‘চান্দার প্রতিটি নিশ্বাস যেন কাটে আলীর নামে।’

                             —মাহ লাকা বাই

হজরত আলীর (রা.) স্মৃতিধন্য হায়দরাবাদের একটি টিলার নাম ‘মওলা আলী’। টিলার ওপরে একটি পাথরে হজরত আলীর হাতের চিহ্ন আছে। পাথরটিকে কেন্দ্র করে সেখানে তার নামে একটি মাজার তৈরি হয়েছে। তার ভক্তদের কাছে এটি এক পুণ্যভূমি। ভক্তদের সমাগমে মুখরিত সে স্থান। রাজ কুয়াঁর বাইও তাদেরই একজন। গর্ভবতী অবস্থায় দোয়া প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তিনি সেখানে জেয়ারত করতে গিয়েছেন। সঙ্গে আছেন শুভাকাঙ্ক্ষী শাহ তাজাল্লি আলী। তিনি একজন বিদ্বান ও সুফি সাধক। ক্যালিগ্রাফি ও চিত্রকলায়ও দখল আছে। হাস্যরস ও প্রজ্ঞায় সমসাময়িকদের মধ্যে তার তুলনা মেলা ভার। হায়দরাবাদের আসাফ জাহি সাম্রাজ্যের বিস্তৃত ইতিহাস ‘তুজুক-ই-আসাফিয়া’ রচনা করে তিনি খ্যাতি লাভ করেছেন। সব ঠিকই ছিল। একাগ্র চিত্তে হজরত আলীর দরবারে প্রার্থনা করছিলেন রাজ কুয়াঁর বাই। কিন্তু হঠাৎ করে তার মধ্যে গর্ভপাতের লক্ষণ দেখা দেয়। শুরু হয় রক্তপাত। শাহ তাজাল্লি আলী দ্রুত মাজারের ভেতরে যান। সেখান থেকে নিয়ে আসেন রঙিন সুতা ও জ্বলন্ত আগরবাতি। তিনি রাজ কুয়াঁর বাইর কোমরের চারপাশে সুতাটি বেঁধে দেন। আগরবাতির ধোঁয়া তার দিকে ঠেলে দিতে থাকেন। আর এতেই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা। হজরত আলীর কৃপায় রাজ কুয়াঁর বাইর গর্ভপাত রোধ হয়। বন্ধ হয় রক্তপাত। গর্ভে ভ্রুণের অবস্থান ঠিকঠাকই থাকে। অতঃপর ১৭৬৮ সালের ৪ এপ্রিল রাজ কুয়াঁর বাইর গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয় সে সন্তান। এক কন্যা। তার নাম রাখা হয় চান্দা বিবি। পরবর্তী সময়ে যে ‘মাহ লাকা বাই’ নামে বিখ্যাত হবেন। 

এ অলৌকিক ঘটনা আমলে নিলে বলা যায়, চান্দা বিবি ওরফে মাহ লাকা বাই হজরত আলীর (রা.) দান। সেক্ষেত্রে মাহ লাকা বাই তার প্রতি ঐশ্বরিক টান তো অনুভব করবেনই। তবে অলৌকিকতাকে এক পাশে সরিয়ে রেখেও হজরত আলীর (রা.) প্রতি মাহ লাকা বাইর ঐশ্বরিক টানকে ব্যাখ্যা করা যায়। তার মা ছিলেন শিয়া মতের অনুসারী। তাই স্বাভাবিকভাবেই হজরত আলীর (রা.) অনুরাগী ছিলেন মাহ লাকা বাই। পরবর্তী সময়ে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি যেসব অভিজাত ব্যক্তিকে পেয়েছেন, তাদের অধিকাংশই ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী। শুভাকাঙ্ক্ষী শাহ তাজাল্লি আলী শিয়া ছিলেন না। কিন্তু সুন্নি হলেও তিনি চিশতিয়া তরিকার অনুসারী একজন সুফি সাধক ছিলেন। আর সুফিদের কাছে হজরত আলীর (রা.) অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাবে মাহ লাকা বাই শিয়া মতের অনুসারী হয়ে ওঠেন। স্বরচিত প্রায় প্রতিটি গজলের শেষে তিনি হজরত আলী (রা.) ও অন্য শিয়া ইমামদের প্রতি নিজের আনুগত্য, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ব্যক্ত করতেন। তাদের প্রতি মাহ লাকা বাইর অনুভূতির এ বহিঃপ্রকাশ ছিল তীব্র, অভিনব ও মনোমুগ্ধকর। আধ্যাত্মিকতা ও ঐশী প্রেম ছিল তার গজলের অন্যতম বিষয়বস্তু। মাহ লাকা বাইর আগে হজরত আলী (রা.) ও অন্য শিয়া ইমামদের প্রশংসা কেবল কাসিদা (প্রশংসাগীতি) ও মর্সিয়াতেই (শোকগীতি) সীমাবদ্ধ ছিল। মাহ লাকা বাইই প্রথম গজলে (প্রেমকাব্য) তাদের প্রশংসা শুরু করেন। গজলে এটি তার উল্লেখযোগ্য অবদান। তার রচিত একটি গজলের শেষ পঙ্‌ক্তি এমন, ‘ও আলী, আপনি ছাড়া আমার আর কোনো সাহায্যকারী নেই!’ মাহ লাকা বাই তার গজলে হজরত আলীকে (রা.) ‘নাজাফের বীর’ বলেও সম্বোধন করেছেন। একটি গজলে তিনি নিজেকে বলছেন, ‘যদিও তুমি মাথা থেকে পা পর্যন্ত পাপের সমুদ্রে ডুবে আছ, তথাপি ও চান্দা, তোমাকে নাজাফের বীর আগলে রেখেছেন।’ উল্লেখ্য, নাজাফ ইরাকের একটি শহর। সেখানে হজরত আলী (রা.) সমাহিত আছেন। শিয়াদের তো বটেই, সুফি তরিকার অনুসারী সুন্নিদের কাছেও এ শহর তাই অন্যতম তীর্থভূমিতে পরিণত হয়েছে। মাহ লাকা বাই তার গজলে সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন। মাহ লাকা বাই যে নিজেকে আপাদমস্তক পাপের সমুদ্রে ডুবে আছেন বলে দাবি করেছেন, এর অন্তত তিনটি ব্যাখ্যা হাজির করা যেতে পারে। হয়তো এ পাপের সমুদ্র বলতে তিনি সার্বিকভাবে দুনিয়াকে বুঝিয়েছেন, যেখানে নানা রঙিন হাতছানিতে কলুষিত হয় মানুষ। কিংবা এর দ্বারা তিনি নিজের পেশার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। মাহ লাকা বাইর ভয় ছিল, তিনি যে জীবন যাপন করছেন, তার জন্য শেষ বিচারের দিন তাকে শাস্তির রায় দেয়া হবে। অথবা নিজের হীনতা, ক্ষুদ্রতা ও তুচ্ছতাকে বোঝাতে তিনি পাপের সমুদ্রে ডুবে থাকার কথা বলেছেন। যাই হোক না কেন, নিজের আত্মিক পরিত্রাণ নিয়ে মাহ লাকা বাইর মনে বেশ ভয় ছিল। কিন্তু তার মনে যে আশাবাদ বিরাজিত, তা সেই ভয়ের চেয়েও শক্তিশালী। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে তিনি যতই পাপী হন, নাজাফের বীর তথা হজরত আলী (রা.) তাকে উদ্ধার করবেন। তার কৃপাতেই পরম করুণাময় মাহ লাকা বাইর সব পাপ ক্ষমা করবেন। শিয়াদের বিশ্বাস অনুসারে, হজরত মুহাম্মদ (দ.) ছাড়াও তার পরিবারের সদস্য হজরত আলী (রা.), মা ফাতেমা (রা.), ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হোসাইন (রা.)ও হাশরের দিন আল্লাহর কাছে পাপী উম্মতের পরিত্রাণের জন্য সুপারিশ করতে পারবেন। মাহ লাকা বাইর গজলে সে বিশ্বাসই প্রতিফলিত হয়েছে। আরেকটি গজলের শেষে হজরত আলীকে (রা.) তিনি ‘হায়দার’ বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি এমনও বলেছেন যে বেহেশত ও দোজখ নিয়ে তার কোনো চিন্তা নেই। তিনি কেবল হজরত আলীকেই (রা.) চান। মাহ লাকা বাই লেখেন, ‘চান্দা বেহেশতের আশা করে না, দোজখের ভয়ও তার নেই, ইহকাল ও পরকালে সে কেবল চায় প্রবল পরাক্রম সিংহ হায়দারকেই!’ উল্লেখ্য, হজরত আলীর (রা.) একটি উপাধি ‘হায়দার-এ-কাররার’। এর অর্থ ‘ভয়হীন সিংহ’। একটি গজলে তিনি মা ফাতেমাকে (রা.) ‘কুররাতুল আইন’ তথা ‘চোখের প্রশান্তি’ বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি লেখেন, ‘পুষ্পশয্যায় শুয়েও আমার চোখে ঘুম আসে না, যখন আপনার পায়ে মাথা রাখি, তখনই ঘুম আসে।’ আরেকটি গজলে তিনি লেখেন, ‘ফাতেমার (রা.) পরিবারের প্রতি চান্দার ভালোবাসা বেড়েই চলেছে, আর যতই সে তাদের নিয়ে ভাবছে, মনে হচ্ছে সে এখনো খুব কমই ভাবছে!’ এসব পঙ্‌ক্তি থেকে মা ফাতেমা (রা.) ও তার পরিবারের প্রতি তার আনুগত্য, শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসার প্রমাণ মেলে। ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হোসাইনকে (রা.) সম্বোধন করেও গজল লিখেছেন মাহ লাকা বাই। তেমনই একটি গজলের শেষ দুটি পঙ্‌ক্তি এমন, ‘ও ক্ষমতাধর আলী, আপনি তো চান্দার প্রতিটি ইচ্ছা পূরণ করেন; এবার তাকে হাসান ও হোসাইনের জন্য সবকিছু উৎসর্গ করার সুযোগ দিন।’ হজরত আলী (রা.) ও তার পরিবারের প্রতি অনুরাগ ও ভালোবাসার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিতে চেয়েছেন মাহ লাকা বাই। গজলের সুরে সে আকাঙ্ক্ষাই ব্যক্ত করেছেন তিনি। 

মাহ লাকা বাই নিজের গুণে ও পৃষ্ঠপোষকদের যথাযথ অবদানে হায়দরাবাদের নিজামের দরবারে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিলেন। সম্ভবত তিনিই একমাত্র বাইজি, যিনি আমির হয়েছিলেন। তাকে জায়গির দেয়া হয়েছিল। তার জন্য ব্যক্তিগত বাহন ও প্রহরী বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। সম্ভবত এ গুরুত্ব ও মনোযোগ হারানোর ভয় মাহ লাকা বাইর মনে ছিল। তাই তিনি হজরত আলীর (রা.) কাছে প্রার্থনা করেছেন, তার এ সমৃদ্ধি যেন সবসময় বজায় থাকে। একটি গজলে তিনি লেখেন, ‘ও আলী, চান্দার এ খ্যাতি যেন সবসময় বজায় থাকে। তার যৌবনের উদ্দীপনা বসন্তকালের চেয়ে শতগুণ বেশি দামি।’ পরকালেও তিনি মর্যাদা প্রার্থনা করেছেন হজরত আলীর (রা.) কাছে। একটি গজলে তিনি লেখেন, ‘ও আলী, আপনার মহানুভবতায় চান্দাকে উভয় জগতে মর্যাদাসম্পন্ন ও ক্ষমতাপূর্ণ স্থান দান করুন।’ মাহ লাকা বাই চিরদিন যুবতী ও সুন্দরী থাকতে চান। তার নিজের পক্ষে তো তা সম্ভব নয়। কিন্তু তার বিশ্বাস, হজরত আলীর (রা.) দোয়ায় আল্লাহ তার এ আশা পূরণ করবেন। তবে চিরদিন যুবতী ও সুন্দরী থাকার অন্য ব্যাখ্যাও থাকতে পারে। সম্ভবত এর দ্বারা তিনি ঐশী প্রেমকেই বুঝিয়েছেন। হজরত আলী (রা.) ও তার পরিবারের প্রতি মাহ লাকা বাইর অন্তরের গভীরে লালিত ভক্তি ও ভালোবাসা যেন কখনই টলে না যায়, সে প্রার্থনাই হয়তো তিনি করেছেন। কারণ বিভিন্ন গজলে মাহ লাকা বাই দাবি করেছেন যে জাগতিক কোনো প্রাপ্তির জন্য তিনি হজরত আলীকে (রা.) ডাকেন না। বরং অন্তরের গভীরে লালিত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থেকেই তিনি হজরত আলীকে (রা.) স্মরণ করেন। তিনি হজরত আলীর (রা.) আলোয় আলোকিত হতে চান। একটি গজলে তিনি লেখেন, ‘ও আলী, চান্দাকে আপনার আলোকচ্ছটায় আলোকিত রাখুন। যেভাবে আপনার দীপ্তিতে প্রতিদিন সূর্য প্রজ্বলিত হয়।’ আলীর (রা.) প্রতি মাহ লাকা বাইর এ ভালোবাসা ছিল হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত। আর তা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এটিকেই তিনি নিজের পাথেয় হিসেবে আঁকড়ে ধরেছেন। আর তাই মন্ত্রপুত কোনো তাবিজ-কবজ ধারণের প্রয়োজনীয়তা তিনি অনুভব করেননি। একটি গজলে তিনি লেখেন, ‘জ্যোতিষীর দেয়া তাবিজ কিংবা মন্ত্রপুত কবজের প্রয়োজন চান্দার নেই। আলীর (রা.) ভালোবাসাই আমার অন্তরের একমাত্র আকর্ষণ।’ অশুভ কোনো কিছুর ভয়ও তাকে তাড়িত করে না। একটি গজলে তিনি লেখেন, ‘অশুভ কোনো কিছুর ভয় চান্দার নেই। কারণ তার রক্ষাকর্তা হলেন আলী, যার প্রভায় ইহকাল ও পরকালে সূর্য দীপ্তিমান হয়।’ মাহ লাকা বাইর পক্ষে প্রতিনিয়ত সশরীরে হজরত আলীর (রা.) মাজার জেয়ারত করা সম্ভব নয়। তাই তিনি ভোরের বাতাসকে সে দায়িত্ব দিয়েছেন। একটি গজলে তিনি লেখেন, ‘ও ভোরের বাতাস, তুমি নাজাফের অধিপতির কাছে যাও, চান্দার হয়ে চুমু খাও তার চৌকাঠে।’ গজলে তিনি হজরত আলীকে (রা.) ‘আবু তোরাব’ নামেও সম্বোধন করেছেন। এটিও হজরত আলীর (রা.) একটি উপাধি। তিনি লেখেন, ‘ও আবু তোরাব, ইহকাল ও পরকালে চান্দার একটিই আবেদন, ভালোবাসার প্রতিটি বাঁকে তাকে আপনার পাশেই রাখুন।’

হজরত আলীর (রা.) প্রতি মাহ লাকা বাইর প্রেমের বহিঃপ্রকাশ কেবল গজলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমেও সে ভালোবাসার প্রমাণ দিতেন। হায়দরাবাদে অবস্থিত মওলা আলীতে প্রতি বছর হজরত আলীর (রা.) ওরসের আয়োজন করা হয়। ওরসের সময় মাহ লাকা বাই সেখানে যেতেন। সেখানে সমবেত সাধকদের জন্য চারদিন ধরে দুই বেলা খাবারের বন্দোবস্ত করতেন তিনি। ওরস শেষে বিদায় নেয়ার সময় প্রত্যেক সাধককে এক রুপি করে দক্ষিণা দেয়া হতো। ক্ষেত্রবিশেষে অনেকের খ্যাতি ও মর্যাদার ওপর নির্ভর করে পাঁচ রুপি, ৫০ রুপি ও ১০০ রুপি পর্যন্তও দক্ষিণা দেয়া হতো। সেখানে অবস্থিত হজরত আলীর (রা.) রূপক মাজারের খাদেম ও ভক্তদেরও তিনি অর্থকড়ি, পোশাক কিংবা মূল্যবান দ্রব্যাদি উপহার দিতেন। তাছাড়া প্রতি বছর রজবের ১৩ তারিখ মওলা আলীতে হজরত আলীর (রা.) জন্মদিন পালন করা হয়। এ অনুষ্ঠানকে বলা হয় ‘জশন-এ-হায়দারি’। সে অনুষ্ঠানে সমাগত অতিথিদের খাওয়ানোর জন্য আর্থিক সহায়তা দিতেন মাহ লাকা বাই। মহররমও গুরুত্ব সহকারে পালন করতেন তিনি। মহররমের চাঁদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই মাহ লাকা বাই সুস্বাদু ও দামি খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতেন। এভাবে কারবালায় প্রাণ বিসর্জন দেয়া হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও তার পরিবারের স্মৃতিতে শোক প্রকাশ করতেন তিনি। আশুরার সময় তিনি অসংখ্য বিদ্বানদের তাদের খ্যাতি অনুযায়ী ১ থেকে ৫ রুপি পর্যন্ত দক্ষিণা দিতেন। হজরত মুহাম্মদের (দ.) বংশধর ও তাদের অনুরাগীদের তিনি হাজার হাজার রুপি হাদিয়া দিতেন। মাহ লাকা বাই তার প্রাসাদে মেয়েদের নাচ ও গানের প্রশিক্ষণ দিতেন। কিন্তু মহররমের সময় তিনি এ প্রশিক্ষণ বন্ধ রাখতেন। হায়দরাবাদ থেকে ‘মওলা আলী’তে যাওয়ার পথে তিনি তীর্থযাত্রীদের জন্য সুপেয় পানির কূপ ও চৌবাচ্চা তৈরি করেছিলেন। মানবিক কারণেই তিনি এটি করেছেন। কিন্তু আরেকটি উদ্দেশ্যও তার ছিল বৈকি। এ গজলেই তার বহিঃপ্রকাশ, ‘ও আলী, কেয়ামতের দিন আপনি কি চান্দাকে স্বর্গীয় সুধার এক চুমুক দেবেন না?’ 

শিয়া সম্প্রদায় ছাড়াও সুন্নিদের কিছু আচার-অনুষ্ঠানও পালন করতেন মাহ লাকা বাই। তিনি বিখ্যাত সুফি হজরত আবদুল কাদের জিলানির (রা.) স্মরণে ‘ফাতেহা-এ-ইয়াজদাহম’ জাঁকজমকের সঙ্গে পালন করতেন। 

মাহ লাকা বাই কবি, সভাসদ, নৃত্যগীতে পারদর্শী ও আমির হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। কিন্তু তার গজলগুলো প্রমাণ করে আধ্যাত্মিকতা ও ঐশী প্রেমেও তিনি সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। তার জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘মওলা আলী’র স্মৃতি। তার সমাধিও সেখানেই। মওলা আলীর পাদদেশে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন মাহ লাকা বাই।

নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক