সাহিত্যে ২০১৬ সালের নিউস্টাডট আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার পর গত ২৮ অক্টোবর, ২০১৬ ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিচের বক্তব্য রাখেন উগরেসিচ। ‘ওয়ার্ল্ড লিটারেচার টুডে’র আগামী ২০১৭ সালের জানুয়ারি সংখ্যার একটি প্রচ্ছদ কাহিনীর মূল প্রসঙ্গ হবেন তিনি। দুব্রাভকা উগরেসিচ একজন ইউরোপীয় লেখক, বিশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত বেশ কয়েকটি উপন্যাস ও প্রবন্ধের রচয়িতা তিনি। ২০১৬ সালের নিউস্টাডট আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কারসহ বেশকিছু সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত উগরেসিচের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সাবেক যুগোস্লাভিয়া ও পরবর্তী ক্রোয়েশিয়ায় এবং বর্তমানে তিনি নেদারল্যান্ডসে বসবাস করছেন।

এই বিশেষ উপলক্ষে কী বলতে হবে, সে নিয়ে প্রচুর ভেবেছি আমি। আমার একটা অংশ আপনাদের আমার নিজের ব্যাপারে কিছু কথা বলতে চেয়েছে, আবার অন্য একটা অংশ রীতিমতো এর বিরুদ্ধে ছিল। কেন? কারণ আমি তুলনামূলক সাহিত্যে পড়াশোনা করেছি এবং আমার নেয়া সাহিত্য-বিষয়ক তত্ত্ব এবং সাহিত্য সমালোচনা-বিষয়ক কোর্সগুলোয় আমি শিখেছি, যেকোনো একটি টেক্সটের ইন্টারপ্রেটার ও টেক্সটের মাঝখানে একটা বিষয়েরই অস্তিত্ব থাকে আর সেটা খোদ সাহিত্যিক টেক্সট, লেখক নন। সেটা ছিল সাহিত্যিক তত্ত্বের এক সুদূরপ্রসারী গুরুত্বপূর্ণ মতবাদের সময় (গঠন, কাঠামোবাদ, প্রতীকীবাদ, বিনির্মাণবাদ)। এসবই টেক্সট নিয়ে কাজ করেছে। আমার প্রজন্মের বেলায় সাহিত্যের স্বায়ত্তশাসন ছিল পবিত্র, লঙ্ঘনের অতীত একটা সীমানা। আজ ভিন্ন একসময়ে, দুনিয়ার সবকিছুর এবং অন্যান্য জিনিসের ভেতর সাহিত্য রুচির গণতন্ত্রায়নের একটা সময়ে বাস করছি আমরা; তীব্র স্বাতন্ত্র্যবোধ এবং সেলফি সংস্কৃতির এই ক্ষণে ডিজিটাল মাধ্যমের হাতে ব্যবহূত হওয়ার অব্যাহত সম্ভাবনার পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আমাদের ও অন্যদের ব্যবহার করার সম্ভাবনার সার্বক্ষণিক উপস্থিতি। আজ লাখ লাখ নামহীন বা আধা-নামহীন মানুষ রয়েছেন, যারা সমান দক্ষতায় কীভাবে আমাদের নখ কাটতে হবে সেই তালিম দেন, যদিও তারা পেডিকিউরিস্ট নন; কেমন করে ডিম সিদ্ধ করতে হবে, যদিও তারা রাঁধুনি নন; আর হেগেল সম্পর্কে কী ভাবতে হবে, যদিও তারা সত্যিই দার্শনিক নন। এটা মুক্তি আর আত্মস্বাধীনতার একটা কাল—যুগপত্ লাজলজ্জাহীন এবং সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক—এমন একটা সময়, যখন চাইলে সবাই পারে আর সবাই জানতে চায় যে তারা পারে। সংক্ষেপে, এক কারাওকে সংস্কৃতিতে বাস করছি আমরা।

আমি যা বলেছি সেখানে আপনি একগুঁয়ে মন্তব্য বা সিদ্ধান্তমূলক কোনো কিছু শুনতে পেয়ে থাকলে তার কারণ আমি জন্ম নিয়েছি ১৯৪৯ সালে। আমার প্রজন্মের সব ইউরোপীয়র মতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছায়ায় বড় হয়েছি। ইউরোপে এই ছায়া দীর্ঘদিন টিকেছিল এবং সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে যে, আসলে কখনই তা মুছে যায়নি। সতেরো বছর বয়সে আমার বাবা—এবং আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই যে সেলিঙ্গারের উপন্যাস দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই-এ হোল্ডেন কলফিল্ডের বয়স সতেরো বছর—পার্টিজান ও যুগোস্লাভিয়ার ফ্যাসিবাদীবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। অন্য কথায়, আমি ভালো ও মন্দ লোকের ভেতর বিভক্ত একটা পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছি এবং বেড়ে উঠেছি। কেবল ১৯৪৮ সালই খানিকটা বিভ্রান্তিকর ছিল। ওই বছর টিটো স্তালিনের কাছে তাঁর বিখ্যাত না পাঠিয়েছিলেন এবং চিরদিনের মতো যুগোস্লাভিয়াকে কমিউনিস্ট দেশগুলোর সমাজ থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল। ১৯৪৯ সালে কট্টর নো-সেয়ার হিসেবে জন্ম নিয়েছিলাম। স্তালিনের উদ্দেশে টিটোর ‘না’র মানে ছিল আমেরিকান চলচ্চিত্র আমদানির পক্ষে হ্যাঁ। আমার ছোটবেলার সেরা দশটি ছবির তালিকায় গ্রিক পুরাণ, দুর্ধর্ষ পার্টিজানদের নিয়ে কিংবদন্তি আর—হলিউডি সব ছবি রয়েছে। হলিউডি সিনেমার প্রতি আমার মায়ের ভীষণ রকম দুর্বলতা ছিল, তো কোনো কোনো ছবি দুবার বা তিনবার পর্যন্ত দেখতে গেছি আমরা।

মায়ের বইপত্রও ছিল। শিরোনামে মেয়েদের নামঅলা উপন্যাসের প্রবল ভক্ত ছিল ও: রেবেকা, আরমান্স, ক্যারি, মাদাম বোভারি, জেন আয়ার, আনা কারেনিনা, এমা, টেস অব দ্য ডি’আরবাভিলস...কায়মনোবাক্যে নারীবাদী ছিল সে। যতক্ষণ উপন্যাসের মূল চরিত্র নারী থাকছে, লেখক পুরুষ নাকি নারী পরোয়া করত না। মায়ের মাপের সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা করেছিলাম আমি এবং ওর প্রিয় বইয়ের তালিকার দুটো বইয়ের নাগাল পেয়েছি: উপন্যাস স্টেফি স্পেক ইন দ্য জজ অব লাইফ আর ইয়াগা লেইড অ্যান এগ। এক প্রেমের উপন্যাসের ‘কন্সট্রাক্টিভিস্ট’ প্যারোডি হিসেবে স্টেফি স্পেক ওর মনে ধরেনি বলেই মনে হয়। মা কেবল সত্যিকার, জাঁকাল, আবেগময় কাহিনীই পছন্দ করত। বাবা ইয়োগা পড়ার সুযোগ পায়নি ও; তত দিনে রোগে ভুগে মরতে বসেছিল। ওরই সম্মানে এই কথাগুলো বলছি, কারণ সে না থাকলে আজ আমি এখানে দাঁড়াতে পারতাম না।

তুলনামূলক সাহিত্য এবং রাশিয়ান ভাষা ও সাহিত্য পড়েছি আমি এবং পড়াশোনার পর কাজের জন্য ইউনিভার্সিটিতেই থেকে গেছি। সাহিত্যে ভীষণভাবে নিবেদিত ছিলাম, কেবল লেখক হিসেবেই নয়, বরং একজন স্কলার, সাহিত্যের ইতিহাসবিদ, অনুবাদক ও সম্পাদক হিসেবে। যে কেউ কোনো বিষয়ে ‘ওস্তাদ’ হতে চাইলে তাকে অবশ্যই সবার আগে শিক্ষানবীশির ভেতর দিয়ে যেতে হবে। এটা ভিন্ন কোনো দিনের প্রসঙ্গ এবং লেখকের পেশাগত নৈতিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আমি সত্যিই বিশ্বাস করি যে, শিক্ষানবীশির মাধ্যমেই কারো নিজস্ব সাহিত্যিক কণ্ঠস্বরের অধিকার লাভ করতে হবে।

আমি যুগোস্লাভিয়ায় ছিলাম, ছয়টি প্রজাতন্ত্রের একটা দেশ, যেখানে স্লোভেন্স, ক্রোট, বসনিয়ান, সার্ব, মন্টেনেগ্রিয়ান, ম্যাসিডোনিয়ান, আলবেনিয়ান আর অন্যান্য জাতি বাস করে: তিনটা সরকারি ধর্ম, দুটো বর্ণমালা (সিরিলিক ও রোমান) এবং বেশ কয়েকটা ভাষার দেশ: স্লোভেনীয়, ম্যাসিডোনেনীয়, আলবেনীয় এবং সরকারি ক্রোটো-সার্বিয়ান— সার্ব, ক্রোট, বসনীয় আর মন্টেনেগ্রীয়দের ভাষার নাম। ১৯৯১ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায়; একই বছর শুরু হয়েছিল ক্রোয়েশিয়া ও বসনিয়ার ভেতর তাণ্ডব চালানো যুদ্ধ। ১৯৯৩ সালে সবকিছু ছেড়ে আসি আমি, আমার চাকরি, আমার পরিবার, শহর এবং বেরিয়ে পড়ি বাইরের দুনিয়ায়, যদিও কোথায় চলেছি নিশ্চিত ছিলাম না। তিক্ততেই সবচেয়ে বেশি তাড়িত ছিলাম; বুঝতে পারছিলাম না আমার স্বদেশবাসী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং তার পরে যারা বেড়ে উঠেছে, যারা ভালো-মন্দের নির্ণায়ক শিখেছিল, তারা হঠাত্ করেই তাদের অতীতের চেতনাকে আহ্বান জানিয়ে মৃত ফ্যাসিস্ট নেতাদের হাত উঁচিয়ে স্যালুট করছে কীভাবে। ভেবেছি, কীভাবে এত সব পরিচয় নাগালে থাকতেও নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর মানুষ সম্ভাব্য জঘন্যতম রক্ত-গ্রুপ, জাতিগত পরিচয়, জাতীয়তা, রাষ্ট্র বেছে নিতে পারে কীভাবে।

এ নিয়ে লিখেছি আমি এবং নিমিষে আমার বিভ্রান্ত দেশবাসীর চোখে ‘শত্রু’ আর ‘বিশ্বাসঘাতকে’ পরিণত হয়েছি। কেবল বইতেই পড়েছিলাম এমন সবকিছুর অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার, এসব আর ঘটতে পারে না বলে নিশ্চিত থাকার পরও। ধ্বংসলীলায় সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন রক্ত-গ্রুপের দেশগুলোয় আমার আর কথা বলার অধিকার ছিল না। বিদায় নিয়েছি আমি, বিভিন্ন আন্তরিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাময়িক ছাদের নিচের আশ্রয়ে আবিষ্কার করেছি নিজেকে, একটা বছর কাটিয়েছি বার্লিনে, আরেক বছর ক্যামব্রিজ, ম্যাসাচুসেটসে, এক বছর আর্মস্টারডামে, একটা বছর চ্যাপেল হিল, ইউনিভার্সিট অব ক্যারোলিনায়, আধা বছর হার্ভার্ডে... শেষতক আর্মস্টারডামে এসে থিতু হয়েছি। এবং মাতৃভাষায় লেখা চালিয়ে গেছি। এরই মধ্যে তা চারটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় ভাগ হয়ে গেছে যদিও, কিন্তু জাতীয়তাবাদী ভাষাতাত্ত্বিক আদর্শবাদীদের সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও আবার একই ভাষা রয়ে গেছে। যুগোস্লাভিয়ার রক্তাক্ত ও নিষ্ঠুর বিলুপ্তির পর কেউই আর আরো চৌকস, শক্তিশালী, আরো যুক্তিবান, সমৃদ্ধ, আরো প্রগতিশীল কিংবা আরো সুখী হয়ে ওঠেনি। মানুষ আরো গরিব হয়েছে, তাদের স্বাধীনতা ও অধিকার আগের চেয়ে এখন ঢের কম। আজ তারা আগের চেয়ে বেশি করে দাসত্বে বন্দি, আগের চেয়ে বহু বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত। অবশ্য সুখের জন্য গণতান্ত্রিক নীতিমালাই নয়, বরং অসুখেরও সন্ধান রয়েছে, অসুখী যুগোস্লাভিয়ার উদাহরণে থেকেই যা স্পষ্ট।

দ্য মিউজিয়াম অব আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার উপন্যাসসহ আমার নিবন্ধ ও উপন্যাসগুলোয় কোনো না কোনোভাবে এসব বিষয়ের অবতারণা করেছি আমি। আমার মা বিরাট পাঠক ছিল, বইয়ের জন্য ক্ষুধার্ত ছিল সে এবং দ্য মিউজিয়াম অব দ্য আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার-এ আমি একটা পর্ব তৈরি করেছি, যেখানে আমার মা বিখ্যাত লেখকদের সঙ্গে কথা বলছে। সেখান থেকে একটা অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করার সুযোগ দিন আমাকে:

 

‘এমনকি যা আমার, কেবলই আমার ছিল, তারও খুব অল্পই মনে করতে পারি আমি,’ বলল আমার মা।

‘একজন স্বাভাবিক মানুষ সকালের নাশতায় কী খেয়েছে মনে রাখে না। বারবার, রুটিনের মতো জিনিসগুলো ভুলে যাওয়ার জন্যই। তার ভেতর নাশতা একটা; আরেকটা হলো প্রিয় মানুষগুলো,’ বললেন ব্রডস্কি।

‘তাহলে এসবের কী অর্থ? আমার যদি কোনো ভবিষ্যত্ না থাকে, অতীতে যদি কোনো ভিত্তি খুঁজে না পাই?!’ প্রশ্ন করল মা।

‘ব্যর্থতাগুলো যেমন হয়, অতীত মনে করার চেষ্টা অস্তিত্বের অর্থ ধরার মতো। দুটোই কারো ভেতর কোনো শিশুর বাস্কেটবল আঁকড়ে ধরার মতো বোধ জাগায়: বারবার হাতের তালু পিছলে যেতে থাকে,’ বললেন ব্রডস্কি। [,,,]

‘যখন এ নিয়ে সত্যি সত্যি ভাবি, একমাত্র যে জিনিসটা পরিষ্কার মনে করতে পারি সেটা হলো ভয়। ছোটবেলায় যে জিনিসটাকে সবচেয়ে বেশি ভয় লাগত সেটা হলো ওল্টানো দস্তানা। ওই নিরীহ জিনিসটাই আমার ভেতর আতঙ্ক জাগিয়ে তুলত,’ বলল মা।

‘আসলে আমার ভীতির মুহূর্তগুলো সংক্ষিপ্ত আর অবাস্তবতার বোধ যতটুকু জাগে ভীতি ততটা নয়,’ বললেন পিটার হ্যান্ডকে।

‘কী জানো, প্রথম আতঙ্কের ব্যাপার হলো বেড়ে ওঠা,’ বলল মা।

‘আতঙ্ক এমন একটা জিনিস, যা প্রকৃতির আইন মেনে চলে: সচেতনতায় শূন্য স্থানের ভীতি,’ বললেন পিটার হ্যান্ডকে।

‘আমার কাছে এর কোনো মানে নেই। আমার মনে হয় পুরুষ হয়ে জন্মালেই সবকিছুই ভিন্ন রকম হতো,’ মা বলল।

‘এ ধরনের পরিবেশে নারী হিসেবে জন্ম নেয়াটাই ভয়ঙ্কর। কিন্তু সম্ভবত একটা স্বস্তির বিষয় আছে: ভবিষ্যত্ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আমাদের গির্জার মেলায় গণকরা শুধু তরুণদের হাতের তালুর দিকেই গুরুতর আগ্রহ দেখায়: কোনো মেয়ের ভবিষ্যত্ তামাশার বিষয়,’ বললেন পিটার হ্যান্ডকে।

‘কেউ তার জীবনটাকে তামাশা বলে মেনে নিতে পারে না,’ মা বলল।

‘জীবনটা গোছানো, টুকটাক জিনিসের মতো, কিন্তু আমরা সবাই এখানে নিজের অবস্থান খুঁজে পাই না,’ বললেন ভিক্টর শ্লোভস্কি।

‘সম্ভবত আমার মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়াটাই আসলে সমস্যা,’ বলল মা।

‘মেয়েমানুষ দুর্বোধ্য। মানুষের রুটিন জঘন্য, অর্থহীন, শ্লথ, অটল,’ বললেন শ্লোভস্কি। [...]

‘অনেক সময় আমার জীবনের তুচ্ছতার কারণে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। কারো কারো সুচিন্তিত কোনো গল্পের মতো জীবনও যাপন করে। আমি ওই ধরনের লোকদের প্রতি সবসময় ঈর্ষা বোধ করেছি,’ মা বলল।

‘সুচিন্তিত গল্পের সঙ্গে বাস্তব মিলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই; জীবন তার পুরো শক্তি দিয়ে সুচিন্তিত কাহিনীর সঙ্গে মিলে যাওয়ার চেষ্টা করে,’ বললেন ইসাক বাবেল।

‘যা-ই হোক, এখন আর এসবের কোনো গুরুত্ব নেই। এখন আমি জানি না আমি কে বা কোথায় আছি অথবা আমি কার...’

 

আমার মায়ের ‘এখন আমি জানি না আমি কে বা কোথায় আছি, অথবা আমি কার...’ কথাগুলো সম্ভাব্য সহজতম উপায়ে অভিবাসী হওয়ার পর থেকে আমি যতগুলো বই লিখেছি, সেগুলোর প্রধান ধারণাগত ভাবনাগুলোকে ধারণ করেছে। আমার সমস্ত বইতে ধ্বংসস্তূপ বা ব্যক্তিগত কিংবা সমবেত স্মৃতি এবং সেই সঙ্গে প্রশ্নাতীত অনুশাসনে পরিণত হওয়ার জন্য পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত বিজয়ীদের হাতে রচিত সরকারি ঐতিহাসিক মিথ্যাচার নিয়ে লিখেছি আমি। আমি যা কিছু লিখেছি সেগুলো ‘আমি কে বা কোথায় আছি, অথবা আমি কার...?’ এই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে। আজকের দিনের নিজের দিক থেকে বলতে পারি যে, আমি উত্তর যুগোস্লাভ, আন্তর্জাতিক কিংবা এমনকি আরো স্পষ্ট করে বললে জাতি-উত্তর (দৃশ্যত এলিয়ট ওয়েইনবার্গারের উদ্ভাবিত একটা পরিভাষা)। আমাকে বলতে হবে যে জাতি-উত্তর সাহিত্য বিকশিত হচ্ছে, যেভাবে হরফের প্রজাতন্ত্রে বেড়ে উঠছে জাতি-উত্তর লেখকের সংখ্যা।

জুরিমণ্ডলীর প্রতি আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। মনোনয়নের জন্য প্রস্তাবিত নামগুলোর ভেতর এত এত গুণী নারী লেখক থাকায় এবং বেশির ভাগ মনোনয়নদানকারী নারী হওয়ায় আমি বিশেষভাবে সম্মানিত বোধ করছি। আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন যিনি সেই চমত্কার লেখক ও অনুবাদক অ্যালিসন অ্যান্ডারসনের প্রতি রইল আমার ধন্যবাদ। গত বছর এবং ষোল বছর আগে ২০০০ সালে আমি মনোনয়নকারী ও জুরিমণ্ডলীর সদস্য থাকতে আমাদের ভেতরকার চিঠিপত্র বিনিময়ের জন্য কন ডেভিস-উন্দিয়ানোকে ধন্যবাদ। আমার গল্প হু অ্যাম আই? মঞ্চস্থ করার জন্য জুডিথ পেন্ডার ও ওকলাহোমা ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ড্রামার ছাত্রদের ধন্যবাদ। সৃজনশীল লেখনীর ক্লাসে অংশ নেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানোয় ধন্যবাদ জানাই রিল্লা আস্কিউকে, ড্যানিয়েল সাইমন এবং ওয়ার্ল্ড লিটারেচার টুডে’র প্রতি গত বছরজুড়ে কেবল ই-মেইল বিনিময়ের জন্যই নয়, বরং ওয়ার্ল্ড লিটারেচার টুডেতে আমার একটা লেখা প্রকাশের ইচ্ছা প্রকাশের জন্যও ধন্যবাদ। আমার সফরটির অনায়াস আনন্দে পরিণত হওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন তিনি। ধন্যবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রছাত্রী ও লেকচারারদের, আমার রচনার প্রকাশক শাদ পোস্টকে; আমার অনুবাদক এলেন এলিয়াস-বারসাচকে; এমিলি জনসন, ড্রাগানা ওব্রাদোভিচ ও অ্যালিসন অ্যান্ডারসনকে ধন্যবাদ আমার কাজ নিয়ে চমত্কার পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখার জন্য। আপনাদের আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানাই এবং সবার শেষে যদিও কিন্তু মোটেই সামান্য নয়, আমার ধন্যবাদ বিশ্বসাহিত্যের অকৃপণ দাতা ও অনুপ্রেরণাদায়ী নিউস্টাডট পরিবারের প্রতি। নিউস্টাডট পরিবার ও আপনাদের সবার প্রতি সত্যি ধন্যবাদ নরম্যান শহরকে অকল্পনীয় কোনো স্বপ্নে বিশ্বসাহিত্যের মূলকেন্দ্রে পরিণত করার জন্য।

নরম্যান, ওকলাহোমা

 

রূপান্তর: শওকত হোসেন