টানা পাখা বাংলা তথা কলকাতায় সঠিক কখন প্রচলিত হয়, তা নিয়েও যথেষ্ট বিতর্কের সূচনা হয়েছিল। একজন পণ্ডিত বলেন, পাখার জন্ম সামন্ত যুগে। ব্যক্তিগত বিলাসবহুল জীবনকে আরো আরামদায়ক করে তোলার জন্য দাস শ্রেণীর হাতে পাখা টানার দড়িটি তুলে দিয়ে যে যুগে দরজা বন্ধ করে মানুষ ঘুমাত, সেই যুগে— আরো বিশদ করে বললে মোগল-পরবর্তীকালে ইংরেজের আগমনের পর কিন্তু ইতিহাসের তথ্য সম্পূর্ণ বিপরীত। ইংরেজ আমলে প্রথমে পাখা ছিল না। কেননা তখন এ দেশের ইংরেজের বাসভবনে নানা শ্রেণীর ভৃত্যের তালিকার সন্ধান পাওয়া গেলেও ‘পাঙ্খা বরদার’ অনুপস্থিত। মিসেস গোল্ডবোর্ন (১৭৮৩-৮৪) সালে লিখেছেন, ‘খাবার সময় খাবার টেবিলের চারদিক ঘিরে ভৃত্যরা সব ছোট-বড় পাখা নিয়ে দাঁড়াবে বাতাস করার জন্য, পাখা সম্পর্কে এই প্রথম পাওয়া গেল সঠিক সংবাদ। অর্থাত্ ১৮ শতকের শেষে দিকে হাতপাখা ছিল। মিসেস গোল্ডবোর্নের কথা থেকে স্পষ্ট প্রমাণ হয়— তখন পাখা থাকলেও টানা পাখা ছিল না। এর কয়েক বছর পরই (১৭৭৯) এমএল ডি গ্র্যান্ডপোর লিখেছেন, ‘অনেক ইংরেজের বাড়িতে খাওয়ার টেবিলের উপরে সিলিং থেকে একটা পাখা ঝুলতে দেখা যায়’, সুতরাং পণ্ডিতদের অভিমত টানা পাখার জন্ম ১৭৮৪ থেকে ১৭৯০ সালের মধ্যে।
জন্ম-সময় তো মোটামুটি বের করা গেল; এখন প্রশ্ন হলো, এ বায়ু সঞ্চালকের আবিষ্কারক পাখার জন্মদাতার পরিচয় নিয়েও বিতর্ক কম হয়নি। প্রথম দাবিদার ছিল ইংরেজরা, শিল্প বিপ্লবের জনক হিসেবে এটি অনিবার্যভাবে ইংরেজ সভ্যতার দান। কিন্তু দাবিটি সবাই মেনে নিতে রাজি হতে পারেননি; প্রথম আপত্তি জানিয়েছিলেন একজন ভারতীয় ভোলানাথ চন্দর। তিনি বললেন, আঠারো শতকের শেষভাগে কলকাতারও আগে চুচুড়ার ডাচ গভর্নর এটি আবিষ্কার করেন। অন্য ইউরোপীয়রাও দাবি ছাড়তে নারাজ; ১৭৯৪-এ ক্যালকাটা ক্রনিকল লিখেছে, ‘পাঙ্খা’ নামক বস্তুটি সর্বপ্রথম এ দেশে আনে পর্তুগিজরা। অর্থাত্ এর জনক ইংরেজ নয়, ডাচ নয়, পর্তুগিজ।
অবশেষে হেনরি ইউল এবং ব্রুনেল সাহেব তাদের বিখ্যাত অভিধানে লিখলেন, অষ্টম শতকে মধ্যপ্রাচ্যে টানা পাখা প্রচলিত ছিল। কোথায় অষ্টাদশ আর কোথায় অষ্টম শতক! সুতরাং একবারে চুপ হয়ে গেল কলকাতা, চুচুড়া এবং লিসবন। এখন সবাই মেনে নিয়েছেন যে, ইরাকে টানা পাখা ব্যবহার হয়ে আসছে বহুদিন আগে থেকেই।
ইংরেজের সময় টানা পাখার বৃদ্ধি হয়েছে, শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে, ক্রমে ক্রমে ইংরেজ ভারতের যেখানে বসতি গেড়েছে, সেখানেই টানা পাখা আদৃত হয়েছে। উত্তর ভারতেও, যে অঞ্চলকে সে সময় বলা হতো আপ-কান্ট্রি, সেখানেও টানা পাখা জেঁকে বসতে সময় নেয়নি। তবে সেখানে গরমের সময় দিনের বেলা ঘরের বাতাস গরম থাকে বলে দিনে টানা পাখা দিয়ে সেই উষ্ণ বায়ু আন্দোলিত করা আদৌ আরামদায়ক ছিল না। তাই সেখানে টানা পাখা ব্যবহার হয় সূর্যাস্তের পর অর্থাত্ তাপমাত্রা কমে গেলে রাতের বেলায়। দিনের বেলায় কখনো টানা পাখার দড়িতে কেউ হাত দেয় না।
টানা পাখা নিয়ে আরো একটি তথ্য এখানে দেয়া যেতে পারে। টানা পাখার বিবর্তনের প্রথম পর্যায়ে পাঙ্খা বরদার বা পাঙ্খাকুলী ঘরের ভেতর অর্থাত্ গৃহকর্তা এবং তার পত্নীর বিশাল শোয়ার ঘরের এক কোনায় বসে পাখা টানত। বোধগম্য কারণেই তখন পাঙ্খাপুলার হিসেবে শুধু অন্ধদের নিয়োগ দেয়া হতো। পরে ঘরের দেয়াল ফুটো করে কপিকল বসিয়ে পাখার দড়ি ঘরের বাইরে নিয়ে যাওয়া হলে অন্ধ পাঙ্খা বরদার নিয়োগ দেয়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।
টানা পাখা ইংরেজ শাসনকে প্রতিষ্ঠা করতে বিশাল ভূমিকা রেখেছে। এ গরমের দেশে যুদ্ধ জয় করা ইংরেজের জন্য সহজ ছিল, কিন্তু গরমকে কাবু করা ছিল তার সাধ্যের বাইরে; অনেক পন্থায় তারা বের করেছিল থার্মিডোর— থার্মিডোর নামে বিশাল পাখাওয়ালা এক যন্ত্রের সাহায্যে ঘরে খসখসে পর্দার ভেতর দিয়ে ঝড়ের বেগে বাতাস ঢুকিয়ে ঘরের এবং মেম সাহেবের কেশসজ্জা লণ্ডভণ্ড করা ছাড়া আর কোনো লাভ হয়নি। টানা পাখার মতো মৃদু, কোমল বাতাস আর কোথায় পাওয়া যাবে?
তবে মাঝে মধ্যে টানা পাখার সিলিংয়ের দড়ি ছিঁড়ে গিয়ে হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটত। থালাবাসন তো ভাঙতই, কেউ কেউ সেই বিশাল কাঠের তক্তার আঘাতে রীতিমতো আহত হতেন। এ নিয়ে সে সময়ের সংবাদপত্রে অনেক রঙদার খবর পরিবেশিত হয়েছে। পাঙ্খা শুধু শোয়ার ঘর বা খানার টেবিলেই নয়, গির্জাতেই একাধিক পাঙ্খা সিলিং থেকে ঝুলত; কোর্ট-কাছারি-এজলাসের তো কথাই নেই।
বাংলা সাহিত্যে অনেক মহিলা এবং পুরুষের আত্মজীবনীতে টানা পাঙ্খার ব্যবহারের স্মৃতিচারণ রয়েছে। যেমন শান্তা দেবী তার ‘পূর্ব স্মৃতি’তে আমাদের জানাচ্ছেন, স্কুল ও কলেজের বড় বড় ঘরে টানা পাখা টাঙানো থাকত, পাঙ্খাকুলীরা সারা দুপুর পাখা টানত। বেচারাদের মাঝে মধ্যে ঘুম পেত এই একঘেয়ে কাজ করতে করতে; তাই তারা দড়ি ধরেই ঘুমিয়ে পড়ত, ‘গরম লাগলে শিক্ষকরা হঠাত্ চেয়ার থেকে উঠে পড়ে পাখাটায় সজোরে একটা টান দিতেন। তার ধাক্কায় কুলিবেচারা হুমড়ি খেয়ে আবার উঠে পড়ে পাখা টানা শুরু করত।’ (পৃ: ৪৮)
মানবতাবাদী কবি রবীন্দ্রনাথ এ টানা পাখা ও পাখাওয়ালাদের সম্পর্কে কী মনোভাব পোষণ করতেন, সে কথায় আসা যাক: এ তথ্য পাওয়া গেছে হেমলতা দেবীর ‘কবি প্রসঙ্গ’র পাতা থেকে। তিনি লিখেছেন, ‘গ্রীষ্মের সময় শান্তিনিকেতনে অসহ্য গরম, দুপুরে কবির লেখনীর বিরাম নেই।
বিজলী পাখার তখন দেখা মেলেনি। কুঠিতে টানা পাখার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু কবি কোনো দিন নিজের জন্য সে সময় পাখা টানতে দিতেন না। ঘেমে নেয়ে উঠতেন তবু পাখা টানতে দিতেন না। বলতেন, একজন লোক এই গরমে বসে বসে পাখা টানবে আর আমি বাতাস খেয়ে লিখব, এ কিছুতেই হতে দেবো না।’ ভৃত্যদের উপর কতখানি দরদ ছিল ওই থেকেই বোঝা যায়।





