নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে স্মরণ করুন। তিনি বলেছেন, চারটি শক্রভাবাপন্ন সংবাদপত্র সহস্র বেয়নেটের চেয়ে বেশি আতঙ্কজনক।
টেলিফোন আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহমবেল বলেছেন, আমেরিকা হচ্ছে আবিষ্কারকদের দেশ আর আবিষ্কারকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন সংবাদপত্রের লোকজন।
মার্ক টোয়েন বলেছেন, আপনি যদি সংবাদপত্র না পড়েন তাহলে আপনি জানেনই না, আর যদি সংবাদপত্রের নিয়মিত পাঠক হয়ে থাকেন তাহলে আপনি ভুল জানেন।
উইলিয়াম ফকনার সংবাদপত্রের ভাষ্যকে মিথ্য না বলে বরং বলেছেন, উপন্যাসের ওপর সত্যের জন্য বেশি নির্ভর করা যায়।
অনস্বীকার্য যে সংবাদপত্র রাষ্ট্রের ফিফথ কলাম।
এ লেখায় কিছু তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে। কেবল একশতবর্ষী নয় তিনশতবর্ষী সংবাদপত্র এখনো প্রকাশিত হচ্ছে। এ কথাও মিথ্যে নয় মুদ্রণযুগ এক অনিবার্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০০৫ থেকে ২০২১—এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ২ হাজার ২০০ স্থানীয় সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে গেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে মুদ্রণ সংস্করণ বন্ধ করে দিয়ে অনলাইন সংবাদপত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হয়েছে।
মিডিয়া টাইকুন রুপার্ট মারডক একসময় সংবাদপত্র ব্যবসাকে বলেছিলেন রিভার্স অব গোল্ড আর এখন বলছেন সেই স্বর্ণনদী শুকিয়ে গেছে। মুদ্রিত সংবাদপত্র নিয়ে আশঙ্কা ও আলোচনা অব্যাহত আছে। একই সঙ্গে শতবর্ষী অনেক সংবাদপত্র অর্থাভাবে বন্ধও হয়ে গেছে।
ছাপা পত্রিকা হিসেবে শতবর্ষ টিকে থাকার গৌরব ও চ্যালেঞ্জ—দুইই বিদ্যমান। ১৬৩১ সালে প্রকাশিত ফরাসি ভাষার পত্রিকা এবং প্রথম সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন লা গেজেট সে বছরের ৩০ মে থেকে ১৯১৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিয়মিত প্রকাশিত হয়—আয়ুষ্কাল ২৮৬ বছর।
ইতালীয় ভাষায় প্রকাশিত মিলান সরকারের আমলে ১৬৩৯ সালে প্রকাশিত মিলানো ১৬৪০ থেকে ১৭৬৮ পর্যন্ত প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে—মোট ১২৮ বছর। ইতালির প্যাপাল স্টেট (পোপশাসিত) বলোনিয়া থেকে ইতালীয় ভাষার পত্রিকা বলোনিয়া ১৬৪২ সালে প্রকাশিত হয়ে ১৩৫ বছর পাঠকের হাতে পৌঁছে।
স্প্যানিশ কাতালান ভাষার সংবাদপত্র গেজেটা ডি বার্সেলোনা এ ভাষার প্রথম সংবাদপত্র। কাতালোনিয়া প্রিন্সিপালিটির অধীনে বার্সেলোনা থেকে প্রকাশিত এ সংবাদপত্র ১৬৪১ সালে প্রকাশিত হয় এবং প্রকাশনা ১৮০৮ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। পত্রিকাটি ১৬৭ বছর চালু ছিল।
ডাচ রিপাবলিকের পত্রিকা Weeklycke
Courante Van Europa
১৬৫৮ সালে প্রকাশিত হয়। ছয় বছর পর মালিকানা ও পত্রিকার নাম বদলে যায়। নতুন নামে (Oprechte Haerlemsche Courante) প্রকাশনা অব্যাহত থাকে। ১৯৪২ সালে পত্রিকাটি Haarlems Dagblad-এর সঙ্গে একীভূত হয়ে প্রকাশনা এখন পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছে। শুরু থেকে হিসাব করলে এ ডাচ পত্রিকাটির বয়স ৩৬৪ বছর।
ইতালীয় ভাষায় হোলি রোমান এম্পায়ারে মন্তুয়া থেকে ১৬৬৪ সালে প্রকাশিত পৃথিবীর প্রাচীনতম ব্যক্তিমালিকানাধীন পত্রিকা, যার প্রকাশনা এখনো অব্যাহত আছে গেজেটিয়া ডি মনতোভা নামে। ১৬৬৫ সালে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড থেকে অক্সফোর্ড গেজেট প্রকাশিত হয়। ১৬৬৬ সালে পত্রিকাটি লন্ডনের ছাপাখানায় মুদ্রিত হতে শুরু করে এবং সে প্রকাশনা এখনো অব্যাহত আছে। ১৬৯০ সালে প্রকাশিত ইংরেজি জার্নাল বেরো’স ওরচেস্টার জার্নালের প্রকাশনা এখনো অব্যাহত আছে। দাবি করা হয় এটি অব্যাহত প্রকাশনার ক্ষেত্রে প্রাচীনতম।
লন্ডন থেকে ১৭০২ সালে দৈনিক হিসেবেই প্রকাশিত হয় পৃথিবীর প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র ডেইলি কুরান্ট। ১৭৩৫ সালে লন্ডনের ডেইল গেজেটিয়ারের সঙ্গে একীভূত হয়ে এখন এ নামেই প্রকাশিত হচ্ছে।
মস্কো থেকে প্রকাশিত ভেদোমোস্তি ২১৪ বছর প্রকাশিত হওয়ার পর বলশেভিক বিপ্লবের সময় বন্ধ হয়ে যায়। পত্রিকাটি ১৭০২ সালে মস্কো থেকে প্রকাশিত হয়। ১৭১১-তে মস্কো থেকে স্থানান্তরিত হয় এবং নতুন নামায়ন হয় সানকি-পিটার্সবার্গ ভেদোমোস্তি। ১৯১৪ সালে একই পত্রিকার পুনঃনামকরণ করা হয় পেত্রোগ্রাদাস্কি ভেদোমোস্তি। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর পত্রিকাটি পুনঃপ্রকাশিত হয় এবং এখন পর্যন্ত প্রকাশনা অব্যাহত আছে।
তিনশতবর্ষী সংবাদপত্র
তিনশতবর্ষী পত্রিকা জার্মান ভাষার উইনার জায়দো ১৭০৩ সালে প্রকাশিত হয়। তবে পত্রিকাটি জার্মানির নয়, অস্ট্রিয়ার। ভিয়েনা থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে এবং অনলাইন পত্রিকার যুগেও মুদ্রিত প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে। ঠিক দুই বছর পর ১৭০৫ সালে জার্মানির হিল্ডশিম থেকে প্রকাশিত হয় হিল্ডশিমার রিলেশনস কুরিয়ার। এখনো প্রকাশিত হচ্ছে, নাম বদলে হয়েছে হিল্ডশিমার আলজেমিন জায়দো।
ব্রিটেনের স্ট্যামফোর্ড থেকে প্রকাশিত স্ট্যামফোর্ড মার্কারির ৩১০ বছর ধরে প্রকাশনা চলছে। ১৭১২-তে প্রকাশিত এই পত্রিকা সম্পর্কে বলা হয় একই নামে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে চলা পত্রিকা স্ট্যামফোর্ড মার্কারি। ১৭২২ সালে প্রকাশিত গ্লস্টার জার্নাল এ বছর ৩০০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে।
দ্বিশতবর্ষী সংবাদপত্র
১৭৩৭-এ প্রকাশিত বেলফাস্ট নিউজলেটার সব আইরিশ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত এবং এখনো প্রকাশিত হচ্ছে।
১৭৩৮-এ প্রকাশিত সুইস পত্রিকা Feuille
d’Avis de Neuchatel
এখনো প্রকাশিত হচ্ছে।
১৭৪৭-এ এবারডিন থেকে প্রকাশিত দ্য প্রেস অ্যান্ড জার্নাল এখনো প্রকাশিত হচ্ছে। ডেনমার্ক-নরওয়ে রাজত্বকালে কোপেনহেগেন থেকে প্রকাশিত ডেনিশ ভাষার পত্রিকা Berlingske
এখনো চালু আছে। ১৭৫২-এর ডাচ পত্রিকা Leewarder
Courant এখনো নেদারল্যান্ডস থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। ১৭৫৪-এর ইংরেজি পত্রিকা ইয়র্কশায়ার পোস্ট লিডস শহর থেকে প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে। ১৭৫৮ সালে প্রকাশিত সুইডিশ সাপ্তাহিক Norrkopings Tidningar এখন দৈনিক হিসেবে চালু আছে। ১৭৬২ সালের সুইস পত্রিকা 24
Heures এখনো চলছে, এখনো জনপ্রিয়। যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল থেকে ১৭৬৪ সালে প্রকাশিত নিউক্যাসল ক্রনিকল প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে।
১৭৭২-এ আয়ারল্যান্ড থেকে প্রকাশিত ডেরি-জার্নাল এখনো সপ্তাহে দুদিন প্রকাশিত হচ্ছে। ১৭৮০ জুরিখ থেকে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত Neue
Zurcher Zeiturg এখনো জুরসার জায়দো নামে চালু আছে। ১৭৮৩-এর গ্লাসগোর দ্য হেরাল্ড এবং ১৭৮৫-এর লন্ডনের দ্য টাইমস এখনো বেশ বহাল আছে। ১৭৯১-এর লন্ডন অবজারভার প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে। ১৮১৩-এর সুইডিশ পত্রিকা গোথেবার্গ-পোস্টেন এখনো প্রকাশিত হচ্ছে। যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত ১৮১৭-এর স্কটম্যান এবং ১৮১৮-এর ওয়েস্টমরল্যান্ড গেজেট এখনো চালু আছে।
২০১ বছর হয়েছে ম্যানচেস্টার থেকে প্রকাশিত দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার। এখনো দাপটের সঙ্গে বহাল আছে।
শতবর্ষী আরো সংবাদপত্র
এখনো প্রকাশিত হচ্ছে এমন কিছু সংবাদপত্রের নাম ও প্রকাশনা শুরুর বছর উল্লেখ করা হচ্ছে: সুইডিশ অ্যাফ্রোনব্লুবাদেত (১৮৩০), পর্তুগিজ O
Acoriano Oriental (১৮৩৫), দি ইকোনমিস্ট (১৮৪৩), ফ্রান্সের লা ইনডিপেনডেন্ট (১৮৪৬), সুইডেনের Sydsvenskan
(১৮৪৮), অস্ট্রিয়ার Die
Press (১৮৪৮), লন্ডনের সারে কমেট (১৮৫৪), ডেইলি টেলিগ্রাফ (১৮৫৫), ফিনল্যান্ডের Vasabladet
(১৮৫৬), ফ্রান্সের লে প্রগ্রেস (১৮৫৯), ইতালির লা নাজিওন (১৮৫৯), ইতালির লা স্টাম্পা (১৮৬৬), ব্রিটেনের ম্যানচেস্টার ইভনিং নিউজ (১৮৬৮)।
শতবর্ষী পত্রিকার সংখ্যা এত বেশি যে তার উল্লেখে প্রচুর পরিসরের প্রয়োজন হবে। তার চেয়ে কয়েকটির নাম কেবল উল্লেখ করছি: দি ইভনিং নিউজ (লন্ডন ১৮৮১), ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস (লন্ডন ১৮৮৮), ডে টেলিগ্রাফ (আমস্টারডাম ১৮৯৩), ডেইলি মেইল (লন্ডন ১৮৯৬), যুক্তরাষ্ট্রের দ্য টেলিগ্রাফ (১৮৩৬), কানাডার অটোয়া হেরাল্ড (১৮৪৫), যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন হেরাল্ড (১৮৪৬), শিকাগো ট্রিবিউন (১৮৪৭), কানাডার লন্ডন ফ্রি প্রেস (১৮৪৯), যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমস (১৮৫১), আর্জেন্টিনার লা ক্যাপিটাল (১৮৬৭) এবং লা নেশিয়ন (১৮৭০), কানাডার গার্ডিয়ান (১৮৭০), যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট (১৮৭৭), লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস (১৮৮১), ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (১৮৮৯), ডেনভার পোস্ট (১৮৯২), আর্জেন্টিনার এল লিবারেল (১৮৯৮), কায়রোর আল আহরাম (১৮৭৫), মুম্বাইয়ের টাইমস অব ইন্ডিয়া (১৮৩৮), সুরাট থেকে প্রকাশিত গুজরাট মিত্র (১৮৬৩), এলাহাবাদ থেকে প্রকাশিত দ্য পাইওনিয়ার (১৮৬৫), মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত দ্য হিন্দু (১৮৭৮), লাহোর থেকে দ্য ট্রিবিউন (১৮৮১), অস্ট্রেলিয়া থেকে সিডনি মর্নিং হেরাল্ড (১৮৩১), মেলবোর্ন থেকে দি এজ (১৮৫৪)।
অনলাইন যুগেও ভারতে টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রচার সংখ্যা ২৮ লাখ এবং হিন্দুর প্রচার সংখ্যা ১৪ লাখ ছাড়িয়ে।
এশিয়ার টিকে থাকা প্রাচীনতম পত্রিকার ডাবল সেঞ্চুরি
২০২২ সালের ১ জুলাই দৈনিক বোম্বে সমাচার লাহোরের নাম বদলে যাওয়ার পত্রিকাকেও হতে হলো মুম্বাই সমাচার। ১৮২২ সালে গুজরাটের বিশিষ্ট প্রেস মালিক এবং ফার্সি ভাষার পণ্ডিত ফারদুনজি মারজবান নিয়মিত সাপ্তাহিক হিসেবে পত্রিকাটিকে চালু করেন, পরবর্তী ১০ বছর তা সাপ্তাহিক প্রকাশনা অব্যাহত রাখে। ১৮৩২ থেকে ১৮৫৫ পর্যন্ত সপ্তাহে দুদিন প্রকাশিত হওয়ার পর বোম্বে সমাচার দৈনিক হয়ে যায় এবং অবিচ্ছিন্ন প্রকাশনা চালিয়ে এ বছর দুই শতাব্দী পূরণের উৎসব উদযাপন করে। অনুষ্ঠানটির নাম ছিল ‘দ্বিশতাব্দী মহোৎসব’। পত্রিকাটি গুজরাটি এবং ইংরেজি দুই ভাষায় প্রকাশিত হয়। পত্রিকা প্রকাশের ১০ বছর আগে ১৮১২ সালে ফারদুনজি গুজরাটের প্রথম ছাপাখানা স্থাপন করেন এবং সেখান থেকে ক্যালেন্ডার ছেপে ভারতবর্ষে পরিচিতি লাভ করেন। আরো ছয় বছর পর রাজধানী কলকাতা থেকে বাংলা ক্যালেন্ডার প্রকাশিত হয়। তবে পত্রিকা প্রকাশনায় বাংলার সমাচার দর্পণ বোম্বে সমাচার থেকে চার বছর এগিয়ে। শ্রীরামপুর ব্যাপ্টিস্ট মিশন ছাপাখানা থেকে ৪০০ কপি পত্রিকা প্রকাশিত হতো। সমাচার দর্পণ শতবর্ষী নয়। সিকিশতবর্ষীও হতে পারেনি। ১৮১৮-তে প্রকাশিত প্রথম ভারতীয় এবং প্রথম বাংলা পত্রিকাটির প্রকাশনা ১৮৪১ সালে বন্ধ হয়ে যায়।
এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা





