ধূমায়িত চায়ের কাপে এক বা একাধিক বিস্কুট, হোক না নোনতা কিংবা মিষ্টি অথবা টোস্ট বিস্কুট, ডুবিয়ে না খেলে বাঙালিদের চা পান করার আনন্দটুকু যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তবে শুধু চায়ে নয়, বরং অনেকেই আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে কফি, হট চকোলেট, এমনকি দুধের মধ্যেও বিস্কুট ভিজিয়ে খেতে পছন্দ করে। যাহোক, আমরা অর্থাৎ বাঙালিরা অভ্যাসটি রপ্ত করেছি ব্রিটিশদের কাছ থেকে। যদিও আধুনিক যুগে চায়ে ভিজিয়ে বিস্কুট খাওয়ার অভ্যাসটির উত্পত্তি ষোড়শ শতাব্দীর নৌবাহিনীর ইতিহাসে দেখা যায়। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে, বিশেষ করে ভিক্টোরিয়ান যুগের (১৮৩৭-১৯০১) প্রথম দিকে, ব্রিটিশরা নিজেদের দেশে বিকালের চা পর্বের সময় চায়ের মধ্যে বিস্কুট ডুবিয়ে খাওয়ার প্রথা চালু করে, যা পরবর্তী সময়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

মধ্যযুগের (আনুমানিক পঞ্চম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত) শুরুর দিকে বিস্কুট তৈরির পদ্ধতি বিকশিত হয়েছিল, বিশেষ করে আরব বিশ্বে। সেখানে ময়দার সঙ্গে চিনি যোগ করা কনফেকশনারি শিল্প তৈরি হয়েছিল। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর মধ্যে পারস্য সাম্রাজ্যের (বর্তমান ইরান) রাঁধুনিরা তাদের পূর্বসূরিদের কাছ থেকে ডিম, মাখন ও ক্রিম দিয়ে রুটিভিত্তিক মিশ্রণকে হালকা এবং সমৃদ্ধ করার বিভিন্ন ধরনের কৌশল শিখেছিল এবং তারা ফল ও মধু দিয়ে সেগুলো মিষ্টি করত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মধ্যযুগে আরব দুনিয়ায় বিস্কুটের কদর ছিল। তাই বিস্কুটের রূপান্তরে আরবরা বড় ভূমিকা পালন করেছিল। তবে বিস্কুট বানানোর ব্রিটিশ কারিগররা আজকের বিশেষ ধরনের বিস্কুট তৈরি করার জন্য দীর্ঘ সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। যখন শিল্প বিপ্লব তাদের ব্যাপক উৎপাদনের দিকে পরিচালিত করে, তখন বিভন্ন ধরনের বিস্কুট ব্রিটিশ খাদ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। জানা যায়, মধ্যযুগের শেষ দিকে বিস্কুট, বিশেষ করে ওয়েফার, ডেজার্ট হিসেবে খাওয়া হতো, যা উচ্চমর্যাদাপূর্ণ খাবার হয়ে উঠেছিল এবং বিভিন্ন ধরনের পাওয়া যেত।

বিস্কুটের, বিশেষ করে মিষ্টি বিস্কুটের ইতিহাস চিনির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে। খাদ্য ঐতিহাসিকরা মধ্যযুগীয় আরব রন্ধনপ্রণালিতে মিষ্টি বিস্কুটের ইতিহাস খুঁজে পান। বাদাম (প্রায়ই কাজুবাদাম) এবং মসলাসহ ছোট চিনির বিস্কুট রাঁধুনিদের কাছে পরিচিত ছিল এবং দ্রুত ইউরোপীয়দের কাছে গৃহীত হয়।

মুসলমান মিঠাই প্রস্তুতকারকরা (কনফেকশনার) সর্বপ্রথম দুবার সেকা রুটির (আরবীয় ভাষায় বাকসামাৎ) জন্য ময়দার সঙ্গে চিনি মিশিয়েছিলেন। সেই খামির দিয়ে তারা বাকসামাৎ বি সুক্কার, যা মিষ্টি বিস্কুটের মতো খটখটে বিস্কুট (রাস্ক) তৈরি করেছিলেন। একসময় মিষ্টতার জন্য খামিরের সঙ্গে মধু ব্যবহার করা হতো। কিন্তু দেখা গিয়েছে, বিস্কুটের খামিরের সঙ্গে মধু মেশালে খামির নরম হয়ে যায়। অন্যদিকে খামিরের সঙ্গে চিনি মেশালে বিস্কুট শক্ত হয় এবং অনেক দিন সতেজ ও শুষ্ক রাখা যায়।

সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে মুসলমান রন্ধনকর্মীরা চিনির ব্যবহার গ্রহণ করেছিল। বাগদাদের লেখক সায়ার আল-ওয়ারাকের দশম শতাব্দীর রান্নার বইয়ে (ইংরেজি শিরোনাম: Annals of the Caliphs’ Kitchens: Ibn Sayyar   Al-Warraq’s Tenth-Century Baghdadi Cookbook, তরজমা করেছেন Nawal Nasrallah) সর্বত্র চিনির উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা অভিজাত ইসলামী রন্ধনপ্রণালির উল্লেখযোগ্য অবদান। বিশাল আকৃতির গ্রন্থটিতে প্রাসঙ্গিক তথ্য ছাড়াও ৬০০-এর বেশি খাদ্যসামগ্রীর প্রস্তুত প্রণালির নির্দেশনা (রেসিপি) রয়েছে, যা ১৩২টি অধ্যায়ে বিভক্ত। বলাবাহুল্য, গ্রন্থটি প্রাচীনতম আরবীয় রান্নার বই এবং মধ্যযুগীয় ইসলামের বিলাসবহুল রন্ধনপ্রণালি থেকে সমসাময়িক রন্ধনসম্পর্কিত সংস্কৃতির জন্য একটি বিরল গাইড।


যাহোক, মুসলমান রাঁধুনিরা চিনিকে মসলা হিসেবে ব্যবহার করে, যেমন মাছের জন্য পুর (স্টাফিং) বা মাংসের ওপর ঢেলে দেয়া কোনো সসের সঙ্গে মেশানো হয়; কিন্তু একই সময়ে বিশেষ এক ধরনের রান্নায় চিনিকে প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে। সায়ার আল-ওয়ারাকের রান্নার বইয়ের এক-তৃতীয়াংশ রন্ধনপ্রণালিতে চিনি ব্যবহার করা হয়েছিল। সব খাবারের মধ্যে মাখা ময়দার পিন্ড, কনজার্ভ, জেলি, পুডিং, প্যানকেক, প্যাস্ট্রি, শরবত ও বিস্কুট অন্যতম।

লিজি কলিংহামের গ্রন্থে (The Biscuit: The History of a Very British Indulgence) বিস্কুটের রূপান্তরে আরব বিশ্বের ভূমিকা আলোচিত হয়েছে। এ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, আরব বিশ্বে মিষ্টি বিস্কুট দুটি আলাদা পদ্ধতিতে বিবর্তিত হয়েছিল: শক্ত মিষ্টি বিস্কুট (রাস্ক) এবং নরম মিষ্টি বিস্কুট। শক্ত মিষ্টি বিস্কুট কেবল দুবার সেকা রুটির জন্য ময়দার সঙ্গে চিনি যোগ করে তৈরি করা হতো। এসব বিস্কুট তৈরির সময় প্রায়ই গোলাপ বা অন্য ফুলের পাপড়ি ভেজা পানি মিশিয়ে সুস্বাদু করা হতো। অন্যদিকে নরম মিষ্টি বিস্কুট, যা কা’ক (ka’k) নামে পরিচিত ছিল, বিশাল চুল্লিতে না বানিয়ে বরং ছোট আকারের তন্দুরে বানানোর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিল। তাতে আরো অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতো। প্রথমে বিস্কুটের ময়দার চাকতি তন্দুরের পাশে আটকে সেকা হতো। তারপর সেগুলোকে হয় রোদে নতুবা চুল্লির ওপর জাল বিছিয়ে মৃদু তাপে শুকানো হতো।

নবম শতাব্দীর বাগদাদে আব্বাসীয় রাজপুত্র ইব্রাহিম বিন আল-মাহদি (জন্ম ৭৭৯ খ্রিস্টাব্দ, মৃত্যু ৮৩৯ খ্রিস্টাব্দ, যিনি হারুন আল রশীদের সৎ ভাই ছিলেন) মিষ্টি বিস্কুট উপহার দেয়ার জন্য তার ভাতিজাকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি কবিতা রচনা করেছিলেন। ইবনে সায়িয়ার আল-ওয়ারাক (দশম শতাব্দীর বাগদাদের লেখক) তার রান্নার বইয়ে কবিতাটি পুনরায় প্রকাশ করেন। ইব্রাহিমের মতে, গোল চাকতির মতো আকৃতির বিস্কুটগুলো চাঁদের মতো ছিল এবং মধু বা মিষ্টির মতো সুস্বাদু ছিল। সেসব বিস্কুট তিল, বাদাম ও পাইন বাদাম (বিশেষ ধরনের বাদাম) দিয়ে সজ্জিত করা হতো। এছাড়া সেগুলোর ওপর বাদাম তেল ছড়িয়ে দিত এবং জাফরান দিয়ে হলুদ রঙ করা হতো, যা স্বর্ণের নাগেটের মতো চকচকে দেখাত। ইব্রাহিম তার ভাতিজাকে বলেছিলেন, দয়ালু ও উদার উপহার চাচার প্রতি ভাতিজার স্নেহের প্রমাণ। এছাড়া তিনি ভাতিজার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন, যেন সে ‘যেকোনো ক্ষতি থেকে রক্ষা পায় এবং এক হাজার বছর বেঁচে থাকতে এবং চিরকাল সুখী হতে পারে।’

আরবদের স্পেন বিজয় (৭১১ খ্রিস্টাব্দ) এবং দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর ক্রুসেডের আগ পর্যন্ত আরবীয় রান্নার কলাকৌশল ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েনি। বলা হয়, আরবরা যখন সেভিল আক্রমণ করে, তখন তারা তাদের সঙ্গে বিস্কুট তৈরির পদ্ধতি নিয়ে যায়। এছাড়া মুসলমান ও ইহুদি বণিকরা মিসরীয় চিনি লোহিত সাগরের নিম্নাঞ্চল এডেন ও কালিকট এবং ভূমধ্যসাগরের ওপারে ইতালির ভেনিস ও জেনোয়ায় রফতানি করার সঙ্গে সঙ্গে কনফেকশনারি ও মিষ্টি বিস্কুট প্রস্তুত প্রণালিও চলে যায় বিভিন্ন দেশে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যে ইউরোপজুড়ে বিস্কুট তৈরির কলাকৌশল রাজকীয় রন্ধনপ্রণালি থেকে শুরু করে রাস্তার বিক্রেতা—সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে সাধারণ বিষয় ছিল। পরবর্তী সময়ে ষোড়শ শতাব্দীতে স্পেনীয় অভিযাত্রীরা মেক্সিকোয় বিস্কুট প্রবর্তন করে, যার প্রকৃত উৎস মধ্যযুগীয় আরবীয় রন্ধনপ্রণালিতে খুঁজে পাওয়া যায়।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে তত্কালীন অবিভক্ত বাংলায় বিস্কুট খাওয়ার রীতি চালু হয় এবং সিলেটি মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিস্কুট নিয়ে সাম্প্রদায়িক অসন্তোষ দেখা গিয়েছিল অবিভক্ত ভারতবর্ষে। কাছাড় এবং সিলেটের মধ্যবিত্ত হিন্দুরা বিস্কুট ও রুটি সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করতেন। কারণ তারা বিশ্বাস করতেন, বিস্কুট ও রুটি মুসলমানরা তৈরি করে। একবার কাছাড়ের কয়েকজন হিন্দু ইংরেজদের চায়ের সঙ্গে বিস্কুট খেতে দেখেছিল, যা নিয়ে দারুণ হইচই পড়ে গিয়েছিল। এ খবর সিলেটের হিন্দুদের কাছে পৌঁছায় এবং সামান্য বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল। সেই বিদ্রোহকে নিষ্ক্রিয় করার জন্য কোম্পানিগুলো তাদের রুটিকে ‘মেশিনে তৈরি’ এবং (মুসলমানদের) হাতের স্পর্শ লাগেনি’ হিসেবে বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, লেখক, বক্তা, সমাজ সংস্কারক এবং ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগ্রামী নেতা বিপিনচন্দ্র পালের (১৮৫৮-১৯৩২) আত্মজীবনীতে এ ঘটনার উল্লেখ আছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, কীভাবে ধীরে ধীরে হিন্দুদের রন্ধনসম্পর্কিত অভ্যাসগুলো শেষ পর্যন্ত পরিবর্তন হয় এবং অবশেষে বিস্কুট ও রুটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

ইংরেজি বিস্কিট শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ bis I coctus বা coquere থেকে, যার অর্থ দুবার রান্না করা। তার কারণ অতীতে বিস্কুট মূলত দ্বিমুখী প্রক্রিয়ায় তৈরি হতো: প্রথমে সেকা, তার পরে অল্প তাপের চুলায় ধীরে শুকানো। চতুর্দশ শতাব্দীতে মূল ফরাসি শব্দ bescuit, পরে ইংরেজি ভাষায় বিস্কিট (biscuit) হয় এবং চতুর্দশ শতাব্দীতে শব্দটি ইংরেজিতে অভিযোজিত হয়েছিল। ইংরেজি বিস্কিট শব্দটি পরে বাংলায় বিস্কুট হয়ে গেছে।

যাহোক, পরিশেষে বিস্কুট নিয়ে ব্রিটিশ কৌতুক অভিনেতা জো ব্র্যান্ডের (জন্ম ১৯৫৭) কথার উদ্ধৃতি দিচ্ছি। তিনি বলেছেন, ‘পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে: এক ধরনের মানুষ আছে, যারা বিস্কুটের প্যাকেট খুলে একটি বিস্কুট তুলে নেয় এবং বাকিগুলো আলমারিতে রেখে দেয়। আরেক ধরনের মানুষ আছে, যারা এক বসায় পুরো প্যাকেটের বিস্কুট সাবাড় করে।’

 

ফজল হাসান: লেখক ও অনুবাদক