জিন্নাভাই পুঞ্জা স্ত্রী মিঠিবাইকে নিয়ে গুজরাটের বড় ব্যবসার পার্টনারশিপজনিত কারণে করাচি চলে এলেন। তার পার্টনার গ্রামস ট্রেডিং কোম্পানির আঞ্চলিক অফিস করাচিতে। এসব ঘটেছে তাদের প্রথম সন্তান
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর জন্মের আগে। জিন্নাভাইকে তার গুজরাটি বন্ধুরা ডাকত জিন্নো, তার মানে শুঁটকো, হাড়সর্বস্ব। প্রথম সন্তানটিও বাবার মতো লম্বা ও শুঁটকো। এই দম্পতির সাত সন্তান:
১. মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ২. আহমেদ আলী জিন্নাহ, ৩. বন্দে আলী জিন্নাহ, ৪. রহমত বাই জিন্নাহ, ৫. শিরিন বাই জিন্নাহ, ৬. ফাতিমা জিন্নাহ ৭. মরিয়মবাই জিন্নাহ।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পড়াশোনা করতে বিলেত যাবেন, বয়স ১৬ বছর। সেখানে কোনো ‘ম্লেচ্ছ সাদা’ মেয়ের পাল্লায় পড়েন, এ আশঙ্কায় তার মা মিঠিবাই ঠিক করলেন, ছেলেকে বিলেত পাঠানোর আগে বিয়ে করাবেন। তিনি পুত্রবধূও ঠিক করলেন। নিকটাত্মীয়দের মধ্যে ১৪ বছর বয়সী এমিবাইকেই তার পছন্দ। ছেলে এতে খুব আগ্রহও দেখালেন না, আবার নাও বললেন না। করাচির গালেলিতে এমিবাইয়ের জন্ম ১৮৭৮ সালে। জিন্নাহ পড়াশোনার জন্য লন্ডন চলে গেলেন। কয়েক মাস পর ১৫ বছরে পড়তে না পড়তেই কলেরায় এমিবাইয়ের মৃত্যু হলো।
এমিবাই সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি, জিন্নাহও কখনো মুখ খোলেননি। দুজনের একটি দুর্লভ যুগল ছবির সন্ধান পাওয়া গেছে। একঝলকে ইউরোপীয় কোনো যুগল বলে ভ্রম হতে পারে।
জিন্নাহ আত্মজীবনী লেখেননি, ডায়েরিও না। দাপ্তরিক ও নিরাবেগ চিঠিপত্রের বাইরে এমন কিছু তিনি লেখেনও নি। এসবের পেছনে তিনটি কারণের যেকোনোটি কিংবা প্রত্যেকটিই জিন্নাহর বেলায় সত্য। প্রথমত. ওকালতি ও রাজনৈতিক ব্যস্ততার জন্য তিনি সময় পেতেন না। দ্বিতীয়ত. তার লেখালেখির অভ্যাস ছিল না। তৃতীয়ত. তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ‘প্রাইভেট পারসন’। তার কোনো ব্যক্তিগত বিষয়, আবেগ-উচ্ছ্বাস, দ্বন্দ্ব-যাতনা বাইরের কেউ জানুক, এটা তিনি চাইতেন না।
এ নিরাবেগ নিরাসক্ত রোবোটিক মানুষটিকেই দুবার কাঁদতে দেখা গেছে। প্রথমবার যখন রতনবাই রটি পেটিটকে কবরে শায়িত করে জিন্নাহকে একমুঠো মাটি ছড়িয়ে দিতে বলা হয়। দ্বিতীয়বার চিরদিনের জন্য ভারত ত্যাগের আগে যখন বোম্বের গোরস্তানে সমাহিত এ নারীর কাছে যান।
রটিকে বলা হতো দ্য রোজ অব বোম্বে— বোম্বের গোলাপ। তার বাবা স্যার দিনশ পেটিট ও মা শিলা টাটা। স্যার দিনশ নিজে বিজনেস ম্যাগনেট। তার বাবা দিনশ মানেকজি পেটিট ভারতের প্রথম কাপড়ের মিল প্রতিষ্ঠাতা। রটির মা শিলা রতনজি দাদাভয় টাটার কন্যা। শিলার চাচা জামশেদজি টাটা। শিলা নিজেও টাটা অ্যান্ড সন্সের বোর্ডে ডিরেক্টরদের একজন। তার পরিচিত লেডি দিনাবাই পেটিট। ব্যারিস্টার মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে মামলার ব্রিফ দেয়ার জন্য তখন বোম্বের শিল্পপতিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা। জিন্নাহ দেশীয় ও ব্রিটিশ আইন-কানুন ভালো জানেন, বিচারকের সামনে প্লিডিংয়ে তার সমকক্ষ কাউকে পাওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার।
স্যার দিনশ পেটিট জিন্নাহকেই আইনজীবী হিসেবে পেতে চান; জিন্নাহ ততদিনে সম্মত।
পেটিট পরিবার শুধু ধনাঢ্যই নয়, সংস্কৃতিমনাও। এ বাড়ির পার্টিতে আসেন ভারতের সেরা বুদ্ধিজীবী, কবি, শিল্পী, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, মন্ত্রী, বিদেশী বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় মুখর থাকে এসব পার্টি। এমন একটি পরিবেশেই পেটিট পরিবারের একমাত্র সন্তান রটি বেড়ে উঠছেন। রটির প্যাশন তিনটি— বই, নতুন পেশাক আর পোষা প্রাণী। বইপত্র নিজের বয়সের তুলনায় এবং সমবয়সী অন্যদের তুলনায় বেশিই পড়েছেন। বোম্বের হাই সোসাইটি সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরা যুবতী হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। সেই সঙ্গে শারীরিক সৌন্দর্য তাকে বোম্বের গোলাপ হিসেবে পরিচিত করাতেই পারে।
১৯১৬-এর গ্রীষ্মে স্যার দিনশ ব্যারিস্টার জিন্নাহকে তার পরিবারের সঙ্গে গ্রীষ্মকালটা দার্জিলিংয়ে কাটাতে নিমন্ত্রণ জানালেন। জিন্নাহ এলেন।
পরিবারের একমাত্র সন্তান ১৬ বছর বয়সী রটি বোম্বের বাড়ির পার্টিতে আগেও দু-একবার দেখেছেন, এবার চেনাজানাটা আরেকটু বেশি হলো। রটি আবিষ্কার করলেন, জিন্নাহর সঙ্গে তার সাংস্কৃতিক রুচির দরুণ মিল। এমনটি আর কারো সঙ্গে কখনো মেলেনি।
রতনবাই রটি পেটিটের জন্ম ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯০০। আর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর জন্ম ২৫ ডিসেম্বর ১৮৭৬। দুজনের বয়সের ব্যবধান ২৪ বছর। তার ওপর জিন্নাহ একবার বিবাহিত। স্ত্রী এমিবাই প্রয়াত।
রটি বাহ্যত দুজনের মধ্যে যেসব মিল খুঁজে পেলেন, তার মধ্যে রয়েছে বইপ্রীতি, ঘোড়ায় চড়া, পৃথিবীর বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আগ্রহ এবং আরো মিলে গেল ব্রিটিশ তাড়ানো, স্বাধীন ভারতের প্রত্যাশা।
প্রেম তো আর ড্রাম পিটিয়ে দামামা বাজিয়ে চারদিক সচকিত করে আসে না, এমনি হয়ে যায়। রটি ও জিন্নাহ দুজনই টের পেলেন, তাদের মধ্যে ব্যাপারটা ঘটে গেছে।
স্যার দিনশ যখন টের পেলেন, অনেক দেরি হয়ে গেছে। মেয়ের একগুঁয়েমি ও স্বাধীনচেতা মনোভাবও তার অজানা নয়। মেয়ে যতই ভালোবাসুক, পারসিক ধর্মীয় গোষ্ঠীর বাইরে রটির বিয়ে মেনে নেয়া যায় না।
বাবা-মা, জুয়েলারি বক্স, ওয়্যারড্রোব, বিত্ত-প্রতিপত্তি টাটা ও পেটিট দুই পরিবারের উত্তরাধিকার সব তুচ্ছ করে নিজের পোষা কয়েকটি বিড়াল নিয়ে রটি বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন।
১৯ এপ্রিল ১৯১৮ বোম্বে জামিয়া মসজিদের মওলানা নজির আহমেদ নাজাফির হাত ধরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন রতনবাই পেটিট। নতুন নাম হলো মরিয়ম। মালাবার হিলসে জিন্নাহর সাউথ কোর্টের বাড়িতে শাড়ি পরে আসা রটি ওরফে মরিয়ম ও জিন্নাহর বিয়ে হলো। দুজন হানিমুনে গেলেন নৈনিতাল।
ফিরে এসে রটি স্বামীর সাউথ কোর্টের বাড়ি নতুন করে সাজালেন। ওয়্যারড্রোব ভরে উঠল নতুন পোশাকে। ওদিকে পারসিক, হিন্দু ও শিখ সমাজে জিন্নাহর বিয়ে নিয়ে ঢি ঢি রব পড়ে গেল। মুসলমান সমাজে প্রতিক্রিয়া হলো সবচেয়ে বেশি। এমনিতেই জিন্নাহর অনৈসলামিক জীবনযাপন বরাবরই তার মুসলমান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধাচরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এবার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিধর্মী ও শ্রমিকের রক্তচক্ষু স্যার দিনশ পেটিটের মেয়েকে বিয়ে।
জিন্নাহর বিয়ে নিয়ে সমালোচনা শুরু করলেন খাকসার আন্দোলনের নেতারা। ইসলামী শিশুকেন্দ্র দেওবন্দের দারুল উলুম আল হিন্দের আলেমরা জানিয়ে দিলেন, জিন্নাহর বিয়ে সম্পূর্ণ অনৈসলামিক। কারণ তিনি দেওয়ানি আদালতে বিয়ে করেছেন। মজলিস-ই-আহরারের নেতাদের মুখেও একই কথা।
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সঙ্গে তখনো জিন্নাহর রাজনৈতিক সখ্য স্থাপন হয়নি। মুসলমান ও পারসিক বিয়েতে তিনি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করলেও তার নিজের নাতনি যখন মুসলমান ছেলে বিয়ে করতে উদ্যত, তিনি তীব্র বাধার সৃষ্টি করলেন। ওদিকে স্যার দিনশ পেটিট জানিয়ে দিলেন, তিনি আর কখনো মেয়ের মুখ দেখতে চান না। তিনি এটাকে মেয়ের বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখলেন।
চুর্তদিকের আক্রমণ নতুন দম্পতিকে আরো কাছাকাছি নিয়ে এল। কিন্তু জিন্নাহর জন্ম তো কেবল প্রেমকুমারের ভূমিকা পালন নয়। বিয়ে, সংসার, নারী— এসবের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার পেশা, তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তার রাজনীতি।
জিন্নাহ সম্ভবত, চাইলেন রটিও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠুন। ১৯১৯-এর মে মাসে প্রথম সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসে মিসেস জিন্নাহ হিসেবে তিনি চমত্কার, আবেগময় ও জোরালো বক্তৃতা দিলেন। এটিই তার প্রথম ও একমাত্র গণবক্তৃতা। তিনি বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কর্ম, পশু অধিকার প্রতিষ্ঠা ও শিশুদের উন্নয়নে কাজ করতে থাকলেন।
রটি ও জিন্নাহর বিয়ের আগে সিভিল ম্যারেজের কথা হয়েছিল। জিন্নাহ অসম্মতও ছিলেন না। জিন্নাহ তখন ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের মুসলমান থেকে সদস্য। সিভিল ম্যারেজে তার মুসলমানত্ব ক্ষুণ্ন হতে পরে এবং সেক্ষেত্রে লেজিসলেটিভ কাউন্সিল থেকে তাকে পদত্যাগ করতে হবে। এ সংকট নিরসন করলেন রটি নিজেই। তিনিই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন।
মুসলমান আলেম-ওলামা ও রাজনৈতিক নেতারা যা-ই বলুন, ‘রটি-জিন্নাহ: দ্য স্টোরি টোল্ড অ্যান্ড আনটোল্ড’-এ খাজা রাজি হায়দার সম্পূর্ণই দেখিয়েছেন, জিন্নাহ তাকে সম্পূর্ণ ইসলামীমতেই বিয়ে করেছেন।
জিন্নাহ নববিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে নাগপুরে কংগ্রেসের সম্মেলনেও গেছেন। গভর্নমেন্ট হাউজের একটি ডিনারে তিনি সস্ত্রীক আমন্ত্রিত ছিলেন। রটি স্কার্ট পরে সে অনুষ্ঠানে আসেন। লেডি উইলিংডন গভর্নমেন্ট হাউজে ভারতীয় ধর্মান্তরিত মুসলমান নারীকে স্কার্টজাতীয় পোশাকে দেখে সম্ভবত বিব্রত বোধ করছিলেন। ডিনার টেবিলে তিনি গভর্নরের এডিসিকে বললেন, মিসেস জিন্নাহর হয়তো ঠাণ্ডা লাগতে পারে, তার পা ঢাকার জন্য কাপড় নিয়ে আসুন।
জিন্নাহ উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ঠাণ্ডা লাগলে মিসেস জিন্নাহ নিজেই বলতেন এবং কাপড় চাইতেন।
তারপর স্ত্রীকে নিয়ে ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। এ ঘটনার পর জিন্নাহ গভর্নমেন্ট হাউজের সব নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
১৯১৯-এর ১৪ ও ১৫ আগস্টের সন্দিক্ষণে জিন্নাহ ও রটির একমাত্র সন্তান দিনার জন্ম। দিনার বয়স যখন ঠিক ১৮ বছর, পাকিস্তান ও ভারত দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অদ্ভুদয় ঘটে।
রটি ও জিন্নাহর বিয়ের তৃতীয় বছর কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে জিন্নাহ পাবলিক লাইফ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। তিনি ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করেন। হোম রুশ লিগ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন। কংগ্রেস ছাড়ার সময় তিনি গান্ধীকে বলেন, আপনার পথ ভুল পথ, আমারটাই সঠিক, সাংবিধানিক পথই সঠিক।
কিন্তু জিন্নাহর ব্যস্ততা কমল না। তিনি আলাদা করে মুসলমানদের জন্য রাজনীতিতে নামলেন। তার নতুন নতুন মামলা, ঘন ঘন ব্রিটেনে যাওয়ার তাগিদ তাকে আরো ব্যস্ত করে তুলল। রটি বুঝতে পারলেন, জিন্নাহকে যতই ভালোবাসুন না কেন, আসলে তিনি ভিন্ন জগতের মানুষ।
জিন্নাহ নিজেও জানেন, তিনি নিজের গভীরে একজন নিঃসঙ্গ মানুষ।
রটি মেয়ে দিনাকে নিয়ে ইংল্যান্ডে এলেন। এসে তিনি এতটা অসুস্থ হয়ে পড়লেন যে, দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিতে হলো। দেওয়ান চমন লালের বর্ণনা:
আমি তখনই হাসপাতালের দিকে ছুটলাম। আমি রটির খুব গুণমুগ্ধ ছিলাম। তার সৌন্দর্য আর মায়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো কোনো নারী পৃথিবীতে ছিল না। এত চমত্কার মেয়ে, অবশ্য মা-বাবার আদরে একটু বখে যাওয়া; তাকে অন্তর দিয়ে বোঝার মতো কোনো অন্তর্গত ক্ষমতা জিন্নাহর ছিল না। তিনি হাসপাতালের বেডে শায়িত, জ্বর ১০৬ ডিগ্রি। তিনি নড়তেও পারছেন না, কিন্তু তার হাতে একটি বই। বইটি আমাকে দিয়ে বললেন, চাম পড়ে শোনান। এটি অস্কার ওয়াইল্ডের কবিতার বই।
কদিন পর জিন্নাহ আয়ারল্যান্ড থেকে ফিরে এলেন। তিনি যখন হাসপাতালে এলেন, আমি সেখানেই অপেক্ষা করছিলাম। তিনি রটির সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা ছিলেন। বেরিয়ে এসে আমাকে বললেন, আমার মনে হয়, বাঁচানো যাবে। সে সেড়ে উঠতে পারবে।
রটি সুস্থ হয়ে উঠছেন। আমি চলে গেলাম প্যারিস, তারপর কানাডা। আমার বিশ্বাস হয়েছে, দুজনের মধ্যে দূরত্ব ঘুচেছে এবং সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ পর আমি প্যারিস এলাম। জিন্নাহর সঙ্গে একটি দিন কাটালাম। ১০০ টি কেন মনে জাগল। সন্ধ্যার সময় জিজ্ঞেস করলাম, রটি কোথায়।
তিনি বললেন, আমাদের ঝগড়া হয়েছে, বোম্বে চলে গেছে।
তিনি এমনই দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন যে, আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেলাম না।
২০ ফেব্রুয়ারি ১৯২৯ ঠিক তার ২৯তম জন্মদিনে দীর্ঘদিন ধরে অন্ত্রের কোলাইসে যন্ত্রণায় ভোগা রটি জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করেন।
বোম্বের গোলাপ বোম্বেতেই সমাহিত হন। যন্ত্রমানবেরও হূদয় আছে। সম্পূর্ণ ইসলামী মতে কাফন পরিয়ে যখন রটিকে বোম্বের গোরস্তানে নামানো হলো, জিন্নাহ পাশেই ছিলেন একেবারে চুপচাপ। লাশ শুইয়ে চাটাইয়ে ঢেকে যখন তাকে মাটি ছিটিয়ে দিতে বলা হলো, তিনি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। ভালোবাসা ও অবহেলার অপরাধবোধ থেকে তিনি জনসমক্ষে কেঁদে ফেললেন। ১৯৪৭-এর আগস্টে যেদিন চিরকালের মতো ভারত ছাড়বেন, স্ত্রীর কবরে এসে একইভাবে তিনি কেঁদে উঠলেন।
জিন্নাহর ড্রাইভারের বিবরণ: বেগম জিন্নাহর মৃত্যুর ১২ বছরেরও বেশি সময় পর জিন্নাহ এক রাতে কাঠের ওয়্যারড্রোব থেকে প্রয়াত স্ত্রী ও তার কাছ থেকে সরে যাওয়া বিবাহিত কন্যার কাপড়চোপড় মেঝেতে কার্পেটের ওপর ছড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে চেয়ে চেয়ে দেখলেন। তখন তার চোখে অশ্রু।
জিন্নাহকে লেখা রটির শেষ পত্রটি একটি অসাধারণ প্রণয়ের উপাখ্যান। রটি জেনে গেছেন, তার মৃত্যু সময়ের ব্যাপার মাত্র। ‘আমি যদি তোমাকে আরেকটু ভালোবাসতাম, হয়তো তোমার সঙ্গেই থেকে যেতে পারতাম।’
রটি তার স্বামীকে সম্বোধন করতেন।






