‘পোশাকে-আশাকে, চালচলনে রহমান সাহেব ছিলেন পুরোদস্তুর সাহেব। তদুপরি দেহের আকৃতি ও মুখের সৌন্দর্য তাহাকে অপরূপ সুশ্রী করিয়াছিল। একবার লর্ড লিটন ঢাকা আসিলে মুসলিম হল পরিদর্শন করিতে আসেন। রহমান সাহেব লাট সাহেব (গভর্নর লর্ড লিটন) ও অন্যান্য কর্মচারী ঘুরিয়া ঘুরিয়া মুসলিম হল (পরবর্তীকালে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল) পরিদর্শন করিলেন। নবাগত ছাত্র, যাহারা ইতিপূর্বে রহমান সাহেবকে দেখে নাই, তাহারা অন্যান্যের তুলনায় বেশভূষা, চালচলন ও চেহারা দেখিয়া রহমান সাহেবকেই লাট সাহেব মনে করিল এবং অন্যদিগকে সরকারি কর্মচারী বলিয়া ধরিয়া নিল। পরে আলাপ-আলোচনায় এই বিভ্রান্তি নিয়া খুব হাসাহাসি হয় এবং নবাগতরা খুব লজ্জিত হয়।’

পূর্ব পাকিস্তানের চিফ মিনিস্টার (১৯৫৬-১৯৫৮) এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী (১৯৮৪-১৯৮৬) আতাউর রহমান খান ‘স্যার এ এফ রহমানের স্মৃতি’ রচনায় আরো উল্লেখ করেছেন: ‘আমরা তাঁহাকে ‘প্রিন্স অব রমনা’ খেতাবে ভূষিত করিয়াছিলাম। আর সত্যিই তিনি রাজপুত্রসদৃশ ছিলেন। ইহা অপেক্ষা ছোট কোনো কিছু তাঁহাকে কল্পনা করিতে পারি নাই।’

আতাউর রহমান খান ১৯৩০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ (অনার্স) ডিগ্রিপ্রাপ্ত। মুসলিম হলের প্রভোস্ট আহমদ ফজলুর রহমান ইতিহাসের শিক্ষক, রমেশচন্দ্র মজুমদার অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। ১৯৩৪ থেকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর; তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশনে যোগ দেয়ায় ১৯৩৭ জানুয়ারির প্রথম দিন রমেশচন্দ্র মজুমদার তার স্থলাভিষিক্ত হলেন। রমেশচন্দ্র মজুমদার অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা এ মানুষটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। ‘আমার পূর্ববর্তী ভাইস চ্যান্সেলর ফজলুর রহমান সাহেব এ বিষয়ে একজন আদর্শ ছিলেন বললেও চলে। সাম্প্রদায়িক কোনো মনোভাব একেবারেই নেই, এ রকম তার মতো দ্বিতীয় কোনো মুসলমান আমি দেখিনি। অনেকটা তার প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক বেশ ভালো ছিল।’

কেবল ছাত্রদের শিক্ষিত করে তোলা নয়, তাদের জন্য ভালো চাকরির জন্য তদবির করেছেন। তার তদবিরে চাকরি পাওয়া এক ছাত্র জাকির হোসেন পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের প্রথম আইজি এবং পরে গভর্নর হন।

বাংলার কামরুদ্দীন আহমদ ইতিহাসের ছাত্র স্যার এ এফ রহমান সম্পর্কে লিখেছেন ‘ইংরেজি বলতেন অক্সফোর্ড একসেন্টে, ঘুম থেকে উঠেই বাথরুমে ঢুকতেন এবং স্নান করে সাহেবি সুট পরে ব্রেকফাস্ট করতেন। ...ছাত্রদের ভালোবাসতেন পুত্রের মতো, তাছাড়া ছাত্রদের আর্থিক সাহায্যও করতেন নানাভাবে। আমরা অন্যায় করলে অনেক সময় জরিমানা করতেন আমাদের প্রভোস্ট—বেশির ভাগ জরিমানা তিনিই দিয়ে দিতেন।’ ১৯৩৩ সালে নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী জন গলসওয়ার্দির মৃত্যু হলে কার্জন হলে তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘ফরসাইট সাগা’ নিয়ে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন ডক্টর মাহমুদ হাসান, কিন্তু তার পঠিত প্রবন্ধের চেয়ে বেশি সুপাঠ্য হয়েছিল অনুষ্ঠানের সভাপতি এ এফ রহমানের বক্তৃতা, ‘যেমন সারগর্ভ, তেমনি সাবলীল।’

প্রফুল্লকুমার গুহ লিখেছেন, ‘১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টি পনেরো-ষোল বছরের মধ্যেই ‘ভারতবর্ষের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠানরূপে খ্যাতি অর্জন করে।’ কিন্তু অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। ‘ঢাকা শহরেরই বিদগ্ধ’ সমাজ এ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ঢাকার উচ্চ শিক্ষার অন্তরায় বলে মনে করলেন। ঢাকা নগরে রব উঠল : ‘They have killed a good college (Dhaka College) to make a bad University.’ প্রফুল্ল গুহ মনে করেন ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এ বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির পেছনে কাজ করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশ ঘটল অরাজনৈতিক অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে।

প্রফুল্ল গুহ লিখলেন: ‘কিন্তু ঢাকা শহরবাসীর শঙ্কা ও সন্দেহ এবং সরকারের দুরভিসন্ধি উভয়ই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসকমণ্ডলীর জাদুস্পর্শে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সৌভাগ্য যে এর প্রাথমিক কর্ণধারগণের প্রত্যেকেরই এমন একটি উদারচিত্ত ও সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা হতে সম্পূর্ণ বিমুক্ত প্রকৃত শিক্ষকের বিশুদ্ধ একাডেমিক স্পিরিট ছিল যে তাদের পরিচালনায় প্রথম হতেই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি পবিত্র বিদ্যামন্দিরে পরিণত হলো। তাদের চোখে হিন্দু ও মুসলমান ছাত্রদিগের মধ্যে কোনো প্রভেদ ছিল না। তারা সব ছাত্রকেই সমান দরদ ও ভালোবাসা দিয়ে নিরপেক্ষভাবে শিক্ষাদান করেন এবং তাদের এই মহৎ সংকল্পে হিন্দু-মুসলমান ছাত্রদের মধ্যেও গড়ে উঠল এক প্রীতি ও বন্ধুত্বের বন্ধন।’

এ এফ রহমান, রমেশচন্দ্র মজুমদার, জ্ঞান ঘোষ, শহীদউল্লাহ, নরেশ সেনগুপ্ত শুধু তাদের ঔদার্য ও ব্যক্তিত্বের প্রভাবে এ অসম্ভবকে সম্ভব করলেন।

তত্কালীন মুসলিম হলের প্রথম প্রভোস্ট স্যার এ এফ রহমান, ১৯২১-২৬ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন, তিনিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বাঙালি এবং মুসলিম ভাইস চ্যান্সেলর। তারপর ১৯৭১ পর্যন্ত যারা প্রভোস্টের দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা হচ্ছেন ফখরুদ্দিন আহমদ (১৯২৬-২৭), এনএউএ সিদ্দিকী (১৯২৭-২৮, অবাঙালি), মাহমুদ হাসান (১৯২৮-৩২, ১৯৩৩-৪২, পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর), মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৯৩২-৩৩), সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন (১৯৪২-৪৮), এম শফিউল্লাহ (১৯৪৮-৪৯), মুহম্মদ ওসমান গনি (১৯৪৯-৫৬), আবু হেনা (১৯৫৬-৫৯), মফিজউদ্দীন আহমেদ (১৯৬৩-৭০), মফিজউল্লাহ কবীর (১৯৭০-৭১)। তাদের মধ্যে ফকরুদ্দিন আহমেদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও এম শফিউল্লাহ ছিলেন ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট।

প্রফেসর ইমেরিটাস সিরাজুল হক ১৯২৩-২৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী। তিনি তার হলের প্রভোস্ট ইতিহাসের রিডার এ এফ রহমান সম্পর্কে লিখেছেন, ‘পরিপাটি বেশভূষা, অসাধারণ প্রজ্ঞা ও অমায়িক ব্যবহারের জন্য তিনি শিগগিরই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী, কর্মকর্তা সকলের নিকট একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। নিজস্ব মনন, প্রতিভা ও মতাদর্শ বলে তিনি মুসলিম হলের সামগ্রিক পরিবেশ গড়ে তোলেন। এ কাজে তিনি অক্সফোর্ডের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। হলে তিনি ছাত্রদের ইউনিয়ন, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়ানুষ্ঠান ও বিভিন্ন সমাজসেবামূলক তত্পরতার সূচনা করেন। প্রথম হল ম্যাগাজিন প্রকাশের কৃতিত্বও তারই। এমনি অসংখ্য শিক্ষামূলক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড স্যার এ এফ রহমানের মুসলিম হল থেকে সূচিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য হলে তা বিস্তার লাভ করে।... ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নানাভাবে এ মনীষীর নিকট চিরঋণী।’

সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, তার সময়ের উপাচার্য এ এফ রহমান হিন্দু-মুসলমান সকলের আদৃত বিরল সজ্জন। একবার হিন্দু ছাত্ররা দোল উৎসবে তাকে রঙ দিতে গিয়েছিল। তারা ভেবেছিল মুসলমান ভদ্রলোক নিশ্চয়ই রুষ্ট হয়ে গালাগাল দেবেন। কিন্তু সকলকে অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন, নিঃসংকোচে রঙ দাও। ‘রঞ্জিত পরিচ্ছদ রহমান সাহেব ছাত্রদিগকে বেশকিছু টাকা বলিলেন তোমরা মিষ্টি খাইও।’

তিনি আরো জানাচ্ছেন, সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো গাড়ি ছিল না। চারজন চড়ার সুন্দর ব্যবস্থা করা ঘোড়ার গাড়িতে শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে ভাড়া লাগত আট আনা। এ এফ রহমানকেও তিনি ঘোড়ার গাড়িতে চড়তে দেখেছেন। ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে কোচোয়ানরা তার বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করত, তাকে যে গাড়িতে তুলতে পারবে সেই ভাগ্যবান। কোচোয়ানরা জানত তিনি কখনো ১ টাকার কম ভাড়া দেন না।

ঐতিহাসিক, রাজনীতিবিদ ও সমাজ সংস্কারক স্যার এ এফ রহমানের জন্ম ২৮ ডিসেম্বর ১৮৮৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে। তিনি জলপাইগুড়ি জেলা স্কুল থেকে ১৯০৮ সালে মেট্রিক পরীক্ষায় বৃত্তি নিয়ে উত্তীর্ণ হন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯১২ সালে ইতিহাসে বিএ (সম্মান) ডিগ্রি লাভ হন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে দুই বছর গবেষণা করেন। ১৯১৪ সালে ‘আলিগড়ে অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ’-এ (আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়) লেকচারার হিসাবে যোগ দেন।

১৯১৪ সালে স্যাডলার কমিশনে যোগ দিয়ে এ এফ রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর ফিলিপ হার্টগের অনুরোধে স্যার এ এফ রহমান ইতিহাস বিভাগে রিডার পদে যোগ দেন।

১৯২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটদের ভোটে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৭ সালের পুনরায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নীলফামারী আসন থেকে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য হন। ১৯৩২ সালে তিনি বঙ্গীয় ভোটাধিকার কমিটি এবং পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সদস্য নিযুক্ত হন। ১৯৪২ সালে তিনি নাইটহুড পান। ১৯৪৫ সালের ১০ ডিসেম্বর মাত্র ৫৬ বছর বয়সে প্রয়াত হন।।

প্রফুল্লকুমার গুহ লিখেছেন, ভাইস চ্যান্সেলর হার্টগ সাহেবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ এ এফ রহমানকে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের (মুসলিম হলের, সলিমুল্লাহ হল তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি) প্রভোস্ট করা। ‘এ এফ রহমান সাহেবের মতো উদারচেতা সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা হতে সম্পূর্ণ বিমুক্ত এক বিরাট ব্যক্তির প্রভাবে মুসলমান ছাত্রদের মনে হিন্দুবিরোধী কোনো চিন্তা প্রবেশ করতে পারল না।’

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গেই বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের দোতলায় মুসলিম হলের গোড়াপত্তন হয়। ১৯২৯-৩০ সালে মুসলিম হলে শিক্ষার্থী দাঁড়ায় ৪১৮ এবং মধ্যে ২৪২ জন আবাসিক, অনাবাসিক ১৭৬ জন। এ এফ রহমান তার ব্যক্তিত্ব ও ব্যবস্থাপনাগুণে মুসলিম হলকে ঢাকা ও জগন্নাথ হলের জন্য অনুকরণীয় মডেলে পরিণত করেন।

 

আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক