মোটামুটি বলা যায়, কিশোরকাল থেকেই মহাশ্বেতা দেবীকে আমি পড়ে আসছি। তিনি আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। একসময় হুমায়ূন কবির একটি পত্রিকা বের করতেন, সেটির নাম ছিল ‘চতুরঙ্গ’। এই পত্রিকায় উনি তখন একটা উপন্যাস লিখেছিলেন। তার সেই লেখাটা থেকেই আমি প্রথম তার নাম জানতে পারি। একই সঙ্গে প্রথম জানতে পারি, মহাশ্বেতা দেবীর বাবার নাম মনীশ ঘটক।
আমার বেশ মনে আছে, আমি তখন বোধহয় বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ি, ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকার তখন সম্পাদক বদলেছে। তো এই পত্রিকায় মনীশ ঘটক কবিতা-টবিতা লিখতেন, মজারসব লেখা ছিল তার। সেই লেখা পড়ার কিছুদিন পরই বোধহয় আমি মহাশ্বেতা দেবীর ‘ঝাঁসীর রাণী’ পড়তে শুরু করি প্রথমবারের মতোন। তারপর থেকে মোটামুটি নিয়মিতভাবেই আমি মহাশ্বেতা দেবী পড়েছি। তার ‘হাজার চুরাশির মা’ পড়েছি, ‘অরণ্যের অধিকার’, ‘দ্রৌপদী’, ‘রুদালি’। রুদালি তো সিনেমাও হয়েছে, সেই সঙ্গে অসাধারণ থিয়েটারও হয়েছে। ‘দ্রৌপদী’, ‘সাঁঝ সকালের মা’— এইসব অত্যন্ত স্মরণীয় লেখাগুলো আমার দারুণ লাগত। বলা যায় তখন থেকেই, আমাদের প্রধান লেখকদের সঙ্গে আমি তাকে তুলনা করতাম। তিনি যখন জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পেলেন, আমি তখন কলকাতা থেকে তাকে ফোন করে অভিনন্দন জানালাম। ওপাশ থেকে তিনি বললেন, ‘তুমি অন্ততপক্ষে, অভিনন্দন দিয়ো না, হাসান এ পুরস্কার তো তোমাদেরই পুরস্কার।’ উনি আমার সঙ্গে এভাবেই কথা বলতেন।
মহাশ্বেতা দেবী আমার লেখা পড়েছেন, আমিও তার লেখা অনেক পড়েছি। কলকাতার বইমেলায় বোধহয় প্রকাশক গিল্ডের একটি অনুষ্ঠানে আমার ডাক পড়েছে কথা বলার জন্য। মঞ্চে উঠতে গিয়ে শুনলাম, এখানে মহাশ্বেতা দেবী রয়েছেন। তখন তার দিকে আমি একবার তাকালাম। এর পর তার সঙ্গে প্রথম আলাপ হলো। ৭০ দশকের গোড়ার দিকে হতে পারে সেটা। তার পর যখন উনি শুনলেন, আমি হাসান আজিজুল হক, তখন উনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। মানে, কি পুরুষ মানুষ কি মেয়ে মানুষ— এগুলো নিয়ে তার কোনো ভাবনা ছিল না। তিনি জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘তোমাকে কতদিন ধরে খুঁজছি, তোমাকে দেখতে চাই।’ এ রকম আরো নানা কথা। তখন থেকেই তার সঙ্গে যোগাযোগের একটা সূত্রপাত হলো।
উনি একবার ঢাকায় এসেছিলেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে অনেক কথা বলেছেন তিনি, তার পর ইলিয়াসের ওখানেই আমার সঙ্গে মহাশ্বেতা দেবীর দেখা হলো। ওর বোধহয় ভাইজি ছিল অ্যারোমা গুণ। আমি মহাশ্বেতাকে বললাম, ‘ওকে নিয়ে এসো রাজশাহী।’ তখন উনি বললেন, ‘ঠিক আছে, ওকে নিয়ে যান আপনি।’ এর পর উনি একবার রাজশাহীতেও চলে এলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক এলাকার ৭৬/সি দোতলা পশ্চিম, আমার এই বাসাতে উনি কয়েকদিন ছিলেন।
এ সময় আমি এমন একটা ব্যবস্থা করেছিলাম, যাতে ওনার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের একটা যোগাযোগ হয়। কারণ মোটামুটিভাবে ঝাড়খণ্ডসহ যেসব জায়গায় সাঁওতাল বা আদিবাসী আছে, তাদের সঙ্গে এরই মধ্যে তার একটা রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল। আমি তাকে কলকাতায় দেখেছি যে, তার থাকার ঘরের বাইরের ঘরটাতে যেখানে লোকজন বসে, উনি সেখানে চলে এলেন। বললাম, ‘আপনি এখানে কেন?’ উনি বললেন, ‘লোথা পরিবারের এক বৃদ্ধ তাকে দেখার কেউ নেই, তার চিকিত্সা করতে হবে এবং তাকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করার আগে তাকে আমার বাসায় আনা হয়েছে।’ তো এইভাবে উনি তাদের পাশে দাঁড়াতেন। যাহোক, আদিবাসীদের গ্রামে যখন আমরা পৌঁছলাম, তখন আদিবাসীরা মহাশ্বেতা দেবীর পা ধুয়ে দিয়েছিল। উনি বললেন, ‘আমি এই মাটিকে প্রণাম করি।’ তার পর
আদিবাসীরা তাকে মদ দেয়া মাত্রই তিনি বলেছিলেন, ‘তোরা তো মদ খাস না রে, মদ তোদের খায়।’ আসলে আদিবাসী বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, এদেশের যারা মূল বাসিন্দা। তাদের সংগ্রামকে তিনি সমর্থন করতেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, রাষ্ট্র নিপীড়ক। ওরা তো বিদ্রোহ করেনি। ওরা তো তলোয়ার হাতে একা একা বের হতে পারে না। তিনি বলতেন, এই ভূমি আদিবাসীদের অধিকার। তাই স্বাভাবিকভাবেই অরণ্য, পাহাড়ের প্রতি ওদের স্বাভাবিক অধিকার ছিল। পরবর্তী সময়ে এইসব— জোতদার, মহাজনরা কেড়ে নিয়েছে।
উনি একজন লেখক, যিনি যা লিখতেন আর যা করতেন— দুটো একই। কোনো পার্থক্য উনি করতেন না। তার মানে গরিব মানুষের জন্য মধ্যবিত্ত লেখকের যে হা-হুতাশ করা, ঠিক তা নয়। তিনি কার্যকরভাবে কিছু করতেন আর সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন মানুষগুলোর দিকে খেয়ালও করতেন। ১৯৬৯ সালের দিকে যখন নকশাল আন্দোলনে একটা সাংঘাতিক ব্যাপার-স্যাপার হলো, কে কাকে হত্যা করছে, কোনো কিছুরই ঠিক নেই। তখনই তিনি হাজার চুরাশির মা উপন্যাসটা লিখেছিলেন। তারপর কত গল্প লিখেছেন। কত ভালোই না ছিল তার গল্প লেখার হাত! তার একটা লেখা আছে ‘স্তনদায়িনী’। এটা তার খুব বিখ্যাত গল্প। তার পর ‘সাঁঝ সকালের মা’। সাঁঝ সকালের মা মানে ভিখিরি, সে সকাল বেলায় ভিক্ষা করতে বের হয়। ভিক্ষা করার আগে তার ছেলেমেয়েরা তাকে একটুখানি খাবার খাইয়ে দেয়। তার পর সে ভিক্ষা করতে নেমে যায়। সারাদিন ভিক্ষা করে ফিরে এসে রাতের বেলায় আবার পরের দিনের জন্য কিছু একটা তৈরি করে। সে তো আর যেনতেন মা নয়, সাঁঝ সকালের মা। এরকম গল্প। ‘চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তীর’ উপন্যাস দেশ বা আনন্দবাজারের মতো বড় কোনো পত্রিকায় ছাপানো হয়েছিল। তার পর সেটা আমাদের হাতে আসে। ‘অরণ্যের অধিকার’-এর পরই বোধহয় ‘চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তীর’ বের হয়েছিল।
আমি যতবার কলকাতা গিয়েছি, ততবারই আমার সঙ্গে তার দেখা হয়েছে। আর উনি তো, গলাটা জড়িয়ে ধরতেন। বুকের সঙ্গে গলা বেঁধে তার পর কথা বলতেন। এখন তো আর ওই রকম আবেগ আর দেখা যায় না গো! আমি একবার সাহিত্য একাডেমিতে বক্তৃতা করতে গিয়েছিলাম কলকাতায়। এর পর দেখলাম, মহাশ্বেতা দেবী বললেন, ‘এখন হাসান কথা বলবে, তার আগে আমি একটুখানি কথা বলি।’ এর পর তিনি কিছু কথা বললেন। তো এই রকম মানুষ ছিলেন। তিনি মানুষ হিসেবেও অসাধারণ আর লেখক হিসেবেও ব্যতিক্রমধর্মী। সেজন্য আমি তাকে বিশেষভাবে স্মরণ করি। তার লেখাতে, তিনি একজন নারী সাহিত্যিক— এটা নিয়ে কোনো প্রশ্নই ছিল না। উনি কাউকে তোয়াক্কাও করতেন না। উনি নিজেকে লেখিকা বলতে পছন্দ করতেন না। কিন্তু তার পরও তো তিনি নারী সাহিত্যিক বটেই।
‘হাজার চুরাশির মা’ নিয়ে আমার স্মৃতি অতোটা এখন আর মনে নেই। ১৯৬৯ সালে নকশাল আন্দোলনের সময় কে, কাকে যে মারবে কিছুই ঠিক ছিল না। তার পর এটা মাওবাদী একটা জায়গায় চলে যায়। এমনকি এখনো পশ্চিমবাংলা এবং ভারতের অনেক জায়গায় মাওবাদীরা আছেও। এখনো তাদের সঙ্গে কারো সম্পর্ক ভালো নয়। ওই সময়টায় ভদ্রঘরের তিন-চারটা ছেলেকে আর একটি লোককে পিটিয়ে মেরে ফেলল— এই পরিস্থিতিতেই মহাশ্বেতা দেবী হাজার চুরাশির মা লিখেছিলেন। তখন তো আর চেনাচেনির প্রশ্ন নেই, সবই নাম্বার। হাজার চুরাশি জেলে আছে, সে বের হলেই তাকে মারা হবে। সবকিছুই নাম্বারে ঠিক করা হচ্ছে। উপন্যাসটি খুব যে বড় তা নয়। মহাশ্বেতা দেবী ওই সময়কে ধরেছেন বলেই উপন্যাসটা এতটা গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে সাহিত্য হিসেবে হাজার চুরাশির মা যে খুব বিশাল সাহিত্য, তা কিন্তু নয়। তার রুদালি এক অদ্ভুত গল্প। তার পর তো রীতিমতো সেখানে ভূপেন হাজারিকার মেঘ গুড়গুড় করে গান দিয়ে আরো বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল। এ গান দিয়ে রুদালি সিনেমাটাও খুব ভালো হয়েছিল। হিন্দিবাসী একজন মহিলা তিনি বাংলাও বলতে পারেন। তিনি একটা থিয়েটার চালাতেন। সেখানেও এই রুদালিটা মঞ্চস্থ করা হয়েছিল। সেটা আমি কলকাতায় গিয়ে দেখেছিলাম।
এ ধরনের মানুষ চলে গেলে যে ক্ষতিটা হয়, সেটা পরিমাপ করা যায় না, অপরিমেয়। কেননা একটা দেশের চিন্তার ক্ষেত্রে, অনুভবের ক্ষেত্রে, একটা দেশ সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে, মানুষ সম্পর্কে কী দৃষ্টিভঙ্গিটা গ্রহণ করা উচিত, এসব কারণে মহাশ্বেতাদেবীর মতো লেখকদের লেখা চিরকালই আমাদের অনুপ্রাণিত করবে। সে জন্যই তো আমরা বড় সাহিত্যিকদের ওইভাবে মূল্য দিই। ‘পথের পাঁচালী’র গ্রাম আর নেই। কিন্তু ‘পথের পাঁচালী’ আছে এবং বহুকাল থাকবে। কিংবা হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, লালসালু, এসব উপন্যাস আছে এবং টিকে থাকবে বহুকাল। একইভাবে মহাশ্বেতা দেবীর লেখাও টিকে থাকবে, আমি মনে করি।
লেখালেখি নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই আছে না, বলে শিল্পসত্তা, ব্যক্তিসত্তা এগুলো আলাদা? এগুলো আমি মনে করি অনর্থক তর্ক। শিল্পী আলাদা, মানুষ আলাদা— কেউ দেখেছে নাকি শিল্পী আর ব্যক্তি আলাদা আলাদাভাবে হাঁটছে। মানুষের সত্তার বহু গুণ, বহু বিস্তৃতভাবে মানুষের দিক আছে। তার মধ্যে হিংসা নাই? বঙ্কিমচন্দ্রের কোনো এক লেখায় আছে, বিড়াল চুরি করে খেয়েছে বলে সেটিকে চোর উপাধি দিয়ে শাস্তি দেয়া হবে। তাকে আমি অনুরোধ করব, তিনি যেন তিনদিন কিছু না খান। এবং তিনি যদি তিনদিন না খাওয়ার পর, যদি হেঁশেলঘরে গিয়ে ধরা না পড়েন, তাহলে আর কি বলেছি! তো মানুষকে দেখারও জায়গা আছে, মানুষকে কেমন করে দেখব। মানুষের অনেক বিদ্বেষ আছে। যেগুলো ধর্মকর্মকে অবলম্বন করে হয়, সাম্প্রদায়িকতাকে অবলম্বন করে হয়, এমনকি আত্মীয়-স্বজনকে অবলম্বন করেও হয়। এগুলোর উপরের পরিচয় হওয়া উচিত মানুষ। তার দোষ-গুণ সবকিছু রয়েছে। তার মধ্যে কাম-ক্রোধ, লোভ-মোহ আছে আবার সহযোগিতা আছে, ভালোবাসা আছে, আত্মত্যাগও আছে। তো মহাশ্বেতা দেবী সেই মানুষকে ধরার চেষ্টাটা করে গেছেন। উনি মনে করেছিলেন, আমাদের এখানে মনুষ্যত্বের অবমাননা হচ্ছে। এই রাষ্ট্র শাসন সার্বভৌমত্ব কাজে লাগিয়ে তারা তাদের সুবিধামতো মানুষকে বিভিন্ন জায়গায় রেখে দেয়। আমার এই বাংলাদেশ সম্পর্কে মহাশ্বেতা দেবীকে বলতে বললে তিনিও বলতেন, বাংলাদেশের মানুষ কি একই রকম আছে? উত্তর যদি হয়, না। তাহলে কেন নাই, সেটা কি মানুষের দোষ? নাকি মানুষের তৈরি সমাজের দোষ? এসব বিষয়কে উনি খুব খেয়াল করতেন এবং এগুলো নিয়ে বলতেন।
তার একটা লেখা আছে ‘ক্ষুধা’। ব্যাপার হচ্ছে, মানুষের ক্ষুধা চিরন্তন ব্যাপার। বাংলাদেশের মানুষ কথায় কথায় বলে যে, ‘না গো, দুমুঠো ভাত খেয়েছি।’ এখন দু’মুঠো ভাত জোটানোই কি যথেষ্ট? মানুষকে তিন বেলা খেতে দিলেই কি সব মিটে গেল? একটা সমাজের মধ্যে সেই মানুষের বিকাশটা যতক্ষণ পর্যন্ত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত বলা যায়, এই সমাজ পুরোপুরি মানবিক সমাজ নয়। এটা একটা অসম্ভব রকমের শ্রেণীবিভক্ত সমাজ। আমাদের এখানে বড়লোকদের আলাদা সবকিছু। মধ্যবিত্তদেরও একই অবস্থা হচ্ছে। বড়লোকদের দিকে তাকিয়ে থেকে তারাও বড়লোক হতে চায়। নিম্নমধ্যবিত্ত আছে, নগরবাসী আছে, আবার গ্রামের সাধারণ মানুষ আছে। তারা কৃষক বা তারা মজুর। কত রকমভাবেই না তারা জীবনযাপন করে। কাজেই মানুষকে নানা জায়গা থেকে দেখে বিচার করা এবং এই মানুষের মধ্যে যে সত্যিকারের মনুষ্যত্বটা, সেটাকে খুঁজে বের করে দেখিয়ে দেয়া এবং তার জন্য লড়াই করা জরুরি। লড়াই করতে গেলে লেখকদের অনেক সময়ই প্রথার বিরুদ্ধেই কথা বলতে হয়। তারা দালাল হলে চলে না। যদি কেউ কোনো দলের দালালি করে, সে অন্তত লেখক নয়। লেখক হওয়ার আগে নিজেকে আইডেন্টিফাই করা দরকার যে, সে বলুক আমি অমুক দলের লেখক। এটা বলেই তবে তাদের লেখা শুরু করা দরকার। যিনি সত্যিকারের লেখক তিনি কারো কাছে মাথা নোয়ান না। তিনি কারো তাঁবেদার নন, কিছুই তোয়াক্কা করেন না তিনি।
তার লেখা আর আমার লেখার সঙ্গে আমি নিজে কখনোই মেলাবো না কিংবা পার্থক্য খুঁজব না। কখনই করব না। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হকের লেখার সঙ্গে কি আমার লেখা তুল্য! না কখনই না, ওরা একরকম, আমি একরকম। আসল কথা হলো, লেখকরা এক, লেখকরা স্বতন্ত্র।
মহাশ্বেতা দেবী বলেছিলেন, ‘লেখার জন্য এই পৃথিবী ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না।’ কারণ তিনি তো সত্যিকারের লেখক। সত্যিকারের লেখকরা কখনো পৃথিবী ছেড়ে যেতে চাইবেন না। কারণ তিনি যাই লিখুক, তাকে যদি কেউ গুরুত্ব না দেয় তাহলে তো তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাথা কাত করে লিখবেন না। এটা বুঝতে হবে। আমারও মাঝে মাঝে এমনটিই মনে হয়। নিজেকে বলি, ‘না, বাইরে বুঝি আর যাওয়া হলো না। এই লেখাটার কাজ রয়েছে। তাই বাইরে যাওয়া যাবে না এখন।’ দিনের পর দিন এভাবেই আমিও যাচ্ছি না হয়তো। অবশ্য এমনো হয় যে, বাড়ি বসে লেখাটাও হচ্ছে না, তাও হতে পারে।
মহাশ্বেতা দেবী নিজে বলতেন তার ‘অরণ্যের অধিকার’ ও ‘চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তীর’ বেঁচে থাকবে। পাঠক হিসেবে আমারও তাই মনে হয়। উনি যে কথাটা বলেছেন সেটিই মোক্ষম কথা, ঠিকই বলেছেন। কারণ এই দুটি উপন্যাসই তার সেরা কাজ। এছাড়া তার কিছু গল্পও টিকবে। আসলে কী টিকবে, কী টিকবে না, সেটা তো বলা মুশকিল। তবে এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, সারা পৃথিবীতে এখন যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাতে মহাশ্বেতা দেবীর এই লেখাগুলো কম গুরুত্বের হয়ে যাবে বলে আমার মনে হয় না। তার পরও, তার লেখা নিয়ে কী হবে, কী হতে পারে? এরকম আলোচনা করা মুশকিল। তার লেখাকে সবাই অনুমোদন দিয়েছে এমনটিও কিন্তু নয়। অনেকে সমালোচনাও করেছেন। আসলে তার মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে এখন এসব লেখার কোনো মানে হয় না।
মহাশ্বেতা দেবী লিখেছেন অনেক। তার জীবনের পরিসমাপ্তি আর লেখার পরিসমাপ্তি একসঙ্গে হলো। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বোধকরি তিনি লিখেই গেছেন। তার এই মৃত্যুর খবর বাংলা সাহিত্যের জন্য ক্ষতি তো বটেই। বাংলা সাহিত্যে তিনি যা দিয়ে গেছেন, তাতেই তিনি চিরকাল বাংলা সাহিত্যের স্মরণীয় একজন প্রধান লেখক বলে বিবেচিত হবেন বলে আমি মনে করি। হয়তো ভবিষ্যতে তার আরো অনেক অনেক পাঠক জুটবে। তার লেখা আরো অনেক বেশি পড়বে। সেটা হলে খুব ভালো।
লেখক: কথাসাহিত্যিক





