বাগদাদের কেন্দ্রে অবস্থিত বাব আল-শারজি জেলাটির নাম মধ্যযুগে নির্মিত শহরটির রক্ষাপ্রাচীর থেকে এসেছে। এর অর্থ পূর্ব দরজা। এ দেয়ালগুলো সম্ভবত দশম শতাব্দীর প্রথমার্ধে নির্মিত হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে ব্রিটিশদের স্বল্পকালীন অবস্থানের সময় এর গেটহাউজটি গ্যারিসন গির্জা হিসেবে ব্যবহূত হয়েছিল। মধ্যযুগের সেসব প্রাচীর বা পূর্ব দরজা কোনোটাই আজ অবশিষ্ট নেই। বাব আল-শারজি বলতে আমার যা মনে আছে তাহলো একটি বিস্তীর্ণ, কোলাহলপূর্ণ ও ব্যাপক কর্মযজ্ঞের এলাকা, যেখানে ব্যস্ত বাসস্ট্যান্ড এবং সারি সারি ট্যাক্সির মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে খাবার ও পুরনো ক্যাসেটের দোকান। তবে শক্তিশালী আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের ক্ষমতার নতুন কেন্দ্র হিসেবে ৭৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এর নামটি বছরের পর বছর ধরে এ অভিজাত শহরটির সম্প্রসারণ ও রূপান্তরের কথাকেই মনে করিয়ে দেয়। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর আর কোনো শহরকে এত বেশি ধ্বংস ও মৃত্যুর উত্পীড়ন সহ্য করতে হয়নি, যা বহু শতাব্দী ধরে বাগদাদ সহ্য করেছে। তবু বিশ্বের অন্যতম বড় সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে অর্ধ সহস্রাব্দের জন্য এটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত, অভিজাত ও ঈর্ষণীয় শহর।
শহরটি প্রতিষ্ঠার ঠিক ১ হাজার ২০০ বছর পর আমি বাগদাদের শিয়া অধ্যুষিত জেলা কারাদাত মারিয়ামে জন্মগ্রহণ করেছি। এখানে বড় একটি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে। জায়গাটি আজকের গ্রিন জোন থেকে পাথর নিক্ষেপের দূরত্বে। ৭৮৬ সালে বাগদাদের একজন অন্যতম বিখ্যাত শাসক যেখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, জায়গাটি তার থেকে কয়েক মাইল দক্ষিণে। তার নাম আবু জাফর আল-মামুন। অর্ধ আরব-অর্ধ পারসিক এ খলিফা ইসলামী শাসকদের মধ্যে বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং প্রাচীন গ্রিসের পর জ্ঞান ও শিক্ষা বিষয়ে বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় যুগের সূচনা করেছিলেন।
অষ্টম শতাব্দীতে যখন পশ্চিম ইউরোপ অন্ধকার যুগে নিমজ্জিত, তখন ইসলামিক সাম্রাজ্য ব্যাপ্তিতে রোমান সাম্রাজ্যকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল কিংবা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট কর্তৃক বিজিত অঞ্চল থেকেও বেশি বিস্তৃত ছিল। সাম্রাজ্যটি এতই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ছিল যে ৭০০ বছরেরও বেশি সময় বিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক ভাষা ছিল আরবি।
কিশোর যুবরাজ মামুন বাগদাদকে তার স্বর্ণযুগে দেখেছিলেন। এটি ছিল একটি বিশাল, সুন্দর শহর, যা বিখ্যাত আব্বাসীয় স্থাপত্যের সূক্ষ্ম নকশায় নির্মিত গম্বুজ ও খিলান দ্বারা সুসজ্জিত ছিল। প্রথম ইটটা গাঁথার পর মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে এটি বিশ্বের বৃহত্তম নগরীতে পরিণত হয়েছিল। এর জনসংখ্যা ছিল ১০ লাখেরও বেশি।
জ্ঞান বিজ্ঞানের পৃষ্ঠাপোষক খলিফা একমাত্র মামুনই ছিলেন তা নয়। তবে অবশ্যই তিনি ছিলেন সবচেয়ে সংস্কৃতিবান, আবেগী ও উৎসাহী। কৈশোরেই তিনি পবিত্র কুরআন মুখস্থ করেছিলেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগের ইতিহাস অধ্যয়ন করেছিলেন। তিনি কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং নতুন আরবি ব্যাকরণের নিয়ম আয়ত্ত করেছিলেন। তিনি রাজস্ব গণনার জন্য গণিত এবং এর প্রয়োগ অধ্যয়ন করেছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি ছিলেন দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। আরো নির্দিষ্ট করে বললে তিনি ‘কালাম’ শাস্ত্রে অভিজ্ঞ ছিলেন, যা দ্বান্দ্বিক বিতর্ক ও যুক্তির একটি রূপ। প্রাথমিক কালের মুসলিম ধর্মতত্ত্ববিদরা দেখতে পেলেন যে কালামের কৌশলগুলো তাদের সঙ্গে বসবাসকারী খ্রিস্টান এবং ইহুদি পণ্ডিতদের সঙ্গে ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনায় তাদের এগিয়ে রাখছে, যারা গ্রিক পণ্ডিত সক্রেটিস, প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের লেখা পড়ে আগে থেকেই তর্কশাস্ত্রে নিজেদের শাণিত করেছিলেন। যুবক মামুন নিশ্চিতভাবেই এসব পণ্ডিতের নাম জানতেন। এমনকি এ সম্ভাবনাও রয়েছে যে নবম শতকের গোড়ার দিকে তাদের কিছু কাজ এরই মধ্যে আরবিতে অনূদিত হয়ে গিয়েছিল।
মামুনের পৃষ্ঠপোষকতা এবং অন্যান্য ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি উদার মনোভাবের কারণে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে বহু পণ্ডিত বাগদাদের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। আশাবাদিতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে সুনামের কারণেই তারা বাগদাদের প্রতি আকৃষ্ট হন। প্রতি সপ্তাহে অতিথিদের প্রাসাদে নিমন্ত্রণ করা হতো। তাদের খাবার ও শরবত পরিবেশন করা হতো এবং তারপর খলিফার সঙ্গে ধর্মতত্ত্ব থেকে শুরু করে গণিত পর্যন্ত সব ধরনের বিদ্যা নিয়ে আলোচনা হত। তিনি প্রাচীন বৈজ্ঞানিক গ্রন্থগুলো সংগ্রহের জন্য দূর-দূরান্তে দূত পাঠাতেন। যেমন সালমান নামের এক ব্যক্তিকে সম্রাট পঞ্চম লিওর কাছ থেকে গ্রিক গ্রন্থ সংগ্রহের জন্য কনস্ট্যান্টিনোপল পাঠানো হয়েছিল। অনেক সময় পরাজিত বিদেশী শাসকদের আত্মসমর্পণের সময় স্বর্ণের পরিবর্তে তাদের গ্রন্থাগারের বই দিয়ে আত্মসমর্পণের শর্ত নিষ্পন্ন করা হতো।
মামুন এতই ক্ষ্যাপাটে হয়ে গিয়েছিলেন যে পৃথিবীর সব বই এক ছাদের নিচে সংগ্রহ করতে, সেগুলো আরবিতে অনুবাদ করতে এবং তার পণ্ডিতদের তা অধ্যয়নের জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তিনি যে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছিলেন, তা বৈজ্ঞানিক স্বর্ণযুগের ফুল ফোটানোর চেয়েও বেশি কিছু। এটি বিশ্বজুড়ে হাউজ অব উইজডম বা বায়ত আল-হিকমা নামে পরিচিতি লাভ করে।
বর্তমানে এ একাডেমির কোনো ভৌত চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। সুতরাং এটি ঠিক কোথায় ছিল বা এটি দেখতে কেমন ছিল, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। এমনকি কিছু ঐতিহাসিক এর ব্যাপ্তি, উদ্দেশ্য এবং এটি স্থাপনে মামুনের ভূমিকা সম্পর্কে অতিরঞ্জিত দাবির বিরুদ্ধে মতামত দিয়েছেন। তবে এর কাজ যা-ই হোক না কেন এবং বাগদাদের অনেক পণ্ডিতই এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হলেও এতে কোনো সন্দেহ নেই যে হাউজ অব উইজডম এ স্বর্ণযুগের প্রতীক হিসেবে কিংবদন্তির অবস্থানে চলে গেছে। যেমন এক হাজার বছর আগে আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি কিংবদন্তির খ্যাতি লাভ করেছিল।
গ্রিস, পারস্য ও ভারত থেকে গ্রন্থ সংগ্রহের কারণে খুব দ্রুত সময়ে হাউজ অব উইজডম সমৃদ্ধ হয়েছিল। এ গ্রন্থগুলোর আরবি অনুবাদ এত বেশি হয়েছিল যে এটি বাগদাদে একটি শিল্পে পরিণত হয়। এ প্রবৃদ্ধি কাগজের ব্যবহারের সঙ্গে আরো গতি পায়। আরবরা চীনা যুদ্ধবন্দিদের কাছ থেকে কাগজ তৈরি করা শিখেছিল। প্যাপিরাস ও চামড়ার পরিবর্তে এটি ছিল সস্তা লেখার উপাদান। অনুবাদকদের লিপিকার থাকত, যারা তাদের কাজ রেকর্ড করত এবং প্রতিটি বইয়ের একাধিক অনুলিপি তৈরি করত। নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি বাগদাদ সভ্য বিশ্বের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছিল। আরব ও পারসিক দার্শনিক এবং বিজ্ঞানীদের কাছে বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে এটি ছিল আকর্ষণীয় স্থান।
বাগদাদের অনুবাদকদের মধ্যে সর্বাধিক বিখ্যাত ছিলেন হুনায়েন ইবনে ইসহাক। তিনি খ্রিস্টান অধ্যুষিত প্রাচীন শহর হীরাতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং কখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। গ্রিক পাণ্ডুলিপির সন্ধানে তিনি বহু বছর বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করেছেন। তিনি চিকিৎসক গ্যালেনের চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কিত কাজ অনুবাদ করেছেন, যা তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কারণ এটি কেবল ইসলামী বিশ্বকে এ মহান রত্নের সন্ধান দেয়নি, অনেক ক্ষেত্রে কেবল এই আরবি অনুবাদের মাধ্যমেই গ্যালেনের অনেক কাজ টিকে গিয়েছে।
মেধাবী যুবক হুনায়েনকে বানু মুসার ভাইরা খলিফা মামুনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এ ভাইরা হাউজ অব উইজডমের সঙ্গে যুক্ত তিনজন বিচিত্র মানুষ ছিলেন। জ্যেষ্ঠ ভাই মোহাম্মদ ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি বলেছিলেন চাঁদ ও গ্রহগুলোসহ মহাজাগতিক সব বস্তুই পৃথিবীর মতো পদার্থবিজ্ঞানের একই সূত্র মেনে চলে। এটি ছিল মহাবিশ্বের ব্যাপারে অ্যারিস্টটলের প্রচলিত মতের বাইরে স্পষ্টভাবে ভিন্ন একটি মতামত। প্রকৃতপক্ষে তার বই ‘অ্যাস্ট্রাল মোশন অ্যান্ড দ্য ফোর্স অব অ্যাট্রাকশন’ পরিষ্কারভাবে ইঙ্গিত দেয় যে নিউটনের মহাকর্ষ বলের ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি না মিললেও এমন একটা বলের ব্যাপারে তার ধারণা ছিল। এ ভাইরা সম্ভবত তাদের দুর্দান্ত আবিষ্কার ও প্রকৌশলের জন্য সর্বাধিক পরিচিত। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল ৮৫০ সালে প্রকাশিত তাদের বই ‘বুক অব ইনজিনিয়াস ডিভাইসেস’। এটি ছিল যান্ত্রিক প্রকৌশলের ওপর একটি বৃহৎ চিত্রিত কাজ, যার মধ্যে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র, ধাঁধা ও যাদুর কৌশল লিপিবদ্ধ ছিল। সবচেয়ে আকর্ষণীয় একটি বিষয় ছিল সম্ভবত প্রোগ্রামযোগ্য মেশিন, যা ছিল একটি রোবোটিকস বাঁশিবাদক। মামুন কর্তৃক হাউজ অব উইজডমে নিযুক্ত অন্য একজন ব্যক্তি আজ পর্যন্ত ‘আরবদের দার্শনিক’ হিসেবে পরিচিত। তার নাম আল-কিন্দি (৮০১-৮৭৩)। তিনি আব্বাসীয় যুগের সব বিষয়ের পণ্ডিতদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত হন। তিনি আরবের বসরায় শক্তিশালী কিন্দা গোত্রে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ধারণা করা হয় জীবনের প্রথম দিকে তিনি বাগদাদে চলে আসেন এবং সেখানে পড়াশোনা করেন। তিনি ছিলেন একজন বড় গণিতবিদ। তিনি ক্রিপ্টো অ্যানালাইসিস অধ্যয়ন করেছিলেন এবং তিনি ছিলেন ইসলামী সাম্রাজ্যের সংগীতের প্রথম মহান তাত্ত্বিক। তবে তিনি মূলত অ্যারিস্টটলের দর্শনকে আরবিভাষী বিশ্বে পরিচিত করার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি একে মুসলিম পাঠকের জন্য পাঠযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলেন। কিন্দির রচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল অ্যারিস্টটলীয় দর্শনকে ইসলামী ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে মিশ্রিত করা। ফলে দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদদের মধ্যে কয়েকশ বছর চলতে পারে এমন বিতর্কের জন্য একটি বৌদ্ধিক প্লাটফর্ম তৈরি করা।
মামুনের বাগদাদের আরেকজন বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন গণিতবিদ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি। বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের অন্যতম বিখ্যাত ইতিহাসবিদ জর্জ সার্টন ‘ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য হিস্ট্রি অব সায়েন্স’ শিরোনামে কয়েক খণ্ডের একটি রেফারেন্স বই লিখেছেন, যেখানে তিনি বিশ্ব ইতিহাসকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেছেন। প্রত্যেক ভাগের নাম বিশ্বের তত্কালীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানীর নামে নামকরণ করা হয়েছে। তিনি ৮০০-৮৫০ এর মধ্যবর্তী সময়কে আল-খোয়ারিজমির কালপর্ব হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
খোয়ারিজমি ৭৮০ সালের দিকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ৮৫০ সালের দিকে মৃত্যুবরণ করেন। তার নাম থেকে জানা যায় যে তিনি মূলত উজবেকিস্তানের খোরেজম নামক একটি প্রদেশ থেকে এসেছিলেন। তিনি গণিতবিদ, ভূগোলবিদ ও জ্যোতির্বিদ হিসেবে হাউজ অব উইজডমে কাজ করেছিলেন। কিন্দির সঙ্গে মিলে তিনি আরবদের ভারতীয় দশমিক সংখ্যার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, যা এখন আমরা ব্যবহার করি। তবে তার সবচেয়ে বড় অবদান হলো বীজগণিত সম্পর্কিত অসাধারণ বই। প্রকৃতপক্ষে ‘অ্যালজেবরা’ বা বীজগণিত শব্দটি এ বইয়ের শিরোনাম থেকে এসেছে, যা ছিল কিতাবুল জেবর। এ বইতে তিনি প্রথমবার বীজগণিতীয় সমীকরণ সমাধানের নিয়ম ও পদক্ষেপ দেখিয়েছিলেন।
নিজের শিক্ষার স্তর নিয়ে সন্তুষ্ট না হয়ে খলিফা মামুন নবম শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বাগদাদে প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত পর্যবেক্ষণের জন্য ভবন নির্মাণের নির্দেশ দেন। এটাই ছিল একমাত্র কেন্দ্র, যার মাধ্যমে তার জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রায়ই বিভিন্ন দ্বন্দ্বপূর্ণ গ্রিক, পারসিক ও ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত গ্রন্থগুলোর যথার্থতা নির্ণয় করতে পারতেন। পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি সম্ভবত বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে নির্মিত বৃহৎ আকারের বিজ্ঞান প্রকল্প ছিল।
মামুন গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ ও ভূগোলবিদদের একটি মেধাবী দলকে বিশ্বের একটি নতুন মানচিত্র অংকনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার জন্য একত্রিত করেছিলেন। তার পর তাদের পৃথিবীর পরিধি পরিমাপের একটি নতুন উপায় বের করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ অর্থে মামুনের আসল অবদান হলো বিজ্ঞানের জন্য বৃহৎ পরিসরে তহবিল সরবরাহ করা।
দার্শনিক কিন্দি মামুনের মৃত্যুর পরও বেঁচে ছিলেন। তিনি বানু মুসা ভাইদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। তারা তার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিলেন এবং তত্কালীন খলিফা আল মুতাওয়াক্কিলকে (৮৪৭-৮৬১) রাজি না করা পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল, যেন মুতাওয়াক্কিল তাকে হাউজ অব উইজডম থেকে বহিষ্কার করেন। তিনি তার বাকি জীবন একাকী কাটিয়ে দেন। তার ধারণাগুলো দশম শতাব্দীতে তুরস্কের দার্শনিক আল-ফারাবি কর্তৃক পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল। ফারাবি কিন্দির গ্রিক দর্শনের ইসলামিকরণের মিশন অব্যাহত রেখেছিলেন এবং তিনি নিজেই দুজন ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব অর্পণ করে যান, যারা ইউরোপে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিলেন এবং বহু রেনেসাঁ চিন্তাবিদকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছিলেন। তারা হলেন ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭) ও ইবনে রুশদ (১১২৬-৯৮)। তারা দুজনই তাদের ল্যাটিনকৃত নাম অ্যাভিসিনা ও অ্যাভিরোস নামে পশ্চিমে বেশি পরিচিত। প্রথম জন চিকিৎসক হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত এবং তিনি ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত পণ্ডিত। তার ‘ক্যানন অব মেডিসিন’ সতের শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপে অবশ্য পাঠ্য ছিল। অন্যদিকে কর্ডোবায় জন্মগ্রহণকারী ইবনে রুশদকে শেষ মহান মুসলিম দার্শনিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আরো অনেক মহামানব রয়েছেন, যাদের অবদান পশ্চিমারা ভুলে গেছে। যেমন আর্কিমিডিস ও নিউটনের মধ্যে দুই হাজার বছরের ব্যবধানে সবচেয়ে বড় পদার্থবিদ ইরাকি প্রতিভা ইবনে আল-হাইসাম, ইসলামের দ্য ভিঞ্চি হিসেবে পরিচিত আল বিরুনি, গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ আল তুসি, যিনি কোপার্নিকাসকে প্রভাবিত করেন। সামাজিক বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক তত্ত্বের স্বীকৃত জনক ইবনে খালদুন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এ মানুষগুলোর নাম স্মরণ করা অ্যারিস্টটল, গ্যালিলিও, নিউটন বা আইনস্টাইনের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
অবশ্যই আমরা হাউজ অব উইজডমের ভেতরের জীবন কেমন ছিল, তা কখনই জানতে পারব না। তবে এটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও বিতর্কহীন যে এটি আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারের মতো শুধু একটি গ্রন্থাগার ছিল না। বরং তার চেয়েও বেশি কিছু ছিল। কারণ এটি কেবল বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা জ্ঞানের বেশির ভাগ অংশকে এক ছাদের নিচে একত্রিত করে তুলেছিল কেবল তাই নয়, এটি বিশ্বের অনেক মহান চিন্তাবিদকে চুম্বকের মতো টেনে এনেছিল।
ইরাকে বেড়ে ওঠা ছেলে হিসেবে আমার মনে আছে, বিজ্ঞানের ক্লাসে নয় বরং ইতিহাসের ক্লাসে আল-কিন্দি ও আল-খোয়ারিজমির মতো পণ্ডিতদের সম্পর্কে শুনেছিলাম। তাদের কাহিনীগুলো শুধু পশ্চিমাদের কাছে জনপ্রিয় হবে তা নয়, আমি আশা করি যে আজ মুসলিম বিশ্বে তাদের বৈজ্ঞানিক অবদানের কথা স্মরণ করা হবে। এটা তাদের অবদান নিয়ে গর্ববোধ তৈরি করতে পারে, যা যৌক্তিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার গুরুত্বকেও উপলব্ধি করাবে। ফলে সভ্য ও আলোকিত সমাজ গঠন সম্ভব হবে।
জিম আল-খলিলি: ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ও লেখক





