জনাব,                                                                                                                                                                                                 নেদারক্লে হাউজ, টন্টন - ২১ জুলাই, ১৮৯৪


পীর বদর সম্পর্কে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সম্ভবত আপনার কাছে আকর্ষণীয় মনে হবে। তার সম্পর্কে মেজর টেম্পল জার্নালের জুলাই সংখ্যার ৫৬৫ পৃষ্ঠায় লিখেছেন। কিছু তথ্য ডক্টর ওয়াইজের ঢাকা শহরসংক্রান্ত অপ্রকাশিত রচনা থেকে নেয়া হয়েছে। বাকি তথ্যগুলো আমার নিজের নোট থেকে নেয়া।

সমগ্র বাংলা ও উত্তর প্রদেশে এ সাধক সুপরিচিত। তার পুরো নাম বদরউদ্দিন, অর্থ ‘ধর্মের পূর্ণচন্দ্র’। তাকে ‘বদর-ই আলম’ বা ‘জগতের পূর্ণচন্দ্র’ নামেও ডাকা হয়। তিনি ভারতের উত্তর প্রদেশের মিরাটে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি একজন মুসাফির ফকির ছিলেন। হিন্দু থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত রাজা জালালউদ্দিনের (১৪১৪-১৪৩০ খ্রিস্টাব্দ) শাসনামলে বাংলায় ইসলামের প্রচার ও প্রসার বেড়ে যায়। সম্ভবত তখন তিনি বাংলায় এসেছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল চাটগাঁয় (চট্টগ্রাম) বাস করেছিলেন। তার দরগা বা সমাধি এখনো চট্টগ্রাম জেলার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও পবিত্র তীর্থস্থানগুলোর মধ্যে একটি। সহজাত সহনশীলতা ও বিশ্বাস বাংলায় বেশ প্রভাবশালী। তাই হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই সমানভাবে তার মাজারে প্রার্থনা করে। এমনকি বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী মগরাও তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। বলা হয়ে থাকে যে মৃত্যুর কিছুকাল আগে তিনি চট্টগ্রাম ত্যাগ করে বিহারে স্থায়ী হয়েছিলেন। সেখানে ৮৪৪ হিজরি তথা ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

নদী ও সমুদ্রের ওপর তার আধিপত্য আছে। এমন ধারণা তৈরি হওয়ার কারণ নির্ণয় করা কঠিন। এক্ষেত্রে বাংলার মুসলিমদের নিয়ে লেখা আমার একটি প্রবন্ধের রেফারেন্স দেয়া যেতে পারে। এশিয়াটিক কোয়ার্টারলি রিভিউর জুলাই সংখ্যায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে আমি ব্যাখ্যা করেছি, ভারতের অনার্য আদিবাসীদের আদিম প্রকৃতি পূজা এবং স্থানীয় দেবদেবী ও রক্ষাকারী শক্তিসমূহ প্রথমে হিন্দু ধর্মে ঠাঁই পেয়েছে। পর্যায়ক্রমে ইসলাম ধর্মে সেসবের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। আমি আরো ব্যাখ্যা করেছি, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছে শ্রদ্ধেয় অসংখ্য পীর বা সাধকের ওপর খুব সম্ভবত সেই প্রাচীন সর্বপ্রাণবাদী বিশ্বাস আরোপিত হয়েছে। এ প্রক্রিয়ার একটি পর্যায় হলো স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় একজন মুসলিম সাধকের নাম ঠিক করা, যাকে ঘিরে দ্রুত বহু কিংবদন্তি গড়ে উঠবে। এসব কিংবদন্তি অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। সমুদ্র ও নদীমাতৃক ভূখণ্ডের সর্বপ্রাণবাদী মন্দিরে পানিকে শাসনকারী ও ঝড়কে দমনকারী শক্তি একটি স্বাভাবিক ও অপরিহার্য সদস্য ছিল। পূর্ববঙ্গে পীর বদর ছাড়াও জিন্দা গাজি, গাজি মিঞা, পাঁচ পীরসহ আরো অনেকেই আছেন। তারা প্রত্যেকে একই ধরনের ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। পীর বদরের কিংবদন্তি তৈরি হওয়ার ব্যাপারে কিছু অনুমান করা যেতে পারে। এসব অনুমানের সম্ভাবনা অনেক বেশি। ধরা নেয়া যেতে পারে যে জনৈক বদরউদ্দিন বা অন্য কেউ নদী ও সমুদ্রপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। জলপথই সে সময় যাতায়াতের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী ছিল। চট্টগ্রাম নদীর মুখে অবস্থিত বিপজ্জনক বালির স্তূপের সঙ্গে ধাক্কা লেগে তার জাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। তারপর তিনি সাঁতার কেটে কূলে উঠে আসেন। আরো অনুমান করা যায় যে তিনি একটি পর্তুগিজ জাহাজে চড়ে এসেছিলেন। তৎকালে পূর্ববঙ্গের জলপথে এ ধরনের অসংখ্য জাহাজ নিয়মিত চলাচল করত। সেক্ষেত্রে তার নামে প্রচলিত কিংবদন্তির কাঠামো নির্মাণের সব প্রয়োজনীয় উপাদান আমাদের কাছে আছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, চট্টগ্রামে প্রচলিত একটি কিংবদন্তি অনুসারে, তিনি ছিলেন একজন পর্তুগিজ নাবিক। ডক্টর ওয়াইস তার নাম ‘প্যাস গ্যাল পেরিস বোথেইলো’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এটি মূল নামের অপভ্রংশ। এটি বোঝা কঠিন নয় যে প্রকৃত নামটি হলো প্যাসকেল পেরেজ বোতেলহো। সম্ভবত বদরউদ্দিন ও বোতেলহো একত্রে কূলে উঠেছিলেন। তবে সেক্ষেত্রে এ বদরউদ্দিন ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করা বদরউদ্দিন হতে পারেন না। কারণ সে সময়ের আরো পঞ্চাশ বছর পর পর্যন্ত ভারতে কোনো পর্তুগিজ ছিল না। কিন্তু কখন ও কীভাবে বিভিন্ন কিংবদন্তির উদ্ভব ঘটে, তার অনুসন্ধান আমি অর্থহীন মনে করি। একটি কিংবদন্তির নির্যাস কোথা থেকে উৎসারিত হয়, তা প্রত্যয় করে বলা হয়তো কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। মেজর টেম্পল তার লেখায় দেখিয়েছেন যে চট্টগ্রামের এ সাধকের খ্যাতি সমগ্র বার্মা মুলুকে ছড়িয়ে পড়েছে। তা তো হওয়ারই ছিল। এটিই দুনিয়ার সবচেয়ে স্বাভাবিক বিষয়।

আপনারই অনুগত

জন বিমস



জনাব,                                                                                                                                                                                 পিটফোল্ড, শটেসমিল, সারে - ২৪ জুলাই, ১৮৯৪  

আমি দেখছি যে আমাদের সোসাইটির জার্নালের বর্তমান সংখ্যায় মেজর টেম্পল পীর বদর নামে পরিচিত সাধক সম্পর্কে আরো তথ্য জানতে চেয়েছেন। সম্ভবত তিনি এ সংখ্যায় সংযুক্ত ডক্টর ওয়াইসের ‘নোটস অন দ্য রেসেস অব ইস্টার্ন বেঙ্গল’-এর (ব্যক্তিগতভাবে প্রকাশিত) নির্বাচিত অংশ দেখেননি। ১৭ পৃষ্ঠায় পাঁচ পীর শিরোনামের লেখাটিতে ডক্টর ওয়াইস একটি গান উদ্ধৃত করেছেন, যেটি মুসলমান নাবিকরা গঙ্গা পাড়ি দেয়ার সময় গেয়ে থাকে। গানের শেষ লাইন হলো—

শিরে গঙ্গা, পাঁচ পীর, বদর! বদর! বদর!

ডক্টর ওয়াইস একসময় চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ছিলেন।

আপনার বিশ্বস্ত,

এইচ বেভারিজ