প্রথম প্রকাশের পরই অত্যন্ত প্রভাবসঞ্চারী একটি বই এবং একটি উদ্ভাবন কুশলকাজ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল ট্রান্সলেটরস থ্রু হিস্ট্রি, যা একই সঙ্গে তথ্যপূর্ণ এবং খুবই পাঠযোগ্য। অনুবাদকরা যুগে যুগে, দেশে দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। উচ্চপ্রশংসিত এ গ্রন্থে বলা হয়েছে বিভিন্ন ভাষার বিকাশে, নানা সাহিত্যের আবির্ভাবে, জ্ঞান বিতরণে ও মূল্যবোধ বিস্তারে এ অনুবাদকদের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজনের অমলিন অবদানের কথা, যা হয়ে উঠেছে বিশ্বসংস্কৃতিরই একটি অনুপম কাহিনী। সে কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই পাক্ষিক আয়োজনে পাঠকদের আমন্ত্রণ (১৭ কিস্তি)

(দ্বিতীয় অধ্যায়)

‘অনুবাদকরা ও জাতীয় ভাষাগুলোর বিকাশ’

ক্যামেরুনের জিবায়া (Gbaya) ভাষার বিবর্তন (শেষাংশ)

 

খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষাদান বা ধর্মান্তরকরণ, শিক্ষা, জাতীয় ভাষাগুলোর প্রচার ও প্রসার এবং অনুবাদ ও ব্যাখ্যা প্রদান (ইন্টারপ্রিটেশন) জিবায়াদের মধ্যে ১৯২৪ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত এত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত ছিল যে, স্বতন্ত্রভাবে এসবের কোনো একটি নিয়ে কথা বলা দুষ্কর। গোড়ার দিকের এই মিশনারীরা যখন স্থানীয়দের ধর্মান্তরকরণ ও শিক্ষাদান করছিলেন, তখন একদল স্বদেশী মানুষ তাঁদের সাহায্যে এগিয়ে এসছিলেন; খুবই উচ্চশিক্ষিত ছিলেন তাঁরা এবং তাঁদের অন্তত দুটো ইউরোপীয় ভাষা জানা ছিল। একজন বিখ্যাত ধর্মান্তরিত ব্যক্তি জোসেফ গার্গা আরো দুজনের সঙ্গে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে দীক্ষাবারি লাভ করেন, যাঁরা পরবর্তী সময়ে অনুবাদকর্মে মিশনারিদের সহায়তা করেছিলেন। জিবায়াদের মধ্যে কাইগামা (উল্লেখযোগ্য একজন ও সহকারী প্রধান) নামে পরিচিত গার্গা অনুরোধ করেছিলেন যেন মিশনারিরা যিশুর জীবন ও ‘দশ অনুজ্ঞা’  (টেন কমান্ডমেন্টস)  জিবায়া ভাষায় অনুবাদ করেন। ১৯৩২ সালের দিকে দেখা গেল জিবায়ারা এত দ্রুত ধর্মান্তরিত হচ্ছে যে, ম্বুলাদের যিনি নেতা তিনিও বাকি রইলেন না। এবং ১৯৪২ সাল নাগাদ পল বাওরো ও দানিয়েল ম্বারকাওর মতো যাজকরা জিবায়া ভাষায় সুসমাচার প্রচার এবং তার ভাষ্যদান শুরু করে দেন। স্বদেশী এই মানুষগুলো অনুবাদ ও ব্যাখ্যা প্রদান কর্মকাণ্ডে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন, ঠিক যেমন ১৯০৮ সালে দৌঅলা ক্যাথলিকদের মধ্যে আকাওয়া মেপান্দো, তিম্বা এবং আন্দ্রে মাবাঙ্গুয়ে এ পেশার পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে কাজ করেছিলেন। অবশ্য তুলনাটা কেবল এ পর্যন্তই খাটে, কারণ আন্দ্রে মাবাঙ্গুয়ে এবং তাঁর সহকারীরা যাতে পরে অনুবাদকর্মে সাহায্য করতে পারেন, সেজন্য তাঁদের আরো প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্দেশে জার্মানিতে পাঠানো হলেও জিবায়া পুরোধাদেরকে তাঁদের ভাষাতাত্ত্বিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে না-পাঠানো সত্ত্বেও তাঁরা বাইবেল অনুবাদে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

ভাষাতাত্ত্বিক ও অনুবাদক রেভারেন্ড আদোলফাস গুন্ডারসন (আনু. ১৮৯০-১৯৫১) জিবায়া ভাষার বিকাশে অসাধারণ অবদান রেখেছেন। তিনি ইংরেজি, ফরাসি, হাউসা, ফুলফুলদে এবং পরবর্তীকালে জিবায়ার ইয়াইয়ুউই উপভাষায় স্বচ্ছন্দ ছিলেন। কয়েকজন জার্মান জাতিতত্ত্ববিদ ও ভাষাতাত্ত্বিক এরই মধ্যে জিবায়া ভাষায় লেখালেখি করার চেষ্টা করেছিলেন। জিবায়া ভাষা শেখার এবং তা খাতায় কলমে লেখার পর গুন্ডারসন স্বদেশীদের জিবায়া ও ফরাসি ভাষা শেখানোর জন্য একটি বিদ্যালয় স্থপন করেন। দুই দেশের জিবায়াদের মধ্যে সুসমাচার (গসপেল) ছড়িয়ে দেয়ার জন্য গুন্ডারসন ১৯৩৩ সালে মধ্য আফ্রিকী রিপাবলিকের একটি ছোট্ট শহর আবা-তে রেভারেন্ড আর্থার অ্যান্ডারসনের সঙ্গে জিবায়া ভাষায় লেখালেখি শুরু করলে অনুবাদ কর্মকাণ্ডে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার ঘটে। বাইবেলের যে রচনাটি জিবায়া ভাষায় প্রথম প্রকাশিত হয়, তা হচ্ছে ম্যাথু কথিত সুসমাচার (১৯৩৯)। মৌখিক সাহিত্যের সংগ্রহ, প্রতিলিপিকরণ (ট্রান্সক্রিপশন) ও অনুবাদ গোড়ার দিকের মিশনারিদের আরেকটি কাজ ছিল বলে মনে হয়, এবং যাঁরা জিবায়া লোকগাথা সংগ্রহ ও অনুবাদ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে গুন্ডারসন অন্যতম ছিলেন।

স্থানীয় জনসাধারণের শারীরিক ও সামাজিক কল্যাণ-সম্পৃক্ত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নারী অনুবাদকরাও ভাষাটির বিকাশে অবদান রেখেছিলেন। সেই ১৯২০-এর দশকে আনা গুন্ডারসন, ওলেট ব্রেটসন, অ্যানি ওলসেন ও ওলগা ক্রিসটেনের মতো মিশনারি অনুবাদকরা স্বাস্থ্যসেবা, সমাজকল্যাণ ও গার্হ্যস্থ অর্থনীতি বিষয়ে লেখা নানা নথি বা কাগজপত্র জিবায়া ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। গোড়া থেকেই দলবদ্ধভাবে কাজ করাই অনুবাদের প্রধান পদ্ধতি ছিল বলে মনে হয়। অনুবাদ কর্মশালা এবং সংস্কৃতিটি সম্পর্কে অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী দেশী ভাষা ব্যবহারকারী ও ভাষাতাত্ত্বিকদের করা সংশোধন ও পরিমার্জনা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। স্থানীয় তথ্য সরবরাহকারী বা দেশী ভাষা ব্যবহারকারীরা এ ধরনের অনুবাদ কর্মকাণ্ডে যে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন, ইউজিন নিডা বারবার তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। রেভারেন্ড আদোলপাস গুন্ডারসন এবং তাঁর দল, যাঁদের বেশির ভাগই মিশনারি অনুবাদক, তাঁরা অসংখ্য অনুবাদ ও ব্যাখ্যা প্রদান কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে জিবায়া ভাষার প্রচার ও প্রসারের একটি দৃঢ় ভিত্তিভূমি রচনা করে গেছেন এবং এ কর্মকাণ্ড জিবায়া জীবন ও সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। ১৯৪২ থেকে যে বছর জিবায়া অনুবাদ কেন্দ্র নাগাউন্দেরে থেকে মেইগাঙ্গাতে স্থানান্তরিত হয়, সেই ১৯৭২ সালের মধ্যের সময়টায় কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম বাদে, জিবায়াদের মধ্যে অনুবাদ ও ব্যাখ্যা প্রদান কর্মকাণ্ডে খানিকটা ভাটা পড়েছিল বলে মনে হয়। এ সময়টায় রেভারেন্ড লয়েড স্যান্ড ‘নিউ টেস্টামেন্ট’-এর কিছু অংশ দিয়ে গঠিত  commentaire biblique বা ‘বাইবেলের ভাষ্য’ অনুবাদ করেন এবং তাঁর স্ত্রী অনুবাদ করেন ‘সং অব সংস’।  একই সময় মেইগাঙ্গাতে École de Théologie (বর্তমানে,  Institut de Théologie Luthérienne) স্থাপিত হয়। ১৯৬১ সালে সেখান থেকে ছয়জন জিবায়া স্নাতক হন এবং তাঁদের ওপর জিবায়া ভাষায় সুসমাচার ছড়িয়ে দেবার ও তার ব্যাখ্যা প্রদানের দায়িত্ব দেয়া হয়। কানডীয় মিশনারি অনুবাদক মাডেল নস্টবাক্কেনের নেতৃত্বে ১৯৬৮ সালে জিবায়া ভাষায় ‘নিউ টেস্টামেন্ট’-এর অনুবাদ সম্পন্ন হয়।

মেবরে উপত্যকার জিবায়াদের মধ্যে অনুবাদ ও ব্যাখ্যা প্রদানের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ১৯৭১ সালে, যখন মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক ফিলিপ নস (জন্ম ১৯৩৯) মেইগাঙ্গায় জিবায়া অনুবাদ কেন্দ্র খোলেন, যে কেন্দ্র ক্যাথলিক চার্চের পূর্ণ সহযোগিতা লাভ করেছিল।

জিবায়া জীবন ও সংস্কৃতি বিষয়ে বিখ্যাত পণ্ডিত নস ক্যামেরুনেই বেড়ে উঠেছিলেন এবং শিশুকালেই তিনি জিবায়া ভাষা শিখেছিলেন। ১৯৭৯ সালে তিনি ক্যামেরুনের ইভাঞ্জেলিকাল লুথারান চার্চের সাহিত্য-বিষয়ক সমন্বয়ক হন এবং ১৯৮৪ সালে ইউনাইটেড বাইবেল সোসাইটিজের পরামর্শক পদে বৃত হন। তিনি পাঁচটি ভাষা নিয়ে কাজ করেন: ইংরেজি, ফরাসি, জিবায়া, ফুলফুলদে এবং সাঙ্গো। তিনি জিবায়া ভাষার ব্যাকরণ সম্পর্কে একটি প্রামাণিক গ্রন্থের রচয়িতা; এছাড়া তিনি ফাদার ওয়াই ব্লাঞ্জার্ড, ওমএমআই (মিশনারি অবলেটস অব মেরি ইমাকুলেট)-এর সঙ্গে মিলে একটি জিবায়া-ফরাসি অভিধানও প্রণয়ন করেছেন; এছাড়া তিনি ফরাসি ও ইংরেজি থেকে নানা বিষয়ের বই জিবায়া ভাষায় অনুবাদ করেছেন। তাছাড়া নস বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ধর্মতাত্ত্বিক প্রবন্ধ অনুবাদ করেছেন, যেসব প্রবন্ধে অনুবাদকে আফ্রিকী সংস্কৃতির প্রেক্ষাপট থেকে, বিশেষ করে জিবায়া ভাষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে দেখা হয়েছে।

{১৯৭০-এর দশক থেকে অন্যান্য উপভাষার ওপরে ভাষা ও সংস্কৃতিগত বিশদ গবেষণা চালানো হয়: উদাহরণস্বরূপ, ফরাসি পণ্ডিত পলেত রুলঁঅ-দোকো ‘মধ্য আফ্রিকী রিপাবলিকের জিবায়া ভাষা সন্নিহিত একটি উপভাষা বোদোয়ে’ নিয়ে গবেষণা করেছেন; এছাড়া তিনি একটি জিবায়া-ফরাসি অভিধানও রচনা করেছেন।}

নস তাঁর রচনাকর্মে আফ্রিকার প্রেক্ষাপটে বাইবেলের নামগুলোর অনুবাদ বা অ্যাডাপ্টেশন (রূপান্তর/আত্তীকরণ) নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেই সঙ্গে তিনি সেখানে ইডিওফোন (ideophone) বা ‘ভাবধ্বনি’ নিয়েও মূল্যবান মন্তব্য করেছেন: ইডিওফোন বা ‘ভাবধ্বনি’ হচ্ছে ধ্বনির একটি প্যাটার্ন বা ছাঁদ বা নকশা, যা স্বরানুপ্রাস (assonance), ধ্বনি সঙ্গতি (consonance) বা অনুপ্রাস (allteration)-এর মতো এবং যা বিশেষণ, ক্রিয়া বিশেষণ বা মডিফায়ারের মতো কাজ করে, এবং মানব সংবেদন বোঝাতে ক্রিয়া বা এমনকি একটি পুরো বাক্যকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। ভাবধ্বনির জটিল চারিত্র্যের কারণে প্রায়ই সেটাকে উপেক্ষা করে যাওয়া হয়েছে, কিন্তু জিবায়া অনুবাদ কেন্দ্রের অনুবাদকরা বাইবেলের কিছু কিছু অংশ অনুবাদে অর্থ ও নাটকীয় অভিঘাত প্রকাশ করতে সেটা ব্যবহার করেছেন।

আফ্রিকার অন্যান্য অংশের মতো ক্যামেরুনের জাতীয় ভাষাগুলোও উনিশ শতকের শেষের দিকে বিকশিত হতে শুরু করে। তুলনামূলকভাবে কম সময়ের মধ্যেই ইউওনদো, দৌআলা, বুলু এবং এই পর্বে আমাদের মূল আলোচ্য জিবায়া— এ ভাষাগুলো মিশনারি অনুবাদকদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে দ্রুত বিকাশলাভ করেছে।

(পরবর্তী পর্ব: ‘হিব্রু: ইসরায়েলের জন্য একটি আধুনিক ভাষা’)