বর্তমান পৃথিবীতে শরণার্থী সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ইউক্রেন-রাশিয়া সংকটের আগেও আমরা দেখেছি সিরিয়ার ঘটনা। পশ্চিম এশিয়ার নানা দেশের সীমান্তে শরণার্থীর ভিড় দেখা গেছে। কিন্তু এ সংকট বা এমন দৃশ্য পৃথিবীর জন্য নতুন কিছু না। এমনকি নতুন না এ উপমহাদেশেও। ১৯৪৭ সালে বহু মানুষ ভিটেছাড়া হয়েছে। হয়েছে ১৯৭১ সালেও। রিফিউজিদের ইতিহাস মূলত বহু বছরের কিন্তু আমাদের ঘরের ভেতরেই রয়েছে অনেক বড় চিত্র বা উদাহরণ। বাংলাদেশের বিহারি ক্যাম্পের কথা আমাদের অজানা নয়। কিন্তু এর বাইরে পাকিস্তানেও রয়েছে বিহারি ক্যাম্প। তবে বাংলাদেশে যেমন বিহারি ক্যাম্প নামে পরিচিত, পাকিস্তানে তেমন নয়। পাকিস্তানের বিহারিদের বেশির ভাগই বাস করেন করাচিতে। তবে জীবনযাপন ও মান পৃথিবীর অন্যসব অঞ্চলের শরণার্থীদের মতোই, নিম্ন।

বিহারিদের মোহাজির হওয়ার ঘটনা ইতিহাসে মূলত দুবার ঘটেছে বড় পরিসরে—১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালে। দেশভাগের সময় বেশির ভাগ বিহারিই বিহার থেকে উত্তর প্রদেশ ও দিল্লিতে গিয়েছিলেন। কিছু এসেছিলেন বাংলাদেশে ও সামান্য সংখ্যায় গিয়েছিলেন কলকাতায়। কিন্তু ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং এর পরপর বাংলাদেশে বিহারিদের প্রতি ক্রোধ ও ক্ষোভ তৈরি হলে তারা পাকিস্তানে গমন করেন। এর একমাত্র কারণ এই নয় যে বাঙালিরা বিহারিদের প্রতি কুপিত ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রেই বিহারিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধী ছিলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে তারা সহায়তা করেছেন। বলা হয় তারা পাকিস্তানকেই নিজের ওয়াতান (দেশ) মনে করত। অনেকের ব্যবসাও ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ফলে তারা পাকিস্তানে চলে যাওয়াই শ্রেয় মনে করে।

অবশ্য সবার ক্ষেত্রেই বিষয়টা এমন ছিল না। বাংলাদেশে বিশেষত ঢাকায়, এমন অনেক বিহারি ছিল যারা নেহায়েতই সাধারণ মানুষ। পশ্চিম পাকিস্তানে তাদের সহায় সম্পত্তি তো দূর, কোনো আত্মীয়ও ছিল না। এরা পাকিস্তানে শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশ ছাড়ে। মোটামুটি ১৯৭০ থেকে এ প্রক্রিয়া শুরু। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশান্তর প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে চলতে থাকে। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশে আটকে পড়া বিহারিদের পুনর্বাসন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ চুক্তি অনুসারে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার বিহারিকে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। তিন ধাপে নানা প্রতিকূলতা ও দুই দেশের মধ্যে চাপান উতোরের মধ্য দিয়ে এ স্থানান্তর ঘটে। এদের বেশির ভাগই করাচিতে বসবাস করে। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পাকিস্তানের অন্যান্য অংশেও পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু একত্রে থাকার ইচ্ছা বা অন্যান্য নানা কারণে তারা করাচিতেই থাকতে ইচ্ছুক। তাই করাচিতেই এক টুকরো বিহার তৈরি করে নিয়েছে।

করাচির বিহারিদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য বসবাস করে ওরাঙ্গি টাউনের মাজিদ কলোনিতে। এটি নতুন করাচির বাহাদুরাবাদে অবস্থিত। একাত্তর সালে তারা অনেকেই জাহাজে করে বাংলাদেশ থেকে এসেছিল পাকিস্তানে। তাদের বিশ্বাস ছিল দেশটিতে তারা দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গৃহীত হবে। কিন্তু বাস্তবতা সব সময়েই চিন্তার চেয়ে ভিন্ন। তাদের দেশপ্রেমিক তো দূর সাধারণ নাগরিকের মর্যাদাও দেয়া হয়নি। প্রাথমিকভাবে তারা নিজেদের খাদ্য-বস্ত্রের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে পারেনি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। নাগরিকত্বও দেয়া হয়নি তাদের।

বর্তমানে করাচিতে বসবাসকারী এ বিহারিদের কোনো নাগরিক সনদপত্রও নেই। ২০১৬ সালের দ্য নিউজের একটি রিপোর্ট অনুসারে মাজিদ কলোনির বিহারিদের কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। ৫২ বছর বয়সী কামরুল হাসান জানিয়েছেন, ন্যাশনাল ডাটাবেজ অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন অথরিটি তাদের কম্পিউটারাইজড ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড নবায়নের ব্যাপারে অপারগতা জানিয়েছে। তখন থেকে কামরুল হাসান বেকার। এ ঘটনা করাচির বিহারিদের জন্য নতুন কিছু নয়। স্থানান্তরের পরপর সত্তরের দশকে বহু বিহারি পাকিস্তানে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করতে বাধ্য হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে করাচিতে আসার আগেই অনেক কিছু হারিয়েছে এ বিহারিরা। ১৯৭২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমসে করাচির বিহারিদের নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে উল্লেখ রয়েছে সৈয়দ বদরুদ্দীন নামে ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির। তিনি চট্টগ্রামের হাফিজ জুট মিলের নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে কাজ করতেন। তারা একাত্তরের মার্চে জাহাজে করে চট্টগ্রামে উপকূল ধরে পালানোর চেষ্টা করেন। তাদের প্রাথমিকভাবে করাচিতে সাদর আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু তিনি তার দুই ছেলে ও এক মেয়েকে আর খুঁজে পাননি। ধরে নিয়েছেন এরা আর জীবিত নেই।

করাচিতে এ বিহারিদের জীবনযাপনে সমস্যা হওয়ার আরেকটি কারণ এর পরিবেশ ও প্রতিবেশ। প্রতিবেশ প্রসঙ্গে একই নিবন্ধে জনৈক রাশিদা বেগমের উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি ঢাকায় দর্জির কাজ করতেন এবং তার স্বামী ছিলেন একজন নরসুন্দর। করাচিতে আসার পর সুতা কেনার মতো টাকাও তার হাতে ছিল না। এর পাশাপাশি করাচির দোকানগুলো তাকে কাজ দিতে অস্বীকার করে। রাশিদার স্বামী রাস্তার পাশে বসে ক্ষৌরকর্ম করতে চাইলেও স্থানীয় নাপিতদের রোষের শিকার হন।

অন্যদিকে করাচির পরিবেশ কৃষিবান্ধব নয়। বিহারিদের অনেকেই ছিলেন কৃষক। কিন্তু করাচিতে পান করা ও গোসলের জন্য সামান্য পানি বাদে এখানে পানি পাওয়া যায় না। সুতরাং ওই পাহাড়ি ও মরুময় পরিবেশে কৃষিকাজের সুযোগ ছিল কম। করাচির স্থানীয় সরকার এখানে ট্রাকের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করে কিন্তু পরিমাণে তা যথেষ্ট নয়। ফলে বিহারিদের একটা অংশ কর্মক্ষম হওয়া সত্ত্বেও কোনো কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারল না। এদের সাহায্য করার চেষ্টা করা হলেও স্বভাবতই যথেষ্ট সাহায্য তারা পায়নি। যেমন লায়নস ক্লাব বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যখনই কোনো দান সামগ্রী পাঠাত, স্থানীয় গুণ্ডা ধরনের লোকেরা তা চুরি (কখনো ছিনতাই) করে নিয়ে অন্যত্র বিক্রি করে দিত। এদের বিহারিরা নাম দিয়েছিল ‘হাঙর’।

কৃষক, দর্জি বা নাপিত নয়, অনেক অবস্থাপন্ন লোকেরাও বাধ্য হয়েছিল শরণার্থী হতে। রাগির হোসেন নামে ৪০ বছর বয়সী এক আইনজীবী শুরুতে ক্যাম্পের সভাপতি হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত ও অবহেলিত।’ ঢাকায় দু-দুটি বাড়ির মালিক রাগিব এ সময় শরণার্থী ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। কাজে যোগ দেয়ার চেষ্টা করার পরও কিছুদিনের মধ্যেই কোনো না কোনো অভিযোগ করে বিহারিদের কর্মচ্যুত করা হতো। তাই এখানে নিজেদের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে সমিতি তৈরি করার চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু দিনে দিনে এদের মধ্যে ঢুকে পড়ে নানা দলাদলি, কোন্দল। আর তরুণরা নানা রকম মাদকের খপ্পরে পড়ে যায়।

ওরাঙ্গি টাউনে বসবাসকারী এ বিহারিরা নিজেদের মধ্যে বিহারের সংস্কৃতির অনেকটাই ধরে রেখেছে। বলা চলে করাচির এ জায়গা এক টুকরো বিহার। এর অন্যতম একটি কারণ পাকিস্তানের স্থানীয়রা বিহারিদের স্বাগত জানায়নি। যে অবস্থায় তারা এখানে বসবাস করে, সেখানেও ভালো থাকা সম্ভব ছিল কিন্তু আশির দশকে করাচিতে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হলে এখানকার বিহারিদের জন্য পরিস্থিতি আরো সংকটজনক হয়ে পড়ে। তাদের আরো কোণঠাসা করে ফেলা হয়। প্রথম দিকে পাকিস্তানের অন্যতম রাজনৈতিক দল এমকিউএম তাদের সহায়তা দিয়েছিল। দলটির পাশাপাশি ধীরে ধীরে বিহারিরা নিজেদের রাজনৈতিক দল তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। সেখান থেকে তৈরি হয় বিহারি কওমি মুভমেন্ট নামে একটি দল। দলটির মাধ্যমে তারা নিজেদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

নব্বইয়ের দশকে বিহারিদের পাঞ্জাবে পুনর্বাসন করার একটি চেষ্টা করা হয়। পাঞ্জাবের খানেওয়াল নামক অঞ্চলের মিয়া চুন্নুতে ৩২১ জন বিহারিকে পুনর্বাসন করার মাধ্যমে কাজটি শুরু হয়। কিন্তু সেখানেও তারা শান্তিতে বসবাস করতে পারেনি। কোনো না কোনোভাবে পাঞ্জাবিরা তাদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছে। বলা চলে তারা আসলে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে এসে আরো বেশি সংকটে পড়েছে। সেখানে বিহারিদের জন্য বরাদ্দ ঘর দখল করে নিয়েছে পাঞ্জাবিরা। বিহারিদের জন্য নির্ধারিত ক্যাম্পের ভেতরে তারা কোনোমতে দিন গুজরান করে চলছে। অভিযোগ করার মতো কোনো সুযোগ নেই।

অথচ বৃহত্তর পাকিস্তানে না হলেও করাচিকে এ বিহারিরাই কসমোপলিটন করে তুলেছে। বিহারের খাবার, বিশেষ করে কাবাব তারা ছড়িয়ে দিয়েছে করাচির অলিগলিতে। এছাড়া কাজের সূত্রে কিংবা জীবিকার তাড়নায় তাদের মিশতে হয়েছে করাচির সাধারণ মানুষের সঙ্গে। সে সূত্রে করাচির মানুষের মধ্যে প্রবেশ করেছে বিহারিদের মুখের ভাষা। তাদের কথা ও কাহিনী গল্পের সঙ্গে করাচির মানুষ না চাইতেও গ্রহণ করেছে। বিহারিদের সঙ্গে করাচির অধিবাসীদের সংকট তৈরি হয়েছিল ভাষা প্রসঙ্গে। কিন্তু খোঁজ করলে দেখা যাবে করাচির সিন্ধিভাষীদের মধ্যে এখন বিহারিদের উর্দু শব্দই কেবল না ভাষার টানও ঢুকে গেছে কোনো না কোনোভাবে। একটি বৃহৎ সম্প্রদায় বা ভাষাভাষী মানুষের প্রভাব তো অস্বীকার করা যায় না।

এমকিউএমের রাজনৈতিক নেতা আবদুল কাদির খানজাদা বিহারিদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন এক সময়। ২০১২ সালে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার করাচিতে এলে খানজাদা বলেছিলেন, ‘আমার পরিবার রাজস্থানের আলোয়ার থেকে এসেছিল। আর এখানে আমার ভোটারদের ৭০ শতাংশই বিহারি।’ পাকিস্তানে বহুদিন ধরে প্রকৃত কোনো আদমশুমারি হয়নি। আনুমানিকভাবে এখন দেশটিতে বিহারিদের সংখ্যা ১৫-১৬ লাখ এবং তারা সবাই যে ক্যাম্পে জীবনযাপন করে এমন নয়। ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের প্রফেসর কামরান আসদার আলীও এক সময় বিহার থেকে শরণার্থী হয়ে এসেছিলেন করাচিতে। তিনি বলেন, ‘বিহারিরা এখন পাকিস্তানের সবখানেই আছে। তারা প্রভাবশালী অবস্থানে যেমন আছে, তেমনি চূড়ান্ত মানবেতর জীবনযাপনও করছে অনেকে।’ কিন্তু তা সত্ত্বেও বিহারিদের স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করা হয়নি। শরণার্থী হিসেবে একটি সাধারণ নাম দেয়া হয়েছে তাদের—মোহাজির।

‘কিন্তু মোহাজির তো যে কেউ। বিহার থেকে আসুন বা উত্তর প্রদেশ, মাদ্রাজ কিংবা বোম্বে—সবাই মোহাজির’, এভাবেই বলেছেন ইকবাল আহমেদ (১৯৩৩-১৯৯৯)। উপনিবেশবিরোধী তাত্ত্বিক ও অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে পাকিস্তানের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠা ইকবাল ছিলেন একজন পাকিস্তানি-বিহারি, অর্থাৎ পাকিস্তানে শরণার্থী। তার কথাটির সহজ অর্থ হলো বিহারিদের আলাদা একটি পরিচয় আছে এবং পাকিস্তানে তারা সে স্বীকৃতিটা চায়। মূলত করাচি থেকে শুরু করে পাকিস্তানের আনাচে কানাচে থাকা বিহারিদের ইচ্ছাই তার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক