মিয়ানমারের উগ্র সাম্প্রদায়িক ও জাতগর্বী বৌদ্ধ শাসকরা দীর্ঘকাল রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সামরিক নিপীড়ন চালাচ্ছে। ১৯৭৮ সালের দিকে বড় মাপের আনুষ্ঠানিক নিপীড়নের শুরু থেকে বাংলাদেশের জনগণ রোহিঙ্গাদের পাশে। পরের প্রত্যেক সংকটে বাংলাদেশ উন্মূল ও দেশান্তরী মানুষগুলোকে আশ্রয় ও খাদ্য দিয়েছে। খানিকটা ব্যতিক্রম দেখা যায় ২০১৫ সালের রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানের পর। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ দেশের সচেতন, শিক্ষিত ও শহুরে মধ্যবিত্তের একটি অংশের মধ্যে প্রবল রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব দেখা যায়। মানবিক প্রয়োজনের পরিস্থিতিতে সে মনোভাব লুকানোর কোনো চেষ্টা তাদের মধ্যে দেখা যায়নি। তারা যেন বরং মিয়ানমারের শাসকদের সামরিক অভিযানে সমর্থন দিতে থাকে। বাংলাদেশের শাসকরা যাতে সাগরে ভাসতে থাকা ঘরপোড়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়, সেজন্য চাপ দিতে থাকে। ক্ষমতাসীনরা সেবার সে চাপে অনেকটা প্রভাবিত হয়েছিলেন। ২০১৬-১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক নির্মূল অভিযান শুরু হওয়ার পর তাই সংশয় দেখা দিয়েছিল, বাংলাদেশ এবারও দ্বিধান্বিত হয়ে লাখো রোহিঙ্গার সলিল সমাধি ঘটতে দেয় কিনা। বড় প্রতিবেশী হলেও ভারত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে বরাবরই অনাগ্রহী। ২০১৫ সালের মতো রোহিঙ্গাবিরোধী ঘৃণার একটা কলরোল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ২০১৬-১৭ সালে উঠলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্রয় দানের সিদ্ধান্তে শহুরে মধ্যবিত্তের ওই রোহিঙ্গা বিদ্বেষী অংশটি গলা নামিয়ে ফেলে। যখন আশ্রয়প্রত্যাশী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ঢল নেমেছে— স্বামী ও পিতৃহারা রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের স্রোত বাংলাদেশের দিকে আসছে, শহুরে মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে ঘৃণা ও ভালোবাসার একটা দ্বিধা কাজ করছে, তখন একদিন কামরুজ্জামান কামুর আমি রোহিঙ্গা কবিতা ফেসবুকের মাধ্যমে আমার সামনে এল। বাংলাদেশের একজন কবি এমন দ্বিধাহীন উচ্চারণে এমন এক সময়ে নিজেকে রোহিঙ্গা ঘোষণা দিয়ে তাদের হাহাকার, ব্যথা ও দুর্বিপাক নিজের করে নিয়ে তাদের কথা উচ্চারণ করলেন— ঢাকার বর্ণবাদী শিল্প-সাহিত্যের জগতে সে কবিতা ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা হয়ে থাকল। এ কবিতার সরলতা, অকপটতা ও আন্তরিকতা প্রথম পাঠে আমাকে আপ্লুত-উদ্বেল করে তুলেছিল। ‘আমি রোহিঙ্গা’ শিরোনামে বই প্রকাশ উপলক্ষে সেই বাষ্পরুদ্ধ স্মৃতি লিখে রাখার দরকার আছে।
এ বইয়ের আর কোনো কবিতা রোহিঙ্গাদের নিয়ে নয়। কিন্তু সমকালীনতার রেফারেন্স প্রত্যেক কবিতায় কোনো না কোনোভাবে উপস্থিত। বিষয়ে সহজ, বুননে সরল কবিতাগুলো পড়তে গিয়ে কবিতার সাহিত্যিক পাঠক আঁতকে উঠতে পারেন। এখনকার কবিতা যে ঠাঁট ও গমকে কথা বলে, কামুর কবিতা সেখান থেকে অন্যদিকে রওনা হয়েছে, তা দেখেও গেল গেল রব উঠতে পারে। তেমন কথা আমি রোহিঙ্গা বের হওয়ার পর কানে এসেছেও। নতুন কবিতা লিখতে গেলে নিন্দামন্দ কিছু হবেই।
কামরুজ্জামান কামুর কবিতা ‘মুখপত্রহীন’ থেকে ‘আমি রোহিঙ্গা’ অবধি অধিকাংশ কবিতা পড়ার অভিজ্ঞতা যাদের আছে, তারা স্পষ্টভাবে তার জার্নি খেয়াল করতে পারবেন। আমাদের এখানে যে কবিতাগুলোকে গম্ভীর, চিন্তাশীল, অলঙ্কার ও উেপ্রক্ষায় ঠাসা বলে বাড়তি মূল্য দেয়া হয়, তেমন কবিতাও কামু অতীতে লিখেছেন। এ কবিতাগুলো যে কলকাতার পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তরের দশকের কয়েকজন কবির কবিতার রিপ্রডাকশন, তা এখন পাঠকদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের অভিনব ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাকে পাশ কাটিয়ে প্রায় দুটি কবি প্রজন্ম বিনাতর্কে কলকাতার কবিতার ভাষা, প্রকরণ ও প্রকাশভঙ্গিকে নিজেদের বলে আত্মস্থ করে নেয়ার ঘটনা বিস্ময়কর শুধু নয়, আমাদের সাহিত্যের জন্য লজ্জাজনক অভিজ্ঞতাও।
বাংলাদেশ ও ভারত স্বাধীন রাষ্ট্র। দীর্ঘকাল ধরে ভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাত্রার কারণে দুই দেশের সাহিত্য দুই রকম হওয়াই স্বাভাবিক। ভাষাগত ঐক্য অবশ্যই আছে; বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস দুই দেশের সাহিত্যেরই ইতিহাসও। বাংলাদেশে ফররুখ আহমদ, হাসান হাফিজুর রহমান, আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, ফরহাদ মজহার, মোহাম্মদ রফিকের কবিতা আর কলকাতায় শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, উত্পলকুমার বসু, জয় গোস্বামী, রণজিৎ দাশের কবিতা চলনে-বলনে-অভিজ্ঞতায় দুই ধারার। সেটা হওয়ারও কথা। কিন্তু আশির দশক থেকে বিশেষ করে নব্বই ও পরের দশকগুলোর অনেক কবি যেভাবে নতুন কবিতা অন্বেষণ করতে গিয়ে কলকাতার পুরনো কবিতার পুনরাবৃত্তি করতে শুরু করলেন, তা বিস্ময়কর এক অভিজ্ঞতা। নিজস্ব ইতিহাসের স্পর্শ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক প্রকার উন্মূল কবিতা রচনার যে মহামারী চলছে, তা থেকে বের হওয়ার সচেতন প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরে কামরুজ্জামান কামুর কবিতার মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। ব্রাত্য রাইসু, সাখাওয়াত টিপুসহ আরো কয়েকজন কবি কাজ করছেন। তাদের কথাও ধীরে ধীরে আমাদের বলতে হবে।
আপাতত কামুর লড়াইয়ের কথাই বলা যাক। কলকাতার কবিতার পুনরুৎপাদনের যুগে নিজেদের ও নিজের কবিতা লিখতে গিয়ে কামুর কবিতা হয়ে উঠেছে নির্মেদ, নির্ভার। সমস্ত আবরণ ও আভরণ সরিয়ে সাহিত্য করে তোলার পুরো কসরত দূরে রেখে একেবারে অরিজিনাল কবিতাকে পাঠকের সামনে হাজির করছেন। ক্র্যাফটের কেরামতির দিন শেষ করে দিয়েছেন তিনি। সাহিত্যিক পাঠকের জন্য ধাক্কা হলেও সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছতে পারলে কামুর কবিতা বিপুলভাবে সমাদৃত হচ্ছে। উদ্দেশ্যহীন যোগাযোগহীন কবিতার জগতে এটা সুসংবাদ। এ কবিতার ইশারা, মজা ও পরিহাস লোকে আস্বাদন করতে পারছে। এ গ্রহণযোগ্যতার পরও কামুকে কড়া মেকআপ, আড়ম্বর, অলঙ্কার, বাহুল্য ও মেকি বৈশিষ্ট্য ও গাম্ভীর্যের সঙ্গে লড়াই চালাতে হবে। এটা আমাদের কবিতার বাঁচা-মরার লড়াই। সমকালীন কোনো না কোনো কবির মুখ দিয়ে কথা বলে উঠবে। প্রত্যেক যুগে প্রত্যেক দেশে কবিতায় গানে গদ্যে এমন ঘটনা ঘটেছে। জনসমাজে, বিদ্বৎসমাজে প্রভাব সঞ্চার করতে হলে কবিতাকে যাপনের অভিজ্ঞতা থেকে জেগে উঠতে হবে। জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে নতুন কবিতা জন্ম নেবে। মানুষের কলরবের স্বর শোনা যাবে নতুন কবিতার বুকে।
আমি রোহিঙ্গা কাব্যের কবিতাগুলো পড়তে পড়তে সেসবের অনেক কিছুই পাওয়া গেল। কোথাও কোথাও কবিতার আপাতসারল্য মহাকালীন কোনো দ্যোতনায় উদ্ভাসিত হয়েছে। আবার কোথাও পরপর সাজিয়ে রাখা লাইনগুলো ওই লাইনগুলোর বাইরে বের হতে পারছে না, এটাও সত্যি। কিন্তু সব কবিতা যে কামুর নিজের এবং একই সঙ্গে নতুন ধরনের কবিতা, সে নিয়ে সংশয় নেই। কামুর কবিতার দিকে নিবিড় মনোযোগ রাখা আমাদের দায়িত্ব হয়ে রইল। নতুন কবিতার যাত্রা অব্যাহত থাকুক।






