গত সংখ্যার পর

 

১৯৬৬ সালে আইয়ুব খানের হাতে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনে নিরাপত্তা বন্দি বনিয়া ঢাকা কারাগারের অন্দরে অন্তরীণ হইবার আগ পর্যন্ত আলমগীর কবিরের জীবনকাহিনী শেখ সাহেবও— যতদূর দেখা যাইতেছে— বিশেষ একটা জানিতেন না। শেখ সাহেবের তরুণ অনুগামী শাহ মুয়াজ্জম হোসেনও একই সময়ে ঢাকা কারাগারে আটকা পড়িয়াছিলেন। আপনকার স্মৃতিকথায় তিনিও কবির-কাহিনী দুই পাতা একান্ত না লিখিয়া পারেন নাই। তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহা পড়িলে মনে হয় শাহ সাহেবও এই ঘটনার আগে আলমগীর কবিরকে বড় চিনিতেন না। শাহ সাহেবের ‘নিত্য-কারাগারে’ পুস্তকের বয়ানটা এইরকম:

বহির্জগতের বার্তা নিয়ে আমাদের মাঝে নূতন অতিথির আগমন হল। আলমগীর কবিরকে কর্তৃপক্ষ আমাদের মাঝেই পাঠালেন। আলমগীর কবির এদেশের অধিবাসী হলেও প্রায় এক যুগ যুক্তরাজ্যে বাস করে এসেছেন। বিলাতের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন তিনি। যুক্তরাজ্যের গণতান্ত্রিক এবং ব্যক্তি-স্বাধীনতার আবহাওয়ায় গড়ে ওঠা আলমগীর কবির ওখানকার পাকিস্তানি নাগরিকদের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন, জন্মভূমির বহু দূরে বাস করেও আলমগীর কবিরেরা     দেশমাতৃকার ক্রন্দন শুনতে পেতেন। (শাহ মুয়াজ্জম ১৯৭৫: ৪৯; বানান সামান্য পরিমার্জিত)

দীর্ঘ বিদেশ প্রবাসের পর মাতৃভূমির মাটিতে পা রাখার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দেশের যে সকল সন্তানসন্ততি পাকিস্তান সরকারের হাতে ‘এমনি সাদর সম্বর্ধনা লাভ’ করিয়াছিলেন আলমগীর কবিরও তাঁহাদের একজন। শাহ মুয়াজ্জম বিষয়টি বিশদ করিয়াছেন এই ভাষায়:

দেশের বুকে যখন গণতন্ত্রের হত্যাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়েছে, দেশবাসীকে যখন শত অত্যাচার আর উত্পীড়নে জর্জরিত করা হয়েছে তখন আলমগীর কবিরের মত প্রাণবান ছেলেরা কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলেই চুপ করে থাকতে পারেনি, তার বিরুদ্ধে সেখানে বসেই আওয়াজ তুলেছে। পাকিস্তানি গণ-মানুষের হাজার দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী সারা বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছে। পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বিশ্বের মিলনকেন্দ্র লন্ডন শহরে পা দিয়েই ওদের বিক্ষোভ আর কাল পতাকায় সম্বর্ধিত হয়েছে।

শাহ মুয়াজ্জম যোগ করিয়াছেন: ‘ওঁদের বিরুদ্ধে সরকারের তাই তীব্র আক্রোশ। বিলেতের আইনের শাসনের রাজত্বে ওরা ওদের হিংসা চরিতার্থ করতে পারেনি। ওঁদের দেশে ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গুনেছে।’

আলমগীর কবির একদিন কারাগারে প্রবেশ করিলেন। আমরা শেখ মুজিবুর রহমানের রোজনামচা হইতেই জানিয়াছি তারিখটা ৬ আগস্ট ১৯৬৬। শাহ সাহেবের সাক্ষ্য অনুসারে, তারপর কারাগারের ‘ঝিমিয়ে আসা পরিবেশ আবার প্রাণবন্ত’ হইয়া উঠিল। তিনি লিখিতেছেন: ‘বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে কবির সাহেবের। আমরা তাঁর কাছ থেকে দুনিয়ার হালচাল জিজ্ঞাসা করি। কবির সাহেবও উৎসাহী শ্রোতা পেয়ে আনন্দের সাথে দেশ-বিদেশের গল্প করেন আমাদের কাছে।’ (শাহ মুয়াজ্জম ১৯৭৫: ৪৯-৫০)

প্রসঙ্গক্রমে আলমগীর কবিরের বাড়তি পরিচয়ও একটু মিলিতেছে শাহ সাহেবের রোজনামচায়। তিনি লিপিবদ্ধ করিয়াছেন আলমগীর কবিরের প্রতিভা ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত’ পর্যন্ত প্রসারিত।

নিয়মিত শরীরচর্চা করে অটুট স্বাস্থ্যের অধিকারী আলমগীর কবির। মেধাবী ছাত্র আলমগীর সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েও পেশায় একজন সাংবাদিক। রেডিও কমেন্টেটার, টেলিভিশন ক্রিটিক, সাংস্কৃতিক ভাষ্যকার এবং সর্বোপরি একজন ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট হিসাবেই কবির সাহেব কাজ করে এসেছেন। সংস্কৃতিমনা কবির সাহেব একজন ভাল গায়কও। সুন্দর রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারেন। (শাহ মুয়াজ্জম ১৯৭৫: ৫০)

শুদ্ধ কি তাহাই? আলমগীর কবিরের গলার প্রতিভা এখানে আরো একটু বাড়িয়াছে: ‘ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, রাশিয়া এবং হনলুলুর কিছু কিছু গানও কবির সাহেব গাইতে পারেন। আমরা সেসব গানের এক বর্ণ বুঝতে না পারলেও হেসে হেসে হাততালি দিয়ে বড় সমঝদারের মত ক্রমাগত মস্তক সঞ্চালন করি।’

আলমগীর কবিরের কারামুক্তি প্রসঙ্গেও শাহ মুয়াজ্জম হোসেন দুই কথা মজা করিয়া লিখিয়াছেন:

কদিন যাবৎ কবির সাহেবকে আইবির লোকেরা অনবরত জিজ্ঞাসাবাদ করে চলেছে। সকাল-বিকাল চার ঘণ্টা করে দুজন অফিসার কবির সাহেবকে নিয়ে প্রশ্ন-উত্তরের পালা চালিয়েছে আজ পাঁচ দিন। জেলগেটের সে পালা শেষ করে প্রতিবারই ক্লান্তিতে বিছানায় ভেঙ্গে পড়েছেন কবির সাহেব। যুক্তরাজ্যে অবস্থান করার প্রতিটি দিন আর মুহূর্তের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব চাচ্ছে ওরা। ওখানকার প্রতিটি বিক্ষোভ আর আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা ওদের দাবি। (শাহ মুয়াজ্জম: ১৯৭৫: ৮৬)

শাহ মুয়াজ্জম যোগ করিতেছেন: ‘জিজ্ঞাসাবাদ পর্বের শেষ দিন কবির সাহেব সেলে ফিরে এলে তাঁকে অত্যন্ত বিমর্ষ মনে হল। আমাদের প্রশ্নের জবাবে বললেন, সরকার তাঁকে যুক্তরাজ্যে ফেরত পাঠাবার পরিকল্পনা করেছে বলে তাঁর বিশ্বাস। বিদায় মুহূর্তে আইবি অফিসাররা ইঙ্গিত করে গেছে।’

এখানে শাহ সাহেবের মন্তব্যও প্রণিধান করিবার মত: ‘দীর্ঘ বারটি বৎসর প্রবাসে কাটিয়ে জন্মভূমির কোলে ফিরে এসেছে যে সন্তান দেশমাতৃকার সেবার শপথ নিয়ে, তারই বুঝি স্থান সংকুলান হচ্ছে না দেশের বুকে। দেশ এবং দেশের মানুষকে ভালবাসার জন্যই হয়ত কবির সাহেবকে দেশান্তরের গ্লানি বহন করতে হবে।’

শেষ পর্যন্ত আলমগীর কবিরকে অবশ্য যুক্তরাজ্যে ফিরিতে হয় নাই। একদিন ‘অপ্রত্যাশিতভাবে’ তাঁহার মুক্তির নির্দেশ আসিয়া হাজির। শাহ মুয়াজ্জমের মন্তব্য: ‘তাঁর জবানবন্দি হয়ত ওদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে অথবা ব্রিটিশ নাগরিক কবির সাহেবকে দীর্ঘদিন আটক করে রেখে দেওয়া হয়ত যুক্তিযুক্ত মনে করছে না [ওরা]।’

৩

১৯৭১ সালে আলমগীর কবির মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যুক্ত হইয়াছিলেন। যুদ্ধ চলাকালে— অন্যান্য দায়িত্বের মধ্যে— তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হইতে ইংরেজি ভাষায় তাঁহার নিজের রচিত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নিজের গলায় প্রচার করিতেন। পার্থক্যের মধ্যে, শুদ্ধ নিজের নামটাকে সামান্য ছদ্মবেশ— অর্থাৎ আহমেদ চৌধুরী— পরাইয়াছিলেন। এই সকল বেতার নিবন্ধ ১৯৮৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। (কবির ১৯৮৪) ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আলমগীর কবিরের কীর্তি চিরকাল কীর্তিত হইবে এই গ্রন্থে বিধৃত রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দৌলতে। আলমগীর কবির রচনা সংগ্রহের যে খণ্ডে এই গ্রন্থের বাংলা তর্জমা স্থান পাইতেছে তাহার ভূমিকা রচনার সৌভাগ্যও পরমেশ্বর আমাকে দান করিয়াছেন। সেই ভূমিকাযোগে আমি ১৯৭১ সালে আলমগীর কবির কি করিয়াছেন তাহার কিছু চুম্বক লিখিয়াছি। তাই এখানে পুথি ছোট রাখাই বিধেয় হইবে।

যুদ্ধের উপান্তে পৌঁছিয়া আলমগীর কবির বেতারভাষ্য প্রচারের মহান কর্তব্য পিছনে ফেলিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সহিত দেশের ভিতরে প্রবেশ করিয়াছিলেন। অগ্রজ সহকর্মী জহির রায়হানের সহিত আলমগীর কবিরের গভীর সখ্য জহিরের জীবনের শেষাংক পর্যন্ত অক্ষুণ্ন ছিল। তাঁহাদের দুই জনের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের কয়েক হাজার ফুট দলিলচিত্র গ্রহণ করা সম্ভবও হইয়াছিল। এই চিত্ররাজির একটা অংশ আলমগীর কবির নিজের ছবিতে কাজে খাটাইয়াছিলেন।

১৯৭১ সালের যুদ্ধের কাছে অনেক বেশি আশা করিয়াছিলেন আলমগীর কবির। এই যুদ্ধ কিন্তু তাঁহার অনেক আশাই পূরণ করে নাই। যুদ্ধের সময় প্রচারিত বেতার নিবন্ধযোগে কবির একদিন লিখিয়াছিলেন, ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষে জর্জরিত একটি শত্রুবাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ এই মুহূর্তে যে যুদ্ধে রত তাহাতে একদফা বড় ফল ফলিয়াছে— এই ফলের নাম ধর্মনিরপেক্ষতা।’ (কবির ১৯৮৪: ২৩)

আলমগীর কবিরের এই বিবৃতি মনে হইতেছে তাঁহার বাসনার প্রায় সমান সত্য ছিল। প্রমাণ একই নিবন্ধে যুক্তি প্রদর্শনের যে কোশেশ তিনি করিয়াছিলেন তাহাতেও মিলিবে। কবির চাহিতেন বাংলাদেশ হইতে যাহাকে বলে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ তাহা যেন একান্ত শুকাইয়া মরে।

কবির আশা করিয়াছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের মধ্যস্থতায় সমাজের ভিত্তিমূলে স্থাপিত অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের বেশির ভাগই লোপ পাইবে।’ কারণ তাঁহার ধারণা, ‘যে নতুন দেশের যাত্রা শুরু হইবে সে দেশে একমাত্র সামর্থ্য আর প্রয়োজন ছাড়া অর্থনৈতিক সম্পদ বণ্টনের অন্য কোন মাপকাঠি থাকিবে না। ২৫ মার্চের আগে যে যে ধর্মীয় পরিচয় বা সামাজিক কাঠামো বহাল ছিল নতুন রাষ্ট্রের গঠন প্রক্রিয়ায় তাহাদের কোনটাই আর পাত্তা পাইবে না।’ (কবির ১৯৮৪: ২৩-২৫)

আজ ভাবিতে একটু অবাকই লাগে— কি সরল বিশ্বাসেই না তিনি এই অবিশ্বাস্য কথাগুলি আওড়াইতেছিলেন। সাম্প্রদায়িকতার একটি প্রস্রবণ অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বে হইলেও হইতে পারে। কিন্তু তাহার শিরা-উপশিরা বা আকার-সাকার কোনটাই তিনি ধারণা করিতে পারেন নাই। আলমগীর কবির হয়ত ঠেকিয়া শিখিতেন। কিন্তু এয়ুরোপ সহায় হয় নাই— না কবিরের না সগিরের, অর্থাৎ আমাদের। সুপবন বাংলাদেশে আজও বহিতেছে না।

দেশ স্বাধীন হইবার পরও আলমগীর কবির সত্য সত্য— অন্তত কিছুদিন পর্যন্ত— এই রূঢ় সত্যটা ঠাহর করিয়া সারিতে পারেন নাই। তাঁহার বিপ্লবী কর্মচাঞ্চল্যে অবশ্য খানিক ভাটা পড়িয়াছিল ১৯৭১ সালের অনেক আগেই— ১৯৬৬ নাগাদ। ১৯৭১ সালের ক্রোড়ে দাঁড়াইয়া তো তাঁহার প্রায় বোধিলাভের উপক্রম!

১৯৭১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চিন বাংলাদেশ প্রশ্নে যে মূক-বধির ভূমিকায় অভিনয় করিতেছিল তাহাও কবিরের দুঃস্বপ্নদোষ কাটাইতে কিছু পরিমাণে সাহায্য করিয়াছিল বলিয়া মনে হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হইতে প্রচারিত রাজনৈতিক ভাষ্যে একদিন তিনি বলিতে বাধ্যই হইয়াছিলেন যে গণপ্রজাতন্ত্রী চিন সেদিন বিশ্ব সমাজতন্ত্রের সহিত নিছক বিশ্বাসহন্তা কিংবা আততায়ীর কাজ করিতেছে। ঐ বছর ৩০ নবেম্বর প্রচারিত বেতার নিবন্ধে আলমগীর কবির যাহা বলিয়াছিলেন তাহার সারাংশ আমি অন্য এক লেখাতেও উদ্ধার করিয়াছি। ঘটনাচক্রে ইহাই ছিল ঐ যাত্রায় কবিরের লেখা শেষ বেতার কথিকা। কবির সেদিন সত্যই কহিতেছিলেন:

২৫ মার্চের পর আজ পর্যন্ত চিন [বাংলাদেশের] মুক্তিবাহিনী কিংবা সাম্রাজ্যবাদের সমর্থনধন্য পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক সরকারের মুখোমুখি বাংলাদেশের জনগণের লড়াইয়ের বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করে নাই— কথাটা সত্য। ২৫ মার্চের পর ঘাতকচক্রের হাতে দেশটি একটা গুলিও তুলিয়া দেয় নাই— এ খবরও আমরা নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাইয়াছি। খুবই ভাল কথা। কিন্তু ইহা কি যথেষ্ট? যে দেশ বা রাষ্ট্র দাবি করিয়া থাকে তাহারা জাতীয় স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য সংগ্রামরত নির্যাতিত মানবজাতির পক্ষে প্রথম সারির সৈনিক সে দেশ বা রাষ্ট্রের এই কি যথার্থ ভূমিকা! (কবির ১৯৮৪: ১৮৪)

নিজের জিজ্ঞাসার উত্তর নিজের কাছেই লইয়াছিলেন আলমগীর কবির: ‘আমার তো মনে হয়, যথার্থ নহে।’

শুদ্ধ গণপ্রজাতন্ত্রী চিন কেন, বাংলাদেশের উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণিও যে মুক্তিযুদ্ধের সহিত সুকৌশলে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছে তাহার প্রমাণ আলমগীর কবির বেশিদিন না যাইতেই হাতেনাতে পাইলেন। ততদিনে চলচ্চিত্র ব্যবসায়ে নামিয়াছেন তিনি। যুদ্ধের সময় এবং যুদ্ধের পরপর মুক্তিযুদ্ধ লইয়া এ দেশে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হইয়াছিল। কিন্তু একসময় মুক্তিযুদ্ধ বিষয় করিয়া ছবি বানান বন্ধ হইয়া যায়। ‘আমাদের চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুতে এখন মুক্তিসংগ্রাম আগের মতন স্থান পাচ্ছে না। কেন পাচ্ছে না?’— এরকম একটা প্রশ্ন সেদিন পেশ করে জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘চিত্রালী’। উত্তর প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালের ২৭ মার্চ। জেনারেল জিয়াউর রহমান তখনো বাঁচিয়া আছেন।

‘চিত্রালী’র প্রশ্নের জবাবে কবির বলিতেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরপর মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করিয়া আট হইতে দশটি ছবি বানান হইয়াছিল। দুর্ভাগ্যের মধ্যে, তাহাদের মধ্যে অনেক ছবিতেই মুক্তিযুদ্ধ সার্থকভাবে উপস্থাপিত হয় নাই। যাহা করা হইয়াছিল তাহা অন্তত আলমগীর কবিরের অনুমোদন লাভ করে নাই। তাঁহার চোখ এড়ায় নাই যে এইসব ছবির মধ্যে ‘মুক্তিযুদ্ধকে উপস্থাপন করার চাইতে সে সময়কার একটি দুর্ঘটনাকে— আমাদের মা-বোনদের শ্লীলতাহানির বিষয়টিকে— বাণিজ্যিক উপাদান হিশেবে ব্যবহার করবার অপচেষ্টা করা হয়।’ (কবির ২০১৮: ২০১) ফলস্বরূপ এসব ছবি— অন্যান্যের মধ্যে— ব্যবসায়িক সফলতা অর্জন করিতেও ব্যর্থ হয়।

চিত্রনির্মাতাদের এই ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করিতেছিলেন কবির। তাঁহার মতে, ‘যেসব নির্মাতা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি করতে এগিয়ে এসেছিলেন তাঁদের প্রায় সকলেরই মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে ধারণা ছিল খুবই ভাসাভাসা। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধকে গভীরভাবে দেখতে পারেননি, কিংবা তাঁদের দেখবার ক্ষমতা ছিল না। আর এই অক্ষমতা নিয়ে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের একটি ব্যাপারকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেন।’ (কবির ২০১৮: ২০২)

জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তরে পত্রিকাকে আলমগীর কবির মাত্র তিনটি উদাহরণে সামাল দিয়াছিলেন। অন্য নিবন্ধে তিনি আরো উদাহরণ যোগান দিতে কসুর করেন নাই। ‘চিত্রালী’র প্রশ্নের উত্তরে তাঁহার উদাহরণ:

যেমন [আনন্দের] ‘বাঘা বাঙ্গালী’ (১৯৭২), যেমন মমতাজ আলীর ‘রক্তাক্ত বাংলা’ (১৯৭২)। [শেষোক্ত] ছবিটিতে তো [পরিচালক] একজন ধর্ষিতা রমণীর রক্ত দিয়ে বাংলাদেশের মানচিত্র এঁকে ফেলেন! এমনকি সুভাষ দত্ত যে ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ (১৯৭২) বানান, সেখানেও তিনি যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে একটি অপ্রধান সমস্যাকেই— বীরাঙ্গনাদের সন্তানকেই— প্রধান করে তুলে ধরেন।

এই ক্ষমাহীন বিশ্লেষণের হাত হইতে আলমগীর কবির নিজেকেও রেহাই দেন নাই। এই উদাহরণকে আমরা তাঁহার শৈল্পিক মহত্ত্ব ও বৈজ্ঞানিক সততার পরম প্রমাণ জ্ঞানে গ্রহণ না করি তো বড় অন্যায় করিব। তাঁহার ‘ধীরে বহে মেঘনা’ সম্পর্কে কবির বলিতেছিলেন, ‘আমার সামনে সমস্যা ছিল যে ছবি তৈরির আগে দীর্ঘদিন আমি সমালোচনা লিখেছি। সেসব সমালোচনায় আমি প্রচলিত যে ফর্মকে আঘাত করেছি, সেই ফর্মে আমার পক্ষে ছবি তৈরি সম্ভব ছিল না। তাই ‘ধীরে বহে মেঘনা’কে আমি সিনেমাটিক কোলাজ হিশেবে তৈরি করি। এ ছবির সমস্ত ঘটনাই ছিল বাস্তব থেকে নেয়া।’

তারপরও— কবির স্বীকার করিয়াছেন— ‘ধীরে বহে মেঘনা’ মুক্তিযুদ্ধের সার্থকনামা ছবি হয় নাই। প্রথমেই আত্মসমালোচনা করিয়া লইয়াছিলেন তিনি:

আমার মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল বলেই এ ছবিটি আমি বানাই। অথচ এর পরে আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আর কোন ছবি বানাইনি। আমি পরিষ্কার বলতে পারি, এর কারণ ছিল [আমি তখন] মুক্তিযুদ্ধকে ঠিক বুঝতে পারিনি। কেননা আমি জানতাম সত্য এক জিনিশ এবং বাস্তব আরেক জিনিশ। আমি বুঝতে পারিনি মুক্তিযুদ্ধে কে ভিলেন এবং কে নায়ক। আমি বুঝতে পারিনি কে দালাল এবং কে প্রকৃত মুক্তিকামী। তখন [স্বল্প] সময়ের ব্যবধানে আমি এসব বুঝতে পারিনি।

কবির সেদিন স্মরণ করিতেছিলেন, ‘পাঁচ বছর স্থায়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে একমাত্র সোবিয়েত ইউনিয়নে দুহাজার ছবি তৈরি হয়েছে। পশ্চিমে এ নিয়ে আরো অন্তত দুহাজার ছবি বানান হয়েছে।’ তাঁহার মতে, ‘বাংলাদেশের নয় মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে অন্তত পঞ্চাশটি ছবি তৈরি হওয়া উচিত।’ (কবির ২০১৮: ২০৩) অথচ তাঁহার অকপট বিচারে সেদিন— অর্থাৎ ১৯৮১— পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ লইয়া সার্থকনামা ছবি একটাও তৈয়ার হয় নাই।

হয় যে নাই এই সত্যে সন্দেহ ছিল না আলমগীর কবিরের। কিন্তু তিনি জানিতেন, ‘সত্য এক জিনিশ আর বাস্তব আরেক জিনিশ’। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠিবে, বাস্তব কোন পদার্থ। সেই প্রশ্নের উত্তরই কবির দিয়াছেন এই ভাষায়: ‘আমাদের এখানে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি তৈরি না হবার কারণ হচ্ছে, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন তাঁরা তা হূদয়ে অনুভব করেন না, আর যাঁরা অনুভব করেন তাঁরা মুক্তিযুদ্ধ সেভাবে দেখেননি।’ (কবির ২০১৮: ২০২-৩)

এই অভিযোগ কি সত্যসত্যই সত্য? আর সত্য যদি হয়ও তো তাহার কতখানি সত্য? প্রশ্নটি আমার মনেও উঠিয়াছে। তাই দেখিলাম, এই সাক্ষাত্কার বা নিবন্ধের গোটা পাঁচ-ছয় বছর পর— অনুমান ১৯৮৬ নাগাদ— মহান আহমদ ছফাও প্রায় একই কথা কহিতেছিলেন। আহমদ ছফার ব্যবসায় সাহিত্যের। তিনি এক সাংবাদিককে তখন মুখে মুখে বলিয়াছিলেন:

মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে লেখা সাহিত্যে যুদ্ধের জীবন অনুপস্থিত। আসলে যুদ্ধের শুরু কিভাবে, কারা ভারতে গেল, কিভাবে গেল, শরণার্থী শিবিরে কারা কিভাবে ছিল, কারা শরণার্থী শিবিরে ছিল না, কারা থিয়েটার রোডে ছিল কিংবা কারা ঘরে ফিরে এল, কারা ফিরতে পারল না— সেসব বিষয়ের দিকে দৃষ্টিপাত না করে একটা যুদ্ধ হয়ে গেছে মনে করে একটি কল্পনার নায়ক বানিয়ে পাকবাহিনীকে কষে গাল দিলে, দুয়েকজন ধর্ষিতা বোনের চিত্র অঙ্কন করলে, একটি যুদ্ধের সাহিত্য রচনা করা যায়— এরকম একটা অপচেষ্টায় আমাদের পেয়ে বসেছে। এই প্রবণতা সাহিত্যক্ষেত্রে আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে জানি না। (ছফা ১৯৮৬)

এক যুগ পরে— একেবারে ১৯৯৮ সালে পৌঁছিয়া— ছফা অধিক দৃঢ়তার সহিত লিখিয়াছেন, ‘অধিকাংশ লেখকই মুক্তিযুদ্ধের ওপর সাহিত্য রচনা করে একটা রিচুয়াল পালন করেছেন মাত্র। তার অধিক অগ্রসর হওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব হয়নি।’ (ছফা ১৯৯৮; সামান্য পরিমার্জিত) উদাহরণ: ‘মুক্তিযুদ্ধের বিবরণ দিতে গিয়ে তাঁরা এন্তার বীভৎস দৃশ্য রচনা করেছেন। দেখা যাবে পাকিস্তানি সৈন্যরা দেদার মানুষ খুন করছে এবং নারী ধর্ষণ করে চলেছে।’

ইহা কি সাহিত্য? নাকি ইহাতে মুক্তিযুদ্ধের সার্থক পরিচয় পাওয়া গিয়াছে? আহমদ ছফা লিখিয়াছেন:

পাকিস্তানি সৈন্য খুন কিংবা ধর্ষণ করেনি— ওটা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। অবশ্যই তারা খুন করেছে এবং ধর্ষণও করেছে। আমাদের কথা হল, খুন এবং ধর্ষণ মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র চিত্র নয়। এগুলো উপলক্ষ, মূল লক্ষ্য নয়। এগুলো এসেছে প্রসঙ্গক্রমে। একটি বিশাল জনগোষ্ঠী যে ইতিহাসে আত্মপরিচয় নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইছে সে জিনিশটিই উপেক্ষিত থেকে গেছে। সেই মহাবেদনা, মহা উল্লাস, মহা উত্থান এই সকল রচনাতে পরিদৃশ্যমান নয়। খুন এবং ধর্ষণ— এগুলোর প্রতি মানবসাধারণের মনে যে ঘৃণা কাজ করে সেই জায়গাটি স্পর্শ করাই যেন এই লোকদের আসল লক্ষ্য। খুন এবং ধর্ষণ নিশ্চয়ই জঘন্য ধরনের অপরাধ। কিন্তু তার বাইরে আরো অনেক ধরনের অপরাধ রয়েছে। খুনের সংখ্যাবৃদ্ধি দেখালে কিংবা ধর্ষণের বিবমিষা-সঞ্চারী চিত্র ভোঁতা কলমে আঁকলেই যে মুক্তিযুদ্ধের যথার্থ চিত্র দাঁড়িয়ে যায় সেটা মোটেই সত্যি নয়। (ছফা ১৯৯৮)

স্বাধীনতার দশ বছরের মাথায় ‘চিত্রালী’র সাক্ষাত্কারে বড় অসহায় আলমগীর কবির বলিতেছিলেন, ‘... এখন যদি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে ছবি করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরি, তাহলে সেটা দেখান সম্ভব হবে কিনা জানি না।’ সুতরাং তাঁহার সিদ্ধান্ত: ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন ছবি চিন্তা করা কঠিন।’ (কবির ২০১৮: ২০৩)

অথচ ১৯৭৭ সালে— মানে মাত্র চার বছর আগে— তিনি আরেকটি ভয়ের কথাও উচ্চারণ করিয়াছিলেন। দেশে ভাল গল্পের বা সাহিত্যের বড় অভাব, বড় টান পড়িয়াছে। তিনি বলিয়াছিলেন, ‘চলচ্চিত্রকার হিশেবে আমার করণীয় কি সে সম্বন্ধে আমার খুব একটা দ্বন্দ্ব নেই। চলচ্চিত্রে নতুন গল্প বলা আমার মতে চলচ্চিত্রকারের দায়িত্ব নয়। কারণ নতুন গল্পপ্লট আবিষ্কার করার দায়িত্ব লেখকের। চলচ্চিত্রকারের দায়িত্ব হল নতুন বা পুরনো যেকোন আখ্যানের নতুন সিনেমাটিক ট্রিটমেন্ট বা ইন্টারপ্রিটেশন সৃষ্টি করা।’ (কবির ২০১৮: ১২৭)

এতদিনে দেখিতেছি, কবিরের ভয়টা মোটেও অমূলক ছিল না। প্রমাণ নিচের গল্পেও পাওয়া যাইতেছে। এই মহান চলচ্চিত্রকারের অকালমৃত্যুর পদে পদে প্রায় আটাশ বছর পর দেশের ধনাঢ্য চিত্রব্যবসায়ীদের জনৈক প্রতিনিধি পুরানা কথাটা আবার প্রমাণ করিয়াছেন। বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মোগল’ এ কে এম জাহাঙ্গীর খান মহোদয় নতুন ছাড়পত্র দিয়াছেন:

আলমগীর কবির শিক্ষিত লোক। আমাদের দেশের সবচেয়ে নামকরা পরিচালক জহির রায়হানের তিনি সহকারী ছিলেন। সাংবাদিকও ছিলেন। এক্ষেত্রেও তাঁর ক্যারিয়ার আছে। লন্ডন থেকে বোধ হয় ফটোগ্রাফি ও ডিরেকশনের উপর পড়ালেখা করে এসেছিলেন, কিন্তু তিনি ফিল্ম ব্যবসা বুঝতে পারেননি। তাঁর কোন ছবিই ব্যবসা করেনি, কিন্তু তিনি সুনাম অর্জন করেছেন। (জাহাঙ্গীর ২০১৬; বানান সামান্য পরিমার্জিত)

খান মহোদয় অকপটে অধিক বলিয়াছেন: ‘চাষী নজরুল আমার পছন্দের পরিচালক। চাষী, আলমগীর কবির আর শিবলী সাদিককে ভাল ও গুণী পরিচালক বলে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছি। এফ কবীর, অশোক ঘোষ আর আজিজুর রহমান আমাকে পয়সা এনে দিয়েছেন। তাঁরা ডেডিকেটেড, দর্শকের চাহিদা বুঝতে পারতেন, ভাল গল্প বানাতে পারতেন।’

আলমগীর কবিরের দুইটি ছবির— ‘সূর্যকন্যা’ (১৯৭৬) আর ‘সীমানা পেরিয়ে’ (১৯৭৭)— প্রযোজক এ কে এম জাহাঙ্গীর খান তাঁহার অন্তিম শ্রদ্ধাটা নিবেদন করিলেন এইভাবে: ‘তিনি ভাল পরিচালক, যুগ যুগ ধরে— যতদিন আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প থাকবে— তাঁর ‘সূর্যকন্যা’, ‘সীমানা পেরিয়ে’ [টিকে থাকবে]। ২০-৩০ বছর পরও মনে হবে [এগুলো] নতুন ছবি, নতুন আঙ্গিকের ছবি।’

জাহাঙ্গীর খানের আক্ষেপ, আলমগীর কবিরের ‘সূর্যকন্যা’ বানাইয়া তিনি রংপুর হইতে মাত্র ছয় হাজার টাকা পাইয়াছিলেন। অথচ আর এক পরিচালক বাবদ তিনি একই রংপুর হইতে পাইয়াছিলেন তের লাখ। আর আর পরিচালকের কোন কোন ছবি হইতে আড়াই কোটি টাকা পর্যন্ত কামাইয়াছিলেন তিনি।

এই সমালোচনার জবাব আলমগীর কবির মনে হয় আগাম দিয়া গিয়াছিলেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে লেখা এক নিবন্ধ তাঁহার মৃত্যুর কিছুদিন পর— ২৯ জানুয়ারি ১৯৮৯— দৈনিক ‘সংবাদ’ পত্রিকায় প্রকাশ পায়। সেই নিবন্ধে কবির দেখাইয়াছিলেন, ‘বাণিজ্যিক ছবির নির্মাতা-দর্শকের যৌথ সহযোগিতায় রুচির ক্রমবর্ধমান অবক্ষয় নিশ্চিত করে সিনেমা আজ এ দেশে মূলত এক প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।’ (কবির ২০১৮: ১০৫)

ব্যাখ্যার অজুহাতে তিনি অধিক গিয়াছিলেন: ‘এ দেশে বলছি এজন্য যে পার্শ্ববর্তী ভারত, শ্রীলঙ্কা, এমনকি পাকিস্তানেও দর্শকের শ্রেণিচরিত্রে এমন ব্যাপক পরিবর্তন আসেনি— যদিও বাংলাদেশের বিনোদন ছবির ধরন-ধারণ, চলন-বলন ও অন্যান্য চুটকি উপকরণ প্রধানত “বোম্বে”, কোন সময় “হীরামন্ডি” সংস্কৃতিনির্ভর পাকিস্তানি ছবি থেকে ধার করা।’

১৯৮৯ সনে কবির আরো দেখিয়াছিলেন ঢাকা শহরের অভিজাত পাড়া গুলশানের সিনেমা হলে ঐ মহল্লার খানদানি কোন বাসিন্দা ছবি দেখার কষ্টটা স্বীকার করেন না। লেখাটা শুরু হইয়াছে এইভাবে:

ঢাকার গুলশান মডেল টাউন অভিজাত পাড়া। দেশি উচ্চবিত্ত, বিদেশি দীর্ঘমেয়াদি আগন্তুক এবং অধিকাংশ কূটনৈতিক দূতাবাস ও কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা। তদানীন্তন ঢাকা উন্নয়ন সংস্থার পরিকল্পনামাফিক গুলশানের বাসিন্দাদের উপযোগী বিপণিকেন্দ্র, পার্ক, কৃত্রিম হ্রদ, আন্তর্জাতিক রেস্তোরাঁসহ এলাকার উপযুক্ত স্থানে একটি সিনেমা হলেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোন পর্যবেক্ষক যদি একদিন এই সিনেমাটির শো ভাঙার সময় উপস্থিত থাকেন তাহলে একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা লক্ষ্য করবেন। দেখবেন শতকরা প্রায় একশ জন দর্শকই লুঙ্গির উপরে রং-বেরঙের হাওয়াই শার্ট পরিহিত। পা খালি অথবা প্লাস্টিক স্যান্ডেলে আবৃত। এদের সবার বসবাস গুলশান এলাকাবহির্ভূত পার্শ্ববর্তী গ্রামসমূহে। (কবির ২০১৮: ১০৪-৫)

আলমগীর কবির আরো লিখিতেছিলেন, ‘এখানে প্রতি সপ্তাহে যেসব ছবি দেখান হয় সেগুলো শৈল্পিক মান বিবর্জিত তথাকথিত বাণিজ্যিক বায়স্কোপ। সুতরাং গুলশানবাসীদের এই হলে এসে ছবি দেখার কোন কারণ নেই।’ তিনি প্রশ্ন তুলিয়াছিলেন— কেন এমন হইল?

তাঁহার বিচারে প্রথম প্রথম— অর্থাত্ সেই ১৯৩০ সালের দশকে— বাংলা চলচ্চিত্র ছিল ‘ভীষণ রকমের জনপ্রিয় নভেল, গল্প ও নাটকনির্ভর’। কবিরের মতে,

বাংলা ছবির এই বিশেষ চরিত্রটি এর মূল দর্শকশ্রেণির চরিত্র নির্ধারণে সহায়তা করেছিল। শিক্ষিত বাঙ্গালি মাত্রেই ছিলেন সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক এবং তদানীন্তন আর্থসামাজিক কারণে এঁদের অধিকাংশই ছিলেন সকল স্তরের মধ্যবিত্ত [শ্রেণি থেকে] উদ্ভূত। এঁরাই হলেন বাংলা ছবির মূল দর্শক। বাংলা উপন্যাসের আবেদন কদাচিত্ নিম্নবিত্তকে আকর্ষণ করত। এ কারণেই বাংলা ছবির দর্শকের মধ্যে নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীর সংখ্যা ছিল নিতান্ত নগণ্য। কিন্তু তাঁরাও ছবি দেখতেন এবং বিপুল সংখ্যায়— বাংলা ছবি নয়, সুদূর বোম্বে বা লাহোরে নির্মিত ‘সর্বভারতীয়’ হিন্দি উদ্ভট ছবি, যেমন ‘হান্টারওয়ালি’ (১৯৩৫), ‘তুফান মেইল’ (১৯৩৪), ‘পাঞ্জাব মেইল’ (১৯৩৯), ‘শেখ চিল্লি’ (১৯৩০) প্রভৃতি। (কবির ২০১৮: ১০৬)

আলমগীর কবির লিখিয়াছেন, ‘কালে হিন্দি ছবির প্রভাব এমনই বৃদ্ধি পায় যে শিক্ষিত বাঙ্গালি দর্শকও প্রভাবিত হয়ে পড়েন। তবুও মধ্যবিত্ত [শ্রেণি] বাংলা ছবি এবং সামাজিক আখ্যানভিত্তিক হিন্দি ছবির প্রধান নিয়মিত দর্শক হিশেবে থেকে যায়।’ সে সময় এই দেশে যে সকল ছবি বাজারে চলিতেছিল তাহাদের বিষয়ে কবিরের মন্তব্যও মনোসংযোগ করিবার জিনিশ: ‘নিম্নরুচির বাণিজ্যিক ছবিতে যাঁরা অর্থলগ্নি করেন বা যাঁরা এসব ছবির নিয়মিত প্রদর্শক তাঁরা কঠিন ব্যবসায়ী।’

এইসব ছবির একটা রাজনৈতিক তাত্পর্যও আলমগীর কবির আবিষ্কার করিয়াছিলেন। তিনি লিখিয়াছিলেন, ‘এইসব জৈবিক বিনোদনসর্বস্ব ছবির একটা রাজনৈতিক দিকও আছে। সার্বিক নৈরাজ্য এবং হতাশার প্রেক্ষাপটে এ জাতীয় ছবি গণ-আফিমের কাজ করে। তাই প্রত্যেক গণবিরোধী সরকার এসব ছবিকে রাজনৈতিক দোসর ভেবে পর্যাপ্ত নির্মাণ ও প্রচারের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে।’ (কবির ২০১৮: ১০৭)

বিশ্ব জুড়িয়া চলচ্চিত্র ব্যবসায়ের শতবর্ষ পূর্তির মাত্র কয়েক বছর আগে আলমগীর কবির এই দেশের ছবি লইয়া অপার বেদনায় মূঢ় হইয়াছিলেন:

চলচ্চিত্রের সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো আর ফিরবে না। বিভাগোত্তর ওপার বাংলায় চলচ্চিত্রের মাধ্যমগত উত্কর্ষ উন্নতির চরমে পৌঁঁছাচ্ছে। এসেছেন সত্যজিত্, ঋত্বিক, মৃণাল, বুদ্ধদেব, উত্পলেন্দু বা অপর্ণার মত দীপ্তবীর্য চলচ্চিত্রস্রষ্টা। এপার বাংলায় একই স্টার্টিং পয়েন্ট থেকে আমরা দৌড়েছি বিপরীত দিকে: সাহিত্য থেকে লোকসাহিত্যে, সেখান থেকে অন্ধকারাচ্ছন্ন শূন্যতায়।

এই অবস্থা হইতে রাতারাতি পরিত্রাণের পথ আলমগীর কবির বাতলাইতে পারেন নাই। তিনি শুদ্ধ আশা প্রকাশ করিয়াছিলেন, ‘দেশ বঙ্গোপসাগরে ভেসে না গেলে সুবাতাস একদিন নিশ্চয়ই বইবে।’ (কবির ২০১৮: ১০৮)

আলমগীর কবিরের গোড়ায়ও আছে এদেশের নতুন কুশীলব শ্রেণির চরিত্র বিচারের অভিন্ন তাগিদ। এই চরিত্র নিছক পরিবেশ বা বংশগতির ফসল— এমন মনে করা ঠিক হইবে না। চরিত্রের পিছনেও ইতিহাস আছে।

 

৪

এই মহান মানুষটির লেখা এতগুলি প্রবন্ধ-নিবন্ধ আর বক্তৃতা-বিবৃতি এতদিন লোকচক্ষুর আড়ালে চলিয়া গিয়াছিল। অর্থাত্— আমাদের এই দুর্ভাগা দেশে যাহা হয়— হারাইয়া যাইতে বসিয়াছিল। কয়েকজন নবীন সাধক এই লেখাগুলি কোন প্রতিষ্ঠান বা অনুষ্ঠানের সহায়তা ছাড়াই— ভালবাসা সম্বল— এক জায়গায় করিয়াছেন। আমাদের জাতীয় সাহিত্য এই বাবদ তাঁহাদের অধমর্ণ হইয়া রহিল। যতদূর জানিতে পারিয়াছি, এই নবীন সম্পাদকদের কেহই আলমগীর কবিরকে চামড়ার চোখে কদাচ দেখিতে পান নাই। কাদম্বিনী যেমন একদিন মরিয়া প্রমাণ করিয়াছিলেন তিনি এতদিন মরেন নাই, এই নবীনেরাও তেমনি এতক্ষণে প্রমাণ করিলেন আমরা যাঁহারা আলমগীর কবিরের পায়ের নিচে দাঁড়াইয়া চলচ্চিত্র ব্যবসায়ে হাত মকশো করিয়াছিলাম তাঁহারা নিজেদের যথাকর্তব্য সম্পাদন করি নাই— শোধ করি নাই নিজ নিজ দায়।

অধুনা লোকান্তরিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্যা অধ্যাপিকা নীলিমা ইব্রাহিম ছিলেন আলমগীর কবিরের আত্মীয়া— তাঁহার শ্বশ্রুমাতা, তাঁহার প্রথম স্ত্রীর জননী। তিনি কবিরকে ভোলেন নাই। তাঁহার আত্মজীবনীর এক খণ্ডের নাম ‘বিন্দু-বিসর্গ’। এই খণ্ডে তিনি অন্যান্যের মধ্যে আলমগীর কবিরের কথাও লিখিয়াছেন। তাহা এইখানে আর তুলিব না। তবে অন্য এক অছিলায় তিনি যাহা লিখিয়াছিলেন তাহা দেখি আলমগীর কবিরের বেলায়ও দিব্য খাটিতেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই যখন— ১৯৬৯ সালে— অকালে লোকান্তরিত হন তখন তাঁহারও বয়স পঞ্চাশ বছরের বেশি হয় নাই। বলা হইয়াছিল, তিনি রেলওয়ে দুর্ঘটনার কোপে পড়িয়া প্রাণ হারাইয়াছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হইবার পর লোকে তাঁহাকেও একপ্রকার ভুলিয়া গিয়াছিল। ১৯৯১ সালের দিকে নীলিমা ইব্রাহিম সেই দুঃখের কথা স্মরণ করিয়া লিখিয়াছেন:

বাংলা বিভাগ আজ অন্তত সর্বাধিক জনাকীর্ণ বিভাগ। কিন্তু এই বিভাগটিকে সুষ্ঠু সুন্দর করে গড়ে তুলেছিলেন মুহম্মদ আবদুল হাই। তখন বাংলা ভাষার কথা বললে ধর্মদ্রোহী হতে হতো, বিশেষ দেশের চর বলা হতো। কিন্তু এই নিষ্ঠাবান সাধক না থাকলে আজকের ভাষা ইনস্টিটিউটের জন্ম হতো কিনা জানি না। দুঃখ, না মানুষ না পণ্ডিত কোনভাবেই তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন হল না— হবার সম্ভাবনাও আর আছে বলে মনে হয় না। (নীলিমা ২০১৪: ৮৮; বানান সামান্য পরিমার্জিত)

নীলিমা ইব্রাহিম প্রবল খেদের সহিত যোগ করিয়াছেন, ‘কারণ বর্তমান কালে স্ব স্ব মূল্যায়নের ব্যবস্থা নিজের বা নিজের গোষ্ঠীকে দিয়ে করাতে হয়। আত্মীয়-বন্ধু দিয়ে গণসংবর্ধনার ব্যবস্থাও করা হয়ে থাকে। তবে মহাকাল নীরবে কাজ করে যায়। হয়ত একদিন আসবে যেদিন অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই যথাযোগ্য মর্যাদা পাবেন।’

মুহম্মদ আবদুল হাই তাঁহার ‘যথাযোগ্য মর্যাদা’ পাইয়াছেন কিনা বলিবার যোগ্যতা আমার নাই। তবে সাহস করিয়া বলিতে ইচ্ছা করে— আলমগীর কবিরের বহুল প্রতীক্ষিত সেই ‘একদিন’ হয়ত আজই আসিতে শুরু করিয়াছে। ‘আলমগীর কবির রচনা সংগ্রহে’র প্রথম খণ্ড তাহারই সুবেহ সাদেক কিনা আমার ভ্রম হইতেছে। আলমগীর কবির বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই সমান লিখিতেন। প্রার্থনা করি, তাঁহার সকল রচনাই একদিন সর্বসাধারণের অধিগম্য হয়।

আগেই বলিয়াছি ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হইতে তিনি ইংরেজিতে যে সকল রাজনৈতিক ভাষ্য প্রচার করিতেন তাহার সংগ্রহ তাঁহার জীবত্কালেই প্রকাশিত হইয়াছিল। সম্প্রতি ঐ বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণও মুদ্রিত হইয়াছে। বক্ষ্যমাণ রচনা সংগ্রহ সম্পাদকদের মধ্যে কয়েকজন ঐ পুস্তকের বাংলা তর্জমাও সম্পন্ন করিয়াছেন। আশা করি ঐ কেতাবটিও অধিক বিলম্ব না করিয়া পাঠিকাদের হাতে পৌঁছিবে।

আলমগীর কবিরের একটি উক্তি এই লেখায় আমি গোটা দুইবার উল্লেখ করিয়াছি। আরো একবার না আওড়াইলে দেখি এই ভূমিকা শেষ হইতেছে না। কবির মুক্তিযুদ্ধে শরিক হইয়াছিলেন যাহাকে আমরা বলিয়াছি ‘দেশবাত্সল্য’ তাহার প্রকোপে। তাহাতে ‘বিপ্লবী কর্মচাঞ্চল্যে’র অভিঘাতও কিছু পরিমাণে লুকাইয়া ছিল— এ সত্যেও সংশয় নাই। দেশ স্বাধীন হইবার পর তিনি চলচ্চিত্র ব্যবসায়ে যোগ হইলেন। এই ব্যবসায়ে জড়াইয়া— যাহাকে বলে ঠেকিয়া শিখিয়া— তিনি নিজেকে নিজে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করিতে লাগিলেন, দেশটি স্বাধীন সত্যসত্যই হইয়াছে তো? নতুবা তিনি কেন বলিতে যাইবেন ‘[আমি তখন] মুক্তিযুদ্ধকে ঠিক বুঝতে পারিনি’?

আলমগীর কবির মিছামিছিই কহিতেছিলেন তিনি মুক্তিযুদ্ধকে ঠিক বুঝিতে পারেন নাই— এমন ধরিয়া লইলেই আমরা সমস্যার একটি সহজ সমাধান পাইতে পারি। কিন্তু তাঁহার গোটা জীবনের বাসনার সহিত এমন মিছা সহজে যায় না। আর যদি কথাটা একান্ত মিছা হইয়াও থাকে, তিনি তো আর কাহাকেও ঠকাইবার লোভে এহেন মিছার ফাঁদ পাতিতেছেন না— নিজেকেই নিজে বুঝাইতেছেন মাত্র তিনি।

এক্ষণে মনে হয় গ্রিক মহাত্মা জেনোর গল্পটার আশ্রয় লইতে হইবে আমাদের। ক্রিটদ্বীপ হইতে আথেন্সে আগত ভদ্রলোকটি যেদিন বলিলেন, ‘আমি মিছা কহিতেছি’— সেদিন সত্যসত্য তিনি কি কহিতেছিলেন? যদি তিনি সত্যসত্য মিছাই কহিতেন তো তাহার ‘আমি মিছা কহিতেছি’ কথাটাও মিছা হইত— মানে আমরা বুঝিতাম তিনি মিছা কহিতেছেন না। আর তিনি যদি মিছা না কহিতেছেন তো তাহার ‘আমি মিছা কহিতেছি’ কথাটাও মিছা নহে— মানে তিনি শেষ পর্যন্ত মিছাই কহিতেছেন।

এই কথার উপর ফরাশিদেশের মহাত্মা জাক লাকাঁ একদা একটি মন্তব্য করিয়াছিলেন। তিনি কহিয়াছিলেন সমস্যার সমাধান একটাই। লোকটি আসলে একজন মাত্র নহেন; তাঁহাকে দুই ভাগ করিয়া লইলে সমস্যার একটা সহজ সমাধান মিলিবে। ‘আমি মিছা কহিতেছি’ কথাটার অন্দরে বক্তা দুই জন— একজন সজ্ঞান, আরজন অজ্ঞান। যিনি সজ্ঞান তিনি কহিতেছেন ডাহা মিছা কথা। আর যিনি অজ্ঞান তিনি মোটেও মিছা কহিতেছেন না। (রোজ ২০০৭: ১৫৩; লাকাঁ ২০০৬: ২৩২-৩৩)

আলমগীর কবির যখন বলিতেছিলেন মুক্তিযুদ্ধকে তিনি বুঝিতে পারেন নাই তখন তিনি সজ্ঞান— মুক্তিযুদ্ধকে তিনি সত্যসত্যই বুঝিতে পারেন নাই। আর তাঁহার ভিতরে যে বক্তা অজ্ঞান তিনি এই যুদ্ধকে সত্যসত্যই বুঝিতে পারিয়াছিলেন।

 

দোহাই

১ আলমগীর কবির, চলচ্চিত্র ও জাতীয় মুক্তি, আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান ও প্রিয়ম প্রীতিম পাল সম্পাদিত, আলমগীর কবির রচনা সংগ্রহ, ১ম খণ্ড (ঢাকা: আগামী প্রকাশনী ও মধুপোক, ২০১৮); বর্তমান গ্রন্থ।

২ আহমদ ছফা, ‘মুক্তিযুদ্ধের ওপর তেমন কোন উল্লেখযোগ্য বিশুদ্ধ বই আমি দেখিনি,’ সচিত্র স্বদেশ, ১৯৮৬ (আনুমানিক), পৃ. ৫৩।

৩ আহমদ ছফা, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের সাহিত্য: অপূর্ণতার দিক,’ মানবজমিন, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯৮।

৪ এ কে এম জাহাঙ্গীর খান, ‘ফিল্ম সেক্টরটি হলো ভাগ্য,’ সাক্ষাত্কার গ্রহণ: ওমর শাহেদ, কালের কণ্ঠ, ২৫ নবেম্বর ২০১৬।

৫ নীলিমা ইব্রাহিম, বিন্দু-বিসর্গ, ৩য় মুদ্রণ (ঢাকা: সাহিত্য বিলাস, ২০১৪)।

৬ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতা সংগ্রহ— ভূমিকা,’ বঙ্কিম রচনাবলী, যোগেশচন্দ্র বাগল সম্পাদিত, ২য় খণ্ড, ১৪শ মুদ্রণ (কলিকাতা: সাহিত্য সংসদ, ১৪০৯), পৃ. ৭৬২-৮৬।

৭ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গীতবিতান, পুনর্মুদ্রণ (কলিকাতা: বিশ্বভারতী, ১৪০৪)।

৮ শাহ মুয়াজ্জম হোসেন, নিত্য-কারাগারে (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৭৫)।

৯ শেখ মুজিবুর রহমান, কারাগারের রোজনামচা (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০১৭)।

১০ Alamgir Kabir, This was Radio Bangladesh 1971 (Dacca: Bangla Academy, 1984).

১১     Jacqueline Rose, The Question of Zion, 3rd print (Princeton, NJ: Princeton University Press, 2007).

১২ Jacques Lacan, ‘The Function and Field of Speech and Language in Psychoanalysis,’ Écrits, trans. Bruce Fink (New York: W W Norton, 2006), pp. 197-268.