সুন্দরবন— পশ্চিমাংশ ভারতে এবং পূর্বাংশ বাংলাদেশে, দুই দেশের সীমান্ত অবশ্য বনকে একেবারে আধাআধি ভাগ করেনি, বঙ্গোপসাগরের মাথায় অবস্থিত— আকারে লেবানন বা যুক্তরাষ্ট্রের কানেক্টিকাটের সমান, দুনিয়ার সবচেয়ে জটিল নদীবিধৌত বদ্বীপ দক্ষিণ এশিয়ার ঝরনামুখ হিসেবে কাজ করে। হিমালয়ের বরফগলা পানি আর মৌসুমি বৃষ্টিপাতে পুষ্ট তিনটি বৃহৎ জলধারা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা বছরে শতকোটি টন পলিমাটি বহন করে পৌঁছায় এক বিস্তীর্ণ গ্রন্থিতে, যা দুনিয়ার অন্যতম পানি পরিশোধক-সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন।
মৌসুমি বায়ুর ধারাবাহিক ছন্দে ৪৫০টির বেশি সর্পিলাকারের নদী ও খাঁড়ি এই বিস্তীর্ণ পানির উেসর নল হিসেবে কাজ করে। উষ্ণ ও বৃষ্টিপাতময় গ্রীষ্মে নদীগুলো ফুলে ফেঁপে ওঠে আর শুষ্ক শীতে যায় শুকিয়ে। পলি পড়ে অনেক জলপথের গতি রুদ্ধ হয়ে আছে অনেক বছর ধরে, কোনোটা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে; আবার নতুন পথও সৃষ্টি হয়েছে। অনেকগুলো চিংড়ি ও ধনী চাষীদের দ্বারা ধ্বংস বা নালায় পরিণত হয়েছে। যে হাইড্রোলজিক্যাল ছন্দ, মিঠা পানি এবং জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে ১০ কিলোমিটার স্থলভাগে ঢুকে পড়া লোনা পানির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে, তা এ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ক্ষতি মাঝে মধ্যে হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের কারণে স্বয়ং সাগরই সুন্দরবনে ঢুকে পড়ার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতিকর।
এই পরিস্থিতিকে আরো পরিপক্ব করে তুলছে সাগরের জলস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, প্রতি বছর সাগরের জলস্তরের উচ্চতা ৩ থেকে ৮ মিলিমিটার বৃদ্ধি পাচ্ছে, অর্থাৎ এই বিরাট ঝরনা নিম্নদেশ থেকে ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে সাগরের পানিতে। এই বনকে কেন্দ্র করে বসবাস এবং জীবিকা নির্বাহ করা (বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অংশে) ৪০ লাখ মানুষের পা ক্রমেই পানিতে ডুবে যাচ্ছে। এবং এটা শুধু মানুষের জন্য নয় বরং একই পরিণতি হচ্ছে দুনিয়ার বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের স্থল এবং জলজ বাস্তুতন্ত্রের, যা দুনিয়ার মধ্যে অন্যতম সমৃদ্ধ।
নতুন ভ্রমণকারীরা ম্যানগ্রোভ বনে এসে রাতে বেঙ্গল টাইগারের গর্জন শোনার প্রত্যাশা করেন, এই উত্সাহের জন্য অবশ্য তাদের দোষ দেয়া যায় না। (স্থানীয়রা যুক্তিযুক্তভাবেই বাঘের গর্জন নিয়ে কম উত্সাহী)। কিন্তু আর মাত্র প্রায় ১০০ বাঘ অবশিষ্ট আছে এবং তারা চলাচল করে মূলত শব্দ না করে। নদীর বুকে মৃদু দুলতে থাকা নৌকার পাটাতন থেকে শোনা যায় লবণসহিষ্ণু ম্যানগ্রোভের মূলে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দ; কাউকে দোষ দিয়ে ইউ ইউ শব্দে ম্যানগ্রোভ পিট্টার ডাক; দূরে শুশুকের শ্বাস ছাড়ার শব্দ, মিঠা পানির গাঙ্গেয় ডলফিনকে বাংলাদেশে শুশুক নামে ডাকা হয়।
আমরা রওনা হলাম খুলনা থেকে। এটি বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম এবং সুন্দরবনের সব থেকে নিকটবর্তী শহর। মুহাম্মদ আলম শেখ; দ্য গাইড ট্যুর কোম্পানির একটি বোটের ক্যাপ্টেন, এখানকার ১২ হাজার কিলোমিটার নদী এলাকায় ঘোরার ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তিনি বললেন, ‘আগামী পাঁচদিনে আমরা প্রায় ২০০ কিলোমিটার এলাকা ঘুরব, পথে নামব বিভিন্ন গ্রামে এবং বনের ধারে।’ সম্প্রতি তিনি বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী দুবলার চর নামের দ্বীপ থেকে মাছ ধরে ফিরেছেন এবং সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডের কাছে একটি ডলফিন গবেষণা অভিযান চালনা করেছেন। সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড একটি সামুদ্রিক গিরিখাত। ২০০৯ সালের মে মাসে তিনি সাগরে ঘূর্ণিঝড় আইলার কবলে পড়েছিলেন, ক্যাটাগরি ফাইভ গতির ঝোড়ো বাতাস তাকে ভারতীয় জলসীমার ২৫ কিলোমিটার ভেতরে নিয়ে ফেলেছিল।
ঘূর্ণিঝড়ের সময় থেকে অনেক দূরে এই নিরাপদ শীতকালীন ভ্রমণে শেখ ইঙ্গিত করলেন শুশুকের অবসন্ন ভেসে ওঠা এবং শব্দ করে শ্বাসক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রসঙ্গে। তিনি ব্যাখ্যা করলেন সমতল মাথার ইরাবতী ডলফিন নদীর উৎসমুখের এত কাছে আসে না। ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটির বাংলাদেশ সিটাসিয়ান ডাইভার্সিটি প্রকল্পের মতে, বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় জলরাশির উপরের অংশ ‘স্তন্যপায়ীদের প্রাচুর্য আর বৈচিত্র্যের হটস্পট’। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনভূমি বিপদাপন্ন চধহঃযবত্ধ ঃরমত্রং ঃরমত্রং বা বেঙ্গল টাইগারের আবাস। এবং এটাই দুনিয়ার একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন যেখানে বাঘ বসবাস করে। সুন্দরবনের বদ্বীপ-নদী মোহনার বাস্তুতন্ত্রের ৪০ শতাংশ ভারতে অবস্থিত, এই অংশটি সুন্দরবন ন্যাশনাল পার্কের সুরক্ষায় থাকায় এখানে মানুষের চলাচল অপেক্ষাকৃত কম। অন্যদিকে বাংলাদেশ অংশে সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ সরু খাঁড়ির অপর পারে অবস্থিত এবং বাঘেরা সাঁতার কাটতে ভালোবাসে! গ্রামের ধীরগতির ছাগল এবং গরু বাঘকে প্রলুব্ধ করে নতুবা তাদের খাদ্যতালিকায় থাকে মূলত চিত্রা হরিণ।
কালাবোগির বসতি বাংলাদেশের সুন্দরবন রিজার্ভ ফরেস্টের উত্তর সীমান্তের উল্টোদিকে অবস্থিত। পাশেই সুতারখালী নদী। পশুর ও শিবসা নামের দুটি বড় নদীর মাঝে একটা খালের মতো বয়ে চলেছে সুতারখালী। অনেক বছর ধরে মুহাম্মদ ফারুক হোসেইন শাহনা তার গ্রামের টাইগার-রেসপন্স টিমে কাজ করছেন: শব্দ করে এবং ঘেরাও করে অন্যদের সঙ্গে তিনি বাঘকে নদীর ওপারে তাড়িয়ে দেয়ার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো বাঘ আমাদের গ্রামের দিকে এলে আমরা প্রতিবেশীদের ঘরের মধ্যে থাকতে বলি।’ দুর্ঘটনাবশত মুখোমুখি হওয়া মৃত্যু ডেকে আনে; শুধু মানুষের নয়, বাঘেরও। তিনি বললেন, দুই বছর আগে একটা বাঘ রাতে তার প্রতিবেশীর পশু খোঁয়াড়ে কোনো শব্দ না করেই সাতটা ছাগল মেরে ফেলে। ‘তারা নীরবে আসে কিন্তু ফিরে যায় গর্জন শুনিয়ে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা একজন বনরক্ষককে ডাকি, তিনি এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়েন এবং বাঘটা সাঁতরে নিজের এলাকায় চলে যায়।’ ১২ বছরের হূদয় মোল্লা সেদিন সকালের কথা স্মরণ করে— ‘অনেক মানুষ ঘিরে ফেলায় নিজেকে নিরাপদ মনে হয়েছিল।’ বাহাদুরির সামান্য ইঙ্গিত রেখে বালকটি বলল। কিন্তু কেউই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। গ্রামের প্রবীণ আবদুল বারি জানালেন বাঘের হাত থেকে বাঁচতে গেওয়া গাছে বেয়ে ওঠার গল্প— বাঘটা তাকে ধরতে গাছে থাবা বসাচ্ছিল। পায়ে কামড় খেয়ে বাঘের চোখে আঙুল ঢুকিয়ে তিনি রক্ষা পেয়েছিলেন। ‘এটা ছিল আমার জীবনজুড়ে সামনাসামনি দেখা ১৩টি বাঘের একটি।’
কাছেই নদীবন্দর নালিয়ান একটি সমৃদ্ধ শহর। এর অবস্থান শিবসা নদীর তীরে, বার্জ বন্দরে ভেড়ার জন্য আছে লোহার জেটি, আছে দ্বিতল পাকাভবনের স্কুল। সাগর থেকে ৮০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে এখানেও আইলা তার হিংস্রতার স্বাক্ষর রেখে গেছে। শিক্ষক আবু সাত্তার জানালেন সিডরের পর এক মাস পর্যন্ত জলোচ্ছ্বাসের পানি আটকে ছিল। তার স্কুলে আশ্রয় নেয়া ১ হাজার ৫০০ জনকে তিনি সংগঠিত করতে সহায়তা করেছেন। স্কুল ভবনটি স্থানীয় অল্প কয়েকটি ভবনের একটি, যা ঘূর্ণিঝড় বাতাসের তোড় সইতে সক্ষম। ‘আমরা শিক্ষার্থীদের গান গাইয়ে এবং ঝড় নিয়ে নাটকে অভিনয় করিয়ে তাদের মনোবল ধরে রাখতাম। তারা আইলার কথা ভোলেনি, কিন্তু তারা ভয়ও পায়নি।’ এখানে নদীর তীরে কার্গো বোটের কাঠামোর ছাপ দেখা যায়। এসব কার্গো বোট স্থানীয় অর্থনীতির মূল পণ্য গোলপাতা পরিবহন করে, এর পাতা গ্রামের ঘরের ছাদ ছইতে ব্যবহূত হয়। বছরের এই সময়ে বোটগুলো কর্দমাক্ত তীরে উঠিয়ে বর্ষা আসার আগে আলকাতরা লাগানো হয়। গোলপাতা ম্যানগ্রোভের উচ্চ লবণাক্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নির্দিষ্ট সময়ে কিছু পাতা কাটতে দেয়া হলেও বার্ষিক উত্পাদিত ২০ লাখ কেজি পাতার বেশির ভাগ আসে খামার এবং পেছনের দিকের গ্রামগুলো থেকে।
বালিনধাঙ্গার পরিমল চন্দ্র সরকার এমন একজন কৃষক। খেজুরের রস সংগ্রহ এবং ম্যানগ্রোভ বনের সব থেকে সহজলভ্য গাছ কেওড়ার ফলে মিষ্টি ও ঝাল মিশিয়ে আচার তৈরি করে নিজের জীবিকার উপায়কে বিস্তৃত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘গোলপাতার ফল খাওয়া যায়, যদিও এ সময়ে পাওয়া যায় না। তার লাগানো তালগাছ দুই বছরের মধ্যেই ফল দিতে যাচ্ছে, এটা ফল দেয়ার গড় বয়সের চেয়ে এক বছর আগেই, এজন্য তিনি গর্বিত। তিনি ধারণা করছেন, তার গাছগুলো জোয়ারের পানি পছন্দ করে। জোয়ারের পানি দিনে দুবার তার বাড়ির প্রাকার অর্থাৎ প্রাচীরে আছড়ে পড়ে।
কয়রা সেতু এ অঞ্চলের অল্প কয়েকটি সেতুর একটি, এখানে সাধারণত নদী পার হতে নৌকা ব্যবহার করা হয়। কয়রা সেতুর কাছে একটি শাখা নদীর পশ্চিম বরাবর বসবাসকারী রবীন্দ্রনাথ সানা ম্যানগ্রোভ বনে মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তার ৬৫ বছরের জীবনের ৫০ বছরই তিনি এ বনে মধু সংগ্রহ করছেন। এপ্রিল ও মে মাসে তিনি বনে যান, এ সময়ে মৌমাছিরা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে তাদের গৃহে ফিরে আসে। মৌচাকগুলো সাধারণত গাছের উঁচু ডালে অবস্থিত। তিনি শুরুতে গোলপাতার পাতা জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি করেন। এই ধোঁয়া মৌমাছিগুলোকে বোকা বানিয়ে দেয়। এরপর তিনি একজন তরুণকে গাছে তুলে দেন মৌচাকের ডালটি কাটতে, তার পর মধু একটি ব্যারেলে ঢালা হয়।
রবীন্দ্রনাথ সানা বলেন, ‘বনের সেরা মধুক্ষেত্রে পৌঁছতে নদীপথে একদিন সফর করতে হয়। এবং সেখানে আমরা এক মাস অপেক্ষা করি তিনটি ম্যানগ্রোভ বৃক্ষের ফুল ছাড়ার সময়কে ধরতে। খালশী, যা থেকে হালকা মধু হয়; তারপর গরান, এর মধুর রঙ গাঢ়, সবশেষে বায়েন, এ ফুলের মধু খুব পাতলা। (লিনিয়ান শ্রেণীবিন্যাস অনুসারে এর নাম আরপবহহরধ ড়ভভরপরহধষরং, মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনে সিনার নামানুসারে এই নামকরণ)
‘আমাদের দলের ছয় সদস্যই বাঘের ভয়ে রাতে নৌকায় ঘুমায়’, জানালেন সানা। ‘আমি অনেকবার বাঘের পায়ের ছাপ দেখেছি এবং গর্জনও শুনেছি। কিন্তু কখনো সামনাসামনি বাঘ দেখিনি।’ সানা নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবতে পারেন। কারণ ১৭ শতকের ফরাসি নাগরিক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার তার ‘ট্রাভেলস ইন দ্য মোগল এম্পায়ার’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘মানুষ ঘুমিয়ে থাকলে এই হিংস্র প্রাণীগুলো খুব দক্ষতার সঙ্গে নৌকায় প্রবেশ করতে পারে এবং নৌকার সব থেকে স্বাস্থ্যবান মানুষটিকে তুলে নিয়ে যায়।’
সানা জানালেন, ভালো মৌসুমে তিনি ১৬০ লিটার মধু এবং ১০ কেজি মোম সংগ্রহ করতে পারেন। তার পরিসংখ্যান মতে, সুন্দরবনে বছরে গড়ে ১২০ টন মধু এবং ৩০ টন মোম উত্পাদিত হয়। তিনি বললেন, বেশির ভাগ মোম থেকেই মোমবাতি তৈরি করে শহরের মানুষের কাছে বিক্রি করা হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে শহরের মানুষ মোমবাতি ব্যবহার করেন। তিনি যোগ করলেন, ‘আমরা গ্রামের মানুষ বিদ্যুতের বাতির ওপর নির্ভর করি না। তাই আমরা আর মোমবাতি দিয়ে কী করব?’ ঠোঁট উল্টে বললেন সানা। ‘কেরোসিনের হ্যারিকেন আমাদের জন্য ঠিকঠাক।’ কিছু মধু অবশ্য নিজের ঘরে রেখে দেন। এই মধু মূলত চাল আর দুধ দিয়ে পায়েশ রাঁধতে ব্যবহূত হয়।
বাংলাদেশীরা নিজেদেরকে দুনিয়ার অন্যতম সাহিত্যানুরাগী হিসেবে গর্ব অনুভব করতে পারে। তাদের গীতিকাব্য ও কবিতা সবচেয়ে বিখ্যাত হয়েছে নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনার মধ্য দিয়ে। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ৮০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। ঠাকুরের পূর্বসূরি ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। সুন্দরবনের উত্তরে, যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে মাইকেল জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বাংলা ভাষার সবচেয়ে বিখ্যাত সনেট ‘কপোতাক্ষ নদ’-এর রচয়িতা, এটা নদীটির প্রতি কবির গাথা। এ কবিতা আজকের দিনেও বাংলাদেশের প্রতিটি স্কুল শিক্ষার্থী মুখস্থ করে। সেই নদী পার হওয়ার সময় ক্যাপ্টেন শেখের এক সহযোগী সেই সনেটের কয়েক লাইন আবৃত্তি করলেন:
সতত, হে নদ তুমি পড় মোর মনে
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।
সতত যেমতি লোক নিশার স্বপনে
শোনে মায়া যন্ত্র ধ্বনি তব কলকলে
জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে।
বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ দলে
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মেটে কার জলে
দুগ্ধস্রোতরূপী তুমি মাতৃভূমি স্তনে।
নদীর তীরে আরো কিছু সাধারণ দৃশ্য চোখে পড়বে, ভাটার সময় ৭ মিটার কাদা, কাঠ দিয়ে ঘেরা মাছ ধরার খাঁচা। এগুলোয় লবণ দিয়ে এমনভাবে মাছ ঝুলিয়ে রাখা হয় যেন দেখে মনে হয় কাপড় শুকাতে দেয়া হয়েছে। অন্যত্র দেখা যাবে কাঁকড়া ধরার জন্য সারি সারি বাঁশের ফাঁদ, নদীর তীরে উঁচু এবং শুষ্ক স্থানে পেঁয়াজের গম্বুজের মতো ধানের খড় স্তূপ করে রাখা হয়েছে। নীল রঙের মাছরাঙা এবং সবুজ পিট্টা তাদের রঙের ছটা ছড়িয়ে এক পার থেকে অন্য পারে উড়ে যায়। বুনো শূকর ও বানর পরিষ্কার সমভূমিতে চলে আসে, মনে হয় তারা কৌতূহলী হয়ে ঘুরে বেড়াতে এসেছে।
এই প্রাণীদের সঙ্গে আরো কয়েক ডজন যোগ করুন, যেমন— কুকুরমুখী জলজ সাপ, নীল বুকের কোয়েল, লাল ঠোঁটের তিতির, চিত্রাহরিণ এবং ২৪০ প্রজাতির কীটপতঙ্গ পাওয়া যায় এ বনে। যে কেউ টের পাবেন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য কতটা সমৃদ্ধ। এবং এখানে উপকূলীয় নদীর কুমিরও বাস করে। নদীর তীরে কুমিরের ছেঁচড়ে নামার মতো চিহ্ন দেখা যায় যা মূলত পার থেকে ডিঙ্গিগুলো নদীতে নামানোর চিহ্ন। জোয়ারের সময় ডিঙ্গিগুলো নদীতীরে থাকে আর ভাটার সময় পানিতে নামে।
রিজার্ভের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে গভীরে পানির সীমান্তে গিয়ে সকালের কুয়াশায় পাঁচটি নদীর সঙ্গমস্থলে, এমনকি ক্যাপ্টেন শেখও মুহূর্তকালের জন্য বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। তিনি নিকটবর্তী এক জেলের উদ্দেশে নিজের অনিশ্চয়তার কথা চিত্কার করে জানান। সেই জেলের জবাব দেন, ‘ভারত!’, কুয়াশার মধ্য দিয়ে সীমান্তের একটি ওয়াচ টাওয়ারের দিকে নির্দেশ করলেন। যেখানে নদীগুলো মিলিত হয়, সেখানকার প্রশস্ত পানির চাদরকে বলে মোহনা (বাংলাদেশে মেয়েদের একটি সাধারণ নাম)। তার পর আবার এগিয়ে গিয়ে তারা পৃথক হয়ে যায়। মনে হয় হাঁপরের মতো একবার বিস্তৃত হচ্ছে, আরেকবার সংকুচিত হচ্ছে, তবে বাতাসের পরিবর্তে নির্গত হচ্ছে পানি, চলছে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের দিকে। কিন্তু সবচেয়ে প্রশস্ত অংশটি আবার সবচেয়ে অগভীর হতে পারে, এবং ভাটার সময় কাদার স্তর উন্মোচিত হয়ে পড়ে।
একদিন সকালে ভাটার সময় খোলপেটুয়া নদীতে জেলে মুহাম্মদ আইয়ুব আলী মোল্লা নিজের চিংড়ি জাল বিছানো থেকে বিরতি নিয়ে আমাদের প্রমোদ নৌকায় এসে উঠলেন। আমাদের নৌকা তখন কিছু সময়ের জন্য চড়ায় আটকে আছে। আইয়ুব আলী সেই ভোর ৫টা থেকে পানিতে আছেন, তাই শহরের মানুষদের সঙ্গে একটু চা পান আর আড্ডা দেয়ার আমন্ত্রণ তিনি ফেলতে পারলেন না। তিনি বললেন, ‘ঢাকায় দুই বছরের মজুরের জীবন আমার ভালো লাগেনি। এখানে নদীতে মাছ না পেলেও আমি আমার বাগান এবং হাঁস-মুরগির যত্ন নিতে পারি।’ শক্তিশালী কণ্ঠে তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত গীতিকার আবদুল আলীমের একটা গান গাইলেন। তিনি গানটা শিখেছেন রেডিও থেকে।
জোয়ার এল, আমাদের নৌকা চড়া থেকে মুক্ত হলো। কোইখালী গ্রাম পর্যন্ত একটা খাঁড়িতে প্রবেশ করে আমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো নীল ইউনিফর্ম পরা এবং হাতে লাঠি থাকা বনরক্ষক মুহাম্মদ সিরাজ উল-ইসলামের সঙ্গে। তিনি একটি স্থানীয় পরিবেশ সংগঠনের হয়ে কাজ করেন।
তিনি জানালেন, তার কাজ হচ্ছে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সমবায় বাঁধকে চড়ে বেড়ানো ছাগলের হাত থেকে রক্ষা করা। এই বাঁধ সাইক্লোন বাফার হিসেবে কাজ করে। তিনি ম্যানগ্রোভ গাছের বীজ রোপণ করেন, বেড়া দেন এবং জোয়ার-ভাটার পর আগাছা পরিষ্কার করেন। গর্বের সঙ্গে তার দ্রুত বর্ধনশীল কেওড়া গাছ, বায়েন গাছের উজ্জ্বল কমলা রঙের ছাল, কাঁকড়া গাছের গুলির আকৃতির বীজ দেখালেন। এই বীজগুলো সুইয়ের মতো মাটিতে গেঁথে যায়। মনে হয় কাদার মধ্যে অঙ্কুরোদ্গমের জন্য তারা খুব আগ্রহী।
খুলনা থেকে ভাটিতে পশুর নদীর কাছে করমজলে সরকার পরিচালিত কুমির প্রজনন কেন্দ্রটি দর্শনার্থীদের কাছে জনপ্রিয়। শামিয়ানা দেয়া লঞ্চে এই কেন্দ্রে পৌঁছে বনের মধ্যে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ কাঠের তৈরি হাঁটাপথের ওপর দিয়ে তারা ঘুরে বেড়ান। এখানে তারা কুমিরকে খেতে দিতে পারেন। শহুরে মানুষদের দিকে বোটের চালক রুমান শিকদার মাথা নাড়ে। ‘অনেক যাত্রী স্যুট-টাই পরে আসেন’, হাসতে হাসতে জানালেন রুমান। ‘আমাকে কয়েকবার বিয়ের সাজপোশাক পরা নববধূকে কাদা থেকে টেনে ওঠাতে হয়েছে। সবাই বাঘ দেখতে চান। কিন্তু বাঘের তাড়া খেলে হাইহিল পরে আপনি দৌড়াবেন কীভাবে?’ তবে যে গভীর বনে বাঘ থাকে, সেখান থেকে এই করমজল অনেক দূরে, এই কথাটা উহ্যই থেকে গেল।
সুন্দরবনের ওপর কাজ করা দুনিয়ার সেরা পরিবেশ বিজ্ঞানীদের একজন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিলীপ দত্ত। তার বেশির ভাগ সহকর্মী এবং দুনিয়ার অন্য সাধারণ পর্যবেক্ষকদের মতো তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত নন। তিনি বলেন, ‘গত ৩০ বছরের স্যাটেলাইট ইমেজ থেকে আমরা দেখেছি আমাদের ম্যানগ্রোভ বনের অবস্থা স্থিতিশীল আছে।’ অথচ এ সময়ে এশিয়ার কিছু স্থানে ৩০ শতাংশ ম্যানগ্রোভ হারিয়ে গেছে, মূলত উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমের কারণে। কিন্তু সুন্দরবনের ক্ষতি এখনো সামান্য। এটা সম্ভব হয়েছে সীমান্তের উভয় পাশেই সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গাছ কাটার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার ফলে। বাংলাদেশের জন্য গাছের দেয়া সুবিধার অর্ধেক আসে সুন্দরবন থেকে। অন্যদিকে ম্যানগ্রোভ রেইনফরেস্টের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি কার্বন শোষণ করতে পারে। সুন্দরবন ৫ কোটি ৬০ লাখ টন কার্বন শোষণ করে পুরো দুনিয়ার সেবা করছে। দত্তের তথ্যমতে, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর বিপুল পরিমাণ পলি তাদের সংযোগমুখ থেকে বয়ে গিয়ে সুন্দরবনের উপকূলীয় তীরে জমা হয়। শক্তিশালী জোয়ারের ঢেউ যে পরিমাণ পলি পারে তুলে দেয়, তার চেয়ে দুর্বল ভাটা অপেক্ষাকৃত কম পলির ক্ষয় ঘটায়, ফলাফল পলির সঞ্চয় হয়। এটা প্রকৃতির বিশেষ দেয়া সৌভাগ্য। এই বিরল অসামঞ্জস্য সুন্দরবনকে সাইক্লোনের বাফার হিসেবে গড়ে তুলেছে। সুন্দরবনের বঙ্গোপসাগরের দিকের অংশটি এর স্থলভাগের অংশটির চেয়ে উঁচু। এ কারণে দত্ত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব, সাইক্লোনের সংখ্যা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত সমস্যার চেয়ে স্থানীয়ভাবে সৃষ্ট ভারসাম্য ধ্বংস নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। এসবের মধ্যে আছে নদীপথে তেলের ট্যাংকার থেকে নিঃসরণ, পোল্ডার (বাঁধ, ভেড়) তৈরি যা দরকারি স্থানে পলি পড়া হ্রাস করে এবং নদীগুলোতে পলি জমাচ্ছে যা ক্ষতিকর। ‘নিকট অতীত পর্যন্ত আমরা ভুল করে নদীর পানি নির্গমনের সক্ষমতার চেয়ে প্রবাহ ক্ষমতার ওপর জোর দিয়েছি, যা পলি পড়া বা পলির অভাব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়’, দত্ত বলেন। ‘পানির পরিবর্তে আমাদের পলির উন্নততর ব্যবস্থাপনা দরকার।’
দিলীপ দত্তের উদ্বেগ সম্প্রতি ফ্যানডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষক দল স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি নিজেও এই গবেষক দলে কাজ করেছেন। বাঁধ, ভেড়ের ডাচ শব্দ পোল্ডার। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ধান চাষে ব্যবহূত আবার জেগে ওঠা নিম্নভূমির চারদিকে বাঁধ দেয়া, সেগুলোর চারপাশে দ্রুতগতিতে পানিপ্রবাহে বাধ্য করা পলির ক্ষয় ঘটাচ্ছে। এই ক্ষয় ঘটছে এমন জায়গায় যেখানে জলোচ্ছ্বাসের ঢেউ থেকে বনের প্রান্তসীমা রক্ষা করতে এই পলি সবচেয়ে বেশি দরকার।
বাংলায় সুন্দরবন নামটি এসেছে সুন্দর বন থেকে। মোগলরা এই বনকে রাজকীয় শিকারের জন্য সংরক্ষিত ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করত, তারা এই বনকে নির্দেশ করত ‘জোয়ার-ভাটা’ নামে। তাই বলা যায় যে, দত্ত এমনভাবে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করছেন, যা বহুকাল ধরে ভারতীয় ও বাংলাদেশীরা অনুভব করছেন। আর তা হচ্ছে, সুন্দরবনকে বোঝা। এটাকে একই সঙ্গে বন এবং জোয়ার-ভাটা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অথবা তার বৈজ্ঞানিক ভাষা যেখানে এই বনকে একই সঙ্গে পলির আশ্রয় এবং বাহক হিসেবে উল্লেখ করছেন।
কিন্তু সুন্দরবনকে জানতে কাউকে অধ্যাপক হওয়ার প্রয়োজন নেই। ছাত্রদের নেতৃত্বে বাদামতলা লাউদোপ স্কুলে ম্যানগ্রোভ ক্লাবে অনেক স্থানীয় বিশেষজ্ঞ পাওয়া যাবে। ক্লাবের সভাপতি ১৪ বছরের প্রণতি মৃধা। সে সম্প্রতি খুলনাভিত্তিক কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (সিএলইএএন) এবং ইউএসভিত্তিক ম্যানগ্রোভ অ্যাকশন প্রজেক্টের যৌথ আয়োজনে একটি তিনদিনের কর্মশালায় অংশ নিয়েছে। প্রণতি অনেক কিছু শিখেছে। কর্মশালার পরীক্ষায় দ্রুতগতিতে ছুড়ে দেয়া একগুচ্ছ প্রশ্নের সবগুলোরই সঠিক উত্তর দিয়েছে। দৃঢ়ভাবে শেষ প্রশ্নের জবাব দিয়ে প্রণতি তার পরীক্ষা শেষ করে: ‘আমি একজন কীটতত্ত্ববিদ হতে চাই, মৌমাছির নয়, পিঁপড়ার।’
সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ তার এবং তার মতো আরো তরুণ-তরুণীর হাতে। যদি সে তার জ্ঞানকে কাজে পরিণত করে, যদি তার দেশ তার পরামর্শগুলো আন্তরিকভাবে শোনে, তাহলে সবদিক থেকে তার প্রতি এখন যে চ্যালেঞ্জগুলো আসছে সেগুলো খুব সম্ভবত সুন্দরবন মোকাবেলা করতে পারবে।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ’১৬, আরামকো ওয়ার্ল্ড
লুই ওয়ার্নার: মার্কিন লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। বসবাস নিউইয়র্কে।
শহিদুল আলম: পাঠশালা সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি, দৃক পিকচার লাইব্রেরি, ঢাকার আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি উৎসব ছবি মেলা’র প্রতিষ্ঠাতা। বাস করেন ঢাকায়।
মূল: লুই ওয়ার্নার, আলোকচিত্র: শহিদুল আলম
অনুবাদ: শানজিদ অর্ণব






