বিশ্বজুড়ে অনেক গিরিপথ তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। খাইবার গিরিপথ ঐতিহাসিক সময় থেকে এ উপমহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যিক রুট। হাজার বছর ধরে অসংখ্য দেশ থেকে নানা জাতি ভারতবর্ষে এসেছে এ পথ ধরে। নানা জাতি ও উপজাতিদের আগমনে হয়েছে কত শত বিদ্রোহ। পার্সিয়ান থেকে শুরু করে ব্রিটিশরাও এ পথ ব্যবহার করেছে। 

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথগুলোর অন্যতম একটি খাইবার পাস। এটি স্পিন ঘার পর্বতের উত্তরাংশ ছেদ করে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে সংযুক্ত করেছে। একসময়ে এটি ছিল ভারতবর্ষ ও আফগানিস্তান তথা মধ্য এশিয়ার সংযোগ সূত্র। এটি প্রাচীন সিল্ক রোড বা রেশমপথের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। গিরিপথটি মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হিসেবে সুপরিচিত। কৌশলগত সামরিক স্থান হিসেবেও এ পথ পরিচিত এবং ব্যবহার হয়েছে। এ পথেই বহুবার ভিন্নদেশ থেকে সেনাদল এসে ভারতীয় উপমহাদেশ আক্রমণ করেছে। এদের মধ্যে পারস্য সম্রাট দারিয়ুস, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, চেঙ্গিস খান, মাহমুদ গজনভি, মুহাম্মদ ঘুরি ছিলেন উল্লেখযোগ্য।

খাইবার পাস সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩ হাজার ৫১০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। এর দৈর্ঘ্য ৫৩ কিলোমিটার। গিরিপথের উত্তরে মুল্লাগোরি জাতিদের বসবাস রয়েছে। দক্ষিণে বসতি আফ্রিদি নামের উপজাতির। পুরো পথটিই উঁচু নিচুভাবে এঁকেবেঁকে গেছে। গিরিপথের উত্তর পাশে রয়েছে আকাশছোঁয়া তুষারাবৃত হিন্দুকুশ পর্বত। এর কিছু দূরে রয়েছে গিরিখাত। যেহেতু এটি সিল্করোডের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, তাই এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব প্রাচীন সিল্করোডকে ঘিরেই তৈরি হয়েছিল। রুটটি কয়েকশ বছর ধরে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় বাণিজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রয়েছে। এটি মধ্য এশিয়ায় আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতায় খাইবার রুটের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও আরব সাগরের মধ্যে সংক্ষিপ্ততম সংযোগ প্রদান করেছে দীর্ঘদিন ধরেই। এ পথের মধ্য দিয়েই দেশগুলো বর্তমান পাকিস্তানের দুশানব থেকে করাচি পর্যন্ত পরিকল্পিত রুট নির্মাণের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনৈতিক চাহিদা বৃদ্ধি করেছে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।

সিল্করোড একটি রাস্তা বা একক পথ নয়। সিল্করোড ১ হাজার ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসায়ীদের দ্বারা ব্যবহৃত। এটি এ পথের যোগাযোগকে বোঝায়। চীনের হান রাজবংশের সময় এ পথ বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ১৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হানরা বাণিজ্য শুরু করেছিল। জার্মান ভূগোলবিদ ও ভ্রমণকারী ফার্ডিনান্ড ফন রিচথোফেন ১৮৭৭ সালে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে পণ্য যাত্রার পথ বর্ণনা করতে প্রথম সিল্করোড"শব্দটি ব্যবহার করেন। শব্দটি বিভিন্ন সংস্কৃতির বা দেশের মধ্যে পণ্য এবং ধারণা বিনিময়ের জন্য একটি রূপক হিসেবেও কাজ করে। যদিও বাণিজ্য যোগাযোগকে সাধারণত সিল্করোড বলা হয়।

রেশমপথ গোবি মরুভূমি ও পামির পর্বতসহ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সমতলভূমিগুলোর মধ্যে একটি। এটি প্রায় ৬ হাজার ৪৩৭ কিলোমিটার বা চার হাজার মাইল প্রসারিত। সেকালে পথটিকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো সরকার না থাকায় সাধারণত রাস্তাগুলোর খারাপ অবস্থায় ছিল। প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় প্রচুর ডাকাত দলের দেখা মিলত এ রুটে। নিজেদের রক্ষা করার জন্য ব্যবসায়ীরা উট বা অন্যান্য পশু নিয়ে কাফেলায় যোগ দিতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্যারাভানসেরা নামক বড় সরাইখানাগুলো গৃহ হিসেবে ভ্রমণকারী বণিকদের কাছে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মধ্যস্বত্বভোগী ও ট্রেডিং পোস্টও তৈরি হয়েছিল প্রাচীন সিল্করোডকে ঘিরে। সিল্করোড ধরে প্রচুর মালামাল নিয়ে বণিক শ্রেণী যাতায়াত করত। বণিকরা চীন থেকে ইউরোপে রেশম নিয়ে যেত, যেখানে এটি রাজকীয় ও ধনীদের পোশাক তৈরিতে ব্যবহার হতো। এশিয়ার অন্যান্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে মূল্যবান পাথর, চীনামাটির বাসন, চা ও মসলা। বিনিময়ে ঘোড়া, কাচের জিনিসপত্র, বস্ত্র ও উৎপাদিত পণ্যগুলো পূর্ব দিকে আসত। এ পথ ধরেই খাইবার গিরিপথে হয়ে ইরান থেকে ভারতে এসছিল নানা রকমের সুগন্ধিজাতীয় পণ্য ও ভারতের মসলা গেছে আফগানিস্তান, ইরানসহ ইউরোপেরও বেশকিছু দেশে। এছাড়া স্বর্ণ, রুপা, তামাসহ মূল্যবান ধাতুর বিনিময় হয়েছে শত শত বছর ধরে এ গিরিপথ ধরেই। খাইবার পাসের মধ্য দিয়ে গান্ধার আফগানিস্তানের বাগ্রামকে পাকিস্তানের তক্ষশিলার সঙ্গে যুক্ত করে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে এটি গড়ে ওঠে। 

সিল্করোড ধরে ধর্ম ও নানা সংস্কৃতি পণ্যের মতোই সহজভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। গিরিপথের পাশের শহরগুলো বহু সংস্কৃতির শহরে পরিণত হয়েছে। রেশমপথের অবিচ্ছেদ অংশ হিসেবে রয়ে গেছে খাইবার গিরিপথ।

হোসেন সুহি: লেখক