১৯৭৬ সালে ১০ মাসের কিছু কম সময় সমর সেন দিনলিপি লিখেছেন ইংরেজিতে, প্রায়ই সাংকেতিক শব্দে। সময়টা ছিল প্রতিকূলে। ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করে তখন শাসন করছিলেন।
১৯৭৯তে মাস পাঁচেক দিনলিপি লিখেছেন বাংলায়। সেখানেও অতি পরিমিত কথন।
১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬-এর একাংশ:
Hindustan Times: Feb 18, Front page ‘portrait of the lady again, Shashibhuson hails SJ as new leader of youth [-] Calcutta awaiting arrival special plane. S. Roy among others, to receive at airport, arches, meeting etc.
জানুয়ারি, ১৯৭৯
বাংলাদেশের স্বপন অ্যাডনান। ভবানী বাবুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলাম। নকশালবাড়ি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। ঠিক কোন পার্টির বিষয়ে আনুগত্য— জিজ্ঞেস করিনি। বাড়িতে যেদিন এসেছিলেন, সেদিন পিটার কাসটেয়ারস সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করলেন। আমার বক্তব্য: লেখকের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে খোঁজখবর করা সম্ভব নয়, আমাদের মতে লেখা ভালো হলেই ছাপাই। বাংলাদেশের নভেম্বরের ঘটনাবলি নিয়ে কিছু কথা হলো। তাহেরকে যেভাবে হত্যা করা হয়, সেটি আমার ভালো লাগেনি।
ইংরেজি দিনলিপির পোর্ট্রেট অব আ লেডি হেনরি জেমসের উপন্যাসের নায়িকা নন, এমনকি নন খুশবন্ত সিংয়ের গল্পের নিঃশব্দ-প্রয়াত বৃদ্ধা। এ পোর্ট্রেট ইন্ধিরা গান্ধীর, যখন তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী, যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় নিজেকে আরো ক্ষমতাশালী করার জন্য তিনি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এক নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বিরুদ্ধ কোনো মত আর সহ্য করা হবে না। ঠিক দেড় মাস পর সমর সেন অফিসে বসে আছেন। ৭ নম্বর রাজা সুবোধ মল্লিক স্কয়ারে মডার্ন ইন্ডিয়া প্রেসে ফ্রন্টিয়ারের একটি ফর্মা কেবল ছাপা হয়েছে। ‘হঠাত্ সশস্ত্র পুলিশ এসে ছাপাখানা বাজেয়াপ্ত করে।’ পরদিন পত্রিকা বাজারে যাওয়ার কথা। আটকা পড়ে গেল পরের সপ্তাহের ম্যাটার, নিউজপ্রিন্ট সবই। অনির্দিষ্ট কালের জন্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ল ফ্রন্টিয়ারের প্রকাশনা। SJ কিংবা SG সঞ্জয় গান্ধী। তখন ইন্দিরার ছোট ছেলে সঞ্জয়-দৌরাত্ম্যে ভারতে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। তার পিতৃসম নেতারাও তখন সঞ্জয় চাটুকারিতায় পিছিয়ে থাকতে চাইছেন না। কার্যত রাষ্ট্রক্ষমতা অংশবিশেষ সঞ্জয় ও তার তরুণ বন্ধুদের হাতে চলে গেছে। ছেলের সামনে ইন্দিরা অসহায়— এ রকম একটি প্রচারণাও তখন প্রশাসনকে বিমর্ষ করে রেখেছে। গুরুত্বপূর্ণ একজন সাংবাদিক লিখেছেন এমনকি এই ‘সুপুত্র’ মাকে চপেটাঘাত করছে।
এমপি শশীভূষণ জরুরি অবস্থা জারি অনিবার্য এবং যৌক্তিক বলে উল্লেখ করে বলেছেন, আগামীর প্রগতিশীল শক্তির নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন সঞ্জয় গান্ধী; প্রধানমন্ত্রী তাঁর বিপুল বোঝার একাংশ কাঁধে তুলে নেন, তাহলে সমস্যা কোথায়?
বিশেষ উড়োজাহাজে সঞ্জয় কলকাতা আসছেন। পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় তাকে স্বাগত জানাতে এয়ারপোর্টে থাকবেন। সুসজ্জিত তোরণ, সভাস্থল।
ভারতে জরুরি অবস্থা, ইন্দিরার একগুঁয়েমি সঞ্জয়ের উত্থান, সঞ্জয় তোষামোদি কিছুই মেনে নিতে পারেননি সমর সেন। সতর্ক শব্দ এবং সতর্ক ইঙ্গিতে দিনলিপিতেও কথাগুলো বলে গেছেন তিনি।
পুলক চন্দ্র সম্পাদনা করেছেন ‘অপ্রকাশিত সমর সেন: দিনলিপি ও জুজুকে’। ১৯৭৬ আর ১৯৭৯-এর আংশিক দিনলিপি আর কন্যা জুজুকে তাঁর ১০২টি চিঠি এতে স্থান পেয়েছে।
সম্পাদক প্রয়োজনীয় টিকাভাষ্য সংযুক্ত করেছেন।
সম্পাদক সঞ্জয় সফর নিয়ে শ্যামলকুমার চক্রবর্তীর লেখা থেকে উদ্ধৃত করলেন:
‘২১ ফেব্রুয়ারি সঞ্জয় এলেন কলকাতায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার ঠাসা প্রোগ্রাম। লাখ লাখ টাকা খরচ হলো। শিল্পপতিরা দু’হাত উজাড় করে টাকা দিলেন যুব কংগ্রেসের হাতে। নেতাজী ভবন, রবীন্দ্রনাথের বাড়ি, প্রদেশ কংগ্রেস অফিস, রোটারি ক্লাবের মিটিং, বিশ্ববিদ্যালয়ে বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে বৈঠক, শিল্পপতিদের সঙ্গে আলাপ এবং সর্বোপরি ময়দানে জনসভা— অনেক কিছুই হলো। সঞ্জয়ের সঙ্গে এলেন তাঁর পত্নী মানেকাও।
দমদম থেকে খোলা গাড়িতে করে সঞ্জয়ের এ কলকাতা পরিক্রমা শুরু হলো। পথে পথে অনেক তোরণ হলো। সঞ্জয়ের জয়ধ্বনি দিয়ে লেখা অজস্র ব্যানারে কলকাতা ছেয়ে গেল।’
৩ জানুয়ারি, ১৯৭৯-এর দিনলিপির মানুষটি স্বপন আদনান। সম্ভবত ইংরেজি বিজনেস কার্ড থেকে নামটি টুকেছেন বলেই তা অ্যাডনান হয়ে গেছে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের ঢেউ এখানেও লেগেছে, শ্রেণীশত্রু নিধন প্রক্রিয়ায় বেশকিছু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কিছু হত্যাকাণ্ডকে সাধারণ মানুষ স্বাগত জানিয়েছে। বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছে কিছু হত্যাকাণ্ডের। নকশালবাড়ি আন্দোলন ও কমরেড চারু মজুমদারকে নিয়ে কৌতূহল এখনো পুরোপুরি মেটেনি।
সমর সেন স্বপন আদনানের সঙ্গে ১৯৭৫-এর নভেম্বরে দ্রুত ঘটে যাওয়া ব্যাপারগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের প্রধান নেতা এবং অন্যতম ত্রাতা কর্নেল তাহেরকে নিয়ে তার বক্তব্য ছিল: তাহেরকে যেভাবে হত্যা করা হয়, সেটি আমার ভালো লাগেনি।
ইংরেজি দিনলিপির অংশবিশেষের অনুবাদ:
৩ মার্চ, ১৯৭৬:
কেউ একজন বলেছেন গুরুত্বপূর্ণ সব বন্দিই (নকশালপন্থী নেতা) জেল ভেঙে বেরোতে পেরেছেন।
মিসেস ‘জি’-এর লেখক ও শিল্পীদের সঙ্গে বৈঠক। ‘জন-অরণ্য’ কি কাজ লাগাবে? (মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় পূর্ণেন্দু পত্রীকে ডেকে এ কথা জিজ্ঞেস করেন?
২৩ মার্চ, ১৯৭৬
জ্যোতিষের মতো সভু সেন (বন্ধু) বললেন: শনি আর মকর। ৩১ মার্চ থেকে মহিলা আরো হিংস্র হয়ে উঠবেন।
বিনোবার (ভাবে) অনশন। জেপির সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বোম্বেতে অনেকেই গ্রেফতার।
ছাপাখানা নিয়ে দুঃসংবাদ— কোনো (মেশিন) অপারেটর নেই। কাল প্রেসে যেতে নিষেধ করেছি।
(জেপি হচ্ছেন সর্বোদয় নেতা জয় প্রকাশ নারায়ণ।)
১২ এপ্রিল, ১৯৭৬
আট বছর আগে এমন দিনে ফ্রন্টিয়ার প্রকাশিত হয় ‘ক্লাইভ অব ইন্ডিয়া’, পড়তে শুরু করি।
(ক্লাইভ অব ইন্ডিয়া লিখেছেন নীরদ সি চৌধুরী।)
১৩ এপ্রিল, ১৯৭৬
পদযাত্রা রিপোর্ট— ইন্দিরা মহারানী কি জয়।
(মিসেস গান্ধী রায় বেরিলির ধূলিমাখা গ্রামে টানা ৪৫ মিনিট হেঁটে একটি নতুন আন্দোলনের ডাক দেন। গ্রামবাসী মহিলা তার পায়ে পড়ে স্লোগান দেয় ইন্দিরা দেবী কি জয়, ইন্দিরা মহারানী কি জয়। ট্র্যাজেডি হচ্ছে পরবর্তী নির্বাচনে এখানেই ইন্দিরার ভরাডুবি হয়।)
১৯ এপ্রিল, ১৯৭৬
সন্দীপ সরকার। দেশ পত্রিকার জন্য যামিনী রায় ও গোপাল ঘোষের আঁকা ছবি হস্তান্তর করলাম।
(যামিনী রায়ের মাদল হাতে সাঁওতাল যুবক ১৫ মে, ১৯৭৬ সংখ্যার প্রচ্ছদে এবং গোপাল ঘোষের নিসর্গ ২২ মে, ১৯৭৬ সংখ্যার প্রচ্ছদে ব্যবহার করা হয়।)
২২ এপ্রিল, ১৯৭৬
তপন বাবুকে দেখতে যাওয়ার কথা ভেবেছিলাম।
দিনটা বড্ড ঘাম ঝরানো।
(তপনরায় চৌধুরী)
৬ মে, ১৯৭৬
প্রবোধ টিকিট নিয়ে এল।
(ভাইস অ্যাডমিরাল কোহলি এবং এয়ার ভাইস মার্শাল পলের গপ্পো)
সতীকান্ত রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছেন। কমিটির সদস্য: প্রেমেন বাবু, প্রমথ বিশি, অন্নদাশঙ্কর প্রমুখ। (পুণ্যশ্লোক রায়— পরিভাষা কমিটির সেক্রেটারি, বেতন মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা)
অনেক দিন পর শিপ্রা সরকার।
(টিকিটটি ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্র উত্সবের। ইন্দিরার দুর্নীতি হটাও’তে চাকরিচ্যুত/পদত্যাগকৃত নৌ ও বিমান প্রধান এবং ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস প্রধান।
সতীকান্ত গুহ পুরস্কৃত হন। পুণ্যশ্লোক অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছেলে। শিপ্রা সরকার ইতিহাসের অধ্যাপক)
১২ মে, ১৯৭৬
তিতাস একটি নদীর নাম (দেখলাম)। মুগ্ধকর কিন্তু দ্বিতীয় অংশে সম্প্রদায়ের ভাঙনটা তাড়াহুড়ো করে করা— সম্ভবত ঋত্বিকের অসুস্থতার কারণে।
(অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ঋত্বিক ঘটকের হাতে চলচ্চিত্রায়িত।)
৫ জুলাই, ১৯৭৬
বিছানায় যাওয়ার আগে আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরি করা লেখকদের কথা ভাবলাম। আমিও কি তাদের দলে যোগ দিচ্ছি না?
একটি বাংলা দিনলিপির একাংশ
২৬ এপ্রিল, ১৯৭৯
পর পর তিনদিন বিদ্যুত্ সংকট স্টেটসম্যানের লিড স্টোরি। শেষ পর্যন্ত স্টেটসম্যানও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে পড়ল। এবারে জ্যাতিবাবুরা অস্বস্তি বোধ করবেন।
সন্ধ্যাবেলা বিনয় বাবু (বিনয় ঘোষ) দু-একটা ঘর ভাড়া করে থাকতে চান। বাড়িতে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
...
‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ শেষ করলাম। যৌবনের সেই অভিভূত ভাব আর হলো না। এটি কি করে বিশ্বসাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি— বুঝতে পারলাম না।
কবিতার সমর সেন
সমর সেনই লিখতে পারেন ‘নিঃশব্দতার ছন্দ’:
স্তব্ধরাত্রে কেন তুমি বাইরে যাও?
আকাশে চাঁদ নেই, আকাশ অন্ধকার,
বিশাল অন্ধকারে শুধু একটি তারা কাঁপে,
হাওয়ায় কাঁপে শুধু একটি তারা।
কেন তুমি বাইরে যাও স্তব্ধরাত্রে
আমাকে একলা ফেলে?
কেন তুমি চেয়ে থাক ভাষাহীন নিঃশব্দ পাথরের মতো?
আকাশে চাঁদ নেই, আকাশ অন্ধকার,
বাতাসে গাছের পাতা নড়ে,
আর দেবদারু গাছের পিছনে তারাটি কাঁপে আর কাঁপে
আমাকে কেন ছেড়ে যাও
মিলনের মুহূর্ত হতে বিরহের স্তব্ধতায়?
সমর সেনের কবিতায় মেলে ‘বণিক সভ্যতার শূন্য মরুভূমি’, ‘আকাশের দীর্ঘশ্বাস’, ‘মধ্যবিত্ত মানসের বিড়ম্বিত গ্লানি’ কিংবা ‘অতৃপ্ত রাত্রির ক্ষুধার ক্লান্তি’। তারই আহ্বান:
পৃথিবীতে নতুন পৃথিবী আনো
হানো ইস্পাতের মতো উদ্যত দিন।
‘তুমি যেখানেই যাও’ তোমার নিষ্কৃতি নেই।
সমর সেন বলতে পারেন:
আর আমাকে ছেড়ে কোথাও তুমি যাবে?
তুমি যেখানেই যাও
আকাশের মহাশূন্য হতে জুপিটারের তীক্ষ দৃষ্টি লেভার শুভ্র বুকে পড়বে। এক প্রজন্ম তাকে চেনে পুরোদস্তুর কবি হিসেবে, পরের প্রজন্মের কাছে তিনি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সটান দাঁড়িয়ে থাকা ‘ফ্রন্টিয়ার’-এর মতো প্রগতিশীল পত্রিকার সম্পাদক।
কাব্যচর্চার কালটি দীর্ঘ নয়— মধ্য তিরিশের দশক থেকে মধ্য চল্লিশের দশক। কাব্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে কয়েকটি কবিতা (১৯৩৭), গ্রহণ (১৯৪০), নানাকথা (১৯৪২), খোলাচিঠি (১৯৪৩) আর তিনপুরুষ (১৯৪৪)। আর রয়েছে তাঁর অসামান্য গদ্যকীর্তি ‘বাবু বৃত্তান্ত’। তাঁর জন্ম কলকাতায়, ১০ অক্টোবর, ১৯১৬, মৃত্যু ২৩ আগস্ট, ১৯৮৭। কীর্তিমান এই কবি, সম্পাদক ও প্রগতির পান্থজনকে জন্ম শতবর্ষের শ্রদ্ধা।





