সত্যজিৎ রায়কে ছেলেবেলার অনেকটা সময় একলা কাটাতে হয়েছে। মাত্র আড়াই বছর বয়সে তার পিতৃবিয়োগের পর তার মা সুপ্রভা রায় তাকে ছয় বছর পর্যন্ত বাড়িতেই নানা বিষয় পড়িয়েছেন। নিজের স্মৃতিকথায় সত্যজিৎ বলেছেন, দিনের অনেকটা সময় তার কাটত বই পড়ে ও আত্মীয়দের কাছে গল্প শুনে। এসব গল্পের বইয়ের মধ্যে বেশিটাই ছিল ইংরেজি, যার মধ্যে জুল ভার্ন ও আর্থার কোনান ডয়েল বিশেষ উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে তিনি পড়েছেন ঠাকুরদা উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর অনবদ্য স্বাদু ভাষায় অনূদিত বিদেশী রূপকথা ও ভারতীয় উপকথার নানা গল্প। বিশেষ করে মায়ের কাছে তিনি শুনতে ভালোবাসতেন কোনান ডয়েলের ‘ব্রাজিলিয়ান ক্যাট’ ও ‘ব্লু জন গ্যাপ’ গল্প দুটি। এ গল্প দুটি তাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল, যার দরুন তিনি ভবিষ্যতে এ গল্প দুটি অনুবাদও করেছিলেন। তার ‘ধনদাদু’ কুলদারঞ্জন রায় তাকে শোনাতেন মহাভারত ও পুরাণের গল্প, যেখানে অলৌকিকতা ও ফ্যান্টাসির রাজত্ব। বালক সত্যজিৎ মুগ্ধ বিস্ময়ে বারবার শুনতে চাইতেন মহাভারতে জয়দ্রথ বধের গল্প। ততদিনে তার পড়ার অভ্যাসের মধ্যে ঢুকে পড়েছে বাবা সুকুমার রায়ের ফ্যান্টাসিভিত্তিক কাহিনীগুলো, যার মধ্যে তার অন্যতম প্রিয় ছিল ‘হেঁশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি’। এ কাল্পনিক চরিত্রটিকে নিয়ে সুকুমার তৈরি করেছিলেন কোনান ডয়েলের ‘লস্ট ওয়ার্ল্ড’-এর দুর্দান্ত প্যারোডি। ছোট কাকা সুবিমল রায় তাকে শোনাতেন ভূতের গল্প। সত্যজিতের লেখা থেকে জানতে পারি, সন্দেশ ছাড়া রামধনু পত্রিকাও তার পছন্দের তালিকায় ছিল। মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের সৃষ্টি জাপানি গোয়েন্দা হুকাকাশির দুটি গল্প ‘পদ্মরাগ’ ও ‘ঘোষ চৌধুরীর ঘড়ি’ তার বিশেষভাবে ভালো লেগেছিল।

বালক সত্যজিতের বই পড়ার মধ্যে একটি প্রধান বিষয় ছিল রূপকথা। রূপকথার ভয়ের ও অলৌকিক জগৎ তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। ব্রিটিশ সমালোচক Eric Rhodes-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ জানিয়েছেন, ‘...we were exposed to English tales, the foreign fairy tales like Red Riding Hood. We read Alice in Wonderland, we read Edward Lear in my school days. Now of course, I have translated many of them, but those things were part of our daily life...side by side with the Bengali folk tales and fairy tales which my grandfather had written. And one of my aunts (সুখলতা রাও) who was a wonderful writer for children adapted all the English fairy tales. There is a Bengali Rumplestiltskin ... those are extremely convincing, transplanted completely. She was very gifted. So we have read the English version, we read the Bengali version, and it went simultaneously.”

এসব ইতস্তত বর্ণনা থেকে আমরা বুঝে নিতে পারি, বালক থেকে কিশোর বয়স পর্যন্ত সত্যজিতের মানসলোক জারিত হয়েছিল বিভিন্ন দেশী-বিদেশী কাল্পনিক ও ফ্যান্টাসি গল্পের মধ্য দিয়ে। অজানা ও অলৌকিকের প্রতি তার আকর্ষণ ও বিস্ময়বোধের ভিত্তি সম্ভবত এ সময়েই তৈরি হয়েছিল। বড় হয়ে যখন তিনি চলচ্চিত্রজগতে এলেন, সেখানেও এই কিশোর বয়সের কল্পনাপ্রবণ মন যেখানেই সুযোগ এসেছে, সেখানেই তার ফ্যান্টাসির জগৎ প্রভাব বিস্তার করেছে।

সত্যজিতের ছবিতে প্রথম ফ্যান্টাসির ছোঁয়া আমরা পাই ‘পরশপাথর’ ছবিতে। ছবির প্রধান চরিত্র পরেশবাবু কার্জন পার্কে একটি পরশপাথর কুড়িয়ে পাওয়ার পর সব লোহার জিনিস মুহূর্তের মধ্যে সোনায় রূপান্তরিত হওয়ার দৃশ্যগুলো সত্যজিৎ অসাধারণ মুন্সিয়ানার সঙ্গে তুলে ধরেন। তার কল্পনায় সোনা ফলানোর মন্ত্র হয়ে যায় তার বাবার লেখা ননসেন্স কবিতা ‘হলদে সবুজ ওরাং ওটাং’। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, পরশুরামের মতো সত্যজিতও পরেশবাবুকে একটি নির্লোভ নিম্নমধ্যবিত্ত চরিত্র হিসেবেই দেখিয়েছেন, যিনি অতুল ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়েও নিজের জন্য শুধু একটি সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কিনেছেন। ভেতরে ভেতরে উনি একজন ছাপোষা মধ্যবিত্ত কেরানি থেকে গেছেন, যিনি এ কুবেরের ঐশ্বর্য নিয়ে হাঁপিয়ে ওঠেন এবং শেষকালে পরশপাথরটি নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।

একজন সফল চিত্রতারকার মনোজগতের টানাপড়েনের বিচিত্র এক প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই ‘নায়ক’ ছবিতে দিল্লিগামী ট্রেনে ভ্রমণরত অরিন্দমের স্বপ্নের মধ্যে। স্বপ্নের মধ্যে অরিন্দমের বেড়ে ওঠা, তার পাড়ার ক্লাবের থিয়েটার, তার সাফল্য, তার ভয়, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সব মিলেমিশে একাকার হয়ে দেখা দেয়। আমরা দেখতে পাই টাকার চোরাবালির মধ্যে সে তলিয়ে যাচ্ছে। চারপাশ থেকে তাকে ঘিরে ধরেছে কঙ্কালের হাতে ধরা টেলিফোনের ধাতব আওয়াজ। অরিন্দমের দ্বিতীয় স্বপ্নে আমরা তার ব্যক্তিজীবনের নানা সম্পর্কের জটিলতার এক প্রতিফলন দেখতে পাই।

সত্যজিতের কল্পনা ও ফ্যান্টাসি-চিন্তার অন্যতম সেরা নিদর্শন দ্বিধাহীনভাবে ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’। এখানে সত্যজিৎ মূল গল্পটিকে অনেকটাই উল্টেপাল্টে নিয়েছেন। কিন্তু পাল্টালেও তার মধ্যে কিশোর বয়েসের সারল্য, বিস্ময়বোধ ও নীতিবোধের এক সামঞ্জস্য বজায় রেখেছেন। বলা চলে, চরিত্রগুলোকে যেন গল্পের চেয়ে আরো যুগোপযোগী, আরো কাছের করে গড়ে তুলেছেন। বাঘা এখানে বেশ হিসাবি ও প্র্যাকটিক্যাল— খাওয়ার আগে নিয়ম করে হাত ধোয় এবং ভূতের বরগুলো বেশ স্বাভাবিকভাবেই উপভোগ করে। রাজপ্রাসাদের আতিথেয়তায় তার প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়— ‘বাঃ ব্যবস্থা ভালোই।’ ভালো রাজার ছেলেমানুষি ও দুষ্টু রাজার ক্রূরতা এ দুদিকই সত্যজিৎ তাদের সংলাপ, বেশভূষা ও সংগীতপ্রিয়তার মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন। এ ছবিতে উদ্ভট ও আজগুবি জগতের সেরা উদাহরণ বোধহয় ৭ মিনিটব্যাপী ভূতের নাচ। এ বিষয়ে তিনি নিজে বলেছেন, এক্ষেত্রে তার কোনো পূর্বসূরি ছিল না, তাই পুরো জিনিসটাই তাকে মাথা খাটিয়ে ভেবে বের করতে হয়েছে। তাঁর মনে হয়েছিল, বাংলাদেশে ভূতদের নিয়ে যে প্রচলিত ধারণা আছে— মুলোর মতো দাঁত, কুলোর মতো পিঠ— সেটা দিয়ে খুব বেশি কিছু করা যাবে না। সেজন্য সত্যজিৎ যুক্তি দিয়েছিলেন, বাংলাদেশে ইংরেজ রাজত্বকালের ২০০ বছরে যারা মারা গেছে, তাদেরই প্রতিনিধিদের ভূত হিসেবে রাখবেন। সেইমতো ভূতদের তিনি চার শ্রেণীভুক্ত করেছেন— রাজা, চাষা, পুরুত-পাদ্রি ও সাহেব। তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে চার ধরনের বাদ্যযন্ত্র দিয়ে। সাজপোশাকের ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের উপাদান সত্যজিৎ ব্যবহার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, জাদুকর বরফির টুপির আইডিয়া তিনি নিয়েছিলেন পিকিং অপেরা থেকে। ভূতের রাজার চেহারা তৈরি করা হয়েছিল ব্রহ্মদৈত্যের আদলে। আর এ তথ্য তো অনেকেরই জানা, স্বয়ং সত্যজিৎ টেপরেকর্ডারের স্পিড বাড়িয়ে সৃষ্টি করেছিলেন ভূতের রাজার কণ্ঠস্বর। শেষকালে যুদ্ধবিরোধী এ ছবি কিন্তু আমাদের শিক্ষা দিয়ে যায়, মানুষ যেন কূপমণ্ডূক না হয়, যার জন্য গুপী বাঘা যেখানে খুশি যাওয়ার বর চেয়ে নেয়। তারা নিজেদের গ্রামে ফিরে না গিয়ে মন তাজা রাখার জন্য ভূতের রাজার জাদু জুতো পায়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ে দেশভ্রমণে।

গুপী গাইনের প্রসঙ্গ উঠলে ‘হীরক রাজার দেশে’র কথা আসতে বাধ্য। হীরক রাজায় সত্যজিৎ রূপকথার মোড়কে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার শোষণের আসল চেহারাটা দেখাতে চেয়েছেন। এখানে পরিচালক রূপকের সাহায্যে দেখিয়েছেন, কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র সমস্ত প্রজার মগজধোলাইয়ের সাহায্যে বশ করে রেখে দেয়। তবে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের সাহায্যে রাষ্ট্রীয় অভ্যুত্থানের যে ছবি তিনি দেখিয়েছেন, তা যেন কিছু জায়গায় অতিসরলীকরণ বলে মনে হয়। অবশ্য এটি একেবারেই আমার নিজস্ব অভিমত।&dquote;&dquote;

আমরা আবারো সত্যজিতের কল্পবিশ্বের অংশীদার হই তার ‘সোনার কেল্লা’ ছবিতে। ছবিটি মূলত একটি ক্রাইম থ্রিলার হলেও আমাদের একটি বালকের কল্পনারাজ্যের অংশীদার করে তোলে। ছবিটি যেন সেই বালকটির কল্পলোকে যাত্রার গল্প বলে। মুকুলের সোনার কেল্লা খুঁজতে গিয়ে ফেলুদার সঙ্গে কখন যেন আমরাও একাত্ম হয়ে যাই। লক্ষণীয় বিষয়, পরিচালক সোনার কেল্লাকে পর্দায় আনেন ছবির একেবারে শেষের দিকে, যাতে ছবির আগাগোড়া দর্শকের কল্পনা ও কৌতূহল বজায় থাকে। ছবির শেষে যখন মুকুল সত্যিকারের সোনার কেল্লায় আসে, তখন তার কান্নার সঙ্গে সঙ্গে কল্পনারও ইতি ঘটে। সে আবার বাস্তব জগতে ফিরে আসে, কলকাতায় নিজের বাড়িতে ফিরতে চায়।

ফেলুদার দুই নম্বর ছবি ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এও আমরা আগাগোড়া রুকুর কল্পনারাজ্যের শরীক হই। ছবির শুরুই হচ্ছে বালকটির মুখে কাল্পনিক চরিত্রদের বর্ণনা দিয়ে— টিনটিন, অরণ্যদেব, টারজান, হিজিবিজবিজ— এরা সবাই রুকুর কাছে দুগ্গাঠাকুরের মতোই সত্যি, সবাই জ্যান্ত। তাই সে ক্যাপটেন স্পার্কের মতো ছাতের কার্নিশে বন্দুক হাতে হেঁটে বেড়ায়। ওই কল্পনারাজ্যের প্রধান প্রশ্রয়দাতা হচ্ছে তার ঠাকুরদা, যিনি নাতির সঙ্গে পরামর্শ করে পারিবারিক গণেশ মূর্তি (যদিও নকল) জটায়ুর ‘করাল কুম্ভীর’ গল্পের আদলে চিউইং গাম দিয়ে সিংহের মূর্তির মুখে লুকিয়ে রাখেন। দাদু তাকে বলেন মূর্তিটা বিসর্জনের আগে বের করে নিতে, নাহলে সেটা আবার সমুদ্রের তলায় সেই আটলান্টিসে চলে যাবে। গোটা ছবিতে বাস্তবতা, হেঁয়ালি আর ছোটদের কল্পনারাজ্যকে এত মসৃণভাবে বুনে দেয়া হয়েছে, ছবি দেখতে দেখতে সব বয়সের দর্শকরাই ভীষণভাবে উপভোগ করেন। ফেলুদার দুই ছবিতেই সুকুমারের লেখা ফিরে ফিরে আসে। জটায়ুর মুখে ‘২৬ ইঞ্চি’, ফেলুদার শাসানিতে ‘৩ মাস জেল আর ৭ দিনের ফাঁসি’, রাত্তিরের বেনারসের গলিতে ফেলুদার ‘বাদুড় বলে ওরে ও ভাই সজারু’, ‘অলিগলি চলিরাম’ উদ্ধৃতিগুলো একটি নিরবচ্ছিন্ন সরসতার ধারা তৈরি করে যায়।

সত্যজিতের ফ্যান্টাসিধর্মী ছবির মধ্যে একটি অনন্যসাধারণ সংযোজন হতে পারত ‘দি এলিয়েন’ ছবিটি। চিত্রনাট্যটি লেখা হয়েছিল ১৯৬৭-তে, যার মূল ভিত্তি ছিল তারই লেখা ছোটগল্প ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’। যারা চিত্রনাট্যটি পড়েননি, তাদের জন্য সংক্ষেপে গল্পটি হলো এই— একটি অজপাড়াগাঁয়ে মাঝরাত্রে একটি বিকল মহাকাশযান হঠাৎ একটি পদ্মপুকুরে এসে পড়ে। তার মধ্যে রয়েছে একটিমাত্র এলিয়েন প্রাণী, সে নিজেও কিছুটা বিকল। পরদিন সূর্যের আলোয় সে আবার সজীব হয়ে ওঠে। এরপর সে রাত্রিবেলায় মাঝে মাঝে বেরোয় এবং তাকে ঘিরে গ্রামের মানুষের নানা রকম প্রতিক্রিয়া ঘিরে গল্প জমে ওঠে। গ্রামে এরপর নানা রকম অলৌকিক কাণ্ডকারখানা ঘটতে থাকে। কখনো অকালেই মাঠ ফসলে ভরে ওঠে, কখনো বা মরা মানুষ চিতায় উঠে বসে। এ গ্রামে চাষাভুষো ছাড়াও একজন মাড়োয়ারি ব্যবসাদার আছেন, একজন আমেরিকান সাহেব আছেন, যিনি সেই খরাপ্রবণ এলাকায় খননের কাজ করতে এসেছেন, এক সাংবাদিক ও তার স্ত্রী আছেন। এদিকে পুকুরে ডুবে থাকা মহাকাশযানটির সোনালি রঙের উপরের অংশটি বেরিয়ে থাকতে দেখে গ্রামবাসী সেটিকে মন্দিরের চূড়া ভেবে বসে, আর এ মওকায় ব্যবসাদার মতলব করেন, আমেরিকান সাহেবের সাহায্যে তিরি মাটি খুঁড়ে আবার মন্দিরটিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে নাম করবেন। একমাত্র সাংবাদিকের মনে সন্দেহ হয়, তিনি আমেরিকানকে গিয়ে তার সন্দেহের কথা জানান। সাহেব প্রথমে তাকে হেসে উড়িয়ে দিলেও শেষে নিজেরও সন্দেহ হয়। ছবির ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যে সাহেব বন্দুক নিয়ে এলিয়েনের মোকাবেলা করতে যান, কিন্তু এলিয়েন সবাইকে বোকা বানিয়ে আবার আকাশে মিলিয়ে যায়। এলিয়েন প্রাণীটি পৃথিবী থেকে কিছু প্রাকৃতিক নমুনা সংগ্রহ করতে এসেছিল। কিছু ফুল, পাতা, পাখি, ইত্যাদি সংগ্রহ করার মাঝে হাবা নামের একটি গরিব অনাথ ছেলের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়, তাকেও সে সঙ্গে করে নিয়ে যায়।

নানা মজাদার সব ঘটনায় ভরা এ চিত্রনাট্য থেকে ছবি করতে হলিউডের কলম্বিয়া কোম্পানি অত্যন্ত আগ্রহী ছিল। কিন্তু ছবিটির প্রযোজনার ব্যপারে যিনি মধ্যস্থতা করছিলেন, তার কিছু গণ্ডগোলের কারণে শেষ পর্যন্ত ছবিটি হয়নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চিত্রনাট্য থেকে সত্যজিতের ভাষায় ‘চার আনা, পাঁচ আনা, দশ আনা করে আইডিয়া দুটি ছবিতে লেগে গেছে’— ছবি দুটি হল স্টিভেন স্পিলবার্গের Close Encounters of The Third Kind I E.T.। অল ইন্ডিয়া রেডিওকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ আক্ষেপ করেছিলেন, ‘এখন এমন অবস্থা যে আমার এলিয়েন আর করা সম্ভব নয়, করলে বলবে যে আমি ওর থেকে নিয়েছি। অথচ ব্যাপারটা আসলে উল্টো।’ স্পিলবার্গ অবশ্য পুরো ব্যাপারটি বেমালুম অস্বীকার করেন আর সত্যজিৎও এ নিয়ে আর বিতর্ক বাড়াতে চাননি। সত্যজিতের বন্ধু ও বিশ্ববিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক আর্থার সি ক্লার্ক এ বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘artists have better things to do with their time.’ সত্যজিতের চিত্রনাট্যে টেকনিক্যাল চমকের চেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়েছিল এলিয়েন ও পৃথিবীর অধিবাসীদের মধ্যে সম্পর্কের ওপর। বাইরের গ্রহের একটি প্রাণী অজপাড়াগাঁয়ের অধিবাসীদের মধ্যে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে ও গ্রহান্তরের প্রাণীমাত্রই যে মানবশত্রু নয়, এটা দেখানোই সত্যজিতের মূল উদ্দেশ্য ছিল। নিঃসন্দেহে ছবিটি তৈরি হলে তা সত্যজিতের কল্পবিজ্ঞান চেতনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকত।

এছাড়া বিক্ষিপ্তভাবে সত্যজিতের কল্পমানসের রাজ্যে আমরা প্রবেশ করি ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছবিতে সিদ্ধার্থের স্বপ্নের মধ্য দিয়ে। সেখানে একটি স্কুলছাত্রীর ড্রাইভারকে গণপিটুনি, নার্সবেশী দেহোপজীবী, সিদ্ধার্থর ভাই, বোন, অবচেতনে থাকা পাড়ার মেয়েটি, ছেলেবেলায় শোনা পাখির ডাক ও মুরগি জবাইয়ের নৃশংসতার স্মৃতি সব একাকার হয়ে যায়। তবে তুলনামূলকভাবে ছোটদের ছবিতেই সত্যজিতের কল্পনালোকের অধিক পরিচয় আমরা পাই, যেখানে তার পাত্রপাত্রীদের তিনি নিজস্ব মূল্যবোধের ছাঁচে গড়ে তুলেছেন। তার কল্পনারাজ্যের দুষ্টু লোকেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সিরিওকমিক ধরনের, আর শেষে নায়কের হাতে তারা উচিত শাস্তি পায়। এ ব্যাপারে তার নীতিবোধ খুবই প্রবল। গুণ্ডা দিয়ে নিরীহ লোককে খুন করা, টাকার জন্য দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করা, বয়স্ক প্রফেসরকে খুন করার চেষ্টা, দেশের প্রজাদের অনাহারে রাখা, রাজ্যে রাজ্যে যুদ্ধ বাধানো, দেশে একনায়কতন্ত্র চালানো— এসবের বিরুদ্ধেই তিনি সোচ্চারভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন তার কল্পনাশক্তি ও ক্যামেরাকে হাতিয়ার করে।

শিশুদের কল্পনাকে তিনি বরাবর প্রশ্রয় দিয়ে এসেছেন। বস্তুত তার সবচেয়ে বেশি প্রমাণ পাওয়া যাবে তার সাহিত্যকীর্তির মধ্যে। সদানন্দের খুদে জগতের আনন্দ ও টিপুর রূপকথার বই পড়ার মধ্যে তার স্পষ্ট চিহ্ন দেখতে পাই। সত্যজিৎ বারবার বলেছেন, তিনি বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা উড়িয়ে দেয়ায় বিশ্বাসী নন, এ ব্যাপারে তিনি মনটাকে খোলা রাখতে চান। যেজন্য জাতিস্মরের মতো বিষয় নিয়ে ছবি করেছেন বলে সমালোচনা সত্ত্বেও আমরা কিন্তু ছবিটিকে একটি নির্ভেজাল গোয়েন্দা কাহিনী হিসেবেই উপভোগ করি। সত্যজিতের নিজস্ব বিশ্বাস ছিল, বিজ্ঞান একদিন অগ্রসর হয়ে এ ধরনের ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারবে। তাই বলে বিজ্ঞান যেন আমাদের মনে আরেকটি dogma না হয়ে যায়। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য স্মর্তব্য। তিনি বলছেন, ‘যে বিষয় প্রমাণও করা যায় না, অপ্রমাণও করা যায় না, সে সম্বন্ধে মন খোলা রাখাই উচিত। যেকোনো একদিকে ঝুঁকে পড়াটা গোঁড়ামি।’

সত্যজিৎকে শ্রদ্ধা জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায় তার ছবিগুলোকে বারবার ফিরে দেখা। তাদের পুনরাবিষ্কারের মধ্য দিয়ে আজও আমরা নিজেদের জীবনবোধকে উন্নত করার রসদ খুঁজে পাই। তাই যতদিন শৈশবের বিস্ময়বোধ ও কল্পনা জাগ্রত থাকবে, ততদিন সত্যজিৎ তার ছবি ও লেখা নিয়ে বাঙালির কল্পবিশ্বের চিরকালীন বাসিন্দা থেকে যাবেন।