কলকাতার গুরুসদয় জাদুঘরটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আছে। অবিভক্ত বাংলার অমূল্য সব নিদর্শন সংরক্ষিত আছে এ জাদুঘরে। কলকাতার দক্ষিণাংশে ডায়মন্ড হারবার সড়কটি পেরোলেই এ জাদুঘরের অবস্থান। জাদুঘরে ঢুকলে আপনাকে স্বাগত জানাবেন চূড়ামণি হাতি। তিনিই এ জাদুঘরের গাইড। শুরুতেই দর্শক তার কাছে শুনবেন বাংলার কাঁথার গল্প। তিনি জানাবেন জাদুঘরে ছয় ধরনের কাঁথা সংরক্ষিত আছে : সুজনি, দুর্জনি, বাইতান, আরশিলতা, রুমাল ও লেপ।
অবিভক্ত বাংলার স্থানীয় শিল্পকর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহশালা এ জাদুঘরটি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে জাদুঘরটি এখন বন্ধ হওয়ার দশা। জাদুঘরের সেরা কাঁথাটি মেইন হলে রাখা আছে। এটি একটি সুজনি কাঁথা, দুপাশে নকশা করা কাঁথাটি অধুনা বাংলাদেশের খুলনা থেকে আসা, কাঁথাটি উনিশ শতকের। শ্রীমতি মানদাসুন্দরী দস্য কাঁথাটি সেলাই করেছিলেন। এ কাঁথাকে এক রকম এনসাইক্লোপিডিয়া বলা যায়। উনিশ শতকের বাঙালি সমাজের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র এ কাঁথায় ফুটে উঠেছে, আছে অন্দর মহল ও বাহির মহল— দুই জায়গারই চিত্র। আছে শিকারের দৃশ্য, গাড়ি, বন্যপ্রাণী, ফুল, বেয়নেট হাতে ভারতীয় সেনা, তরবারি হাতে ব্রিটিশ সেনা। এমব্রয়ডারি দারুণ সূক্ষ্ম। হাতির অনুমান, ‘বেয়নেটগুলো কি ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রতীক?’
জাদুঘরে আরো আছে পটচিত্র। মৌখিক ইতিহাসকে বর্ণনা করে এমন চিত্রিত পাণ্ডুলিপিকেই পটচিত্র বলে। জাদুঘরে ষোড়শ শতক-পরবর্তী সময়ের অনেক পটচিত্র সংর
ক্ষিত আছে। এসব পটচিত্রে বিভিন্ন পুরাণের বঙ্গীয় রূপের চিত্রায়ণ দেখা যায়। জাদুঘরে পটচিত্রগুলো কাচের বাক্সে বন্দি, মূক এবং চলত্শক্তিহীন। একসময় যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই পটচিত্রগুলো তৈরি হয়েছিল, তা আজ রহিত। আরো আছে এসব পটচিত্রের শহুরে রূপ উনিশ শতকের কলকাতার কালীঘাটের পটচিত্র। এগুলো তালপাতার ওপর হাতে আঁকা আবার ছাপা কিছু পাণ্ডুলিপিও আছে। ষোড়শ শতকের একটি অসাধারণ কারুকাজ করা পাণ্ডুলিপি আছে, যেখানে চিত্রিত হয়েছে দশমহাবিদ্যা ও দশাবতার। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। দারুণ অনেক সংগ্রহ এখনো বাকি আছে।
জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা গুরুসদয় দত্ত ১৮৮২ সালের ১০ মে সিলেট জেলার করিমগঞ্জ মহকুমার বীরশ্রী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিলেটের ইংরেজি স্কুল থেকে এন্ট্রান্স (১৮৯৯) এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ (১৯০১) পাস করেন। ১৯০৩ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেত যান এবং ১৯০৪ সালে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইসিএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ইংল্যান্ডে তিনি কিছুদিন ক্যামব্রিজের ইমানুয়েল কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। ১৯০৫ সালের শেষ দিকে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের চাকুরে হিসেবে ভারতে ফিরে আসেন।
গুরুসদয় ব্রিটিশ সরকারের চাকরি করলেও দেশপ্রেম, দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্বের কথা ভোলেননি। এজন্য সরকারি আদেশ অমান্য এবং সরকারের সমালোচনা করতেও তিনি পিছু হটেননি। এমন উদাহরণ একজন আমলার ক্ষেত্রে বিরল, সেই ঔপনিবেশিক আমলে তো বটেই, এমনকি এ যুগেও। তিনি হাওড়া জেলার ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালে বামুনগাছিতে এক বর্বর গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ-সংক্রান্ত মামলার রায়ে তিনি ইউরোপীয় এসপি ও সামরিক কর্মকর্তাদের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। আর একবার ১৯৩০ সালের মে মাসে লবণ আইন অমান্য আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধী গ্রেফতার হলে বিক্ষুব্ধ জনতাকে ঠেকানোর জন্য কর্তৃপক্ষ গুলির আদেশ দিলে তিনি তা পালনে অস্বীকৃতি জানান। এতে কর্তৃপক্ষ তার প্রতি বিরাগভাজন হয়ে তাকে বীরভূমে বদলি করে।
১৯২৮-২৯ সালের শীতকাল। ভারতীয় সিভিল সার্ভেন্ট গুরুসদয় দত্ত তখন মধ্য চল্লিশে। এ সময় তিনি ১৯১১ সালে সেসিল শার্প প্রতিষ্ঠিত ইংলিশ ফোক ডান্স সোসাইটি সম্পর্কে প্রথমবারের মতো জানতে পারেন। ১৯১৯ সালের জানুয়ারিতে দত্ত অ্যালবার্ট হলে অল ইংল্যান্ড ডান্স ফেস্টিভ্যালের সাক্ষী হন; এ উৎসব তার চোখ খুলে দিয়েছিল। ‘সেই হলে যখন আমি নাচ দেখছিলাম, তখন মনে মনে সংকল্প করেছিলাম বাংলায় বাড়িতে ফিরেই আমি লোকনৃত্য নিয়ে একটি আন্দোলন তৈরি করব।’— নিজের দ্য ফোক ডান্সেস অব বেঙ্গল গ্রন্থে তিনি এসব কথা জানিয়েছেন। বইটি তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়।
সে বছর কিছুদিন পর দত্ত ভারতে ফিরে আসেন। তাকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পোস্টিং দেয়া হয় বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহে। এখানে শিগগিরই তিনি ‘মনোহর জারি নৃত্যকে’ আবিষ্কার করেন এবং বাউল ও জারি নৃত্যের পুনর্জাগরণের জন্য আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু করেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ফোক ডান্স অ্যান্ড ফোক সং সোসাইটি, যা ১৯৩২ সালে রুরাল হেরিটেজ প্রিজারভেশন সোসাইটি অব বেঙ্গল নাম ধারণ করে।
১৯২৫ সালে দত্ত প্রতিষ্ঠা করেন জ্বরে ভুগে মৃত্যুবরণ করা তার বহুমুখী প্রতিভাধর স্ত্রীর স্মরণে সরোজ নলিনী শিক্ষা সমিতি। সরোজ নলিনী যেসব সমাজসেবামূলক কর্মে যুক্ত ছিলেন, সেগুলোকে অব্যাহত রাখতেই এ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার স্বামী। এ সমিতি গ্রামের মেয়েদের লেখাপড়ায় সহায়তা করত। দত্ত সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছেন তার ব্রতচারী আন্দোলনের জন্য; এটা ছিল ব্যাডেন-পাওয়েলের স্কাউট আন্দোলনের প্রতি বাঙালির জবাব।
একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দত্ত বহু স্থানে ঘুরেছেন। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তার লোকশিল্পকর্ম সংগ্রহ সমৃদ্ধ হতে থাকে। বিশেষত ১৯২৯ সাল থেকে তার সংগ্রহের পরিমাণ দারুণভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৪০ সালে, তার মৃত্যুর মাত্র এক বছর আগে, তার সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় আড়াই হাজার। এসবের মধ্যে ছিল টেক্সটাইল, পুতুল, কাঠ খোদাই, মিষ্টির ছাঁচ এবং এমনকি পারফর্মিং আর্টস। দত্ত দ্রুতগতিতে বাংলার বিলীয়মান স্থানীয় ঐতিহ্যকে পুনরাবিষ্কারক ও পুনর্জাগরক হিসেবে দেখতে
চেয়েছিলেন।
বর্তমানকালে লোকসংস্কৃতির গবেষকরা সে আমলের লোকশিল্প সংগ্রাহকদের ভূমিকাকে সমস্যাজনক বলে অভিহিত করেছেন। কারণ তাদের মতে, এই লোকশিল্প সংগ্রহগুলো প্রকৃতপক্ষে ঔপনিবেশিক, শহুরে সৃষ্টি। বিশ শতকের শুরুর বছরগুলোয় বাংলায় বেশ কজন লোকশিল্প গবেষকের আবির্ভাব দেখা যায়। এরা অধিকাংশই প্রশাসনিক বা জ্ঞানক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে কাজ করেছেন। এরা মৌখিক সাহিত্য ও ছাপাখানা-পূর্ব যুগের শিল্পকর্ম সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির জাতিগত গৌরবকে পুনরুদ্ধার করা। বাঙালির শিল্পকে অন্য সংস্কৃতি বা সভ্যতার মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং নিজেদের ভুলে যাওয়া মাটিকে কর্ষণ করলেই দরকারি সম্পদ পাওয়া সম্ভব— এই ছিল দৃষ্টিভঙ্গি। এভাবে দত্তের সংগ্রাহক (ঐতিহ্যে তিনি কোনোরূপ হস্তক্ষেপ করেননি) হিসেবে ভূমিকাকে সমস্যাজনক হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু বিপুল লেখাপত্র ও সংগ্রহ থেকে তার দায়বদ্ধতা সম্পর্কে ধারণা করা যায়। দত্ত স্থানীয় শিল্প ঐতিহ্যকে পশ্চিমা বুর্জোয়া শিল্পের সমাবস্থায় দেখতেই, তাই তিনি ১৯৩২ সালে কলকাতার ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্টে। এখানেই কয়েক বছর আগে পল ক্লি ও ওয়াসিলির শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছিল।
বিরভূম-মুর্শিদাবাদ সীমান্তে রামনগর ও সাহোরা গ্রামে সফরের সময় কিছু বাড়িঘরের চমত্কার রঙিন নকশা তার দৃষ্টি কাড়ে। তিনি কেবল এই চিত্রকর্মগুলোর বিবরণ যুক্ত করেছেন তাই নয়, বরং একই সঙ্গে যারা সেগুলো এঁকেছিলেন তাদের নামও লিপিবদ্ধ করেছিলেন— অপর্ণা দেবী (২৪-২৫ বছর), ব্রজগোপী (৩২ বছর), প্রমোদিনী দেবী (৪২ বছর)। এ শিল্পমাধ্যমটির প্রকাশভঙ্গি সামষ্টিক কিন্তু তার পরও দত্ত পেছনের শিল্পীদের নামকে সংগ্রহ করেছিলেন। শিল্পকর্মগুলোকে অজ্ঞাতপরিচয় শিল্পীর সৃষ্টি হয়ে থাকতে হয়নি। তিনি তার লেখায় জানিয়েছেন, সবচেয়ে সমৃদ্ধ কিছু শিল্পধারা নারীরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, যার মধ্যে আছে— কাঁথা, মিষ্টি তৈরির ছাঁচ, আলপনা ও দেয়ালচিত্র।
১৯৪১ সালে গুরুসদয় দত্তের মৃত্যুর পর তার সংগ্রহ ব্রতচারী সমিতির অধিকারে চলে যায়। এ সমিতিই ১৯৬৩ সালে জাদুঘরটি তৈরি করে। জাদুঘরটি বর্তমানে আর্থিক সংকটে দিন পার করছে। আর্থিক সংকটের কারণে জাদুঘরটির পক্ষে তার সংগ্রহে থাকা ৩ হাজার ৩০০টি সংগ্রহের নিরাপত্তা প্রদান ও রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাদুঘরটির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। দত্ত এই জড় সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন। কারণ তিনি যে শিল্পধারাটি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন সেটা গতিশীল, জীবন্ত। তিনি যে শুধু পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেছেন তাই নয়, বরং একই সঙ্গে সেগুলোর সঙ্গে যে বিবরণমূলক গানগুলো গাওয়া হতো, সে কথাও লিপিবদ্ধ করেছেন। কলকাতা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সুন্দরীমোহন দাসের ১৯৩১ সালের আগস্টে দত্তকে লেখা একটি চিঠিতে জানা যায়, তিনি ভ্রমণের সময় গ্রামাঞ্চলের নাচ ভিডিও রেকর্ড করেছিলেন। জাদুঘরটিতে মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনার মাধ্যমে অডিও পারফরম্যান্সের সঙ্গে পটচিত্রের প্রদর্শনী হতে পারে। এভাবে এ জাদুঘরের সঙ্গে গুরুসদয় দত্তের কিংবদন্তীয় জীবিত থাকবে।
স্ক্রলে প্রকাশিত সুজন মুখার্জীর প্রতিবেদন ও বাংলাপিডিয়া অবলম্বনে





