উত্তর ভারতে মোগল শাসন তখন শক্তিশালী। দাক্ষিণাত্যে তাদের প্রভাব পড়লেও ক্ষমতা কখনো পুরোপুরি দখল করতে পারেনি মোগলরা। মারাঠা উত্থানের আগে দাক্ষিণাত্যে স্বাধীনভাবে শাসন করা ও সে শাসন টিকিয়ে রাখতে কয়েকজন ব্যক্তির অবদান ছিল সর্বাধিক। মালিক অম্বর তাদের মধ্যে প্রধান। মুর্তজা নিজাম শাহের অধীনে চাকরি করা এ ব্যক্তি তৎকালীন ভারতের রাজনীতি ও শাসনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন। তার কর্মক্ষেত্র দাক্ষিণাত্য—নির্দিষ্ট করে বললে আহমদনগর—হলেও তার প্রভাব উত্তর ভারত পর্যন্ত গিয়েছিল। প্রতিরোধ, যুদ্ধ ও সন্ধির মাধ্যমে তিনি নিজের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন। তার চেয়ে বড় কথা দাক্ষিণাত্যে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কিং মেকার।

মালিক অম্বরের জন্ম ১৫৪৮ খ্রিস্টাব্দে ইথিওপিয়ার হারার অঞ্চলে। তার জন্মসাল নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে ধারণা করা হয় মালিক অম্বরের জন্ম ১৫৪০ থেকে ১৫৪৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনো সময়ে। অন্যান্য হাবশির মতো তারও জীবন শুরু হয় দাস হিসেবে। প্রথম জীবনে তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়। কথিত আছে তিনি দাস ব্যবসায়ীদের দ্বারা অপহূত হয়েছিলেন। আবার কেউ বলে পিতা-মাতাই তাকে বিক্রি করে দেয়। সে যা-ই হোক, বহু হাত ঘুরে ইয়েমেন, বাগদাদ, মক্কা পার হয়ে তিনি দাক্ষিণাত্যে পৌঁছেন। সেখানে চেঙ্গিস খানের ভৃত্য হিসেবে নিযুক্ত হন। দাক্ষিণাত্য তখন বিদেশীদের জন্য সোনার খনি। সেখানে নানা অঞ্চলের মুসাফির, পরিব্রাজক ও ব্যবসায়ীরা যেতেন ভাগ্য পরীক্ষা করতে। ষোড়শ শতাব্দীতে দাক্ষিণাত্যে ছিল আদিলশাহি ও নিজামশাহি। এ দুই রাজবংশের সঙ্গে ছিল পারস্যের যোগসূত্র। ফলে পারস্য হয়ে নানা রসদ, অস্ত্র, সৈন্যের পাশাপাশি আসত দাস।

মানু এস পিল্লাই লিখেছেন, মালিক অম্বর দাক্ষিণাত্যে আসেন ১৫৭১ খ্রিস্টাব্দে। অর্থোডক্স খ্রিস্টান থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে ততদিনে ইসলামে দীক্ষিত হয়েছেন। ছেলেবেলা থেকে যে মনিবের অধীনে অম্বর কাজ করতেন, তিনি অম্বরকে আহমদনগরের পেশওয়ার কাছে বিক্রি করে দেন। এই পেশওয়া ছিলেন আহমদনগরের নিজাম শাহের অমাত্য। তাকে পেশওয়া বলা যেতে পারে, আবার উজিরও বলা যেতে পারে। অম্বরের ভাগ্য খোলার চাবিকাঠি ছিলেন নিজাম শাহের অমাত্য চেঙ্গিস খান। কেননা তিনি নিজেও একজন হাবশি ছিলেন এবং অম্বরের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন। অম্বর তার মনিব ও পরিবারের প্রতি বিশ্বস্ত ও নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। পাঁচ বছর কাজ করার পর তার মনিব মারা গেলে মনিবানী তাকে মুক্তি দেন। আফ্রিকার হাবশিদের ভারতে পেশা বলতে ছিল গার্হস্থ্য ও সৈনিকের কাজ। মালিক অম্বর অস্ত্রবিদ্যা জানতেন। ফলে পেশওয়ার কাছে কাজ ছেড়ে তিনি ভাড়াটে সৈন্যের কাজ নেন। বিশ বছর তিনি এ পেশায় ছিলেন।

ভাড়াটে সৈন্য (মার্সেনারি) হিসেবে মালিক অম্বর প্রাথমিকভাবে বিজাপুরের সুলতানের হয়ে কাজ করেন। সেনাবাহিনীতে কৃতিত্বের কারণে বিজাপুরের সুলতান আদিল শাহ তাকে ‘মালিক’ উপাধি দেন। এ সময়ে তিনি বিয়ে করেন এবং দুই পুত্র ও দুই কন্যার জনক হন। সংসারের পাশাপাশি চলতে থাকে তার নিজের কাজ। মালিক বুঝতে পেরেছিলেন নিজেকে শক্তিশালী করা জরুরি। আর সে কাজটি তিনি করেছিলেন ১৫৯০ সালে, আহমদনগরে মোগল অভিযানের সময়। সে সময় মালিক অম্বর ছিলেন মাত্র দেড়শ ঘোড়সওয়ারের অধিনায়ক। নিজেকে শক্তিশালী করতে আরেকজন হাবশি সেনাপতির সঙ্গে তিনি জোট তৈরি করেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে দাক্ষিণাত্যের অভিজাতদের মধ্যে ভাঙন ধরে। এ সময় তারা দুর্বল হয়ে পড়লে তাদের সেনাদলও ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। অম্বর তার বাহিনীর পরিসর বৃদ্ধি করেন। এক বছরের মধ্যে তার সেনাদলে সৈন্যের সংখ্যা হয় ৩ হাজার। আকবর দাক্ষিণাত্য জয় করার চেষ্টা করলে সে যুদ্ধে মালিক অম্বর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।

দাক্ষিণাত্যে মালিক অম্বর নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার প্রথম পর্বে আহমদনগরে আকবরের আক্রমণ হয়। চাঁদ বিবির বিরুদ্ধে তিনি অভিযান করেন। এ সময় চাঁদ বিবি গোলকোন্ডা ও বিজাপুরের মিলিত শক্তি নিয়ে মোগল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। কিন্তু সুবিধা করতে পারেননি। তিনি মারা গেলে তার তত্ত্বাবধানে থাকা সুলতানকে মোগলরা গোয়ালিয়রে অন্তরীণ করে। মালিক অম্বর তখন হুসেইন নিজাম শাহর এক অপ্রাপ্তবয়স্ক ভ্রাতুষ্পুত্রকে সিংহাসনে বসান। এর পাশাপাশি তিনি দাক্ষিণাত্যের একটি অংশে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেখান থেকে মোগলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা করেন। পারেন্দা নামক স্থানে ছিল তার শাসনের কেন্দ্র। অবশ্য তিনি নিজে সামনে থেকে শাসন করেননি। তার কাজ ছিল পর্দার আড়াল থেকে সুলতানকে চালনা করা। কিন্তু মালিক অম্বরই যে সর্বেসর্বা তা সবাই জানত। শাসন ও সৈন্য বাহিনীর ওপর প্রভাব থাকার কারণে অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে নিজামশাহির পশ্চিমাংশকে ‘অম্বরের দেশ’ বলে উল্লেখ করা হতো।

সপ্তদশ শতকের শুরু থেকেই দাক্ষিণাত্যের পশ্চিম অংশ বদলাতে শুরু করে। মোগল আক্রমণে খানিকটা কোণঠাসা হয়ে পড়লেও মালিক অম্বরের বিচক্ষণতায় তারা একটি আলাদা স্বাধীন অংশ তৈরি করেন। তবে মালিক অম্বর এ সময় নিজের মতো করে নিজের ক্ষমতা সংহত করার চেষ্টা করেন। আহমদনগরের অন্য অমাত্যদের মধ্যে তার প্রভাব ছিল। তিনি নিজের প্রভাব খাটিয়ে ‘সর্বসম্মতিক্রমে’ দ্বিতীয় মুর্তজা নিজাম শাহকে সুলতান ঘোষণা করেন। মালিক অম্বরের পদ হয় ‘ওয়াকিল এ সালতানাত’। প্রথমে এ রাজ্যের রাজধানী করা হয়েছিল পারেন্দাকে। কিন্তু সেখানে বেশিদিন থাকা হয়নি। পরে রাজধানী সরিয়ে প্রথমে জুন্নার ও পরে খিড়কিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এই খিড়কি পুরোটাই প্রায় ছিল মালিক অম্বরের নিজের হাতে তৈরি করা শহর।

খিড়কিতে যাওয়ার আগে মালিক অম্বর সম্পর্কে আরো কিছু বিষয় জেনে নেয়া প্রয়োজন। মোগলদের সঙ্গে মালিক অম্বরের দ্বন্দ্ব বহুদিন ধরে চলেছিল। মোগলদের লিখিত ইতিহাস মতে, ‘তিনি কখনো জয়লাভ করতেন, কখনো পরাজিত হতেন।’ তবে এ কথা সত্য, মোগল বাহিনীকে একাধিকবার প্রতিহত করেছেন মালিক অম্বর। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দেই তিনি নিজামশাহির বকলমে মোগলদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। আকবরের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীর সিংহাসনে বসলে তিনি আকবরের দাক্ষিণাত্য জয়ের ইচ্ছাকে বাস্তবে পরিণত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানে তার সৈন্যবাহিনী ব্যর্থ হয়েছিল মালিক অম্বরের কাছে। জাহাঙ্গীর এতে এতই ক্ষেপে যান যে মালিক অম্বরের একটি ছবি তৈরি করান। সে ছবিতে দেখা যায় মালিক অম্বরের মাথা লক্ষ্য করে জাহাঙ্গীর তীর ছুড়ছেন। অম্বরের আশপাশে জীবিত ও মৃত পেঁচা উড়ে বেড়াচ্ছে। রাত, অন্ধকার ইত্যাদি প্রতীকের ব্যবহারে ছবিটি চিত্রকর্মের একটি দারুণ উদাহরণ কিন্তু এর মধ্য দিয়ে জাহাঙ্গীরের ঘৃণাও টের পাওয়া যায়। এ ঘৃণার মূল ছিল মালিক অম্বরের সাফল্য। ছবিটি দেখে মনে হতে পারে অম্বরের রঙের কারণে তার প্রতি বর্ণবাদী আচরণ করেছেন জাহাঙ্গীর। কিন্তু আদতে জাহাঙ্গীর যুদ্ধের ময়দানে মালিক অম্বরকে হারাতে না পেরে ছবিতে নিজের মনোবাসনা চরিতার্থ করেছেন।

মালিক ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। প্রথমত, তিনি একটি দক্ষ সেনাবাহিনী তৈরি করেন। একজন ইংরেজ ইতিহাসবিদের মতে, ১৬১০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ মালিক অম্বরের অধীনে ১০ হাজার হাবশি সৈন্য ছিল। এর সঙ্গে ছিল দাক্ষিণাত্যের আরো ৪০ হাজার সৈন্য। মোট ৫০ হাজার সৈন্য তখন কোনো মোগল সেনাপতির অধীনেও থাকত না। ফলে দাক্ষিণাত্যে যেকোনো সুলতানের তুলনায় মালিক অম্বর ছিলেন শক্তিশালী। এর মধ্যে আবার সেনাবাহিনীতে ১০ হাজার হাবশি সৈন্য থাকায় পুরো বাহিনীতে হাবশিদের প্রভাব ছিল। ফলে দলের মধ্যে বিদ্রোহ তৈরি হওয়ার আশংকা কমে যায়। সুলতানের ওপর তার প্রভাব তো ছিলই, এরপর অম্বর একটি পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি করার কথা ভাবেন। তিনি সুলতানের সঙ্গে নিজ কন্যার বিয়ে দেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ বিয়েটি খুব একটা কার্যকর হয়নি। নিজাম শাহর পারসিক পত্নীর হাতে মালিকের কন্যা নিগৃহীত হলে মালিকের পরিকল্পনায় দ্বিতীয় মুর্তজা নিজাম শাহ ও তার স্ত্রীকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। এরপর নিজামের পুত্রকে (পুত্রটি মালিকের কন্যা নাকি নিজামের পারসিক স্ত্রীর গর্ভজাত তা নিয়ে ইতিহাস নীরব) সিংহাসনে বসান। বুরহান নিজাম শাহের অভিভাবক হয়ে ১৬১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে মালিক অম্বর পর্দার আড়াল থেকে সক্রিয়ভাবে শাসন শুরু করেন।

মোগলদের আহমদনগরে প্রবেশ করতে না দিয়ে অম্বর সফল হলেন। এরপর তিনি ভাবলেন রাজ্যকে নিরাপদ করা প্রয়োজন। তিনি দৌলতাবাদ (পুরনো দেবগিরি) দখল করলেন। ১৬১০ সালে তিনি খিড়কিতে রাজধানী স্থাপন করেন। এখানেই শেষ নয়, রাজ্যের নিরাপত্তার পাশাপাশি এটিকে বাসযোগ্য করা এবং সুদৃশ্য শহরে পরিণত করার সব বন্দোবস্তই তিনি করেছিলেন। শহরটিতে বাগান, প্রাসাদ, বড় বড় রাস্তা তৈরি করান। এর মধ্যে জানজিরা প্রাসাদ সবচেয়ে পরিচিত। দ্রুততম সময়ের মধ্যে শহরটি অন্তত দুই লাখ মানুষের বাসস্থান হয়ে ওঠে।

ভারতে মোগল শাসনের শেষ পর্যায়ে, বিশেষত আওরঙ্গজেবের শাসনামলের পরে মারাঠারা প্রবল শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু আদতে এদের উত্থান হচ্ছিল ধীরে ধীরে। মজার ব্যাপার হলো মারাঠাদের উত্থানের পেছনে সক্রিয়ভাবে না হলেও প্রচ্ছন্ন অবদান রয়েছে মালিক অম্বরের। মালিক অম্বর একজন অসাধারণ সেনানায়ক ছিলেন। তিনি তার অঞ্চলের গলিঘুঁজি জানতেন এবং সেভাবেই তিনি যুদ্ধের সময় সেনা পরিচালনা করতেন। মোগলদের বিরুদ্ধে তার কৌশল ছিল গেরিলা আক্রমণ। সাধারণত মোগল সৈন্যবহর ধীরগতিতে অগ্রসর হতো। মালিক অম্বর এ বিষয়টি লক্ষ করে দ্রুততম সময়ে গেরিলা আক্রমণ করতেন। মারাঠারা পরবর্তী সময়ে এ কৌশল অবলম্বন করত। কিন্তু মারাঠাদের গেরিলা আক্রমণের পেছনে মালিক অম্বরের ভূমিকা কী? এ প্রশ্ন আসতেই পারে। উত্তর দেয়ার জন্য খিড়কির উপশহরগুলোর নামের দিকে তাকাতে হয়। এগুলোর নাম ছিল পরশপুর, ভিটপুর, খেলপুর ইত্যাদি। মালিকের দলে বহু মারাঠা অভিজাত ছিলেন এবং মালিক তাদের সম্মান জানিয়ে উপশহরগুলোর এমন নামকরণ করেন। একজন পণ্ডিতের মত স্মরণ করে পিল্লাই লিখেছেন, ‘এ সময় নিজামশাহি মূলত হাবশি-মারাঠা যৌথ শাসনের একটি রাজ্যে পরিণত হয়েছিল।’

মালিক অম্বর মোগল শাসকদের মধ্যে তিনজনকে দেখেছেন—আকবর, জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান। এর মধ্যে শাহজাহানকে অবশ্য সম্রাট হিসেবে দেখেননি কিন্তু তার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করতে হয়েছে। যোদ্ধা শাহজাহানকে তিনি দেখেছেন। ১৬১৭ খ্রিস্টাব্দে শাহজাহানকে ‘শাহ সুলতান’ উপাধি নিয়ে দাক্ষিণাত্যে পাঠান জাহাঙ্গীর। নিজাম শাহের বিরুদ্ধে জয়লাভ করা কঠিন হতো। শাহজাহান তাই প্রথমে বিজাপুরের আদিল শাহের সঙ্গে দর কষাকষির মাধ্যমে একটি সন্ধি করেন। মালিক অম্বর এ সময় বিজাপুরের সুলতানের কাছে মোগল সেনার বিরুদ্ধে যৌথভাবে দাঁড়ানোর কথা বললে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ করার চেয়ে তাদের উপহার দিয়ে তুষ্ট করাই ভালো।’ ফলে বিজাপুরের সাহায্য পাননি অম্বর। শাহজাহানের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে একাই দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

এ যুদ্ধে মালিক অম্বর ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তার সেনাবাহিনীর বহু মারাঠা সৈন্য ও অভিজাত মারা যান। গোদাবরীর তীরে হওয়া এ যুদ্ধের সময় প্রায় ৪০ হাজার ঘোড়সওয়ার নিয়ে আক্রমণ করেছিলেন অম্বর। কিন্তু মোগল বাহিনী নদী দিয়ে ঘেরা একটি গ্রামকে আশ্রয় করে। তারা একটি গর্ত খনন করে তাতে নিজেদের কামান ও অন্যান্য অস্ত্র অন্য পাশে নিয়ে অপেক্ষা করেছিল। মালিক অম্বরের দল বোকার মতো ওই খাদে পড়ে গেলে তারা পিছু হটার সুযোগও আর পায়নি। বিজাপুরের এক দরবারি ঐতিহাসিক লিখেছেন, ‘মালিক অম্বরের দলের সবাই বর্গীর মতো লড়াই করত।’  কিন্তু সেবার আর তা সম্ভব হয়নি। পুরো দলটিই এমন এক অবস্থায় পৌঁছে যায় যে মোগলদের দয়ার ওপর নিজেদের ছেড়ে দেয়া ছাড়া কোনো উপায় তাদের ছিল না।

মালিক অম্বরের জীবনের ওপর বহুবার হুমকি এসেছে। বহুবার তিনি গুপ্তহত্যার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন। এর মধ্যে ১৬১৩ ও ১৬১৪ খ্রিস্টাব্দে দুবার মারাত্মক চেষ্টা হয়েছিল। এর পেছনেও জাহাঙ্গীরের হাত ছিল বলে মনে করেন ইতিহাসবিদদের কেউ কেউ। কিন্তু বেঁচে যান অম্বর। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন দানশীল। এর বাইরে তিনি ছিলেন যোগ্য প্রশাসক। তাকে বলা হয় নতুন আহমদনগরের রূপকার। এ লেখায় খিড়কি নামে যে শহরের কথা বলা হলো, মালিক অম্বরের পর তার পুত্রের হাতে এ শহরের নাম হয় ফতেহপুর। পরবর্তী সময়ে আওরঙ্গজেবের শাসনামলে এ শহরেরই নাম হয় ঔরঙ্গাবাদ। সে হিসেবে মালিক অম্বরই ঔরঙ্গাবাদের পত্তন করেন।

অম্বরের সময়কার পানি বণ্টন ব্যবস্থা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়। দাক্ষিণাত্যে পানির অভাব পূরণের জন্য ঔরঙ্গাবাদে বেশকিছু নহর (খাল) তৈরি করেন। আড়াই লাখ রুপি খরচ করে তিনি এ কাজ করেন। আশপাশের পাহাড়ি ঝরনার পানি এসব ‘ক্যানেলের’ মধ্য দিয়ে শহরে আনা হতো। ‘পাঞ্চাকি’ নামের একটি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পানি আনা হতো। এর মধ্যে একটি নহরের নাম ছিল নহর-এ-অম্বরী। এ চ্যানেলটি প্রকৌশলের দারুণ নিদর্শন। সাত ফুট গভীর চ্যানেলের মধ্য দিয়ে একজন মানুষ হাঁটার মতো জায়গা ছিল। সংস্কারকাজের জন্য এতে ছিল ১৪০টি ম্যানহোল। কিন্তু ৩২১ বছর পর্যন্ত এ নহরে পরিচ্ছন্নতাজনিত কোনো সংস্কারকাজ করার প্রয়োজন হয়নি।

মালিক অম্বর তার শাসন ও সেনা ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি এ ধরনের কাজের জন্যও স্মরণীয়। ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। এর আগে শাহজাহান যখন নূরজাহানের বিদ্বেষের কারণে ফেরারি জীবনযাপন করছিলেন সে সময় দাক্ষিণাত্যে তিনি মালিক অম্বরের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়ালে মালিক অম্বর তাকে সাহায্য করেছিলেন। মূলত মালিক জানতেন যে শাহজাহানের বন্ধুত্ব তার প্রয়োজন হবে। মালিক অম্বর সম্পর্কে মোগল দরবারি ইতিহাসবিদ মোতমিদ খান লেখেন, ‘মালিক অম্বর একজন যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। যুদ্ধে, নেতৃত্বে, সূক্ষ্ম বিচার তথা প্রশাসনের ক্ষেত্রে তার প্রতিপক্ষ কেউ ছিলেন না। ইতিহাসে আর কোনো হাবশি দাসের সাক্ষ্য মেলে না, যিনি তার সমান মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন।’

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক