মার্কিন কবির যশোর রোড ও শরনার্থী শিবির পরিদর্শনের নতুন ভাষ্য

তাদের ট্যাক্সির হালকা ঝাঁকুনি খাওয়ার শব্দ পাশ কাটিয়ে যেতে চাওয়া একটা ডিজেলচালিত ট্রাকের গর্জনে চাপা পড়ে গেল। সেখানে একটা পাখির চিড়িয়াখানা আছে। কেউ মন খারাপ করা বুনো রাজহংসীর মতো ডাকছে, কেউবা মৃদু কিচিরমিচির করছে, কেউবা ডাকছে অ্যাজমাক্রান্ত খচ্চরের মতো। শোনা যাচ্ছিল বাইসাইকেলের বেলের আওয়াজ, আর রিকশার ঘণ্টার ফাঁপা শব্দ। ক্যাসেট রেকর্ডারটিতে শিশুদের সবিরাম কণ্ঠস্বরও রেকর্ড হচ্ছে, কিন্তু নানা কর্কশ শব্দ সেগুলোকে গিলে খাচ্ছিল। তবে শুধু টেপের রেকর্ড নিজেই তো আর সব বর্ণনা করতে পারে না, তাই বিরতিতে অ্যালেন গিনসবার্গের কণ্ঠ পরিস্থিতির বিবরণ দিচ্ছিল। হঠাৎই ট্যাক্সির ঝাঁকুনি বন্ধ হয়ে গেল। গিনসবার্গের বিবরণীও থেমে গেল। এরপর গাড়ির দরজা খোলা ও বন্ধ হওয়ার শব্দ। বাইকের শব্দ হচ্ছিল আরো দূরে। পানি রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

কেউ একজন বলে উঠল, ‘যত দূর সম্ভব আমরা যাব।’

১৯৭১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর, অ্যালেন গিনসবার্গ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী উদ্বাস্তু শিবিরগুলো পরিদর্শন করতে কলকাতা থেকে যশোর রোডে বেরিয়ে পড়েন। রবি শঙ্কর ও আলী আকবর খান এক বছর আগে জর্জ হ্যারিসনকে একটা কনসার্টের আয়োজন করতে বলেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের সাইক্লোনে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করতে। হিসাবমতে, ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বরের সাইক্লোনে পাঁচ লাখ মানুষ বঙ্গোপসাগরে ভেসে গিয়েছিল। এ প্লাবনের পর এক হাজার মাইল দূরের পশ্চিম পাকিস্তান প্রশাসন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের দুর্দশা লাঘবে তেমন কিছুই করেনি। এর ঠিক ছয় মাসেরও কম সময়ে রক্তপাতময় স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। প্লাবনের পাঁচ মাস পর নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্মের ঘোষণা দেয়া হয়, তখন উন্মত্ত যুদ্ধ চলছে, নদীতে পানি বাড়ছে এবং আবারো পশ্চিম বাংলায় উদ্বাস্তুদের ঢল নামল। উদ্বাস্তু শিবিরগুলোর ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে গেল। সীমান্ত পার হতে অনেক পরিবারকে সপ্তাহখানেক ধরে হাঁটতে হয়েছে; পথে খাবার, শৌচাগার, ওষুধপত্র ও টাকার অভাবে অনেকেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।

দ্য লিভিং থিয়েটার কলকাতায় নতুন একটি কোম্পানি চালু করেছিল। তারা এ কোম্পানির উদ্বোধন উপলক্ষে উদ্বাস্তুদের সহায়তায় কিছু করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাই তারা বাংলার বাউলদের সামনে নিয়ে এল। বব ডিলানের ম্যানেজার ও অ্যালবার্ট গ্রসম্যানের মাধ্যমে অ্যালেন গিনসবার্গ বাউলদের আমেরিকায় পরিচিত করিয়ে দিয়েছিলেন। রোলিং স্টোনের রবার্ট ফ্রেজার তাকে বিমানের টিকিট পাঠিয়ে দিলেন। ‘তুমি তো রবার্ট ফ্রেজারকে চেনো, চেনো না?’— অ্যালেনের বন্ধু ঔপন্যাসিক উইলিয়াম বারোজ লিখলেন। এবং তাকেও যেতে বলা হয়েছে, বারোজ জানালেন, কিন্তু দুর্ভাগ্য, অ্যালেনের যাত্রার ১০ দিন আগেও টিকিট পেলেন না বারোজ। ‘আমি শুনেছি যে, আমাদের আরেক বন্ধু চিত্রশিল্পী কেইথ হ্যারিং নিশ্চিতভাবে যাচ্ছে’— বারোজ জানাল। কনসার্ট ফর বাংলাদেশের সাফল্যে অভিভূত রোলিং স্টোনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য জান ওয়েনারও যাওয়ার জন্য আগ্রহী ছিলেন।

অ্যালেন গিনসবার্গ সুহূদ ফ্রেজারের কাছে জানতে চাইলেন যে, সেখানে (কলকাতায়) গিয়ে তার কী করা উচিত। ফ্রেজারের জবাব ছিল, যা ইচ্ছে তাই।

শেষমেশ বারোজের মনে হলো, কলকাতায় এক সপ্তাহ সফরের জন্য এত টাকা ঢেলে দেয়া ঠিক হবে না। তাছাড়া তিনি তার সিনেমা দ্য নেকেড লাঞ্চ নিয়েও খুব ব্যস্ত ছিলেন। মদ্যপানে দুই বছর আগে তাদের পরম বন্ধু কবি ও ঔপন্যাসিক জ্যাক কেরুয়াক পৃথিবী ছেড়েছেন। অ্যালেন তরুণ কবি বন্ধু গ্রেগরি করসোকে মাত্রই চেলসিয়া হোটেল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। চেরি ভ্যালিতে অ্যালেনের খামারে তার দীর্ঘদিনের বন্ধু-পার্টনার কবি চলচ্চিত্র নির্মাতা পিটার অরলোভস্কিকে ব্যস্ত শসা চাষে। গত শীতে তারা ১৮৮ বোতল পিকল তৈরি করেছে। তাই শেষ পর্যন্ত কলকাতার প্লেন ধরলেন শুধু অ্যালেনই, সঙ্গে তার নোটবুক ও ডিলানের দেয়া শৌখিন টেপ রেকর্ডার। এর বাইরে একটা হারমোনিয়াম কেনারও ইচ্ছে ছিল তার। আরো ইচ্ছা ছিল একটা খাদির শার্ট বানানোর, পিটারের জন্য লুঙ্গি কেনা ও বেনারস থেকে শিবের একটা ত্রিশূল সংগ্রহ করা। অনেক ভক্তিমূলক সংগীত সংগ্রহের পরিকল্পনাও করছিলেন অ্যালেন। এর আগে থেকেই পড়ার সময় নিয়মিত, এমনকি পেন্টাগনের সামনে বিক্ষোভেও তিনি কীর্তন, ভজন গাইতেন এবং হরে কৃষ্ণ জপতেন। তিনি তার এ জপ দিয়ে বন্ধুদের বিস্মিত করেছিলেন। ১৯৬৮ সালে শিকাগো দাঙ্গার সময় সবাইকে শান্ত করার জন্য তিনি ৭ ঘণ্টা ‘ওম’ জপেছিলেন। তখন একজন ভারতীয় তাকে একটি নোট পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন যে, তার উচ্চারণ ভুল হচ্ছে। তাই তার এ ভুল সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত এবং অতি অবশ্যই তার একবার নিমতলা শ্মশান ঘাট পরিদর্শন করা উচিত।

ধানক্ষেতে ঘেরা দমদম বিমানবন্দরে অবতরণের পরই অ্যালেনের মনে পিটারের স্মৃতি উঁকি দিল। অ্যালেনের চোখে তখনো তরুণ পিটারের ছবি ভেসে উঠছে; গোসল সেরে ভেজা সোনালি চুল কাঁধে ফেলে পিটার ফিরছে, কলকাতার গরমে দরদর করে ঘামছে। নস্টালজিয়ার তোড়ে ভেসে গেলেন অ্যালেন।

নিজেকেই প্রশ্ন করলেন, ‘সে কতকাল আগের কথা?’

পশ্চিম বাংলার সীমান্তবর্তী শহর বনগাঁও থেকে রামকৃষ্ণ মিশনের অফিস মাত্র ১০ কিলোমিটারের পথ। মিশনের প্রবেশপথে অ্যালেনকে স্বাগত জানালেন একজন আমলা। এ আমলা অ্যালেনকে আশ্বস্ত করলেন যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। ক্যাসেট রেকর্ডারটা চালু করে দেয়া হলো।

‘এ মানুষেরা বন্যাকে ভয় করে না। কারণ বাংলাদেশ পানির উৎস দিয়ে পূর্ণ।’

অ্যালেন বলল, ‘যেখান থেকে খাবার বিতরণ করা হয়, আমি সেই জায়গাটা দেখতে চাই।’

‘আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? অনুগ্রহ করে বসুন।’

‘আমি খাবার বিতরণের জায়গাটা দেখতে চাই।’

‘খাবার বিতরণ হচ্ছে? সাধারণত শুধু বৃহস্পতিবারেই দুর্দশাগ্রস্তদের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়। তাই আজ খাবার বিতরণ দেখা সম্ভব নয়।’

‘আচ্ছা।’

‘শুধু বৃহস্পতিবার। সপ্তাহে একদিন। সপ্তাহে শুধু একদিনই রেশন বিতরণ করা হয়। আর সেটা হলো বৃহস্পতিবার। আর তাই আপনি আজ ছবি পাচ্ছেন না।’

‘ঠিক আছে। আমি দেখব সেখানে কী হয়।’

‘আর কী সাহায্য করতে পারি?’

‘আমি আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে চাই না।’

‘স্থানীয়ভাবে পরিচালিত আরেকটি কমিটি আছে। নতুন আসাদের, যেমন আজ যারা পৌঁছছেন, তাদের চাল সরবরাহ করছে। তারা মেডিকেল বোর্ডের সামনে দাঁড়াচ্ছে।’

‘আমরা দেখেছি।’

‘আপনি দেখেছেন? তারা স্লিপ ইস্যু করছে এবং সেই স্লিপের ভিত্তিতে স্থানীয় কমিটি চাল বিতরণ করছে ইত্যাদি ইত্যাদি। আপনি সেটাও দেখেছেন? তাহলে আর দেখার কিছু বাকি নেই।’

‘রাস্তার পাশে এমন আর কতগুলো ক্যাম্প আছে?’

‘অনেক ক্যাম্প আছে। অনেক।’

‘ক্যাম্পগুলোর অবস্থা কী?’

‘সব ক্যাম্পই বন্যা উপদ্রুত।’

‘আর মানুষ?’

‘নাহ্! ত্রাণ দেয়া হচ্ছে, মানুষেরা সহায়তা পাচ্ছে। আমরা মাঝে মধ্যেই সেখানে ত্রাণ বিতরণ করতে যাই।’

‘সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। গুড লাক। নমস্কার।’

‘নমস্কার।’

আমলাটি একটু ঝুঁকে সুনীলকে জিজ্ঞেস করলেন যে, মানুষটি কোন দেশ থেকে এসেছে।

‘আমেরিকা’— সুনীল জবাব দিলেন।

ঠিক। ঠিক আছে।

এসবই শুরু হয়েছিল যখন অ্যালেন গিনসবার্গ কলকাতায় বসবাস শুরু করলেন। ১৯৬৩ সালের জুলাইয়ে এশিয়া ফাউন্ডেশন পল এঙ্গেলের কাছে ১ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার পাঠাল। অর্থটি ছিল একজন নতুন বাঙালি লেখকের জন্য এক বছরের ফেলোশিপের ব্যয় মেটানোর খরচ। এঙ্গেল বেশ উত্তেজনা নিয়ে ব্যাখ্যা করলেন যে, তিনি কলকাতার তরুণ কবিদের নেতাকে বাছাই করেছেন। ‘সে হ্যাংরি জেনারেশন নামে একটি দলের নেতা। হ্যাংরি নামের কারণ তারা একই সঙ্গে ক্ষুধার্ত (হাংরি) ও বিক্ষুব্ধ (অ্যাংরি)।’ মলয় রায় চৌধুরী তার দলের এ নামকে সামনে রেখেই কাজ করছিলেন।

কিন্তু এঙ্গেলের বাছাই ও বোঝাপড়ার বিপরীতে হাংরি বা হ্যাংরি জেনারেশনের সঙ্গে সুনীলের কোনো সম্পর্ক ছিল না। ফেলোশিপ নিয়ে তিনি প্রতারিত হয়েছেন, এমন ধারণা থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায় বিমানবন্দরে সুনীলকে বিদায় জানাতে এলেন না। ১৯৬৩ সালের মধ্য সেপ্টেম্বরে সুনীল যখন দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন অ্যালেন গিনসবার্গ বন্ধু পিটার অরলোভস্কি কলকাতায় এলেন সুনীলকে বিদায় জানাতে। অ্যালেন পিটারকে সুনীলের সঙ্গে একই বিমানে নিউইয়র্কে ফেরার টিকিটের টাকা পাঠাতে চাইলেও পিটার রাজি হলেন না, উল্টো তিনি নিউইয়র্কে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেন ঠিক, তবে সেটা একা একা সড়কপথে; পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ তারপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র— এই ছিল তখন পিটারের পরিকল্পনা। প্রচণ্ড হতাশায় বিক্ষিপ্ত সুনীল লিখলেন অ্যালেনকে, ‘এটা আমার কাছে অকল্পনীয়।’ যে রাতে পিটার চলে যান, সে রাতে সুনীল কেঁদেছিলেন, যতটা পিটারের জন্য ততটা নিজের আসন্ন নিরানন্দ যাত্রার কথা ভেবে। অ্যালেনের কাছে সুনীলের স্বীকারোক্তি, ‘আমি কোনো মানুষের জন্য এত মনের টান অনুভব করিনি। আমি কোনোদিনই জানতে পারব না, তিনি কেন তোমার কাছ থেকে বিমান ভাড়া নেননি।’ তার নিজের বিমান যখন পশ্চিমের পথে যাত্রা করল, তখন সুনীল জানালা দিয়ে নিচে তাকালেন, যেন একাকী পিটারকে রাজস্থানের মরুভূমি দিয়ে চলতে দেখতে পাবেন।

সুনীল চলে যাওয়ার পর মলয় ও শক্তির দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠল। হ্যাংরি জেনারেশনের মেনিফেস্টোয় ক্রমেই বাড়তে থাকা ক্রোধ আর অযাচিত রুক্ষতা তাদের কুখ্যাতি এনে দিল, তারা এমনটাই চাইছিল। সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়তে প্রকাশিত লেখায় প্রমাণ করার চেষ্টা হলো যে, হ্যাংরিয়ালিস্টরা রাষ্ট্রের ধ্বংস ছাড়া আর কিছু চায় না। কর্তৃপক্ষ পুলিশ ডাকল। ২৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়া হলো, প্রশ্ন করা হলো, গ্রেফতার করা হলো পাঁচজনকে। অভিযোগ আনা হলো ষড়যন্ত্র ও অশ্লীলতার। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে টাইমের এক প্রতিবেদককে উৎপল কুমার বসু বলেছিলেন, ‘আমাদের হতাশা ব্যক্তিগত নয়। বরং এর উৎস সমাজের দারিদ্র্য, অনাচার আর উপেক্ষা।’ যদিও উৎপলকে শেষমেশ অভিযুক্ত করা হয়নি, কিন্তু টাইমের প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর তাকে চাকরি থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। উৎপল লিখলেন অ্যালেনকে, ‘আমি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছি।’

উৎপল বলেন, শক্তি গণমাধ্যমের প্রিয়ভাজন হওয়ার দৌড়ে নেমে পড়েছে। ‘বাধ্যগত হওয়ার আগ্রহ’ থেকেই ও এ দৌড়ে নেমেছে। আইওয়ায় বসে সুনীল এসবই শুনলেন। তিনি কবিদের শাস্তি দেয়ায় সরকারের সমালোচনা করলেন এবং বললেন যে, শহরের মূল সমস্যা থেকে নজর সরাতেই সরকার এসব করছে। শেষমেশ মলয় বাদে আর সবার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়। বেশির ভাগকে আর কখনো অশ্লীল লেখা লিখবেন না, এমন মুচলেকায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। অ্যালেনের সহায়তায় উৎপল ইংল্যান্ডে নির্বাসনে যান। মলয় নিজেকে সত্যিকার বড় মাপের কবি মনে করতেন। এরপর তিনি নিজেকে বর্জিত ও প্রতারিত অনুভব করতে লাগলেন। সবাইকে সমালোচনা করে তিনি অ্যালেনকে চিঠি লিখলেন তাকে আমেরিকায় একাডেমিক অ্যাপয়েনমেন্ট জোগাড় করে দিতে। ‘আমার মনে হয়, আমিই একমাত্র ব্যক্তি, যে ভারতকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম...।’

ট্যাক্সির মোটর আবার গর্জে উঠল। বাতাসের সঙ্গে শব্দের মাত্রা বদলে যাচ্ছিল একেবারে অগ্নিশিখার শব্দের মতো। রাস্তায় বেল বাজিয়ে, হর্ন চেপে বাইসাইকেলগুলো আমাদের পাশ কেটে যাচ্ছিল।

‘এখানে সবাই কি মহামায়া সম্পর্কে সচেতন?’— অ্যালেন জিজ্ঞেস করলেন সুনীলকে। অ্যালেনের মনে হয়েছিল সব দুঃখই মায়া, এমন ধারণা হয়তো মানুষকে সান্ত্বনা দিতে পারে।

‘হ্যাঁ’— সুনীল জবাব দিলেন, ‘এ অঞ্চলের মানুষ ভাগ্য নিয়ে খুব মাতামাতি করে।’

‘ঠিক’— অ্যালেন বললেন, ‘এমনটাই হওয়া উচিত।’

‘বৃষ্টি হবে। এটা সবাই বুঝতে পারে।’

‘আমরা কি ট্যাক্সি থেকে নেমে চারপাশে একটু হেঁটে বেড়াব?’

‘সে চেষ্টা না করাই ভালো।’

‘এখানে কি আর কোনো রাস্তা আছে?’

ট্যাক্সিচালক একজন রিকশাচালকের সঙ্গে বেশ খানিকটা সময় বাংলায় আলোচনা করল। সে সময় এক কিশোর ট্যাক্সির জানালা দিয়ে মাথা গলিয়ে ভেতরের আরোহীদের পর্যবেক্ষণ করল। আবার ট্যাক্সির দরজা খুলল এবং বন্ধ হলো, ড্রাইভার নেমে গিয়ে দেখে এসে জানাল, সামনে রাস্তা দিয়ে চলাচল অসম্ভব।

তাই তাদের ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে রিকশা নিতে হলো।

‘এটা বয়ে নিতে আমি আপনাকে সাহায্য করব।’

‘আমিই বহন করতে পারব।’

‘আপনার জুতা এখানে রেখে যান।’

‘আমরা হেঁটে যেতে পারব।’

‘এখন ১০-১১টার মতো বাজে, ৫টার মধ্যে ফিরতে হবে। তাই ২টা নাগাদ আবার ফিরতি যাত্রা করতে হবে আমাদের।’

রিকশায় উঠে অ্যালেন আবার টেপ চালু করলেন, যাতে তিনি যা দেখছেন, তা রেকর্ড করে রাখতে পারেন। তিনি বিশ্রামঘরের আয়নায় নিজেকে দেখছেন, অ্যাপার্টমেন্টের পেছনের জানালা দিয়ে এক দৃষ্টিতে কিংবা তিনি অবিশ্বাস্য দুর্দশার বর্ণনা দিচ্ছেন। জার্নালেও সব টুকে রাখছেন। অ্যালেন গিনসবার্গ নিজেকে কখনো প্রশ্ন করেননি যে, তার এ রেকর্ডিং বা সামনের দিনগুলোয় আরো যত রেকর্ডিং করবেন, সেগুলো কে শুনবে। একইভাবে তিনি যে জার্নাল রাখছেন, সেটা টাইপ হবে। যদিও তিনি পরবর্তীতে ‘যশোর রোড’ নামে একটি কবিতা লিখবেন। কিন্তু মনে হচ্ছিল, মাইকে তার বলা কথায় শব্দের অপ্রতুলতা সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন না। ‘নদীর ওপর একটা লোহার সেতু। আমরা এখন সেই সেতুটি পার হচ্ছি। টালির ছাদ, ডুবে গেছে, পানিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। অকেজো হয়ে যাওয়া জানালা, আরেক ছাদের বাঁশ পানিতে ভেসে আছে’— এ বর্ণনা দ্রুতই পানির মধ্য দিয়ে রিকশা চলার সময় চাকা ঘোরায় ছিটকে পড়া পানির শব্দের তলায় ডুবে যায়। নানা কোলাহলের মধ্যেও তার চোখ উদাসী ও খোলা।

পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া একজন মানুষ কী বলছে, সেটা সুনীল অনুবাদ করে শোনাতেন এবং তারপর অ্যালেন সেটা নিজে টেপ রেকর্ডারের সামনে পুনরায় বলতেন।

‘সবকিছু পানির তলায় চলে গেছে এবং সরকার কিছুই করছে না। আমাদের সঙ্গে থাকা একজন দোকানদার এমনটাই বলছেন।’

ভারতে রক্ত-মাংসের মানুষের মধ্যেই দেবতারা থাকেন বলে সাধারণ আকাঙ্ক্ষা প্রচলিত আছে। আমাদের মধ্যে দেবতাদের চেনার উপায় হচ্ছে, তাদের চোখের পাতা কখনো বন্ধ হয় না। এ চোখ দিয়ে দেখেই তারা মানুষের দুনিয়াকে জানেন।

এর আগে পৌঁছার দুদিন পর হোটেল ছেড়ে অ্যালেন থিয়েটারে গেলেন। সেখানেই সুনীল ও শক্তির সঙ্গে তার দেখা হয়। চৌরঙ্গী ও পার্কের কোণে ছিল ওয়াইডব্লিউসি। শক্তি তখন প্রায় মাতাল, চিবুকে চর্বি জমেছে, কিন্তু আর সব অপরিবর্তিত। সুনীল তেমনই গোলগাল আছেন, বয়স বেড়েছে বলে মনে হয় না। তারা সবাই জ্যোতি দত্তের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশে রওনা হলেন। একটি বাংলা দৈনিকের সাংবাদিকতার ফলে সুনীলের একটা গাড়ি ও গাড়িচালক আছে।

জ্যোতি দত্তও আমেরিকায় ছিলেন, কিন্তু এক পাপবোধ ও হোমসিকনেসের কারণে তিনি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর প্রভাষকের পদ ছেড়ে ভারতে ফিরে আসেন। তিনি ভারতে ‘বিশুদ্ধ, পবিত্র, গান্ধীবাদী দারিদ্র্যে’ জীবন যাপন করতে আমেরিকা ছেড়েছিলেন। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি কলকাতার দক্ষিণে অবস্থিত ম্যানগ্রোভ জলাশয়ের একটি দ্বীপে ছোট্ট এক কুঁড়েঘরে বাস করতে শুরু করেন। খালি পা, নিরামিষাশী; তামাক, অ্যালকোহল ও মোটরযান বর্জন করেন। নিজেকে কবিতার জন্য উৎসর্গ করেন আর স্টেটসম্যানের জন্য সপ্তাহে একটি কলাম লিখতেন। চারপাশে মাথা তোলা গৃহযুদ্ধ নিয়ে নীরবতা বজায় রাখায় সুনীল তাকে তিরস্কার করলেন। কিন্তু তিনি মনে করতেন, পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের যুদ্ধের নিন্দা জানানোর কোরাসে গলা মেলানোর কোনো প্রয়োজন নেই। কে ভুল করছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি তার কলমকে বিশুদ্ধ কবিতার জন্যই বরাদ্দ রাখার পক্ষপাতী ছিলেন। কুঁড়েঘরের ছাদে অ্যালেন পদ্মসম্ভবা মন্ত্র গুনগুন করলেন এবং জ্যোতিকে আশীর্বাদ করলেন। সে বছরের শুরুর দিকে অ্যালেনের বিশ্বাস জন্মেছিল, সে একজন শিক্ষকের দেখা পেয়েছে, তিনি ছিলেন একজন তিব্বতি বৌদ্ধ রাঙ্গপা রিনপোছে। তার পরও অ্যালেন বেনারসে গিয়ে হিন্দু সাধুদের সঙ্গে আরো আলাপের পরিকল্পনা করেছিলেন।

জ্যোতির কুঁড়েঘর থেকে তারা এবার চললেন সুনীলের ঘরে, উদ্দেশ্য ডাল-ভাত, চা পান আর স্মৃতিচারণ। আলোচনায় একসময় অবশ্যম্ভাবীরূপে নানা দুঃখ-বেদনার ঘটনার কথা উঠে এল: দুর্নীতি, ধর্মঘট, তাদের প্রিয় শহরের করুণ দশা। ভারত-চীন যুদ্ধের পর চায়না টাউন শহরের প্রান্তদেশে চলে গিয়েছিল। শুধু নানকিংই অবশিষ্ট ছিল। তারা জানাল, নানকিংয়ে যাওয়া এখন সম্ভব নয়। সে জায়গা এখন গুণ্ডা আর মাওবাদীদের দিয়ে পূর্ণ, যারা নকশাল নামে পরিচিত। পেছনের ছয় বছর ধরে কলকাতা শহর এক সহিংস বিদ্রোহের শিকারে পরিণত হয়েছিল। বাঙালি মধ্যবিত্ত ছিল নকশালদের পছন্দের টার্গেট। শুধু একটি এলাকায়ই ৮০ জন মানুষ নকশালদের হাতে খুন হয়েছিলেন। সরকারও সাম্প্রতিক সময়ে এক রকম সহিংস ক্র্যাকডাউন আরম্ভ করেছে। মধ্যরাতে সুনীলের গাড়িতে করে অ্যালেন আর শক্তি শহরে ফিরলেন।

অ্যালেনের হাতে চুমু দিয়ে মাতাল শক্তি বললেন, ‘আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’ তার বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে শক্তি অ্যালেনের পা ছুঁয়ে ফেলল। ‘তোমার মন্ত্র জপ মোটামুটি হয়েছে। আসো আমার স্ত্রী ও পরিবারের সঙ্গে দেখা করে যাও।’

অনধিকার চর্চা করে একটি কণ্ঠ অ্যালেন বিবরণীর ধারাবাহিকতায় ব্যাঘাত ঘটাল। মনে হবে হঠাৎই কেউ অ্যালেনের বিবরণীতে একঘেয়ে হয়ে গেছে বা একজন সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে তার উচিত অ্যালেনকে বিভ্রান্ত করা। যদিও বাঙালিরা যোদ্ধা হিসেবে কোনো কালে সেভাবে পরিচিত ছিল না। তবু তিনি ১৯৬৫-এর যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে বাঙালিদের সাহসিকতার স্মৃতিচারণ শুরু করলেন। কর্দমাক্ত সীমান্তজুড়ে যে গৃহযুদ্ধ চলছিল, সেখানে বাঙালি সেনারা সমর্থন দিচ্ছে। এ ব্যাঘাতকে উপেক্ষা করতে অ্যালেন সর্বোচ্চটা করেছিলেন।

‘আত্মসম্মানের জন্য আমাদের অবশ্যই দেখাতে হবে যে, আমরা যুদ্ধ করতে পারি...।’

‘আর সবার মতো’— অ্যালেনের জবাব।

‘অন্য যে কারো চেয়ে ভালোভাবে’— গর্বের সঙ্গে মানুষটি তত্ক্ষণাৎ জবাব দিল।

‘এ কেমন কর্ম। আমি আপনাকে সাবধান করছি, এটা কিন্তু ভয়ানক কর্ম, এতে আপনাদের জড়ানো উচিত নয়। ইসরায়েলে ইহুদিরাও এমনটা বলে।’

‘তাদের অনুভূতি আমি এখন বুঝতে পারি।’

‘কিন্তু তারা ভুল!’ বিরক্ত হয়ে অ্যালেন গলা চড়াল, ‘তারা ভুল করছে। এ ব্যাপারে কী কী বলবেন?’

এবার রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়ে গেল। সেই সেনা কর্মকর্তা জোর দিয়ে বললেন, নিক্সন বাংলাদেশে একটা নৌঘাঁটি তৈরি করতে চায়। কারণ এটা কৌশলগতভাবে একটি অপরিহার্য এলাকা। সিআইএ ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে সহায়তা করছে। চীনারাও একই কাজ করছে। গিনসবার্গের কাছে এটা অসম্ভব মনে হলো। চীন কী করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এজেন্টের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারে? অ্যালেন তর্ক চালিয়ে গেল এবং তার মত থেকে কোনোভাবেই সরল না।

‘রাস্তার পাশের খড়ের দোকানগুলো সারা দিন খাবারের অপেক্ষায়। চারদিকে মল, বন্যা আর বিড়ির গন্ধ। ভারি বৃষ্টি, কলেরার মহামারী। টেঁটা হাতে এক ব্যক্তি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। গরিব অধিবাসী আর উদ্বাস্তুদের মধ্যে চলছে উত্তেজনা। গরিব গ্রামবাসীর প্রতি উদ্বাস্তুদের অভিযোগ, ‘তোমরা জমিদারের মতো ব্যবহার করছ।’ আর স্থানীদের অভিযোগ, ‘উদ্বাস্তুরা আমাদের উঠানে মলত্যাগ করছে।’”

যশোর রোডে সুনীল অ্যালেনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি কি আরমাগেডনে বেঁচে থাকতে চাও?’

‘না, নিশ্চতভাবেই না। গ্যারি স্নাইডার বেঁচে থাকার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। করাত ও মেশিন ছাড়াই তিনি জাপানি ধাঁচের মন্দির তৈরি করেছিলেন।’

‘ভূগর্ভে?’

কাছেই একটা ছাগল ম্যা ম্যা করে ডাকছিল। অ্যালেনরা খবর পেলেন যে, বন্যার পানিতে নিমজ্জিত একটা উদ্বাস্তু শিবির ভেসে গেছে। লোকজনের কী হয়েছে? অ্যালেনের জিজ্ঞাসা। নিশ্চিত কোনো জবাব পাওয়া গেল না।

‘এখানে গোবরের গন্ধ। বাতাস পূর্ণ হয়ে আছে রান্নার ধোঁয়া আর ধূসর মেঘে।’ জিদ নিয়ে অ্যালেন তার বিবরণী চালিয়ে গেলেন। এখন রাস্তার দুই পাশেই হাজারো মানুষ পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে বা বসে আছে। অসুস্থ ও ক্ষুধার্তদের নীল প্লাস্টিকে মোড়া তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। চাল ও শিখ সেনাবোঝাই ট্রাক বিক্ষিপ্তভাবে এসে পৌঁছেছে। অ্যালেনের রিকশাকে হঠাৎ একদল উদ্বাস্তু ঘিরে ধরল। তারা জানাল, সব ক্যাম্পই পানির নিচে চলে গেছে। শুষ্ক স্থলভাগ থেকে ট্রাক এলেও এখানে পর্যাপ্ত খাদ্য নেই। রাস্তাগুলো ধুয়ে গেছে, সেগুলো আর ট্রাক চলাচলের উপযোগী নেই। চালের বস্তা পানিতে পড়ে যাচ্ছে।

কথোপকথনে একটা ছেদ পড়ল।

কেউ একজন একটা সিগারেট চাইল।

ফিরে চলল তারা।

এ অভিজ্ঞতা থেকেই গিনসবার্গ পরে লিখলেন তার বিখ্যাত কবিতা সেপ্টেম্বর ইন যশোর রোড, যা শুধু গিনসবার্গের আবৃত্তিই নয়, গান হয়ে কণ্ঠ দিলেন বব ডিলানও।

আ ব্লু হ্যান্ড: অ্যালেন গিনসবার্গ অ্যান্ড দ্য বিটস ইন ইন্ডিয়া গ্রন্থ থেকে

অনুবাদ: শানজিদ অর্ণব

ডেবোরা বেকার: জীবনীকার ও প্রাবন্ধিক, বিখ্যাত ভারতীয় সাহিত্যিক অমিতাভ ঘোষের স্ত্রী