পৃথিবীর যেকোনো দেশের ভাষাভাষীরা এ চলচ্চিত্র দেখে নিজেদের সমস্যা, অপূর্ণতা, অভাব, দীনতার কথা সহজেই বুঝতে পারবেন। সবাই চলচ্চিত্রটিকে নিজেদের বলে ভেবে নেবেন। আমাদের সমস্যা, সংকটই এ চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে। সরলভাবে দেখলে তা বোঝা যাবে না কিন্তু চলচ্চিত্রটি এমন এক রাজনৈতিক চলচ্চিত্র, যা সব দেশের মানুষের সংকটের মূলে জড়িয়ে আছে। বলছিলাম মহান চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ চলচ্চিত্রটির কথা। এ চলচ্চিত্রের কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংগীত, পরিচালনা সবই সত্যজিৎ রায়ের। রূপকের আশ্রয় নিয়ে চলচ্চিত্রটিতে এমন সব ধ্রুব সত্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে, যা সব শ্রেণী-পেশার দর্শককে বিনোদিত করেছে।
হীরক রাজার দেশে চলচ্চিত্রটি সহজ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে সহজ বিনোদনের চলচ্চিত্র মনে হলেও এর নিরীখে আছে বিশদ সংকটের সমাধান। যে রাজ্যে ক্ষুধা, দারিদ্র্য চিন্তা, অস্তিত্ব সংকট প্রধান, সেই রাজ্যে উন্নয়নের সাম্রাজ্য বা হীরার খনি খুঁজতে ব্যস্ত রাষ্ট্রনায়ক। তাই তো গানে গানে সত্যজিৎ রায় বলেছেন,
‘এসে হীরক দেশে
দেখে হিরের চমক,
এতো খাতির পেয়ে
দেখে রাজার ঝমক
মোদের মন ভরে গেছে খুশিতে।
মোরা সে কথা জানাই...।’
মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধি বা প্রগতিশীল ভাবনার মানুষ যে গোটা পৃথিবীতে অবহেলিত, তা এখানে স্পষ্ট। রাষ্ট্র পরিচালক হিটলারের ভূমিকায় থাকলে রাষ্ট্রের প্রগতিশীল মানুষ তাদের ভাবনার বিচ্ছুরণ ঘটাতে পারবেন না, এটাই স্বাভাবিক। সত্যজিৎ রায় তার সুনিপুণ ভাবনায় বিষয়টি এত সহজভাবে দেখিয়েছেন যে, সবাই তা আত্মস্থ করতে পেরেছে। রাষ্ট্র পরিচালক নমস্য, তবে তা রূপক অর্থে।
‘রাজা এতোই রসিক
রাজা এতো দরাজ
রাজা এতো মিশুক
এতো চিকন মেজাজ,
মোদের প্রাণ ভরে গেছে তাই
মোরা সে কথা জানাই।’
একজন রাষ্ট্রনায়ক যে ধরনের, যে মনের, যে মানসিকতার হোক না কেন, তার রাজ্যে তিনি সর্বেসর্বা— এটা সব দেশেই প্রযোজ্য। সে রাজ্য তিনি পরিচালনা করছেন। ভালো হোক, মন্দ হোক রাষ্ট্রনায়ক কখনই কোনো মন্দ কথা শুনতে রাজি নন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, হিটলারও তার রাজ্যে কোনোরূপ মন্দ কথা শুনতে রাজি ছিলেন না। রাষ্ট্র পরিচালকের একনায়কতন্ত্রের কথা আমরা সবাই জানি, জানেন সত্যজিৎ রায়ও। তিনি গুপী, বাঘা দুই রূপক চরিত্র দিয়ে অনেক কিছুই দেখিয়েছেন।
‘বলো হীরক রাজার জয়।
বলো এমন রাজা ক’জন রাজা হয়।
কতো দেশে দেশে, ঘুরে শেষে
মন বলে হীরকে এসে।
এমন রাজা কোনো দেশে নাই
বলে এমন রাজা কোনো দেশে নাই।’

সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের কথা আমরা এখন মুখে মুখে বলি। সত্যজিৎ রায় সেই সময় তা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি তার চলচ্চিত্রে মানবতাকে স্পষ্টত প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সত্যজিতের চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান ও পুনরাবৃত্ত উপাদান হলো মানবতাবাদ। তার ছবিগুলো আপাতদৃষ্টিতে সরল, কিন্তু এ সরলতার গভীরে লুকিয়ে আছে জটিলতা। এ জটিল সমাধানের নেপথ্যে একজন দর্শককে মাথা ঘামাতে হবে এবং দর্শক যখন এ সূত্রের সহজ সমীকরণ বুঝতে পারবেন, তখন চলচ্চিত্রটি দেখে আনন্দ পেয়ে যাবেন।
২.
গত বছর সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন উপলক্ষে সত্যজিৎ রায়ের কর্ম সংরক্ষণ সংঘের আয়োজনে পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা অভিনেত্রী ও নির্মাতা অপর্ণা সেনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অপর্ণা সেন তার বক্তৃতায় বলেছেন, ‘সত্যজিৎ রায় রাজনীতিসচেতন একজন মানুষ ছিলেন। যারা সত্যজিৎ রায়কে অরাজনৈতিক দাবি করেন, তারা ভুল দাবি করেন। তিনি অরাজনৈতিক ছিলেন না একেবারেই। তার রাজনীতি কেবল প্রতিনিয়তই যেসব রাজনৈতিক দল একে অন্যের গলা চেপে ধরে, তাদের ঘিরে ছিল না। ১৯৬৬ সালে পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে যে নীরব প্রতিবাদ হয়েছিল, সত্যজিৎ রায় ছিলেন তার সর্বাগ্রে।’
সত্যজিৎ রায় রাজনৈতিক দুর্বলতাকে উপহাস করে দেখিয়েছেন তার চলচ্চিত্রে। শুধু তাই নয়, ১৯৫৮ সালে খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমূল্যের প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গের দুর্ভিক্ষ দূরীকরণ কমিটি, কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্য বাম দলগুলো আন্দোলন করেছিল। সত্যজিৎ রায় তাদের সমর্থন করতেন, যার ছাপ তিনি তার সিনেমাগুলোয় দেখিয়েছেন। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ চলচ্চিত্রের এক গানে তিনি বলছেন,
‘পেটে খেলে পিঠে সয়
এ তো কভু মিছে নয়—
সেনা দেখে লাগে ভয়
লাগে ভয়-লাগে ভয়!
আধপেটা খেয়ে
বুঝি মরে! মরে!
যত ব্যাটা চলেছে সমরে।’
এ গানের পটভূমিতে ক্ষুধার্ত সৈন্যদের মিছিলের পর মিষ্টির হাঁড়ি আসায় তারা যুদ্ধের অস্ত্র ফেলে মিষ্টির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কতটা পরিহাস করলে এভাবে তা দৃশ্যায়ন ঘটানো সম্ভব। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে পুরো পৃথিবীই অন্ধকার, আর রাষ্ট্রের সৈন্য সেও তো মানুষের পর্যায়ে পড়ে। তাদেরও ক্ষুধা আছে, চাহিদা আছে।
ভয়ানক অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এ সৈন্যদের সত্যজিৎ রায় উপহাস করে বলছেন, ‘মিথ্যে অস্ত্র-শস্ত্র।’ কতটা দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতা থাকলে তিনি এভাবে বলতে পারেন। তিনি রাজ্যে রাজ্যে যুদ্ধ করাকে অপচয় আখ্যা দিয়েছেন।
‘মিথ্যে অস্ত্র-শস্ত্র ধরে
প্রাণটা কেন যায় বেঘোরে।
রাজ্যে রাজ্যে পরস্পরে
দ্বন্দ্বে অমঙ্গল,
তোরা যুদ্ধ করে করবি কি তা বল!’
রূপকাশ্রয়ে ভয়ানক বাস্তবতা, কঠিন ঘটনা, একনায়কতন্ত্রের জাঁতাকলে পিষ্ট নাগরিকের জীবনযাপন তিনি দক্ষতার সঙ্গে অনায়াসেই দৃশ্যায়ন করেছেন। তার মতো মহান চলচ্চিত্র পরিচালকই সহজে তা উপস্থাপন করতে পেরেছেন।
নিজস্ব নির্মাণশৈলী ও গল্প বলার ধরনের জন্য তার খ্যাতি শুধু বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছেই নয়, চলচ্চিত্রপ্রেমী গোটা বিশ্বের কাছে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশ ও দেশের বাইরের অনেক চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। প্রখ্যাত জাপানি চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, সম্পাদক ও চিত্রনাট্যকার আকিরা কুরোসাওয়া বলেছেন, ‘সত্যজিতের চলচ্চিত্র না দেখা আর পৃথিবীতে বাস করে চন্দ্র-সূর্য না দেখা একই কথা।’
সত্যজিৎ-পরবর্তী প্রজন্মের নির্মাতাদের কাছে সত্যজিৎ রায় এখনো মহান পথপ্রদর্শক। যে পথে শুধু বাংলা ভাষাভাষী চলচ্চিত্র পরিচালকই নন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিচালকরা হাঁটেন এবং তাকে আদর্শ হিসেবে মানেন।





