[রচনাটি ২০০৭ সালে ওয়েস্টার্ন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ৪২তম মধ্যযুগীয় পাঠ আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে পিটার কনিজনি হাউ টু ইনভেইড ইরাক; দ্য মোঙ্গল ওয়ে’ নামে যে পেপারটি উপস্থাপন করেছেন তার ওপর ভিত্তি করেই লিখিত, অন্যান্য উৎস থেকেও তথ্য সংগৃহীত হয়েছে]

১২৫৮-এর গ্রীষ্মে ধূলিসাৎ হয়ে গেল সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পাদপীঠ বাগদাদ। ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হওয়ার পরও মূলত দুই ঘরানার ঐতিহাসিকরা ঘটনাটিকে দুর্বলভাবে উপস্থাপন করেছেন। দুর্বলতার প্রধান কারণ তাদের পক্ষপাতদুষ্টতা। পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিকরা বাগদাদ অবরোধ আক্রমণকে মোঙ্গলদের ভয়াবহ বর্বরতার বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। 

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এসে আব্বাসীয় শাসনের দুর্বলতাগুলো প্রকট হতে শুরু করে—শাসকদের ভোগবিলাস এর অন্যতম কারণ। একই সাথে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে ও বাইরে তুর্কি ও মামলুক নেতারা খলিফার কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করে। তখনো পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞান ও সংস্কৃতিকেন্দ্র হিসেবে বাগদাদের গৌরব ও ঐশ্বর্য স্বীকৃত ছিল। ওদিকে পূর্ব দিক থেকে চেঙ্গিস খানের অব্যাহত সাম্রাজ্য বিস্তার পরিকল্পনা আব্বাসীয়দের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তুর্কি হাবসি শাসক দ্বিতীয় আলাউদ্দিন মুহাম্মদ (১১৬৯-১২২০) যখন আব্বাসীয় সাম্রাজ্য আক্রমণের হুমকি দেন তখন খলিফা সহযোগিতার আলোচনার জন্য চেঙ্গিস খানের কাছে দূত পাঠিয়েছিলেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র গোষ্ঠীগত বিভেদ ও লড়াই, খণ্ড খণ্ড জনযুদ্ধ ও কেন্দ্রীয় দুঃশাসন আব্বাসীয় শাসন কাঠামোকে দুর্বল করে তোলে। সেই সাথে যোগ হয় উপর্যুপরি বন্যা এবং বেশ ক’টি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড।

১২৪২ সালে পিতা খলিফা আল মুনতাসির বিল্লাহর মৃত্যুর পর আল মুনতাসিম বিল্লাহ যখন ৩৭তম আব্বাসীয় খলিফা হিসেবে শপথ নেন তার পক্ষে সেই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে বোঝা সম্ভব ছিল না যে তিনিই আব্বাসীয় যুগের শেষ খলিফা। খলিফা আল মুনতাসিম বিল্লাহর অদক্ষতা নিয়ে তার সমকালীন ও পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকদের কারোই দ্বিমত নেই। একজন লিখেছেন, ‘ভোগ ও আনন্দে তিনি নিবেদিত ছিলেন, তিনি নারীবেষ্টিত ও নারী নিয়ন্ত্রিত ছিলেন, তিনি বাজপাখি নিয়ে খেলায় মজে থাকতেন। তার বিচার ও বিবেচনাশক্তি ছিল কম, তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতেন, সরকার পরিচালনায় তার নিজের ভূমিকাকে তিনি অবহেলা করতেন।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘নিঃসন্দেহে রাজ্য শাসন করার মতো দক্ষতা ও মহত্ত্ব থেকে তিনি বঞ্চিত ছিলেন।’ তার দরবারকে চিহ্নিত করা হয়েছে ষড়যন্ত্রকারীদের আখড়া হিসেবে, যেখানে ষড়যন্ত্রকারীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেই অধিকাংশ সময় কাটাতেন। খলিফার প্রধান সেনা কমান্ডার, যার খেতাব ছিল দাওয়াতদার, তিনি নিজেই ক্ষমতালাভের জন্য উচ্চাভিলাষী হয়ে ওঠেন। 

১২৫৬-এর গ্রীষ্মের শুরুতে মোঙ্গল বাহিনী ইরান আক্রমণ করে। তখন টাইগ্রিস নদীর বন্যায় তীর প্লাবিত হয়ে বাগদাদ শহরে পানি ঢুকে পড়েছে। পানি সরে যাওয়ার আগেই শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে বিরোধ রক্তাক্ত চেহারা ধারণ করে। খলিফার এক পুত্রের নেতৃত্বে সৈন্যরা কার্থ অঞ্চলে গিয়ে বহুসংখ্যক শিয়া নাগরিককে হত্যা করে। এ সময় শিয়া উজির তার নিজ বাসভবন খুলে দিয়ে শত শত শিয়াকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন। সুন্নি ঐতিহাসিকরা অভিযোগ করেণ এ সময়ই ক্ষুব্ধ উজির সঙ্গোপনে মোঙ্গল বাহিনীর আগমন স্বাগত জানান এবং তাদের সমর্থন করেন।

আব্বাসীয় সাম্রাজ্যে যখন ক্ষয় শুরু হয়ে গেছে, মোঙ্গলরা তখন ক্ষমতা ও বৈভবের শীর্ষে। তখনকার শাসক যখন বিশ্বজয়ের পরিকল্পনা করছেন, তার আসন্ন টার্গেটের মধ্যে তখন ইরাক ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশকিছু অংশ। ১২২০-এর দশক থেকেই বাগদাদ তাদের হুমকিতে ছিল। ১২৫৪ সালের আগে আব্বাসীয় খলিফা তাদের কাছে কিছুটা আনত হয়েছিলেন, কিন্তু মোঙ্গলদের চাওয়া ছিল বাগদাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। মঙকে খান তার ভাই হালাকু খানকে দুই লাখ সৈন্যের একটি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে নির্দেশ দেন; মধ্যপ্রাচ্যে যা কিছু আছে পদানত করো। যদি বাগদাদের খলিফা সম্মান জানান তাহলে তাকে কোনোভাবেই লাঞ্ছিত করবে না, যদি তিনি অহংকার প্রকাশ করেন তাহলে অন্যদের মতো তাকেও গুঁড়িয়ে দেবে।

প্রকারান্তরে বাধাগ্রস্ত হলে ধ্বংস করার নির্দেশ নিয়ে হালাকু খানের বাহিনী অগ্রসর হয়। হালাকুর বাহিনী ১২৫৪ সালে অভিযানে বের হয়। তাদের অশ্বারোহী বাহিনীর দাপট দেখে আফগানিস্তান ও পারস্যের অধিকাংশ স্থানীয় শাসক দ্রুত আত্মসমর্পণ করে। তবে উত্তর ইরানের ইসমাইলিরা তাদের প্রতিহত করতে থাকে। দুই বছরের মধ্যে তাদের সম্পূর্ণ পরাজয় ও পতন ঘটে; ততক্ষণে মোঙ্গলরা আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক সীমান্তের আন্তঃদেশে পৌঁছে গেছে। এর আগে হালাকু খান ইসমাইলিদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাকে সহায়তা করার জন্য সেনা সমর্থন চেয়ে খলিফা আল-মুস্তাসিমকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। খলিফা তাতে সাড়া না দেয়ায় মোঙ্গলদের ইরাক আক্রণের একটি অজুহাত সৃষ্টি হয়। তারা হালাকু খানের বিশেষ ধরনের মোঙ্গলীয় বার্তা পাঠায়; ‘আমি যখন বাগদাদের বিরুদ্ধে আমার সৈন্য পরিচালনা করব, আপনি যদি ভূগর্ভে কিংবা আকাশেও কোথাও লুকান, জেনে রাখুন আমি আপনার রাজত্বে একজনকেও জীবিত রাখব না; আমি আপনার শহর ও দেশ পুড়িয়ে ছাড়খার করে ফেলব।’

খলিফা মধ্যপ্রাচ্যের সমন্ধে কাব্য ভাষায় জবাব পাঠিয়ে দেন: ‘আপনি সৈন্যবাহিনী, সমরকৌশল, ফাঁস সবকিছু নিয়ে আসতে পারেন, কিন্তু আপনি একটি নক্ষত্রকে অধিকার করবেন কেমন করে? রাজপুত্র (হালাকু খান) কি জানেন না পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত বাদশা থেকে ভিখারি পর্যন্ত, বৃদ্ধ থেকে তরুণরা পর্যন্ত এ দরবারের সদস্য এবং আমার সেনাবাহিনীর সৈনিক?’

শিয়া মতাবলম্বী উজির শান্তি স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে খলিফাকে অনুরোধ করেন, কিন্তু সেনাধ্যাক্ষ ও অন্য সব সভাসদ দাবি জানালেন হালাকু খানের জন্য কোনো দয়া নয়, তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে। খলিফা আল মুস্তাসিম সৈন্যবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। বাগদাদ রক্ষা করতে কুর্দি সৈন্যদের ভাড়া করে এনে মোতায়েন করা হলো, কিন্তু খলিফা একসময় তাদের ভাতা বন্ধ করে দেয়ায় তারা নগর অরক্ষিত করে প্রত্যাবর্তন করে। জিহাদের নামে সিরিয়া ও মিসর থেকে স্বেচ্ছাসেবক সৈন্য আনার প্রক্রিয়াটিও ভেস্তে যায়। মোঙ্গলীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ক্রসেড বা ধর্মযুদ্ধ হিসেবে গৃহীত হয়নি। এক্ষেত্রে খলিফা আল-মুস্তাসিমের ব্যক্তিগত ইমেজেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু হালাকু খানের বহুজাতিক প্রস্তুতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মোঙ্গলদের সমরাঙ্গনে সহায়তা করার জন্য জর্জিয়ান ও আর্মেনিয়ান সৈন্যবাহিনীও প্রস্তুত হয়। এটাকে প্রচলিত অর্থে স্বাভাবিক ঐক্যের আঁতাত মনে করা ঠিক হবে না। কারণ ক্ষুদ্র শক্তিগুলো আতঙ্কিত ছিল যে হালাকু খানকে সমর্থন না করলে তারাই মোঙ্গলদের পরবর্তী টার্গেটে পরিণত হবে। এক্ষেত্রে মসুলের সুলতান বদর আল-দীন লুলুর ভূমিকা লক্ষণীয়। তিনি বিগত সময়ে মোঙ্গল ও আব্বাসীয় উভয়ের সাথে চুক্তিবন্ধ হয়েছেন। কোনো কারণে এক পক্ষ আক্রান্ত হলে তিনি সামরিক সাহায্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। একই সময়ে হালাকু খানের মোঙ্গল দূত চেয়েছেন যুদ্ধাস্ত্র ও অবরোধন সরঞ্জাম আর খলিফার দূত খলিফার নির্দেশমতো চেয়েছেন বাগদাদে প্রেরণের জন্য ব্যান্ড পার্টি।

১২৫৭ সালের নভেম্বরে ১৫-১৭ জন কমান্ডারের নেতৃত্বে পশ্চিম ইরান থেকে হালাকু খানের মোঙ্গল বাহিনী যাত্রা করে। একটি কমান্ডারের অধীনে ১০ হাজার সৈন্যের বহর। তাদের সাথে সহযোগী বাহিনী হিসেবে আর্মেনিয়া ও ইরানি সৈন্য মিলে মোট সংখ্যা তিন লাখের কাছাকাছি হওয়ার কথা। অনেক ঐতিহাসিকের মতে সৈন্য দুই লাখ।

মোঙ্গল যুদ্ধকৌশলের যে টেক্সট বই বিবরণের সাথে পৃথিবী পরিচিত, বাগদাদের বেলায়ও তা-ই করা হয়েছে। ইরাকের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে তারা প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন দিক দিয়ে আক্রমণ চালায়, তাতে আব্বাসীয় বাহিনী হতভম্ব হয়ে পড়ে। দাওয়াতদারের নেতৃত্বাধীন ইরাকি বাহিনী প্রথমে বাগদাদের পূর্ব দিকে বাকুবায় অবস্থান নেয়। কিন্তু অল্পকালের মধ্যে তাদের শহরে ফিরে আসার নির্দেশ দিয়ে পশ্চিমাংশে প্রতিরোধ গড়তে বলা হয়। কারণ মোঙ্গলরা নিজেরাই অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করে ইউফ্রেটিস নদী পেরিয়ে তিকরিতের কাছে চলে এসেছে। ১২৫৮-এর ১১ জানুয়ারি বাগদাদের ৩০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে আনবারে আব্বাসীয়দের সাথে মোঙ্গলদের লড়াই হয় এবং হানাদার হালাকু খানের বাহিনীকে পরাস্ত করে সামনে আর না এগিয়ে বিজয় উৎসব ও মদ্যপানে মেতে ওঠে। দাওয়াতদার খলিফাকে পাঠানো বার্তায় উল্লেখ করেন, আমি তাদের সবাইকে পরাজিত করেছি, যে ক’জন বেঁচে আছে তাদের ব্যাপারে কাল সিদ্ধান্ত নেব।

বাস্তবে আব্বাসীয় সেনাবাহিনী যাদের পরাজিত করেছে তারা মোটেও মোঙ্গলদের মূল বাহিনী নয়। এটা ছিল পরিস্থিতি এবং আব্বাসীয়দের সমরশক্তি যাচাই করার জন্য প্রেরিত একটি ছোট দল। বড় দলটি সন্ধ্যা নাগাদ এসে হাজির হলো এবং সীমান্ত ঘেরাও করে ইউফ্রেটিসে বিভিন্ন বাঁধ কেটে দিলে প্রবল বেগে ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করল। এমন একটি সমরকৌশলের কথা আব্বাসীয়রা কখনো ভাবতেই পারেনি। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আব্বাসীয় বাহিনী নিজেদের পানিবন্দি অবস্থায় আবিষ্কার করল। তার পরই শুরু হলো হালাকুর সৈন্যদের আক্রমণ। ১২ হাজার ইরাকি সৈন্য তাদের তরবারির আঘাতে এবং পানিতে ঢুবে মৃত্যুবরণ করল। একজন ঐতিহাসিকের মতে, সেনাধ্যক্ষ দাওয়াতদারসহ মোট তিসজন প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বাগদাদে ফিরতে পারলেন। তারা না ফেরা পর্যন্ত বাগদাদের বাইরে অন্য কোথাও আক্রমণকারীদের প্রতিহত করার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তবে শহর প্রতিরক্ষায় ৬০ হাজার সৈন্য ও রসদ মোতায়েন অব্যাহত থাকে।

ওদিকে মোঙ্গল সৈন্যদের আগে আগে আতঙ্কিত ও ধাওয়া খাওয়া মানুষের মিছিল বাগদাদের দিকে আসতে থাকে। শহরের খাদ্য সরবরাহের ওপর চাপ পড়ে এবং রাস্তাঘাট লোকারণ্য হয়ে যায়। আবর্জনার স্তূপে ভরে যায় চারদিক।

১৮ জানুয়ারি হালাকু খানের বাহিনী চারদিক থেকে বাগদাদ ঘিরে ফেলে। টাইগ্রিস নদীর ওপর তারা কয়েকটি অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করে। পারাপারের জন্য বহুসংখ্যক ইরাকি নৌকা নিজেদের দখলে নিয়ে যায়। তারা তখনই আক্রমণ চালায়নি। নিজেদের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য শহরের চারদিকে দ্রুত মাটির দেয়াল তোলে এবং দেয়ালের সামনে পরিখা খনন করে তাতে পানি প্রবাহিত করে, দেয়ালের পেছনে উঁচু ঢিবি তৈরি করে নিক্ষেপযোগ্য যুদ্ধাস্ত্র স্থাপন করে। এ সময় খলিফা সন্ধি স্থাপনের চেষ্টায় উজির ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একজন নেতাকে কিছু উপহারসামগ্রী দিয়ে হালাকু খানের কাছে পাঠান। এ উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। ২৯ জানুয়ারি মোঙ্গল বাহিনী আক্রমণ শুরু করে। বাগদাদের পশ্চিমাংশে কোনো দেয়াল ছিল না, যুদ্ধের পথম দিনই তার পতন ঘটে।

মিনারের পতন ঘটে যুদ্ধের তৃতীয় দিন ১ ফেব্রুয়ারি। সেদিন সেনাধ্যক্ষ ১০ হাজার সৈন্যের এক বাহিনীকে টাইগ্রিস নদীতে জাহাজে অবস্থান নিতে নির্দেশ দেন। মনে করা হলো মোঙ্গলদের পেছন থেকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে এ আয়োজন। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, খলিফা সেনাধ্যক্ষসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপদে পলায়নের জন্য এ ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু মোঙ্গল বাহিনীর কামানে নিক্ষিপ্ত প্রস্তরাঘাতে যখন জাহাজ ভাঙতে শুরু করে এবং অবিরাম তীর নিক্ষিপ্ত হতে থাকে, এক পর্যায়ে তিনটি ইরাকি জাহাজ শত্রুর দখলে চলে যায় দাওয়াতদার দলবলসহ শহরে চলে আসতে বাধ্য হন।

হালাকু খান দুদিন পর বাগদাদ দখলের নির্দেশ দেন। বাগদাদবাসী বুঝে যায় তাদের প্রতিরোধ ভেঙে গেছে, আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তারা দলে দলে রাস্তায় নেমে আসে। হালাকু জানান, খলিফা যদি নেমে এস আত্মসমর্পণ না করেন, তাহলে তিনি প্রাসাদেই থাকুন। সৈন্যরা প্রসাদে ঢুকবে না, খলিফা যতদিন না বের হন তারা অপেক্ষা করতে থাকবে।

যারা আত্মসমর্পণ করছে তাদের কাউকে জীবন ভিক্ষা দেয়া হচ্ছে, অন্যদের দ্রুত হত্যা করা হচ্ছে। দাওয়াতদার তার সৈন্যদের অস্ত্র সমর্পণের নির্দেশ আনতে খলিফার কাছে গেলেন। অনুমতি পেলেন। তারপর ঘুরে ঘুরে তার সৈন্যদের অস্ত্র সমর্পণের নির্দেশ দিয়ে আত্মসমর্পণের জন্য মোঙ্গল শিবিরে এলেন। তার মাথা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে মাথাটা সতর্ক সংকেত হিসেবে মসুলের সুলতান লুলুর কাছে পাঠিয়ে দেয়া হলো।

তারপর শুরু হলো হত্যাকাণ্ড। একের পর এক হত্যাকাণ্ড চলতেই থাকল। সুলতান বললেন, আমার শত্রুরা জিতেছে আর আমি চালাক ছোট পাখির মতো ফাঁদে পড়ে গেছি। আমার চোখের সামনে আমার দেশবাসীকে জবাই করা হচ্ছে। খলিফার সৈন্যবাহিনীর সবাইকে হত্যা করার পর ১৩ ফেব্রুয়ারি ১২৫৭ হালাকু খান তার সৈন্যদের বাগদাদ শহরের ভেতরে প্রবেশের অনুমাতি দিলেন। তারা এক সপ্তাহ শহরে ছিল এবং এমন কোনো নারকীয় কাণ্ড নেই যে সৈন্যরা করেনি। ১২৬২ সালে হালাকু খান নিজেই গর্ব করে লিখেছেন, আমার সৈন্যরা দুই লাখ মানুষকে কেটে টুকরো করেছে। চতুর্দশ শতাব্দীর লেখকদের মতে, সংখ্যাটি কমপক্ষে আট লাখ হবে। পঞ্চদশ শতাব্দীর আরব ঐতিহাসিকদের মতে, বাগদাদে হত্যাযজ্ঞ ৪০ দিন ধরে চলে। ততদিনে মৃত্যু ১০ লাখ পেরিয়ে যায়। 

একজন ঐতিহাসিক লিখেছেন, উজির সৈন্যদের আক্রমণের শিকার হয়নি। খ্রিস্টান ও ইহুদিরা বেঁচে গেছে। তখনকার একজন শিয়া কর্মকর্তা লিখেছেন, তার পরিবারের কোনো সদস্য নিহত হননি।

নিহত পচাগলা মানুষের দুর্গন্ধ ও অগ্নিদগ্ধ শহরের দানবীয় চেহারা আর সহ্য করতে না পেরে ২০ ফেব্রুয়ারি হালাকু খান বাগদাদ ত্যাগ করেন। তিনি খলিফা আল মুসতাসিম ও তার পরিজনকে সাথে নেন। তিনি খলিফাকে ছেড়ে দিয়ে তাকেই পুতুল শাসক বানিয়ে ইরাক নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার শিয়া উপদেষ্টা বললেন, খলিফা বেঁচে থাকলে তাকে ঘিরে আবার সুন্নি মুসলমানদের জাগরণ ঘটবে, তা আরো বেশি সংকটের সৃষ্টি করবে। 

হালাকু খান যুক্তি মেনে নিলেন। খলিফাকে হত্যা করা হলে রাজরক্ত মাটিতে পড়বে, তাতে মোঙ্গলদের ক্ষতির আশঙ্ক থাকবে, এই সংস্কারে বিশ্বাসী মোঙ্গল সৈন্যরা তাকে একটি বড় চামড়ার বস্তায় ভরে মুখ বন্ধ করে একের পর একে লাথি মেরে হত্যা করে।

মার্কো পলোর বর্ণনাটি ভিন্ন। স্বর্ণ, রৌপ্য ও অন্যান্য দামি আলংকারপূর্ণ একটি টাওয়ারে খলিফাকে উঠিয়ে হালাকু খান বলেন, আপনি তো সব সময় এগুলোই বেশি পছন্দ করতেন। এসব খেয়েই দিন কাটান। এ অবস্থায় ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত খলিফা চতুর্থ দিন মৃত্যুবরণ করেন।

পেছনে রয়ে যায় ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক সভ্যতা। মর্মান্তিক এই বাগদাদের পতন। হালাকু খানের নির্মমতার কাহিনীর সাথে তার সৃজনশীলতার কথাও বলা হয়। চমত্কার চিঠি লিখতেন, কবিতার ভাষায়।


এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা