ব্রিটেনের বাজার ঘুরলে প্রতিটি উৎসবের জন্য আলাদা আলাদা বিস্কুট পাওয়া যাবে। কী নেই সেখানে! সদ্য দাঁত ওঠা শিশুদের জন্য টোস্ট বিস্কুট, জন্মদিনের উৎসবের জন্য পার্টি রিং, চায়ে ভিজিয়ে খাওয়ার জন্য কাস্টার্ড ক্রিম, লাঞ্চবক্সে দেয়ার জন্য টানক’স ওয়েফার আর চিজ দিয়ে খাওয়ার জন্য ওয়াটার বিস্কুট। বিস্কুটের বিভিন্ন ধরন দিয়ে এমনকি মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও বিশ্লেষণ করা হয়। এ কারণে যুক্তরাজ্যের ওয়েবসাইট মামসনেটে রাজনীতিবিদদের সাক্ষাত্কার গ্রহণের সময় তাদের নিজেদের প্রিয় বিস্কুটের নাম বলতে বলা হয়। ব্রিটেনের বাইরে আর কোনো দেশ এত বেশি বিস্কুট কেনে বা খায় বলে মনে হয় না। নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে জাতীয় লকডাউন চলার শেষ মাসেও সেখানকার ক্রেতারা শুধু বিস্কুট কেনার পেছনেই খরচ করেছেন বাড়তি ১ কোটি ৯ লাখ পাউন্ড।

এখানে জেনে নেয়া যাক বিস্কুট নিয়ে ১৫টি অবাক করে দেয়া তথ্য:

বিস্কুট দিয়ে বিয়ার

প্রথম দিকে শুধু শুধু খাওয়ার জন্য বিস্কুট তৈরি করা হয়নি। প্রাচীন সুমেরীয়রা বার্লি রুটির টুকরো শক্ত করে টোস্টের মতো শুকিয়ে নিত বিয়ার তৈরির প্রয়োজনীয় মলটেড বার্লি সংরক্ষণ করার জন্য। পরে বিয়ার তৈরির সময় এসব টোস্ট উষ্ণ গরম পানিতে ভেজাতে হতো, সেসব থেকে ম্যাশ তৈরির জন্য। এরপর সেটাকে কিছুটা মধু বা খেজুরের রস দিয়ে মিষ্টি করা হতো এবং পরে সেটা গাঁজাতে দেয়া হতো। এ কাজে ব্যবহারের জন্যই প্রথমে তৈরি করা হয় বিস্কুট।

স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে তৈরি করা হয় ফিগ রোল

মধ্যযুগে মুসলমানরা বিস্কুটে প্রথমবারের মতো চিনি যোগ করেন। তারাই পরে সেটাকে বিলাসবহুল স্বাস্থ্যকর খাবারে পরিণত করেন। আগে চিনিকে বিবেচনা করা হতো ওষুধ হিসেবে। ভাবা হতো, চিনি শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। এ ভাবনা থেকেই মধ্যযুগে আরবের চিকিৎসক ইবনে বুতলান পরামর্শ দেন সেই সব বিস্কুট খাওয়ার, যেগুলো গরম করা ডুমরের পেস্ট ও বাদামে পরিপূর্ণ থাকবে।

ব্রিটেনের প্রথম বিস্কুটগুলো ছিল ব্রিদ ফ্রেশনার

প্রথম যে বিস্কুট বানানোর পদ্ধতিটা ব্রিটেনে এসেছিল, সেটা ছিল ইতালিয়ান রসায়নশাস্ত্রের পাশাপাশি চিকিৎসাবিষয়ক হ্যান্ডবুক। সেখানে প্লেগ রোগের প্রতিকারের পাশাপাশি এ ‘সুস্বাদু টুকরোটি’ কীভাবে তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে নির্দেশনাবলি লেখা ছিল। পাশাপাশি ওই বইতে পায়ের আঙুলের দুর্গন্ধ দূর করার মতো টিপসও ছিল। এসব বিস্কুট ছিল কস্তূরী ও মৌরির স্বাদযুক্ত স্পঞ্জ ফিঙ্গার। আর শ্বাসকে নির্মল করার জন্য এবং পাকস্থলী থেকে উঠে আসা বাষ্পকে দমন করার জন্য বিস্কুটগুলো খেতে হতো খাবার খাওয়ার পরে।


বিস্কুট খেলেই পাপমুক্তি

একসময় ব্রিটেনে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় মরদেহের ওপর বিস্কুট রাখা খুবই সাধারণ এক বিষয় ছিল। সেই সময়ে শোককারীরা মরদেহ সত্কারের আগে ওই বিস্কুট খেতেন। যেন তারা মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তির পাপ গ্রহণ করতে পারেন। আয়ারল্যান্ড পরে এ আচার গ্রহণ করে। সেখানে কফিনের পাশে যারা আগে থেকেই শ্রদ্ধা জানানোর জন্য বসে থাকত, সেই সব অতিথিকে এক গ্লাস করে ওয়াইন ও একটি বিস্কুট দেয়া হতো। কিন্তু ইংল্যান্ডে সপ্তদশ শতাব্দীতে সেই সব প্রথার অল্প খানিকটা বজায় ছিল, সেখানে শুধু চার্চ সেবার আগে অতিথিদের বিস্কুট ও ওয়াইন দেয়া হতো।

বিস্কুটের জন্য লিভারপুলবাসীর নাম হয় স্কাউসার্স

শিপ বিস্কুট নামে একটি শুকনো বিস্কুট ছিল, যেটা নাবিকরা তাদের প্রতি বেলার খাবারেই খেত। এসব বিস্কুট শুকনা খাওয়া যেত না, তাই প্রথমে ভিজিয়ে রাখতে হতো, পরে লবস্কাউস নামে একটি স্টুয়ের মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহূত হতো। সেটাই ছিল নাবিকদের জন্য আদর্শ খাবার। মাছ বা মাংস যেটাই হাতের কাছে থাক সেটার টুকরো সেই স্টুয়ের সঙ্গে পরে যোগ করা হতো। ফিনল্যান্ডের উত্তরের এলাকা ল্যাপল্যান্ডের নাবিকরা তাতে জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণী সিন্ধুঘোটকের মাংস দিত, জার্মানরা দিত হেরিং মাছ আর ইংলিশরা যোগ করত লবণ ও ভিনেগার যুক্ত করা গরুর মাংস। ইংল্যান্ডের লিভারপুলে জাহাজের কর্মীদের কাছে এ লবস্কাউস পরিচিত ছিল স্কাউস নামে। এই স্টু লিভারপুলে এত বেশি সাধারণ খাবার হয়ে গিয়েছিল যে লিভারপুলের বাসিন্দাদের নামই হয়ে যায় স্কাউসার্স।

বিস্কুট ফ্যাক্টরি প্রথম গড়ে উঠেছিল ব্রিটেনে

হান্টলে অ্যান্ড পামার্স ১৮৪৬ সালে যুক্তরাজ্যের রিডিংয়ে প্রথম তাদের বিস্কুটের জন্য আলাদা ফ্যাক্টরি গড়ে তোলে। সাংবাদিক হেনরি মেহিউ সেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এভাবে, ‘যদিও আমাদের মোজা, জাহাজের ব্লক, পিন ও সুচ যান্ত্রিকভাবে তৈরি করা হয়, কিন্তু এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে কীভাবে ফ্যাক্টরির চাকা, যন্ত্র লেডিস ফিঙ্গার এবং টপস অ্যান্ড বটমস বিস্কুট তৈরি করবে।’ ১৮৭৪ সালের মধ্যে হান্টলে অ্যান্ড পামার্স ১০ হাজার টন বিস্কুট তৈরি করে ফেলে আর সে সময় তারাই ছিল সবচেয়ে বড় বিস্কুট তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান।


নিজের নামানুসারে বানানো বিস্কুট প্রত্যাখ্যান করেন রানী ভিক্টোরিয়া

রাজকীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হওয়ার কারণে বিস্কুটের বিক্রি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। মেরি বিস্কুটের নাম রাখা হয়েছিল রাশিয়ান ডাচেসের নামে, বুরবো নামকরণ করা হয়েছিল ফরাসি রাজবাড়ির আদলে, আলবার্ট বিস্কুটের নাম রাখা হয়েছিল রানী ভিক্টোরিয়ার স্বামীর নামানুসারে। কিন্তু এতকিছুর পরও তার নামে বিস্কুট বানানোর জন্য হান্টলে অ্যান্ড পামার্স অনুরোধ করলে তা প্রত্যাখ্যান করেন রানী ভিক্টোরিয়া। হয়তো বিস্কুটের টিনে তার নাম খোদাই করা থাকলে সেটা দেখতে অশ্লীল হবে বলে মনে করেছিলেন তিনি। প্যালেসের পক্ষ থেকে সে সময় এ বিস্কুট তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শ দেয়া হয়, ইংল্যান্ডের দ্বীপ আইল অব উইটে থাকা রানীর প্রিয় বাড়ির নামে একটি বিস্কুটের নামকরণ করা যেতে পারে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে আসে অসবর্ন বিস্কুট। ঊনবিংশ শতাব্দীর দিকে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিস্কুট ছিল অসবর্ন।

পেট ফাঁপা মহামারী নিরাময় করতে ডাইজেস্টিভ বিস্কুট

ঊনবিংশ শতাব্দীর খবরের কাগজগুলোর ওপর যদি বিশ্বাস করা হয় তাহলে বলা যায়, ভিক্টোরিয়ান ভদ্রলোকেরা পেট ফাঁপা মহামারীতে শহীদ ছিলেন। ব্রিটিশ ব্র্যান্ড ম্যাকভিটি’সকে সাধুবাদ দিতে হয় তাদের অসুস্থ পেটের প্রতিকার হিসেবে ডাইজেস্টিভ বিস্কুট তৈরি করার জন্য। বস্তুত এ বিস্কুট খাওয়ার কারণে তৈরি হওয়া গ্যাস থেকে পেট ব্যথা দূর করার বিষয়টা নতুন নয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর দিকে ক্যারাওয়ে বিস্কুট খাওয়া হতো পাকস্থলীকে স্বস্তি দেয়ার জন্য। ১৮৯২ সালের দিকে গিয়ে ম্যাকভিটি’স মিষ্টি স্বাদের এ খাবারে বেকিং পাউডার যুক্ত করে, তাতে বদহজম থেকে রক্ষা মিলবে এমনটাই বিশ্বাস ছিল তাদের।

অভিযাত্রীদের সঙ্গী

বায়ুরোধী একটি টিনে করে বাজারে আনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইংলিশ বিস্কুট সবসময় দাবি করত, তারা ‘সময় ও জলবায়ু’-কে অস্বীকার করে। সেটা মূলত অনুসন্ধানকারীদের জন্য একটা ঈশ্বর প্রদত্ত উপহার ছিল। রয়্যাল নৌ-কর্মকর্তা এবং অনুসন্ধানকারী রবার্ট স্কট দক্ষিণ মেরুতে তার দুর্ভাগ্যজনক অভিযানের আগে আগে হান্টলে অ্যান্ড পামার্স থেকে গ্লুকোজে ভরপুর বিশেষ বিস্কুট অর্ডার করেছিলেন। রোজ আইল্যান্ডে স্কট হাটের তাকগুলোয় এখনো সেই সব বিস্কুটের টিন রাখা আছে—দেখা যাবে।

বিস্কুটের টিনের কত ব্যবহার!

ফ্যাক্টরি থেকে দোকানিদের হাতে নানা ধরনের বিস্কুট পাঠানো হতো বড় বড় চৌকো টিনে করে। পরে সারা বিশ্বের বিস্কুট খাদকরাই ওইসব টিন ব্যবহার করতেন বিভিন্ন রকম কাজে। একজন মঙ্গোলিয়ান সর্দার এগুলোকে ভ্রাম্যমাণ বাগান থেকে শুরু করে রসুন ফলানোর কাজে ব্যবহার করেছিলেন, পাশাপাশি ব্যবহার করা হতো ফ্লেভারযুক্ত মাটন স্টু তৈরির কাজেও। সেনাবাহিনীর সদস্যদের সেগুলো স্টোভ, হাত ধোয়ার বেসিন বা টয়লেট হিসেবে ব্যবহার করতেও দেখা গেছে। উগান্ডায় হান্টলে অ্যান্ড পামার্সের টিনে করে বাইবেল ও প্রার্থনার বই রাখত চার্চগুলো, যেন সাদা পিঁপড়া সেগুলো নষ্ট করতে না পারে। সেসব টিন দিয়ে কখনো কখনো গানের যন্ত্রপাতি বানানো হতো, এমনকি রানী ভিক্টোরিয়ার মেয়ের জামাইয়ের কফিন তৈরিতেও ব্যবহার হয় এসব টিন, যিনি পশ্চিম আমেরিকা থেকে বাড়ি ফেরার জন্য সমুদ্রযাত্রায় মৃত্যুবরণ করেন।

একটি অস্ট্রেলিয়ান বিস্কুট কোম্পানির কাছে আছে শিশুদের ছবির সবচেয়ে বড় সংগ্রহ

১৮৮০ সালের দিকে অস্ট্রেলিয়ার বিস্কুট তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান আরনট’স দুধ ও অ্যারারুট দেয়া বিস্কুট তৈরি করে। বিস্কুটটি বিশেষভাবে শিশুদের সূক্ষ্ম হজমশক্তির জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এ সময়েই তারা প্রথম গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়ে বিজ্ঞাপন প্রচার করে। গর্বিত বাবা-মাকে আরনট’স বিস্কুট খেয়ে সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা সন্তানের ছবি পাঠাতে বলা হয়। পরবর্তী ৬০ বছরে প্রতিষ্ঠানটি ১০ হাজারের বেশি শিশুর ছবি হাতে পায়। সেখান থেকে বিজয়ীদের ছবি নিয়মিত আরনট’সের খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনে ছাপানো হতো। আরনট’সের হাতেই এখন রয়েছে চিনি খাওয়া তরুণ অস্ট্রেলিয়ানদের ছবির আর্কাইভ।

১৯২০-এর দশকে জ্যাজ ক্লাবে থাকত পার্টি বিস্কুট

১৯২০-এর দশকে ভোগবাদী বিশ্বে নতুন মাত্রা পায় বিস্কুট। বিশেষ করে জ্যাজ ক্লাব, নাচের উন্মত্ততা ও ককটেল পার্টি আয়োজনের ঘূর্ণিতে বিস্কুটের ছিল উজ্জ্বল উপস্থিতি। বিস্কুট তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তখনই বিভিন্ন দামের ককটেল বিস্কুট এবং বিশেষভাবে তৈরি নতুন নতুন সব মিল্কবার ও কফিবার বাজারে নিয়ে আসে। আবার সাইক্লিং ট্রিপের জন্য আদর্শ স্ন্যাক ছিল বিস্কুট, এক্সকারসন (ভ্রমণ উপযোগী) বিস্কুট গাড়ি চালানোর সময় সঙ্গে নেয়ার জন্য একদম ঠিকঠাক আর ইয়াচট (প্রমোদতরী) বিস্কুট বেশি নেয়া হতো সমুদ্রে ভেসে যাওয়ার সময়। বাজারে সেই সময়ে কিছু কনভারসেশন বিস্কুটও এসেছিল, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে বসার সময়ই সেটা বেশি ব্যবহার হতো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও চা-বিস্কুট

ব্রিটেনের কর্মজীবী শ্রেণীর জন্য মিষ্টি চা ছিল পছন্দের পানীয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চা ও চিনি রেশন দেয়া হতো। সে সময়ে অনেকের অভিযোগ ছিল যুদ্ধকালীন চা কখনই যথেষ্ট মিষ্টি ছিল না। ফলে বিস্কুট তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সেই জায়গায় সম্পূরক ক্যান্টিন সেবা সরবরাহ করার জন্য কাজ শুরু করে। যেন অগ্নিনিরোধনে কর্মরতরা, অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার ও বোমায় আহত সাধারণ নাগরিকরা চায়ের মধ্যে না থাকলেও যথেষ্ট চিনি গ্রহণ করতে পারেন। সে থেকেই শুরু। ১৯৪৫ সালের দিকে চায়ের কেটলি হাতে হাতে চলতে শুরু করলেই সবাইকে বিস্কুট টিনে হাত দিতে দেখতে পাওয়া যেত অহরহ। কালের পরিক্রমায় তা জায়গা করে নেয় আধুনিককালের চায়ের টেবিলেও।

 

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

 

শর্মিলা সিনড্রেলা: সাংবাদিক