‘সেকালে অর্থাৎ ঔপনিবেশিক আমলে শোভাবাজার কালাখানা অঞ্চলে একটা বড় বনস্পতি ছিল। সেই বটগাছের শানবাঁধানো তলায় তখনকার পুরবাসীদের অনেক কাজ চলত। বসে বিশ্রাম নেওয়া হত। আড্ডা দেওয়া হত। গানবাজনা হত। বইয়ের পসরাও বসত। অনুমান হয় এই বই ছিল বিশ্বনাথ দেবের ছাপা। ইনিই বটতলা অঞ্চলে এবং সেকালের উত্তর কলকাতায় প্রথম ছাপাখানা খুলেছিলেন। বহুকাল পর্যন্ত এই ‘বান্ধা বটতলা’ উত্তর কলকাতায় পুস্তক প্রকাশকদের ঠিকানা চালু ছিল।’ তার নাম হয় বটতলা। অনুরূপ ঢাকা থেকেও একই আঙ্গিকে বই প্রকাশ হতে শুরু করে, যা একই সঙ্গে বটতলা বই হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে

জনপ্রিয় সাহিত্যের বাংলা ভাষার উত্থান বটতলাকে ঘিরে। সস্তা দামে, অনেক সময় দুর্বল প্রডাকশন বা সস্তার প্রডাকশনে খ্যাত-অখ্যাত লেখকরা তাদের সেলফ আইডেন্টিটিকে সোস্যাল আইডেন্টিটির সঙ্গে মিলিয়ে প্রকাশ করার সুযোগ গ্রহণ করলেন। আজ যাকে আমরা ‘বাজার’ বলি, উনিশ শতকের সেই বাজারে এল সেলফ আর সোস্যালের এক আশ্চর্য টেক্স— বটতলা। ‘আশ্চর্য’ এই জন্যই বলা হচ্ছে, সেই ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার আদি যুগে আমাদের সাহিত্যের দুটি ধারা— ‘উচ্চ’ নন্দনতত্ত্ব মান্যকারী এবং ‘অপর’ নন্দনতত্ত্ব মান্যকারী হিসেবে যে পথ ধরেছিল, তার মধ্যে দ্বিতীয়টি বটতলার সূত্রে একটা বিরাট জনমনকে স্পর্শ করল। নব্যশিক্ষিত বাঙালির পাঠাকাঙ্ক্ষাকে মদদ জোগাতে— উচ্চ ও অপরের যে জোগান শুরু হয়েছিল কলকাতা এবং তত্সংশ্লিষ্ট জনপদগুলোয়, তার সেই ‘জোগান’-এর উপভোক্তা রূপে কলকাতা ও শহরতলিতে গড়ে ওঠা বাঙালি সমাজ— যারা ইংরেজদের প্রয়োজনে গড়ে তোলা অফিস-কাছারিতে চাকরি করে, নানা ধরনের ব্যবসা ও ছোট ছোট শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অথবা জমিদার-পত্তনিদার-ভূস্বামীর কাছে কাজকর্ম, চাষাবাদ, বিক্রিবাট্টার সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ যারা ছিল এ দেশের নিজস্ব ভূমি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত তারা এবং যারা আস্তে আস্তে আধুনিক শিক্ষা ও সমাজ প্রয়োজনের দিকে যাচ্ছিল, আর যারা সচেতনভাবে বা বাধ্য হয়ে এই ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকে গ্রহণ করল, মান্য করতে বাধ্য হলো— যাদের ইংরেজি ভাষার সঙ্গে যোগাযোগ আছে এবং বিদেশী শাসন সম্পৃক্ত অফিস-কাছারিতে কাজকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য করে, তারা সবাই হঠাৎ করে পড়ার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ঢুকে গেল। এর কারণ, বাঙালির চিরকালের নানা জিনিস সম্পর্কে অত্যুৎসাহ— সে জানতে চেয়েছে চণ্ডীমণ্ডপের আড্ডায় কিংবা বাজারহাটের সভাসমিতিতে, বৈঠকখানার আলোচনায়, মঠমন্দিরে, ঘরগৃহস্থালিতে, প্রতিবেশী সম্পর্কে, বন্ধুবান্ধব সম্পর্কে, সমাজের ভালো-মন্দ, কেচ্ছাকাহিনি সম্পর্কে, যা তার আকাঙ্ক্ষার স্পেসকে অন্যের স্পেসের সঙ্গে গোপনে অথবা প্রকাশ্যে আদান-প্রদান করবে। ভারতীয়দের মধ্যে এটা বাঙালিদের বিশেষভাবে ছিল। এই দেয়ালে আড়ি পাতা থেকে তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়া-বিবাদ, এক কথায় যাকে বলে মতামত দান— নানা বিষয়ে নানা রকম মতামত দানে তার আগ্রহ বহুকালের। এত দিন যখন ছাপাখানা ছিল না, তখন তার অবলম্বন ছিল ওরাল বা মৌখিকভাবে মানুষজনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা। যখন ছাপাখানা এল, তখন সেই সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনের স্পেসটা আরো বেশি এককের হয়ে উঠতে পারল।

সুকুমার সেন ‘বটতলার বই’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘‘সেকালে অর্থাৎ আজ থেকে দেড়শ বছরেরও বেশি কাল আগে শোভাবাজার কালাখানা অঞ্চলে একটা বড় বনস্পতি ছিল। সেই বটগাছের শানবাঁধানো তলায় তখনকার পুরবাসীদের অনেক কাজ চলত। বসে বিশ্রাম নেওয়া হত। আড্ডা দেওয়া হত। গানবাজনা হত। বইয়ের পসরাও বসত। অনুমান হয় এই বই ছিল বিশ্বনাথ দেবের ছাপা। ইনিই বটতলা অঞ্চলে এবং সেকালের উত্তর কলকাতায় প্রথম ছাপাখানা খুলেছিলেন। বহুকাল পর্যন্ত এই ‘বান্ধা বটতলা’ উত্তর কলকাতায় পুস্তক প্রকাশকদের ঠিকানা চালু ছিল।’’ ১৮১৮ সাল নাগাদ বিশ্বনাথ দেবের ছাপাখানাই বটতলার প্রথম ছাপাখানা। তখন কলকাতায় বাংলা ছাপার জন্য আরো পাঁচটা প্রেস ছিল— মিশন রো-এ গভর্নমেন্ট গেজেট প্রেস, বৌবাজারে ফেরিস কোম্পানির প্রেস, লালবাজারে হিন্দুস্তানি প্রেস, চোরবাগানে হরচন্দ্র রায়ের বাঙালি প্রেস এবং পটলডাঙায় লল্লু লালের সংস্কৃত প্রেস। লং সাহেব লিখেছেন, ১৮২১ সালে কলকাতায় চারটে প্রেস ছিল, যা দেশীয় লোকের হাতে বাংলা ছাপা হত— হিন্দুস্তানি প্রেস, বাঙালি প্রেস, সংস্কৃত প্রেস ও বিশ্বনাথ দেবের প্রেস। বিশ্বনাথ দেব নানা ধরনের বই ছাপতেন— বিদ্যালয় পাঠ্য গণিত (১৮১৮) থেকে রামজয় বিদ্যাসাগর সম্পাদিত কবিকঙ্কণের চণ্ডী (১৮২৩)।

কেথায় কোথায় বটতলা গড়ে উঠেছিল— সুকুমার সেন লিখছেন, ‘ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য ছোট সস্তার প্রেস গড়ে ওঠে— যার চৌহদ্দি ছিল দক্ষিণে বিডন স্ট্রিট ও নিমতলা ঘাট স্ট্রিট, পশ্চিমে স্ট্র্যান্ড রোড, উত্তরে শ্যামবাজার স্ট্রিট এবং পূর্বে কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট। ... কলকাতায় সস্তা ছাপাখানার স্বর্ণযুগ বা রমরমা ১৮৪০ থেকে ১৮৭০ পর্যন্ত। তবে সস্তার প্রেস যে কেবলমাত্র শোভাবাজার-চিত্পুরে, যেখানে একদা এক বৃহৎ বটবৃক্ষকে কেন্দ্র করে প্রকাশনা ব্যবসা গড়ে উঠেছিল এবং সেই অঞ্চলেই যে বইবাজারও সীমায়িত ছিল, সে কথা ভাবলে ভুল হবে। সত্যি কথা বলতে কী, সস্তার ছাপাখানা শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল: কুমারটুলি, শোভাবাজার, বালাখানা, আহিরীটোলা, দর্জিপাড়া, গরাণহাটা, হোগলকুঁড়ে, সিমলে, জোড়াবাগান, জোড়াসাঁকো, চোরবাগান, বড়বাজার, আমড়াতলা, শিয়ালদহ, কসাইটোলা (কসিটোলা), কলুটোলা, চুনাগলি, মিশ্রিগঞ্জ, জান (জন) বাজার, ট্যাঙ্ক স্কোয়ার (ডালহৌসি স্কোয়ার), সেকরাপাড়া, ইটিলি। বস্তুত শহরের উত্তরপূর্ব এবং মধ্যাঞ্চলে যেখানেই দেশীয় লোকদের বাস এবং কারবার ছিল, সেসব জায়গাতেই এই ধরনের প্রেস ছিল।

‘কলিকাতা’ নগরকে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে নতুনভাবে একটা ‘বাজার’ হাজির করেছিল বটতলা। শুধু বটতলা নয়, উনিশ শতকের বই ব্যবসায় নানা ধরনের বই বের হওয়া এবং উচ্চশিক্ষিত থেকে নব্যশিক্ষিত বাঙালির চাহিদা মেটাতে সেসব বিচিত্র বিষয়ের বই বাণিজ্যিক সাফল্যও অর্জন করেছিল। আশিস খাস্তগির লিখেছেন, ‘লেখক বই লিখছেন আর সে বই বাজারে বিক্রি হচ্ছে, এমনটি উনিশ শতকের আগে ভাবা যায়নি।’ যখন ভাবা গেল, তখন তার সাফল্য বটতলাকে অন্তর্ভুক্ত করে একটা শীর্ষ স্পর্শ করেছিল, যার হিসাব দেখলে আন্দাজ করা যাবে, কতটা বাজার দখল করতে সক্ষম হয়েছিল বটতলা সংশ্লিষ্ট বই ব্যবসা—

১৮০১-৫২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বই প্রকাশের বার্ষিক হার:

                   ১৮০১-১৭          ১৮১৮-৪৩  ১৮৪৪-৫২

ইতিহাস          ০.৫৩                 ১.৮৮           ৫.৪৪

জীবনী            ০.২৩                 ০.৭৭           ১.০০

ধ্রুপদী গল্প   ০                        ০.৩৮          ২.৬৭

কাহিনী           ০.০৬                 ১.১১             ২.৪৪

গদ্য                 ০.০৬                 ১.৩৮           ২.৬৭

পদ্য                ০.১৮                  ১.১৫            ৭.২২

নীতিকথা        ১.০০                  ৩.১৫           ৫.৬৭

পুরাণকথা                         ৪.৫৩                      ৬.১১                        ১৬.৭৮

বৈদিক                               ০.৪১                        ২.১১                         ১০.৬৭

বৈষ্ণব                               ০.১২                       ০.৭৭                        ৫.৭৮

খ্রিস্টান                              ০.৮৮                      ৬.৫০                      ১০.৫৫

মুসলমানি                         ০.৩৫                      ০.২৭                        ২.৬৭

ডাক্তারি                             ০                              ০.৫৪                       ২.০০

সাধারণ বিজ্ঞান                ০.১২                       ৩.৯২                       ৬.৩৩

আইন                               ০.১২                       ২.৬৫                      ৪.৭৮

ভূগোল                              ০                              ০.৫৪                       ০.৮৯

অভিধান ও ব্যাকরণ        ১.৬৫                      ৬.০৪                       ৯.৮৯

মোট                                 ১০.২৪                     ৩৯.৩১                   ৯১.৮৯

সূত্র: যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য

 &dquote;&dquote;

এই হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে ১৮১৭ সালে মোট বই প্রকাশের হার ১০.২৪ শতাংশ, ১৮৪৩ সালে সেটা ৩৯.৩১ শতাংশ এবং ১৮৫২ সালে ৯১.৮৯ শতাংশ। অর্থাৎ ৫০ বছরে বই প্রকাশের হার বেড়েছে নয় গুণ। এটা একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার, বই প্রকাশের ওই প্রথম পর্যায়ে বাজারের এই সাফল্য দেখে নিশ্চয় অনুমান করা যায় এটা কেবল উচ্চবর্গের বই কেনার মধ্য দিয়ে সম্ভব ছিল না। সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও বই কেনার মধ্য দিয়েই এটা সম্ভব হয়েছিল।

‘বাজার’ গড়ে ওঠার সমর্থন মেলে রেভারেন্ড জেমস লংয়ের দেয়া হিসাব থেকেও। সেখানে ধরা পড়েছে এক বছরে বিক্রি হওয়া বইয়ের বিপুল সংখ্যার হিসাব—

 

১৮৫৭ সালে বিক্রি হওয়া বইয়ের হিসাব:

বিষয়                               বইয়ের সংখ্যা                        বিক্রির সংখ্যা

পঞ্জিকা                          ১৯                                          ১,৩৬,০০০

জীবনী ও ইতিহাস         ১৫                                          ২০,১৫০

খ্রিস্টান                           ৮                                            ৯,৫৫০

নাটক                             ৮                                            ৫,২৫০

শিক্ষা                              ৪৬                                         ১,৪৫,৩০০

যৌনতা                           ১৩                                          ১৪,২৫০

কাহিনী                           ২৮                                         ৩৩,০৫০

আইন                             ৫                                            ৪,০০০

বিবিধ                              ১২                                          ১৮,৩৭০

পুরাণ ও হিন্দুধর্ম           ৮৫                                         ৯৬,১৫০

নীতিকথা                        ১৯                                          ৩৯,৭০০

মুসলমান                        ২৩                                         ২৪,৬০০

সাধারণ বিজ্ঞান             ৯                                             ১২,২৫০

সংবাদপত্র                     ৬                                            ২,৯৫০

সাময়িকপত্র                  ১২                                          ৮,০০০

সংস্কৃতি                           ১৪                                           ১৫,০০০

মোট                               ৩২২                                      ৫,৭১,৬৭০

সূত্র: জেমস লং

 &dquote;&dquote;

আরেকটি হিসাব থেকেও জানা যাচ্ছে বইয়ের বার্ষিক প্রকাশ সংখ্যা এবং পুনর্মুদ্রণ ও সংস্করণের সংখ্যা। চাহিদার জায়গাটা কেমন ছিল, সেটা বোঝা যাচ্ছে এ সংস্করণের তালিকা দেখে। ফলে বাজার গড়ে ওঠার বৈশিষ্ট্যে এ ধরনের চাহিদার সারণি অনায়াসে বুঝিয়ে দেয় কোনো বিষয়ে বাঙালির পড়ার আগ্রহ, কীভাবে উনিশ শতকের বই-সংস্কৃতিতে একটা ভিন্ন ধারণা স্থাপন করতে পেরেছিল। সে ভিন্ন ধারণা হলো, বই কোনো ‘পবিত্র’ অবাণিজ্যিক উপাদান নয়, পণ্য হিসেবে লাভজনক অত্যন্ত বাজার-সার্থক উপাদান।

 

১৮৫৩ থেকে ১৮৬৭ সালের মধ্যে বই প্রকাশ ও সংস্করণের হিসাব:

 

সাল                 নতুন বই                           পুনর্মুদ্রণ ও সংস্করণ                                                          মোট

১৮৫৩           ১১৬                                  ৪৭                             ১৬৩

১৮৫৪            ১১৯                                   ৪৯                            ১৬৮

১৮৫৫           ১০৬                                  ৮৩                           ১৮৯

১৮৫৬           ৭১                                      ৫৫                           ১২৬

১৮৫৭            ২৪০                                  ৫১                            ২৯১

১৮৫৮           ৯৪                                     ৬৪                            ১৫৮

১৮৫৯            ১১৬                                  ৪৪                             ১৬০

১৮৬০           ১০৭                                   ৬৯                           ১৭৬

১৮৬১            ১৩২                                  ৭০                            ২০২

১৮৬২           ১৭২                                   ৮৫                           ২৫৭

১৮৬৩           ২৪৪                                  ৯৭                            ৩৪১

১৮৬৪            ১৬০                                  ৮৪                            ২৪৪

১৮৬৫           ২১৯                                  ১৮৫                         ৪০৪

১৮৬৬           ৯৫                                    ৬৭                            ১৬২

১৮৬৭            ১৭৭                                   ১১৪                           ২৯১

সূত্র: যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য

 

বটতলার বইয়ের বিষয়বস্তু

জনপ্রিয় সাহিত্যের একই সঙ্গে দুটি লক্ষণ দেখা যায়, বিষয়বস্তু হিসেবে যে চিরাচরিতকেই পছন্দ করে, আবার সমসাময়িক বা অভিনবকেও আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ করে।

বটতলার বিষয়বস্তুতেও একই রকমভাবে এই দুইয়ের সম্মিলন দেখা গেছে। একদিকে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল, বিদ্যাসুন্দর, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি ছেপেছে; যা চিরায়ত বাজার-পরীক্ষিত টেক্সট, যার বিক্রি স্টেডি। অন্যদিকে নানা ধরনের নকশা প্রহসনের মধ্য দিয়ে সমকালকে ধরার চেষ্টা করে গেছে— তার সামাজিক বিতর্ককে, যৌন কেলেঙ্কারি, মদ্যপান, বেশ্যাসক্তি, বিধবা বিবাহ, বাল্যবিবাহ, ফিরিঙ্গিপ্রীতি, আধুনিক সময়ের ফল হিসেবে বউকে ভজনা করে মাকে অবহেলা ইত্যাদি নানা রকম নীতিনিষ্ঠ বিষয়বস্তুকে ধরতে চেয়েছে বটতলা। আবার চিরায়ত বিষয়গুলোকে কখনো কখনো নিজের প্রয়োজন মতো ঢেলে সাজিয়ে নিয়েছে।

অনেক সময় হুবহু অনুবাদের চেষ্টাও দেখা গেছে। ‘ঞযব ঞধষবং ড়ভ ঞযড়ঁংধহফ ধহফ ড়হব উধুং’ অনুদিত হয়েছে শ্রী অবিনাশচন্দ্র মিত্র দ্বারা ‘সচিত্র একাধিক সহস  দিবস’ নামে ১৮৮৪ সালে। হিন্দি ভাষায় রচিত ‘গোলেহরমুজ’-এর কেতাব অনুবাদিত হয় ১২৮৫ সালে।

উল্টোদিকে বটতলা বিখ্যাত হলো তার অভিনব বিষয়বস্তুর বইপত্র বের করে, যা অন্য কোনো উচ্চরুচির উচ্চবর্গের ছাপাখানা বা প্রকাশক বের করেননি। তাদের কাছে এসব ছিল হীন ব্যাপার। উচ্চমার্গীয় নয় বলে বটতলার সঙ্গে তাদের সম্পর্কটা অপরত্বের। তাদের জ্ঞান-আধিপত্য দিয়ে বটতলাকে ‘অপর’ করে রেখেছে। আর বটতলা তার মতো করে বিকশিত হয়েছে, বিশেষত যাবতীয় বিস্তার ঘটিয়েছে অন্য শ্রেণীর বইপত্র প্রকাশ করেই। শ্রীপান্থ তার বইতে লিখেছেন, ‘সত্যি বলতে কী, বিষয় বৈচিত্র্যে বটতলার কোনও তুলনা নেই। ধর্ম, পুরাণ, মহাকাব্য, কাব্য সংগীত, নাটক, কাহিনি, যাত্রার বই (পরে থিয়েটারেরও), পঞ্জিকা, সাময়িকপত্র, শিশুপাঠ্য, চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতিষ, অভিধান, ভাষাশিক্ষা, কারিগরিবিদ্যা— এমন কোনও বিষয় নেই, যা ছিল বটতলার কাছে অজানা। সংস্কৃত, ফরাসি, উর্দু, ইংরেজি— নানা উৎস থেকে কাহিনি সংগ্রহ করেছেন বটতলার লেখক ও প্রকাশকরা।... বটতলা সেদিক থেকে সাধারণ বাঙালির কাছে যেন এক খোলামেলা বিশ্ববিদ্যালয়, আজকের ভাষায় যাকে বলে ওপেন ইউনিভার্সিটি।’

নানা বিষয়সহ গড়ে ওঠা ওই ওপেন ইউনিভার্সিটির খোঁজ রবীন্দ্রনাথও পেয়েছিলেন, ‘আকাশপ্রদীপ’-এর ‘যাত্রাপথ’ কবিতায় সে কথা লিখেছেন, ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ সে বটতলাতে ছাপা/ দিদিমায়ের বালিশ-তলায় চাপা/ আলগা মলিন পাতাগুলি, দাগি তাহার মলাট/ দিদিমায়ের মতোই যে বলি-পড়া ললাট।/ মায়ের ঘরের চৌকাঠেতে বারান্দর এক কোণে/দিন-ফুরানো ক্ষীণ আলোতে পড়েছি এক মনে।’ লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই বটতলা ব্যবহারের রীতির মধ্যে একটা অপরত্বর পরিচয় রয়েছে। আলমারির তাক থেকে সাবধানে পেড়ে আনা বই নয়, বটতলা বালিশের তলায় চাপা দিয়ে রাখা মলিন মলাটের বই, তা সে ‘রামায়ণ’ই হোক আর ‘হরিদাসের গুপ্তকথা’। বিশেষত তথাকথিত ভদ্র বাড়িতে এই বই ব্যবহারের মধ্যে একটা চাপিয়ে দেয়া উচ্চ-নীচ ভেদ ছিল। সেটার সঙ্গে কখনো ঔপনিবেশিক নীতিনিষ্ঠ সমাজের যোগ খুঁজে পাওয়া যাবে আবার হয়তো বর্ণ ও শ্রেণীগত দৌরাত্ম্য প্রতিষ্ঠার রাজনীতিও কেউ কেউ খুঁজে পেতে পারেন।

রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’ থেকেই তার উদাহরণ টানা যাক, ‘চাকরদের মহলে যে সকল বই প্রচলিত ছিল, তাহা লইয়াই আমার সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত হয়। তাহার মধ্যে চাণক্যশ্লোকের বাংলা অনুবাদ এবং কৃত্তিবাস-রামায়ণই প্রধান।’ এই রামায়ণ যে বটতলায় ছাপা, তার প্রমাণ আমরা আকাশপ্রদীপের লেখায় আগেই উল্লেখ করেছি। চাকরবাকর মহলের বইপত্র হিসেবে বটতলার অস্তিত্বকে এইভাবে অগ্রাহ্য করা, নস্যাৎ করা, অসম্মান করার মধ্যেই শ্রেণী-অবস্থান ধরা পড়বে— আমরা বাবু, তোমরা অধঃস্তন। তোমরা বটতলা পড়ো। আমরা পড়ি না। পড়লেও ঠাকুমা বালিশ চাপা দিয়ে পড়েন। আর রবি মায়ের ঘরের বারান্দার এক কোণে গিয়ে দিনের ফুরনো আলোয়, নাকি প্রায় অন্ধকারে এই বই পড়েন। এই চাকর মহলের বই, বালিশ চাপা দেয়া বই, অল্প আলোর কোণে গিয়ে পড়ার বই বটতলা, তার সূচনালগ্ন থেকেই শ্রেণিবৈষম্যের অসম্মান অর্জন করে এসেছে। রামায়ণ পাঠের মধ্যে তো সেভাবে অসম্মান থাকতে পারে না, হয়তো বটতলার অন্যান্য বিষয়, যা অশ্লীলতার ছাপ্পা কিংবা সামাজিক বিতর্কের মধ্যে ঢুকে গিয়ে নিজেই তর্ক-বিতর্কের হয়ে গিয়েছিল, তার জন্য এই ‘ছুত্মার্গ’ তৈরি হয়েছিল। সেটাও এক ধরনের ভিক্টোরিয়ান মানসিকতা, যা পুরো সমাজের ওপর চাপিয়ে দেয়া কালচারাল হেজিমনি। তার রেশ এতটাই যে ভদ্রবাড়িতে সেটা রামায়ণ হলেও বালিশ চাপা দিয়ে রাখতে হয়। অনেকে বলেন, বালিশ চাপার কারণ মাথায় ধর্মগ্রন্থ রেখে পুণ্য অর্জন। না, তা নয়, তাহলে রবি কোনায় গিয়ে পড়বে কেন, চাকর মহলের সঙ্গে একাত্ম করে এই বইকে হাজির করবে কেন? সেখানে ওই অবজ্ঞাটাই ধরা পড়েছে বড় বাড়ির, আভিজাত্যের, উচ্চ রুচির, উচ্চ নন্দনতত্ত্বের। ১৮৫৫ সালে রেভারেন্ট জেমস লং বাংলা বইয়ের একটা তালিকা প্রকাশ করেছেন, সেখানে ১ হাজার ৪০০ বইয়ের হদিস আছে, তার মধ্যে অজস্র বটতলার বই। শ্রেণীবদ্ধভাবে প্রাসঙ্গিক তথ্য উল্লেখ করে লং পুরো তালিকাটি বানিয়েছেন কয়েকটা পর্বে— (১) শিক্ষাবিষয়ক বই, (২) পঞ্জিকা-সাময়িকপত্র-সাহিত্য-পাঁচালি-আদিরসাত্মক বই, (৩) ধর্মবিষয়ক বই ইত্যাদি। এ নিয়ে সন্দেহ নেই যে ধর্মবিষয়ক বইই বটতলার বইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল। তার মধ্যে হিন্দু ধর্মবিষয়ক, মুসলমান ধর্মবিষয়ক, এমনকি খ্রিস্ট ধর্মবিষয়ক বইও।&dquote;&dquote;

খানিকটা লংয়ের তালিকা থেকে, খানিকটা নানা বিচ্ছিন্ন সূত্র থেকে আমরা বটতলার বইয়ের যে বিচিত্রতার সন্ধান পাই, তা উল্লেখযোগ্য। যেমন, গদ্য-পদ্য মিলিয়ে— কামিনীকুমার, কন্দর্পকোমুদী, কৌতুক-সর্বস্ব নাটক, খোশ গল্পসার, শুক-বিলাস, শুক-সংবাদ, যোজনগন্ধা, পারস্য ইতিহাস, অমরকোষ, গোলদেওগান্ধার, ইংরেজি পাঠ, হস্তমালিক, ভাষা দ্রব্যগুণ, রসমঞ্জরী, হাতেমতাই, লালমন কেচ্ছা, চাহার দরবেশ, মন কেচ্ছা, বদমাএস জব্দ, বেশ্যা গাইড, বেশ্যা বিবরণ, বাহাবা চৌদ্দ আইন, ডেঙ্গু জ্বরের পাঁচালি, একেই বলে পোল, আশ্বিনে ঝড়, ড্রেনের পাঁচালি, আকালের পুঁথি, দুর্ভিক্ষ চিন্তামণি ইত্যাদি।

১৮১৬ সালে কলকাতার ফোরস কোম্পানির প্রেসে ছাপানো ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’-এ যে ছয়টি ছবি ছিল, সেটাই বাংলা বইয়ে প্রথম ছবির ব্যবহার। দুটি ছবিতে শিল্পীর নাম আছে— রামচাঁদ রায়। কিন্তু বটতলার ছবির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে আরো ১৫ বছর পর— ১৮৩১ সাল নাগাদ। তারপর প্রচুর বই বের হয়েছে, যাতে ছবি যুক্ত হয়ে আলাদা মাত্রা অর্জন করেছে। অনেক সময় বইয়ের বিজ্ঞাপনে ‘সচিত্র’ কথাটি উল্লেখ করা হতো। বিক্রির সঙ্গে নিশ্চয় এর যোগ ছিল। ‘কালী কৈবল্যদায়িনী’ (১৮৩৬), ‘ভাগবদগীতা’ (১৮৩৬), ‘হরপার্বতীমঙ্গল’ (১৮৫১), ‘অন্নদামঙ্গল’ (১৮৫৭), ‘পঞ্চদশী’ (১৮৬২) ইত্যাদি বহু বইতে ছবি ছাপা হলো। উনিশ শতকের প্রথম দশক থেকেই আমরা বেশ কিছু খোদাই শিল্পীর নাম পাচ্ছি, যারা বটতলার বইতে ছবি এঁকেছেন— রামচাঁদ রায়, রামধন স্বর্ণকার, কাশীনাথ মিস্ত্রি, গোবিন্দচন্দ্র রায়, গোপীচরণ স্বর্ণকার (কমুলিটোলা), হীরালাল কর্মকার (বটতলা), হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিশ্বম্ভর আচার্য, কৃষ্ণচন্দ্রদাস, মাধবচন্দ্র দাস, রূপচাঁদ আচার্য, রামসাগর চক্রবর্তী, বীরচন্দ্র দত্ত, পঞ্চানন কর্মকার (হোগল কুড়িয়া), তারিণীচরণ দাস, বীরচন্দ্র দাস (আহিবিটোলা), কার্তিকচন্দ্র বসাক, কার্তিকচন্দ্র কর্মকার, গঙ্গানারায়ণ ঘোষ, বেণীমাধব ভট্টাচার্য, নিত্যলাল দত্ত (কখনো বানান নৃত্যলাল)। নিত্যলাল দত্তর নিজের ছাপাখানা ছিল দত্ত প্রেস। গোবিন্দচন্দ্র রায়ের আঁকা একটি ছবির নিচের লেখা— ‘এই রকম হরেক ছবি কলিকাতায় ছাপা হইতেছে, যাহার দরকার হয় আসিয়া লইবেন।’ আবার কৃষ্ণচন্দ্রের ছবিতে লেখা, ‘মোং শোভাবাজারে চূড়ামণি দত্তের পাড়ায় ২৭ নং বাটিতে ও বটতলার দক্ষিণ রাওজীর দোকানে মোং কলিকাতা ও শ্রীরামপুরের হরেক রকম ছবি পাইবে শ্রীকৃষ্ণচন্দ্র কৃত।’ এই কৃষ্ণচন্দ্র পঞ্চানন কর্মকারের জামাই মনোহরের ছেলে। মনোহর যখন ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন, তখন সেখান থেকে কৃষ্ণচন্দ্র সচিত্র পঞ্জিকা প্রকাশ করেছেন। সেই ছবিও নিজেই আঁকতেন।

এসব নামাঙ্কনের পেছনে ছিল এদের বাজার ধরার আকাঙ্ক্ষা। কার আঁকা ছবি এবং কোথায় পাওয়া যাবে ভিত্তিতে ক্রেতা খোঁজ নিয়ে যথাস্থানে পৌঁছে সেই ছবি বা বটতলার কাঠখোদাই কিনবেন। কারণ, প্রচলিত কালীঘাটের পটচিত্রে, যা মেদিনীপুরের পটুয়ারা উনিশ শতকের শুরুতেই কালীঘাটে এসে (বর্তমান মন্দির তৈরি হয় ১৮০৯ সালে) জীবিকার্জনের তাগিদে বসবাস করতে শুরু করে এবং কালীঘাটের পটচিত্র জনপ্রিয় হয়। তার দাম ছিল বটতলার ছাপা ছবির কয়েক গুণ বেশি। ফলে সাধারণ মানুষ দেবদেবীর ছবি কিনতে গিয়ে দামের সুবিধার কারণে কালীঘাটের বদলে বটতলার ছবিকেই বেছে নিত বেশি। আর উইলিয়াম আর্চার কালীঘাটের পটের সঙ্গে বটতলার কাঠখোদাইয়ের মিলও খুঁজে পেয়েছেন। এই সময়ে দুটো শিল্পধারা চর্চিত হচ্ছিল। ১৮০০ সাল থেকে তিনি কালীঘাটের পট খুঁজে পাচ্ছেন। ১৮১৬তে আমরা বাংলা বইয়ের প্রথম অলঙ্কৃত ‘অন্নদামঙ্গল’ পাচ্ছি। তারপর থেকে বটতলার বইতে যে ছবি এল, তার সঙ্গে আমাদের দেশীয় পটচিত্রের যোগ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। যদিও আর্চার কালীঘাটের পটে পাশ্চাত্য চিত্রকলার ছায়া দেখতে পেয়েছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে এ দেশীয় গবেষকরা দেখিয়েছেন, এ ধারণা ভুল। কালীঘাটের পট দেশীয়ভাবে গড়ে উঠেছিল, যার সঙ্গে আর্চার কথিত পাশ্চাত্য প্রভাবের মিলগুলো প্রাক-ঔপনিবেশিক শিল্পকলায় দেখতে পাওয়া যায়।

দামের দিক থেকে সস্তার ফলে বটতলার ছবি যেমন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, তেমনি ছাপা ছবি হওয়ার কারণে কালীঘাটের পটের রঙ বাঁচিয়ে রাখার যে ঝক্কি, তা থেকে মুক্ত ছিল সাধারণ মানুষ। তাছাড়া কালীঘাটের পট কালীঘাটে গিয়ে কিনতে হতো মূলত। যদিও ঐধহধ শরহরুশড়াধ ‘ঞযব উত্ধরিহমং ড়ভ ঃযব কধষরমযধঃ ংঃুষব’ (চত্ধমঁব, ১৯৭৫) বইতে বোঝাতে চেয়েছেন, কালীঘাট শুধু কালীঘাটেই সীমাবদ্ধ ছিল না, একটা স্কুলিং হিসেবে শহরের অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়েছিল। তবু নামের মধ্যে কালীঘাট থাকার কারণে কালীঘাটের কাছাকাছি থাকার যে দায়বদ্ধতা ছিল, তা বটতলার চিত্রকরদের ছিল না। ফলে তারা অনেক বেশি বিস্তার লাভ করেছিল বসতির দিক থেকে। ফেরিওয়ালারা তাদের ছবি নিয়ে ফেরি করত। বইতে করে সে ছবি অনায়াসে পৌঁছে যেত, যে পাঠক ছবিপ্রিয় নয়, তার কাছেও। ছবি দেখে আকৃষ্ট হয়ে সেই অনাগ্রহী পাঠক যখন আগ্রহী হতো, তখন সে-ও কিনত অথবা আলাদা করে কাঠখোদাই, ধাতুখোদাই না কিনে বইয়ের ছবি সংরক্ষণ করত।

বটতলার ছবিকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়— (১) দেবদেবী বা ধর্মসংক্রান্ত ছবি এবং (২) মানুষ বা অধর্মীয় বিষয়কেন্দ্রিক ছবি।

নানা রকম ছবির নাম। নানা ধরনের নারী-চিত্র আঁকার প্রবণতা ছিল। মূলত কাম আকাঙ্ক্ষা থেকে এগুলোর চাহিদা ছিল নানা বয়সী বাঙালি পুরুষসমাজে। ‘অশ্লীল’ বইপত্রের ধারা তার অনুসরণে দেখতে পাই।

১৩১৫ সালে প্রকাশিত ‘সচিত্র রতিশাস্ত্র’ বইতে সে রকমই একটি নায়িকাচিত্র সিরিজ প্রকাশিত হয়েছিল। এরা কেউ বাৎসায়ন কথিত নারী শ্রেণী অনুসারী নয়। কারণ, সেভাবে সমাজ নেই। সমাজ যেভাবে আছে, সেখানে নারীরা যেভাবে রয়েছে, সেসব পোশাক, অলঙ্কার, ঠাঁটবাটসহ বটতলা তার নায়িকাচিত্র রচনা করেছে। স্টুডিওতে বসা ফটোগ্রাফ যেন। আঁকা ছবিতে সে রকমই ফুলদানি, টেবিল, টেবিল ক্লথ, মেঝে, চেয়ার ইত্যাদি। নতুন উদ্ভূত ফটো তোলার কায়দাকে অন্তর্ভুক্ত করে সে আরেক ধরনের মাধ্যমের মিশ্রণকে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে। ফটোগ্রাফ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তারই সঙ্গে যেন বটতলাও নিজের প্যাটার্ন বদলায়। কমলিনী সাহিত্য মন্দিরের ১ টাকায় উপন্যাস সিরিজের একটি উপন্যাস ‘বিয়েবাড়ি’। তার অন্তর্গত রঙিন হাফটোন ছবি ছাপতে শুরু করে পরবর্তীকালের বটতলা। দেখা যায়, সিনেমার সেটের মতো একটি রেলিংওয়ালা বারান্দায় দাঁড়িয়ে নায়িকা। একই রকমভাবে আহিরিটোলা কমলিনী সাহিত্য মন্দিরের ১ টাকা সিরিজের উপন্যাস ‘রাজরাণী’ থেকেও একটি রঙিন হাফটোন ছবি মেলে, যেখানে ওই ধরনের স্টুডিও চিত্রের মতো রিয়েলিস্টিক ঢঙে আঁকা ঘোড়ায় চড়া রানী, যদি বটতলায় প্রথম যুগের আঁকা কাঠখোদাই থেকে এই হাফটোনের ছবিগুলো ধারাবাহিক পর্যালোচনা করা যায়, তাহলে দেখা যাবে— বৃহত্তর পৃথিবীতে টেকনোলজিক্যাল উন্নতির ফলে ছবির জগতে যত ধরনের অদলবদল ঘটেছে, বটতলা ধারাবাহিকভাবে তাকে অনুসরণ করে গেছে। বাইরের প্রভাবকে দরজা বন্ধ করে আটকে রাখেনি।

বটতলার বইয়ের ভাষা

বটতলার ভাষা জনপ্রিয়তার অন্যতম একটা কারণ। যথাসম্ভব চলতি ভাষাকে ব্যবহার করে আটপৌরে শব্দ ও বাক্যের মধ্য দিয়ে সমসাময়িক ভাষা-মেজাজটাকে ধরতে চেয়েছে বটতলা। তার ফলে সমকালীন বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে গ্রহণের সুযোগ বেড়েছে। বাঙালির যে নব-উত্থিত শিক্ষিত অংশ অথবা স্বল্পশিক্ষিত, তারা সবাই যে সাহিত্য বিষয়ে জটিলতায় বিশ্বাসী ছিলেন এমন নয়, বরং ভাষাগতভাবে উল্টো বিশ্বাসে স্থিত ছিলেন। জনপ্রিয়তার সঙ্গে যে জনভাষার যোগ, তার মনস্তত্ত্ব প্রধানত দাঁড়িয়ে থাকে ভোক্তার ভাষা-ক্ষমতা বা ভাষা-অধিকারের উপরে। চমস্কি মনে করেন, এ ভাষা গ্রহণটা উচ্চশিক্ষিত প্রস্তুত পাঠকদের মতো নয়, তারা অজানা শব্দ ও ভাষা সম্বন্ধে আগ্রহী হয়, সেই ভাষাটা তারা জেনে নেয়— শব্দ-বাক্য-অর্থ জানার প্রবণতা তাদের শিক্ষার অর্জন পথের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে। অন্যদিকে, বৃহত্তর জনমানসে ভাষার সেই নতুনত্বের প্রতি অনধিকার ভয় কাজ করে। সে ভাবে, এই নতুন ভাষা-পৃথিবীটা তার জন্য নয়, বরং তাকে বিপর্যস্ত করার জন্য। তখন সে নিজেই প্রত্যাখ্যান করে ওই সাহিত্য বা টেক্সটকে। যা তার বোধগম্য, তা গ্রহণীয়— এই তত্ত্ব মেনে জনপ্রিয় সাহিত্যের ভাষা গড়ে ওঠে। যেহেতু তা বোধগম্য, অনেক বেশি তাদের ব্যবহার্য ভাষার কাছাকাছি, যথাসম্ভব বোধগম্য, কথ্যভাষার প্রতি অতিনিষ্ঠ, তাই জনপ্রিয় সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ সমধিক।

বটতলার বইয়ের দাম: বটতলার বই ভালো কাগজের বদলে চলতি কাগজ দিয়ে শুরু করলেন প্রকাশকরা। অধিকাংশ বইয়ের মলাট হতো আরো পাতলা রঙিন কাগজে। খরচ আরো কম। কখনো বাঁধাই হতো। তার মান অথবা খরচ, মেইন স্ট্রিমের বইয়ের তুলনায় কম করা হতো বলে অন্যান্য বাঁধাই বইয়ের চেয়ে সেটার দাম কমই হতো।

বটতলার বইয়ের সঙ্গে বই ব্যবসার একটা বিপুল বিস্তারি, বহু লোকজনের পেশা হয়ে ওঠা একটা কর্মকাণ্ড হওয়ার ফলে তাদের বিক্রি বেশি হতো এবং অল্প অল্প করে সবাই এমন একটা টাকা হাতে পেল, যা সব মিলে চলনসই। মালিকরা অনেকেই ধনী ছিলেন। এদের খরচ কমানোর ঝোঁক এত তীব্র ছিল যে, অনেক সময় লেখক শিল্পী কারিগরদের টাকা পর্যন্ত দিতেন না। হরফের অকালও মিটে গিয়েছিল। কলকাতায় তখন প্রচুর ছাপাখানা। এগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে টিকে থাকার। তার জন্য দাম কম করার প্রতিযোগিতা। এই দাম কমের কারণে সাধারণ মানুষ এত দিন যে বই কিনতে পারত না, সেটা সে পারল। কিনল। এই সম্ভাবনা আরো কেনার দিকে নিয়ে গেল। অর্থাৎ উনিশ শতকে অর্থবান বাবুরা ছাড়াও নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাঙালির যে বই কিনতে পারার ইচ্ছে, তার পেছনে আছে বটতলার বইয়ের দাম কম রাখার বাস্তবতা। নতুন একদল ক্রেতা তৈরি হলো। তারা দাম কম বলেই হতে পারল, এদের অন্য কোনো সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা নেই, যাতে কিনতেই হবে। এই কিনতে পারার মতো দাম বটতলাকে জনপ্রিয় করেছে।

‘বসাক অ্যান্ড সন্স, ১২৭ নং মসজিদ বাড়ি স্ট্রিট, কলকাতা’, থেকে প্রকাশিত (পঞ্জিকা ১৯২৬) থেকে একটা বিজ্ঞাপন উল্লেখ করা যাক, ‘এরূপ লক্ষাধিক বিষয়পূর্ণ গ্রন্থের মূল্য অধিক হওয়া উচিত কিন্তু দরিদ্র বঙ্গ দেশ তাহা বহনে অক্ষম বলিয়া ৬ টাকা মাত্র ধার্য্য হইল— আবার বহুল প্রচার জন্য গ্রাহকগণ অল্প দিন মাত্র ২২০ আড়াই টাকায় পাইবেন।’

 

বটতলার বইয়ের বিপণন

বিপণনের ক্ষেত্রে সহজলভ্যতা বটতলার বইয়ের ক্ষেত্রে একটা বড় বৈশিষ্ট্য। ছাপানো বইয়ের ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দোকানই ভরসা। প্রকাশকরা বটতলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মূলত উত্তর কলকাতার। কখনো বা মধ্য কলকাতায় তাদের বিস্তার। আমরা আগেই বলেছি প্রচ্ছদে ‘কলিকাতা’ লিখে দূরের পাঠককে নাগরিক মাহার্ঘ্য হিসেবে উপস্থাপনের সাইকোলজি ছিল। এর ফলে দোকানের ঠিকানাও কলকাতার। সঙ্গতভাবেই তার সঙ্গে পাঠকের ভৌগোলিক দূরত্ব অনেক। গ্রাম-মফস্বলের পাঠকের কাছে সহজে মিলবে না। সে যেহেতু সচরাচর কলকাতায় আসে না, তার পক্ষে ওই বই কলকাতার দোকান থেকে সংগ্রহ করা সহজ নয়। তখন উপায় বের করলেন বটতলার বই ব্যবসায়ীরা।

বইওয়ালা— ফেরিওয়ালার মতো বই বিক্রি করার আইডিয়া বাংলায় প্রথম এল এই বটতলার হাত ধরেই। একজন ফেরিওয়ালা ব্যাগে বই নিয়ে, কাঁধে ব্যাগ, হাতে বই— গাড়ি ধরে চলে গেলেন মফস্বলে, গ্রামে— অন্যান্য জিনিসের মতো বইও ফেরি করে বিক্রি করতেন তারা। প্রচুর বিক্রি হতো। যারা কখনই বই কেনার কথা ভাবেননি, তারাও বই কিনতেন। তারা ধার-বাকিতে বই বিক্রি করতেন, কারণ ক্রেতা-বিক্রেতা পরিচিত। ফলে পাঠকদের সুবিধা হতো আরো। বাড়ির মা-বউরা কিনতেন, বিধবা পিসি-মাসিরা কিনতেন, শিশুরা কিনত, বড় কর্তারাও কিনতেন আগ্রহ নিয়ে। পাঁচালি, ধর্মগ্রন্থ রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, শাস্ত্রগ্রন্থ, আয়ুর্বেদ, আইন, শিক্ষাবিষয়ক বই থেকে শুরু করে ভোজবাজি, তন্ত্রমন্ত্র, উপন্যাস, সামাজিক প্রহসন, নাটক, কাব্য-কবিতা— সবই ভীষণভাবে বিক্রি হতো। বিয়ের সিজনে বটতলার বইয়ের সঙ্গে আলতা, সিঁদুর, সুগন্ধি তেল ফ্রিতে দেয়ার স্কিমও সেকালের ক্রেতাদের কাছে বাড়তি আকর্ষণের কেন্দ্র করে তুলেছে। চাহিদা অনুসারে অর্ডার যেত কলকাতায়। চাহিদা বুঝে নতুন বই নির্বাচন করা হতো। সেই নতুন বই আবার এরাই নিয়ে যেতেন। মোবাইল সেলিং সিস্টেম— ঘুরে বিক্রির একটা বিরাট দল বটতলার বইকে জনপ্রিয় করেছে, বটতলার অর্থনীতিতে নিজেদের বেঁচে থাকার উপায় বের করছে।

 &dquote;&dquote;

বটতলার বইয়ের বিজ্ঞাপন

বটতলার বইয়ের জনপ্রিয়তার পেছনে উল্লেখযোগ্য অবদান বটতলার বিজ্ঞাপনের। মূলত পঞ্জিকা এবং প্রকাশিত বইয়ের প্রচ্ছদে বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে তারা এক ধরনের প্রচার চালাত, যা প্রচারিত ধারার একদম উল্টো চিত্র। তাদের লক্ষ্য ছিল পঞ্জিকার বিপুল বিস্তৃত জনসাধারণ। ঘরে ঘরে ব্যবহূত পঞ্জিকায় বিজ্ঞাপন দিলে অবশ্য ‘মাস’ ও ‘ক্লাস’ উভয়ের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। সেই সুযোগটিকে ব্যবহার করত বটতলা।

সেকালের বিখ্যাত জনপ্রিয় ডিটেক্টিভ লেখক পাঁচকড়ি দে’র বই প্রকাশ করত ‘পাল ব্রাদার্স অ্যান্ড কোং ৭নং নবকৃষ্ণ দা লেন, (বি) জোড়াসাঁকো, পো. বড়বাজার, কলিকাতা।’ পাঁচকড়ি দের উপন্যাসের ছকে মহিলারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অর্জন করে। তাদের রূপ-বুদ্ধি-রহস্যময়তাকে ব্যবহার করে পাঁচকড়ি দে যা লিখেন, তাকে বিজ্ঞাপিত করা হয়। অর্থাৎ মহিলাকেন্দ্রিকতাকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে বিজ্ঞাপন রচিত হয়। বটতলার বিজ্ঞাপন সেই আকর্ষণের কথা সরাসরি বলে। ‘মনোরমা’ উপন্যাসের বিজ্ঞাপনে লেখা হয়, ‘কামাখ্যাবাসিনী সুন্দরীরা প্রেমোন্মাদিনী হইয়া জগতে কি না করিতে পারে? তাহারই ফলে সেই কামিনীর কোমল করে এক রাত্রে পাঁচটি গুপ্ত নরনারী হত্যা।’ অথবা ‘মায়াবী’ উপন্যাসের বিজ্ঞাপনের ভাষা, ‘মোহিনীর চরিত্রে আরো দেখিবেন, স্ত্রীলোক একবার ধর্মভ্রষ্টা পাপিষ্ঠা হইলে, তখন তাহাদের অসাধ্য কর্ম আর কিছুই থাকে না।’ এই বিশ্বাস সামাজিকভাবে প্রচলিত মতকে স্বীকার করে পাঠকের কাছে জানানো হয়, ‘ঘটনার পর ঘটনা-বৈচিত্র্য বিস্ময়ের ওপর বিস্ময়-বিভ্রম, রহস্যের ওপর রহস্যের অবতারণা— পড়িতে পড়িতে হাঁপাইয়া উঠিতে হয়।’ যা পছন্দ করবে জনগণ, তাকে ব্যবহার করে রহস্য উপন্যাস লেখাতেই বটতলার ঝোঁক। যেমন পাঁচকড়ি দের বিখ্যাত উপন্যাস নীলবসনা সুন্দরী— আবার মহিলার তাস ব্যবহার করলেন, সঙ্গে নীলবসনা। রহস্যে ভরা বাতাবরণ। ‘ইহাতে এমন একটিও পরিচ্ছেদ নাই, যাহাতে একটা না একটা অচিন্তিত পূর্বভাব অথবা কোনও চমকপ্রদ ঘটনার বিচিত্র বিকাশে পাঠকের বিস্ময়, তন্ময়তা ক্রমশ বর্ধিত না হয়।’ একদিকে ফর্ম, অন্যদিকে উনিশ শতকের মতোই বিশ শতকের প্রথম পর্বে যেভাবে নারীকে কেন্দ্র করে আপামর পাঠকের অজানা রহস্য কল্পনা, তাকে ব্যবহার করেই কনটেন্ট গঠিত হচ্ছে বারবার। বরং আরো তীব্রভাবে যেমন ‘জীবন্মৃত রহস্য’ উপন্যাসের বিজ্ঞাপনে লেখা, ‘মায়াবী উপন্যাসের নারী দানবী জুমেলিয়াকে দেখিয়া চমকিত হইলে চলিবে না। আরো দেখুন, এই ‘জীবন্মৃত রহস্যের’ জুলেখা আরো কি ভয়ঙ্করী। এই জুলেখা সাহসে, প্রতাপে, কৌশলে, চাতুর্যে, শঠতায়, দম্ভে, গর্বে কোনো অংশে সেই সর্ব পরাক্রমশালিনী জুমেলিয়ার অপেক্ষা কম নহে। এই প্রলয়ঙ্করী নারী-নাগিনী জুলেখার কার্যকলাপ আরো অদ্ভুত, আরো চমত্কার, আরো ভীষণ-ভীষণ হইতেও ভীষণতর।’

আরো একটা উপন্যাসের বিজ্ঞাপন একই ধরনের। ‘পরিমল’ নামের সেই উপন্যাসের বিজ্ঞাপনে লেখা— ‘নারীর রূপতৃষ্ণা ও বিষয় লালসায় মানব কিরূপ দানব হইয়া উঠে।’ সঙ্গে ছাপা হয়েছে ছবি— দু’দুটি খুনের পর ছুরি ধরা এক মহিলাকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা চালাচ্ছে দুই পুরুষ।

‘রঘু ডাকাত’ উপন্যাসের নিচেই ছাপা হয়েছে ‘মৃত্যু-রঙ্গিনী’ নামে একটি বটতলার উপন্যাসের বিজ্ঞাপন, ‘এই উপন্যাসের নায়িকা সুন্দরী যথার্থই মৃত্যুরঙ্গিনী বটে! এই রমণী পিশাচী অপেক্ষাও ভয়ঙ্করী; নর হত্যা, নারী হত্যা, স্বামী হত্যা— হত্যার উপরে হত্যা। এই রমণী সাহসে, প্রতাপে কোনো অংশে রঘু ডাকাতের কম নহে। ইহাকে মেয়ে রঘু ডাকাত বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।’

এভাবে নানা বিজ্ঞাপনের মধ্য থেকে একটা আকর্ষণ আগ্রহের বয়ান আমরা পাই, যা মেয়েদের প্রতি পুরুষের যে আকর্ষণ, রহস্যময় টান, তাকে ব্যবহার করা। এটা বটতলার ঘুরেফিরে বহু বিজ্ঞাপনেরই লক্ষ্য। একে আমরা বটতলার বিজ্ঞাপনের অকপটতা বলতে পারি।

‘সরল ইংরাজী শিক্ষা’ বইয়ের বিজ্ঞাপন ভাষা— ‘এখন ইংরাজী ভিন্ন গতি নাই। তিন মাসে নিজে নিজে ইংরাজী লিখিবার ও শিখিবার ৩১২ পৃষ্ঠার সচিত্র চূড়ান্ত গ্রন্থ।’ একই বিষয়ে শ্রী শরচ্চন্দ্র শীল (১৫/৩ নং লক্ষ্মীদত্ত লেন, পোস্ট বাগবাজার, কলিকাতা) প্রকাশন বিজ্ঞাপন করছে ‘ইংলিশ টিচার বা ইংরাজী পণ্ডিত’ বইয়ের— ‘এই পুস্তক দ্বারা অতি অল্প দিনে ইংরাজীতে কথাবার্তা বলা, চিঠিপত্র লেখা প্রভৃতি সমুদয় বিষয় সুন্দররূপে শিক্ষা করিতে পারা যায়।’ আবার ‘কার্তিকচন্দ্র ধর ব্রাদার্সের সুলভ কলিকাতা লাইব্রেরি (৪৪ নং নিমু গোস্বামী লেন, পোস্ট বিডন স্ট্রিট, কলিকাতা)’ জানাচ্ছে— ‘ইংরাজী ভাষা শিক্ষা’ বইয়ের বিজ্ঞাপনে— ‘ইংরাজী কাঁচা লেখা, পাকা লেখা, টানা লেখা, ইংরাজী রচনা ইত্যাদি যাহা যাহা ইংরাজ রাজ্যে আবশ্যক, তাহা সকলই লিপিবদ্ধ করা হইয়াছে।’ আমরা এ বিজ্ঞাপনগুলো থেকে উনিশ-বিশ শতকের ঔপনিবেশিক আইডেন্টিটির পরিচয় দেখতে পাচ্ছি। একটা সামাজিক সংঘাতের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যা ভারতীয় অদলবদল সংক্রান্ত আইডেন্টিটির বদল, তার রূপরেখা মিলছে এসব বিজ্ঞাপনের আহ্বানে অথবা প্রত্যাখ্যানে। আমরা তার পরস্পরবিরোধী কিছু উদাহরণ দেখে বুঝে নেব এই সংশয়ে বাঙালির প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের গ্রহণ-বর্জন অথবা এ দেশে ও দেশের মান্যতা বিষয়ে কী ধরনের দৃষ্টিকোণ ছিল।

‘বৃহৎ জ্যোতিষ সিদ্ধান্ত, (বসাক অ্যান্ড সন্স) বইয়ের ভেতর পাওয়া যাবে এ দেশীয় চাহিদার যাবতীয় রকমফের। যথা— ‘সংসারে গ্রহ, ফাঁড়া, বিপদাপদ, শনি কার না আছে? ইহার সেই ভূত-ভবিষ্যৎ ও বর্তমানের শুভাশুভ গণনা, পঞ্জিকা গণনা, কোষ্ঠীগণনা, নষ্টকোষ্ঠী উদ্ধার, বৃষ্টিগণনা, কার্যসিদ্ধ, নষ্টদ্রব্য উদ্ধার, বিবাহ, বন্ধ্যা ও পত্নীহীনযোগ, সুখ-দুঃখ এবং হাত দেখা, মনের কথা বলা, প্রশ্ন গণনা, স্ত্রীভাগ্য, গ্রহ শান্তি ও দৈববাণী গণনা, গর্ভস্থ সন্তান গণনা, রোগ ও তাহার ভোগ নির্দেশ, দৈবশান্তি প্রভৃতি জ্যোতিষের কোনো বিষয়ই বাকি নাই...’ সবই এ গ্রন্থে পাওয়া যাবে। এসবই সম্পূর্ণভাবে বাঙালির অথবা ভারতীয় চাহিদার অন্তর্গত। এখানে মানা হয়নি পাশ্চাত্যের দাবি।

আবার ‘ইন্দ্রিয় সম্বন্ধীয় যৌবন পাঠ্য গ্রন্থ’, ‘যৌবন পথে’ (বসাক অ্যান্ড সন্স)-র আইডিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাশ্চাত্যের সেক্স গাইডের ধারণা। বিজ্ঞাপনেও সেভাবেই ভোক্তাকে আকর্ষণের কথা লেখা হয়েছে— ইউরোপ, আমেরিকা প্রভৃতি প্রদেশে রমণীরা যে উপায়ে ইচ্ছা মতো ৫/৬ বৎসর অথবা ততোধিক সময় অন্তর সন্তান উৎপাদন করে— কী উপায়ে ও কিরূপ নিয়মে গর্ভ হয়’ নমুনা মিলবে এ গ্রন্থে। পাশ্চাত্যের যে ‘মডেল’ যৌন ধারণা তাকে অনুসরণ করে জীবন উপভোগ। এই ধরনের বই প্রচুর বেরিয়েছিল বটতলা থেকে। আর এসব বই সচিত্র হতেই হবে। চিত্রের প্রতি আকর্ষণ পাঠকের কামনাকে পরিতৃপ্ত করবে। এ ধরনের বই বিক্রিও হতো প্রচুর। তখন কলের গান খুব জনপ্রিয়। সেই রেকর্ড সংগীতের বই একাধিক ছিল। এ বই তা নয়, তবে তার আকর্ষণকে অবলম্বন করে গড়ে তোলা। রেকর্ড কাকলী— ‘ইহা সৌন্দর্যের ঝরনা-আনন্দের খনি— মনের মতো প্রিয়জনকে উপহার দিবার পুস্তক। গায়ক-গায়িকা, নর্তকী, অভিনেত্রীগণ ও কবিগণের ফটো— সুন্দরীর মেলা!! মূল্য দেড় টাকা।’

বটতলার বিজ্ঞাপনে অবধারিতভাবে নীতিশিক্ষামূলক বইও দেখতে পাওয়া যায়, যাতে পাঠককে আকর্ষণ করা হয়, নারীর সচ্চরিত্র ও গুণবতী হয়ে ওঠার কৌশল শেখানোর মতো ‘মহান’ দায়িত্ব নিয়ে। এগুলোকে আমরা আমাদের সমাজের ঔপনিবেশিক সংঘাতের বহিঃপ্রকাশ বলতে পারি। আমাদের মেয়েরা কেমন এবং কেমন হওয়া উচিত এই বিষয়ক দ্বিধা। একদিকে ‘দিদিমার রূপকথা’, ‘মহিয়ষী ভারতীয় নারী’, ‘নারীর পুরাণ’, ‘পৌরাণিক মহিলার মতো একটা ভারতীয় মডেল, অন্যদিকে ‘স্ত্রীর সহিত কথোপকথন’ (প্রফুল্লকুমার ধর প্রণীত ‘প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তম, জীবনের অবলম্বন, রুগ্ণ শয্যা সহায়, শয্যাগুরু সহধর্মিণীর সহিত ফুলশয্যার দিন হইতে আলাপ করিয়া, কিরূপে প্রেম স্থায়ী হইবে ও চিরদিন সুখে কাটিবে এবং স্বামী-স্ত্রীর শিখিবার ও স্ত্রীকে সুশিক্ষিতা, সচ্চরিত্রা ও সুগৃহিণী করিবার সমুদয় বিষয় ইহাতে লিখিত হইয়াছে।’) ‘স্বামী স্ত্রী, (ধীরেন্দ্রনাথ পাল প্রণীত। ‘সতী সাধ্বী অন্য নাম রমণী তোমার’— বসাক অ্যান্ড সন্স), ‘গৃহস্থ জীবন’ (টিসি দাস অ্যান্ড কোং। ‘কর্মী ও গৃহীর নিতান্ত প্রয়োজনীয়’) ধর্মবিষয়ক বই, রান্নার বই, ডাক্তারি শিক্ষার বই (যেখানে অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি থেকে ঝাঁড়ফুক পর্যন্ত থাকত), ইন্দ্রজাল, গান লেখা, গোপাল ভাঁড় ইত্যাদি মজার বই প্রচণ্ড চাহিদা নিয়ে বহু সংস্করণ বের হয়েছে বটতলার নানা প্রকাশনী থেকে। তবে সামাজিক নকশার প্রতি আকর্ষণ সেকালের মানুষদের বাড়তি চাহিদা যে ছিল, তা বহু নকশার প্রকাশে যেমন দেখতে পাওয়া যায়, তেমনি বোঝা যায় বসাক অ্যান্ড সন্সের একটি বিজ্ঞাপন পড়ে। ‘কলিকাতা রহস্য, (ধীরেন্দ্রনাথ পাল প্রণীত, চতুর্থ সংস্করণ) ‘কলিকাতা শহরের চমকপ্রদ নকশা বিষদরূপে এ গ্রন্থে বিবৃত হইয়াছে। বড় ঘরের ঘরোয়া কথা, গুপ্তকথা, গুপ্ত রহস্য, কুহকিনীর কুহক লীলা, বিধবা চরিত্র, কপট প্রেম, পাশব বৃত্তি, ষড়যন্ত্র, পাপের গগনভেদী হাহাকার, মেয়েচুরি, জাল, জুয়াচুরি, খুন, হত্যা, বকধার্মিকের ভণ্ডামি, থিয়েটার নাচগান, রাজা জমিদার, চোর-ডাকাত, বদমাইশ, লম্পট, গুণ্ডা প্রভৃতির সম্যক চিত্র দেখিবার পক্ষে ইহাই দর্শনস্বরূপ। আবার গুণীর গুণপনা, সতীর পতিভক্তি, নিঃস্বার্থের স্বার্থত্যাগ, সুশিক্ষার ফল, পবিত্র প্রণয়, প্রভৃতি সদগুণ রাশি এ গ্রন্থে একাধারে চিত্রিত হইয়াছে।’

পাঠকের দায় বইয়ের কাছে পৌঁছানো, এই সত্য না মেনে, বইকেই পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করে গেছে বটতলা। প্রকাশকরা বিজ্ঞাপনে বারবার লিখেছেন, ‘চিঠি দিলে নিজ ব্যয়ে পুস্তক তালিকা পাঠাইয়া থাকি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।’ (বসাক অ্যান্ড কোং) রঙিন বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছে পঞ্জিকার পাতাজুড়ে। আট-দশ পাতার ক্যাটালগ, যার মধ্যে লাল কিংবা সবুজ রঙের ছাপা। বিজ্ঞাপন থেকে ক্যাটালগ সর্বত্রই ভিপিতে বই পাওয়ার নিশ্চিত সুযোগের কথা বলা আছে দূরের পাঠকদের জন্য। সব মিলে বটতলা তার বিজ্ঞাপনের জন্য, গণসংযোগ তত্ত্বের যাবতীয় পদ্ধতি অনুসরণ করে পাঠক আকর্ষণের জন্য এবং প্রকাশকের দায়দায়িত্বসহ বই পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার প্রয়োজনে একটা ধারাবাহিক দৃষ্টান্তমূলক কাজ করে গেছে।

বইয়ের ক্ষেত্রে দেখতে পাই, সেকালের ছোট ছোট দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রকাশকদের কাছ থেকে বই কিনে পাঠককে ঠকতে হয়েছে— বইয়ের পাতা নেই, চিরায়ত ধর্মগ্রন্থ সম্পাদিত, সংক্ষিপ্ত ইত্যাদি। সেই প্রতারণার দ্বিধা কাটিয়ে পাল ব্রাদার্স বিজ্ঞাপনে ‘বিশেষ কথা’ শিরোনামে আলাদা জোর দিয়ে লিখেছে, ‘আমাদের নিকটে যে কোনো পুস্তক গ্রহণ করুন একটুও ছাড়-বাদ পাইবেন না... আমরা কখনো নকল পুস্তক দিই না, সুতরাং কাহাকেও ঠকিতে হয় না, সেজন্য শহর মফস্বলের সকলেই সর্বাগ্রে আমাদিগকে অর্ডার দিয়া থাকেন।’ ভোক্তার কাছে শুধু পৌঁছানো নয়, ভোক্তার ভয়কে দূর করে আস্থার সঙ্গে পৌঁছানোর পেশাদারিত্বও অর্জন করতে চাইছে বটতলার এ ধরনের বিজ্ঞাপন। বারবার জানিয়েছে, ‘নকল হইতে সাবধান, যাহারা আমাদিগের পুস্তক ক্রয় করিতে ইচ্ছুক, তাহারা কলিকাতার... ঠিকানাস্থ অঞ্চলে সন্ধান করিলে পাইবেন।’ নতুন গড়ে ওঠা নাগরিক সংস্কৃতি এবং তার নাগরিক মন যে আধুনিক স্বাচ্ছন্দ্য চায়, পেশাদারিত্ব চায়, তাকে স্বীকৃতি দিয়েই গড়ে উঠেছিল বাঙালির সবচেয়ে বিস্তৃততর বটতলার বই ব্যবসা।

সংক্ষিপ্ত। অদ্রীশ বিশ্বাস সম্পাদিত বটতলার বই: উনিশ শতকের দুষ্প্রাপ্য কুড়িটি বই গ্রন্থে সম্পাদকের লেখা ভূমিকা।