আর্থার সি. ক্লার্ক

ভাষান্তর: আবুল বাসার

ষাটের দশকের শুরুর দিকে একটি সায়েন্স ফিকশন মুভি বানানোর আগ্রহ জানিয়ে ক্লার্কের কাছে চিঠি লিখেছিলেন সত্যজিৎ রায়। এরপর ১৯৬৪ সালে তিনি ক্লার্কের সঙ্গী মাইক উইলসনের সঙ্গে সরাসরি দেখা করেন। এ ঘটনার মাত্র কয়েক দিন আগেই একটি সফল সিংহলিজ চলচ্চিত্রের কাজ শেষ করেছিলেন মাইক, যার নাম ‘রান মুথু দুয়া’ (মুক্তা আর সোনার দ্বীপ)। এ রচনায় সত্যজিৎ আর স্ট্যানলির ঘনিষ্ঠতার কথা উল্লেখ করেছেন আর্থার সি. ক্লার্ক।

 

‘২০০১: আ স্পেস ওডেসি’ নিয়ে আমি যখন স্ট্যানলি কুবরিকের সঙ্গে কাজ করছিলাম, ঠিক সে সময় মাইক উইলসন এবং সত্যজিৎ রায় ‘দি এলিয়েন’-এর চিত্রনাট্য ঠিকঠাক করছিলেন। ভিনগ্রহের ছোট্ট এক বাসিন্দাকে নিয়ে একটি স্পেসশিপ ভারতের এক প্রত্যন্ত গ্রামে অবতরণ করা নিয়ে দি এলিয়েনের কাহিনীটি ছিল চমত্কার। ব্যতিক্রমী বিক্রয়কুশলতার দক্ষতায় মাইক সত্যজিৎকে হলিউডে নিয়ে গিয়ে পিটার সেলার্সের সঙ্গে চুক্তি করিয়ে দিলেন, মার্লোন ব্রান্ডোকে বাদ দিলেন এবং এরপর কলাম্বিয়ার সঙ্গে চুক্তি করলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে সবকিছু দ্রুতগতিতে সমাধান হয়ে গেলেও দি এলিয়েন হয়ে রইল ‘হয়তো সেরা হতে পারত’ চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম (অনেকটা চার্লস লটনের আই, ক্লডিয়াস, অবশ্য কিছু ছোট পরিসরে)।

এই সময়ে (১৯৬৫ সালের দিকে) লন্ডনের উত্তরে বোরহামউডে এমজিএম স্টুডিও দেখতে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ। সেখানে তাকে স্ট্যানলি কুবরিকের সঙ্গে এবং একইভাবে রোমান পোলানস্কির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। সে সময় পোলানস্কি তার ‘ভ্যাম্পায়ার’ নিয়ে মুভি বানাচ্ছিল (এই মুভিটি আমি কখনো দেখিনি। তবে আমার বিশ্বাস, এতে একটা দরকারি তথ্য আছে: ভ্যাম্পায়ার যদি ইহুদি হয়, তাহলে তাকে ক্রুশবিদ্ধ করে কোনো লাভ নেই)।

২০০১ ছবির সেটের কাছে খুব কমসংখ্যক মানুষকেই আসার অনুমতি দিয়েছিল স্ট্যানলি। অল্পসংখ্যক এই মানুষের মধ্যে একজন ছিলেন সত্যজিৎ। আবার অন্য চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রশংসা করার ব্যাপারেও স্ট্যানলি ছিল মিতব্যয়ী। তবে সত্যজিতের প্রশংসার ব্যাপারে সে অকুণ্ঠ ছিল। অবশ্য প্রায় অর্ধশতাব্দী পর এখন আমি নিশ্চিত নই, সে সময় সে সত্যজিৎকে এক নম্বর বলে স্বীকার করেছিল কিনা। নাকি দুই নম্বর বলেছিল?

দি এলিয়েন অনেকবার বাঁচানোর চেষ্টা করেও কোনো লাভ হয়নি। আমি দুঃখিত, সত্যজিৎ আর স্টিভেন স্পিলবার্গের (তার জন্যও আমার প্রায় একই রকম মুগ্ধতা) মধ্যে এক শীতলতা গড়ে উঠেছে। কারণ ই.টি এবং দি এলিয়েন দুটোরই মূলভাব একই। তবে এ ধরনের কাকতালীয় ঘটনা তো সাধারণ ব্যাপার। আবার স্টিভেন এ ব্যাপারে বিরক্তির সঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, দি এলিয়েনের কাহিনী যখন হলিউডে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তিনি হাইস্কুলের ছাত্র।

অনেক বছর পর সত্যজিৎ তার বিজ্ঞান কল্পকাহিনী ও ফ্যান্টাসি গল্পের সংকলনের জন্য আমার কাছে একটা ভূমিকা লিখে দেয়ার অনুরোধ করে সম্মান জানিয়েছিলেন। দুঃখের ব্যাপার হলো অসুস্থতা ও অন্যান্য কাজের চাপে তার এ অনুরোধ রাখা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।

এমজিএম স্টুডিওতে সত্যজিতের সঙ্গে ওই একবারই আমার দেখা হয়েছিল। তার ব্যক্তিত্বে ভীষণভাবে মুগ্ধ হয়েছিলাম। একই মুগ্ধতা ছিল তার কাজেও। বিষয়টি যদি পিঠ চাপড়ে দেয়ার মতো না শোনায়, তাহলে বলি, আমার শোনা সেরা ইংরেজি বলতে পারত সত্যজিৎ, মানে অরসন ওয়েলস আর রিচার্ড ব্র্যানসনের মতো। (বার্নার্ড শ একবার সখেদে বলেছিলেন, ইংরেজরা কেন ইংরেজিতে কথা বলতে পারে না?)

লোকজন যখন আমাকে চিঠি লিখে জানায়, আমার প্রথম প্রকাশিত গল্পটিই সেরা, তা শুনে আমার বেশ অস্থির লাগে। হয়তো সত্যজিৎও তার প্রথম সৃষ্টি নিয়েও একই রকম বোধ করেন। তবে সত্যি সত্যিই পথের পাঁচালী হলো এ পর্যন্ত নির্মিত সেরা হূদয়ছোঁয়া সুন্দর চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। এতে একটি দৃশ্য আছে, যা আমার আর কখনো দেখার দরকার নেই, কারণ দৃশ্যটা আমার স্মৃতিতে একটা পোড়া দাগ রেখে গেছে।

অনেক বছর আগে জন কের ক্রস নামের খাঁটি এক লেখক (তবে এখন বিস্মৃতপ্রায়) বলেছিলেন, ‘সাহিত্য মানেই বিলি বার্ড*।’ আমারও মনে হয়, চলচ্চিত্র মানেই পথের পাঁচালী।

তবে গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে এই দুইয়ের মধ্যে তুলনা এখানে খাটে না। কারণ মেলভিলের বইটি ছিল তার সর্বশেষ লেখা, আর এই চলচ্চিত্রটি সত্যজিতের প্রথম সৃষ্টি। খুশির ব্যাপার হলো, তিনি এখনো ছবি বানিয়ে যাচ্ছেন।

এ কথাগুলো লেখার পরপরই আমি সত্যজিতের কাছ থেকে একটা চিরকুট পেয়ে খুবই খুশি হয়েছিলাম। তাতে লেখা ছিল, ‘এইমাত্র একটা ছবির কাজ শেষ করলাম। পথের পাঁচালীর পর এটিই আমার সেরা কাজ বলে আমার ধারণা।’ চমত্কার খবর!

 

* ‘বিলি বার্ড’ হারমান মেলভিলের লেখা সর্বশেষ উপন্যাস

আর্থার সি ক্লার্কের রচনা সংগ্রহ গ্রিটিংস, কার্বন-বেজডস বাইপেডস! থেকে