প্যানপেনে হলুদ আলোয় নিজের পার্স খুঁজছিল তান্না। গেল কোথায় ছাই! কাল রাতে এখানে রেখেই তো সোজা কিচেনে ঢুকে পড়েছিল সে।
কী যে হয় আজকাল, মনে থাকে না কিছুই।
সামান্য টেনশন হলেই মাথাটা বিগড়ে যায়। পচা কুমড়োর মতো ঢকঢক করে নড়ে ওঠে ব্রেন। সদ্য চাক ভাঙা মৌমাছির মতো বোঁ বোঁ শব্দ হয় তখন। তার সঙ্গে কানের ভেতর গলা খুলে চিচিম চিচিম করে ডেকে যায় ঝিঁঝিঁ পোকার দল।
তান্না তখন হাল ছেড়ে দেয়। ধুস, যাক গে যাক। সব স্মৃতি ধুয়ে-মুছে যায় যদি তো যাক গে। কী হবে এ জীবনে স্মৃতিফুলের মালা গেঁথে গেঁথে!
আসগরের আসার কথা ছিল কাল রাতে।
সে কথাও একেবারে ভুল মেরে গেছিল সে। ভাগ্যিস আসার আগে কিছু লাগবে কিনা জানতে চেয়ে আসগর নিজেই ফোন করেছিল। নইলে বেচারাকে ফাঁকা ঘরে একা বসে থাকতে হতো তান্নার কাজ শেষে ঘরে ফেরার অপেক্ষায়।
সোফার ওপর জমে থাকা এক বোঝা ছাড়া কাপড় এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পার্স খোঁজে তান্না।
যা বাবা, এত কাপড় জমে গেছে! কবে যে বসে একটু গুছিয়ে নেবে, তার সময়ও হয় না। কাজ শেষে ঘরে ফিরে কিচ্ছু করতে ইচ্ছে করে না ওর। গা ছেড়ে শুয়ে থাকে। টিভিটা একা একাই এবিসিডি বকে যায়। ও ঘরের ছাদ দেখে। দেয়ালে টিকটিকি খোঁজে। নিঃসীম ফাঁকা ঘর। নিশ্ছিদ্র সুনসান। হিম হিম নীরবতা। এ একটা জীবন হলো! ইচ্ছামতো শোও, খাও, ঘুমাও, জেগে থাকো, হেসে-কেঁদে চেঁচাও কেউ এসে বলবে না, এই শুনছ, এক কাপ চা বানাও তো তান্নুজান। কিংবা, মা মা দেখো ভাইটা আমার সব রঙ পেন্সিল কেড়ে নিচ্ছে...
এই তো পেয়েছি! এক থোক কাপড়ের নিচ থেকে হারানো পার্সটা খুঁজে পেয়ে তাড়াতাড়ি অফিসের বড় ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলে। তারপর হালকা করে দরোজা টেনে বেরিয়ে পড়ে তান্না।
আজ সানডে। এখনো শীত রয়েছে জাঁকিয়ে। সাদা শীত। যেদিকে তাকাও বরফ আর বরফ।
বিদেশের সব ভালো! কেবল এ বিচ্ছিরি শীতকালটা যেতেই চায় না।
মোটা কোটের ওপর আরো একটা মোটা শালে মাথা-মুখ জড়িয়ে কাছের বাংলাদেশী স্টোরে আসে তান্না। আসগরের প্রিয় কিছু খাবার কিনবে ও।
এটুকু রান্না করতে ওর বেশ ভালো লাগে। তবুও তো সপ্তাহ শেষে কেউ একজন ওর হাতের রান্না খেয়ে শিশুদের মতো খুশিতে আহা উহু করে ওঠে!
হাঁ করে ঘুমাচ্ছে আসগর। এখানকার একটা ফিলিং স্টেশনে কাজ করে ও।
পরিচয় হয়েছিল সেখানেই। বয়সে কয়েক বছরের ছোটই হবে আসগর। তাতে তান্নার কিছু যায় আসে না। তান্না জানে, এ বয়সে ওর আর আসগরের শরীরে নতুন করে আর কোনো বাড়বাড়ন্ত হবে না। ৪০-৪৫ বছর বয়সে ওরা একজন আরেকজনের সঙ্গী হয়ে সুখেই আছে গোটা বছর দশেক।
তাছাড়া একাত্তরে ওর মাকে যে পাকিস্তানি সৈন্যটি রেপ করেছিল, তার বয়স ছিল বড়জোর ২১ কি ২২। বয়স কম হলে বা বেড়ে গেলে পুরুষের নাকি তেমন কিছু আসে যায় না। নারীদের কি সমস্যা হয়? এ ৪৫-এ তান্না অবশ্য তেমন কিছুই বুঝতে পারে না। মাঝে মাঝে তো কোনো রকম শরীরী ব্যাপার ছাড়াই কত দিন ওরা কাটিয়ে দেয় মহা আনন্দে। আবার কয়েকটা দিন থাকে তুমুল শরীরী। সম্পর্কের উনিশ কি বিশ কই কিছুই তো হয় না! ওদের কাছে বয়স একটি বেচারা সংখ্যা হয়ে বয়ে যাচ্ছে ক্যালেন্ডারে।
একটা সত্যি বিয়ে আর একটা চুক্তি বিয়েতে দুজন পুরুষের সঙ্গে ১০ আর ৫ করে ১৫ বছর সংসার করে এই একাকী জীবনের বছর দশেক সে আসগরের সঙ্গে থাকছে।
আসগর গুজরাটি এবং আর কখনো গুজরাটে ফিরে যেতে চায় না। কিন্তু গুজরাটের জন্য মনের ভেতর অবিরাম কেঁদে যায়। যেমন কাঁদে তান্না।
দুজনের ভেতর ভালো সমঝোতা। বিয়েটিয়েতে আর আগ্রহ নেই ওদের। আসগর উইকএন্ডে চলে আসে তান্নার কাছে। দুজন দুজনের কথায়, গানে, সংসারের কাজেকর্মে, শরীর ও ঘামে ঘর খুঁজে নিয়েছে। মাঝে মাঝে হঠাৎ কখনো ওদের হারানো স্বদেশও চলে আসে ক্ষণিকের উদ্ভাসে।
কোনো কোনো দিন আসগর ফোন করে গুজরাটের এক শহরে, রমেশ নামের একজনের কাছে জানতে চায়, কেম ছ মহারো গুজরাট মোটাভাই?
ওপাশে রমেশ মোটাভাই বারবার গুজরাটে ফিরে আসতে বলে আসগরকে, ফিরে আয় আসগর ভাই আমার। দাঙ্গা নেই। চুকেবুকে গেছে সব।
না না করে হাজারবার না বললেও আসগরের চোখে-মুখে ভেসে ওঠে মায়ের কোলে বসে দোল খাওয়ার আনন্দ আর খুশি। সেদিন আসগর সারাক্ষণ মাউথ অর্গানে সুর তোলে, এ যো দেশ হ্যায় তেরা, স্বদেশ হে তেরা...
তখন কেন যেন তান্নার মনেও ভেসে যায়, এ মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে লক্ষ মুক্তিসেনা, দে না, আমায় দে না, সে মাটি আমার অঙ্গে মাখিয়ে দে না...
তান্নার প্রথম বিয়েটা বেশ লাগসই হয়েছিল। একদিন কী যে হলো। ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে মিন্তি মজুর কাজ করছে পুকুর ধারে। উঠোন লাল করে রোদ তাপাচ্ছে ক্ষেতের শুকনো মরিচ। লাউ-কুমড়ার জাংলার হাতলে বসে তিন-চারটে দাঁড়কাক কা-কা করে গলা ফাটাচ্ছে।
শাশুড়ির সঙ্গে দুপুরের রান্না করছিল তান্না। ছেলেমেয়ে দুটো ইশকুলে। এমন সময় প্রথম স্বামী শফিক অফিস থেকে বাসায় ফিরে আসে। শাশুড়িই আগে দেখে। অবাক হয়ে রান্নাঘরের দরোজা দিয়ে গলা বাড়িয়ে জিগ্যেস করে, অ শফিক ফিরে আসলি যে বাবা! শরীর খারাপটারাপ লাগতিছে নাকি রে বাপ?
তান্না আলু পটোল উচ্ছে তরকারি কুটছিল। বঁটি নামিয়ে তাড়াতাড়ি ছুটে আসে, কী হইছে কী তোমার? মুখটা যেন লাল লাগতিছে! এই যে শুনছ, তুমি বসো তো আগে। শরবত বানাই! না না, আগে তুমি পানি খাও। দাঁড়াও পানি আনতিছি এখুনি!
শফিক তান্নার দিকে রক্তচোখে তাকিয়ে থাকে। রাগে গরগর করছে ওর সমস্ত শরীর।
তান্না গ্লাসে পানি নিয়ে শফিকের কপালে হাত দিতে যেতেই গ্লাস ছুড়ে ফেলে দেয় শফিক। তারপর আচমকা তালাক, তালাক, তালাক বাইন তালাক দিলাম তোমাকে, বলে ঘরে ঢুকে ঘটাং শব্দে দরোজা বন্ধ করে দেয়।
আম্মাগো বলে তান্না ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে শাশুড়িকে।
শাশুড়ি, ননদ, দেবররা ছুটে আসে। বদ্ধ দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে সবাই চুপ করতে বলে শফিককে। কিন্তু কেউ সেদিন থামাতে পারেনি শফিককে। উন্মাদের মতো ঘরের ভেতর থেকে চেঁচিয়ে বলতে থাকে শফিক, তালাক দিলাম তোমাকে। তুমি এখুনি বেরোও। বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে। তোমার মুখ যেন আর না দেখি!
তান্না কেঁদে আকুল হয়। সঙ্গে শাশুড়ি-ননদরাও দিশেহারা। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এ কী হলো তাদের বাড়িতে। বড় দেবর সান্ত্বনা দেয়, চিন্তা করো না ভাবি। রাগের মাথায় তালাক বললেই তো আর তালাক হয়ে যায় না।
কিন্তু শফিক জানায়, সে সজ্ঞানে, সচেতনভাবে তান্নাকে তালাক দিচ্ছে। কেন দিচ্ছে তা তালাকনামার কাগজেই সে লিখে দেবে। তান্নার আব্বাজিকে খবর দিয়ে পাঠিয়েছে। সে যেন চলে যায় তার আব্বাজির সঙ্গে। ছেলেমেয়ে সে দেবে না। পারলে কেস করুক।
এবার হতবাক হয়ে পড়ে সবাই।
শফিক-তান্নার ভেতরে খুটখাট ঝগড়া ছাড়া কখনো বড় কিছু নিয়ে তেমন মনোমালিন্য হয়নি। তান্না হাসিমুখে শ্বশুরবাড়ির সবার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। ফলে এ বাড়ির ছোট-বড় সবার কাছেই তান্না বেশ প্রিয়।
বড় ভাইয়ের কাণ্ডমাণ্ড দেখে ছোট ভাইবোনেরা অবাক আর বিরক্ত হয়। ভাবির বিরুদ্ধে তাদের কখনই কোনো অভিযোগ ছিল না। বরং সবার ‘মুশকিল আসান’ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিল তাদের বড় ভাবি।
তান্না নিজেও কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না, শফিক আজ বিয়ের ১০ বছরের মাথায় হঠাৎ কী কারণে তাকে তালাক দিল! কোনো কিছুই তো অজানা নয়! সবকিছু জেনে-শুনেই তো শফিকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। তবে?
একাত্তরের শান্তি কমিটির একজন চেয়ারম্যানের মেয়ে সে। কেবল সে নয়, তার অন্য তিন বোনের বিয়েতেও বাবার পরিচয়ের জন্য প্রচুর সমালোচনা হয়েছে। সব বোনকেই শ্বশুরবাড়িতে কম-বেশি খোঁচা সহ্য করতে হয়। ঠাট্টার ছলে হলেও কেউ না কেউ একবার মনে করিয়ে দিয়ে যায়, ওরা রাজাকারের মেয়ে। দেশদ্রোহীর রক্ত ওদের শরীরে। তাতে রাগ করে না ওরা। বরং কম-বেশি ঘৃণাই করে ওরা ওদের আব্বাজিকে।
তান্নার মনে আছে ছোটবেলার কিছু ঘটনা। ওদের দেখলেই ছোট শহরের অনেকে চোখ ঘোঁচ করে নিচু স্বরে কথা বলতে শুরু করত। অনেক মুরব্বি ছোট্ট তান্নাকে কাছে ডেকে নিয়ে কী যেন খুঁজত তান্নার মুখে। তান্না ছটফট করে ছুটে পালিয়ে আসত। এ সবকিছু জেনেই তো তান্নাকে বিয়ে করেছিল শফিক।
তাহলে? আর কী অপরাধ আছে তার?
মাগরিবের নামাজের পর তান্না দেখে সারিবদ্ধ কাঁঠাল গাছ লাগানো রাস্তা দিয়ে তার আব্বাজি হেঁটে আসছে। ঝড়ের মতো গিয়ে আছড়ে পড়ে, আব্বাজি আমার সংসার বাঁচান। আমি জিয়া রাইসাকে ছেড়ে বাঁচতে পারব না আব্বাজি!
আব্বাজি কারো সঙ্গেই কোনো কথা না বলে তান্নাকে নিয়ে চলে আসে।
তান্না ভাবে, এ মুহূর্তে কিছু বলে কোনো লাভ হবে না বলেই আব্বাজি চুপ থেকে তাকে নিয়ে চলে এসেছে। পরে নিশ্চয় একটা ফয়সালা হয়ে যাবে। শফিকের রাগ আর কতক্ষণ থাকবে। বাচ্চারা ইশকুল থেকে এসে কান্নাকাটি করলেই শফিক তওবা করে তাকে নিতে আসবে। কিংবা ও বাড়ির কাউকে পাঠাবে তাকে নিয়ে যেতে!
ব্যাপারটা ভেবে তান্নার আরো বেশি কান্না পেয়ে যায়। রিকশার ভেতর সে কাঁদতে কাঁদতে ভাবে, আল্লারে শফিক কেন এরম করল? তাও বিয়ের এত বছর পরে!
কত সাধের সংসার তাদের। মুহূর্তে ভেঙে চুর চুর করে দিল শফিক।
আব্বাজি তার পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দিতে দিতে মাঝে মধ্যে বিশেষ একটা জায়গায় হাত রাখছিল। তান্না তখন কান্নার দমকে আমল দেয়নি। সেখানেই মাঝে মাঝে একটু গভীর চাপ দিচ্ছিল আব্বাজি। তান্না একটু চমকে গেলেও ভেবেছিল সান্ত্বনার প্রকাশ হয়তো বা।
তার আব্বাজি কঠিন দিলের নেকপছন্দ মানুষ। শতভাগ খারাপ মানুষ তিনি, তবে মেয়ে মানুষ দেখলে ‘নাউজুবিল্লাহ’ বলে সরে আসে সাত হাত দূরে।
কিন্তু মাঝরাতে যখন সান্ত্বনা দেয়ার ছলে অপরিসীম কামনায় জড়িয়ে ধরে কাঁধে গলায় চুমু খায়, তখন অবাক বিস্ময়ে আঁতকে ওঠে তান্না, আব্বাজি ছাড়েন। কী করছেন আপনি!
মিটমিটে আলোয় আব্বাজির কামনা মদির চোখ দেখে চমকে উঠেছিল তান্না, আব্বাজি আমি তান্না। আপনার মেয়ে।
শান্তি কমিটির ভূতপূর্ব চেয়ারম্যান হিসিয়ে উঠেছিল সঙ্গে সঙ্গে, আব্বা কিসের আবব্বা। কার আব্বা। আমি তোর মতো নাজায়েজ সন্তানের বাপ না বুঝলি।
লুঙ্গির গিঁটে হাত দিতেই একাত্তরে হিন্দু বাড়ি থেকে লুটে আনা কাঁসার জগ তুলে নিয়েছিল হাতে তান্না, আপনি সত্যিই একটা জানোয়ার। মিথ্যা কথার মা-বাপ!
ব্যর্থ হয়ে সাপের মতো হিসহিসিয়ে উঠেছিল লোকটা, ‘যা তোর আম্মার কাছে যা। শুনে আয় কীভাবে তোর জন্ম হয়েছে হারামজাদি। শফিক কি তোরে এমনি এমনি তালাক দেছে নাকি! সব সত্যি আমি বলে দিছি শফিককে। দেখি তুই কই যাস।’
শরীরের এক পাশ প্যারালাইজড শিক্ষিকা মায়ের পাশে বসে আকুল হয়ে কাঁদে তান্না, আম্মা আমি কে আম্মা? আব্বাজি তো অমানুষেরও অধম আম্মা। এখন কী করব আমি? কোথায় যাব?
খাদিজা বেগম নিজেও কেঁদে ভাসান। কী বলবেন তিনি মেয়েকে? শুধু মুখটা মনে আছে তার। অল্প বয়সী একজন সৈন্য। ৩২ বছরের খাদিজা বেগমকে টেনে-হিঁচড়ে শুইয়ে ফেলেছিল গার্লস ইশকুলের হেডমিসট্রেসের ঘরে। যুদ্ধের জন্য প্রায় ফাঁকা ইশকুলে খাদিজা বেগম, হেডমিসট্রেসসহ তাদের একজন বান্ধবী গল্প করছিল সেদিন। একাধিক সন্তানের মা ছিল তারা।
খাদিজা বেগম সেই সদ্য তরুণ সৈন্যটিকে ভয় দেখিয়েছিল আল্লাহ রাসূলের। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। শহরের শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান স্বামীর কথা বলে ভয় দেখালে সৈন্যটি আরো মজা পেয়ে জাপটে ধরেছিল তাকে। ২২ কি ২৩ বছরের এক সৈন্য।
ধর্ষণ শেষে জানোয়ারটা যখন তার গায়ে-মুখে পেশাব করে ছিটিয়ে দিচ্ছিল আর তার রাজাকার, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান স্বামীর নাম করে হাসছিল, খুব ঘেন্না লেগেছিল মনে।
তান্না সেই ঘেন্নার ফসল।
শফিকের সঙ্গে আপসে তালাক হয়ে গিয়েছিল তান্নার। নিজের বিড়ম্বিত জীবনে ছেলেমেয়েদের জড়িয়ে নিতে চায়নি ও। শফিক খুব ভালো বাবা। ভালো মানুষ। তাছাড়া একটি অটুট পরিবারের স্নেহ আদর, আশ্রয়-প্রশ্রয় আর পরিচয়ে ছেলেমেয়েরা আছে, তাই থাকুক। বুকের ভেতর কিছু অভিমান চেপে সে শফিককে ক্ষমা করে দিয়েছে।
তাছাড়া তান্না আরো বুঝতে পেরেছিল, ও দূরে সরে না গেলে ওই জানোয়ার বাবা নামধারী তার ছেলেমেয়েদের জীবনটাও তামা তামা করে ফেলবে। তাই ধর্ষিত মায়ের সাহায্যে এক দূরসম্পর্কের মামা চুক্তি বিয়ে দিয়ে, ওকে নিয়ে আসে কানাডা।
তান্না এখন কানাডার নাগরিক।
বাংলাদেশী দোকানের ভারতীয় বাঙালি সেলস গার্ল জয় বাংলা বলে স্বাগত জানায় তান্নাকে। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ চলছে। তান্নার মনেই ছিল না, ভাষা শহীদের মাস চলে গেছে। এর পরই চলে আসবে সেই মুক্তিযুদ্ধের ভয়াল মাস। রক্তাক্ত মার্চ। ছোট ছোট লাল-সবুজ পতাকা আর কালো পতাকায় ভরে গেছে দোকান। লাল-সাদা শাপলা ফুল হাতে গ্রামের দুরন্ত বালক-বালিকার ছবি হাসছে দেয়ালজুড়ে। ছবির শহীদ মিনার বুক ভাঙা বেদনা নিয়ে তাকিয়ে আছে তান্নার দিকে। শূন্য স্মৃতিসৌধের আলোকচিত্রের নিচে কে যেন রেখে গেছে এক গোছা বিভিন্ন রঙের ফুল।
অনেকগুলো পতাকা কিনে নেয় সে।
সন্ধ্যায় মোমের আলোয় লাল-সবুজ রঙ কালোয় মিলেমিশে অদ্ভুত মায়াবী দেখায়। চেনা চেনা মায়াবীথি। লাউমাচার নিচে রক্তজবার বনে সন্ধ্যা নামলে শফিক ঘরে ফিরে আসত। কী যে এক হাসি হাসত সে!
মাউথ অর্গানে সুর তোলে আসগর, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।
তান্না কাঁদে। মনে মনে। আকুল কান্না কাঁদে। কেঁদে কেঁদে গাঙপাখির মতো গলে যায়, চিরদিন তোমার আকাশ...
ওদের কারোর কোনো স্বদেশ নেই। স্বজন নেই। দুজনের কেউই পাখি নয় অথচ ঘর নেই, মাটি নেই, বৃক্ষ নেই, জল নেই, কেবল আছে উড়াল উড়াল! এ বন তো সে অরণ্যে, এ বৃক্ষ তো সে এক অন্য লতাঝোপে, জলে, স্থলে, আকাশে, পৃথিবীর কোলে পিঠে হাতে, ওরা পরমানুষ। বৃক্ষে যেমন ঝুলে থাকে পরগাছা।
অলেপ্পোয় প্যারাসাইট।






