একজন ভাগ্যান্বেষী সৈনিকের সরাসরি মোগল সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল না। তাকে প্রথমে একজন পৃষ্ঠপোষক খুঁজে বের করতে হতো। পৃষ্ঠপোষক হতেন একজন সেনাপতি। তার অধীনে সে সৈনিক কাজ করার সুযোগ পেতেন। এক্ষেত্রে জাতি ও দেশের পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। সাধারণত দেখা যেত, একজন সেনাপতি নিজ জাতি ও স্বদেশী সৈনিকদেরই তার বাহিনীতে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতেন। একইভাবে একজন সৈনিকও তার নিজ জাতি ও দেশের কাউকেই পৃষ্ঠপোষক হিসেবে খুঁজে বের করতেন। ফলে দেখা যেত, মোগল সেনাপতির অধীনে মোগলরা, আফগানদের অধীনে আফগানরা এবং পারস্য থেকে আসা সেনাপতিদের অধীনে তাদেরই স্বজাতীয় সৈনিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকত। এটি একটি অলিখিত কিন্তু চিরাচরিত বিধিতে পরিণত হয়েছিল। তৎকালীন ঐতিহাসিক নথিপত্র থেকে জানা যায়, যদি কোনো সেনাপতি ইরানের হতেন, তাহলে তার অধীনে সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ সৈন্য থাকত মোগল, আর দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি থাকত সৈয়দ ও শেখ বংশীয় সৈনিক। কিছু আফগান ও রাজপুত সৈনিক থাকারও রেকর্ড পাওয়া যায়। তবে তাদের সংখ্যা হতো নগণ্য, পর্যায়ক্রমে এক-ষষ্ঠাংশ ও এক-সপ্তমাংশ। সৈয়দ ও শেখ বংশীয় অভিজাতরাও তাদের স্বজাতিদের নিজেদের বাহিনীতে নিয়োগের ব্যাপারে অগ্রাধিকার দিতেন। কিছুসংখ্যক আফগানকেও কদাচিৎ তারা নিয়োগ দিতেন। আফগান সেনাপতিদের অধীনে অর্ধেক সৈনিকই থাকত আফগান। বাহিনীর বাকি অর্ধেক মোগল ও শেখ সৈনিকদের মাধ্যমে পূরণ করা হতো। রাজপুত সেনাপতিরা তাদের সম্পূর্ণ বাহিনী রাজপুত সৈনিকদের মাধ্যমেই গঠন করতেন।
মোগল সেনাবাহিনীতে নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষক পাওয়া প্রাথমিক ও প্রধান শর্ত হলেও একমাত্র শর্ত ছিল না। একজন নিয়োগপ্রার্থী সৈনিকের নিজের ঘোড়া এবং অন্যান্য সরঞ্জাম থাকতে হতো। তবে এক্ষেত্রে খানিকটা শিথিলতা ছিল। অনেকেই অতিরিক্ত ঘোড়ার অধিকারী ছিলেন এবং প্রয়োজন অনুসারে ঘোড়াবিহীন সৈনিকদের সেগুলো ধার দিতেন। এ পদ্ধতির ফলে সৈনিকদের মধ্যে আলাদা দুটি পরিচয় তৈরি হয়। যে সৈনিক নিজের ঘোড়ায় চড়তেন, তাকে ‘সিলাহদার’ (অর্থাৎ, যার প্রয়োজনীয় সামগ্রী আছে) বলা হতো। আর যে সৈনিক অন্যের কাছ থেকে ধার করা ঘোড়ায় চড়তেন, তাকে বলা হতো ‘বারগির’ (ভারবাহী)। ঘোড়ার পাশাপাশি অন্যান্য সাজসরঞ্জামও ধার পাওয়া যেত। অনেক সময় সেনাপতি নিজেই তার অধীনস্থ সৈনিকদের জন্য ঘোড়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের বন্দোবস্ত করে দিতেন। পরবর্তী সময়ে সেসব সৈনিকের বেতন থেকে তার দাম কেটে রাখা হতো।
পৃষ্ঠপোষক তার কাছে ধরনা দেয়া সৈনিকটিকে মীর বখশির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন। সৈনিকদের নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকতেন মীর বখশি। তার মাধ্যমে একজন সৈনিকের নিয়োগের সুপারিশপত্র সম্রাটের কাছে পৌঁছত। সৈনিকদের পরিচয় ও আনুষঙ্গিক তথ্যাদি সংবলিত এ সুপারিশপত্রের আনুষ্ঠানিক নাম ছিল ‘হাকিকত’। তথ্যগুলো সম্রাটের মনঃপূত হলে তিনি নির্দিষ্ট দিনে সে সৈনিককে দরবারে হাজির করার আদেশ দিতেন। সে অনুযায়ী ভাগ্যান্বেষী সৈনিক দরবারে উপস্থিত হয়ে সম্রাটকে কুর্নিশ করতেন। তার পরই চূড়ান্ত নিয়োগের আদেশ দেয়া হতো। তারপর মীর বখশির কার্যালয় থেকে লিখিত নিয়োগপত্র দেয়া হতো। এ নিয়োগপত্রকে বলা হতো তাসদিক। মীর বখশির কার্যালয় থেকে তাসদিক যেত ওয়াকিয়াহনিগারের (দিনপঞ্জি লেখক) কার্যালয়ে। সেখানে তাসদিকটি নথিভুক্ত করা হতো। একে বলা হতো ‘ইয়াদ-দাশত’ (স্মারকলিপি)।
যখন একজন সৈনিক সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত হতেন, তখন তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনাসংবলিত একটি তালিকা তৈরি করা হতো। একে বলা হতো ‘চিহরা’। সেখানে সৈনিকের নাম, পিতার নাম, গোত্র বা জাতি, তার জন্মস্থান ইত্যাদি তথ্য লিপিবদ্ধ থাকত। পাশাপাশি তার গায়ের রঙ, সে কি বাদামি, গৌর, লালচে নাকি অন্য কোনো বর্ণের, তার দুই চোখের ভ্রু সংযুক্ত নাকি বিযুক্ত, তার চোখ কী হরিণের মতো নাকি ভেড়ার মতো, চোখের মণির রঙ কেমন, সে কি বিড়ালচোখা, তার নাক কি খাড়া নাকি থ্যাবড়া, তার কি দাড়ি আছে নাকি নেই, থাকলে তা কেমন, কালো নাকি লালচে, পাতলা নাকি ঘন, সোজা নাকি প্যাঁচানো, তার শরীরে কোনো তিল বা আঁচিল আছে কিনা, থাকলে কয়টি আছে, তার কানের আকৃতি কেমন ইত্যাদি বিষয় খুঁটিয়ে তালিকাভুক্ত করা হতো। চিহরা একটি লাল কাগজে লেখা হতো। তাতে স্বর্ণপাতের ছিটা দেয়া থাকত।
সৈনিকদের ঘোড়াগুলোকে সেনাবাহিনীতে যুক্ত করার আগে সেগুলোকে দাগ দেয়া হতো। ঘোড়ার ঊরুতে তপ্ত লোহা চেপে ধরা হতো। এক্ষেত্রে ঘোড়ার শরীরে সুনির্দিষ্ট প্রতীকের ছাপ দেয়া হতো। সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে ২২ ধরনের প্রতীকের ব্যবহার ছিল।
মোগল সেনাবাহিনীতে নিয়োগের মতো সৈনিকদের বেতন ও ঘোড়াদের ভরণপোষণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বিধান ছিল। সৈনিকের বেতন ঘোড়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। একজন সৈনিকের ঘোড়ার গায়ে ছাপ পড়ার দিন থেকেই তার বেতন শুরু হতো। দুভাবে এ বেতন দেয়া হতো। নগদ টাকার মাধ্যমে কিংবা কোনো জায়গিরের মাধ্যমে একজন সৈনিককে বেতন দেয়ার বিধান ছিল। যদি একজন সৈনিকের দুটি ঘোড়া থাকত, তাহলে তাকে সেই অনুপাতে বেতন দেয়া হতো। দুটি ঘোড়ার মধ্যে একটি মারা গেলে একটি ঘোড়ার অনুপাতে তাকে বেতন দেয়া হতো। আবার দুটি ঘোড়াই মারা গেলে তাকে এক মাস পর্যন্ত বেতন দেয়া হতো। যদি এর মধ্যে তিনি নতুন ঘোড়া জোগাড় করতে না পারতেন, তাহলে তার বেতন বন্ধ করে দেয়া হতো। একটি ঘোড়ার অধিকারী সৈনিকের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম ছিল। আরো কিছু কারণেও বেতনের তারতম্য হতো। এর মধ্যে অনুপস্থিতি, অসুস্থতা, ছুটি নেয়া, পালিয়ে যাওয়া, বরখাস্ত হওয়া ইত্যাদি কারণ অন্যতম। যদি কোনো সৈনিক টানা তিনদিন অনুপস্থিত থাকতেন, তবে তার বেতন কেটে রাখা হতো। আর চতুর্থ দিনও যদি তিনি কোনো যথোপযুক্ত কারণ ছাড়া অনুপস্থিত থাকতেন, তবে তার সব বকেয়া বেতন বাজেয়াপ্ত করা হতো। যদি কোনো সৈনিক উৎসবের দিন অনুপস্থিত থাকতেন, তবে তার অর্ধেক দিনের বেতন কাটা হতো। যদি একজন সৈনিক অসুস্থতার কারণে অনুপস্থিত থাকতেন, তাহলে তিনদিন পর্যন্ত বিবেচনা করা হতো এবং বেতন দেয়া হতো। কিন্তু তার বেশি যদি তিনি অনুপস্থিত থাকতেন, সেক্ষেত্রে তার বেতন বন্ধ করে দেয়া হতো। অবশ্য যদি তিনি নিজের বর্ধিত ছুটির সপক্ষে যথাযথ প্রমাণ হাজির করতে পারতেন, তাহলে বেতন স্বাভাবিক নিয়মেই চলত। যদি কোনো সৈনিক ব্যক্তিগত কারণে ছুটিতে থাকতেন, তাহলে অনুপস্থিতির দিনগুলোর জন্য তাকে কোনো বেতন দেয়া হতো না। তবে পারিবারিক কোনো উৎসব বা গুরুতর কোনো কারণে ছুটি নিলে একদিন ছুটি দেয়া হতো। যদি এর বেশি সময় তিনি অনুপস্থিত থাকতেন, তাহলে তার বেতন কেটে রাখা হতো। যদি কোনো সৈনিক কর্মরত অবস্থায় মারা যেতেন, তাহলে তার উত্তরাধিকারীদের এককালীন কিছু অর্থসহায়তা প্রদান করা হতো। এ প্রথার আনুষ্ঠানিক নাম ছিল ‘ফৌতি’। ‘ফৌত’ তথা মৃত্যু থেকে ফৌতি। সেক্ষেত্রে উত্তরাধিকারীদের নিজেদের দাবির সপক্ষে কাজি কর্তৃক সত্যায়িত একটি সনদ উপস্থাপন করতে হতো।
মোগল সেনাবাহিনীতে সৈনিকরা তাদের বীরত্ব ও নানা যোগ্যতার স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন উপাধি, খেলাত এবং নানা ধরনের উপহার পেতেন। খেলাত হলো সম্মানসূচক পোশাক। মোগল আমলে পাঁচ ধরনের খেলাত দেয়ার নিয়ম ছিল। তিন, পাঁচ, ছয় ও সাত খণ্ডের সম্মানসূচক পোশাক সৈনিকদের তাদের বীরত্ব ও যোগ্যতার মাত্রা অনুসারে প্রদান করা হতো। তবে সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে সম্রাটের নিজের পরিহিত পোশাক একজন সৈনিককে পরিয়ে দেয়া হতো। এটি ‘মালবুস-এ-খাস’ বা বিশেষ খেলাত নামে পরিচিত ছিল।
মোগল সেনাবাহিনী ছিল সুশৃঙ্খল ও সুনিয়ন্ত্রিত। নিয়োগবিধি থেকে বেতন কাঠামো, সব ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বিধিমালা ছিল। সৈনিকদের কর্মপরিধি ও কাজ ছিল সুস্পষ্ট ও সুসংবদ্ধ। তাই মোগল সেনাবাহিনী হয়ে উঠেছিল অনন্য। এ শক্তিতে বলীয়ান হয়ে মোগল শাসকরা তাদের সাম্রাজ্যের পরিধি বাড়িয়েছিল।
মোহাম্মদ রবিউল হোসাইন: লেখক





