মোগল সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তের রাজধানী শহর জাহাঙ্গীরনগরের প্রতিষ্ঠা বাদশাহ জাহাঙ্গীরের সময়ে। শহরটির পূর্বনাম ঢাকা ও মোগল সুবাহ বাংলার রাজধানী হিসেবে এর ভূ-অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঢাকার প্রাক-মোগল পর্বে বা সুলতানি আমলের মানব বসতি ও প্রশাসনিক অস্তিত্ব প্রমাণিত। বিনত বিবির মসজিদ, মান্দ্রা শিলালেখ, শাহ আলি বোগদাদির মাজারে প্রাপ্ত সুলতান ইউসুফ শাহের (৮৮৫ হিজরি) শিলালিপিসহ একাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এটিকে সমর্থন করে। বাদশাহ আকবরের সময় ঢাকা ছিল থানা বা সামরিক চৌকি। এটি মানতেই হবে যে তথ্যের স্বল্পতায় সুলতানি পর্বে ঢাকার নাগরিক জীবনের চিত্র কিছুটা বিচ্ছিন্ন ও অস্পষ্ট। সুবাহ বাংলার রাজধানী জাহাঙ্গীরনগরের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক উত্কর্ষের শুরু মোগল আধিপত্যের মাধ্যমেই। পাঠকের দরবারে মোগল রাজধানী শহর হিসেবে ঢাকার উত্থান ও সমৃদ্ধির সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরাই পরবর্তী অংশের উদ্দেশ্য।

বাদশাহ জাহাঙ্গীরের বিশ্বস্ত সুবাদার ইসলাম খান চিশতি কৌশলগত অবস্থানের জন্য ঢাকাকে রাজধানী ও বসবাসের জন্য নির্বাচন করেছিলেন। সম্ভবত বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী স্থানটি অপেক্ষাকৃত উঁচু এবং চারপাশের নদীর মাধ্যমে জলপথে ভাটি অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্তিই ছিল ইসলাম খানের পছন্দের ভিত্তি। বুড়িগঙ্গা নদী শহরটির পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশ দিয়ে নৌ চলাচলের উপযোগী এবং এটি পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে শীতলক্ষায় গিয়ে সংযুক্ত। সেখান থেকে ব্রহ্মপুত্র নদের আদি জলস্রোত এবং আরেকটু নিচের দিকে মেঘনা হয়ে সুবাহ বাংলার দক্ষিণ ও পূর্বাংশের যেকোনো এলাকায় নৌপথে যাওয়া যেত। এমনকি তা বঙ্গোপসাগর সম্পর্কজালের সঙ্গে ঢাকাকে সংযুক্ত করেছিল। এছাড়া ধলেশ্বরী নদী দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার সমান্তরালে প্রবাহিত এবং বর্তমান মুন্সিগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জের দক্ষিণ-পূর্বাংশের যোগাযোগকে করেছিল সহজ ও দ্রুত। বালু নদী ছিল জাহাঙ্গীরনগরের পূর্বদিকে। এভাবে রাজধানী শহরটি প্রায় চারদিকে জলপ্রবাহের প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা এবং একই সঙ্গে অ্যাডমিরাল ইহতিমাম খানের নওয়ারা চলাচলের আদর্শ স্থান। পূর্ব বাংলার তথা ভাটি অঞ্চলের জমিদারদের দমনে সাফল্যের পেছনে রাজধানী ঢাকার এ ভূ-অবস্থানগত বিবেচনাটিকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই।

ইসলাম খানের জাহাঙ্গীরনগর, যেখানে তিনি বারো ভূঁইয়াদের দমন করার জন্য সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিলেন, ছিল একটি ক্ষুদ্র উপশহর। মির্জা নাথান তার বাহারিস্তান-ই-গায়েবী গ্রন্থে ঢাকায় একটি প্রাচীন দুর্গের উল্লেখ করেছেন (প্রথম খণ্ড পৃষ্ঠা: ৫৭)। ইতিহাসবিদ আহমেদ হাসান দানী ঢাকা: আ রেকর্ড অব ইটস চেঞ্জিং ফরচুনস্ গ্রন্থে বাহারিস্তানের বিবরণের ভিত্তিতে অনুমান করেছিলেন, সম্ভবত ইসলাম খানের ঢাকায় বসতি স্থাপনের আগে এখানকার জনবসতি বাবুবাজার ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সীমিত ছিল (পৃষ্ঠা ২১-২৩)। মির্জা নাথানের ভাষ্য অনুসারে সুবাদার দুজন সামরিক কর্মকর্তাকে অধীনস্থ মনসবদারসহ অগ্রসর বাহিনী হিসেবে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন। এ বাহিনী ঢাকার পুরাতন কিল্লাটির সংস্কারকাজ শুরু করেছিলেন (বাহারিস্তান, প্রথম খণ্ড পৃষ্ঠা: ৫৭)। ঢাকায় পুরাতন দুর্গটিকে সুবাদার ইসলাম খানের বসবাসযোগ্য করে তোলাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। ইসলাম খান ঢাকায় আসার পরপরই দুর্গটিকে কেন্দ্র করে বসতি সম্প্রসারিত হতে থাকে। পুরাতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদদের অনুমান এ কিল্লা ছিল ঢাকাস্থ কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় (বর্তমানে এটি পরিত্যক্ত)। পুরাতন দুর্গটির দুটি তোরণ ছিল: পূর্ব দরওয়াজা ও পশ্চিম দরওয়াজা। প্রথমটি ছিল আবুল হাসনাত সড়কের মুখোমুখি এবং দরজাটি কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকের কাছেই ছিল। দ্বিতীয় দরজাটি ছিল বর্তমান উর্দু রোডমুখী ।

হাকিম হাবিবুর রহমান তার ঢাকা আজসে পঁচাস বরস পহলে গ্রন্থে উল্লেখ করেন, মোগলদের আগে ঢাকা মসৌন্দি (মহোষিমান্দি পশুর হাট) থেকে উত্তর দিকে পাণ্ডু নদী পর্যন্ত এবং পশ্চিমে ফুলবাড়িয়া পার হয়ে চাঁদনি ঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল (পৃষ্ঠা ১২)। কিন্তু বাহারিস্তানের প্রথম টীকা সম্বলিত অনুবাদক মহিউদ্দিন আহমেদ বোরাহের মত হলো: ইসলাম খানের চাঁদনি নৌকার নামে এ ঘাটের নামকরণ করা হয়েছিল। এ বিশেষ নৌকায় চড়ে তিনি বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী দুর্গে এসেছিলেন (বাহারিস্তান, দ্বিতীয় খণ্ড পৃষ্ঠা: ৮২৩)। সম্ভবত সুবাদারের বাসস্থান ও দুর্গটির চারদিকে ছিল পাদশাহি বাজার (সম্ভবত বর্তমান চকবাজার), পিলখানা (বর্তমানে বিডিআর সদর দপ্তর) ও মাহুতটুলী (মাহুতদের এলাকা), বকশিবাজার এবং দেওয়ান বাজার এলাকা দিউয়ান, বখশিসহ অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের আবাসিক এলাকা ছিল। রমনা এলাকায় দুটি জনবসতি গড়ে উঠেছিল—মহল্লা সুজাতপুর ও মহল্লা চিস্তিয়া। এ এলাকায়ই তৈরি হয়েছিল বাগ-ই-বাদশাহি (বাদশাহি বাগান)। সুবাদার ইসলাম খান চিশতিকে প্রথম এখানে সমাহিত করা হয়েছিল। আজকের ঢাকা শহরের সুপরিচিত শাহবাগ (বাগ-ই-বাদশাহির উত্তর-পশ্চিম অংশ) এলাকাটি মোগল যুগের স্মৃতিবাহক।

সুবাদার ইসলাম খান চিশতি বুড়িগঙ্গা নদীর পার্শ্ববর্তী বর্তমান বাবুবাজারের কাছ থেকে মালিটোলা-তাঁতিবাজার পর্যন্ত ধোলাইখাল খনন করেছিলেন। এ খালটি ইসলাম খানের প্রতিষ্ঠিত মোগল ‘নতুন ঢাকা’কে পূর্ববর্তী বসতি থেকে আলাদা করেছিল। নদীর তীরবর্তী সমান্তরালে বাবুবাজার থেকে পাটুয়াটুলি এলাকাটিকে ইসলামপুর নামকরণ করা হয়। বর্তমানে কাপড়ের বিখ্যাত পাইকারি বাজার ইসলামপুর, বংশাল-মালিটোলা এলাকার পুরাতন মোগলটুলী ও চকবাজারের সন্নিকটে দক্ষিণ-পূর্বদিকের মোগলটুলী মোগল বসতিরই স্মৃতি বহন করে চলছে। এ শহরের উল্লেখযোগ্য মোগল স্থাপনাগুলো যেমন পুরাতন কিল্লা, লালবাগ দুর্গ, খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ, পাকুরটুলীতে (বাবুবাজারের কাছে) অবস্থিত শায়েস্তা খানের প্রাসাদ ও মসজিদ, চক মসজিদ, শাহ সুজার বড় কাটরা ও শায়েস্তা খানের ছোট কাটরা ধোলাইখালের পশ্চিমে অবস্থিত। মোগল ঢাকার সীমানার মধ্যে ছিল ‘পুরনো ঢাকা’ (ঢাকার যে অংশ রমনা এলাকার দক্ষিণ থেকে বুড়িগঙ্গা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত) এবং এটি পূর্ব দিকে নারিন্দা, পশ্চিম দিকে মনেশ্বর ও হাজারীবাগ এবং উত্তরে রমনা এলাকার দক্ষিণে অবস্থিত ফুলবাড়িয়া (বর্তমানে এলাকাটি সেন্ট্রাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জের দক্ষিণে অবস্থিত এবং এখানেই ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন) পর্যন্ত সম্প্রসারিত ছিল। শহরের পশ্চিম প্রান্তে দুর্গ পিলখানা এবং উত্তর দিকে দুর্গ ফুলবাড়িয়ার মাঝখানের এলাকায় সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী, ব্যবসায়ীদের আবাসিক এলাকা ছিল। বর্তমানের ‘মেগা’ ঢাকা দক্ষিণের ‘পুরান ঢাকা’ নামে পরিচিত এলাকাটিতে আঁকাবাঁকা সরুপথ, অপরিকল্পিতভাবে একই সঙ্গে বাজার আবাসিক এলাকা স্পষ্টভাবে চিরাচরিত মোগল শহরের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু নদী-তীরবর্তী কাটরা (সরাই) এবং নদীর ঘাটগুলো সুবাহ বাংলার রাজধানী শহরের বিকাশমান বাণিজ্যের মনোরম দৃশ্যকল্পেরই ইঙ্গিতবাহী।

সুবাদার মিরজুমলার সময় (১৬৬০-৬৩) জাহাঙ্গীরনগরের উত্তরের সীমানা ছিল সুবাদার নির্মিত তোরণ। এটি বর্তমানে ‘ঢাকা গেট’ নামে পরিচিত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান গ্রন্থাগার ও তিন নেতার সমাধির মাঝখানে অবস্থিত। সুবাদার মিরজুমলা রাজধানীকে নিরাপদ রাখার জন্য নির্মিত দুর্গগুলোর সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের জন্য দুটি সড়ক নির্মাণ করেন: (ক) উত্তর দিকে টঙ্গী-জামালপুর পর্যন্ত এবং (খ) পূর্ব দিকে ফতুল্লা পর্যন্ত। উল্লেখ্য, পূর্বমুখী সড়ককে কেন্দ্র করে দুটি মোগল জলদুর্গও নির্মাণ করা হয়েছিল। এ দুই কিল্লা জাহাঙ্গীরনগরকে নদীপথে জলদস্যু ও শত্রুর আক্রমণ থেকে নিরাপদ করেছিল।

টমাস বাউরি (১৬৬৯-৭০) তার আ জিওগ্রাফিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব কান্ট্রিজ অ্যারাউন্ড দি বে অব বেঙ্গল গ্রন্থে সুবাহ বাংলার রাজধানী শহরের আয়তন উল্লেখ করেন চল্লিশ ইংলিশ মাইল (পৃষ্ঠা ১৪৯-৫১)। তার দেখা শহরটি পূর্বদিকে ডেমরা খাল থেকে পশ্চিমে সাত মসজিদ পার হয়ে মিরপুর এবং দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার তীর থেকে উত্তরে টঙ্গী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মিরজুমলা টঙ্গী ও পাগলায় ব্রিজ এবং বর্তমানের মুন্সিগঞ্জের ইদ্রাকপুরে একটি জলদুর্গ স্থাপন করেছিলেন। শায়েস্তা খান (১৬৬৩-৭৮; ১৬৭৯-৮৮) ঢাকায় অনেক স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন। এদের মধ্যে রয়েছে তাঁর নিজের প্রাসাদ, ছোট কাটরা এবং বুড়িগঙ্গা নদীর পার্শ্ববর্তী একটি বাঁধ। টাভার্নিয়ার (১৬৬৬ সাল) ‘বিখ্যাত বাণিজ্যিক শহর’ ঢাকায় এসেছিলেন এবং এ প্রাসাদেই সুবাদারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। অল্প সময়ের জন্য ঢাকায় এসে যুবরাজ মুহাম্মদ আযম খান শায়েস্তা খান নির্মিত প্রাসাদেই বাস করেছিলেন। তিনি লালবাগ দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন (১৬৭৮)। দ্বিতীয় দফায় সুবাদার হয়ে শায়েস্তা খান এ দুর্গেই বসবাস শুরু করেন। বাদশাহ আওরঙ্গজেবের আদেশে যুবরাজ ফিরে যাবার সময় শায়েস্তা খানকে দুর্গের নির্মাণকাজ সমাপ্ত করার অনুরোধ করেছিলেন। সুবাদারের প্রিয় কন্যা বিবি পরি (ইরান দুখত) এ সময় মৃত্যুবরণ করলে শায়েস্তা খান কিল্লার নির্মাণকাজকে অশুভ মনে করেন। তার প্রিয় কন্যার সমাধি এ দুর্গের মাঝখানে অবস্থিত এবং সেটি তাজমহলের নকশাকে অনুকরণ করে তৈরি করা। এছাড়া শায়েস্তা খান পুরাতন দুর্গটিতে চেহেল সাতুন (৪০ পিলারওয়ালা অডিটোরিয়াম) নামের একটি মিলনায়তন বানিয়েছিলেন। আহমেদ হাসান দানী তার স্থাপত্য কর্মগুলোকে ‘শায়েস্তাখানি-রীতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। শায়েস্তা খানের সময়কে জাহাঙ্গীরনগরের স্বর্ণযুগ বললে অত্যুক্তি হবে না। স্থাপত্যকর্মের পাশাপাশি এ সময়ের জনসচ্ছলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কথা সুবিদিত। তার সময়ে এক রুপাইয়াতে আট মণ চাল পাওয়া যেত। এটি প্রায় কিংবদন্তির মতো হয়েছিল যে তিনি কিল্লার একটি দরওয়াজা সিল করে দিয়েছিলেন এবং ঢাকা ত্যাগ করার সময় আদেশ দিয়েছিলেন যে অনুরূপ কম দামে শস্য বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত দরজাটি বন্ধই থাকবে। সর্বভারতীয় মোগল বাণিজ্য বলয়ের অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি সপ্তদশ শতাব্দীর শেষদিকে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর বাণিজ্য কার্যক্রমই ছিল সুবাহ বাংলার রাজধানীর সমৃদ্ধির পেছনের অনুঘটক। ১৬৪০ সালে সেবাস্টিয় ম্যানরিক ঢাকা সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘এ শহরের বৈচিত্র্যময় পণ্যদ্রব্য, যা এ অঞ্চলের সমৃদ্ধ ও উর্বর ভূমিতে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয়। এর ব্যবসা-বাণিজ্যের আকর্ষণেই বহু বিচিত্র জাতির মানুষ এখানে জড়ো হয়েছে (ট্রাভেলস অব ফ্রে সিবাস্টিয় ম্যানরিক থেকে বর্তমান লেখক কর্তৃক অনূদিত)’। এই নানা জাতির মধ্যে উত্তর ভারতীয় নানা গোষ্ঠীর পাশাপাশি ইউরোপীয়দের মধ্যে ছিল ইংরেজ, পর্তুগিজ, ফরাসি, ওলন্দাজ, গ্রিক ও আর্মেনীয়রা। ঢাকাই মসলিন এবং অন্যান্য সুলভ আকর্ষণীয় দ্রব্যাদি তাদের জাহাঙ্গীরনগরে ব্যবসায়ী কুঠি স্থাপনে উৎসাহিত করেছিল।

বাদশাহ আওরঙ্গজেব যুবরাজ আজিমউশ্শানের ব্যক্তিগত বাণিজ্য নিষিদ্ধ করায় তিনি প্রাদেশিক কোষাগার এবং জনগণের করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন। দিউয়ান মুর্শিদকুলি খান যুবরাজের অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেন। তিনি যুবরাজের ব্যয় সংকোচন ও রাজস্ব ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের নানা উদ্যোগ নেন। ফলে উভয়ের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সম্পর্ক এমন তিক্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে যুবরাজ দিউয়ানকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। এ ঘটনার পর মুর্শিদকুলি খান বাদশাহর অনুমতি নিয়ে দিউয়ানি কার্যালয় মকসুদাবাদে (১৭০৪ সালে এবং পরবর্তী সময়ে মুর্শিদাবাদ) স্থানান্তরিত করেন। প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে জাহাঙ্গীরনগরের মর্যাদার চূড়ান্ত অবসান ঘটে ১৭১৭ সালে, যখন মুর্শিদকুলি খানকে বাংলার সুবাদার নিয়োগ করা হয়। মোগলদের বাকি সময়টুকুতে ঢাকা আর সুবাহ বাংলার রাজধানী শহরের মর্যাদা পায়নি। ইসলাম খান প্রতিষ্ঠিত ‘নতুন’ ঢাকা ১৭১৭ সাল ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত হয়ে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করেছিল। প্রশাসনিক গুরুত্বের পাশাপাশি ইউরোপীয়দের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের সুবাদে ঢাকা আধা নাগরিক শহর থেকে সপ্তদশ শতকের একটি ‘কসমোপলিটন মহানগরী’তে পরিণত হয়েছিল।

 

সহায়ক গ্রন্থাবলি

আহমেদ হাসান দানী, বিবলিওগ্র্যাফি অব দ্য মুসলিম ইনসক্রিপশন্স অব বেঙ্গল, ঢাকা, ১৯৫৭।

আবদুল মমিন চৌধুরী (সম্পাদিত), ঢাকা আ রেকর্ডস অব ইটস চেঞ্জিং ফরচুন্স, আহমেদ হাসান দানী, ঢাকা, পুনর্মুদ্রণ, ২০০৯ (প্রথম প্রকাশ, ১৯৫৭)।

আবদুল করিম, ঢাকা: দ্য মোগল ক্যাপিটাল, ঢাকা, ১৯৬৪।

হাকিম হাবিবুর রহমান, ঢাকা আজসে পঁচাস বরস পহলে, লাহোর, ১৯৪৯।

মহিউদ্দিন আহমেদ বোরাহ (অনূদিত ও সম্পাদিত), বাহারিস্তান-ই-গায়েবী আ হিস্ট্রি অব মোগল ওয়ার্স ইন আসাম, কোচবিহার, বেঙ্গল, বিহার অ্যান্ড ওড়িষ্যা ডিউরিঙ্গ দ্য রিজিয়ন্স অব জাহাঙ্গীর অ্যান্ড শাহজাহান বাই মির্জা নাথান, প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, গৌহাটি, ১৯৩৬।

আবু মুসা, হিস্ট্রি অব ঢাকা থ্রু ইন্সক্রিপশন অ্যান্ড আর্কিটেকচার, ঢাকা, ২০০০।

টমাস বাউরি, আ জিওগ্রাফিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব কান্ট্রিজ অ্যারাউন্ড দ্য বে অব বেঙ্গল, দিল্লি, পুনর্মুদ্রণ ২০২০।

 

শহিদুল হাসান: সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়