ভারতীয় এক তরুণ সাংবাদিক প্রতিবেদনে প্রকাশ করলেন, স্পিলবার্গের ই.টি সত্যজিতের চিত্রনাট্যের নকল।

প্রায় ৩৬ বছর আগে ১৯৮২ সালের এক বসন্তে সত্যজিৎ রায় একটি ফোনকল পেলেন বন্ধু, বিজ্ঞান লেখক আর্থার সি. ক্লার্কের কাছ থেকে। যদিও ক্লার্ক স্থায়ীভাবে শ্রীলংকায় বসবাস করেন, ওই সময়ে জুনের মাঝামাঝি তিনি লন্ডনে গিয়েছিলেন। সেখানেই স্টিভেন স্পিলবার্গের নতুন ছবিটি দেখেছেন, ই.টি.— দি এক্সট্রা টিরেস্ট্রিয়াল, তখনই ছবিটি নিয়ে ব্যাপক প্রশংসা শুরু হয়েছিল চারদিকে।

স্পিলবার্গের ছবিটি দেখার পর ক্লার্ক সত্যজিতের মধ্য-ষাটে লেখা চিত্রনাট্য দি এলিয়েন (বঙ্কুবাবুর বন্ধু) আর সদ্য দেখা নতুন ছবিটির মধ্যে যে আশ্চর্য মিল খুঁজে পেয়েছেন, এ কথা জানাতেই সত্যজিৎকে তিনি ফোন করেন। রায়ের চিত্রনাট্যে বাংলার একটি গ্রামে ভিনগ্রহের এক আগন্তুক হাজির হয়েছে, তার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে এক তরুণের।

ক্লার্কের নড়েচড়ে বসার আরো কারণ হলো, ১৯৬৭ সালে তার পরামর্শেই রায় চিত্রনাট্যটি হলিউডে পাঠিয়েছিলেন কোনো একটা স্টুডিওর সঙ্গে চলচ্চিত্রের জন্য চুক্তিবদ্ধ হওয়ার আশায়। এক পর্যায়ে কলাম্বিয়া পিকচার্স ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে যোগাযোগ করে রায়ের সঙ্গে এবং সম্ভাব্য ছবিতে সেই সময়ের হলিউডের দুজন নামকরা অভিনেতার নামও জানানো হয়। এদের একজন ছিলেন পিটার সেলারস, আর অন্যজন স্টিভ ম্যাকুইন; দুজনের মধ্যে যেকোনো একজনকেই বেছে নেয়া হবে রায়ের ছবির আমেরিকান চরিত্রটির জন্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে অনেক বছর সত্যজিতের এ ছবির প্রকল্প শেলফে পড়ে থাকে এবং একসময় বিস্মৃত হয়ে যায়; দি এলিয়েন আর চলচ্চিত্রে রূপ নেয়নি। ১৯৮৩ সালে সত্যজিৎ রায় ইন্ডিয়া টুডের সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে ক্লার্ক ও তার মধ্যকার টেলিফোন আলাপের বিস্তারিত প্রকাশ করেন। ওই সাক্ষাত্কারে রায় স্পষ্ট করেই বলেন, শুধু স্পিলবার্গের ই.টিই নয়, ক্লোজ এনকাউন্টার অব দ্য থার্ড কাইন্ড (১৯৭৭) আমার দি এলিয়েনের মেমোগ্রাফ কপি গোটা আমেরিকায় সহজলভ্য না হলে ছবি দুটো বানানো সম্ভব হতো না।’

অসীম চার্বা একজন লেখক ও চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজক, শশী কাপুরকে নিয়ে তিনি একটি পুস্তকও রচনা করেছেন। তিনি ২০১৭ সালের নভেম্বরে হিন্দুস্তান টাইমে একটি নিবন্ধও প্রকাশ করেন, ই.টি সত্যজিতের স্ক্রিপ্ট থেকেই কপি করা— এ সত্যটি তিনি যতবার ছবিটি দেখেছেন ততবারই উপলব্ধি করেছেন আর চোখের জলে বুক ভাসিয়েছেন। কিন্তু এরও আগে সেই ১৯৮৩ সালে তিনি যখন কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র, তখন রায় ও স্পিলবার্গের একজন অনুরাগী হিসেবে ওই সাক্ষাত্কার পাঠ শেষে তার তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। তারই ফলস্বরূপ তিনি বেশ কাঠখড় পুড়িয়ে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেন দি এলিয়েন আর ই.টি নিয়ে, যার কারণে বেশকিছু বিষয় সামনে চলে আসে।

সত্যজিতের সাক্ষাত্কারটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখের সামনে ভিনদেশী আগন্তুকের, সত্যজিতের করা স্কেচগুলো ভেসে ওঠে, ব্রিটিশ লেখিকা মারি সিটনের বই পোর্ট্রেট অব আ ডিরেক্টর: সত্যজিৎ রে  বইয়ে দেখা প্রাণীর সঙ্গে স্পিলবার্গের ক্লোজ এনকাউন্টার ছবিতে মাদারশিপ থেকে নেমে আসা ভিনগ্রহের প্রাণীর অপূর্ব মিল তিনি আবিষ্কার করলেন। 

উত্তেজনায় এ গল্প তিনি তখন তার কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককেও বলেন এবং একই সঙ্গে অসীম উপলব্ধি করলেন, তার আবিষ্কার প্রমাণ করতে হলে এর স্বপক্ষে তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে হবে। আর তা করতে গেলে প্রথমেই তাকে কথা বলতে হবে আর্থার সি. ক্লার্ক, রায় আর সম্ভব হলে স্পিলবার্গের সঙ্গে।

সে উদ্দেশ্যেই অসীম টাইপরাইটারে লেখা একটি চিঠি ক্লার্কের প্রকাশক বরাবর পাঠালেন। আরেকটা চিঠি— বেশকিছু প্রশ্নসংবলিত— পাঠালেন রায়ের কাছে। তার চিঠি রায়ের কলকাতার বাসায় পৌঁছে নিউইয়র্কে ভারতীয় কনস্যুলেট মারফত। আর ওই সময়েই অসীম স্পিলবার্গকে তার বাসার ফোনে ধরার চেষ্টা করলেন বেশ কয়েকবার কিন্তু ব্যর্থ হলেন।

অসীম যখন রায় ও ক্লার্ককে চিঠি পাঠিয়ে ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করছেন কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে, তখন তার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধু রায়ের দি এলিয়েনের স্ক্রিপ্টের একটি কপি হাজির করে তাকে চমকে দিল। তার বন্ধুটি মুম্বাইয়ে মার্চেন্ট আইভরি প্রডাকশন হাউজে কিছুদিন ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করেছিলেন, সে সময়েই রায়ের দি এলিয়েনের চিত্রনাট্যটি তিনি খুঁজে পান (রায়ের সঙ্গে ইসমাইল মার্চেন্ট ও জেমস আইভরির বেশ সখ্য ছিল। তাদের প্রযোজিত হাউজহোল্ডার, যার হিন্দি নাম ছিল ঘরেবাইরে, সত্যজিৎ তাতে সম্পাদনায় যুক্ত ছিলেন, যদিও ছবিতে তা অনুল্লিখিত থেকেছে)। বন্ধুটি তার স্ক্রিপ্ট একদিনের জন্য ধার নিয়ে আর ফেরত দেয়নি।

ওই চিত্রনাট্য পড়তে গিয়েই অসীম গভীরভাবে উপলব্ধি করেন, ক্লার্ক ঠিকই ধরেছিলেন, ই.টি আর রায়ের দি এলিয়েনের মধ্যে প্রভূত মিল রয়েছে।

রায়ই প্রথম ভিনগ্রহবাসীদের ধীরগতির তিন আঙুলের কথা বলেছেন, ই.টির ভিনগ্রহের অতিথিও ধীরগতির, তিন আঙুলের জায়গায় তার আঙুল চারটি। রায়ের ভিনগ্রহের অতিথিরও যেমন আরোগ্য করার ক্ষমতা ছিল, ই.টিরও তা-ই। দুজনই গাছে ফুল ফোটাতে পারত। এ রকম আরো অনেক সাদৃশ্য আছে দুজনের কাজের মধ্যে।&dquote;&dquote;

কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পরও চিঠির কোনো উত্তর না পেয়ে অসীম পরবর্তী যে পদক্ষেপ নিলেন তা হলো, স্থানীয় এটিঅ্যান্ডটি অপারেটরের সহযোগিতায় তিনি ফোন কোম্পানির আন্তর্জাতিক ডেস্কের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হলেন। তাদের কাছে তিনি শ্রীলংকায় কলম্বোয় ক্লার্কের বাসার ফোন নাম্বার পেয়ে গেলেন।

ক্লার্কের সঙ্গে অসীমের যোগাযোগ হলো, কথা হলো। ক্লার্ক বন্ধুবৎসল, তার সব প্রশ্নের জবাব দিলেন তিনি: “আমি সত্যজিৎকে বলেছিলাম সে যেন স্পিলবার্গকে ভদ্রভাবে লেখে যে, ‘দেখো, প্রচুর মিল রয়েছে এখানে।’ সে যেন তাকে সরাসরি অভিযুক্ত না করে অথবা কোনো রকম হুমকিতে না গিয়ে কথাটা বলে।”

তারপর অসীম যোগাযোগ করেন মারি সিটনের সঙ্গেও, আবার ওই আন্তর্জাতিক টেলিফোন কোম্পানিই যোগাযোগ ঘটিয়ে দিল। তার মনে আছে আসল মারি সিটনকে খুঁজে পাওয়ার আগে আরো পাঁচজন মারি সিটনকে খুঁজে পেয়েছিলেন লন্ডনে। বেশ কয়েকবারের চেষ্টায় বয়োবৃদ্ধ মহিলাকে পাওয়া গেল, আলাপের পর তিনি তাকে সত্যজিতের টেলিফোন নাম্বারও সরবরাহ করলেন। এবং বলে দিলেন, তিনি যেন ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে তাকে ফোন করেন। ওই সময়টায় সত্যজিৎ ঘণ্টাখানেকের জন্য তার টেবিলে বসেন।

নিউইয়র্কের ডরমিটরির ঘর থেকে সত্যজিৎকে ফোন করলেন অসীম। সত্যজিৎ নিজেই ফোন ধরলেন, জানালেন তিনি তার চিঠি পেয়েছেন এবং উত্তর লিখছেন। কিন্তু অসীম জানালেন, তিনি ই.টি নিয়ে এখনই আলাপ করতে চান। সত্যজিৎ রাজি হলেন এবং ওই আলাপে তিনি অসীমকে জানান, কলকাতার একজন উকিলের সঙ্গে তিনি স্পিলবার্গের বিরুদ্ধে নকলের দায়ে মামলা করা যায় কিনা, সে বিষয়ে কথা বলেছেন। সত্যজিৎ তখন এটাও বলেন, কলাম্বিয়া পিকচার্স ‘আমার স্ক্রিপ্টের ডজন ডজন কপি ছড়িয়ে দিয়েছে।’

তবে ওই একই আলাপে সত্যজিৎ স্বীকার করেন, ‘সে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনগুলো সেরেছে, কাজেই তার বিরুদ্ধে মামলা করে কোনো ফল হবে না। এ অভিযোগের কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়া আসলে সম্ভব না।’ সত্যজিতের কণ্ঠে হতাশা ছিল— ‘মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার কিছু একটা করা উচিত, কিন্তু এখানে আমি আমার ছবির মাঝখানে (ওই সময়ে সত্যজিৎ ঘরেবাইরে তৈরি করছিলেন),’ অসীমকে তিনি বলেন, ‘শুধু যোগাযোগ করে কিছু করতে পারব না। ও (স্পিলবার্গ) স্বীকার করবে না। ও যে ক্ষতিটা করেছে, আমার ছবি বানানোর সম্ভাবনাটা শেষ করে দিয়েছে, কারণ এখন আমি ছবিটা বানালে লোকজন বলবে আমি স্পিলবার্গ থেকে নিয়েছি।’

সত্যজিৎ রায় এ কথাও যোগ করেন, ‘বৈরী’ কোনো মনোভাব নেই তার স্পিলবার্গের প্রতি— ‘ও একটা ভালো ছবি তৈরি করেছে, ও একজন ভালো পরিচালক।’

অসীম এরপর বোমাটা ফাটান। তিনি রায় ও ক্লার্কের কথা উদ্ধৃত করে কলাম্বিয়া নিউজ সার্ভিসের মাধ্যমে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করলেন, সে সময়ে বেশকিছু পত্রিকায় তার এ প্রতিবেদন ছাপা হলো। তবে একই সঙ্গে প্রতিবেদনটি অসীম লিখেছিলেন তার সাংবাদিকতা কোর্সের অংশ হিসেবেও। ছাপা হওয়া এ প্রতিবেদন অতিরিক্ত আগ্রহ তৈরি করল তখন, অবশ্য এর পেছনে আরো একটা কারণ ছিল। ওই একই সময়ে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্য লড়ছিল ই.টি আর গান্ধী। তুলনামূলকভাবে গান্ধীই এগিয়ে ছিল। কিন্তু কিছু প্রতিবেদকের মনে হলো, অসীম গান্ধীকে বিজয়ী করতেই এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন এবং অসীমের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস তখন তিনটা ফলোআপ স্টোরি প্রকাশ করল। নিউইয়র্ক টাইমস এমনকি নাম উল্লেখ না করে স্পিলবার্গের কার্যালয়ের এক মুখপাত্রের বরাতে এ সংবাদও ছাপল যে, রায়ের অভিযোগে পরিচালক মর্মাহত হয়েছেন।

তবে অসীম মনে করেন না, তার প্রতিবেদন সেদিন অস্কারে কোনো পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল। যদিও গান্ধী জিতে নেয় আটটি অস্কার (১৯৮৩), ই.টি জেতে চারটি; তার বেশির ভাগই ছিল প্রযুক্তি ক্যাটাগরিতে, আর জন উইলিয়ামের সংগীতের জন্য।

সত্যজিৎ রায়কেও অসীম তার প্রতিবেদনের ছাপা কপি পাঠিয়েছিলেন। সত্যজিৎ অপ্রসন্ন হয়েছিলেন। তিনি এ প্রচারণা চাননি।

স্পিলবার্গ কখনই প্রকাশ্যে অসীমের প্রতিবেদনের ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি, কিন্তু রায়ের প্রতি তিনি কখনো অসূয়া প্রকাশ করেননি। বরং স্পিলবার্গ, মার্টিন স্করসেস ও মার্চেন্ট আইভরির দল সত্যজিতের সম্মানসূচক অস্কার (১৯৯২) পাওয়ার পেছনে জোরালো সমর্থন জুগিয়েছিলেন।