আয়ওয়ায় এসেছি কয়েক সপ্তা হয়ে গেছে। এখানকার ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রামে এ বছর বিভিন্ন দেশ থেকে আমরা পঁয়ত্রিশজন লেখক যোগ দিয়েছি। কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ছাড়াও দলে রয়েছেন চলচ্চিত্র, নৃত্য ও সংগীতসহ অন্যান্য ভিসুয়াল মাধ্যমে কাজ করা শিল্পীরা। মাধ্যমের বৈচিত্র্য সত্ত্বেও মূলত লেখালেখি বা সাহিত্যকীর্তির মানদণ্ডেই প্রত্যেকের জায়গা হয়েছে নির্বাচিত লেখক তালিকায়। যে কারণে একজন গ্রাফিক শিল্পীর অন্য পরিচয় ঘাঁটলে দেখা যাবে, তিনি ঔপন্যাসিকও বটে। তেমনি যিনি চিত্রনাট্যকার, তিনি ছোটগল্পকারও। নৃত্য বা সংগীত নিয়ে যিনি মেতে আছেন, তিনি ভিন্ন পরিচয়ে কবি।

রাইটিং প্রোগ্রামের পরিচালক ক্রিস্টোফার মেরিল— স্বনামধন্য কবি ও অনুবাদক— জানালেন, অতীতের চেয়ে এ বছর যথেষ্ট বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে। সাহিত্য ও শিল্পচর্চার নানা মাধ্যম থেকে যেমন লেখকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তেমনি বয়সগত মাপকাঠিকে খানিকটা আলগা করার ফলে প্রতিষ্ঠিত ও বয়স্ক লেখকদের পাশাপাশি তরুণ, এমনকি সবে লিখতে শুরু করা সম্ভাবনাময় লেখকরাও সুযোগ পেয়েছেন।

আমাদের বহরে সবচেয়ে বয়স্ক ইসরায়েলের ওডে বিসারত ও সাইপ্রাসের স্টিফানোস— দুজনই ৭০ ছুঁই-ছুঁই। হংকংয়ের ভার্জিনিয়াও প্রায় ওঁদের কাছাকাছি। অন্যদিকে কনিষ্ঠতম ক্রিস্টিনের বয়স মাত্র ২৬। ইথিওপিয়ার এ মেয়েটি কথাবার্তায় চৌকস, ব্যক্তিত্বের ওজন বয়স ছাপিয়ে অনেক বেশি, সাহিত্য-বিষয়ক বোধ-বুদ্ধিতেও সে পোক্ত। ক্রিস্টিন ইংরেজিতে কবিতা লেখে, ভালো লেখে। মধ্য-তিরিশ বা কিছু উপরের দিকে রয়েছে ইসরায়েলের গালিথ, হিব্রুতে লেখে। হৈচৈ করা মেয়ে, হয়তো সে কারণেই স্বভাবে যথেষ্ট ভঙ্গুর। এই হাসি-ঠাট্টা করছে, পরমুহূর্তে দেশে ফেলে আসা বাচ্চাদের দেখভাল হচ্ছে কিনা, এ নিয়ে মন খারাপ করছে। কিংবা আগের রাতে তার অসম্পূর্ণ উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ একটা চ্যাপ্টারের বারোটা বাজিয়েছে বলে রেগে টং হয়ে আছে। কৌতূহলকর বিষয় হলো, ইসরায়েলি গালিথের সঙ্গে সমবয়সী প্যালেস্টাইনি এলিসের হূদ্যতা। এলিস কবি; আরবি ও ইংরেজিতে লেখে, মাহমুদ দারবিশের অনেক কবিতা অনুবাদ করেছে। মিসরের খালিদ আলখামিচি সিনিয়র লেখক, কিছুটা বাগাড়ম্বরপ্রবণ। আমাকে জানাল, আরবিতে লেখা তার উপন্যাস ‘ট্যাক্সি’ প্রথম বছরেই দুই লাখ কপির ওপর বিক্রি হয়েছে, আর পরের বছর পার না হতেই ২৭টি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। কৌতূহলী হয়ে বইটা পড়লাম, ফেরত দেয়ার সময় কী বলব— ভাবতে ভাবতে লাগসই কথাটাই বললাম, দুর্দান্ত। আদতে তেমন কিছু মনে হয়নি।

ভারতের কর্ণাটকের বিভেক সামবাগ পুরোপুরি উল্টো। কথা বলে কম; যাও বলে, তা নিচু গলায়। ২০০০ সালে আমাদের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে ঢাকায় গিয়েছিল, সঙ্গে ছিলেন দুই মহীরুহ— মহাশ্বেতা দেবী ও মালায়াম লেখক আনন্দ। সে সময় মহাশ্বেতা দেবী তাকে ও আনন্দকে নিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের আজিমপুর কলোনির বাসায় গিয়েছিলেন।

শোনামাত্র বললাম, ‘বলো কী! মহাশ্বেতা দেবী যে দুটো দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইলিয়াস ভাইয়ের বাসায় আসর বসিয়েছিলেন, আমিও তখন ওখানে ছিলাম— পুরো সময় না যদিও। আনন্দ ছিলেন মনে আছে, তুমিও যে ছিলে একদম মনে করতে পারছি না। আরো লোকজন ছিল, সেজন্য হয়তো।’

বিভেক ইউনিলিভারে কাজ করত, শেষ পোস্টিং ছিল লন্ডনে। চাকরি ছেড়ে এখন পুরো সময় লেখালেখিতে আছে। তার ‘গাছোর গোছর’ উপন্যাসটির অনুবাদ ছেপেছে হারপার কলিন্স বছর চারেক আগে, গত বছর পেঙ্গুইনও করেছে। এ বছর আমেরিকায়ও বের হচ্ছে। নিম্নমধ্যবিত্ত একটা কানাড়া পরিবারকে নিয়ে মনকাড়া আখ্যান। রোগা-পাতলা বই, ১০০ পৃষ্ঠার কিছু বেশি হবে। এক বসায় শেষ করে রাতের দিকে মেইল করে অভিনন্দন জানালাম। বইয়ের কিছু বিষয়-আশয় নিয়েও সংক্ষেপে লিখলাম। মিনিট কয়েক পার না হতেই বিভেকের ফোন, ‘আমি কি আসতে পারি?’ রাত তখন প্রায় ১২টা, আয়ওয়া হাউজে যেখানে আমরা আছি, সেখানে সে থাকে না। তার থাকার জায়গা খানিকটা দূরে। বললাম, ‘কাল সকালে এসে পড়ো।’ মিসরের খালিদের বই পড়ে বলেছিলাম, দুর্দান্ত (ওয়ান্ডারফুল) আর বিভেককে অভিনন্দন (কংগ্রাচুলেশন)। দুটোর মধ্যে ফারাক আকাশপাতাল।

পরদিন বিভেকের সঙ্গে অনেক কথা হলো। তার বইয়ের কিছু কিছু অসামান্য বর্ণনার প্রশংসা করলাম। অনুবাদকের সঙ্গে কি একসঙ্গে দিনের পর দিন বসেছে?— জানতে চাইলে বলল, পাক্কা দেড় বছর ধরে বসেছে। মজার তথ্য দিল, অরুণাভ সিনহা তার বই বাংলায় অনুবাদ করছেন। মজার এজন্য, অরুণাভ বরাবর বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং তাকে বলা হয়ে থাকে অনুবাদের কারখানা। শংকর, সুনীল, মহাশ্বেতা— দেদার করে যান। একটা বই করতে দেড়-দুই মাস!

আয়ওয়াকে নিয়ে সুনীল গাঙ্গুলীর লেখা পড়ে অনেকেই মধ্য-পশ্চিম আমেরিকার মনোরম এ শহর, এর প্রাকৃতিক রূপমাধুর্য ও মানুষজনের কথা পড়ে মোহিত হয়েছেন। আয়ওয়ায় কবিতা ওড়ে— কথাটা মিথ্যা নয়। প্রতি সপ্তায় শহরের এখানে-ওখানে কবিতা পাঠের যেসব আয়োজন হয় আর সেসব অনুষ্ঠানে আক্ষরিক অর্থেই যে পিনপতন নীরবতায় নিথর শ্রোতারা কবিতা শোনেন, তা বিস্ময়কর। আমাদের একজন ড্রাইভার মার্ক কবি, একাধিক সংকলনও রয়েছে তার। আয়ওয়া রিভিউয়ের মতো পত্রিকায় তার কবিতা ছাপা হয়। অন্য একজন অ্যান্ডি স্প্যানিশ থেকে ইংরেজিতে কবিতা অনুবাদ করে, তবে যেকোনো স্প্যানিশ ভাষাভাষী কবির কবিতা নয়। কবিকে হতে হবে কোস্টারিকার, যেখানে অ্যান্ডির বাবার জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা। কথায় কথায় সে জানাল, ইদানীং কবিতা সহজ হয়ে যাচ্ছে— গলায় অস্ফুট আক্ষেপ। বলল, ‘আগে যখন কবিতা নিয়ে বসতাম, কত কিছু ভাবতে হতো; সময় লাগত প্রচুর। তবে শেষ করে ফেলে যে তৃপ্তি জুটত, এখনকার কবিতা তা দিতে পারে না। বড়ই সোজা-সরল, উপমা-ম্যাটাফোর বেশি বেশি ডাউন-টু-আর্থ।’

অ্যান্ডির কথার সমর্থন মিলল ফিনল্যান্ডের কবি হেনরিকা টাভির মুখে, তবে আক্ষেপের বদলে স্বস্তি কিংবা এক ধরনের মুক্তির আভাস তার গলায়। কবিতাকে তো মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে, বেশি বেশি মানুষের কাছে— মানুষই যদি না পড়ল, কী লাভ খামোখা নিজের জন্য পদ্য লিখে!

কথাটা যে আমার সমর্থনপুষ্ট নয়, তা সরাসরি না জানিয়ে জিগ্যেস করলাম— তার কবিতার পাঠক কত? প্রকাশক কত কপি ছাপে?

হেনরিকা একটু দমে গেল। ছোট একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘কবিতার এখন আকাল গোটা ইউরোপ-আমেরিকায়। লাতিন বা আফ্রিকান দেশগুলোর খবর বলতে পারব না। তোমাদের ওখানে কী অবস্থা?’

পাশ কাটাতে চাইছে বুঝে তার হাতে ধরা কবিতার বইটা কত বিক্রি হয়েছে— সোজাসাপ্টা জানতে চাইলে তাকে বিষণ্ন দেখাল। বলল, ‘ভালো না। ছেপেছিল শ পাঁচেক কপি... ’

হেনরিকাকে অপ্রস্তুত করার কোনো ইচ্ছা ছিল না, তবু আগের কথার রেশ টেনে না বলে পারলাম না, ‘তাহলে কী লাভ কবিতাকে বেশি বেশি সরল-সোজা করে? লেখ তো নিজেকে মুক্ত করতে। তবে হ্যাঁ, বেশি পাঠকের মধ্যে তোমার উপলব্ধি সঞ্চারিত হলে সেটা অবশ্যই বড় পাওনা। কে না চায় তার কবিতা বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছাক! তাই বলে অনুভূতির সূক্ষ্মতাকে তক্তা পিটিয়ে চওড়া-চ্যাপ্টা করতে হবে কেন?’

কথাগুলো যে মোটেও তার সায় পাচ্ছে না, হাবভাবে তা পরিষ্কার। বলল, ‘কমিউনিকেটিভ না হলে কবিতার মুক্তি নেই। এজন্য দেখছ না পারফর্মিং মিডিয়ামে কবিতা কতদূর এগিয়েছে! গতকাল দেখলে না নিউজিল্যান্ডের কর্টনি কেমন নেচে-গেয়ে তার কবিতা শোনাল। আসল কথা, কবিতাকে মুক্ত হতে হবে।’

হেনরিকা তার জায়গা ছেড়ে নড়বে না। শেষমেশ কি আর বলি, সেই পুরনো কথা বলতে হলো, ‘কবিতাকে রুদ্ধও হতে হয়—রুদ্ধ হয়েই তবে মুক্তি।’

আমাদের দলে মিয়ানমারের কোকো থেট্ একটা চরিত্র বটে। ৫০ ছুঁই-ছুঁই ছোটখাটো গড়নের কোকোকে দূর থেকে হেঁটে আসতে দেখলে শারীরিক যে বৈশিষ্ট্যটি প্রথমেই নজর টানবে, তা তার আজানু লম্বিত ইখতিয়ারউদ্দিন বখতিয়ার খিলজি-মার্কা হাত দুটো। কোকো মূলত কবি, দেশে স্বৈরশাসনের কোপানল এড়াতে ২০ বছরের ওপর কাটিয়েছে ইউরোপের নানা দেশে, প্রধানত ফিনল্যান্ডে। অং সান সু চি নির্বাচনে জেতার পর দেশে ফিরেছে। এখানে সে লুঙ্গি পরে ঘুরছে-ফিরছে, প্রায় সারাক্ষণই মত্ত অবস্থায় থাকে বলে কথাবার্তা কম বলে। তার কবিতা বেশ জটিল। নিজের কবিতা নিয়ে সে যা বলে, ‘দীর্ঘদিন দেশছাড়া হওয়ায় আমার ভাষায় নানা সংস্কৃতির মিশেল— খাপছাড়া, এলোমেলো, বল্গাহীন মিশেল বা ভেজাল। সেজন্য যা লিখি, তাকে কবিতা না বলে কোলাজ-টোলাজ বললে ধরতে সুবিধা হবে।’ কোকো ঢাকার বেঙ্গল লাইটসের খবরাখবর রাখে, তাদের পত্রিকায় নাকি লিখেওছে। দু-একজনের নাম বলল, বিশেষ করে খাদেমুল ইসলামের।

অফুরন্ত অবসর। রাইটিং প্রোগ্রামের নানা কর্মসূচি কিছু না কিছু প্রতিদিনই থাকে। বেছে বেছে কোনো কোনোটায় যোগ দেই। আমার একটা প্যানেল আলোচনা আগামী সপ্তায়, বিষয় : রাইটিং এ্যজ রিকোভারি। পরের সপ্তায় ইন্টারন্যাশনাল লিটারেচার টুডে শিরোনামে ক্লাস নেব, সাথি লেখকরা ছাড়াও আয়ওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ও গ্র্যাজুয়েট ছাত্ররা থাকবে।

১০-১২ মিনিট হাঁটা দূরত্বে একটা পুরনো বইয়ের দোকান বের করেছি। নাম হন্টেড বুকশপ। বেশ কয়েকটা দেশে পুরনো বইয়ের দোকান ঘাঁটতে গিয়ে দেখেছি, সব ক’টার চরিত্রে আশ্চর্য মিল। সবগুলোরই মালিক মহিলা— বয়স্ক, গোমড়ামুখো মহিলা। এক মনে উলের কাঁটা নাড়াচ্ছে হাতে, নয়তো বিভোর গাবদা বইয়ে। আর যা অবধারিত (অন্তত আমার অভিজ্ঞতায়), পায়ের কাছে লেজ বিছানো বিকট বিড়াল। হন্টেড বুকশপকে ব্যতিক্রমী বলতে হবে। পুরনো বাড়ি, চার-চারটা ফ্লোর নিয়ে বিশাল বইয়ের ভাণ্ডার। খুঁজতে সুবিধা হবে— সেভাবে লেখকের নামের শেষাংশের (লাস্ট নেম) আদ্যাক্ষর দিয়ে শেলেফর পর শেল্ফ সাজানো। কাউন্টারে যিনি, তিনি মহিলা বটে, তবে আমার দেখা তার সমগোত্রীয়াদের মতো নন। ইনি সুবেশ তরুণী (অনতি-তরুণী), আর হাতে উলের কাঁটা বা ওজনদার বইয়ের বদলে কিন্ডেল। দোকানে ক্রেতার আনাগোনায় পরিবেশও বেশ উষ্ণ, এ-দেয়ালে ও-দেয়ালে প্রচুর আলো। বইয়ের দাম মিটিয়ে খুচরা পকেটে ফেলে বইয়ের বোঁচকাটা তুলতে যাব, চোখ গেল তরুণী বা মহিলার চেয়ারের নিচে— বিড়াল বললে কম বলা হয়, মিশমিশে কালো প্রকাণ্ড হুলো। লাল, জ্বলজ্বলে চোখে কী খুঁজছে আমার চোখে? গত ঈদে একটা নভেলা লিখেছিলাম, সেখানে পিটার নামে এক মস্ত হুলো বিড়াল কী করে যেন পার্শ্বচরিত্র থেকে মূল চরিত্রের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছিল। সেটা ছিল ধবধবে সাদা। গায়ের রঙ পাল্টে এ সে না তো! মনে মনে বললাম, পিটার।