অরুন্ধতী রায় দুনিয়ার আলোচিত লেখক, বুদ্ধিজীবী ও অ্যাক্টিভিস্ট। বামপন্থী মহলে রয়েছে তার বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা। ভারতীয় এ লেখক অ্যাক্টিভিস্টের যেকোনো কথাকেই আন্তর্জাতিক মিডিয়া গুরুত্ব দেয়, ফলাও করে প্রচার করে। ঔপন্যাসিক হিসেবে আলোচনায় এলেও পরবর্তীকালে রাজনৈতিক প্রবন্ধ, বক্তব্য ও অ্যাক্টিভিজমের মাধ্যমে তিনি বেশি আলোচিত হন। প্রচার, খ্যাতির তোড়ে তার সমালোচনা গণমাধ্যমে চোখে পড়ে না। কিন্তু কেউ যদি গভীরভাবে অরুন্ধতী রায়ের বিভিন্ন মত ও লেখা সম্পর্কে অধ্যয়ন, বিতর্ক করতে চান, তবে কিছু বিদগ্ধ সমালোচকের লেখা পেয়ে যাবেন। এদের মধ্যে আছে রাজমোহন গান্ধী, রামচন্দ্র গুহের মতো বড় বড় নামও।
গান্ধী, বর্ণ প্রথা বনাম আম্বেদকর
২০১৪ সালের ১ মার্চ ক্যারাভান ম্যাগাজিনে অরুন্ধতী রায় মহাত্মা গান্ধীর কঠোর সমালোচনা করে পুস্তিকা আকারের দীর্ঘ একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। রায়ের লেখাটির শিরোনাম ছিল দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট: আম্বেদকর, গান্ধী অ্যান্ড দ্য ব্যাটল অ্যাগেইনস্ট কাস্ট। লেখাটি রায় মূলত লিখেছিলেন আম্বেদকরের আলোচিত রচনা দি অ্যানহাইলেশন অব কাস্ট-এর ভূমিকা হিসেবে। দি অ্যানহাইলেশন অব কাস্ট আম্বেদকরের লেখা একটি বক্তৃতা, ১৯৩৬ সালে তিনি এ বক্তৃতা করতে গিয়েও পারেননি; লেখাটি বেশি বিপ্লবী বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট আয়োজকরা তাকে সেটি পড়তে দেননি। যাহোক, অরুন্ধতী তার ভূমিকায় গান্ধীকে বর্ণ প্রথার একজন সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করে দলিতদের নেতা বাবাসাহেব আম্বেদকরকে মহিমান্বিত করেছেন। লেখাটি ইতিহাস, রাজনীতি নিয়ে আগ্রহীদের মধ্যে সাড়া জাগায়, বিশেষত বামপন্থী মহলে দারুণভাবে আদৃত হয়। কিন্তু বড় বড় অনেক পণ্ডিত অরুন্ধতীর এ মূল্যায়নকে অজ্ঞতা এবং পর্যাপ্ত ইতিহাস জ্ঞানের অভাবে ভারাক্রান্ত বলে মন্তব্য করেছেন। বিশদ ইতিহাস আলোচনার সুযোগ নেই, বর্তমান লেখকের এ বিষয়ে যেমন অক্ষমতা আছে, তেমনি বর্তমান লেখার উদ্দেশ্যও তা নয়। দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট: আম্বেদকর, গান্ধী অ্যান্ড দ্য ব্যাটল অ্যাগেইনস্ট কাস্ট রচনাটির সমালোচকদের মধ্যে একজন আছেন অরুন্ধতীর বাড়ির মানুষ। অরুন্ধতী বড় হয়েছেন কেরালায়, ইতিহাসবিদ এমএসজি নারায়ণানও কেরালার মানুষ এবং তিনি কেরালার ইতিহাস নিয়ে একজন অথরিটি। নারায়ণান ইতিহাসবিদ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত, তিনি ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব হিস্টরিক্যাল রিসার্চের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অরুন্ধতীর দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট লেখাটির সমালোচনা করে ২০১৪ সালের ২৪ জুলাই ওপেন ম্যাগাজিনে নারায়ণান লেখেন অরুন্ধতীয় রায়’জ অ্যাহিস্টরিকাল ফিকশন। লেখার শুরুর দিকেই তিনি বলেছেন, ‘কিছুদিন ধরে অরুন্ধতী রায় সেনসেশনালিজমে (সংবেদনবাদ) লিপ্ত হয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বিভিন্ন মন্তব্য করছেন।’ নারায়ণান মনে করেন, অরুন্ধতী রায় তার লেখায় বাগাড়ম্বরের মাধ্যমে বর্ণ প্রথা ইস্যুতে গান্ধীকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি লিখেছেন, “অরুন্ধতী রায় কেরালায় তার গ্রামকে নিয়ে চমত্কার একটি উপন্যাস লিখে আলোচনায় আসেন। বইটি ১৯৯৭ সালে বুকার পুরস্কার পায়। যাহোক, একজন ভালো ঔপন্যাসিক হলেই তিনি ইতিহাস বা রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করার যোগ্যতা রাখেন না। গান্ধীকে ‘বর্ণ প্রথাবাদী’ বলে আখ্যা দেয়ার মাধ্যমে রায় ভারতের জাতীয় আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে মহাত্মা গান্ধীর ভূমিকা নিয়ে নিজের পূর্ণ অজ্ঞতাকে প্রকাশ করেছেন। ভাইকোম সত্যাগ্রহের সময় গান্ধী একবার কেরালা গিয়েছিলেন এবং সেখানে তিনি শ্রী নারায়ণ গুরুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর তিনি মত প্রকাশ করেন যে, বর্ণাশ্রম প্রথা বিলুপ্ত করতে হবে। নিজের সম্পাদিত হরিজন ও ইয়ং ইন্ডিয়ায় কলাম লিখে গান্ধী এ মত প্রকাশ করেন।’ নারায়ণানের মতে, গৌতম বুদ্ধ থেকে শুরু করে অনেক মহান সংস্কারক বর্ণ প্রথা থেকে সৃষ্ট সামাজিক বৈষম্যকে দূর করতে চেষ্টা করেছেন কিন্তু কেউই সফল হননি। ২০ শতকে গান্ধী এ বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামকে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের আন্দোলনে যুক্ত করতে পেরেছিলেন। ফলে স্বাধীন ভারতের সংবিধানে অস্পৃশ্যতাকে একটি অপরাধ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এসব উল্লেখ করে নারায়ণান লিখছেন, ‘এখন ফিকশন লেখক অরুন্ধতী রায় এসব বিষয় মুছে ফেলতে চাইছেন। এবং সেখানে তার মনের কল্পনা যুক্ত করে আধুনিক ভারতের সমালোচকদের খুশি করতে চাইছেন।’ ভারতের আর যেকোনো হিন্দুর মতো গান্ধীও বর্ণ প্রথার নীতি রক্ত নিয়েই জন্মেছিলেন কিন্তু এর সমস্যা বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সচেতনভাবে এ প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। অস্পৃশ্যদের মর্যাদা দিতে এবং তাদের মধ্যে সম্মানের বোধ তৈরি করতে গান্ধী তাদের ‘হরিজন’ বা ‘ঈশ্বরের সন্তান’ উপাধি দেন। ‘গান্ধী নির্দেশনা দিয়েছিলেন যে, সকল সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পে হরিজনদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, যেদিন কোনো হরিজন ভারতের প্রেসিডেন্ট হবেন, সেদিন হবে তার জীবনের সবচেয়ে খুশির দিন।’ এরপর নারায়ণান অরুন্ধতীর সমালোচনায় তার ভাষা কঠোর করেছেন, তিনি রায়কে মিডিয়াবান্ধব পপুলিস্ট হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ‘গান্ধীকে বর্ণ প্রথার বাহক বলে অরুন্ধতী রায় হয়তো একদল চরমপন্থীর নায়ক হতে চাইছেন কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি মানুষের ন্যায়বোধের চেতনাকে আহত করছেন। তিনি হয়তো মিডিয়া ও টিআরপি-ক্ষুধার্ত টেলিভিশন চ্যানেলে ঝড় তুলতে সক্ষম হয়েছেন...ভারত ও দুনিয়ার মানুষ জানে কে গরিব এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলেন। ফাঁকা বুলি আওড়ানো মানুষ আর সাহসী কর্মবীরের মধ্যে পার্থক্য করার কমনসেন্স মানুষের আছে।’ উল্লেখ্য, গান্ধীর সঙ্গে অনেক মতপার্থক্য থাকলেও আম্বেদকর অনেক জায়গায় উল্লেখ করেছেন, সমাজের প্রান্তিক ও নিম্নবর্ণের মানুষের মুক্তির বিষয়ে কোনো বিতর্ক সম্ভব ছিল না, যদি গান্ধী ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জমিনে সক্রিয় না হতেন। গান্ধী শুরুতে বলতেন, ‘ঈশ্বরই সত্য’ কিন্তু পরবর্তী জীবনে বলতেন, ‘সত্যই ঈশ্বর’। অরুন্ধতী রায় গান্ধীর চরিত্রের এসব বিবর্তনকে অনুধাবনেও ব্যর্থ হয়েছেন।
মজার ব্যাপার হলো, অনেক দলিত নেতাও অরুন্ধতীর লেখা ভূমিকাটির সমালোচনা করেছেন। দলিতদের একটি ফোরাম দলিত ক্যামেরা অরুন্ধতী রায়ের প্রতি একটি খোলা চিঠি লিখেছিল। চিঠিটি দলিতদের মিডিয়া পোর্টাল রাউন্ড টেবল ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত হয়। রাউন্ড টেবল ইন্ডিয়ার (আরটিআই) সম্পাদক অনু রামদাস বলেছিলেন, ‘আমরা অরুন্ধতী রায়ের ভূমিকার সমালোচনা করছি, কারণ তিনি আম্বেদকরের মূল্যবান কাজটিকে অনুধাবন করতে সক্ষম হননি এবং লেখাটির সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক সস্তা ও উত্তেজনাকর ভূমিকাটি আম্বেদকরের বিরুদ্ধে কুৎসা সৃষ্টিরও ঝুঁকি তৈরি করেছে।’ ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে বর্ণ প্রথা নিয়ে গবেষক মুরালি শানমুগাভেলান কড়া সমালোচনা করেছিলেন অরুন্ধতী রায়ের। তার মতে, দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট শিরোনামের ভূমিকায় রায় প্রগতিশীল রাজনীতির একজন বক্তা হিসেবে হাজির হলেও অসতর্কভাবে তিনি দলিত রাজনীতিকে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। মুরালি লিখেছেন, ‘আমার মতে, রায়ের ভূমিকাটি বর্ণ, শ্রেণী, ধর্ম, পুঁজি, প্রযুক্তি ও ভারতের নব্য উদারবাদী রাজনীতি এবং প্রবাসী হিন্দুদের মধ্যে যে জটিল-সূক্ষ্ম সম্পর্ক রয়েছে, সেটা ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।...তার ভূমিকায় আম্বেদকরের মূল লেখাটির বিষয়ে আলোচনা নেই বললেই চলে, তিনি জোর দিয়েছেন গান্ধী ও আম্বেদকরের তুলনায়। মনে হয়, এ তুলনাই তার বইটির উদ্দেশ্য।’ আরটিআইর একজন অ্যাক্টিভিস্ট ও কন্ট্রিবিউটিং এডিটর নরেন বেদিদে বলেছেন, ‘মিডিয়ায় ঝড় তুলতে এবং বাণিজ্যিক কারণে গান্ধীকে নিয়ে তার মন্তব্যের জন্য ঢাল হিসেবে অরুন্ধতী রায় আম্বেদকরকে ব্যবহার করেছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি নিজের প্রকাশনার স্বার্থে দলিত রাজনীতিকে ব্যবহার করেছেন।’ শেষমেশ মুরালি লিখেছেন, “দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট থেকে আম্বেদকর কেউই লাভবান হবে না, শুধু রায় নিজেই সুবিধা পাবেন। রায়ের জীবন, কাজ এবং এ বইটি আমার কাছে নব্য উদারবাদী ‘পোভার্টি ব্যারন’দের মতো মনে হয়, যারা দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে বিমানে উড়ে দারিদ্র্য বিমোচনের টোটকা দিয়ে বেড়ান।”
দলিত ক্যামেরা অরুন্ধতী রায়ের প্রতি তাদের লেখা খোলা চিঠিতে দলিত ইতিহাস ও আম্বেদকরের মূল রচনার প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। চিঠির একটি অংশে লেখা হয়েছে, ‘আপনার ভূমিকাটি পড়ার পরে আমাদের মনে হয়েছে, বইটির (অ্যানহাইলেশন অব কাস্ট) ইতিহাস নিয়ে আপনি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল নন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়: অন্ধ্র প্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় দলিত কর্মীরা অ্যানহাইলেশন অব কাস্ট বইটি স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করে বিনামূল্যে বিতরণ করেছে। বইটি নিয়ে দলিতদের এমন একটি কাজের কথা আপনার ভূমিকায় স্থান পায়নি। আমরা অনেকেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আম্বেদকর বা আম্বেদকরপন্থীদের আন্দোলন এমনকি মূল লেখাটি নিয়েও আপনার জানাবোঝা বেশ কম।’
জীবনীকার, গবেষক, অধ্যাপক রাজমোহন গান্ধী অরুন্ধতীর দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট-এর একটি বিশদ জবাব দিয়েছেন। উল্লেখ্য, মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে বেশ কয়েকটি বই আছে রাজমোহনের। তার কথায়, ‘দ্য ডক্টর অ্যান্ড দ্য সেইন্ট পড়ার পর আমার বেশ কিছুটা সময় লেগেছে লেখাটির মূল উদ্দেশ্য বুঝতে। অ্যানহাইলেশন অব কাস্ট নিয়ে আলোচনা তার উদ্দেশ্য ছিল না, গান্ধী-আম্বেদকর সম্পর্কও নয়। ...রচনাটির মূল উদ্দেশ্য মহাত্মাকে আক্রমণ করা, তাকে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া।’ রাজমোহনের মতে, গান্ধীর বিরুদ্ধে রায় কিছু অযৌক্তিক আক্রমণ করেছেন, যেগুলো তার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা বলে তার কাছে মনে হয়েছে। রাজমোহন এটাও বলেছেন যে, গান্ধীকে সমালোচনা করতে গিয়ে রায় সচেতনভাবে অনেক তথ্য উপস্থাপন থেকে বিরত থেকেছেন।
গান্ধীকে বর্ণ প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে অরুন্ধতীর অভিযোগ নিয়ে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভারতের ইতিহাসের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপিকা মৃদুল মুখার্জি বলেছেন, ‘গান্ধী তার জীবনের বেশির ভাগ সময় বর্ণ প্রথার ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তিনি হিন্দু ধর্মের একজন সংস্কারক, কোনো পুনর্জাগরণবাদী নন।’ মৃদুলা আরো বলেন, ‘ভারতে বর্ণ প্রথার শোষণ বন্ধ করার বিষয়ে গান্ধী এবং আম্বেদকর ভিন্নভাবে চিন্তা করতেন কিন্তু বিষয়টি নিয়ে তারা দুজনই একই রকম আন্তরিক ছিলেন।’
উপন্যাস
অরুন্ধতী রায় তার প্রথম উপন্যাস দ্য গড অব স্মল থিংস-এর জন্য ১৯৯৭ সালে বুকার পুরস্কার পেয়েছিলেন। বইটি প্রকাশ হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। এ বই ও বুকার পুরস্কারই অরুন্ধতীকে সেলিব্রেটি মর্যাদা এনে দিয়েছিল। এরপর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি প্রকাশ হয় তার দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় শোরগোল উঠে যায় বইটি নিয়ে, বুকারের লংলিস্টে নাম উঠে যায়, বহু ভাষায় অনূদিত হয়। দেশ পত্রিকায় পৌলোমী সেনগুপ্ত উপন্যাসটি নিয়ে মোক্ষম একটি সমালোচনা করেছিলেন, ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস খুলে একটি খটকা লাগে। প্রথম উপন্যাসের পর তিনি কুড়ি বছরে যা লিখেছেন, তাকে মোটামুটি রাজনৈতিক প্রবন্ধ বলা যেতে পারে। কোনও বিশেষ দলের পক্ষে বা বিপক্ষে হয়তো নয়, কিন্তু সামাজিক-রাজনৈতিক ভেদাভেদ ও বৈষম্য এবং মানুষের উপর তার প্রভাব নিয়ে তিনি বারবার লিখেছেন। মৌখিকভাবেও জানিয়েছেন তার বিশ্বাসের কথা। সেই কারণেই কি এই বইটিতেও তার বিশ্বাসের বাড়াবাড়ি রকম প্রভাব! কোনও বিশেষ ভাবনা বা বিশ্বাসের পরিপন্থী বা অনুপন্থী হওয়ায় ভুল নেই। কিন্তু উপন্যাস ও সুরম্য প্রবন্ধের পার্থক্য থাকবে, তা আশা করা অন্যায় নয় নিশ্চয়ই।’ চরিত্রগুলোকে পরিপক্ব করে তোলায় অরুন্ধতী ব্যর্থ হয়েছেন বলে পৌলোমীর কাছে মনে হয়েছে। পুরো উপন্যাসে অরুন্ধতী মূল কী গল্পটি বলতে চেয়েছেন, সেটা পৌলোমীর কাছে পরিষ্কার হয়নি। ‘মূল কাহিনি? দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস বইটিতে কি মূল কাহিনি বলে আছে কিছু?... হোঁচট খেতে-খেতে আখ্যান এগোয় নিজের গতিতে, লাফাতে থাকে আগে-পরে, উপর-নিচে। কিন্তু কোনও পূর্ণ রূপ পায় না। মনে হয় লেখিকা ঠিক মনস্থির করতে পারেননি কোন অংশটা কীভাবে লিখবেন, তাই এমন অগোছালো ভাব। এমন ভেঙে-পড়া চালার মতো কাঠামো নিয়েও উপন্যাস হতেই পারে, প্রশ্ন সেখানে নয়। আসলে বারবার মনে হয়েছে, অরুন্ধতী তার কিছু প্রিয় বিষয় নিয়ে লিখতে চাইছেন। গল্প ঘুরিয়ে চরিত্রদের সেই সব বিষয়ের মধ্যে নিয়ে ফেলাই যেন লক্ষ্য। যেন উপন্যাসের ছদ্মবেশে প্যামফ্লেট লিখতে চাইছেন অরুন্ধতী রায়।’ উপন্যাসের পাতা ওল্টালে যে কারো কাছেই এমন মনে হবে। নির্দিষ্ট কিছু মনের কথা বলতেই যেন লেখিকা তার চরিত্রগুলোকে তৈরি করেছেন। সমসাময়িক ইতিহাস-রাজনীতি বিশেষত অরুন্ধতীর প্রবন্ধ সাহিত্য নিয়ে যারা ওয়াকিবহাল, তাদের জন্য উপন্যাসটি কোনো চমক দিতে পারেনি; তাদের মনে হবে তারা যেন চেনা চিত্রই দেখছেন, আগে বলা কথা শুনছেন। এ মতের সমর্থন পাওয়া যায় দি আইরিশ টাইমসে প্রকাশিত ইলিন ব্যাটারসবি’র বুক রিভিউয়ে। ইলিন শিরোনামেই বলেছেন, অরুন্ধতীর উপন্যাসের সব কিছুই যেন স্পষ্ট, অনিবার্য, নির্ধারিত। তিনিও মনে করেন, দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস উপন্যাসে অরুন্ধতীর রাজনৈতিক সচেতনতা যতটা প্রকট, শিল্পবোধ ততটাই যেন অনুপস্থিত। তার মতে, ঔপন্যাসিক হিসেবে এটা অরুন্ধতীর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। ইলিন লিখছেন, ‘উপন্যাসের ন্যারেটিভের ধরনটি ভালো কিন্তু অগোছালো এবং ভাসা ভাসা। পাতা উল্টালে পাওয়া যাবে চেনা গল্প। এটা স্পষ্ট যে, রায় রুশদির মতো নানা উপাদানের মিশ্রণ ঘটাতে চেয়েছেন কিন্তু রুশদির মতো শব্দের ঝংকার তুলতে সফল হননি।’
নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন
রামচন্দ্র গুহ ভারতীয় ইতিহাসবিদ। পরিবেশ ও সময়সাময়িক ইতিহাস নিয়ে তার কাজ দুনিয়ায় প্রশংসিত। গুহ ২০০০ সালের ২৬ নভেম্বর ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য হিন্দুতে নর্মদা আন্দোলনে অরুন্ধতী রায়ের অংশগ্রহণ নিয়ে একটি সমালোচনামূলক লেখা লেখেন। লেখাটির শিরোনাম ছিল— ‘দ্য অরুণ শুরী টু দ্য লেফট’। লেখাটির সংক্ষিপ্ত অনুবাদ—
১৯৯৯ সালের গ্রীষ্মকালে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন ঔপন্যাসিক অরুন্ধতী রায়ের সমর্থন পায়। রায় এমন একটা সময় যুক্ত হন, যখন আন্দোলনে ভাটার টান চলছে। ১৯৯৯ সালের মে মাসে সর্দার সরোবর বাঁধ নিয়ে (নর্মদা নদীর ওপর বাঁধ) অরুন্ধতী রায়ের প্রবন্ধ আউটলুক ও ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। লেখাটি নিয়ে সে সময় আমার অনুভূতি ছিল মিশ্র। বিশ্লেষণের দিক থেকে লেখাটি মৌলিক ছিল না, আশীষ কোঠারি (নর্মদা আন্দোলনে যুক্ত পরিবেশবাদী) আগেই এ রকম বিশ্লেষণ করেছিলেন। আর সাহিত্যের দিক থেকে ছিল নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন এবং বাগাড়ম্বর। গণস্বার্থে এর আগেও রায়ের সাংবাদিকতা নিয়ে আমি বিরক্ত হয়েছিলাম; সেটা ছিল ১৯৯৮ সালে পরমাণু পরীক্ষা নিয়ে তার তর্ক নিয়ে। রায় বলেছিলেন, অনেকে তাকে পরামর্শ দিয়েছিল বোমার ব্যাপারে পারমাণু বোমার বিরুদ্ধে না লিখতে, লিখলে আয়কর বিভাগের লোকজন তার পেছনে লাগতে পারে। রায় এ পরামর্শকে উপেক্ষা করে লিখেছেন। অরুন্ধতী রায় তার প্রবন্ধটি লেখার মাসখানেক আগে পোখরান বিস্ফোরণের বিরুদ্ধে কলকাতার রাস্তায় চার লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিবাদ মিছিল করেছিল। এ মানুষদের বাড়িঘরে কি আয়কর বিভাগের কর্মকর্তারা হানা দিয়েছিল?
বাঁধের বিরুদ্ধে লেখা রায়ের প্রবন্ধটিও তার নিজের খেয়াল-খুশিমতো লেখা। বাঁধকে পরমাণু অস্ত্রের সঙ্গে তুলনা করাটা অযৌক্তিক। প্রযুক্তিকে খলনায়ক হিসেবে তুলে ধরাটা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ। কে. জি. রায় ও সুহাস পারাজপাই সমঝোতার একটি উপায় বের করেছেন, তারা সর্দার সরোবর বাঁধের উচ্চতা কমাতে চান। এতে মানুষের ক্ষতির পরিমাণ কমে আসবে এবং প্রকল্পে যে হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে, সেটাও পানিতে যাবে না। রায় চান বাঁধকে অকার্যকর প্রযুক্তির জাদুঘর বানাতে। সব মিলিয়ে প্রবন্ধটিতে লেখিকার প্যাশন থাকলেও যত্ন নিয়ে লেখা হয়নি। বাঁধের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলো হচ্ছে সামাজিক ন্যায়বিচার, বাস্তুতান্ত্রিক বিচক্ষণতা এবং অর্থনৈতিক উপযোগিতার মানদণ্ডে কিন্তু রায়ের প্রবন্ধে এগুলো হারিয়ে গেছে। তার লেখাটি পড়লে পাঠক যে দুটো জায়গায় আটকে যাবেন, সেগুলো হচ্ছে— বিজ্ঞানের প্রতি ঘৃণা এবং আদিবাসী জীবনধারার রোমান্টিক উদযাপন।
অরুন্ধতী রায়কে বামপন্থীদের অরুণ শুরী বলা যায়। একজন অতি দেশপ্রেমিক আর অন্যজন দেশবিরোধী এবং তারা দুজনই প্রায় একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করেন। তারা একেবারে একমুখী চিন্তা করেন। দুজনই ১০০ শব্দ ব্যবহার করেন, প্রকৃতপক্ষে যা ১০ শব্দেই বলা সম্ভব। দারুণ ঔদ্ধত্যভরে তারা দুজনই মনে করেন যে, অন্যদের নৈতিক সনদপত্র দেয়াটা তাদের অধিকারের মধ্যে পড়ে। অরুণ শুরীর সমালোচনা করলে তিনি দেশবিরোধী আর অরুন্ধতী রায়কে সমালোচনার সাহস দেখালে তাকে রাষ্ট্রের দালাল আখ্যা দেয়া হয়। উভয়ের লেখায় আবেগ আর ঘৃণা প্রকাশের আতিশয্যে ফ্যাক্টগুলো হারিয়ে যায়।
যে কাউকে মানতে হবে যে, অরুন্ধতী রায় একজন সাহসী নারী। অন্য ঔপন্যাসিকরা নিজেদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে রাখতে পছন্দ করেন কিন্তু রায় বরং দুনিয়ার সঙ্গেই যুক্ত হতে চান। খুব কমসংখ্যক লেখকই গণ ইস্যুতে সচেতনতা দেখান। সম্মানিত এ ভিন্নমতাবলম্বীদের মধ্যে আমরা অরুন্ধতী রায়কে কোথায় স্থান দেব?
দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ অ্যাক্টিভিস্ট-ঔপন্যাসিক সম্ভবত জর্জ অরওয়েল। ইটন এবং ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসের চাকরি ছেড়ে অরওয়েল প্যারিসে থালাবাসন ধুয়েছেন, উত্তর ইংল্যান্ডে খনি শ্রমিকদের সঙ্গে থেকেছেন। এরপর স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। দারিদ্র্যকে প্রত্যক্ষ করা এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই তাকে অ্যানিমেল ফার্ম ও ১৯৮৪ এবং রাজনীতি নিয়ে কিছু অমর প্রবন্ধ লিখতে প্রেরণা দিয়েছিল। আধুনিক দুনিয়ার মহারণে তিনি সাহসী কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে আনফ্যাশনেবল অবস্থান নিয়েছিলেন, তার অবস্থান ছিল একই সঙ্গে সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের পক্ষে। অরওয়েলকে আমি জানি তার বইয়ের মাধ্যমে, তবে আধুনিক ভারতের সেরা ঔপন্যাসিক-অ্যাক্টিভিস্ট কোটা শিব্রাম কারান্থকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তিনি তার দীর্ঘ জীবনে বিধবা বিবাহ উৎসাহীকরণে কাজ করেছেন, কন্নড় সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন এবং কর্ণাটকের পরিবেশবাদী আন্দোলনে অগ্রদূতের ভূমিকা রেখেছেন। তুঙ্গভদ্রার দূষণ এবং কাইগা পারমাণবিক প্লান্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। এগুলো ১৯৮০-এর দশকের ঘটনা, কোটা শিব্রামের বয়স তখন নব্বইয়ের ঘরে। এসবের এক দশক আগে উত্তর কন্নড়ে বেদথি পাওয়ার প্রজেক্টের বিরুদ্ধে সফল আন্দোলনে প্রেরণাদায়ী হিসেবে কাজ করেছেন।
সাহসে অরুন্ধতী রায় হয়তো অরওয়েল ও কোটা শিব্রামের সমকক্ষ। কিন্তু তাদের যে বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও মূল্যায়ন করার ক্ষমতা ছিল, সেটা অরুন্ধতীর নেই। অরওয়েল ও কোটা শিব্রামের লেখায় গভীরতা ছিল, একেকটি শব্দ লেখার আগে তারা সেটা ওজন করে নিতেন। একদিক থেকে তারা ভাগ্যবান যে, তারা টেলিভিশন বা রঙিন পত্রিকার আগের যুগের মানুষ। তখন ব্যক্তিত্বের চেয়ে কারো নীতির প্রাধান্য ছিল বেশি। হয়তো অরুন্ধতী রায়ের অসতর্কতার জন্য আমরা আমাদের বর্তমান যুগকে দায়ী করতে পারি। তিনি অসতর্ক এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি যে সংগঠনকে সমর্থন করেন, তাদের দায়ের করা একটি মামলার শুনানি চলকালে রায় সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট বিচারকদের নিয়ে অমর্যদাকর মন্তব্য করেছেন।
বর্তমানে বাঁধের উচ্চতা পাঁচ মিটার বৃদ্ধি করার পক্ষে আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অরুন্ধতী রায় আবার ফেটে পড়েছেন। তিনি বলেছেন, বিচারক এবং বিচার দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমরা ‘ব্যানানা রিপাবলিক’-এ বাস করছি। তিনি বলেছেন, বিচারকরা মূর্খ এবং অসংবেদনশীল। বিদেশী একজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি আদালতের এ রায়কে যুগোস্লাভিয়ায় ন্যাটোর বোমা বর্ষণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আন্দোলনকারীরা যখন আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ পিটিশন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই তিনি এমন মন্তব্য করেন। সামাজিক আন্দোলনে সেলিব্রেটিদের যুক্ত হওয়া সবসময় ঝামেলা বয়ে আনে।
আমি শুনেছি অরুন্ধতী রায় খুব ভালো একটি উপন্যাস লিখেছেন। তার এখন নতুন উপন্যাস লেখায় হাত দেয়া উচিত। অ্যাক্টিভিজম থেকে তার বিরত হওয়া সাহিত্য এবং ভারতীয় পরিবেশবাদী আন্দোলন দুয়ের জন্যই ভালো হবে।
পুনশ্চ: আমার এ লেখাটি যখন ছাপাখানায় যাচ্ছে, তখন আউটলুক ম্যাগাজিনের নতুন সংখ্যা হাতে এল। সমাজবিজ্ঞানে অরুন্ধতী রায়ের নতুন লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এটাও তার অন্য লেখাগুলোর মতোই নিজের স্বার্থে নিজের মতো করে লেখা। প্রবন্ধটি স্ববিরোধীও; তিনি এতে বাজার ও বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন, অথচ তিনি নিজেই তার সেলিব্রেটি মর্যাদার জন্য বৈশ্বিক বাজারের কেন্দ্রে অবস্থান করেন। আমার মনে হয়, ফিকশনে ফিরে যাওয়াটাই অরুন্ধতী রায়ের জন্য ভালো হবে।





