বনানীর ১৫ তলা একটি ফ্ল্যাট ভবনের ১২ তলার সি’তে তিন রুম, ডাইনিং কাম ড্রইং, বিদেশী টাইলস বসানো তিন টয়লেট, ফুল ফ্লোর মোজাইক, দুটি বারান্দা ও সার্ভেন্টদের আলাদা টয়লেটসহ দক্ষিণমুখী অত্যাধুনিক ১ হাজার ৭৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটে দক্ষিণ থেকে কত রকম বাতাস জানালা-দরজা দিয়ে আসে-যায়, ভালো বাতাসে হূদয় হয় উত্ফুল্ল, মন্দ বাতাসে মন হয় বিষণ্ন, বাতাস গল্প বহন করে, গল্প নিয়ে যায়; তো সেই দক্ষিণের ফ্ল্যাটে থাকে ময়মনসিংহের চাকলাদার পরিবার। মিসেস চাকলাদার দুই মাস পরপর কাজের মেয়েসহ নিজ পরিবারের চারজনের জন্য পাঁচ রঙের পাঁচটি টুথব্রাশ কেনেন।

সোনিয়া চাকলাদার— বাসার ছোট মেয়ে, উনিশে পা দেবে আগামী বছর। গায়ের রঙ কালো ঘেঁষা, উচ্চতা ভালো, হিলঅলা জুতো পরার ইচ্ছে থাকলেও পরতে পারে না, ঢ্যাঙা ঢ্যাঙা লাগে। মুখে, গলায়, গ্রীবায় আর দুই বাহুতে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি মাখে সকালে আর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে; রেভলনের লিপস্টিক পছন্দ। বাথরুমে শাওয়ারের নিচে গরমকালে অনেকক্ষণ থাকে, শীতকালে সপ্তাহে তিনদিন গরম পানিতে সোনিয়া গোসল করে, গরমের দিনে গোসলের সময় বড় টুনাইট-এর প্রথম দুই লাইন গায়, পরের লাইনগুলো জানে না। কথার মধ্যে প্রয়োজনে বলে ইংরেজি শব্দ। একবার বলে, ফ্যাশন ডিজাইনার হবে, কিছুদিন পরে মত বদলায়, বলে বিউটিশিয়ান হতে হবে। গুলশানের জিমে সোনিয়া ভর্তি হয়েছিল, নিয়মিত যাওয়া হয়নি, সাঁতার কোথায় শিখবে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, ধানমন্ডি নাকি শেরাটনে, ভাবছে। দুই মাস অন্তর একবার গুলশানে হেয়ার ড্রেসারের কাছে গিয়ে চুল স্টেপ করায়, ফিল্ম ফেয়ার ও স্টার ডাস্ট কেনে, বলিউডের নায়ক-নায়িকাদের ছবি দেখে, কিছু গসিপ পড়ে, ঐশ্বরিয়ার সঙ্গে বিবেক ওবেরয়ের সম্পর্ক কোন দিকে যাচ্ছে, সে নিয়ে ঈষৎ চিন্তিত, ব্যবহার করে নীল রঙের টুথব্রাশ। তার মোবাইল ফোনের রঙও নীল।

সেলিম চাকলাদার— বাসার বড় ছেলে, জাতক মেষ রাশির, জন্মেছিল ১৯৮২-র এপ্রিলে, এরশাদের সামরিক শাসনামলে। তার ঘরের দেয়ালে চে গুয়েভারার ছবির পাশে গায়িকা ম্যাডোনার স্বল্প বসনের ছবির পোস্টার লাগানো, বছরে চারবার চুলের ফ্যাশন বদলায়, হাছন রাজার ‘কি ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার’ শুনে ভাবে এ জগৎ শূন্য। তার ঘরের ওয়ার্ডরোবের দুটি ড্রয়ার চাবি মারা থাকে, ভেরি ভেরি পার্সোনাল ইফেক্টসে ঠাসা দুটি ড্রয়ার, দু-তিন কপি প্লে বয় ও রসময় গুপ্তের কয়েকটি চটি বইয়ের সঙ্গে আরো কিছু জিনিসপত্র সেখানে আছে। এডিডাসের কেডস ও লেভিসের কাপড় খুব পছন্দ। বন্ধুদের সঙ্গে একদিন হুইস্কি খেয়ে মাতাল হয়েছিল, বমি করেছিল, পরদিন প্রচণ্ড মাথা ধরে, তার পর থেকে ও-সব ছোঁয় না, তবে মাঝেমধ্যে বিয়ার খায়, সিগারেটের ধোঁয়া ভালো লাগে না, শুক্রবারে বাবার সঙ্গে ইস্ত্রি করা সিল্কের পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে মসজিদে যায়, ব্যবহার করে লাল রঙের টুথব্রাশ। তার মোবাইল ফোনের রঙও লাল।

মোরশেদউদ্দিন চাকলাদার— বাসার কর্তা, পঞ্চাশের উপরে বয়স, তবু একটা চুলও পাকেনি। ব্যাক ব্রাশ করেন, পছন্দের পোশাক সাফারি, তবে জিয়াউর রহমান নন, তিনি ভক্ত ভাসানীর। মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে একসময় তার— যখন মান্নান সাহেব, ভাসানী ন্যাপ করতেন— ভালো পরিচয় ছিল, আদৌ ছিল কিনা কে জানে, কিন্তু তিনি খবরের কাগজে বা টিভিতে মন্ত্রী সাহেবকে দেখলেই ওই প্রসঙ্গটি বলেন, প্রায়ই মাঝে মধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে বসে সঙ্গ-সৌজন্য দেখাবার জন্যে কখনো কখনো একটু-আধটু মদ্যপান করেন। তার শোবার ঘরে টাঙানো আছে মক্কার ছবি। বাসায় পায়জামা-পাঞ্জাবি পরবার জন্য মেয়ে ও বউ তাকে বেশ চাপ দিয়েছিল কিন্তু কাজ হয়নি, লুঙ্গি পরতে পছন্দ করেন। সত্তর বছর বয়সের পর যদি বেঁচে থাকেন, মোরশেদউদ্দিনের ইচ্ছে আছে হজে যাবার, যদিও নিয়মিত নামাজ পড়েন না, তবে প্রতি শুক্রবারে আড়ংয়ের সিল্কের পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে কানে আতরের ছোঁয়া দিয়ে জুম্মা পড়তে যান, এক চা-চামচ মধুর সঙ্গে প্রতি সকালে এককোষী রসুন খান, এই হারবালে নাকি বীর্য ঘন হয়, সুচিত্রা সেনের পরে কোনো সুন্দরীর জন্ম হয়নি বলে মনে করেন, ব্যবহার করেন সবুজ রঙের টুথব্রাশ। তার মোবাইল ফোনের রঙও সবুজ।

শরিফা খাতুন চাকলাদার— বাসার কর্ত্রী, বয়স সাতচল্লিশ প্লাস, বিউটি পার্লারে গিয়ে চুল কালার করেন, দুই ইঞ্চি উঁচু হিলের বিভিন্ন রঙের স্যান্ডেল সু আছে তার, শাড়ি ও ব্লাউজের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে স্যান্ডেলগুলো কেনা হয়েছে, হালকা লিপস্টিক ও ডায়না পারফিউম না লাগিয়ে কখনো বাসা থেকে বের হন না, বাম হাতের মধ্যমা ও অনামিকায় যথাক্রমে আকাশি রঙের শেফায়ার এবং গোলাপি রঙের রুবি পরেন আর ডান হাতের মধ্যমায় পরেন হোয়াইট গোল্ডের তিন প্যাচের আংটি ও অনামিকায় লাগান সিঙ্গাপুর থেকে কেনা বারো আনা সোনার রিংয়ের ওপর মুক্তা বসানো আংটি, তিন মাস পর পর জ্যোতিষ সম্রাট সোলাইমান কবীরকে দিয়ে হাত দেখান, প্রতি মাসের শেষ মঙ্গলবারে যান সায়েদাবাদের হুজুরের কাছে, গলায় পরেন হালকা চেন; ব্যবহার করেন শর্ষে হলুদ রঙের টুথব্রাশ। তার মোবাইল ফোনের রঙ হলুদ নয়, কফি কালারের।

মা, বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে, ছয়জন বসতে পারে এ রকম ওভাল আকারের একটি খাবার টেবিলে বসে সোনিয়া রাত্রির খাবার শেষ করে থালায় লেগে থাকা আঠালো হলদেটে চর্বির ওপর— মুরগির মাংস খেয়েছিল— বৃত্ত আঁকছে, মুছে দিচ্ছে এবং পশ্চিমের দেয়ালে টাঙানো, স্টিলের ফ্রেমে বাঁধানো আরবি ক্যালিওগ্রাফিতে লেখা ‘আল্লাহু’র দিকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে। তার চিত্ত অস্থির, তার বান্ধবী তাকে অপমান করেছে। বিষয়টি সোনিয়ার বিবেচনায় খুবই গুরুতর। বাবা-মার সঙ্গে কথা বলে, আলোচনা করে মীমাংসা করা উচিত, কেননা বিষয়টির সঙ্গে পরিবারের স্ট্যাটাস গভীরভাবে জড়িত। প্রত্যেকের থালার পাশে নিজ নিজ মোবাইল, কখন কার জরুরি ফোন আসে বলা তো যায় না! চাকলাদার পরিবারের মিস্টার ও মিসেস রাত্রিতে একসঙ্গে কখনো কখনো বসে খাওয়ার সময় পেলেও পরিবারের অন্য দুই সদস্য সময় পায় না। পরিবারের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ব্যস্ততা ছোট ইঁদুরের মতো। সেলিম ও সোনিয়াকে মিসেস চাকলাদার অনেক দিন অনেকবার বলেছে, অন্তত ডিনারটা সবার একসঙ্গে বসে খাওয়া উচিত কিন্তু কাজ হয়নি। আজকে একসঙ্গে খেতে বসেছে সোনিয়ার সমস্যাটি পারিবারিক মিটিং করে সমাধান করবে বলে। সোনিয়াকে তার বান্ধবী রিমা বলেছে, ‘তোরা কোনো দিন মরডান (রিমা ও সোনিয়া জানে না শব্দটির উচ্চারণ মডার্ন, মরডান নয়) হতে পারবি না, যাদের নামের সাথে চাকরবাকর শোনায়— এ রকম চাকলাদার-টাকলাদার থাকে, তারা কখনো মরডান হইতে পারে না।’ তিন বান্ধবী, তিন বন্ধুসহ আজ দুপুরে কারওয়ান বাজারের লা ভিঞ্চিতে গিয়েছিল লাঞ্চ করতে, সেখানেই রিমা ওই কথা বলে।

খাবার টেবিলে আজ খুবই সিরিয়াস মিটিং হবে। সবার মোবাইল সবাই বন্ধ করে দিল। সোনিয়া চায় চাকলাদার পদবির একটা চূড়ান্ত মীমাংসা করতে, এ পদবি এই সময়ে অচল। সোনিয়ার কাছে তার ছেলে বন্ধু জয় জানতে চেয়েছিল, ‘চাকলাদার, হোয়াট ডাজ ইট মিন?’ সোনিয়া জানে না চাকলাদার পদবি কীভাবে এসেছে, জানে না তার ভাই সেলিমও। সোনিয়া যখন পদবি বিষয়ে উত্তর দিতে পারছিল না, তখনই রিমা ওই কটাক্ষ করে। পরিস্থিতিকে সহজ করবার জন্যে জয় বলেছিল, ‘ওয়েল ইউ উড আস্ক ইওর ড্যাড, হি শুড নো।’

‘যারা চাকলার শাসক বা মালিক ছিল, তারাই চাকলাদার। চাকলা হচ্ছে কয়েকটি পরগণার সমষ্টি, শব্দটি ফারসি। তোমার বন্ধুদের বলে দিও আমাদের রুট আছে, আমাদের বর্গারা আমাদের সম্মান করত জমিদারের মতোই’— মোরশেদউদ্দিনের ব্যাখ্যা শুনে সোনিয়া ও সেলিম কথা বলছে না দেখে ওদের মা বলল, ‘দ্যাখ কি উচ্চবংশ ছিল।’ মায়ের কথার জবাব না দিয়ে সোনিয়া তার বাবার কাছে জানতে চায়, ‘বর্গা জিনিসটা কী?’ বর্গা বিষয়ে শোনার পরে সেলিম জানতে চায়, ফ্যামিলি ট্রি লেখা আছে কিনা। সে রকম কোনো কিছু লেখা নেই, লেখা হয়নি। এসব আলোচনার মাঝখানে মিস্টার চাকলাদার তার মিসেসকে কড়া ভাষায় দু’চার কথা শোনাল। যদি ছেলেমেয়েরা নিয়মিত গ্রামে যেত, নিজের গ্রাম চিনত, তাহলে বুঝত চাকলাদার পরিবার কী। মিসেস চাকলাদার তার বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে মফস্বল শহরে শহরে ঘুরে বড় হওয়া মেয়ে, গ্রামে গ্রাম্যতা ছাড়া আর কিছুই নেই, কেউ তার এ বিশ্বাসে কখনো চিড় ধরাতে পারেনি। ‘এবার কিছু একটা বলো’— বাবার প্রশ্ন শুনে সোনিয়া বলল, ‘আমার নামের সাথে চাকলাদার রাখব না, এখন থেকে বলব সোনিয়া মোরশেদ।’ ‘বাহ’ বলে সেলিম বলল, ‘আমিও এখন থেকে সেলিম মোরশেদ।’ শরিফা খাতুনের চোখে একটা দ্যুতি খেলে গেল এবং তিনিও অবাক স্বরে বলে ফেললেন, ‘খুব সুন্দর, এখন থেকে আমি শরিফা মোরশেদ।’ এবং আরো জানালেন, তিনিও নাকি চাকলাদার পদবিতে স্বস্তি বোধ করতেন না। ক’দিন আগে পাশের ফ্ল্যাটে বেড়াতে গিয়েছিলেন, সেখানে বারিধারা থেকে এসেছিল এক মহিলা, শরিফা চাকলাদারের সঙ্গে আগন্তুক মহিলার পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় পাশের ফ্ল্যাটের মহিলা ঠোঁট বিস্তারিত করে চাকলাদার শব্দটিকে বলেছিলেন, ‘মিসেস চ্যাকলাদার।’ বারিধারার মহিলা, ‘নেভার আই হ্যাভ হার্ড সাচ ফ্যামিলি নেম, সাউন্ডস ফানি’— বলে কেমন যেন হেসেছিল। মোরশেদউদ্দিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘আমি আমার বাপ-দাদার পদবি ছাড়ব না।’

রাত সাড়ে ১০টা। মোরশেদউদ্দিন এ সময়ে বাসায় থাকলে বিবিসির বাংলা খবর শুনবেনই কিন্তু আজকে দক্ষিণের আবছা অন্ধকার বারান্দায় বসে আছেন, পাশে ১২ ব্যান্ডের সনি রেডিওটি নেই, মোবাইল ফোন আছে, তার দৃষ্টির মধ্যে ঢাকার কালো আকাশ, আকাশের নিচে কোনো বাড়ির ঘর অন্ধকার, কোনো বাড়ির পর্দা দেয়া জানালা খোলা, ঘরে আলো জ্বলছে। একটা শূন্যতার মধ্যে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছেন মোরশেদউদ্দিন। খাবার টেবিলে বাপ-দাদার পদবি নিয়ে যে ঘটনা ঘটে গেল, তার পেছনে আসলে কী কাজ করছে, সে সম্পর্কে একটা সদুত্তর তার পাওয়া দরকার। কিন্তু তাকে উত্তরটা দেবে কে? নিজের সঙ্গে তর্ক করলেন, যুক্তি দিলেন, যুক্তি খণ্ডালেন কিন্তু সমাধানযোগ্য মীমাংসায় পৌঁছতে পারলেন না। এক অধ্যাপক বন্ধুর কথা তার মনে পড়ল, বন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান পড়ায়, খবরের কাগজে উপসম্পাদকীয় লেখে। ফোনে অনেকক্ষণ আলোচনা হলো বন্ধুর সঙ্গে। বন্ধু ব্যাখ্যা করে করে বুঝিয়ে দিল সমাজে, পরিবারে এবং ইনডিভিজুয়ালের মধ্যে ব্যাপকভাবে শুরু হয়ে গেছে আইডেন্টিটি ক্রাইসিস। সবাই নতুন নতুন আইডেন্টিটি খুঁজছে, কোথায় দাঁড়ালে যে শান্তি পাবে, সে বিষয়ে কেউ নিশ্চিত নয়। সারা পৃথিবীতে এখন ভাঙন চলছে, ১১ সেপ্টেম্বরের অনেক আগে থেকে, আসলে রাশিয়া ভাঙনের পর থেকে শুরু হয়েছে এক শূন্যতা, বিশ্বক্ষমতার ব্যালান্স নষ্ট হওয়ার পরে সবকিছুতে একটা ব্যালান্স থাকতে হয়, কী বলো এবং ফোন ছেড়ে দেয়ার আগে বন্ধু পরামর্শ দিল, ছেলেমেয়ে ও বউয়ের কথা মেনে নাও। আবছা অন্ধকারের মধ্যে বসে, কার সঙ্গে কী দিয়ে পদবি-সংক্রান্ত জটিলতার ব্যালান্স মোরশেদউদ্দিন করবেন, তার কিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না। মোবাইল বেজে উঠল। ‘চাকলাদার কী করো?’ বন্ধু হাফিজের প্রশ্নে খুবই শান্ত স্বরে মোরশেদউদ্দিন উত্তর দেয়, ‘চাকলাদার একা বসে আছে।’ হাফিজ হেসে বলেন, ‘ভাবী কিছুক্ষণ আগে আমার বউয়ের সাথে কথা বলছিল, ফোন ছেড়ে দেয়ার পরে আমার বউ শুধু হাসছিল, হাসতে হাসতেই বলল, তোমার ছেলেমেয়ে, তোমার বউ নাকি নামের সাথে আর চাকলাদার রাখবে না, সত্যি নাকি?’ মোরশেদউদ্দিন বলল, ‘হ্যাঁ, এখন রাখি, পরে কথা বলব।’ হাফিজের কানে একটি দীর্ঘশ্বাস এল।

খাবার টেবিল থেকে উঠে এসে সোনিয়া তার পাঁচজন বন্ধু ও তিনজন বান্ধবীকে জানিয়ে দিল, আজ রাত থেকে সে সোনিয়া মোরশেদ, আগামীকাল কোর্টে গিয়ে নাম এফিডেভিড করাবে। চাকলাদার বলে রিমা টিটকারী মেরেছিল, সোনিয়া তাকে জানায়নি। সোনিয়ার কাছ থেকে চাকলাদার উড়িয়ে দেয়ার কথা শুনে তার বন্ধু জয় বলেছিল, ‘ব্যাপারটিকে আমি সাপোর্ট করতে পারছি না।’ কেন সাপোর্ট করতে পারছে না, সে সম্পর্কে একটা ব্যাখ্যা জয় দিয়েছিল। মানুষের যেকোনো একটি জায়গায় একটি অবস্থান থাকতে হয়, ফ্যামিলি ট্রি বলে একটা খুবই জরুরি জিনিস আছে, তা থেকে আলাদা হয়ে যাওয়াটা আধুনিকতা নয়— এ পর্যন্ত বলে জয় আরো বলেছিল, ‘সোনিয়া তুমি রিমার কাছে হেরে গেছ।’ জয়ের সঙ্গে কথা শেষ হওয়ার পরই আসে রিমার ফোন। সোনিয়া কলটি কেটে দেয়।

প্রথম কেনা হয় মোরশেদউদ্দিনের মোবাইল ফোন। তিনদিন পর দ্বিতীয়টি কেনা হয় তার মিসেসের জন্য। তিনদিন পরই কেনার কারণ হচ্ছে, পাশের ফ্ল্যাটের মহিলা বেড়াতে এসেছিলেন মোবাইল হাতে এবং শরিফা খাতুনকে ফোনটি দেখিয়ে তিনবার কিছুক্ষণ পরপর বলেছিলেন, তিনি নাকি কিছুতেই মোবাইল নেবেন না কিন্তু কিটির (কিটি শব্দের দুটি অর্থ: তাসের খেলায় বাজির পরিমাণ ও বিড়াল ছানার আদুরে নাম) বাবা তাকে বুঝিয়েছে মোবাইলের গুরুত্ব। শহরে বের হলে কখন কী ঘটে, কে কোথায় আছে তা সবসময় জানা থাকা দরকার, বিপদ-আপদের কথা তো বলা যায় না। মহিলা থাকতে থাকতেই তিনবার ফোন এসেছিল। প্রথমবার কথা হলো ধানমন্ডির দুই নম্বর রোডের আগোরা নিয়ে, সেখান থেকে পদ্মার একটি ইলিশ ১ হাজার টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে এবং ইলিশের বড় পেটিটা খেতে খেতে দাম বেশ সস্তা হয়েছে বলছিল কিটির বাবা, সেই জরুরি কথা হাসতে হাসতে জানিয়ে মহিলা অন্য প্রান্তকে আরো বলল, ‘কাল তিনি নিউমার্কেট যাবেন না।’ দ্বিতীয়বার ফোন এল। তিনি চোখ কুঁচকে গম্ভীর স্বরে জানালেন, তিনি মিটিংয়ে আছেন। তৃতীয়বার তিনি মিনিট দশেক একজন পুরুষের সঙ্গে কথা বললেন। বিষয় এ রকম: আগামী সোমবার কিটির বাবা সিঙ্গাপুর যাবে, তখন অসুবিধে হবে না। আর দুদিন তার লক্ষ্মীকে ধৈর্য ধরতে হবে। ফোন ছেড়ে দিয়ে— চোখ দুটি ছিল উচ্ছল— শরিফা খাতুনকে মহিলা বলল, মোবাইল ছাড়া তিনি একমুহূর্ত থাকতে পারেন না। ভদ্রমহিলা পরামর্শ দিলেন, একটি মোবাইল নিয়ে নেন, সাহেব কোথায় যায় না যায়, তার হদিস রাখা যাবে।

শরিফা খাতুনের জন্য কফি কালারের মোবাইল ফোন কেনা হলো। নতুন মোবাইল হাতে পেয়েই কুমিল্লায় তার বড় ভাবী ল্যান্ড লাইনে ফোন করেন। ‘আমরা ভালো, তোমরা ভালো? মোবাইল নাম্বার নাও, নতুন ফ্ল্যাটে আসছি কতদিন হলো, বেড়াতে তো আসলা না, বেড়াতে আসো, না না অনেক টয়লেট আছে, সারভেন্টদের আলাদা টয়লেট, পাগল হইছ এক টয়লেটে পায়খানা করব, গন্ধই তো বিশ্রী, হাসছো ক্যা, কী বললা? আমি জানি তোমার টয়লেট তোমার ছেলেমেয়েকেও ব্যবহার করতে দেও না, তুমি যেদিন আসবা তার দুইদিন আগে একটা টয়লেট আলাদা কইরে রাখব, পরিষ্কার কইরে রাখব, হ্যাঁ বলছি তো, তোমার কোনো অসুবিধা হবে না, মোবাইল নাম্বার হইলো জেরো ওয়ান সেভেন থিরি... ঠিক আছে, লিখছো? টিঅ্যান্টি থেকেও করতে পারবা, আজকা সন্ধ্যা সাতটা থেইকা সাড়ে সাতটার মধ্যি অবশ্যই অবশ্যই ফোন দিবা, কারণ হইলো তখন আমি কিটির মার বাসায় থাকব।’

মোরশেদউদ্দিন ননদিনী আর ভাবীর আলোচনা শুনে একটু ভাবনার মধ্যে পড়ে গেলেন। কত জরুরি কথা এখন থেকে যে হবে, মাসে কত টাকার কার্ড যে কিনতে হবে!

সোনিয়া কলেজ থেকে সাধারণত ৪টার মধ্যেই ফিরে আসে কিন্তু সেদিন ৫টা বেজে যাওয়ার পরেও মেয়ে আসছিল না। উদ্বিগ্ন শরিফা খাতুন দুবার মোবাইল করেও তার স্বামীকে পায়নি, দুবারই শুনেছে: এখন সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। মাঝে মধ্যেই মোরশেদ উদ্দিন মোবাইল বন্ধ রাখে কেন? প্রশ্নটা একবার শরিফা খাতুনের মাথায় ধাক্কা দিয়ে যায় কিন্তু চিন্তাটা মেয়ের চিন্তার কারণে এখন বেশি দূর এগোয় না। দেশে নতুন এসেছে মোবাইল ফোন। টাকাওয়ালা বাপের ছেলেমেয়েদের হাতে দেখা যাচ্ছে। সোনিয়ার কাছে একটি মোবাইল থাকলে এখন মেয়ে কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে খোঁজ পাওয়া যেত। শরিফা খাতুন সিদ্ধান্ত নেয়, সোনিয়া ও সেলিমের জন্য কালকেই মোবাইল কিনতে হবে।

সোনিয়া ফিরল রাত ৮টার দিকে। জানা গেল, বন্ধুরা মিলে অটামের ফুল মুন দেখতে আশুলিয়ায় গিয়েছিল। আশুলিয়ায় যাওয়ার প্ল্যান হঠাৎ করে হয়। ক্লাস শেষে জয় আর অন্য বন্ধুদের সঙ্গে সোনিয়া গিয়েছিল। প্রস্তাবটা ছিল জয়ের। জয়ের ক্লাসে সুন্দরী তরুণী শারমীন ম্যাডাম শেলির কবিতা পড়াবার সময় সৌন্দর্য, সৌন্দর্যকে উপভোগ করা ইত্যাদি নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে দিতে সাদা হালকা, লাইক কাশফুল, মেঘের ভেতরে দৌড়ানো অটামের ফুল মুনের সৌন্দর্য উপভোগ করবার-বোঝবার চোখ সবার থাকে না, কবিদের থাকে, নতুন প্রেমিক-প্রেমিকার থাকে, চোখে ভাব ফুটিয়ে বলেছিলেন। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে পড়া ক’জন তরুণ-তরুণী আশুলিয়ায় গিয়েছিল। কেয়া সোনিয়াকে বলেছিল বাসায় জানাতে। সোনিয়া উত্তর দেয়, ‘দরকার হবে না, মা-বাবা তো অনেক দিন খেয়ালই করে না, আমি কখন বাসায় ঢুকছি, কখন বাসা থেকে বের হচ্ছি।’ স্বরে শূন্যতা ছিল।

সোনিয়ার জন্য নীল এবং সেলিমের জন্য লাল মোবাইল ফোন কেনা হলো।

সোনিয়া প্রথমে ফোন করল জয়কে। এনগেজড। পরে শাকিলকে, এনগেজড। কেয়ার ফোন বলল, এখন সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এনগেজড, এনগেজড, সংযোগহীন, সবাই কি মহাব্যস্ত? সোনিয়া তার ভাইকে ফোন করল। এনগেজড। অবশেষে কেয়াকে আবার করল, পাওয়া গেল।

: এই সনি আমার নাম্বার পেলি কোথায়?

: কেন আজ সকালেই তো তোদের সবার নাম্বার নিলাম, মনে নেই? বল্লাম না, আজকে মা আমাদের দুই ভাইবোনের জন্যে মোবাইল কিনবে?

: কালকে মোবাইল উপলক্ষে কোথায় খাওয়াবি?

: তুই-ই বল।

: পিত্জা হাট, গুলশানে নতুন খুলেছে, কাগজে ছবি দেখিসনি, ডেইলি স্টারে, একবারে ২২০ জন বসতে পারে।

: তবে রিমা না থাকলে ভালো হয়।

: তুই তো এখন আর চাকলাদার না, থাকলে

সমস্যা কী, আর বন্ধুদের মধ্যে এ রকম একটু হয়েই থাকে, তোর ভাই নাকি খুব হ্যান্ডসাম হইছে?

: নজর দিয়া লাভ হবে না মনে হয়, পাশের ফ্ল্যাটের কিটির সাথে বোধহয় কিছু হচ্ছে। ঠিক আছে, কালকের প্রোগ্রাম ফাইনাল, রাখি, বাই।

জয়কে আবার ফোন করল, ‘দুঃখিত এ মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না’ শুনে ফোনটাকে আছাড় মারতে ইচ্ছে করে সোনিয়ার। সেলিমের ঘরের দরজা বন্ধ। সেলিম হ্যান্ডসাম হয়েছে কিনা, সোনিয়া দেখতে এসেছিল। একই বাসায় চোখের সামনে থাকার জন্যে ভাইয়ের হ্যান্ডসাম হয়ে ওঠা বোন সেভাবে খেয়াল করেনি। সেলিমের ঘর থেকে হাসির শব্দ আসছে, কথা আসছে। সোনিয়া দরজার সামনে দাঁড়াল, কান অতিমাত্রায় গোয়েন্দা। ‘ও ডিয়ার সুইট হার্ট আই উড লাভ ইউ টিল মাই ডেথ’ শুনে সোনিয়ার মনটা একটু খারাপ হলো, জয় কখনো এভাবে তাকে বলেনি।

সোনিয়া ও সেলিমের মোবাইল কেনা দুই সপ্তাহ হয়ে গেছে। মোবাইলে সোনিয়া কথা বলছিল কায়সার নামের নতুন পরিচয় হওয়া এক তরুণের সঙ্গে, ৫০০ টাকা এইমাত্র শেষ হয়ে গেল, সোনিয়ার মেজাজ খারাপ। খুবই জরুরি আলাপ করছিল ওরা। মাইকেল জ্যাকসনের থেকে রিকি মার্টিনের গানে সেক্স অ্যাপিল বেশি, এ পর্যন্ত সোনিয়া শোনবার পরেই কার্ড শেষ হয়ে যায়। নিশ্চয় কায়সার ভাববে, সোনিয়া লাইন কেটে দিয়েছে, এই জন্যেই মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল তার। খাওয়ার টেবিলে বাবাকে সে বলল, ‘আমাকে মোবাইলের খরচ মাসে ৩ হাজার দিতে হবে।’ মোরশেদউদ্দিন অবাক হয়ে জানতে চায়, ‘দুই সপ্তাহে ১ হাজার ৮০০ টাকার কার্ড শেষ করে ফেলেছ?’ সোনিয়া বলল, ‘তার বন্ধু ও বান্ধবীদের মাসিক মোবাইল বাজেট ৩ হাজার টাকা।’ মিসেস মোরশেদ মৃদু আপত্তি করে বললেন, ‘এত কথা কার সাথে বলিস?’ সোনিয়া উত্তরে জানায়, ‘আমার একটি পার্সোনাল লাইফ আছে।’ মোরশেদউদ্দিন ছেলেকে বলেন, ‘তোমার কি পার্সোনাল লাইফ বেড়ে গেছে?’ ছেলে উত্তরে জানায়, ‘ইউ থিংক এবাউট ইওর ইউনিভার্সিটি লাইফ, তখন তো মোবাইল ছিল না।’ মোরশেদউদ্দিন ছেলে ও মেয়ের সঙ্গে আর কথা বাড়াল না।

মোরশেদউদ্দিন চাকলাদার অফিসে বসে আছেন। বউকে বাসায় ফোন করলেন, বউ বাসায় নেই। মোবাইল বলল, দুঃখিত এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না; ছেলেকে মোবাইল করলেন, এনগেজড; মেয়েকে করলেন, দুঃখিত এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

মিসেস মোরশেদ মোবাইল করলেন তার স্বামীকে, এনগেজড; করলেন ছেলেকে দুঃখিত এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না; করলেন মেয়েকে,. এনগেজড।

সোনিয়া মোবাইল করল বাবাকে, এনগেজড; করল মাকে, দুঃখিত এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না; করল সেলিমকে, এনগেজড, করল কায়সারকে, এনগেজড।

সেলিম করল মাকে, দুঃখিত এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না; করল বাবাকে, মনে হলো বাবা নেটের বাইরে। করল বোনকে, দুঃখিত এই মুহূর্তে...; করল কিটিকে দুঃখিত, এই মুর্হূর্তে ...।