বাসের ভেতর আয়েস করে বসে ছিলাম। বাঁ পায়ের ওপর ডান পা তুলে দিয়ে তাকিয়ে ছিলাম বাইরে। তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিলাম জোছনার সৌন্দর্য। জোছনার সময় বন-পাহাড়ের সৌন্দর্য বহুগুণ বেড়ে যায়। তার ওপর এখন বসন্তকাল। নাম না জানা কত ফুল যে ফুটেছে! রাস্তার ধারের জংলি ফুল দেখে মন ভরে যাচ্ছে। খুব ইচ্ছে করছে জানলা খুলে বাতাসের ঘ্রাণ নিই, কিন্তু সে উপায় নেই: বাসে ওঠার পরেই পেছনের যাত্রী বলে দিয়েছেন জানালাটা যেন না খুলি, কারণ তাঁর ঠাণ্ডার সমস্যা আছে।
কক্সবাজার থেকে ফিরছি ঢাকায়। আমাদের বাস এখন রামুর অরণ্যভূমি পেরিয়ে যাচ্ছে। আমার সঙ্গে আছে তিনটা দিনের অমূল্য স্মৃতি আর পকেটে শ-খানেক টাকা। পাশের সিটে বসে আছে বন্ধু সাকিব। ওর পকেটে কত আছে জানি না। সংকোচের কারণে জিজ্ঞেসও করতে পারছি না। টাকা না থাকলে রাতটা উপোস করে কাটাতে হবে। যাত্রা বিরতির সময় দুজনের সবজি-পরোটাও জুটবে না।
সাকিব আর আমি ভার্সিটিতে একই ডিপার্টমেন্টে পড়তাম বলে নিয়মিত হাই-হ্যালো হতো। পরীক্ষার সময় পাশের ডেস্কে বসত। নকল করাটাও যে একটা শিল্প, সেটা সাকিবকে না দেখলে জানতাম না। ওর সঙ্গে আমার যেটুকু ঘনিষ্ঠতা, সেটা খাতা দেখাদেখি করতে গিয়েই হয়েছে। বলা যায়, ওর আন্ডারওয়্যারের চিপায় লুকিয়ে থাকা নকল গড়ে দিয়েছে আমাদের সম্পর্ক। সেই সূত্র ধরেই দুজনে কক্সবাজারে এসেছিলাম বেকারত্বের ঝলসানো উত্তাপ থেকে দুদণ্ড মুক্তি পেতে।
ভার্সিটিতে যারা আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল তারা আর আজ কেউ নেই। নেই মানে মরে-টরে যায়নি। সবাই চাকরি নিয়ে ব্যস্ত। কেবল পাস করার আড়াই বছর পরও আমার কোনো গতি হলো না। এজন্য আমার মেধা না নিয়মবদ্ধ জীবনের প্রতি অনীহা— কোনটা দায়ী বলতে পারি না। আমার বাবা ব্যাপারটা ছেড়ে দিয়েছেন স্রষ্টার হাতে। একমাত্র পুত্র বিসিএস পাস করে বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে— এ বিশ্বাস নিয়েই তাঁর দিন কাটছে। নইলে রিটায়ার করার পরও মাসোহারা দিয়ে কোনোভাবেই আমাকে ঢাকায় রাখতেন না। কান ধরে হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যেতেন রংপুরে। তারপর বসিয়ে দিতেন চাচার সঙ্গে কাপড়ের দোকানের ব্যবসায়।
হঠাত্ সামনের সিটটা পরশুরামের কুঠারের মতো নেমে এল আমার দুই পা বরাবর। তীব্র ব্যথায় কাতর হয়ে শিশুর মতো চিত্কার করে উঠলাম। এতটাই জোরে যে ড্রাইভারসুদ্ধ সবাই আমার দিকে ঘুরে তাকাল। লজ্জায় চুপ করলাম। সামনের সিট থেকে একটা কোমল স্বর খুব ব্যগ্র হয়ে বলল, ‘সরি সরি। আপনার ব্যথা লাগেনি তো?’
ব্যথা আমি পেয়েছি। কিন্তু কীভাবে স্বীকার করি? বিশেষ করে যখন এমন একটা মায়াবী চোখের মেয়ে আমাকে প্রশ্নটা করছে? গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বললাম, ‘না না। একটুও না।’
মেয়েটা কী বুঝল জানি না। একটু হাসল। তারপর সিটটা সোজা করে নিল। আমি ভাবলাম এই সুযোগ আর আসবে না। ইতস্তত করে তার কাঁধে একটা টোকা দিলাম। সে ঘুরে তাকাল আমার দিকে।
প্রথমবার মেয়েটাকে ভালোভাবে খেয়াল করার সুযোগ পাইনি। এবার খেয়াল করলাম। একটা সাদা রঙের হিজাব পরে আছে। গায়ে একটা চকোলেট কালারের বোরকা। হিজাবের ফাঁক দিয়ে কয়েক গাছি রঙ করা লালচে চুল দেখা যাচ্ছে। মেয়েটার চোখ সুন্দর। সুন্দর তার মুখ। সবচেয়ে সুন্দর বোধহয় লাল টুকটুকে ঠোঁট। এমন কড়া রঙের লিপস্টিক দিয়ে কাউকে বাসে উঠতে আগে দেখিনি।
মেয়েটাকে বললাম, ‘আপনি চাইলে সিটটা নামিয়ে নিতে পারেন।’
সে খুব সতর্কতার সঙ্গে সিট নামাতে শুরু করল। এমন সময় হঠাত্ই একটা কাণ্ড করে বসল সাকিব। মেয়েটাকে উদ্দেশ করে ধমকে উঠল, ‘হইছে হইছে! আর নামাইতে হবে না। মাত্র তো ওর ঠ্যাঙের বারোটা বাজাইছেন। আবারো বাজানোর ইচ্ছা নাকি?’
সাকিবটার কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। কখন কাকে কী বলতে হবে কিচ্ছু জানে না। আমি ওর হাতে জোরে একটা চাপ দিলাম। মেয়েটাকে বললাম, ‘কিছু মনে করবেন না। আপনার যতটুকু প্রয়োজন, চেয়ারটা ততটুকু নামাতে পারেন।’
চেয়ার খানিকটা হেলিয়ে মেয়েটা আবার আমার দিকে তাকাল। অনুমোদনের ভঙ্গিতে কাঁধ হেলিয়ে বললাম, ‘ঠিক আছে।’
এতক্ষণ আধশোয়া হয়ে বাইরে জোছনা দেখছিলাম। এবার চেয়ারটা টেনে সোজা করলাম। একটা মিষ্টি ফুলের গন্ধ পেলাম। আমি মোটামুটি নিশ্চিত এ গন্ধের উত্স মেয়েটার চুল। চাঁদের আলোয় তার মাথার পেছনের অংশটা অপার্থিব লাগছে। কে বলবে একটু আগে বাইরের ফুলের ঘ্রাণ নিতে আমার প্রাণটা আইটাই করছিল? ফুল যে আমার সামনে চলে এসেছে!
লম্বা হওয়ার একটা সুবিধা পেলাম। পেছন থেকে মেয়েটাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। একটা লাল রঙের ট্রাভেল ব্যাগ রেখেছে পায়ের কাছে। কোলের ওপর ধরে আছে একটা বড়সড় ভ্যানিটি ব্যাগ। সেখানে এত কী রেখেছে কে জানে! মেয়েটা দুবার জানালা দিয়ে বাইরের চাঁদটাকে দেখল। জোছনারাতে ভ্রমণ করার এই মজা। কোথাও গেলে চাঁদটাও সঙ্গে যেতে থাকে।
এভাবে লুকিয়ে-চুরিয়ে মেয়েটার কাণ্ডকীর্তি দেখতে অস্বস্তি হচ্ছিল। ভয়ও হচ্ছিল, যদি কেউ দেখে ফেলে। কিন্তু মেয়েটা, তার চুলের মাতাল সুবাস আমাকে যেন এক অদৃশ্য বাঁধনে বেঁধেছিল। হিড় হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ির মতোই আমিও চালিত হচ্ছিলাম।
কোলের ঢাউস ব্যাগ থেকে মেয়েটা একটা মোবাইল ফোন বের করল। একটা স্মার্টফোন। তারপর ফেসবুকে লগইন করল। ভয়ে ভয়ে ছিলাম এই বুঝি সে কাঁধ ঘুরিয়ে আবিষ্কার করে যে, আমি তার সবকিছু দেখছি। তারপর চেঁচিয়ে বাস মাথায় তোলে। কিন্তু সে কিছুই করল না। একমনে হোমপেজ ঘাঁটতে লাগল।
আড়চোখে ওর ফোনের স্ক্রিন দেখছি আর মনে মনে বলছি যেন ওর কোনো বয়ফ্রেন্ড না থাকে। ফেসবুক দেখে অবশ্য কিছুই বুঝলাম না। সে একগাদা ড্রেস আর লিপস্টিকের পেজ ব্রাউজ করতে থাকল। একমনে তা দেখছি, এমন সময় পাশেই হো হো করে কে যেন হেসে উঠল। মেয়েটা পেছনে ফিরল। আমি তাড়াতাড়ি সিটে হেলান দিয়ে ঘুমানোর ভান করলাম। সাকিব হাসতে হাসতে আমার গায়ে গড়িয়ে পড়ল।
‘মামা, এমনে কইরা কী দেখতাছস তুই?’
সে এমন জোরে কথাটা বলল যে সামনে-পেছনে অনেক যাত্রী শুনে ফেলেছে। আমার মেজাজ ভীষণ খারাপ হলো। আমি রেগে কটমট করে সাকিবের দিকে তাকালাম। কাজ হলো। সে আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিস ফিস করে বলল, ‘সরি ম্যান। ভুল হয়া গেছে। তুই যে চিকসটারে চেক আউট করতাছিলি বুঝি নাই।’
আমাদের ফিসফাস শুনে মেয়েটা একবার সিটের ওপর দিয়ে আমাদের দিকে তাকাল। ওর চোখে চোখ পড়তেই আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল: আহা! এত সুন্দর মানুষ হয়!
মেয়েটা বোধহয় আমাদের কথা শুনতে পায়নি। সে পেছন ফিরে আমাদের দেখতে দেখতে দুই কানে হেডফোন গুঁজে নিল। আমার একটা অভ্যাস আছে। কেউ হেডফোনে গান শুনলে অনুমান করার চেষ্টা করা, সে কোন গানটা শুনছে। জানি না সবসময় ব্যাপারটা মেলে কিনা। মনে হচ্ছিল মেয়েটা একটা রবীন্দ্রসংগীত শুনছে— যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে...।
খুব ইচ্ছে করছিল মেয়েটার কাঁধে টোকা দিয়ে জেনে নিতে, সে কী গান শুনছে। কিন্তু একটা অপরিচিত মেয়ের কাঁধে বারবার টোকা দেয়া যায় না।
আমার মনের কথা বোধহয় মেয়েটা শুনতে পাচ্ছিল। সে হঠাত্ই ফোন থেকে হেডফোন খুলে ফেলল। গান বাজতে লাগল, ‘সব যে হয়ে গেল কালো/ নিবে গেল দীপের আলো/ আকাশ-পানে হাত বাড়ালেম কাহার তরে?/ অন্ধকারে রইনু পড়ে স্বপন মানি।’
মনটা আনন্দে ভরে গেল। এদিকে বাসের ঝাঁকুনিতে বারবার আমার জানালা খুলে যাচ্ছিল। পেছনের যাত্রী জানালা লাগিয়ে দিতে তাগাদা দেয়া শুরু করলেন। বেচারার নাকি ঠাণ্ডা লাগলেই নাক বন্ধ হয়ে নিঃশ্বাস-টিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। আমি জানালা বন্ধ করে গান শুনতে লাগলাম।
বাস হেলেদুলে চলছে জোছনাপ্লাবিত বনের মধ্যে দিয়ে। সব যাত্রীই ঢলে পড়েছে গভীর ঘুমে। জেগে আছি শুধু আমি, মেয়েটা আর সাকিব।
মেয়েটা হঠাত্ আমার দিকে ফিরে বলল, ‘আপনার কাছে পানি আছে?’ আমার কাছে পানি ছিল না। সাকিবের বোতলটা নিয়ে তাড়াতাড়ি এগিয়ে দিলাম। শয়তানটা আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিস ফিস করে বলল, ‘দোস্ত, আমি কিন্তু বোতলে মুখ লাগায়া খাইছি।’
মেয়েটা হাঁ করে অনেকটা পানি খেল। তারপর বোতলটা ফেরত দিতে দিতে বলল, ‘থ্যাংকিউ।’
সাকিব আগবাড়িয়ে এবার একটা কাণ্ড করে বসল। মেয়েটার পাশের যাত্রীর দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘চাইলে তো ওনার বোতল থেকে খেতে পারতেন। আমাদের পানিতে তো মধু দেয়া নাই।’
আমি লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেলাম। কি কুক্ষণেই না এই ব্যাটার সঙ্গে কক্সবাজার এসেছিলাম। মান-ইজ্জত সব গেল! মুখের হাসি অমলিন রেখে মেয়েটা বলল, ‘আপু তো ঘুমাচ্ছে, তাই আপনাদের বললাম। কিছুক্ষণ পরেই বিরতি দিবে। তখন একটা পানির বোতল কিনে নিব।’
এই দকে আমার খুব একটা যাতায়াত নেই। কখন বিরতি দেবে কিচ্ছু জানি না।
মেয়েটা আবার কানে হেডফোন গুঁজে দিল। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে বনভূমি। বাসস্ট্যান্ডে বসে পড়া দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকার একটা রিপোর্টের কথা মনে পড়ল। হেডলাইন ছিল, ‘বন্যহাতির আক্রমণে রামুতে তিন সন্তানের মায়ের মৃত্যু।’
আমাদের বাসটা যে পথ দিয়ে যাচ্ছিল, তার জায়গায় জায়গায় সতর্কতা বাণী লেখা: ‘হাতি চলাচলের পথ।’ হয়তো এই পথে চলাচলকারী কোনো হাতির হাতেই নিহত হয়েছেন ওই মা। জর্জ অরওয়েলের লেখা ‘শুটিং অ্যান এলিফ্যান্ট’ নামের একটা গল্প পড়েছিলাম। এ অঞ্চলের পটভূমিতেই লেখা। গল্পটা বারবার মনে পড়ে গায়ে কাঁটা দিতে লাগল।
হঠাত্ আলো জ্বলে উঠল। সুপারভাইজার ড্রাইভারের পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘যাত্রা বিরতি ২০ মিনিট।’ কিছুক্ষণ পরেই বাসটা একটা রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়াল। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে মেয়েটা গুটি গুটি পায়ে বাস থেকে নেমে গেল। পেছন পেছন নামলাম আমি। আমার পেছনে সাকিব। মেয়েটার দিকে চেয়ে ফিক ফিক করে হাসছে।
আমি একটা রাগের ভঙ্গি করলাম।
বাথরুম সেরে আমরা বসলাম খাওয়ার টেবিলে। এইসব রেস্টুরেন্টে গলাকাটা দাম রাখে। আগে দাম জিজ্ঞেস না করে কিছু খেতে যাওয়া বোকামি হবে। তাছাড়া সাকিবকে জিজ্ঞেস করা হয়নি ওর কাছে টাকা আছে কি নেই।
সাকিবের কাছে টাকা নেই। টেবিলের দুপাশের মুখোমুখি দুটি চেয়ারে বসে আমরা অন্যদের খাওয়া দেখতে লাগলাম।
মেয়েটা ওখান দিয়ে যাচ্ছিল। একহাতে একটা প্যাকেট। আরেক হাতে পানির বোতল। হঠাত্ কী মনে হলো, ডাক দিলাম, ‘এই যে, শোনেন।’ সে আমার দিকে তাকানোমাত্র আমি তাকে বললাম, ‘চা খাবেন?’ মেয়েটা ঘাড় সামান্য কাত করল। আমি তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে একটা চেয়ার এগিয়ে দিলাম।
সাকিব জিজ্ঞাসা করল, ‘প্যাকেটে কী নিছেন?’
‘চিকেন প্যাটিস। ’
‘ভালো ভালো। আমার না এইসব প্যাটিস-ফ্যাটিস খাইলে গ্যাস হয়। কখন ঢুসঢাস শুরু হয় কইতে পারি না। ’
আমি সাকিবের দিকে তাকিয়ে একটা ইশারা করলাম। সে না বোঝার ভান করে মিটি মিটি হাসতে লাগল। শেষে একটা আঙুল তুলে ইশারা করার পর আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করে টেবিল ছেড়ে উঠে গেল।
আমি মেয়েটার দিকে ফিরে বললাম, ‘চা খাবেন? না অন্য কিছু? ’
‘আপনার কি বাসে ঘুম পায়? ’
‘না।’
‘তাহলে চা-ই খাই।’
দুজনে দুই কাপ চা খাওয়ার পর বিল হলো ৪০ টাকা। মেয়েটাকে বাস পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম। তারপর সাকিবের কাছে গেলাম সিগারেট টানতে।
আমাকে আসতে দেখেই সাকিব খেপে গেল। বলল, ‘তুই কিন্তু কাজটা ঠিক করতেছিস না। জানা নাই, শোনা নাই, একটা আননোন মেয়ে!’
‘আজব তো! তুই কি এখন আমার গার্ডিয়ান হয়ে গেলি নাকি?’
‘শোন’, আমার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে সাকিব বলল, ‘মেয়েটা ইয়াবা সুন্দরী হইতে পারে। এটা কক্সবাজার। এখান থেকেই সারা দেশে ইয়াবার চালান যায়।’
‘ইয়াবা সুন্দরী মানে?’
‘মাইয়ার কথায় চাঁটগাইয়া টান। কিন্তু ট্রাভেল করতেছে একলা। এই রাতের বেলা কক্সবাজারের কোনো লোকাল মেয়েই একা ট্রাভেল করবে না।’
‘তো?’
‘ইয়াবা সুন্দরীরা একা ট্রাভেল করে। এমন সব সাজপোশাক পরে যে কিছু বুঝবি না। মনে হবে ভদ্রঘরের মেয়ে। ভার্সিটিতে পড়ে। কিন্তু ওদের কাছে লাখ লাখ পিস ইয়াবা থাকে।’
‘তোরে কইছে!’ আমি রেগে বলি।
সাকিব বিরক্ত হয়ে হাতের সিগারেট ছুড়ে ফেলে দিয়ে লাফ দিয়ে বাসে উঠে যায়। ওর পেছন পেছন আমিও সিটে গিয়ে বসি। বাস চলতে শুরু করে। মেয়েটা চুপচাপ বসে আছে। হঠাত্ বাসে গান বেজে উঠল: আশা ভোঁসলের গাওয়া ‘খুব চেনা চেনা লাগছে তোমাকে...।’ মেয়েটা গানের সঙ্গে মাথা দুলিয়ে জানালার কাচে হাত রাখল। ওর অনামিকায় একটা সোনার আংটি। আগে খেয়াল করিনি। বিবাহিত নয় তো? হয়তো নতুন বিয়ে হয়েছে, হাজব্যান্ড খোলা মনের মানুষ, হয়তো ভার্সিটিরই ক্লাসমেট। এজন্য এই মাঝরাতে একা যাচ্ছে।
মনটা খারাপ হয়ে গেল। শুধু আমার সঙ্গেই কেন এ রকম ঘটে?
জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। একটু একটু করে লোকালয় দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে কিছু অরণ্যের অবশেষ। হঠাত্ খুব জোনাকি দেখার ইচ্ছে জাগল। কিন্তু রাস্তার দুই পাশে কোথাও কোনো জোনাকি নেই। কেন?
মেয়েটার ফোন বাজছে। সে ব্যাগ থেকে একটা ছোট ফোন বের করল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নাম্বারটা দেখল, কিন্তু কল রিসিভ করল না। ফোনটা বেজে চলল। আমার কেন যেন মনে হলো, ফোন করেছে ওর হাজব্যান্ড। বউ কত দূর গেল খোঁজ নিচ্ছে। ফোন বেজে বেজে থেমে গেল। কিছুক্ষণ পরেই আবার বেজে উঠল। মেয়েটা এবার ফোন ধরল।
‘হ্যালো আব্বু?’
আমার কানে যেন মধু বর্ষিত হলো।
‘না, কোনো সমস্যা নাই। পাশের সিটে একটা আপু বসছে...।
‘হাঁ, খাইছি।
‘চিকেন প্যাটিস।
‘হাঁ, একটা বোতল নিছি...’
তারপর চাঁটগাইয়া ভাষা শুরু করল, যার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না।
একটা অদ্ভুত ভালো লাগায় মনটা ভরে গেল।
মেয়েটা কথা শেষ করে দুটো ফোনই ব্যাগের ভেতর রাখল। তারপর একপাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল।
এদিকে সাকিবও ঘুমিয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে ওর নাক ডেকে উঠছে ঘোঁওত্ শব্দ করে। এই ক’দিন হোটেলে একসঙ্গে থেকে ওর নাক ডাকার প্যাটার্ন আমার মুখস্থ হয়ে গেছে। ঘোঁত ঘোঁতের মাঝখানে হঠাত্ করে বাঁশির চিকন সুর, তারপর চুপ।
সারা দিন অনেক ধকল গেছে। আমারও দুচোখ বন্ধ হয়ে এল। কতক্ষণ পেরিয়ে গেল জানি না, ঘুম ভাঙল বাসের ঝাঁকুনিতে। ঝাঁকুনির সঙ্গে বাসটা দাঁড়িয়ে পড়ল। কোথায় আছি, অন্ধকারে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। দূরের কর্ণফুলী সেতুর বাতি দেখে বুঝলাম চট্টগ্রাম পৌঁছেছি। পোশাকধারী দুই পুলিশ সদস্য বাসে উঠে এল। শুনেছি এই পথে প্রচুর ইয়াবার চালান যায়। মিয়ানমারের রোহিঙ্গারাও এই পথ দিয়ে দেশের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। এজন্য বেশ কড়া চেকিং চলে।
হঠাত্ আমার এক বন্ধুর কথা মনে পড়ল, চেকিংয়ের সময় পুলিশের চোখের দিকে তাকাতে নেই। তাকালেই পুলিশ সন্দেহ করে। তারপর ব্যাগ-ট্যাগ খুলে যাচ্ছেতাই অবস্থা করে। বর্ষণ নামের সেই বন্ধুটা একবার বাসে করে রংপুর যাচ্ছিল। ওর পকেটে ছিল গাঁজার একটা মোটাসোটা পুরিয়া। সিরাজগঞ্জে চেকিংয়ের জন্য বাস থামাতেই সে ল্যাপটপ বের করে টেপাটেপি শুরু করে। ওর পাশের সিটে ছিল ওর এক বন্ধু, গুঁতোতে থাকে। পাশের সিটেই ছিল ওর বন্ধু মেঘন। মেঘন জানত যে বর্ষণের কাছে গাঁজা আছে। সে বেচারা নাকি ভয় পেয়ে পুলিশের দিকে তাকাচ্ছিল। পুলিশ তাকে সার্চ করা শুরু করল। তার কাছে অবৈধ কিছু ছিল না, কিন্তু পুলিশ লকার থেকে ওর ব্যাগ বের করে আধা ঘণ্টা ধরে তাকে সার্চ করে। সেদিনের ঘটনায় খুব ভয় পেয়েছিল মেঘন। কিন্তু বর্ষণ পেয়েছিল মজা। জিলা স্কুলের সামনের আড্ডায় বসে আমাদের সে রসিয়ে রসিয়ে ঘটনাটা বলেছিল।
দুই পুলিশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রতিটা যাত্রীকে দেখছিল। তারা একসময় মেয়েটার সিটের সামনে এসে দাঁড়াল, তার দুটো ব্যাগই তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখল। কিন্তু কিছু পেল না। তারপর তারা আমাদের সিটের সামনে এসে হাতের ইশারায় সাকিবকে উঠে দাঁড়াতে বলল। সাকিব বাধ্য ছেলের মতো উঠে দাঁড়াল। ওরা ওর পকেট ও মানিব্যাগ সার্চ করার পর ওর ব্যাগটা খুলল। ভেতরের কাপড়-চোপড় উল্টানোর পর একটা পলিথিনের প্যাকেট বের করে আনল। সাকিব বার্মিজ মার্কেট থেকে কিছু আচার আর শুঁটকি কিনে একটা পলিথিনের ব্যাগে রেখেছিল। পুলিশ সেই ব্যাগ খুলতেই টেপ মোড়ানো চারকোনা একটা প্যাকেট বেরিয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যেই এক পুলিশ সাকিবের দুই হাত পিছমোড়া করে ধরে ফেলল। আমি বিস্ময়ে থ বনে গেলাম। সাকিবের মুখ থেকে টুঁ শব্দটিও বেরুল না।
আমার ভয় হচ্ছিল, পুলিশ হয়তো আমাকেও সার্চ করবে; কেউ যদি আমার ব্যাগেও অবৈধ কিছু রেখে থাকে? পুলিশ যদি সাকিবের সঙ্গে আমাকেও থানায় চালান করে দেয়? এমনিতেই চাকরি পাচ্ছি না, তার ওপর মাদক চোরাচালানের অভিযোগে হাজতে চালান হয়ে গেছি, এই খবর পেয়ে আমার বাবা নির্ঘাত হার্টফেল করে মারা যাবে। উদ্বেগ-আতঙ্কে ঘেমে গোসল হয়ে গেলাম।
নিচ থেকে কয়েকজন পুলিশ এসে ব্যাগসুদ্ধ সাকিবকে বাস থেকে নামিয়ে নিয়ে গেল। নামার ঠিক আগ-মুহূর্তে সাকিব আমার দিকে তাকাল। ওর সঙ্গে চোখাচোখি হলে এই গরমের মধ্যেও আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমস্রোত বয়ে গেল।
একটু পর জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখতে পেলাম পুলিশের এক সদস্য সাকিবকে এলোপাতাড়ি চড়-থাপ্পড় মারছে। ভেবে পেলাম না, এখন আমার কী করা উচিত। ওকে বাঁচানোর চেষ্টা করা দরকার, কিন্তু সাহস হলো না; বরং ভয় হলো সাকিবের পক্ষে কিছু বলতে গেলে পুলিশ আমাকেও মাদক পাচারকারীর সঙ্গী হিসেবে ধরে ফেলবে।
কিন্তু আমার ভাবনা শেষ হওয়ার আগেই বাস চলতে শুরু করল। কারো জন্য কারো জীবন থেমে থাকে না। সাকিবের জন্য ভীষণ খারাপ লাগতে শুরু করল।
কিন্তু ওর ব্যাগে ইয়াবার চালান কীভাবে গেল? সাকিব কি আমাকে না জানিয়ে ইয়াবা পাচার করছিল? নাকি কেউ ইচ্ছা করে ওর ব্যাগে ইয়াবার প্যাকেট ঢুকিয়ে দিয়েছে?
একটু পর সুপারভাইজার এসে সাকিবের খালি সিটটাতে বসল। একটা ফিচকে হাসি দিয়ে আমাকে বলল, ‘ভাই, এই লাইনে কত দিন আছেন?’
‘মানে?’
‘মানে হইল গিয়া আপনেগো দুইজনের টিকেট কিন্তু এক নামে। আপনারেও কিন্তু পুলিশের কাছে ধরায়া দিতে পারতাম।’
আমি হতবাক।
‘এখন যা কই মন দিয়া শুনেন। আমগো লাইগা কিছু মাল ছাড়া লাগব। যদি না ছাড়েন, সুয়েল দারগারে ফোন দেওয়ার দশ মিনিটের মধ্যে আইসা পড়ব।’
আমার সামনের সিটের সেই মেয়েটা হঠাত্ পেছন ফিরে সুপারভাইজারকে ধমক দিয়ে উঠল। পরিষ্কার ঢাকাইয়া উচ্চারণ: ‘যা কইছোস কইছোস, অহম থাম। কথাটা যদি ভাইয়ার কানে যায়, তোরে কাইটা কুত্তা দিয়া খাওয়াইবো।’
সুপারভাইজার যেন ইলেকট্রিক শখ খেল, ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে দ্রুত ছুটে গেল সামনের দিকে, যেন বাঘে তাড়া করেছে।
আমি মেয়েটার দিকে তাকালাম। বন্ধ জানালার অনেকটা সে খুলে দিয়েছে। খুলে ফেলেছে হিজাব। তার সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল এখন দেখতে পাচ্ছি। খোলা জানালা দিয়ে আসা দাপুটে বাতাসে লাফিয়ে উঠছে ওর ঘন চুল। চাঁদের আলোয় চকচক করছে মুখ।
সে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। কী মনে করে পাশ ফিরে তাকাল আমার দিকে। ওর মুখে দুর্বোধ্য হাসি। আমি বিস্ময়ে বিমূঢ়।






