উনিশ শতকের বাংলায় কোম্পানির জেলা প্রশাসনিক পদ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট— অনুবাদ করলে দাঁড়ায় প্রতিনিধি ম্যাজিস্ট্রেট। বাংলা-ইংরেজি মেশানো শব্দটি এ পদের মাহাত্ম্য বা গুরুত্ব বোঝাতে তেমন লাগসই নয়। বেকার গ্র্যাজুয়েট নবীনচন্দ্র সেনেরও এ পদটি সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না, তাই ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদের পরীক্ষা দেয়ার নমিনেশনপত্র পেয়ে কিছুটা আনন্দমিশ্রিত উত্কণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি। আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট কি? ওকালতি, মুনসেফি, সবজজি এসব আশৈশব শুনিয়াছ। উকিল হইব এ আশা উচ্চতম আশা ছিল। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট তো কখনো মনেও ভাবি নাই। উহা কি তাহা জানিতাম না। তবে জানিতাম একটা বড় চাকরি...।’
এ বড় চাকরি পেয়ে অবশ্য তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কোম্পানি আমলের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির জেলা শহরের ছোট হুজুর ও ছোট হাকিমই হলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট— সংক্ষেপে ডেপুটি বাবু বা ডেপুটি সাহেব। এ চাকরির দৌলতে উনিশ-কুড়ি বছরের খোকা হাকিমও অপরাধীদের বেত মারার হুকুম দিতে পারেন, চোর বদমাশের সাজা দিতে অর্থাৎ জেলে পাঠাতে পারেন। (অবশ্য তিন মাসের জন্য)।
নবীনচন্দ্র ডেপুটি পদ পেয়ে নিজেকে আশাতীত ভাগ্যবান বলে মনে করেছিলেন। ভাগ্যবান তো বটেই। উনিশ শতকের ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালি জীবনে এ রাজ পদটি ছিল দুর্লভ কামনার ধন, সামাজিক প্রতিপত্তির মাপকাঠিতে তার উচ্চাশার সর্বোচ্চ শিখর। কারণ এরই মধ্যে লর্ড কর্নওয়ালিশ শিক্ষিত বাঙালির উঁচুপদে ওঠার চারাগাছটি চিরদিনের জন্য মুড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ দেশের উঁচু সরকারি পদে বাঙালির নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার কৃতিত্ব এ ইংরেজ প্রশাসকের, যিনি মাত্র কিছুদিন আগে উত্তর আমেরিকায় ইংরেজ কলোনির স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে যুদ্ধে গো-হারা হেরে, সেখানকার ব্রিটিশ উপনিবেশ হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছিলেন। মনে হয় এ গ্লানি ভুলবার জন্য বাংলায় গভর্নর হয়ে এসে এই একদা ব্যর্থ সেনাপতি শার্দুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাংলার অসহায় কৃষকদের ঘাড়ে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নখদন্তের নির্মম আঘাতে বাংলার মানুষকে ছিন্নভিন্ন করে এক চিরস্থায়ী ঔপনিবেশিক কীর্তি স্থাপন করেছিলেন তিনি। এ মহাপুরুষের পরবর্তী শিকার শিক্ষিত বাঙালি সম্প্রদায়। ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালি যোগ্যতা অনুযায়ী যাতে উঁচু পদ না পায়, সেজন্য এক উদ্ভট মনগড়া যুক্তি খাড়া করেন তিনি। উঁচু পদের প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত করলেন। তার ধারণা যে, দেশীয় ব্যক্তিদের উঁচু স্তরে নিয়োগ দিলে দেশীয়দের সংস্পর্শে এ সদ্য ভারতে আগত ‘ধোয়া তুলসী পাতা’ (পড়ুন বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো) তরুণ ইংরেজ কর্মকর্তাদের ‘দূষিত’ হবার সম্ভাবনা প্রবলরূপ নেবে, সরলমতি ইংরেজ কর্মচারীরা নেটিভদের সংশ্রবে এসে উেকাচ প্রভৃতি গ্রহণে দ্বিধা করবেন না। শুধু এই নয়, দিব্যদৃষ্টির অধিকারী— এ মহাপুরুষের বদ্ধ ধারণা হয়েছিল যে, নেটিভরা রাজকার্যের পক্ষে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। অতএব কর্তব্যের তাগিতে তিনি দেশীয় ব্যক্তিকে যোগ্যতা থাকলেও রাজকার্যের উঁচু পদে নিয়োগ করতে নিষেধ-বিধি আরোপে বিলম্ব করেননি। পলাশি যুদ্ধের ইতিহাস যারাই একটু মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন, তারা অবশ্যই জানেন দেশীয়দের কেউ উেকাচের ঘটনায় জড়িত থাকলে তাকে কারা বদ্ধ করা হত। আর কোনো বিদেশী বণিকরা উেকাচ পেয়ে যেকোনো অপরাধ বা নীতিহীন কাজে আদৌ পিছপা হতেন না। ইংরেজ কর্মচারীরা এ উদ্দেশ্যে উেকাচের খরস্রোত বইয়ে দিতে দুর্নীতির যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন, তা পলাশি এবং পরবর্তী সময়ের ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই এর প্রমাণ মিলবে অনায়াসে। এর ফলে কর্নওয়ালিশের আমলে দেশীয়দের জন্য সরকারি উঁচু চাকরির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
কর্নওয়ালিশের পর ওয়েলেসলিও এই একই পথ অনুসরণ করেছিলেন, অবশেষে বেন্টিংক এসে কর্নওয়ালিশের অপকর্মের রেখা মুছে দিয়ে শিক্ষিত বাঙালিদের উঁচু পদে নিয়োগের বাধা কিছুটা তুলে দিয়েছিলেন।
ঔপনিবেশিক বাংলায় জেলা শাসনের ভার পুরোপুরি ইংরেজ সিভিলিয়ানদের হাতে থাকায় জনসাধারণের সঙ্গে তাদের ব্যবধান হয়ে ওঠে বিশাল। তাদের বিকৃত উচ্চারণ, ভিন্ন রীতি-নীতি শাসক এবং শাসিতের সম্পর্ক নিয়ে সাধারণ মানুষকে সবসময় সন্ত্রস্ত এবং অচেতন রাখত। কালক্রমে এসব বিঘ্ন দূর করার লক্ষ্যে বেন্টিংকের আমলে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদ সৃষ্টি হওয়ায় বাঙালি শিক্ষিত যুবকরা এ পদে নিয়োগ পেতে থাকেন।
ডেপুটি পদে যোগ্য বাঙালি প্রার্থীর নিয়োগের অনুকূলে যেসব কারণ যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছিল, সে সম্পর্কে কিছু প্রাসঙ্গিক তথ্য তুলে ধরার তাগিদে একটু পেছনে তাকানো যাক। এরই মধ্যে দেশীয়দের উঁচু পদ না দেবার ভ্রান্ত নীতির ফলে ইংরেজদের ওপর সব কাজের চাপ বাড়ে। এ গরমের দেশে বরফ ও পাখাবিহীন অবস্থায় শীতের দেশ থেকে আসা এসব কর্মচারীর স্বাস্থ্য রক্ষার নিয়মকানুনের প্রতি গভর্নমেন্টের তেমন নজর দেয়া সম্ভব হয়নি সে সময়। এ দেশের আবহাওয়ায় কয়েক বছরের মধ্যে তারা অকালে মারা যেতে থাকেন। এ কর্মকর্তাদের ছোট-বড় সব কাজ আগাগোড়া ভার দেয়া হলে তা সময়মতো সুসম্পন্ন হতো না তা বলাই বাহুল্য। দেশীয় রীতিনীতি ও সামাজিক পরিমণ্ডল সম্পর্কে অজ্ঞিতা ও জ্ঞানের অভাবই এজন্য বহুলাংশে দায়ী। কিছুদিনের মধ্যেই যখন দেখা গেল প্রাণপণে চেষ্টাতেও কাজ শেষ করা সম্ভব হয় না, তখন তারা অধিকাংশ কাজ দেশীয় আমলাদের হাতে দিয়ে গা ভাসিয়ে দেয়া যুক্তিসঙ্গত মনে করলেন। তাদের আয়েসী কর্মজীবনের দিন শুরু হয় মতলববাজ দেশীদের সালাম গ্রহণ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ দিয়ে। সকাল ও দিনের অর্ধেক অংশ ব্যয় হতো আরো একটি প্রীতিপ্রদ দায়িত্ব পালনে, সেটি হলো ঘোড়ায় চড়া। এর পর আহার, কিঞ্চিৎ দিবানিদ্রা এবং খেলাধুলার বন্দোবস্ত করতেই দিনের বাকি অংশের সমাপ্তি। সে সময় ইংরেজ কর্মকর্তাদের কাজে দক্ষতা দেখিয়ে উন্নতির তেমন ইচ্ছা ছিল না, কারণ তারা জানতেন সময়মতো প্রমোশন যখন হবেই, তখন আর কাজ দেখাবার প্রয়োজন কেন!
অনভিজ্ঞ নবীন ইংরেজ যুবকদের বিলেত থেকে এনে সম্পূর্ণ অপরিচিত নানাজাত-পাতের রীতিনীতিতে আকীর্ণ এই বহু ভাষাভাষী অধ্যুষিত বিস্তীর্ণ দেশটিতে হঠাৎ ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টরের পদে বসিয়ে দেয়ার বিপত্তি ধরা পড়তে শুরু করে। কোনো ইংরেজ কর্মকর্তা সব কাজেই অমনোযোগ ও বুদ্ধিহীনতার পরিচয় দিলে অর্থাৎ কি ম্যাজিস্ট্রেট, কি কালেক্টর কোনো কাজই যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে অক্ষম, তখনই তার কপালে জুটত জজের পদ। এমনো দেখা গেছে যে পদ তিনি পেলেন, সেই পদেই গোটা চাকরিজীবন কেটে গেছে তার। এ কারণে কোম্পানি আমলের সেই গোড়ার দিকে সুপ্রিম কোর্ট ছাড়া অন্যসব আদালতে জজের পদ হতভাগ্যদের ‘আশ্রয় স্থান’ বলে পরিচিত ছিল। (ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।
যদি কোনো কর্মকর্তা একটু দক্ষতা দেখাতে পারতেন, তবে তাকে রাজস্ব বিভাগে রাখা হতো— রাজস্বের প্রতি ডিরেক্টরদের বিশেষ নজর ছিল। তবে এ বিভাগেও যে পুরোপুরি কর্মদক্ষ সিভিলিয়ানভরা ছিল তা নয়। এক রিপোর্টে গভর্নমেন্ট বলেছেন, এ বিভাগেরও কর্মচারীগণ সাধারণত অত্যন্ত অকর্মণ্য, কারণ It is unreasonable to expect a collector to be competent to review a settlement, if he does not know what is settlement is, or how it is to be made.
পুলিশ বিভাগের অবস্থাও যে খুব উন্নত ছিল তা ভাবার কোনো কারণ নেই। কি দেওয়ানি, কি ফৌজদারি, কি পুলিশ, সব বিভাগেই বলতে গেলে বিচারবিভ্রাট ছাড়া কথা ছিল না। দেওয়ানি বিভাগে বিচারবিভ্রাট অথবা অত্যাচারে মানুষের আর্থিক কষ্ট বা সম্পত্তি ক্রয়ের মাধ্যমে নিষ্কৃতি পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু ফৌজদারি বিভাগে বিচার প্রহসন হলে প্রজার প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়ে। ফৌজদারি বিচারের ফলে একবার প্রাণ হারালে পরে নির্দোষ প্রমাণ হলেও আর প্রাণ ফিরে পাওয়ার উপায় নেই। পুলিশ বিভাগও মূলত ফৌজদারি বিভাগেরই একটি অঙ্গ। পুলিশের বিচারেও নিরপরাধী দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাজা পেলে তার আর ফিরিয়ে নেয়ার উপায় থাকে না। কোম্পানি শাসনের প্রথম যুগে দেওয়ানি বিভাগের মতো ফৌজদারি ও পুলিশ বিভাগে এ বিচারবিভ্রাট এত দূর গড়িয়েছিল যে, সাধারণ মানুষ শত অত্যাচার সত্ত্বেও পুলিশে অথবা ফৌজদারিতে নালিশ করতে পা বাড়াত না। বরং ঘুষ দিয়ে নালিশ না করা বা কোনো নালিশে সাক্ষ্য দেয়া হতে প্রাণপণে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করত।
বিচারবিভ্রাটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত এখানে দেয়া প্রাসঙ্গিক হবে। দেওয়ানি বিভাগে লাখেরাজ জমি বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা নিয়ে যে বিচার প্রহসন ঘটে গেছে এবং যার ফলে ভূস্বামীরা বিশেষ করে পুরনো অভিজাত মুসলিম পরিবারের যে সর্বনাশ হয়েছিল, তা দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাঙালির মননে বিষাক্ত ক্ষত হয়ে বিরাজ করেছে।
এ দেশের শাসনযন্ত্রের সর্বেসর্বা হয়ে কোম্পানি আইনজারি করে যে, কয়েকটি বিশেষ অবস্থায় লাখেরাজ সম্পত্তি বা জমি বাজেয়াপ্ত করা হবে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই বিশেষ অবস্থার বিচার করে সিদ্ধান্ত নেয়ার অবকাশ প্রশাসকের হতো না। লাখেরাজ সম্পত্তির নাম শুনলেই তা বাজেয়াপ্ত করা আইনের চোখে বৈধ এবং দস্তুর হয়ে দাঁড়ায়। পাটনার ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট টেলার এ বিচারবিভ্রাটের কতগুলো কীর্তি রেখে কুখ্যাত হয়ে আছেন আজো।
গবেষকরা বিচারবিভ্রাটের মূলত দুটি প্রধান কারণ খুঁজে পেয়েছেন। প্রথমটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। সেটি দেশীয়দের সরকারি উচ্চ রাজকর্মে নিয়োগ না দেয়ার ভ্রান্ত নীতি। দ্বিতীয়টি বিলাতের হেলিবেরিতে অবস্থিত ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ‘হেলিবেরি কলেজ’। বলা হয় কোম্পানির প্রধান অংশীদারদের যেসব আত্মীয় নিতান্ত অকর্মণ্য, তারা সেই কলেজে দু-এক বছর কাটিয়েই ভারতে কোম্পানির চাকুরে হিসেবে নিয়োগের যোগ্য হতো। ১৭ থেকে ২১ বছরের মধ্যে এ কলেজে ঢোকার আগে ক্লাসিক্যাল ভাষা সম্পর্কে একটি পরীক্ষা পাস করতে হতো সব প্রার্থীকে।
এ পাঠ্যসূচি এত সহজ ছিল যে, এ পরীক্ষা বৈতরণী পার হতে কারোই তেমন বিশেষ প্রস্তুতির প্রয়োজন হতো না। এর পর হেলিবেরিতে শিক্ষানবিশ সিভিলিয়ান দুই বছর ‘বাসা বাঁধিয়া থাকেন’ এবং ভবিষ্যতের ভারতীয় প্রশাসক হিসেবে কর্তব্যকর্ম সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করার জন্য সংস্কৃত ভাষা আয়ত্তে পূর্ণ শক্তি নিয়োজিত করেন। এছাড়া কিছু ফারসি ও সংস্কৃত ভাষাজ্ঞান লাভ করাও প্রয়োজন, তবে হেলিবেরির প্রধান কাজ হলো, সংস্কৃত ভাষায় ব্যুত্পত্তি অর্জন। কিন্তু এ বিখ্যাত কলেজটিতে প্রাচ্যবিদ্যার ভড়ং থাকলেও সংসারজীবনে বাস্তবজ্ঞানসহ বিচরণের উপযোগী কোনো বিষয়েই পড়ানো বা পরীক্ষার সুযোগ ছিল না। তাই পরীক্ষার ফল বেরোলে দেখা যায়, বিশজন প্রার্থীর মধ্যে উনিশজনই পরীক্ষায় চূড়ান্ত পারদর্শিতা দেখিয়েছেন আর বাকি একজন ‘খুব সম্মানের সঙ্গে’ উত্তীর্ণ হয়েছেন। এ কলেজটিতে কী ধরনের পড়াশোনা বা পরীক্ষা হতো, তা বিশদ বলার প্রয়োজন নেই। পড়াশোনা শেষে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির ডেপুটি চেয়ারম্যান এক সুদীর্ঘ বক্তৃতায় সিভিলিয়ানদের বুঝিয়ে দেন যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ও ক্ষমতার বিস্তৃতির সঙ্গে তাদের কর্মক্ষেত্র কত বিস্তৃত। কোটি কোটি মানুষের ওপর তারা শাসন প্রভাব বিস্তৃত করতে যাচ্ছেন। এ শাসনকাজে সংস্কৃত ভাষাজ্ঞান বিশেষ সাহায্য করবে। ফারসি ভাষা শিখলে প্রজাদের মঙ্গল হবে। রাজস্ব আদায়ে পেলির ধর্মবিজ্ঞান কাজে আসবে আর গ্রিক ভাষার বইগুলো দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচারে বিশেষ সহায়ক হবে। এ ধরনের উদ্ভট বক্তৃতায় উত্তেজিত হয়ে সংস্কৃত ভাষা, পেলির ধর্মবিজ্ঞান এবং আত্মাভিমানে পূর্ণ হয়ে খোকা সিভিলিয়ানরা ভারত শাসনে এ দেশের মাটিতে পা রাখতেন। এর ফল যে হাস্যকর হয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়।
এ দেশে এসে যত দিন না কাজ পান, তত দিন তারা রাইটার্স বা কেরানি বলে অভিহিত হতেন। এ রাইটার্সদের সংস্কৃত ও ফারসি, উর্দু, মারাঠি, হিন্দি ইত্যাদি দেশী ভাষায় পরিপূর্ণতা লাভের জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বছর দুয়েক পড়াশোনা করতে হতো। বিলাতে হেলিবেরি কলেজে এত সাফল্যজনকভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও এ পোড়া দেশে এসে এত খাটাখাটুনি অপমানজনক মনে করে এসব নবীন চাকরিওলা ফোর্ট উইলিয়ামের সময়টুকু আমোদ-প্রমোদে কাটিয়ে দিতেন। হাজারপাঁচেক টাকা বছরে বেতন পান, তাতে এত আমোদ-ফুর্তির খরচ কুলানো অসম্ভব। অতএব দেদার ধারকর্জ করে বাবুয়ানার রসদ সংগ্রহ করতেন তারা।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে কয়েক মাস পর পর পরীক্ষা নেয়া হয়, ‘‘তখন অগত্যা দু-চার মাস দু-একখানা পুস্তকের দু-চার পাতা এক পণ্ডিত বা মৌলভীর সাহায্যে দেখিয়া লইতে হয়— আর তাহা করিলেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ’, কারণ যিনিই অধ্যাপক, তিনিই পরীক্ষক। এ প্রকার উত্তীর্ণ হইলেই অমনি (রাইটার্স পুঙ্গব) ম্যাজিস্ট্রেটের বা সহকারী কালেক্টর পদে নিযুক্ত হইয়া মফস্বলে প্রেরিত হইতেন, সেখানে সাহেবের প্রাচ্য ভাষার অধ্যয়ন কোনো কাজে লাগিবে না।’’
কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যক্ষ একবার কোম্পানিরই অধীনস্থ এক কর্নেল ছিলেন। তিনি ছাত্রদের পড়াশোনায় আরো মনোযোগী হওয়ার জন্য বহু চেষ্টা করে ও ব্যর্থ হন। কোনো কোনো মহারথী ছাত্র পরীক্ষার সময় অপর সহপাঠীর খাতা থেকে নকলরত অবস্থায় ধরা পড়েন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কলেজ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কর্তৃপক্ষ না দেখার ভান করে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিত না। এ প্রতিভাধর ছাত্রদের কেউ কেউ দেশীয় শিক্ষক— বিশেষ করে ফারসি শিক্ষককে চড়-থাপ্পর দিতেও কুণ্ঠিত হতেন না বিন্দুমাত্র। এ ধরনের ছাত্র যে পরে কেমন বিচারক বা প্রশাসক হবেন, তা অনুমান করা কঠিন নয়।
এমনি করে কোম্পানির প্রশাসনের রথ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে দীর্ঘদিন প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে জেলার ম্যাজিস্ট্রেটরা কি সবাই অকর্মণ্য ছিলেন, তারা কী করেছিলেন এ জোড়াতালি দেয়া প্রশাসনের হাল ধরতে? ম্যাজিস্ট্রেটকে কিন্তু সবসময়ই দোষ দেয়া ও যথার্থ হবে না। তারা একাধারে ম্যাজিস্ট্রেট, কালেক্টর এবং অনেক সময় জজ পর্যন্ত। তাছাড়া ট্রেজারির সম্পূর্ণ দায়িত্ব তার হাতে, এর ওপর একটা জেলার ছোট-বড় এত অনেক কাজের দায়িত্ব ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর চাপানো হয়েছিল, তিনি সবসময় পেরে উঠতেন না।
কাজেই নিচের কর্মচারী ও আমলাদের দিয়ে অনেক কাজ করিয়ে নেয়া হতো। এমনকি কখনো কখনো ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব নিজের পরিচালনাধীন মামলার রায় পর্যন্ত লিখিয়ে নিয়ে নিচে দস্তখত করতেন মাত্র। দৃষ্টান্তস্বরূপ হলওয়েল সাহেবের কথা মনে পড়বে। ‘তিনি খাজনা আদায় করা থেকে রাস্তা মেরামত প্রভৃতি করতেন। পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট বাড়িঘরের অ্যাসেসমেন্ট পর্যন্ত করেছেন।’
১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে পার্লামেন্টে কোম্পানির সনদ নবীকরণের সময় কোম্পানির ডিরেক্টররা বুঝতে পারলেন দেশীয়দের ক্ষোভ এবং ভারতে কোম্পানির প্রশাসনের মাঝারি পর্যায়ে দেশাচার ও দেশীয় রীতিনীতি জানা বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন দেশীয় কর্মকর্তার অভাবে প্রশাসনের চাকা মন্থরগতি হয়ে পড়ছে। প্রায় কর্তাব্যক্তিদের বোধোদয় হলো যে, দেশীয়দের নিয়োগ না দিলে শাসনযন্ত্রের গতি সচল হবে না। ১৮৩৩-এ কিছুটা উদারতা দেখানোর জন্য এবং কিছুটা বাধ্য হয়ে কোম্পানির ডিরেক্টররা এ বাস্তবতা স্বীকার করে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে দেশীয়দের উঁচু পদে নিয়োগ করবেন। ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে এক আইনের খসড়া তৈরি হয়েছিল, তাতে দেশীয় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের কথা ছিল। ভারতে ইংরেজ সরকার দেশীয়দের জন্য পদ দিতে চাইলেও কোম্পানির ডিরেক্টররা তা চাইতেন না। ফলে ’৩৩ খ্রিস্টাব্দে নতুন সনদে উল্লেখিত দেশীয়দের নিয়োগবিধি বিশেষ ফলপ্রসূ হয়নি। অবশেষে ১৮৩৭ খিস্টাব্দে পুলিশ সংস্কারের লক্ষ্যে বার্ড সাহেবের সভাপতিত্বে এক কমিশন বসে। দ্বারকানাথ ঠাকুর এ কমিশনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন যে, দেশীয় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদের আবশ্যকতা— দারোগা ও কেরানি শ্রেণী থেকে প্রমোশন দিয়ে এ ডেপুটি পদ পূর্ণ করা মারাত্মক ভুল হবে। এদের ভদ্রঘরের, শিক্ষিত এবং সদ্বংশজাত হয়ে যদি ইউরোপীয় বা ইউরোপীয় প্রার্থী দিয়ে এ ডেপুটি নিয়োগ দিতে হয়, তাহলে এই প্রার্থীদের দেশীয় ভাষা অবশ্যই জানতে হবে, যাতে কোনো দোভাষীর সাহায্য ব্যতিরেকেই তারা যেন রায়তের অভাব-অভিযোগ শুনতে এবং দরখাস্ত পড়তে পারেন। তারা যেন সম্রান্ত পরিবার থেকে মনোনীত হন এবং ‘এই পদগুলি যেন বর্তমান দারোগা-সেরেস্তাদার ইত্যাদির বেতন বৃদ্ধি ও পদোন্নতির উপায়মাত্র না হয়। এদের মধ্যে এদিক ওদিক দুই-চারিজন ভালো মানুষ থাকিতে পারে। কিন্তু সাধারণত তাহারা কোন কর্মের নহে। এই প্রস্তাবিত অফিসারেরা হয় সরকার বাহাদুর— না হয়— দেওয়ানি আদালত কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন।’ দ্বারকানাথ ঠাকুর এই নতুন অফিসারদের নিয়োগে আরো কিছু সুপারিশ করেছিলেন। যেমন—
‘তাহাদের কর্মক্ষেত্র হইবে জেলার অভ্যন্তরে এবং ফৌজদারি মামলায় তাদের মুন্সেফের সমান ক্ষমতা এবং থানাদারের ওপর তাহাদের আইনত কর্তৃত্ব থাকিবে। বর্তমান দারোগা নিয়োগের ব্যবস্থা অবলোপ করা হউক। এবং কলিকাতার ধরনে থানাগুলির পুনঃসংস্কার করা উচিত। আস্থাবিশেষে জমাদার অথবা তার সহকারী ব্যক্তিগতভাবে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট সমস্ত ঘটনা জানাইবে...।’ দ্বারকানাথের সুপারিশই ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদ সৃষ্টি হলেও তার সবগুলো সুপারিশ পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করা হয়নি। কারণ এগুলো কায়েকটি ইংরেজ শাসনের নিরাপত্তাবিরোধী বলে সর্বাংশে গ্রহণ করা হয়নি।
এ সুপারিশ অনুযায়ী খুব সম্ভবত ১৮৪৩ খিস্ট্রাব্দ থেকে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদ সৃষ্টি হয়।
সেই প্রথম যুগের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যে স্বনামধন্য হলেন (নওয়াব) আবদুল লতিফ, বঙ্কিমচন্ত্র, গৌরদাস বসাক, নবীনচন্দ্র, সঞ্জীবচন্দ্র, পূর্ণচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রনাথ লাল, শ্রী শচন্দের মতো ব্যক্তিত্ব পূর্ণ অফিসার।
সে যুগের ডেপুটি সম্প্রদায়কে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। এক শ্রেণীর হলো, যারা প্রত্যক্ষভাবে এ চাকরিতে নিযুক্ত হয়েছেন (উপরের তালিকা দ্রষ্টব্য) এবং আরেক শ্রেণীর হলো, যারা দারোগা সেরেস্তাগিরি থেকে এমন পদোন্নতি পেয়ে এ পদলাভ করেছেন। বলা বাহুল্য, এ দুই শ্রেণীর ডেপুটিদের আচার-আচরণ এবং শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের বিষয়ে মনোভাব মেরুপ্রমাণ ব্যবধান ছিল। শেষোক্ত ডেপুটিরা শিক্ষা-দীক্ষা এবং যোগ্যতায় বেশ খানিকটা খাটো ছিলেন। ডেপুটিগিরি পদ পাওয়াটাই তাদের কাছে মস্তবড় পাওয়া ছিল। সুতরাং একবার এ মোক্ষলাভ হলে তাদের আরো কোনো পার্থিব আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থাকত না। অন্যদিকে হিন্দু/প্রেসিডেন্সি কলেজ বা কলকাতা মাদ্রাসার ইংরেজি শিক্ষিত ডেপুটিরা দেখতেন বিদ্যা-বুদ্ধিতে তাদের সমান অথবা হীন হওয়া সত্ত্বও শ্বেতাঙ্গ সহকর্মীরা শুধু গায়ের রঙের ঔজ্জ্বলে অনেক বেশি বেতন এবং সুযোগ-সুবিধা পান। ইংরেজি শিক্ষিত সদ্বংশজাত বাঙালি ডেপুটিরা যদি বেশি কর্মতত্পরতা দেখাতেন, সেটাও অনেক সময় ঊর্ধ্বতন সাহেব কর্তৃপক্ষের মনঃপূত হতো না। এ বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল প্রমুখ সবারই কোনো না কোনো সময় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মনোমালিন্য হয়েছিল। সেজন্য উচ্চশিক্ষিত বাঙালি ডেপুটিদের মধ্যে একটা চাপা ক্ষোভ বিরাজ করত। এ চাপা অসন্তোষই আত্মপ্রকাশ করেছে দেশপ্রেমমূলক কবিতা, উপন্যাস ও গানে। এ শুধু অনুমাননির্ভর মন্তব্য নয়, খোদ ইংরেজ সিভিলিয়ান সি.ই বাকল্যান্ডের উক্তিতে এর সমর্থন রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তার Sketches of Social life in India 1884 গ্রন্থ থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করা যেতে পারে।
‘এ দেশে আসার পর তরুণ ইংরেজ সিভিলিয়ানরা দেশীয় অধস্তন গ্রেডের যে কর্মকর্তাদের সংস্পর্শে আসেন, তাদের বলা হয় ডেপুটি কালেক্টর ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। এরা প্রতি জেলাতেই যথেষ্ট কর্তৃত্বের অধিকারী হিসেবে জেলার প্রধান শাসনযন্ত্রের দায়িত্বে নিয়োজিত। এরা সবাই সাধারণত দীর্ঘ বাস্তব অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ কর্মকর্তা। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের তরুণ সিভিলিয়ানরা যদি এদের কারো সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হন, তবে তিনি এদের মধ্যে তার মিত্র এবং বিশ্বস্ত বন্ধু খুঁজে পাবেন। ইনি এদের সঙ্গে বিশ্বস্তার সঙ্গে যেকোনো নতুন বিষয় বা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে পারেন এবং এদেশীয় কর্মকর্তারা সানন্দে তার সরকারি কাজের দুশ্চিন্তা লাঘবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন। যদিও অনেক ডেপুটিই যথাযথ সহূদয়াতক ও মর্যাদা দিয়ে তার উপরের অধিকর্তাদের সম্মান জানাতে দ্বিধা করেন না, তবু এদের মধ্যে কিছু ডেপুটি রয়েছেন, যারা সবসময়ই তরুণ ইংরেজ সিভিলিয়ানদের আন্তরিকতাকে খোলামনে গ্রহণকরণে অপারগ। পুরনো রীতির ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট যারা ক্রমে পদোন্নতি পেয়ে বাস্তব অভিজ্ঞাতায় সমৃদ্ধ হয়ে উপরে উঠেছেন, অথচ ইংরেজি ভাষা আয়ত্তে কখনো তেমন মাথা ঘামাননি। তারাই সাধারণত এ নবাগত অনভিজ্ঞ ইংরেজ সিভিলিয়ানদের বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন। কিন্তু সম্প্রতি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট যারা ইংরেজি এবং ইউরোপীয় ক্ল্যাসিকাল সাহিত্যে দক্ষ, তারাই সম্প্রতি ডেপুটি পদের বেশির ভাগ দখল করে রয়েছেন। এদের ধারণা যে, তারা এ নবাগত সিভিলিয়ান যাদের জেলার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছে এবং যারা মূলত সমস্ত দেশই শাসন করেছেন, তাদের চেয়ে এদেশীয় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটরা সমস্ত কাজই অধিক দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে সক্ষম। ইংরেজ অধিকর্তারা সমস্ত সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করছেন, যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেশীয় ডেপুটিরা প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত হয়ে রয়েছেন। ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, তার জন্য এই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ডেপুটিরা সন্তুষ্ট বা কৃতজ্ঞ নন। ইংরেজ শাসকরা তাদের চোখে সদাই ব্যস্ত নিজেদের সুখ-সুবিধা বেতন-ভাতা বাড়াবার জন্য। সুতরাং এ ডেপুটিরা সবসময় বেতন-ভাতা এবং ক্ষমতা বাড়াবার জন্য দাবি করে চলেছেন; একটি দাবি পূরণ হওয়ামাত্র আরেকটি দাবি তুলে ধরেন তারা।
প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পাস করা ডেপুটিদের সম্পর্কে বাকল্যান্ডের এ উষ্মা নেহাত অকারণ না। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে ডেপুটি বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে এই বাকল্যান্ডের সংঘর্ষ বেধেছিল। বঙ্কিমের জেদের কাছে হার মেনে তিনি বঙ্কিমকে পাঠানো একটি চিঠি ও তার মন্তব্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তদানীন্তন ছোট লাট এলিয়টের সঙ্গেও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ভূমি আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে মতবিরোধ প্রচণ্ড আকার নিয়েছিল। দ্বিজেন্দ্রলাল প্রায় চাকরি হারাতে বসেছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয় যে, তার ভূমি আইনের ব্যাখ্যাই সঠিক, ছোট লাট ভ্রান্তপতিপন্ন হয়েছিলেন। মোদ্দকথা, এই রকম ছোট-বড় বিরোধের ফলে ইংরেজরা লক্ষ করলেন যে, উচ্চশিক্ষিত নেটিভরা মোটেই কর্তাভজা নন, তারা আত্মসচেতন এবং তীক্ষবুদ্ধিসম্পন্ন, অন্যদিকে বিদেশী রাজকর্মচারীদের মধ্যে যোগ্য ও সুদক্ষ ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু ইংরেজ সিভিলিয়ানদের অপদার্থতার জীবনে জনসাধারণ ও বিব্রত হয়ে উঠেছিল। এর পর থেকে ডেপুটিগিরিতে মেধাবী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সংখ্যা যে ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছিল, তার মূলে ইংরেজ কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টার কথাও অস্বীকার করা যায় না।
দারোগা সেরেস্তাদারদের মধ্য থেকে ডেপুটি নেয়া অব্যাহত রইল। এই দারোগা পেশকাররা এতই বেশি উেকাচপ্রবণ ছিলেন যে, অনেক সময় তারা ডেপুটি পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাতে পেছপা হতেন না। তবু যারা নিতেন, তারা পদোন্নতির কারণে আর্থিক ক্ষতিপূরণ সম্পর্কে সচেতন হতেন। বঙ্কিমের মুচিরাম গড়ের ডেপুটি পদ পাওয়ায় তার প্রতিক্রিয়ায় এই পরিস্থিতির অনেকটা প্রমাণ মেলে।
‘আপিসে সংবাদ পৌঁছিল যে, মুচিরামের উচ্চপদ হইয়াছে।... মুচিরামের মাথায় বজ াঘাত হইল। তিনি পেশকারিতে ঘুষ লইয়া অসংখ্য টাকা রোজগার করেন— আড়াই শত টাকার ডেপুটিগিরিতে তাহার কি হইবে? মুচিরাম সিদ্ধান্ত করিলেন ডেপুটিগিরি অস্বীকার করিবেন।...’
এতক্ষণ ডেপুটির চাকরি নিয়ে নানা তত্ত্বকথা বলা হয়েছে, যে ঔপনিবেশিক বাধ্যবাধকতায় এই ডেপুটিগিরি উদ্ভব হয়েছিল, তাও বলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কেমন ছিল সেই আদি ডেপুটিলিগার যুগে পরীক্ষার ধরন, তখন তো কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল না এদের জন্য। তারা কাজ শিখেছেন কীভাবে। ঔপনিবেশিক ভেদবুদ্ধির কারণে কেমন করে ইংরেজ প্রভুদের খামখেয়ালির মোকাবেলা করেছেন? এসব প্রশ্নের সদুত্তর পেতে হলে সরকারি প্রতিবেদনের চেয়ে যারা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সাফল্যজনক ভূমিকা রেখেছেন, তাদের লেখা আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা, অনেক বেশি সহায়ক হবে বলে গবেষকদের অভিমত।
সুতরাং আমরা এখানে তিনজন প্রখ্যাত বাঙালি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের আত্মজীবনী ঘেঁটে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। এ আত্মজীবনী লেখকরা তিনজন স্বনামধন্য বাঙালি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তিনজনই তদানীন্তন পূর্ববঙ্গ নিবাসী। এরা হলেন ফরিদপুরের (নওয়াব) আবদুল লতিফ (খানবাহাদুর) (মুসলিম বাঙ্গলা: আমার জীবনী); পলাশীর যুদ্ধ-এর রচয়িতা চট্টগ্রাম নিবাসী নবীনচন্দ্র সেন (আমার জীবন- প্রথম খণ্ড) এবং টাঙ্গাইলের গিরীশচন্দ্র নাগ (ডেপুটির জীবন)।
উনিশ শতকের ডেপুটি জীবনের আদি, মধ্য ও শেষ পর্বের নানা তথ্য তাদের লেখায় বিধৃত হয়েছে। আবদুল লতিফ ১৮৪৯ সালে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ১৮৭৭ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট পদে উন্নীত হন। আবদুল লতিফ সাতক্ষীরায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত অবস্থায় সেখানকার কৃষকদের ওপর ইংরেজ নীলকরদের নির্যাতন ও শোষণ প্রত্যক্ষ করে ব্যথিত হন। তিনি সেখানকার কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ হতে এবং তাদের অভিযোগের কথা সরকারকে অবহিত করতে উৎসাহ দেন। তিনি নিজেও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অবশেষে তার উদ্যোগেই নীলকরদের অত্যাচার বন্ধ করার জন্য ১৮৬০ সালে ইংরেজ সরকার নীল কমিশন গঠন করে। তার এসব কাজের জন্য ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল লতিফ তার চাকরি জীবনের প্রথমেই নীলকরদের রোষে পড়েন। কলকাতার ব্যবসায়ী ও ঝিকরগাছা নীল কনসার্নের মালিক ফার্গুসন ১৮৫৪ সালের ৯ মে তারিখে বাংলা সরকারের কাছে অভিযোগ করেছিলেন যে, তার কনসার্নের নব্বইটি গ্রামে কারো নীলকরদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ ছিল না, কিন্তু ‘আবদুল লতিফের ক্ষমতাপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে সে এলাকার সমগ্র অংশের রায়তরা নীল বপন করতে এবং চুক্তি মেনে চলতে অস্বীকার করে’ (নীল বিদ্রোহ ব্লেয়ার বি. ক্লিং/বাংলা একাডেমী, ঢাকা)
ঝিকরগাছার ম্যানেজার ম্যাকেঞ্জি অভিযোগ করেন যে, যখনই একজন রায়ত নালিশ জানাত, আবদুল লতিফ তখনই নীল বপন বন্ধ করে দিতেন এবং সেসঙ্গে রায়তদের দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে বলতেন, ম্যাকেঞ্জি আরো গুরুতর অভিযোগ করেন, তার কারখানার কর্মচারীদের উত্তেজিত করছিল এমন কয়েকজন কৃষক নেতার নামসংবলিত তীব্র অভিযোগপত্র ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল লতিফ অগ্রাহ্য করেন এবং ম্যাকেঞ্জির কারখানার লোকদের গ্রামে প্রবেশ বন্ধ করার জন্য পুলিশ পাঠান। ‘নীলকরদের প্রতি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের সম্বোধনেও অবজ্ঞা ফুটে উঠত।’
‘নদীয়ার কমিশনার কর্তৃক আবদুল লতিফের আচরণ তদন্তের পর হ্যালিডে তাঁকে এক কম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকায় বদলি করেন।’ লিখেছেন ব্লেয়ার বি. ক্লিং। তবে পরবর্তী গভর্নর জেনারেলদের অধীনে তিনি সম্মানের সঙ্গে চাকরি করতে পেরেছিলেন।
১৮৬৫ সালে ভারতীয় ব্যবস্থাপক পরিষদে আনীত একটি প্রস্তাবে মুসলিম সমাজে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিলে আবদুল লতিফ একটি স্মারকলিপির মাধ্যমে ইংরেজ সরকারকে এ বিল সংশোধনের পক্ষে যুক্তি প্রদান করেন। বাংলার মুসলিমদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে আবদুল লতিফের অবদান উল্লেখযোগ্য। তার এই প্রচেষ্টার কারণে ১৮৫৪ সালে হিন্দু কলেজ প্রেসিডেন্সি কলেজে রূপান্তর করে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের ছাত্রদের এ কলেজে পড়ার সুযোগ দেয়া হয়। এর আগে হিন্দু কলেজে কোনো অহিন্দু ছাত্র ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেত না।
বঙ্গিমচন্দ্র কোনো আত্মজীবনী না লিখলেও তার মুচিরাম গড়ে এর কাহিনী এবং Bransinism-এ ডেপুটিদের বিশেষ করে প্রথম পর্বের ডেপুটি জীবন ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণায় কীভাবে পর্যুদস্ত হয়েছিল, তার বিশদ বিবরণ কৌতূহলী পাঠকরা পড়ে দেখতে পারেন। দ্বিজেন্দ্রনাল রায় বা ডি. এল. রায় যাকে প্রজারা ‘দয়াল রায়’ বলে অভিহিত করতেন— কোনো স্মৃতিকথা না লিখলেও তার জীবনীতে লর্ড ইলিয়টের সঙ্গে সংঘর্ষের কারণ ও ফলাফল বুঝতে কষ্ট হয় না।
এরা সুদীর্ঘ ৩৩/৩৪ বছর চাকরি করেছেন। কিন্তু সবাই প্রায় চাকরির শেষ প্রান্তে এসে ডেপুটি জীবনের সর্বোচ্চ ধাপ অর্থাৎ সপ্তম স্তরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হতে পেরেছিলেন। ম্যাজিস্ট্রেট বা কমিশনার হওয়া কারো ভাগ্যে জোটেনি। ২০০ টাকায় চাকরি শুরু করে ৩৩ বছর পর ৮০০ টাকায় শেষ করে বিদায় নিয়েছেন। সপ্তম থেকে প্রথম ধাপে প্রমোশন পেতেই জীবন কেটে গেছে। যদিও খানবাহাদুর রায় বাহাদুর খেতাব পেয়েছিলেন আবদুল লতিফ, বঙ্গিমচন্দ্র ও নবীনচন্দ্র সেন। আবদুল লতিফ নওয়াব উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।
ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগে গোড়ার দিকে পরীক্ষার কোনো বালাই ছিল না। তখন শুধু শিক্ষাগতযোগ্যতা, বংশমর্যাদা ও সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে সরকার প্রত্যক্ষ মনোনয়ন দিত। নওয়াব আবদুল লতিফ, বঙ্কিমচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, সঞ্জীবচন্দ্র প্রমুখ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সবাই সরকারি মনোনয়ন বা নিয়োগপত্র পেয়েছিলেন। সে সময় নিযুক্তির আগে কোনো পরীক্ষা হতো না। লর্ড গ্রে বাংলায় গভর্নর হয়ে ডেপুটি নিয়োগের জন্য প্রথম পরীক্ষার নিয়ম চালু করলেন। গ্রে সাহেবের উদ্দেশ্য ভালো ছিল, কারণ পরীক্ষা নেয়া শুরু করলে অযোগ্য লোক ডেপুটি পদে স্থান পাবেন না, তার ধারণা হয়েছিল যারা সভ্রান্ত পরিবারের সন্তান, তারা অনায়সেই ‘সুপারিশ’ জোগাড় করতে পারেন। এবং সচরাচর তারাই ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে থাকেন। পাশাপাশি যাদের বংশ গৌরব নেই, অথচ শিক্ষিত এবং যোগ্য, তারা এ পদ প্রায়ই পান না। অতএব এ সমস্যা দূর করতে গভর্নর সাহেব ঘোষণা দিলেন যে, আগ্রহী ব্যক্তিরা আগেই একটি পরীক্ষা দিয়ে তাদের নাম ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রেজিস্টারিতে লেখাতে পারেন। ডেপুটি পদ কেবল এ পরীক্ষায় সফল প্রার্থীদের দেয়া হবে। নিযুক্তির পর আবার তাদের পরীক্ষা দিতে হবে। দু-দুবার পরীক্ষা নেয়ার ফলে অযোগ্য প্রার্থী স্বভাবতই ঝরে পড়বে। এমনটি ভাবাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু এ প্রত্যাশা সবসময় পূরণ হয়নি।
নবীনচন্দ্র সেন গ্রে সাহেব জারিকৃত পরীক্ষা দিয়েই ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলেন। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের গ্র্যাজুয়েট হওয়ায় এবং বিদ্যাসাগরের মতো ব্যক্তিদের সুপারিশ হাতে থাকায় সরকারের কাছ থেকে সহজেই ‘নমিনেশন রোল’ পেয়েছিলেন। এবার তাকে লিখিত পরীক্ষা দিতে হবে— কেমন ছিল সেই পরীক্ষা— নবীনচন্দ্র জানাচ্ছেন, ‘তার নিয়োগপত্রে লেখা আছে সাহিত্যে, অংকে, ইতিহাসে পরীক্ষা হইবে। সাহিত্যের কোনো পুস্তক, কী ইতিহাস, কোন দেশের ইতিহাস, তাহা পর্যন্ত লেখা নাই। তাহার পর আরো সর্বনাশ— বিজ্ঞান। তখন বিজ্ঞান স্কুল-কলেজে পাঠ্য ছিল না। তাহাতে আবার কী বিজ্ঞান, কোন বিজ্ঞানের পুস্তক, তাহা কিছুই লেখা নাই। নবীনচন্দ্রের কাছে এ পরীক্ষা শুধু নতুন-ই নয়, পরীক্ষাটি ছিল Competitive examination (প্রতিযোগী পরীক্ষা)— সুতরাং তার আশঙ্কা বোধগাম্য।
লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার উইলিয়াম গ্রে যোগ্যপ্রার্থী নির্বাচনের উদ্দেশ্যে ৩৪টি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদভিলাষীকে পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচন করে ক্রমে ক্রমে পরীক্ষার ফল অনুসারে নিয়োজিত করার নিয়ম করে গেছেন। এই ৩৪ জনের মধ্যে ১৭ জন ইংরেজ এবং ১৭ জন দেশীয় নিয়োজিত হবেন। এ পরীক্ষার জন্য ৫১ জন ইংরেজ এবং ৫১ জন দেশীয় প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে পরীক্ষা দেয়ার জন্য অনুমতি পেতে পারেন। কেবল শিক্ষিত এবং সদ্বংশীয়দেরই মনোনীত করা হবে। এ ৫১ জনের মধ্যে পরীক্ষায় যে ১৭ জন প্রথম দিকে নিয়োজিত থাকবেন, তাদের মধ্য থেকে শীর্ষ নয়জন তত্ক্ষণাৎ কাজে নিয়োজিত হবেন। অবশিষ্ট আটজন ক্রমে ক্রমে পদ পাবেন। নবীনচন্দ্রের মুদ্রিত নিয়োগপত্রের সঙ্গে এ নিয়মাবলি যুক্ত ছিল। যথাসময়ে এ নিয়মাবলিসহ গভর্নমেন্টের এক গেজেটে সংবাদপত্রে প্রকাশ করা হয়েছিল।
নবীনচন্দ্রসহ ১০২ জন পরীক্ষার্থী কলকাতা টাউন হলে পরীক্ষায় বসলেন। পরীক্ষক খ্যাতনামা কেএম ব্যানার্জি ওরফে ‘কৃষ্ট বন্দ্য’ এবং প্রেসিডেন্সির কমিশনার চ্যাপম্যান সাহেব। ‘দুই দিন পরীক্ষা হইল। তৃতীয় দিবস রচনা— পূর্বাহ্নে বাঙ্গালা, অপরাহ্নে ইংরাজি’। সে সময় প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার গুজবে পরীক্ষার্থীরা আতঙ্কিত ও বিব্রত হতো। কলকাতায় গুজব রটল ‘প্রশ্ন চুরি’ হয়েছে। তখনো নকলবাজ পরীক্ষার্থীর অভাব ছিল না। পরীক্ষার গার্ড দেখলেন, হাইকোর্টের কোনো জজের জামাতা তার পকেট থেকে একতাড়া কাগজ বের করছেন। চ্যাপম্যান সাহেব খবর পেয়ে তাকে হাতেনাতে ধরে ফেললেন। দেখা গেল, ‘জামাইবাবু বাড়ি হইতে রচনা রচিয়া লইয়া আসিয়াছেন, তত্ক্ষণাৎ তাহাকে অর্দ্ধচন্দ্র দেয়া হইল, টাউন হলে একটা গোল পড়িয়া গেল। চ্যাপম্যান ভ্রুকুটি করিয়া তাহা থামাইলেন।’
নবীনচন্দ্র আরো লিখেছেন: সকালে পরীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েট দল রব তুললেন— তারা পরীক্ষা দেবেন না, যখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে। ‘এবার যত বড় মানুষের যত এড়ে পাশ হইবে আর আমাদের দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলঙ্ক হইবে।’ চ্যাপম্যান এবং পাদরি কৃষ্ট বন্দ্যে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বিকেলের পরীক্ষা শেষ করলেন।
তখন কোনো ট্রেনিং একাডেমি ছিল না, কর্মকমিশনও ছিল না। সরকারি নিরাপত্তা প্রেস তো দূরের কথা, প্রশ্নপত্র হাতে লিখে ওই হাতে লেখা কপি ছাপিয়ে কাজ সারা হতো। অনেক সময় ছাপা অস্পষ্ট হয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি ঘটাত, বিশেষ করে আরবি-উর্দু টানা হাতের লেখার কারণে। পরীক্ষার ফল গেজেট হয়ে পত্রিকায় ছাপা হলো, নবীনচন্দ্র প্রথম ব্যাচেই পাস করে তত্ক্ষণাৎ যশোরের ডেপুটির চাকরিতে যোগ দিলেন।
এবার শোনা যাক কেমন ছিল সে আমলের নব্য ডেপুটিদের হাতে-কলমে ট্রেনিং।
নবীনচন্দ্র যশোরে পৌঁছে ম্যাজিস্ট্রেট মনরো সাহেবের সঙ্গে ‘জীবনে প্রথম ধড়াচূড়া যথাসাধ্য বান্ধিয়া’ সাক্ষাৎ করতে গেলেন। শিষ্ঠাচার বিনিময়ের পর এবং নবীনচন্দ্রের পারিবারিক ও বংশমর্যাদার তথ্য তালাশ করে মনরো সাহেব নবাগত ডেপুটির জন্য যশোর শহরের একটি খণ্ডচিত্র তুলে ধরলেন। তার চাকরি জীবনের প্রথম পাঠটি নবীনচন্দ্রের নিজের ভাষায় শোনা যাক :
‘সমস্ত শহরের (যশোর) কে কেমন লোক, কে হিন্দু, কে ব্রাহ্মণ, কে মদ খায়, কে বেশ্যালয়ে যায়, আমি (নবীনচন্দ্র) কাহার সঙ্গে মিশিব, কাহার সঙ্গে মিশিব না ইত্যাদি বিষয়ে একটি দীর্ঘ উপদেশ প্রদান করিয়া বলিলেন— তুমি আজ গিয়া বিশ্রাম করো, কাল কালেক্টরি কাচারিতে আমার কাছে উপস্থিত হইও।’ আমার বুক হইতে যেন একটি পাথর নামিয়া গেল।
পরদিন নিয়মমাফিক মনরো সাহেব তাকে ডেপুটির চাকরিতে দীক্ষার শপথ পাঠ করলেন এবং তাতে স্বাক্ষর করিয়ে নিলেন। তারপর তার কক্ষের পাশে একটি ছোট্ট ঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন ‘এই তোমার এজলাস, তোমার টেবিলের উপর দুটি বান্ডিল আছে। সাবধানের সঙ্গে এ দুটি পড়ে বাড়ি চলে যাও।’ ঘরটি ছোট এবং কোনো রেলিং না থাকায় ভীত নবীনচন্দ্র একটু অস্বস্তি প্রকাশ করলে মনরো সাহেব আবার নবীনচন্দ্রকে তার কক্ষে নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন। এই খানে রেলিং আছে কি? নতুন ডেপুটির উত্তর না নেই। কিন্তু মনরো সাহেবের নামই যথেষ্ট। তার ভয়ে কেউ এখানে আসবে না। সাহেব একটু হেসে বললেন, ‘তোমারও নাম করিতে হইবে। তুমি সে রূপ নাম করিতে না পারিলে যশোহরের বদমাসদিগকে কখনো শায়েস্তা করিতে পারিবে না— এটিই তোমার প্রথম শিক্ষা।’ ঔপনিবেশিক প্রভুর ঔপনিবেশিক সীমাবদ্ধতা ও বাধ্যবাধকতার দরুন এহেন প্রথম দীক্ষাদান আশ্চর্যজনক হলেও অস্বাভাবিক নয়। নবীনচন্দ্র এজলাসে গিয়ে সেই বান্ডিল দুটি মনোযোগ দিয়ে পড়ে শেষ করলেন এবং একটিতে মনরো সাহেবের বিচারের কয়েকটি কালেক্টরির নথি ও সার্কুলার এবং অন্যটিতে তার বিচারাধীন কয়েকটি ফৌজদারি নথি ও সার্কুলার।
পরদিন অফিসে মনরো তাকে বাকি খাজনা ও ফৌজদারি মোকদ্দমা দিলেন। এবার তার হাতে-কলমে বিচার করতে হবে। নবীন হাকিমের সহায়তা করার জন্য একটি উপযুক্ত মুসলমান সেরেস্তাদার দিলেন সাহেব, তবে সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানালেন, এ সেরেস্তাদারের মতো ‘এমন বদমায়েশ আর নাই’, নতুন হাকিমকে এ ব্যক্তিটিকে শাসন করতে হবে। ডেপুটির ইতস্তত ভাব দেখে হেসে বললেন, ‘তুমি ইহাকে শাসনে রাখিতে পারিলে কখনও কোনো আমলা তোমাকে আর হাত দেখাইতে পারিবে না। এটি তোমার দ্বিতীয় শিক্ষা’।
নবীনচন্দ্র মনরোর বিচারের পদ্ধতি অনুসরণ করে সে মোতাবেক মামলা শেষ করলেন। মনরো সাহেব তার প্রথম হাকিমি কাজ দেখে খুশি হয়ে বললে, ‘এখন আর তোমাকে আমার শিক্ষা দিবার বড় কিছু নাই।’ তবে যত শীঘ্র সম্ভব ফৌজদারি আইন দুখানি এবং দশ আইনধারা অবশ্য পড়ে ফেলতে হবে বলে উপদেশ দিলেন।
নবীন হাকিম নবীনচন্দ্র লিখেছেন যে, সেই প্রথম দিনের কাজে লোকের কাছে তিনি একটি ক্ষুদ্র অবতার হয়ে পড়লেন। বলা বাহুল্য, ‘যশোরের বদমাশরা’ নবীনচন্দ্রকে তেমন মুশকিলে ফেলতে পারেনি। তিনি এখানে বেশ আনন্দে দিন কাটিয়েছিলেন। শিশির কুমার ঘোষের মতো অমৃতবাজার পত্রিকার দুঁদে সম্পাদকের নিজ এলাকা হওয়া সত্ত্বেও।
নবীনচন্দ্রের আত্মজীবনী হতে জানা যায়, সেই সময় ডেপুটিদের নিয়োগের পর দুটি পরীক্ষা দিতে হতো, একটি লোয়ার স্ট্যান্ডার্ড পরীক্ষা অর্থাৎ প্রথম বিভাগীয় পরীক্ষা। অন্যটি হায়ার স্ট্যান্ডার্ড পরীক্ষা। এক এক পরীক্ষা তিনবার উত্তীর্ণ না হতে পারলে ‘ডেপুটিলীলা শেষ’। তবে চাকরিতে ঢোকার ছয় মাসের মধ্যে প্রথম পরীক্ষা দিতে হতো।
বঙ্কিমচন্দ্রের ছোট ভাই সঞ্জীবচন্দ্র সহজেই বিদ্যা ও বংশমর্যাদাগুণে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ পেয়েছিলেন। কিন্তু বিভাগীয় পরীক্ষায় পাস না করতে পারায় চাকরিতে বহাল থাকতে পারেননি তিনি।
গ্রে সাহেব ডেপুটিদের নিয়োগে সুপারিশের উৎপাত কিছু কমাতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। স্যার গ্রের পর জর্জ ক্যাম্পবেল গভর্নর হয়ে এলেন। তার ধারণা বাঙালিরা সাধারণত শারীরিকভাবে দুর্বল। অতএব, ব্যায়াম শিক্ষায় উৎসাহ দেয়ার জন্য ডেপুটি পদে বলিষ্ঠ ব্যক্তিদের কিছুটা সুবিধা দিতে মনস্থির করলেন। তাদের প্রাথমিক কাজ শেখার জন্য সাব-ডেপুটি নামের নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়। যারা ঘোড়ায় চড়া, সাঁতার এবং দ্রুত হাঁটতে পারঙ্গম, তাদের সাব-ডেপুটি হবার অধিকারী করা যায়। এ পদের জন্য সামান্য কিছু জরিপ, জমাবন্দি আর আইন জানা আবশ্যক। এর ফলে দারোগা, স্কুলশিক্ষক, মুহুরি প্রমুখ ব্যক্তি প্রথমে সাব-ডেপুটি হয়ে পরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পর্যন্ত হয়েছেন। এদের অনেকে ‘ক্যাম্পবেলের উট’ বলে রগড় করেছেন। কারণ এরা বলিষ্ঠ, কষ্টসহিষ্ণু।
অমৃতবাজারের সম্পাদক শিশির কুমার ঘোষ স্যার জর্জ ক্যাম্পবেলের কেতাবি বিদ্যার বাইরে বোটানি, সারভেয়িং, জিমন্যাস্টিক, সাঁতার, অশ্বারোহণ ইত্যাদি বিদ্যায় ভাবী ডেপুটিদের পারদর্শী করে তোলার সংকল্পকে ব্যঙ্গ করে তার অমৃতবাজার পত্রিকা ২/৫/১৮৭২ তারিখের সংখ্যায় একটি কার্টুন ছাপান। কার্টুনটিতে আজ্ঞারত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে এক সাহেব। সাহেবের সামনে একটি ঘোড়ার লাগাম ধরে, অবনতশিরে দণ্ডায়মান আর একজন (বাঙালি), তার পরনে দেশীয় পোশাক, কোমর থেকে আবার শিকলের বাঁধন। এ শৃঙ্খলাবদ্ধ মানুষটি হলো ‘মডেল ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট’।
‘মডেল ডেপুটি’ চিহ্নিতকরণের জন্য বিধিগুলো পদ্যে কার্টুনের নিচে দেয়া হয়েছে
সেলামে মজবুত অশ্বারোহণেতে
লাঙ্গুল স্থানে চেন কম্পাস কানেতে
তিন হাত সাত ইঞ্চি দুই আঙ্গুল পা দুটি
আমাদের হুজুরের মনমতো ডেপুটি
লে. গভর্নর ক্যাম্পবেল চাকরিরত পুরনো ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটদেরও ঘোড়ায় চড়া পরীক্ষা নিতে আদেশ করলে নানা হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। একজন প্রাচীন সম্প্রদায়ের ডেপুটিকে তার ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তা প্রশ্ন করলেন, বাবু, আপনি চড়তে জানেন? উত্তর— জানি। প্রশ্ন— কী চড়েন (অর্থাৎ বড় ঘোড়া না পনি) উত্তর পাল্কি!!
সাহেব হো হো করে হেসে উঠলেন এবং বললেন, পরীক্ষা নেয়ার আদেশ হয়েছে, তবে তিনি চড়তে জানেন না বলেই রিপোর্ট যাবে। বৃদ্ধ ডেপুটি সাহেবকে দেখলেন বেগতিক। একে তো তিনি বিভাগীয় পরীক্ষা দিতে পারেননি বলে তার বেতন বৃদ্ধি বন্ধ। এত দিন দুশ টাকা পেতেন। এখন রিপোর্ট গেলে চাকরি যাবে। লে. গভর্নর যে সে লোক নন স্যার জর্জ ক্যাম্পবেল। তিনি সাহেবকে অনুনয়-বিনয় করে বললেন, ঘোড়া চড়তে জানতাম। এখন দুশ টাকা বেতন মাত্র, ঘোড়ার খরচ চলে না। সাহেব তাকে কারো একটা ঘোড়া ধার করে আনতে বললেন। তিনি গাধার মতো দেখতে একটি টাট্টু ঘোড়া নিয়ে এলেন। বহু কসরৎ করে চড়ার পর এবং প্রচণ্ড পীড়ন সত্ত্বেও সে টাট্টু একপাও যেত রাজি হলো না। সাহেব হেসে বললেন— বাবু। আপনার আর পরীক্ষা দিতে হবে না।
বঙ্কিমের ক্রমাগত বদলি, পদোন্নতি বিলম্ব এবং তার Bransinism রচনা প্রভৃতির প্রভাবে শিক্ষিত বাঙালি যুবকদের ডেপুটিগিরির প্রতি কিছুটা মোহভঙ্গ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবু বাঙালি মধ্যবিত্তের চাকরি জোগানোর পরিধিটি এখনকার মতো তখনো খুব বড় ছিল না। ফলে বৈষম্য, অপমান লাঞ্ছনার মুখোমুখি হতে হবে জেনেও ডেপুটির চাকরি ছাড়া মেধাবী বাঙালি ছাত্রদের অন্য কোনো উপায় ছিল না।
এমনি সামাজিক এবং প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে টাঙ্গাইলের এক অখ্যাত গ্রামের প্রায় অসচ্ছল একটি পরিবারের কৃতী সন্তান গিরীশচন্দ্র নাগ ১৮৯২, ৩০ জুন প্রবেশনারি ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে দুমকায় কাজে যোগদান করেন।
নবীনচন্দ্রের সঙ্গে গিরীশ নাগের সময়ের ব্যবধান খুব কম নয়। ডেপুটির চাকরিতে কিছু পরিবর্তন সত্ত্বেও নিয়োগে ক্যাম্পবেল সাহেবের বিধি-বিধান আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। পরীক্ষার বিষয়গুলোতে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন লক্ষণীয়। চাকরির বৈষম্য ও উপরে ওঠার গতি নবীনচন্দ্রের যুগের মতোই মন্থর। বেশির ভাগ ডেপুটিই হিন্দু পরিবারের সন্তান। তবে দু-চারজন মুসলিম ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটও নজরে পড়ে। তাদের অনেকেই সাবডিভিশনাল অফিসার পর্যন্ত হয়েছিলেন।
‘গিরীশ নাগ বিএ পাস করে কলকাতা গেজেটের এক নোটিসে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও সাব-ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্তির জন্য আগামী মার্চ মাসে পরীক্ষা হবে বলে সংবাদ পেলেন।’ পেনাল কোড, সিভিল অ্যান্ড ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোডস, এভিডেন্স অ্যাক্ট এবং কয়েকখানা রেগুলেশন Field’s introduction to the Regulations, Survey and Mensuration প্রভৃতি কয়েকখানা বই এই পরীক্ষার জন্য পড়তে হবে। প্রত্যেক প্রার্থীকে ওই পরীক্ষার জন্য Riding এবং Health Certificate দাখিল করিতে হইব। লক্ষণীয়, নবীনচন্দ্রের সময় অশ্বারোহণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার সার্টিফিকেট প্রয়োজন হয় নাই। বিষয়বস্তু ছিল সাধারণ পড়াশোনার আওতাভুক্ত। পেনাল কোড, এভিডেন্স অ্যাক্টের কোনো বালাই ছিল না তখন।
গিরীশ নাগ জীবনে কখনো ঘোড়ায় চড়েননি। তাই একিট ভুটিয়া ঘোড়া সহিস জোগাড় করে Riding শিখে নেন। কোচবিহার নিয়ে। এর পর Superintent of State-এর বাড়িতে আরো কয়েকজন পরীক্ষার্থীর সঙ্গে ১০/১৫ মিনিট অশ্বারোহণের নানা কসরত দেখিয়ে পরীক্ষায় পাস করলেন। সাহেব একখানা সার্টিফিকেট দিলেন। সার্টিফিকেট ফর্ম এ রকম:
“I have seen so and so ride. He can seat a pony on gallop and trot and rides well enough for all practical purposes.”
এর পর civil surgen-এর কাছ থেকে হেলথ সার্টিফিকেট নিয়ে নির্ধারিত ফর্মে পরীক্ষার অনুমতির জন্য দরখাস্ত ও ফি প্রভৃতি বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েটে পাঠিয়ে দিলেন। ১৮৯২-এর মার্চ মাসে কলকাতার সিনেট হাউজে পরীক্ষা শুরু; তিন কি চারদিন দুবেলা পরীক্ষা হতো। Law, English, Essay, Translation-এ পরীক্ষা ভালো হলো; কিন্তু Criminal প্রসিডিউর কোডের দু-একটি প্রশ্ন না বুঝতে পেরে ভুল উত্তর দেয়ায় গিরীশের পরীক্ষা পাসে একটা সংশয় বয়ে গেল।
টাঙ্গাইলে বাড়িতে বসে ছুটি উপভোগে ব্যস্ত গিরীশ। জুন মাসে গেজেট দেখে জানতে পারেন তিনি পরীক্ষায় সপ্তম স্থান অধিকার করে প্রবেশনারি ডেপুটি কালেক্টর পদ পেয়েছেন। তাকে বিহার প্রদেশে সাঁওতাল পরগণা জেলার হেডকোয়ার্টার দুমকায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
দুমকায় গিরীশ নাগকে সেখানকার ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে কাজ শিখতে হয়েছিল। তার প্রথম দায়িত্ব কমিশনারকে নিজের ডাক খোলার দায়িত্ব তার হাতে দিয়ে বলেন, তুমি আমার দৈনিক ডাক খুলবে এবং সব চিঠি মনোযোগ দিয়ে পড়বে। এতে অনেক বিষয় শিখতে পারবে। পড়ার পর সে চিঠিগুলো সেরেস্তাদারের কাছে পাঠাবে। তিনি বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে বিলি করবেন। কিছুদিন পর ওইসব তোমাকেই বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে পাঠাতে হবে। পরে এ তরুণ প্রবেশনারকে একজন ইংরেজ সদর সাবডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে কাজ শিখতে পাঠানো হলো। তিনি মাসে মাসে তাকে দু-একটি Petty enquiry করতে দিতেন। বলা বাহুল্য, এসব কাজ দুমকা শহরের বাইরের এলাকায় গিয়ে করতে হতো; একমাত্র বাহন ঘোড়ায় চেপে। এভাবে গিরীশ চন্দ্র নাগের ডেপুটি জীবন বিকশিত হতে লাগল। একই মাসে নারী নির্যাতনের তদন্ত, স্ত্রী হত্যার তদন্ত করে তিনি উপরিওয়ালাদের বাহবা পেয়েছিলেন।
এবার সে আমলের ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষা সম্পর্কে একটু আলোচনা প্রাসঙ্গিক হতে পারে। মে মাসে গিরীশ চন্দ্রের ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষা— High Sandard-এর পরীক্ষা। পরীক্ষা কেন্দ্র দুমকা। ডেপুটি কমিশনার পরীক্ষার প্রেসিডেন্ট পরীক্ষা শুরু হওয়ার পরই চলে গেলেন। অন্য সিনিয়র ডেপুটি কালেক্টর একজন গার্ড হিসবে রইলেন। এবার গিরীশচন্দ্রের ভাষায় এ পরীক্ষার সংক্ষিপ্ত বিবরণ শোনা যাক:
‘আমরা ১৫/১৬ জন পরীক্ষার্থী ছিলাম। বেশ পরস্পর কথোপকথন ও দেখাশুনা চলিতে লাগিল। এইভাবে দুই কি তিনদিনে পরীক্ষা শেষ হইল। একদিন একজন ইউরোপিয়ান গার্ড আমাদিগকে প্রশ্নোত্তর বলিয়া দিতে আগ্রহ প্রকাশ করিলেন। সেদিন “With books”, Law পরীক্ষা হচ্ছিল। Guard একটি প্রশ্নোত্তর বলিয়া দিলেন, তাহা ভুল। আমি সে উত্তর লিখিলাম না। যাহা ঠিক উত্তর তাহা লিখিলাম। Higher Standard completely পাস করিলাম। তাহার পরই 2nd Class Magistrate-এর ক্ষমতা পাইলাম।
ফৌজদারি ও দেওয়ানি মোকদ্দমা করিতে লাগিলাম। দেওয়ানি মোকদ্দমা বেশ কয়েক হাজার নিষ্পত্তি করিলাম।”
১৯২৫ সালে প্রায় ৩২ বছর ৬ মাস চাকরি করার পর গিরীশচন্দ্র আবসর গ্রহণ করলেন। মাসিক পেনশন ৫০০ টাকা। তার একমাত্র দুঃখের কারণ হিসেবে উল্লখ করেছেন হঠাৎ আয় একেবারে কমে যাওয়া। নিজেই লিখেছেন যে, তিনি অবসরের জন্য অনেক দিন হতে অপেক্ষা করছিলেন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে দাসত্ব শৃঙ্খল শেষ দিকে অশান্তির কারণ হয়ে উঠেছিল। গিরীশচন্দ্রের অবসর পাওয়ার পর যে মনোভাব আমরা দেখতে পাই, তা সে যুগের প্রায় সব বাঙালি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের মনোভাবের অনুরূপ। কারণ কমবেশি প্রায় সবাই ন্যায্য প্রাপ্য প্রমোশন হতে বঞ্চিত হয়েছিলেন ঊর্দ্ধতন শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তাদের বৈরী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য। গিরীশচন্দ্রের আক্ষেপভরা মন্তব্য আদৌ অতিশয়োক্তি নয়, মির্মম বাস্তব সত্য। তিনি লিখেছেন:
যদি আমার ন্যায্য প্রাপ্য প্রমোশনগুলি পাইতাম, তাহা হইলে মনের ভাব কিরূপ হইত জানি না, কিন্তু চাকরির জীবনে সরকার কর্তৃক যেদিন হইতে অনাদৃত হইতেছিলাম, সেদিন হইতেই আমার মোহ ঘুচিয়াছিল। তবে পরিবার ভরণপোষণের একান্ত গুরুভার বহনের জন্যই লাঞ্ছিত অবস্থায়ও কর্মত্যাগ করিতে পারি নাই। এখন স্বাভাবিক নিয়মের বশবর্তী হইয়া অবসর গ্রহণ করিলাম। মনে একটা শান্তিও আসিল, কেননা কতকটা স্বাধীনতা লাভ করিলাম। দশটায় তাড়াতাড়ি স্নানাহার সম্পন্ন করিয়া, পোষাক আঁটিয়া দ্বিচক্র গাড়িতে ছুটিয়া কারাগারসদৃশ বিচার বা অবিচারালয়ে কিংবা অফিসে প্রবেশ, দুর্নীতিপরায়ণ, অশান্তিজনক ও অপ্রীতিকর আবহাওয়াতে ৬/৭ ঘণ্টা বাস, একঘেয়ে নীরস মামলা মোকদ্দমা বা অফিসের কার্য্য করা, উপরিস্থ কর্মচারীর অনুগ্রহ, নিগ্রহের জন্য সর্বদা উত্কণ্ঠিত থাকা— এই সকল বিড়ম্বনা হইতে অব্যাহিত পাইলাম।
এখানে বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটদের এহেন ভাগ্য ইংরেজ আমল পার হয়ে ঔপনিবেশিক পূর্ব পাকিস্তান আমলের শেষ পর্ব পর্যন্ত, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া, প্রায় একই রকম ছিল।
পারিবারিক ও বংশমর্যাদার তথ্য তালাশ করে মনরো সাহেব নবাগত ডেপুটির জন্য যশোর শহরের একটি খণ্ডচিত্র তুলে ধরলেন। তার চাকরি জীবনের প্রথম পাঠটি নবীনচন্দ্রের নিজের ভাষায় শোনা যাক :
‘সমস্ত শহরের (যশোর) কে কেমন লোক, কে হিন্দু, কে ব্রাহ্মণ, কে মদ খায়, কে বেশ্যালয়ে যায়, আমি (নবীনচন্দ্র) কাহার সঙ্গে মিশিব, কাহার সঙ্গে মিশিব না ইত্যাদি বিষয়ে একটি দীর্ঘ উপদেশ প্রদান করিয়া বলিলেন— তুমি আজ গিয়া বিশ্রাম করো, কাল কালেক্টরি কাচারিতে আমার কাছে উপস্থিত হইও।’ আমার বুক হইতে যেন একটি পাথর নামিয়া গেল।
পরদিন নিয়মমাফিক মনরো সাহেব তাকে ডেপুটির চাকরিতে দীক্ষার শপথ পাঠ করলেন এবং তাতে স্বাক্ষর করিয়ে নিলেন। তারপর তার কক্ষের পাশে একটি ছোট্ট ঘরে নিয়ে গিয়ে বললেন ‘এই তোমার এজলাস, তোমার টেবিলের উপর দুটি বান্ডিল আছে। সাবধানের সঙ্গে এ দুটি পড়ে বাড়ি চলে যাও।’ ঘরটি ছোট এবং কোনো রেলিং না থাকায় ভীত নবীনচন্দ্র একটু অস্বস্তি প্রকাশ করলে মনরো সাহেব আবার নবীনচন্দ্রকে তার কক্ষে নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন। এই খানে রেলিং আছে কি? নতুন ডেপুটির উত্তর না নেই। কিন্তু মনরো সাহেবের নামই যথেষ্ট। তার ভয়ে কেউ এখানে আসবে না। সাহেব একটু হেসে বললেন, ‘তোমারও নাম করিতে হইবে। তুমি সে রূপ নাম করিতে না পারিলে যশোহরের বদমাশদিগকে কখনো শায়েস্তা করিতে পারিবে না— এটিই তোমার প্রথম শিক্ষা।’ ঔপনিবেশিক প্রভুর ঔপনিবেশিক সীমাবদ্ধতা ও বাধ্যবাধকতার দরুন এহেন প্রথম দীক্ষাদান আশ্চর্যজনক হলেও অস্বাভাবিক নয়। নবীনচন্দ্র এজলাসে গিয়ে সেই বান্ডিল দুটি মনোযোগ দিয়ে পড়ে শেষ করলেন এবং একটিতে মনরো সাহেবের বিচারের কয়েকটি কালেক্টরির নথি ও সার্কুলার এবং অন্যটিতে তার বিচারাধীন কয়েকটি ফৌজদারি নথি ও সার্কুলার।
পরদিন অফিসে মনরো তাকে বাকি খাজনা ও ফৌজদারি মোকদ্দমা দিলেন। এবার তার হাতে-কলমে বিচার করতে হবে। নবীন হাকিমের সহায়তা করার জন্য একটি উপযুক্ত মুসলমান সেরেস্তাদার দিলেন সাহেব, তবে সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানালেন, এ সেরেস্তাদারের মতো ‘এমন বদমায়েশ আর নাই’, নতুন হাকিমকে এ ব্যক্তিটিকে শাসন করতে হবে। ডেপুটির ইতস্তত ভাব দেখে হেসে বললেন, ‘তুমি ইহাকে শাসনে রাখিতে পারিলে কখনও কোনো আমলা তোমাকে আর হাত দেখাইতে পারিবে না। এটি তোমার দ্বিতীয় শিক্ষা’।
নবীনচন্দ্র মনরোর বিচারের পদ্ধতি অনুসরণ করে সে মোতাবেক মামলা শেষ করলেন। মনরো সাহেব তার প্রথম হাকিমি কাজ দেখে খুশি হয়ে বললে, ‘এখন আর তোমাকে আমার শিক্ষা দিবার বড় কিছু নাই।’ তবে যত শীঘ্র সম্ভব ফৌজদারি আইন দুখানি এবং দশ আইনধারা অবশ্য পড়ে ফেলতে হবে বলে উপদেশ দিলেন।
নবীন হাকিম নবীনচন্দ্র লিখেছেন যে, সেই প্রথম দিনের কাজে লোকের কাছে তিনি একটি ক্ষুদ্র অবতার হয়ে পড়লেন। বলা বাহুল্য, ‘যশোরের বদমাশরা’ নবীনচন্দ্রকে তেমন মুশকিলে ফেলতে পারেনি। তিনি এখানে বেশ আনন্দে দিন কাটিয়েছিলেন। শিশির কুমার ঘোষের মতো অমৃতবাজার পত্রিকার দুঁদে সম্পাদকের নিজ এলাকা হওয়া সত্ত্বেও।
নবীনচন্দ্রের আত্মজীবনী হতে জানা যায়, সেই সময় ডেপুটিদের নিয়োগের পর দুটি পরীক্ষা দিতে হতো, একটি লোয়ার স্ট্যান্ডার্ড পরীক্ষা অর্থাৎ প্রথম বিভাগীয় পরীক্ষা। অন্যটি হায়ার স্ট্যান্ডার্ড পরীক্ষা। এক এক পরীক্ষা তিনবার উত্তীর্ণ না হতে পারলে ‘ডেপুটিলীলা শেষ’। তবে চাকরিতে ঢোকার ছয় মাসের মধ্যে প্রথম পরীক্ষা দিতে হতো।
বঙ্কিমচন্দ্রের ছোট ভাই সঞ্জীবচন্দ্র সহজেই বিদ্যা ও বংশমর্যাদাগুণে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ পেয়েছিলেন। কিন্তু বিভাগীয় পরীক্ষায় পাস না করতে পারায় চাকরিতে বহাল থাকতে পারেননি তিনি।
গ্রে সাহেব ডেপুটিদের নিয়োগে সুপারিশের উৎপাত কিছু কমাতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। স্যার গ্রের পর জর্জ ক্যাম্পবেল গভর্নর হয়ে এলেন। তার ধারণা বাঙালিরা সাধারণত শারীরিকভাবে দুর্বল। অতএব, ব্যায়াম শিক্ষায় উৎসাহ দেয়ার জন্য ডেপুটি পদে বলিষ্ঠ ব্যক্তিদের কিছুটা সুবিধা দিতে মনস্থির করলেন। তাদের প্রাথমিক কাজ শেখার জন্য সাব-ডেপুটি নামের নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়। যারা ঘোড়ায় চড়া, সাঁতার এবং দ্রুত হাঁটতে পারঙ্গম, তাদের সাব-ডেপুটি হবার অধিকারী করা যায়। এ পদের জন্য সামান্য কিছু জরিপ, জমাবন্দি আর আইন জানা আবশ্যক। এর ফলে দারোগা, স্কুলশিক্ষক, মুহুরি প্রমুখ ব্যক্তি প্রথমে সাব-ডেপুটি হয়ে পরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পর্যন্ত হয়েছেন। এদের অনেকে ‘ক্যাম্পবেলের উট’ বলে রগড় করেছেন। কারণ এরা বলিষ্ঠ, কষ্টসহিষ্ণু।
অমৃতবাজারের সম্পাদক শিশির কুমার ঘোষ স্যার জর্জ ক্যাম্পবেলের কেতাবি বিদ্যার বাইরে বোটানি, সারভেয়িং, জিমন্যাস্টিক, সাঁতার, অশ্বারোহণ ইত্যাদি বিদ্যায় ভাবী ডেপুটিদের পারদর্শী করে তোলার সংকল্পকে ব্যঙ্গ করে তার অমৃতবাজার পত্রিকা ২/৫/১৮৭২ তারিখের সংখ্যায় একটি কার্টুন ছাপান। কার্টুনটিতে আজ্ঞারত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে এক সাহেব। সাহেবের সামনে একটি ঘোড়ার লাগাম ধরে, অবনতশিরে দণ্ডায়মান আর একজন (বাঙালি), তার পরনে দেশীয় পোশাক, কোমর থেকে আবার শিকলের বাঁধন। এ শৃঙ্খলাবদ্ধ মানুষটি হলো ‘মডেল ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট’।
‘মডেল ডেপুটি’ চিহ্নিতকরণের জন্য বিধিগুলো পদ্যে কার্টুনের নিচে দেয়া হয়েছে
সেলামে মজবুত অশ্বারোহণেতে
লাঙ্গুল স্থানে চেন কম্পাস কানেতে
তিন হাত সাত ইঞ্চি দুই আঙ্গুল পা দুটি
আমাদের হুজুরের মনমতো ডেপুটি
লে. গভর্নর ক্যাম্পবেল চাকরিরত পুরনো ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটদেরও ঘোড়ায় চড়া পরীক্ষা নিতে আদেশ করলে নানা হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। একজন প্রাচীন সম্প্রদায়ের ডেপুটিকে তার ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তা প্রশ্ন করলেন, বাবু, আপনি চড়তে জানেন? উত্তর— জানি। প্রশ্ন— কী চড়েন (অর্থাৎ বড় ঘোড়া না পনি) উত্তর পাল্কি!!
সাহেব হো হো করে হেসে উঠলেন এবং বললেন, পরীক্ষা নেয়ার আদেশ হয়েছে, তবে তিনি চড়তে জানেন না বলেই রিপোর্ট যাবে। বৃদ্ধ ডেপুটি সাহেবকে দেখলেন বেগতিক। একে তো তিনি বিভাগীয় পরীক্ষা দিতে পারেননি বলে তার বেতন বৃদ্ধি বন্ধ। এত দিন দুশ টাকা পেতেন। এখন রিপোর্ট গেলে চাকরি যাবে। লে. গভর্নর যে সে লোক নন স্যার জর্জ ক্যাম্পবেল। তিনি সাহেবকে অনুনয়-বিনয় করে বললেন, ঘোড়া চড়তে জানতাম। এখন দুশ টাকা বেতন মাত্র, ঘোড়ার খরচ চলে না। সাহেব তাকে কারো একটা ঘোড়া ধার করে আনতে বললেন। তিনি গাধার মতো দেখতে একটি টাট্টু ঘোড়া নিয়ে এলেন। বহু কসরৎ করে চড়ার পর এবং প্রচণ্ড পীড়ন সত্ত্বেও সে টাট্টু একপাও যেত রাজি হলো না। সাহেব হেসে বললেন— বাবু। আপনার আর পরীক্ষা দিতে হবে না।
বঙ্কিমের ক্রমাগত বদলি, পদোন্নতি বিলম্ব এবং তার Bransinism রচনা প্রভৃতির প্রভাবে শিক্ষিত বাঙালি যুবকদের ডেপুটিগিরির প্রতি কিছুটা মোহভঙ্গ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবু বাঙালি মধ্যবিত্তের চাকরি জোগানোর পরিধিটি এখনকার মতো তখনো খুব বড় ছিল না। ফলে বৈষম্য, অপমান লাঞ্ছনার মুখোমুখি হতে হবে জেনেও ডেপুটির চাকরি ছাড়া মেধাবী বাঙালি ছাত্রদের অন্য কোনো উপায় ছিল না।
এমনি সামাজিক এবং প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে টাঙ্গাইলের এক অখ্যাত গ্রামের প্রায় অসচ্ছল একটি পরিবারের কৃতী সন্তান গিরীশচন্দ্র নাগ ১৮৯২, ৩০ জুন প্রবেশনারি ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে দুমকায় কাজে যোগদান করেন।
নবীনচন্দ্রের সঙ্গে গিরীশ নাগের সময়ের ব্যবধান খুব কম নয়। ডেপুটির চাকরিতে কিছু পরিবর্তন সত্ত্বেও নিয়োগে ক্যাম্পবেল সাহেবের বিধি-বিধান আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। পরীক্ষার বিষয়গুলোতে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন লক্ষণীয়। চাকরির বৈষম্য ও উপরে ওঠার গতি নবীনচন্দ্রের যুগের মতোই মন্থর। বেশির ভাগ ডেপুটিই হিন্দু পরিবারের সন্তান। তবে দু-চারজন মুসলিম ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটও নজরে পড়ে। তাদের অনেকেই সাবডিভিশনাল অফিসার পর্যন্ত হয়েছিলেন।
‘গিরীশ নাগ বিএ পাস করে কলকাতা গেজেটের এক নোটিসে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও সাব-ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্তির জন্য আগামী মার্চ মাসে পরীক্ষা হবে বলে সংবাদ পেলেন।’ পেনাল কোড, সিভিল অ্যান্ড ক্রিমিনাল প্রসিডিউর কোডস, এভিডেন্স অ্যাক্ট এবং কয়েকখানা রেগুলেশন Field’s introduction to the Regulations, Survey and Mensuration প্রভৃতি কয়েকখানা বই এই পরীক্ষার জন্য পড়তে হবে। প্রত্যেক প্রার্থীকে ওই পরীক্ষার জন্য Riding এবং Health Certificate দাখিল করিতে হইব। লক্ষণীয়, নবীনচন্দ্রের সময় অশ্বারোহণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার সার্টিফিকেট প্রয়োজন হয় নাই। বিষয়বস্তু ছিল সাধারণ পড়াশোনার আওতাভুক্ত। পেনাল কোড, এভিডেন্স অ্যাক্টের কোনো বালাই ছিল না তখন।
গিরীশ নাগ জীবনে কখনো ঘোড়ায় চড়েননি। তাই একিট ভুটিয়া ঘোড়া সহিস জোগাড় করে Riding শিখে নেন। কোচবিহার নিয়ে। এর পর Superintent of State-এর বাড়িতে আরো কয়েকজন পরীক্ষার্থীর সঙ্গে ১০/১৫ মিনিট অশ্বারোহণের নানা কসরত দেখিয়ে পরীক্ষায় পাস করলেন। সাহেব একখানা সার্টিফিকেট দিলেন। সার্টিফিকেট ফর্ম এ রকম:
“I have seen so and so ride. He can seat a pony on gallop and trot and rides well enough for all practical purposes.”
এর পর civil surgen-এর কাছ থেকে হেলথ সার্টিফিকেট নিয়ে নির্ধারিত ফর্মে পরীক্ষার অনুমতির জন্য দরখাস্ত ও ফি প্রভৃতি বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েটে পাঠিয়ে দিলেন। ১৮৯২-এর মার্চ মাসে কলকাতার সিনেট হাউজে পরীক্ষা শুরু; তিন কি চারদিন দুবেলা পরীক্ষা হতো। Law, English, Essay, Translation-এ পরীক্ষা ভালো হলো; কিন্তু Criminal প্রসিডিউর কোডের দু-একটি প্রশ্ন না বুঝতে পেরে ভুল উত্তর দেয়ায় গিরীশের পরীক্ষা পাসে একটা সংশয় বয়ে গেল।
টাঙ্গাইলে বাড়িতে বসে ছুটি উপভোগে ব্যস্ত গিরীশ। জুন মাসে গেজেট দেখে জানতে পারেন তিনি পরীক্ষায় সপ্তম স্থান অধিকার করে প্রবেশনারি ডেপুটি কালেক্টর পদ পেয়েছেন। তাকে বিহার প্রদেশে সাঁওতাল পরগণা জেলার হেডকোয়ার্টার দুমকায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
দুমকায় গিরীশ নাগকে সেখানকার ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে কাজ শিখতে হয়েছিল। তার প্রথম দায়িত্ব কমিশনারকে নিজের ডাক খোলার দায়িত্ব তার হাতে দিয়ে বলেন, তুমি আমার দৈনিক ডাক খুলবে এবং সব চিঠি মনোযোগ দিয়ে পড়বে। এতে অনেক বিষয় শিখতে পারবে। পড়ার পর সে চিঠিগুলো সেরেস্তাদারের কাছে পাঠাবে। তিনি বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে বিলি করবেন। কিছুদিন পর ওইসব তোমাকেই বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে পাঠাতে হবে। পরে এ তরুণ প্রবেশনারকে একজন ইংরেজ সদর সাবডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে কাজ শিখতে পাঠানো হলো। তিনি মাসে মাসে তাকে দু-একটি Petty enquiry করতে দিতেন। বলা বাহুল্য, এসব কাজ দুমকা শহরের বাইরের এলাকায় গিয়ে করতে হতো; একমাত্র বাহন ঘোড়ায় চেপে। এভাবে গিরীশ চন্দ্র নাগের ডেপুটি জীবন বিকশিত হতে লাগল। একই মাসে নারী নির্যাতনের তদন্ত, স্ত্রী হত্যার তদন্ত করে তিনি উপরিওয়ালাদের বাহবা পেয়েছিলেন।
এবার সে আমলের ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষা সম্পর্কে একটু আলোচনা প্রাসঙ্গিক হতে পারে। মে মাসে গিরীশ চন্দ্রের ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষা— High Sandard-এর পরীক্ষা। পরীক্ষা কেন্দ্র দুমকা। ডেপুটি কমিশনার পরীক্ষার প্রেসিডেন্ট পরীক্ষা শুরু হওয়ার পরই চলে গেলেন। অন্য সিনিয়র ডেপুটি কালেক্টর একজন গার্ড হিসবে রইলেন। এবার গিরীশচন্দ্রের ভাষায় এ পরীক্ষার সংক্ষিপ্ত বিবরণ শোনা যাক:
‘আমরা ১৫/১৬ জন পরীক্ষার্থী ছিলাম। বেশ পরস্পর কথোপকথন ও দেখাশুনা চলিতে লাগিল। এইভাবে দুই কি তিনদিনে পরীক্ষা শেষ হইল। একদিন একজন ইউরোপিয়ান গার্ড আমাদিগকে প্রশ্নোত্তর বলিয়া দিতে আগ্রহ প্রকাশ করিলেন। সেদিন “With books”, Law পরীক্ষা হচ্ছিল। Guard একটি প্রশ্নোত্তর বলিয়া দিলেন, তাহা ভুল। আমি সে উত্তর লিখিলাম না। যাহা ঠিক উত্তর তাহা লিখিলাম। Higher Standard completely পাস করিলাম। তাহার পরই 2nd Class Magistrate-এর ক্ষমতা পাইলাম।
ফৌজদারি ও দেওয়ানি মোকদ্দমা করিতে লাগিলাম। দেওয়ানি মোকদ্দমা বেশ কয়েক হাজার নিষ্পত্তি করিলাম।”
১৯২৫ সালে প্রায় ৩২ বছর ৬ মাস চাকরি করার পর গিরীশচন্দ্র অবসর গ্রহণ করলেন। মাসিক পেনশন ৫০০ টাকা। তার একমাত্র দুঃখের কারণ হিসেবে উল্লখ করেছেন হঠাৎ আয় একেবারে কমে যাওয়া। নিজেই লিখেছেন যে, তিনি অবসরের জন্য অনেক দিন হতে অপেক্ষা করছিলেন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে দাসত্ব শৃঙ্খল শেষ দিকে অশান্তির কারণ হয়ে উঠেছিল। গিরীশচন্দ্রের অবসর পাওয়ার পর যে মনোভাব আমরা দেখতে পাই, তা সে যুগের প্রায় সব বাঙালি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের মনোভাবের অনুরূপ। কারণ কমবেশি প্রায় সবাই ন্যায্য প্রাপ্য প্রমোশন হতে বঞ্চিত হয়েছিলেন ঊর্ধ্বতন শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তাদের বৈরী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য। গিরীশচন্দ্রের আক্ষেপভরা মন্তব্য আদৌ অতিশয়োক্তি নয়, নির্মম বাস্তব সত্য। তিনি লিখেছেন:
যদি আমার ন্যায্য প্রাপ্য প্রমোশনগুলি পাইতাম, তাহা হইলে মনের ভাব কিরূপ হইত জানি না, কিন্তু চাকরির জীবনে সরকার কর্তৃক যেদিন হইতে অনাদৃত হইতেছিলাম, সেদিন হইতেই আমার মোহ ঘুচিয়াছিল। তবে পরিবার ভরণপোষণের একান্ত গুরুভার বহনের জন্যই লাঞ্ছিত অবস্থায়ও কর্মত্যাগ করিতে পারি নাই। এখন স্বাভাবিক নিয়মের বশবর্তী হইয়া অবসর গ্রহণ করিলাম। মনে একটা শান্তিও আসিল, কেননা কতকটা স্বাধীনতা লাভ করিলাম। দশটায় তাড়াতাড়ি স্নানাহার সম্পন্ন করিয়া, পোষাক আঁটিয়া দ্বিচক্র গাড়িতে ছুটিয়া কারাগারসদৃশ বিচার বা অবিচারালয়ে কিংবা অফিসে প্রবেশ, দুর্নীতিপরায়ণ, অশান্তিজনক ও অপ্রীতিকর আবহাওয়াতে ৬/৭ ঘণ্টা বাস, একঘেয়ে নীরস মামলা মোকদ্দমা বা অফিসের কার্য্য করা, উপরিস্থ কর্মচারীর অনুগ্রহ, নিগ্রহের জন্য সর্বদা উত্কণ্ঠিত থাকা— এই সকল বিড়ম্বনা হইতে অব্যাহতি পাইলাম।
এখানে বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটদের এহেন ভাগ্য ইংরেজ আমল পার হয়ে ঔপনিবেশিক পূর্ব পাকিস্তান আমলের শেষ পর্ব পর্যন্ত, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া, প্রায় একই রকম ছিল।






