এক শীতের রাতে আকবর এবং তাঁর রসিক সহচর বীরবল আগ্রার দুর্গে আরাম করছিলেন। এমন সময় এক গরিব ব্রাহ্মণকে হাজির করা হলো। নিজের করুণ অবস্থা জানিয়ে সাহায্য চাইল ব্রাহ্মণ। আকবর বললেন, ‘শুনেছি ব্রাহ্মণরা নাকি নানা তেলেসমাতি দেখাতে পারে। তুমি যমুনা নদীতে কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে সারা রাত কাটাতে পারবে? কোনো সাহায্য ছাড়া সেটা পারলে তুমি যা চাইবে তাই দেব আমি।’ পরদিন দরবারের কাজ শুরু হলে ব্রাহ্মণের খোঁজ করলেন আকবর। পুরস্কারের আশায় অপেক্ষা করছে সে, তাকে জানানো হলো। ‘নিয়ে এসো। প্রশ্ন করব আমি।’ ব্রাহ্মণ হাজির হলে আকবর বললেন, ‘সত্যি করে বলো, কীভাবে সারা রাত উষ্ণ ছিলে তুমি?’ ‘জাঁহাপনা, প্রাসাদের নিচে নদীতে দাঁড়িয়ে থাকার সময় জানালায় আলো দেখতে পেয়ে ওটার দিকেই তাকিয়ে ছিলাম, তাই উষ্ণ থাকতে পেরেছি।’ ‘আহা,’ বলে উঠলেন আকবর, ‘তাহলে আমার প্রাসাদের আলোর সাহায্যেই উম পেয়েছ তুমি! তোমাকে তো অমন করতে বলা হয়নি।’ দরবার থেকে তাকে বের করে দিলেন তিনি। দুর্গ থেকে বেরোনোর পথে বীরবলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ব্রাহ্মণের। আকবরের কাণ্ড জানতে পেরে ব্রাহ্মণকে কিছু বুদ্ধি বাতলে দরবারে সম্রাটের কাছে চলে গেলেন বীরবল।
সেদিন আরো পরে সম্রাট ও তাঁর সহচররা বনে গেলেন শিকারে। সহসা হাওয়ায় ধোঁয়া উড়তে দেখে ব্যাপার কী খোঁজ করতে গিয়ে দেখেন এক লোক লম্বা একটা গাছের গোড়ায় আগুন জ্বালিয়েছে, গাছটার ডালে একটা পাত্র ঝোলানো। ‘কী করছ তুমি?’ জিজ্ঞেস করলেন আকবর। ‘ভাত রাঁধছি, হজুর,’ উত্তর দিল লোকটা। ‘বেকুফ কাঁহিকা! গাছের তলায় আগুন রেখে ডালে হাঁড়ি চাঁপিয়েছ কোন বুদ্ধিতে? কী ফায়দা হবে তাতে?’ তখনই বীরবল এগিয়ে এসে বললেন, ‘জাঁহাপনা, ওই সেই দরিদ্র ব্রাহ্মণ যাকে আপনি প্রাসাদের জানালার আলোয় শরীর উষ্ণ রাখার দোষে দোষী করেছেন। অমন কিছু করতে পারলে নির্ঘাত্ ভাতও রান্না করতে পারবে।’ বোকা বনে গেছেন বুঝতে পেরে ব্রাহ্মণকে জুতসই পুরস্কার দিলেন আকবর।
এমনি আরো ঘুমপাড়ানি গল্প আছে। সবসময়ই এগুলো বীরবলের রসাত্মক পাল্টা উত্তর কিংবা ব্যাখ্যায় শেষ হয়ে তার প্রভু আকবরকে বোকা বানিয়ে বৈরী পরিবেশকে অনুকূল করে তুলেছে। নিরক্ষর মুসলিম নারী-পুরুষ এগুলোর কথক। পরে এসব গল্প পাঠ্যবইতেও জায়গা পেয়েছে; পথের ধারের সস্তা বইয়ের দোকানেও বহু পাওয়া যায়। এমনি ‘বীরবলিয়ানার’ বিস্তৃতির আভাস দিতে আরো কয়েকটা নজির তুলে ধরা যেতে পারে।
সম্রাট একবার একটামাত্র বাক্যে দুটো প্রশ্নের উত্তর দিতে বলে ধাঁধা জিজ্ঞেস করলেন বীরবলকে। প্রশ্ন দুটো ছিল: ‘ব্রাহ্মণের কেন পিপাসা পেল? গাধাটার কেন মন খারাপ?’ চট করে লোটা শব্দ নিয়ে কৌতুক করে জবাব দিলেন বীরবল, ‘লোটা না থা।’ বিশেষ্য হিসেবে লোটা না থাকায় ব্রাহ্মণ তৃষ্ণার্ত হয়েছিল এবং ক্রিয়া অর্থে বেশকিছু সময় গড়াগড়ি খেতে পারেনি বলেই গাধাটার মন খারাপ হয়েছে।
আরেক ধরনের গল্প আছে, এগুলোয় সম্রাট কোনো একটা কবিতার অর্ধেক পঙিক্ত বলতেন এবং তার পর বীরবলকে বাকি পঙিক্ত বানিয়ে সেটাকে অর্থময় পদ্যে পরিণত করতে হতো। এই চ্যালেঞ্জকে বলা হয় সমস্যা পূর্তি, মানে সমস্যার ফয়সালা কিংবা শূন্যস্থান পূরণ। সংস্কৃত ও অন্যান্য সম্পর্কিত ভাষায় বেশ জনপ্রিয় একটা খেলা এটা।
একদিন প্রাসাদের জানালা থেকে রাস্তার দৃশ্য দেখার সময় সম্রাটের চোখে পড়ল এক তরুণী মাথায় করে পানির পাত্র নিয়ে যাওয়ার সময় সেটা থেকে পানি ছলকে পড়ছে। পানি ছলকে যাওয়ার কারণ কী, ভাবলেন আকবর। তার পর নিজেই প্রশ্নের উত্তর দিলেন। পাত্রটা ভারী, কিন্তু ওই মহিলা কম বয়সী, নাজুক। সঙ্গে সঙ্গে অর্ধেক পঙিক্ত রচনা করে ফেললেন। ‘পাত্রের পানি ছলকায় কেন?’ পরে ওই অর্ধেক পঙিক্তর সমস্যা পূর্তি করতে বললেন বীরবলকে। এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে একটা পঙিক্তটা আবৃত্তি করলেন বীরবল, ‘তারুণ্যে মাতাল এক মেয়ে গেছে কুয়ো থেকে পানি আনতে। ভারী পাত্র টেনে তুলে আনতেই টান লেগে এঁটে থাকা কাঁচুলি খসে গেছে। লজ্জা ঢাকতে না পেরে রেগে গেছে সে। পাত্র থেকে তাই ছলকে পড়ছে জল।’ খুবই খুশি হলেন সম্রাট।
এবার কয়েকটা চুটকি:
আকবর, যুবরাজ সেলিম ও বীরবল শিকারে গেছেন। দিন তেতে উঠতেই আকবর ও সেলিম পরনের ভারী পোশাক খুলে বীরবলের হাতে তুলে দিলেন। তার পর আকবর ঠাট্টা করে বললেন, ‘একটা গাধার বোঝার মতো লাগছে।’ বীরবল উত্তর দিলেন, ‘না, না, হুজুর, দুইটা গাধার বোঝার মতো।’
আকবর একদিন বীরবলকে বললেন, ‘গত রাতে স্বপ্ন দেখলাম আমি একটা মধুর গর্তে পড়ে গেছি। তার পরই দেখলাম তুমি পড়েছ মলের গর্তে।’ ‘কি আশ্চর্য, জাঁহাপনা!’ নিমেষে উত্তর দিলেন বীরবল। ‘আমিও ওই একই স্বপ্ন দেখেছি। তার পর গর্ত থেকে উঠে আমি আপনার গা চাটলাম, জাঁহাপনা, আর আপনি দয়া করে একই কাজ করলেন আমার বেলায়।’
আকবর একদিন বীরবলকে বললেন, ‘আমাকে ষাঁড়ের দুধ এনে দিতে হবে।’ একটা দিন সময় চেয়ে নিলেন বীরবল। তার পর বাড়িতে মেয়ের কাছে গেলে তাকে বুদ্ধি জোগাল সে। সেদিন গভীর রাতে যমুনামুখী জানালার নিচেই কাপড় কাচার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল সম্রাটের। একজন সৈন্যকে পাঠিয়ে দোষীকে হাজির করা হলো রাজার সামনে। এক তরুণী। ‘এত গভীর রাতে কাপড় কাচছ কেন?’ জানতে চাইলেন আকবর। ‘দিনে পারতে না?’ ‘জাঁহাপনা, বাবার একটা ছেলে হওয়ায় সারা দিন ব্যস্ত ছিলাম,’ জানাল মেয়েটা। ‘এতক্ষণে বাড়ি থেকে বের হতে পারলাম।’ ‘বলছ কী? তোমার বাবার ছেলে হয়েছে?’ রাগের সঙ্গে জানতে চাইলেন আকবর। ‘এমন আজগুবি কথা কে কবে শুনেছে!’ ‘তাহলে কে কবে ষাঁড়ের দুধ হওয়ার কথা শুনেছে, জাঁহাপনা?’ উত্তর দিল মেয়েটি।

আকবর ও বীরবল একদিন যমুনায় নৌবিহারে বের হয়েছেন। হঠাত্ সম্রাটের গলা থেকে একটা মুক্তোর মালা নদীতে পড়ে গেল। আকবর বীরবলকে বললেন, ‘বীরবল, মালা দে।’ বীরবল চট করে উত্তর দিলেন, ‘জাঁহাপনা, বেহনে দো।’ মানে ভেসে যেতে দিন, যাকে আবার ‘আপনার বোনকে দিন’ হিসাবেও ব্যাখ্যা করা যায়। সম্রাট চুপ করে গেলেন।
এসব গল্পের কোনোটার কি ইতিহাসে ধরে রাখা কোনো ঘটনার সূত্র রয়েছে? দুটো গল্পের খোঁজ মিলেছে।
‘আমি দুই মাসকে মিলিয়ে এক মাসে পরিণত করেছি,’ বীরবলকে বললেন আকবর। বীরবল উত্তর দিলেন, ‘আপনার অশেষ দয়া। এত দিন লোকে মাত্র পনের দিন চাঁদের আলো পেত, এখন পাবে পাক্কা তিরিশ দিন।’
আব্দুল কাদির বদায়ূনি আকবরের আমলের ‘অনঅনুমোদিত’ ইতিহাস লিখেছিলেন। তিনি বলছেন, ১৫৮২ সালে আকবর ১৩ তারিখের বদলে ২৮ তারিখ থেকে হিন্দু মাসের গণনা শুরু এবং সেই মোতাবেক সুপরিচিত হিন্দু উত্সবের দিন স্থির করার ফরমান জারি করেছিলেন। কিন্তু এই বিধান চালু হয়নি, যদিও সেই ফরমান ফাতপুর থেকে গুজরাট আর বাংলায় পৌঁছে গিয়েছিল।
বীরবলকে আকবর বললেন, ‘বীরবল, তোমাকে আমার কালিমা পড়তেই হবে [মানে আমার ধর্ম গ্রহণ করতে হবে]’ বীরবল জবাব দিলেন, ‘জাঁহাপনা, আমি তো আগেই আপনার কালিমা পড়েছি [মানে আমি সম্পূর্ণ আপনার অনুগত], কিন্তু আমি ধর্ম পাল্টে ফেলার কালিমা পড়ব না।’
আকবরের বিয়ের সূত্রে ভাস্তে এবং সম্ভবত সর্বসেরা সেনাপতি রাজা মান সিংয়ের নামে চালু মন্তব্যের প্রতিধ্বনি রয়েছে এখানে। এক আন্তরিক সামবেশে আকবরের ‘শিষ্যদের’ সঙ্গে যোগ দিতে জোরাজুরি করায় মান সিং সোজাসাপ্টা জবাব দিয়েছিলেন, ‘শিষ্যত্বের মানে প্রাণ বিসর্জন দিতে তৈরি থাকা হলে আমি তো আগেই আমার মাথা হাতে তুলে নিয়েছি, এরচেয়ে বেশি প্রমাণের আর কী আছে? কিন্তু এ কথার ভিন্ন মানে থাকলে, যদি ধর্মের কথা বুঝিয়ে থাকে, আলবত্ আমি একজন হিন্দু। আপনি হুকুম করলে আমি মুসলমান হব, কিন্তু এ দুটো ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের কথা আমি জানি না।’ এই পর্যায়ে বদায়ূনি জানাচ্ছেন, ‘ব্যাপারটা মিটে গিয়েছিল, সম্রাট তাকে আর কিছু বলেননি।’
মুসলিম-হিন্দু সাম্প্রদায়িক টানাপড়েন সম্পর্কে সজাগ হওয়ার পর আকবর-বীরবলের এই গল্পগুলো ভিন্ন রঙ পেয়েছিল। অনেকগুলোই যেন মোগল শাসকের বিরুদ্ধে হিন্দু লেখকের অসন্তোষ তুলে ধরেছে বলে মনে হয়েছে। কিঞ্চিত্ বোকা, কিছুটা যুক্তিবর্জিত এবং সাধারণভাবে আক্রমণাত্মক মুসলিম শাসক যত চালাকিই করুন না কেন, চতুর হিন্দু প্রতিপক্ষ বরাবরই তারচেয়ে সেরা জবাব খুঁজে বের করে ফেলছেন। আকবর সম্পর্কে বিশেষ করে তার ধর্মীয় পছন্দের পাশাপাশি হিন্দু মহাকাব্যের প্রতি দুর্বলতা, জিজিয়া কর বিলোপ, বিখ্যাত রাজপুতদের সঙ্গে সখ্য এবং কর্তৃত্বের জন্য মুসলিম ধর্মগুরুদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব সম্পর্কে জানার পর পুরো ব্যাপারটা আরো জটিল চেহারা নেয়। একজন মুসলিম রাজা যেখানে সধর্মীদের বৈরী করে হলেও অমুসলিম প্রজাদের প্রতি বৈষম্য দূর করতে অনেক করেছেন। অথচ তাকে এই গল্পগুলোয় এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে দৃশ্যত সাম্প্রদায়িক জোর রয়েছে।
ফ্রয়েড অবচেতন মনের সঙ্গে কৌতুকের সম্পর্ক নিয়ে বই লেখার পর থেকেই ঠাট্টা-মশকরাকে কোনো ধরনের চাপা আগ্রাসী তাগিদ হিসেবে দেখা মামুলি ব্যাপার হয়ে আছে। ‘পথের বাধার (কামুক বা প্রতিশোধমূলক) প্রেক্ষিতে কৌতুক ইচ্ছা পূরণ সম্ভব করে তোলে। এগুলো এই বাধা পাশ কাটিয়ে এক অর্থে অগম্য পরিণত করা উত্স থেকে আনন্দ সংগ্রহ করে।’ আমরা কি তবে ফ্রয়েডের কথামতো এই কৌতুকগুলোকে ‘উদ্দেশ্যমূলক কৌতুক’ বলে মোগলদের বিরুদ্ধে চাপা ক্ষোভের প্রকাশ ধরে নেব? কিন্তু চালু ধারণা অনুযায়ী এই ক্ষোভ তো আকবরের বদলে আওরঙ্গজেবের প্রতিই হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। আওরঙ্গজেব হয়তো নিতান্ত অপছন্দের মানুষ ছিলেন, কিন্তু তাকে নিয়ে কৌতুকের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য।
অন্যদিকে কৌতুককে চাপা ক্রোধের প্রকাশ হিসেবে দেখলে বদায়ূনি ও পরবর্তীকালের মুসলিম লেখকদের আকবরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি একই ধরনের গল্পের ভিন্ন একটা সংগ্রহকে যেন স্পষ্ট করে তোলে। যেমন, আকবরের কথিত আরেক দারবারি বিদুষক মোল্লা দোপিয়াজার কর্মকাণ্ড। মূলত মোল্লা দোপিয়াজার রসিকতাগুলো ভিন্ন লোকদের উদ্দেশে ছিল। তবে বেশ কয়েকটি গল্পে তাকে বীরবল এবং আকবরের চেয়ে সেরা হিসেবে দেখিয়েছে। তো বলা যেতে পারে যে, এই ধরনের বুদ্ধির খেলায় মোল্লা ছিলেন সনাতনী ইসলামের ধ্বজাধারী। দুটো উদাহরণ:
একদিন সম্রাট ও মোল্লা বাগানে ঘুরছিলেন। এমন সময় বাতকর্ম করে বসলেন সম্রাট। নিজের বিব্রত ভাব গোপন করতে আকাশের দিকে তাকালেন তিনি। মোল্লা অমনি পেট চেপে ধরে এক রকম আওয়াজ করে আকাশের দিকে তিনিও তাকালেন। ক্ষেপে উঠলেন সম্রাট। ‘আকাশের দিকে তাকাচ্ছ কেন?’ রাগের সঙ্গে জানতে চাইলেন। ‘দেখুন, জাঁহাপনা,’ বললেন মোল্লা, ‘আমি স্রেফ দেখছিলাম কারটা বেশি উপরে গেছে।’ ভীষণ অস্বস্তি বোধ করলেন সম্রাট।
একদিন এক ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সম্রাটকে বললেন ভোরে জোড়া-কাক দেখা সৌভাগ্যের ব্যাপার। বীরবল ছিলেন সেখানে, তিনিও সাক্ষী দিলেন। কিন্তু মোল্লা আকবরের কানে ফিসফিস করে বললেন, ‘হুজুর, ব্যাপারটা পরখ করে দেখতে পারেন।’ আকবর সঙ্গে সঙ্গে বীরবলকে বলে দিলেন একসঙ্গে জোড়া-কাক দেখলেই যেন তাকে জানান। একদিন সকালে বীরবল ছুটে গিয়ে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন সম্রাটকে। ভীষণ শীতের সকাল ছিল সেটা। তবু বীরবলের পিছু পিছু বাইরে এসে মাত্র একটা কাক দেখতে পেলেন। অন্যটা উড়ে গেছে। সম্রাট রেগে আগুন হয়ে বীরবলকে গোটা দুই চড় কষে দিলেন। সেদিন আরো পরে এক রাজপুত রাজকন্যাকে তুলে দেয়া হলো সম্রাটের স্ত্রী হিসেবে। তখনই মোল্লা বুকে হাত রেখে সামনে এগিয়ে এসে বললেন, ‘জাঁহাপনা, ওই কাক দুটো দেখলে আর এই উপহার পেতেন না, কারণ যে দেখেছে সে কি পেয়েছে আমরা জানি।’
ভীষণ লজ্জা পেলেন বীরবল।
বলা বাহুল্য, বীরবলের গল্পের ভাণ্ডারে এমন গল্পও আছে, যেগুলোয় মোল্লাকে পরাস্ত দেখানো হয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে গল্প এক হলেও জয়ী ভিন্ন, যা কিনা উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে মিল বোঝাতে পারে।
একসঙ্গে মেলায় গেলে আমরা যেন এসব জনপ্রিয় ও বেনামি গল্পে আকবরের এক বিচিত্র চেহারা পাই। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের দুই প্রান্তেই যেন আছেন তিনি। স্পষ্টই, কৌতুকের ভেতর দিয়ে কোনো ধরনের চাপা ধর্মীয় ঘৃণার কথা বলে ব্যাখ্যা দেয়া যথেষ্ট হবে না। এই প্রশ্নের আরো সুলুক সন্ধান প্রয়োজন।
তিন চরিত্রের নিবিড় পর্যবেক্ষণ:
আকবর ১৫৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন, মারা যান ১৬০৫ সালে। তাঁর বাবা ছিলেন সুন্নি তুর্কি, মা ইরানি শিয়া। ইরানে পালিয়ে যাওয়ার পর এক হিন্দু রাজার কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন হুমায়ুন, সেখানেই আকবরের জন্ম। হুমায়ুন রাজ্য উদ্ধার করেন এবং তার অল্পদিন পরেই, ১৫৫৬ সালে মারা যান। মাত্র ১৩ বছর কয়েক মাস বয়সে সিংহাসনে বসেন আকবর। অবশ্য ১৫৬২ সাল নাগাদ সবেসর্বা হয়ে ওঠেন তিনি এবং ইতোমধ্যে বেশ কয়কজন রাজপুত স্ত্রীর ভেতর প্রথমজনের সঙ্গে বিয়ে হয় তার (যিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি)। ১৫৬৫ সাল নাগাদ হিন্দু প্রজাদের প্রতি বৈষম্যমূলক সব কর রদ করেন তিনি, তবে তখনো ধার্মিক মুসলিমই ছিলেন, বলা হয় নিয়মিত প্রার্থনা করতেন এবং মুসলিম ধর্মগুরুদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। দশক পরিক্রমায় বেশকিছু মুসলিম কর্মকর্তার গোষ্ঠীগত ধর্মান্ধতায় তিতিবিরক্ত হয়ে ওঠেন। তাদের কেউ কেউ প্রায়ই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধাচরণ করছেন বলেও ধারণা হয় তার। ১৫৭৭ সালে বেশ কয়েকজন মুসলিম পণ্ডিতের হাতে সম্রাটের ভ্রান্তিহীনতা ঘোষণার শামিল ‘মাহজার’ (আইন) জারি করান তিনি।
এদিকে অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কেও আকবর কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলেন। বিভিন্ন ধর্মীয় বিষয়ে তাঁর সামনে আলোচনার জন্য ধর্মীয় পণ্ডিতদের জড়ো করেন। শেষ পর্যন্ত নিজের ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা পূরণে বিভিন্ন আচারের একটি মিশেল তৈরি করেন। নিজেকে আধ্যাত্মিক গুরু ভাবতে শুরু করেছিলেন তিনি; ‘মুরিদ’ বা অনুসারীও তৈরি করেছিলেন। তবে কোনো নতুন ধর্ম শুরু করেননি বা দরবারের কোনো সদস্যকে জোর করে ধর্মান্তরিতও করেননি।
বীরবলের আসল নাম মহেষ দাস। ১৫২৮ সালে কালপি গ্রামে এক ভাট ব্রাহ্মণ পরিবারে তার জন্ম। পেশা হিসেবে কবিতা রচনা বেছে নেন এবং রাজপুত দরবারে সুনাম অর্জন করেন। কে তাকে আকবরের দরবারে নিয়ে এসেছিল পরিষ্কার নয়, তবে ১৫৬৩ সাল নাগাদ বীরবল সাবেক মনিবের পক্ষে আকবরের কাছে মধ্যস্থতা করার মতো অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। আবুল ফজল দুই হাজার অধিনায়কের ভেতর তার নাম যোগ করেছেন, কিন্তু কোন পদ থেকে শুরু করেছিলেন সে তথ্য নেই। অবশ্য রাজপুত দরবারে তার নাম ব্রহ্ম কবি ছিল এবং আকবরই যে নতুন খেতাব দিয়েছিলেন তাতে সবাই একমত। বদায়ূনি মোটেই বীরবলের গুণগ্রাহী ছিলেন না, তিনি এভাবে তার পরিচয় তুলে ধরেছেন।
‘তরুণ বয়স থেকেই সম্রাট ব্রাহ্মণদের মতো বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী, সংগীতজ্ঞ এবং অন্য হিন্দুদের ব্যাপারে কৌতূহল দেখিয়ে এসেছেন। তো তার রাজত্বের গোড়ার দিকে গদাই ব্রাহ্মণদাস নামে উল্লেখ করার মতো বুদ্ধি ও ক্ষমতার অধিকারী এক সংগীতজ্ঞ, যার একমাত্র কাজ ছিল হিন্দুদের তারিফ করা, দরবারে আসে। সম্রাটের সঙ্গে আলাপের ভেতর দিয়ে এবং ব্যতিক্রমী মেজাজের সুযোগ নিয়ে ধীরে ধীরে উপরের পদে উঠে যায় এবং সম্রাটের আস্থাভাজন হওয়ার সম্মান পায়। প্রথমে কবি রায় বা কবির রাজপুত্র এবং পরে রাজা বীরবর, অর্থাত্ ‘বিখ্যাত যোদ্ধা’ খেতাব পায় সে।

এমনটা হওয়ার খুবই সম্ভাবনা রয়েছে। আকবর ইরান ও ভারতের গল্প-সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন। নিজের উপভোগের জন্য বেশকিছু সংস্কৃত রচনা ফারসি ভাষায় তর্জমা করিয়েছিলেন তিনি। অনূদিত বইয়ের তালিকায় নাম না থাকলেও কথা সরিত সাগরের একটি পুরোনো ফারসি তর্জমার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন আকবর। যেখানে এ গল্পটি রয়েছে। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, আকবর নিশ্চয়ই রাজা বিক্রমাদিত্যের নামের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন; কেননা তাঁর দিনপঞ্জির বদলানোর ব্যর্থ প্রয়াস পেয়েছিলেন তিনি। সিংহাসন বাতিসি বা বিক্রমাচরিত্র্য তর্জমার নির্দেশ নিয়েছিলেন তিনি, যেখানে এই কিংবদন্তি রাজার বিপুল তারিফ করা হয়েছে। তিনি সম্ভবত তার প্রথম মহান হিন্দু প্রতিপক্ষ হিমুর আরেক বিক্রমাদিত্য হিসেবে পরিচিত হওয়ার ইচ্ছার কথাও জানতেন।
স্পষ্টতই কেবল কবি হিসেবে নন, বরং নিবেদিত ও বিশ্বস্ত সহচর হিসেবেই আকবরের কাছ থেকে খেতাব পেয়েছিলেন বীরবল। বেতাল গল্পের বীরবল দুটি দিক থেকে অসাধারণ: বিপুল দৈনিক আয়ের বেশির ভাগই দান করে দিয়েছেন তিনি এবং মনিবের জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনে নিজের ছেলেকে উত্সর্গ করেছেন। পৃষ্ঠপোষকের প্রতি এই ধরনের ভক্তি ও ঔদার্য বীরবলেরও বৈশিষ্ট্য ছিল।
সম্রাটও বীরবলের কম অনুরাগী ছিলেন না। নিজের চেম্বারের খুব কাছে বীরবলের জন্য একটা বাড়ি তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি। অন্য কোনো সভাষদের ভাগ্যে এই সম্মান জোটেনি। বীরবলের বিভিন্ন বাড়িতে সম্রাটের চারবার বেড়াতে যাওয়াও সমান বিরল সম্মান। অন্য ক্ষেত্রে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বীরবলকে হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন আকবর। বীরবলের প্রতি বদায়ূনির তীব্র ঘৃণা তার জন্য আকবরের অগাধ সম্মানেরই প্রতিচ্ছবি।
১৫৮৬ সালে ইউসুফজাই আফগানদের বিরুদ্ধে এক বিপজ্জনক যুদ্ধে বীরবল নিহত হলে আকবর বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। টানা দুদিন তিনি জলখাবার স্পর্শ করেননি। দরবারি শোক ঘোষণা করেছিলেন।
কয়েক মাস পর গুজব রটেছিল যে বীলবলকে উত্তরের পাহাড়ি এলাকায় জীবিত দেখা গেছে। এর পরের ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন বদায়ূনি:
‘সম্রাটের হূদয়ের ঝোঁক ওই অপবিত্রের দিকে সেঁটে আছে এবং তাকে হারানোয় দিয়ে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েছেন বুঝতে পেরে উগ্র হিন্দুরা প্রতিদিন গুজব ছড়াতে শুরু করল যে, লোকে যোগী ও সন্ন্যাসীদের সঙ্গে উত্তরের পাহাড়ি এলাকা নগরকোটে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে তাকে। মহামান্য তার মতো একজন মানুষ দুনিয়ার আকর্ষণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এবং ইউসুফজাইদের হাতে দুর্ভাগ্য বরণের গ্লানির কারণে দরবারে ফিরতে না চাওয়া অবিশ্বাস্য নয় বিশ্বাস করে বসলেন। একজন কর্মকর্তাকে নাগরকোটে পাঠিয়ে তদন্ত করা হলো। দেখা গেল ওই খবর অলস গুজবমাত্র।’
আবুল ফজল এবং আব্দুল কাদের বদায়ূনি বিপরীত মেরুর সমসাময়িক ছিলেন। প্রথমজন বীরবলকে সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে শেষেরজন তাকে ‘বেজন্মা’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু দুজনের কেউই বীরবলের রসিকতা নিয়ে কিছু বলেননি।
অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকের মোগল দরবারের অভিজাতদের একটি জীবনীভিত্তিক অভিধান মা’আসির আল উমারায় বিখ্যাত রসিক হিসেবে প্রথম বীরবলের উল্লেখ মেলে। লেখক জানাচ্ছেন, ‘বীরবলের সৌভাগ্য তাকে সম্রাটের দরবারে নিয়ে এসেছিল এবং এখানে তার কবিতা ও রসবোধ তাকে রাজার ঘনিষ্ঠ সহচরদের ভেতর জায়গা করে দেয়; তবে ধীরে ধীরে তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে যান। সম্রাট তাকে ‘আমার বিজ্ঞ সহচর’ বলতেন।’ পরে একই লেখক লিখছেন, ‘রাজা বীরবল উদারতার দিক থেকে সেই সময়ের বিচারে অতুলনীয় ছিলেন। তার কবিতাগুলো বিখ্যাত ছিল এবং বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর ও গল্প সবার মুখে মুখে ফিরত।’
মোল্লা দোপিয়াজা এই ত্রয়ীর তৃতীয় সদস্য। আকবরের সময়ের কোনো লেখায় তার উল্লেখ মেলে না। গত শতকের শেষ দিকে তাঁর জীবন ও কৌতুকের ওপর বেশ কটি প্যামফ্ল্যাট বেরিয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে এসব ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত হাফিজ মাহমুদ শিরানির এক নিবন্ধে জালিয়াতি হিসেবে বাতিল করা হয়। শিরানির কাছে ফারসি ভাষায় লেখা বেশ কয়েকটা কাহিনী গল্প ও চিঠিসহ উনিশ শতকের গোড়ার দিকের একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। এখানে আশলাগি নামে কারো রচিত দুটো দীর্ঘ লেখাও ছিল। নিজেকে মোল্লার ছেলে ও শিষ্য দাবি করেছেন তিনি। আশলাগির কথামতো মোল্লা ভারতে জন্ম নিয়েছিলেন, কিন্তু ৯৯০ হিজরিতে (১৫৮২ সাল) ইরানে চলে যান। ৩৬ বছর পর জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ফিরে আসেন এবং তার পর পরই ১০৩০ হিজরি (১৬২০ সাল) মারা যান। তার আসল নাম আবদ আল-মোমিন। দোপিয়াজা বিখ্যাত হয়ে ওঠা গৃহীত একটা নাম। শিরানির উল্লেখ করা আরো কিছু সূত্রমতে, মোল্লার কবর রয়েছে মধ্য ভারতের জুতসইভাবে ‘হাঁড়িয়া’ (রান্নার পাত্র) নামে একটা জায়গায়। এই প্রমাণের ভিত্তিতে শিরানি মোল্লা নিশ্চয় কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র হবেন বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তবে উল্টো কিছু বিশ্বাস করার একাধিক কারণ রয়েছে। (১) আশলাগি সম্পর্কে অন্য কোনো তথ্যের অস্তিত্ব নেই। কোনো অভিধানেই ‘আশলাগ’ কি ‘আশলাগি’ শব্দ পাওয়া যায় না। শব্দটিকে অর্থপূর্ণ করে তোলার অন্য একমাত্র পথ একে ‘শালাগ’ অর্থাত্ ‘মাথা ফাটানো’ অর্থে নেয়া। আশলাগির মানে তাহলে দাঁড়ায় মাথা ফাটানোয় নিপুণ কেউ। কোনো গল্পের শিয়াবিরোধী ভাব বিচারে এটা খুব একটা দূরবর্তী নাও হতে পারে। (২) আশলাগি জানাচ্ছেন, মোল্লা ১৫৮২ সালে হেরাতে গেলে কবি ফাসিহির (মৃ: ১৬৩২) বাড়িতে গিয়েছিলেন। স্ত্রী বাড়িতে নেই অজুহাত দেখিয়ে ফাসিহি তাকে কোনো খাবার দেননি। মোল্লা মন্তব্য করেছেন: ‘মেহমান রুটি চায়, তোমার স্ত্রীকে নয়।’ এটা আসলে একটা রসগল্প সংকলনে প্রকাশিত বেনামি কৌতুক, যার লেখক ১৫৩২ সালে মারা যান। (৩) উবায়েদ-ই যকানির পঞ্চদশ দশকের বেশ ক’টি প্রহসন ও কৌতুক রচনার পাণ্ডুলিপিতে ‘তা’রিফাত ই-মোল্লা দোপিয়াজা’ নামে একটি অংশ রয়েছে।
আকবরের আমলের বেশ আগেই পারস্য লোককাহিনীতে রসিক মোল্লার অস্ত্বিত্ব ছিল। এই কারণে আব্দুল মোমিন মোল্লা দোপিয়াজা নাম নিয়েছিলেন বলে যুুক্তি দেখানো যায় বটে, তবে সেটা তাকে আকবরের দরবারের কাছে নিয়ে আসছে না। আশলাগি থেকে শিরানির উল্লেখ করা কোনো কৌতুকেই আকবরের উল্লেখ নেই। আসলে আশলাগির ভাষ্যে আকবরের আমলে হতাশ হয়ে মোল্লা ভারত থেকে চলে গিয়েছিলেন। তাঁর (আকবর) মৃত্যুর পর ২৩ বছর পেরোনোর আগে আর ফেরেননি।
উপরের তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপদে ধরে নেয়া যায় যে, বীরবলের বিপরীতে মোল্লা একেবারে কাল্পনিক। ঐতিহাসিক আকবরের সঙ্গে কোনো রকম সম্পর্কহীন ইরান ও মধ্য এশিয়ার লোককাহিনীর সৃষ্টি একটি কৌতুক চরিত্র।
দুটি কৌতুক চরিত্র পাচ্ছি আমরা। একজনের ঐতিহাসিক ভিত্তি অন্যজনের চেয়ে বেশি, তবে খ্যাতি আর কর্মকাণ্ডের দিক থেকে দুজনই সমান কিংবদন্তিসম। দুজনই দৃশ্যত আকবরকে বিনোদিত করেছেন, অনেক সময় পরস্পরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে মেতেছেন, তবে প্রায়ই কিঞ্চিত তীক্ষ কৌতুকে খোদ পৃষ্ঠপোষককেই ঘায়েল করেছেন। তাদের কৌতুক কাহিনীগুলো মোটামুটি একই সময়ে, অর্থাত্ ভারতে মোগল শাসন প্রায় ১০০ বছরের মতো ভিত্তি পাওয়ার পর উত্তর ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে মনে হয়।
এর আগে ধারণা ছিল যে, মোল্লা ও বীরবল হয়তো দুটো বিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন এবং আকবর ও পরস্পরের বিরুদ্ধে সুপ্ত বৈরিতা প্রকাশ করে থাকবেন। তবে এই ধারণা ঠিক সন্তোষজনক নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে আকবর এবং তার পরবর্তী সময়ের বিপুল হিন্দু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈরী ও ভীষণ সাম্প্রদায়িক সম্পর্কের আভাস দেয়। দ্বিতীয়ত. এটা বিনোদনমূলক গল্পগুলোকে স্রেফ রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষিতে স্থান দিয়ে সাধারণ পটভূমিকে উপেক্ষা করে। এখন এই দুটো বিষয় বিবেচনা করা যাক।
প্রথমত. বীরবলকে আকবরের প্রতি কথিত হিন্দুদের ঘৃণার প্রতীক ভাবার প্রশ্ন। সবচেয়ে তিক্ত আকবরবিরোধী বই পিনোর কে বলে আকবর মহান? থেকে পাওয়া যায়:
‘আকবরকে প্রায়ই মহান পুরুষ ও অভিজাত রাজা হিসেবে তুলে ধরা হয়। তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এই মূল্যায়ন সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। আকবরের সব পূর্বসূরিই বর্বর ও ভয়ঙ্কর ছিলেন। তার উত্তরসূরিরাও তাই... আগাগোড়া। আকবর তার উত্তরসূরি, পূর্বসূরি এবং সমসাময়িকদের চেয়ে মোটেও কম নিষ্ঠুর ছিলেন না। কিছু হয়ে থাকলে, তার নিষ্ঠুরতা, ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতক চরিত্র এবং বিশাল এলাকায় তিনি যে সীমাহীন ক্ষমতা দেখিয়েছেন সেটা কেবল ভারত নয়, বরং গোটা বিশ্বের অন্যতম স্বৈরাচারী হওয়ার যোগ্য করে তোলে তাকে।’
এর পর বীরবল সম্পর্কে কিছু ইতিবাচক মন্তব্যের আশায় পিনোর মতামত যাচাই থেকে বিস্ময়করভাবে এই মন্তব্য মেলে: ‘ভারতে চালু আকবর বীরবলের কৌতুক ও রসিকতা-সম্পর্কিত কিছু সস্তা গল্প কিছু মেধাবী লেখকের হাতে তৈরি হয়েছে এবং সময়ে সময়ে অন্যদের মারফত যোগ হয়ে এক ধরনের ঐতিহাসিক আকবর-বীরবল পটভূমি জুগিয়েছে। সত্যিকারের বীরবল রসিকতা বা কবিতা থেকে দুরস্ত এক ভয়ঙ্কর, নাজুক এবং গভীরভাবে বিতৃষ্ণ জীবনযাপন করেছেন।’
ভারতীয় বিদ্যা ভবন থেকে প্রকাশিত একাধিক লেখকের দ্য হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অব দ্য ইন্ডিয়ান পিপল-এও বীরবল নায়কোচিতভাবে হাজির হননি। স্রেফ দরবারি বিদুষক হিসেবে বর্ণনা করে অল্প ক’টি বিক্ষিপ্ত বাক্যই তাকে বাতিল করে দেয়া হয়েছে। আকবরের আমলের প্রেক্ষিতে ‘বিস্মৃত বীর’ হিমুকেই একটি অধ্যায় বরাদ্দ করে সম্মান দেখানো হয়েছে।
আকবরের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরেছেন কিনা, দেখতে কিছু হিন্দু লেখকের রচনাও যাচাই করে দেখা হয়েছে। কিন্তু তেমন কিছু মেলেনি। বীরবলের ওপর যেসব রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ নিবন্ধ লিখেছেন আকবরকে তারা স্ত্রী ও সহচরদের ভালোবাসেন এমন সাহসী ও ন্যায়বান শাসক হিসেবে তুলে ধরেছেন। একইভাবে আকবরের দরবারের হিন্দু কবিদের নিয়ে সাহিত্যিক ইতিহাস রচয়িতারা ব্রাহ্মণ কবি (বীরবল) ও নাসারির মতো কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা করায় তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
বীরবলকে নিয়ে জনপ্রিয় ও দ্রুতপ্রজ লেখক বৃন্দাবন লাল ভার্মার পূর্ণাঙ্গ হিন্দি নাটকও খতিয়ে দেখা হয়েছে। ১৯৬৫ সাল নাগাদ এর ছয়টি মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। ভার্মা কৌতুকগুলোকে সাধারণ মানুষের অলীক কল্পনার প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু সত্যনির্ভর মনে না করায় ব্যবহার করেননি। নাটকটিও খুব একটা মৌলিক ধরনের ছিল না। আমাদের অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে লক্ষণীয়ভাবে এর চরিত্র তালিকা আমাদের ত্রয়ীকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ভার্মার নাটকে মোল্লা বহু কৌতুকের বিষয়, অন্ধ মুসলিমের মতো কথা বলেন, কিন্তু শেষে বীরবলের সহায়তায়ই ইজ্জত বাঁচান। কিন্তু অতিরিক্ত নারীপ্রেমী হলেও আকবর কিছুটা গুণের অধিকারী, প্রজাদের কল্যাণের জন্য উদ্বিগ্ন এবং আধ্যাত্মিক সত্যির জন্য তার হূদয় কেঁদে মরে। বীরবল বিজ্ঞ এবং বুদ্ধিদীপ্ত, সাধারণ মানুষের উপকারের জন্যও উদ্বিগ্ন এবং কৃষ্ণের দিব্য দর্শন লাভের পর আকবরকে দ্বিধা মুক্ত হতে সাহায্য করেন। নিশ্চিতভাবেই এসব হিন্দু লেখকদের ক্ষেত্রে বীরবল ও আকবরের ভেতর এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ছিল। একজন ভালো হয়ে থাকলে অন্যজনকেও ভালো হতে হবে বৈকি এবং উল্টোটি।
ভবিষ্য পুরানা নামের বিচিত্র বইটি ভারতে আকবরের শাসনামলের সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সূত্র। প্রধান না হলেও এটি অন্যতম প্রতিষ্ঠিত পুরানা। এর সবচেয়ে পুরনো অংশ ৫০০-১২২ অব্দ আগের। এখানে বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি ভারতে মুসলিম অস্তিত্বের ব্যাপারে প্রচুর মন্তব্যও আছে। মুসলিমদের এখানে আগাগোড়া ম্লেচ্ছ, পৈচাশ বা দৈত্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন অংশ মুসলিম রাজাদের কথা উল্লেখ করেছে, কিন্তু আকবরই একমাত্র রাজা, যার জন্য ৯৭টি সংস্কৃত পঙিক্তর আকবর বাদশাহ ভারনন নামে একটা গোটা অধ্যায় বরাদ্দ করা হয়েছে। সম্ভবত আরো আগে রচিত রচনাটি নিশ্চয়ই অষ্টাদশ শতকের কোনো এক সময় ভবিষ্য পুরানায় যোগ করা হয়েছে। আকবরের কাহিনী বলা হচ্ছে এভাবে:
‘শঙ্কর আচার্যের গোত্রে জন্ম নেয়া ব্রহ্মাচারী মুকন্দ বিশজন শিষ্যসহ তপস্যা করছিলেন। হঠাত্ ম্লেচ্ছদের নিষ্ঠুর রাজা বাবরকে দেবতাদের অমর্যাদা করতে দেখে হাভানার আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি। ম্লেচ্ছদের ধ্বংস করতে তার শিষ্যরাও একইভাবে আত্মাহুতি দিল। কিন্তু দুধের সঙ্গে গরুর পশম খেয়ে ফেলায় এক ম্লেচ্ছ মায়ের ঘরে তার পুনর্জন্ম হয়। শিশুটির জন্মের সময় আকাশ থেকে একটা কণ্ঠস্বর বলে ওঠে: ‘এ এক অলৌকিক শিশু। নিয়তির ওপর ক্ষমতাবান। অতীতেও ম্লেচ্ছদের নিষ্ঠুর পথে চলেননি তিনি, এখনো চলবেন না। এই কারণেই, হে হুমায়ু, তোমার সন্তানের নাম হবে আকবর। বিশজন বিখ্যাত শিষ্য আছে যার। খোদ মুকন্দই জন্ম নিয়েছেন তোমার ঘরে।”’
বিশজন শিষ্যও আকবরের সমসাময়িক হয়েই জন্ম নিয়েছেন এবং ঘনিষ্ঠরাই যোগ দিতে এগিয়ে এসেছেন। তাদের একজন পূর্বজন্মে ছিলেন দেপাবি, এই জন্মে তার নাম হয়েছে বীরা বলা, ‘ভাগ্যদেবী (সরস্বতী) আশীর্বাদপুষ্ট একজন পশ্চিমাত ব্রাহ্মণ।’ বর্ণনা এগিয়ে গেছে, ‘আকবর নামের সেই রাজা অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এবং পঞ্চাশ বছর শাসন উপভোগ করেছেন। তার পর শিষ্যদের নিয়ে স্বর্গে আরোহণ করেন।’ আকবরই একমাত্র মুসলিম রাজা, যাকে সর্বভারতীয় শাস্ত্রগ্রন্থে এমন সম্মান দেখানো হয়েছে। আমাদের সমসাময়িক সাম্প্রদায়িক উদ্বেগকে অতীতের শতাব্দীতে নিক্ষেপ করার বিরুদ্ধে এক স্পষ্ট সতর্কবাণী।
এবার সাধারণ প্রেক্ষিতের প্রসঙ্গ। আমরা এসব কৌতুককে রাজা ও ভাঁড় সম্পর্কিত ইসলামী অঞ্চল ও ভারতীয় অন্যান্য রসগল্পের প্রেক্ষিতে স্থাপন করলে কী ঘটে ভাবুন। এসব দেশের জনপ্রিয় সাহিত্য বেশ কয়েকজন এমনি জুটি তুলে ধরে: হারুন আল রশীদ (৭৮৬-৮০৯) ও বাহলুল। একদিকে গাযনার মাহমুদ (৯৯৮-১০৩০) ও তালাত এবং একদিকে শাহ আব্বাস (১৫৮৭-১৬২০) ও এনায়েত এবং অন্যদিকে বিজয়নগরের রাজা কৃষ্ণদেবরায় এবং তার নেমেসিস ব্রাহ্মণ তেনালি রামা এবং নদীয়ার (বাংলা) রাজা কৃষ্ণচন্দ্র (অষ্টাদশ শতক) এবং নাপিত গোপাল ভাঁড়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা সেই সময়ের বিচারে অকল্পনীয় ক্ষমতা ও জাঁকের একজন রাজাকে পাই, যার সমান কিংবদন্তিসুলভ একজন বিদুষক রয়েছে। সময়ানুক্রমে এই তালিকায় আকবরের স্থান কৃষ্ণদেবরায়ের পর কিন্তু শাহ আব্বাসের আগে হওয়ার কথা।
ইসলামিকৃত বিদুষকদের ব্যাপারে তথ্যের অভাবে নিখুঁত তুলনা করা কঠিন, তবে কিছু কিছু তথ্য স্বপ্রকাশিত। ইসলামী বিদুষকরা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে স্বাধীনভাবে কথা বলেন, এমনকি অপমানিতও করেন, কিন্তু ভারতীয় প্রতিপক্ষের মতো রাজাদের আগ্রাসী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন না। আরব্য রজনীর কাহিনীতে হারুন আল রশিদ ও কবি আবু নওয়াসকে নিয়ে একটি গল্প আকবর ও বীরবলের সমস্যা পূর্তি গল্পের সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু দুটো ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জকে ষাঁড়ের দুধের গল্পের অযৌক্তিক চ্যালেঞ্জের তুলনায় যুক্তিসঙ্গত বলা যেতে পারে। অনেক গল্পেই দেখা গেছে ভারতীয় রাজারা তাদের বিদুষকদের প্রতি যুক্তিহীন প্রশ্ন ছুড়ে দিতে বা অসম্ভব দায়িত্ব দিতে স্বভাবের বাইরে চলে গেছেন। তারা যেন প্রকাশ্যে দাবি করা পূর্ণাঙ্গ আধিপত্য সম্পর্কে নিজেদের সংশয় আড়াল করতে এবং চাহিদামতো নিখুঁত অবস্থায় পৌঁছাতে চান। ডেভিড শালমান তাঁর কৃষ্ণদেবরায় ও তেনালি রামা সম্পর্কে আলোকবিস্তারি রচনায় যেমন বলেছেন, ‘ভাঁড়ের অস্তিত্ব বাদে শাসক স্থবির, সাহিত্যিক বাস্তবতা এবং নিজের অন্তস্থ মেকিভাবের শিকারে পরিণত হন, সত্যিকারের রাজকীয় চরিত্রের এক প্যারোডি রসুলভ ইমেজ, যেটা তিনি আর প্রত্যাশা কিংবা ঠিকমতো উপলব্ধিও করতে পারেন না।’
এটা আমাদের দ্বিতীয় ভিন্নতার দিকে আমাদের নজর ফেরায়। ইসলামী অংশে রাজা ও বিদুষকের ভেতর কোনো শ্রেণীভেদ নেই। রাজার পক্ষে তাত্পর্যপূর্ণ হওয়ার মতো বিদুষকদের এমন কোনো বিশেষ পেশাও নেই। ভাতীয় দুটি কাহিনীতে একজন বিদুষক ব্রাহ্মণ এবং অন্যজন নাপিত। অন্য কথায় ভারতীয় ভাঁড়রা এমন গোত্রের সদস্য, যারা স্বভাবিক অবস্থায় রাজার কোনো দাবিকে বৈধতা দিতে পারতেন। এই তুলনায় ইসলামী ভাঁড়দের সামাজিক শিকড় তেমন তাত্পর্যপূর্ণ নয়। আসলে তাদের এমনকি প্রতীকীভাবে উল্লেখও করা হয়নি, তারা রাজার উদ্দেশ্যকে তুলে ধরছেন, সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিজেদের গোত্রকে নয়।
জেমস রায়ান তার এক সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে বিশ্ব লোককাহিনীর প্রেক্ষিতে জাতক কাহিনী, শ্রী লঙ্কার একটি ভাষ্য এবং ফিলিপিন্সের একটি গল্পসংগ্রহে ষাঁড়ের দুধের গল্পের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, এগুলো বিশ্বের সব মিথ ও লোককাহিনীতে মেলা সর্বজনীন কৌতুক ও ধারণা। তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো চুম্বক ঘিরে থাকা বস্তুর মতো বীরবল ও আকবরকে ঘিরে বিন্যস্ত হয়েছে এগুলো। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে কেন আকবর ও বীরবল? ফিরোজ তুঘলক বা আওরঙ্গজেব নয় কেন? বীরবল কেন, মানসিং বা তোড়ামল কেন? এবং কেনইবা দোপিয়াজা?
উত্তরসূরিদের কাছ থেকে এই মর্যাদার আসন পেয়েছেন আকবর। কথা ও কাজে তিনিই ভারতের সবচেয়ে প্রতাপশালী শাসক ছিলেন। জৌনপুরের এক জৈন বণিকের আত্মকথা থেকে তার কতটা শক্তিশালী ভাবমূর্তি ছিল, তার মৃত্যুর বর্ণনা থেকে সেটা আঁচ করা যেতে পারে।
‘১৬৬২ বিক্রম সালে কার্তিক মাসে বর্ষাকাল শেষ হওয়ার পর মহান সম্রাট আকবর আগ্রায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর ভয়ঙ্কর খবর দ্রুত জৌনপুরে পৌঁছে যায়। রাজা ছাড়া লোকজন ভীষণ অনাথ ও অনিরাপদ বোধ করছিল। সর্বত্র ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছিল। ভীষণ ভয়ে কাঁপন ধরেছিল মানুষের বুকে। চেহারা থেকে রঙ মুছে গিয়েছিল তাদের। আমি আমার বাড়ির সিঁড়িতে বসে থাকা অবস্থায় ভয়ঙ্কর খবরটা শুনি, তীব্র আঘাতের মতো ছিল সেটা। প্রচণ্ড, নিয়ন্ত্রণের অতীত ক্ষোভে কাঁপিয়ে দিয়েছে আমাকে। ...গোটা শহর কম্পিত ছিল। সবাই দরজা আটকে দিয়েছে, দোকানিরা দোকানের ঝাঁপি নামিয়ে ফেলেছে। ধনীরা তাদের অলঙ্কার আর দামি পোশাক মাটিচাপা দিয়েছে। অনেকেই সহায়-সম্পদ ফেলে হাতের কাছে যা ছিল তাই নিয়ে বিদায় নিয়েছে। ...ধনীরা সাধারণ কাপড় গায়ে দিতে শুরু করেছিল। ...আশপাশে কোনো চোর-ডাকাতের অস্তিত্ব না থাকায় বিনা করণেই সর্বত্র সুস্পষ্ট ত্রাসের ছাপ ছিল। দিন দশেক পর হট্টগোল থিতিয়ে আসে।’
লক্ষণীয়ভাবে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর খবর লেখক স্রেফ উল্লেখ করে গেছেন। কোনো ভীয়ভীতি নেই। যেন কোনো যুগের সমাপ্তি ঘটেনি বা অলৌকিক প্রভু বিদায় নেননি।
ভ্বিষ্য পুরাণায় বৈষ্ণবীয় ঋষির পুনর্জন্ম রূপে আকবরকে অন্তর্ভুক্ত করা জনপ্রিয় ধর্মীয় সাহিত্যে এক ধরনের দেবত্ব আরোপ হয়ে থাকলে এসব নামহীন কৌতুকে রাজকীয় মূল চরিত্র হিসেবে তার নির্বাচনও এক ধরনের মহত্ব দান। আকবর-বীরবল কৌতুকগুলো সত্যি উদ্দেশ্যমূলক। কিন্তু সেগুলোর উদ্দেশ্য আকবরকে আরো পূর্ণাঙ্গ ও মানবিক— আভাসে এমনকি মহত্ও— করে তোলা। তাঁর প্রতি কোনো ধরনের চাপা সাম্প্রদায়িক বৈরিতা প্রকাশ নয়। অপর মূল চরিত্র হিসেবে বীরবলের নির্বাচনের কারণ তিনি কবি নন, বরং ব্রাহ্মণ। এভাবে তিনি আকবরের দরবারের অন্য দুই প্রধান হিন্দু, ক্ষত্রিয় তোড়া মল এবং রাজপুত মান সিংয়ের চেয়ে এসব গল্পের ভারতীয় প্রতীকী ধরনে খাপ খেয়ে যান।
মোল্লার ক্ষেত্রে ইসলামী ধারায় ভাঁড়ের কোনো সহজাত সামাজিক নির্ধারিত ক্ষমতা বা ভূমিকা ছিল না দেখতে পাই। এসব গল্পের প্রতীকী কাঠামোর ভেতরই কেবল ক্রিয়াশীল তিনি এবং পৃষ্ঠপোষকের কাছে তার বিকৃত ভাবমূর্তি ফিরিয়ে দেয়াই মূল কাজ। এদিক থেকে তিনি এক ধরনের ভারসাম্য জোগানোর উপায়; রাজাকে মানবীয় অপূর্ণতা মেনে নিতে বাধ্য করেন। এদিক থেকে মোল্লা দোপিয়াজা ও বীরবল একই রকম। কিন্তু মোল্লা আবার তার মালিকের স্বার্থের রক্ষকও হতে পারেন। ইরানি চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে সম্রাট ও ভারতের মান রক্ষা নিয়ে বেশ কয়েকটা গল্প আছে। আশগালি পাণ্ডুলিপির যেখানে মোল্লা ইরানে গেছেন, শিরানির উদ্ধৃত কয়েকটা ঘটনায় দেখা যায় যে, তিনি কখনই নিজেকে বিকোননি বা সুন্নি ধর্ম খোয়াননি। ভারতের অভ্যন্তরে অন্য কোনো রাজার চেয়ে বরং আকবরই সবচেয়ে সফলভাবে দমন করেছিলেন বিভিন্ন মুসলিমগোষ্ঠীর এমন বৈরিতাকে তুলে ধরা বিভিন্ন কৌতুকে প্রথমবারের মতো মোল্লার দেখা মিলেছিল বলেই মনে হয়।
ধীরে ধীরে আকবরের মরণোত্তর ভাবমূর্তি জনমনে বিশাল হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মোল্লাকেও তাঁর কিংবদন্তি দরবারে একটা জায়গা বরাদ্দ করা হয়। স্বভাবতই এর পরের ধাপ ছিল বীরবলের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তার পর ‘ইসলামের সমর্থক’ হয়ে ওঠা।
নামহীন জনপ্রিয় কাহিনী ও অন্যান্য লোককথা রাজনৈতিক ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করতে পারে, তবে সেটা যতক্ষণ সেগুলোকে ধারাভাষ্য ধরে না নিচ্ছি। লোককাহিনীগুলো নিজেরাই এক ধরনের ইতিহাস। এগুলো কেবল প্রত্নসামগ্রীই নয়, বরং বিভিন্ন ঐতিহ্য ও প্রেক্ষিতে বৈচিত্র্যময় প্রভাব সৃষ্টির লক্ষ্যে একটা প্রক্রিয়াও বটে। প্রক্রিয়া হিসেবে মজাদার এই গল্পগুলোকে যুগপত্ রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিতকারী এবং বিদ্রোহীও বলা যেতে পারে।
বীরবলের গল্পের রুশ অনুবাদক ডি.এম. গোল্ডম্যান বলেছেন, এসব গল্প এক ধরনের ‘সামাজিক ইউটোপিয়া’ তুলে ধরে এবং ‘অন্ধকারতম সময়ে সাধারণের আশাবাদ’ মূর্ত করে। তবে গল্পগুলোয় যেহেতু কোনো ‘অন্ধকার সময়’ নেই, তাই বলা যায় যে, লেখকদের তরফে অতীতের গৌরবময় সময়ের তুলনায় কম সুখের একটা সময়ে এক ধরনের ‘ইউটোপিয়ার’ অস্তিত্ব ছিল। অন্যদিকে আকবর-বীরবল গল্পগুলোকে ‘মুসলিম শক্তি’র ওপর ‘হিন্দু’ আধিপত্য তুলে ধরার কাজে লাগানো যেতে পারে। কারণ কে বলতে পারে, এসব ভাসমান কাহিনী আকবরের সঙ্গে প্রথম জুড়ে দেয়ার সময় মোগল বা আকবরের প্রতি ঘৃণার কারণ ছিল না? আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, ভবিষ্য পুরাণা বাকি মুসলিমদের ঘৃণার সবচেয়ে নিচের সারিতে ফেলে আকবরকে অনুমোদনের চরমে পৌঁছে দিয়েছিল। তবে ফ্রয়েডের ভাবনাও পুরোপুরি অস্বীকার করা যাবে না। তবে এটাই সব সত্যি নয় বলা যায় শুধু। কৌতুক শুধু হাসায় না, কাঁদাতেও পারে। শব্দগুলো এক হলেও কারো সাথে হাসা আর কাউকে নিয়ে হাসা উদ্দেশ্যের দিক থেকে একেবারেই ভিন্ন। সম্ভবত সবচেয়ে নিরাপদ হবে এসব কৌতুককে আমাদের সমসাময়িক উদ্বেগের নিরীখে নিবিড়ভাবে না দেখা বা সেগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ঘরানার পরিচয় ভুলে না যাওয়া। এখানে ব্যর্থতা আমাদের পূর্বধারণায় আটকে রেখে সেগুলোর বহুবিধ প্রেক্ষিত জানার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
প্রত্নসামগ্রী হিসেবে এই বেনামি গল্পগুলো চারটি দুর্গ, আকবরের ইতিহাসবিদদের লেখা দিনপঞ্জি এবং তার শিল্পীদের আঁকা মিনিয়েচারের মতোই আকবরের প্রতাপের দৃশ্যমান ও মূল্যবান চিহ্ন। বিপুলভাবে এগুলো তাদের মূল চরিত্রের মর্যাদার কথা বলে। ভবিষ্য পুরাণায় অনুকূল মন্তব্য আকবরকে ভারতে মুসলিম রাজাদের ভেতর অনন্য করে তুলে থাকলে লোককাহিনীর বিশ্বে একজন নয়, দু-দুজন ভাঁড়ের সঙ্গে তাকে সম্পর্কিত করে পূর্ণতা দানও তাকে গোটা উপমহাদেশে— সম্ভবত বিশ্বে— অনন্য করে তুলেছে।
[বিদেশী নিবন্ধ অবলম্বনে]






