ভরা সন্ধ্যায় কলিংবেল বাজল। মারজানা তখন রাঁধছে। গ্যাসের চুলায় ভাত চাপিয়ে তরকারি কুটছে। ভেজা হাত। আঁচলে হাত মুছে সে সিটকিনি খোলে। এই সময় কে আসে তার ভালো করে জানা আছে। ছোট্ট একটা ব্যাগ হাতে ঘরে ঢোকে আনসার। কপালে, মুখে ফুটে আছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। শার্টও ভেজা ভেজা। তীব্র গরম পড়ছে। আকাশ গুমোট হয়ে আছে। শ্রাবণের আকাশ। এই রোদ এই বৃষ্টি। বৃষ্টি নামলে আরামদায়ক শীতলতা। রোদ উঠলে অস্বস্তিকর গরম। মারজানা বলে, জামা ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে নাও। চা দিচ্ছি। চিনি শেষের দিকে। আনতে বলেছিলাম, এনেছ তো?

আনসার ওয়াশরুমে ঢুকতে ঢুকতে বলে, আনিনি।

তা আনবে কেন! মারজানা হনহন করে ঢুকে যায় রান্নাঘরে।

অল্পক্ষণ পরে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে আনসার। গামছায় হাত-মুখ মুছতে মুছতে কিচেনের দিকে যায়। সস্তা বাসার ছোট্ট কিচেন। একজনেই জায়গা জুড়ে নেয়। আনসার দরজার মুখে দাঁড়িয়ে পড়ে— মাস শেষ হতে আর তিনদিন আছে। এ ক’দিন চা খাওয়ার দরকার নেই। সামনের মাসে বেতন তুলে চিনি কিনে আনব।

মারজানা প্লাস্টিকের ঝাঁকার ভেতর তরকারি ধুচ্ছিল। ধুতে ধুতে বলে, আমার সমস্যা নেই। তুমি যদি চা ছাড়া থাকতে পারো, আলহামদুলিল্লাহ।

লাবিব পড়ছে তো?

হ্যাঁ, ওর রুমে আছে। এখানে বকবক না করে ওর পাশে গিয়ে একটু বসে অংকটংক দেখিয়ে দিলেও তো পারো।

আচ্ছা যাচ্ছি। তুমি দ্রুত রান্না শেষ করো। খিদে লেগে গেছে।

তুমি যাও আমি টোস্ট বিস্কুট পাঠাচ্ছি।

আনসার দুই পা হেঁটে হঠাত্ কিছু মনে পড়েছে ভঙ্গিতে ফিরে আসে। এই শোনো, মন্টুর জন্য একটা পাঞ্জাবি আনলাম। নতুন না, পুরনো দোকান থেকে।

         মারজানার ভ্রূ কুঁচকে যায়— মন্টুটা কে?

         মন্টুকে চেনো না! আমাদের বাসার সামনের যে স্মৃতি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, ওই দোকানে কাজ করে। রেগুলার ওই দোকান থেকেই দরকারি জিনিসগুলো কেনা হয়। সেখান থেকেই ভাব হয়ে গেছে।

         চিনি তো। নাম মন্টু এটা জানি না। তা মাসের শেষে চা খাওয়া চিনি কিনতে পারছ না আবার দোকানদার ছোকড়ার জন্য পাঞ্জাবি কিনছ, ঘটনা কী?

         ঘটনা কিছু না। সেদিন অফিসে যাচ্ছি, হঠাত্ সালাম দিয়ে কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। বললাম, কী খবর মন্টু, কিছু বলবা? ও বলল, না স্যার, কিছু কমু না। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম কিছু বলতে চায় ও। অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছিল তাই আর ঘাঁটিনি তখন। সন্ধ্যায় ফেরার সময়ও সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল সামনে। বললাম, কোনো সমস্যা মন্টু? ও আমতা আমতা করে জানাল— শুক্রবারে সবাই জুমার নামাজ পড়তে মসজিদে যায়, ওরও যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু মসজিদে যাবে কোনো পাঞ্জাবি নেই। বললাম, ঠিক আছে তোমারে একটা পাঞ্জাবি কিনে দেব। বুঝলে মারজানা, দিইনি এখনো, শুধু আশ্বাস দিয়েছি তাতেই এমন খুশি হলো, ইচ্ছা করল তখনই গিয়ে একটা কিনে আনি।

         তা কয় টাকা নিল?

         বেশি না, মাত্র একশ চল্লিশ।

         আড়াই কেজি চিনির দাম।

         তুমি শুধু চিনির কথা ভাবছ। ছেলেটার আনন্দের কথা একটুও ভাববে না!

         পাঞ্জাবি দিয়ে এসেছ আসার পথে?

         না, কাল দেব। তোমাকে দেখানোর জন্য আনলাম।

         আচ্ছা, তুমি লাবিবের ঘরে যাও, ওকে একটু পড়াও, আমি রান্না শেষ করে নিই। শোয়ার সময় পাঞ্জাবি দেখব।

 

আনসার বড় হয়েছে গ্রামে। পড়াশোনা করেছে গ্রামে। মত্স্য অফিসের চাকরিটা পাওয়ার পর থেকে সে কুষ্টিয়া শহরে বাস করছে। চাকরির দুই বছরের মাথায় বিয়ে করেছে। প্রথম প্রথম সে একাই থাকত। মারজানা থাকত গ্রামে, আনসারের মা-বাবার কাছে। লাবিব একটু বড় হলে ছেলের ভবিষ্যত্ চিন্তা করে পরিবারকে সে নিজের কাছে নিয়ে আসে। সেই থেকে সে পেয়ারাতলার এই বাসায় বসবাস করছে। দিনে দিনে বেলা অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। কেরানি থেকে আনসার এখন জুনিয়র অফিসার। বাসা থেকে অফিস বেশ দূর হয়ে যায়। কিন্তু বদল করা হয়নি। অনেক দিন থাকতে থাকতে মায়া পড়ে গেছে। এতদিনে বাসার মালিকানাও চেঞ্জ হয়েছে। বুড়ো বাড়িওয়ালা মারা গিয়ে বাসার মালিক হয়েছে তার ছেলে। আনসার চুপটি করে একটা প্রজন্মের হাত বদল দেখে ফেলেছে। এজন্য নিজেকে তার মাঝে মাঝে খুব বয়স্ক লাগে।

লাবিব জিলা স্কুলে নাইনে পড়ে। ছেলেটা মেধাবী। আনসার কিংবা মারজানা কারোরই পড়াশোনার রেকর্ড ভালো না। আজকাল তো রেজাল্ট ভালো না হলে তাকে মেধাবী বলা হয় না। সেই অর্থে আনসার কিংবা মারজানার পড়াশোনার জীবন উজ্জ্বল ছিল না। তবু তাদের ছেলেটা কোথায় পেল এই মেধা কে জানে।

শোয়ার আগে আনসার পাঞ্জাবিটা বের করে ব্যাগ থেকে— দ্যাখো তো, ঠকলাম কিনা। তুমি তো আবার এসব ভালো বোঝো। মারজানা কোলের ওপর মেলে নেয় পাঞ্জাবি। বুকের ওপর কাজ করা গাঢ় নীলের পাঞ্জাবি। সিল্কের। মারজানা নেড়েচেড়ে দেখে। কাপড় ভালো, ডিজাইন ভালো। শুধু রঙটা একটু বিবর্ণ। একশ চল্লিশ টাকায় আনসার ঠকেনি। ভাঁজ করে ব্যাগে রাখতে গিয়ে বোতামের দিকে চোখ যায় মারজানার। প্রথমে কেমন বেখাপ্পা ঠেকে। তারপর চমকে ওঠে। চোখের একেবারে সামনে নিয়ে বোতামগুলো পরখ করে। এরপর দ্রুত পাঞ্জাবির পেছন পাশ সামনে আনে উল্টে। পিঠের দিকে কাপড় একটু কুঁচকে আছে। মারজানা উত্তেজিত গলায় বলে, এটা তো লাবিবের পাঞ্জাবি! ওর ছোট মামা কিনে দিয়েছিল গত ঈদে।

যাহ! কী বলো এসব! আনসারের চোখে অবিশ্বাসের ছায়া।

ঠিকই বলছি।

কীভাবে বুঝলে?

         বোতামগুলো দেখো। সবগুলো নীল। একটা কালো। একটা বোতাম ছিঁড়ে হারিয়ে গেলে আমি এই কালো বোতামটা লাগিয়ে দিয়েছিলাম। নীল বোতাম তখন ছিল না ঘরে।

         এটা তো অন্যের বেলায়ও হতে পারে। তারাও তো নীল বোতাম হারিয়ে কালো বোতাম লাগাতে পারে।

         তাহলে এইটার কী বলবে? এই দেখো। একবার ইস্ত্রি করতে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছিলে পিঠের ওপরে। কাপড় কুঁচকে গেছিল। মনে আছে তোমার? লাবিব মন খারাপ করেছিল।

         হ্যাঁ, মনে আছে। কই দেখি! আনসার হাতে নেয় পাঞ্জাবি। কুঁচকে যাওয়া জায়গাটা চোখের কাছে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে। এটা পুরনো কাপড়ের দোকানে গেল কীভাবে?

         সেটা তো মনে নেই। লাবিব তো নিয়মিত পরত না এটা। অনেক দিন পর হঠাত্ খুঁজতে গিয়ে পাওয়া যাচ্ছিল না। নেই নেই, কোথাও নেই। তারপর আর খোঁজ নিইনি।

         বাবা-মায়ের উত্তেজিত গলা শুনে এ ঘরে আসে লাবিব। কৌতূহলী গলায় বলে, না ঘুমিয়ে কী করছ তোমরা?

         মারজানা পাঞ্জাবিটা লাবিবের দিকে বাড়িয়ে ধরে বলে, দ্যাখ, এটা তোর সেই পাঞ্জাবি না? তোর ছোট মামা দিয়েছিল।

         লাবিব নেড়েচেড়ে গন্ধ শুকে উত্তেজিত গলায় বলে, হ্যাঁ সেটাই তো! কিন্তু এতদিন কোথায় ছিল? পাঞ্জাবিটা আমার অনেক পছন্দের।

         সেটা তো আমরাও বুঝছি না। তোর বাবা এটা স্টেশনের পুরনো কাপড়ের দোকান থেকে কিনে এনেছে। বাসার সামনের দোকানে কাজ করে মন্টু না কী নাম তার জন্য।

          সেকেন্ড হ্যান্ডের দোকান! ওখানে যাবে কীভাবে!

          সেটাই তো কথা।

বাবা-মা আর ছেলে, তিনজন মিলে অনেক্ষণ চিন্তা করে পাঞ্জাবির রহস্য নিয়ে। কিন্তু কোনো সমাধানে পৌঁছতে পারে না। শেষে ক্লান্ত আর বিরক্ত হয়ে তারা ঘুমিয়ে পড়ে।

         সকালে চা খেতে খেতে পত্রিকা পড়া অভ্যাস আনসারের। অন্যদিন খুব ভোরেই ঘুম ভাঙে তার। আজ বেশ দেরি হয়ে যায়। শেষ রাতে কী এক দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেছিল। নতুন করে আবার পুরনো ঘুম ফিরে পেতে সময় লাগে। তার প্রভাবে ঘুমও ভাঙে দেরিতে। আনসার বিছানা থেকে চোখ ডলতে ডলতে কিচেনের দিকে গলা চড়ায়— চা কি হবে আজ?

কিচেনে মারজানার গলা শোনা যায়— চিনি যেটুকু আছে আজকের সকালটা চলতে পারে।

         আনসার টেবিল থেকে পেপার নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে। ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। বারন্দার গ্রিলের সঙ্গে ঝুলছে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির পানি। আনসারের মনে হয় পানি নয়, বৃষ্টির ফুল ফুটে আছে। গেটের মুখে পেঁপেগাছের ডাঁটিতে একটা দোয়েল বসে ভিজছে। শিস দিচ্ছে। বাসায় নিশ্চয় বাচ্চা আছে। বাচ্চার খাদ্যের জন্য ভোরবেলায় এই বৃষ্টির মধ্যে চলে এসেছে বাইরে। আনসারের নিজেকে পাখি পাখি লাগে। তাকেও একটু পর বৃষ্টি ঠেলে বেরোতে হবে বাইরে, খাদ্যের সন্ধানে, স্ত্রী আর সন্তানের জন্য।

         বৃষ্টির ছাঁট বাঁচিয়ে আনসার চেয়ারে বসে পড়ে পেপার হাতে। দেশের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে কয়েকটা জেলা। অনেক জায়গায় শহররক্ষা বাঁধ ধসে পড়ার উপক্রম। নিহতের সংখ্যা একশ পাঁচ।

         প্রথম পাতায় দিনাজপুরের একটা গ্রামের ছবি। কলার ভেলায় বসে মা ভাত রাঁধছে। হাঁড়ির দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে দুই সন্তান। পাশেই তাদের ঘর। শুধু চাল দেখা যাচ্ছে। বাকি অংশ পানিতে ডোবা। চালের ওপর একটা ছাগল।

         আনসার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শিশু দুটোকে দেখে। ছেলে না মেয়ে বোঝা যাচ্ছে না। ছেলেদের মতো ছোট করে ছাঁটা চুল। হয়তো ছেলেই হবে। ওদের বাবা কোথায়? নিরাপদ কোনো মাটির সন্ধানে গেছে নাকি!

         আরেকটা সংবাদে আনসারের চোখ আটকে যায়। শিওরে ওঠে। গাইবান্ধার এক মৃত মহিলাকে ভেলায় ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। মাটির অভাবে। আনসার মারজানাকে ডাকে। এই তো আসছি বলতে বলতে চা নিয়ে বারান্দায় আসে মারজানা।

         আনসার উত্তেজিত গলায় বলে, দেখছ খবর? এক মহিলার দাফন করার মাটি পাওয়া যায়নি। ভেলায় ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। গাইবান্ধায়।

         কই দেখি! মারজানা চায়ের কাপ স্বামীর হাতে দিয়ে পেপারটা তুলে নেয়।

         চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠতে থাকে। আনসার বলে, বন্যা তো একদিন দূর হবে। কিন্তু ওই মহিলার কবর? মহিলার স্বজনরা তো বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে তার কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে চাইবে। কোথায় দাঁড়াবে! আনসার কথা বলে প্রশ্ন করার ঢঙে। কিন্তু মারজানা জানে, এই প্রশ্ন মারজানাকে নয়, নিজের কাছে নিজে করছে আনসার। তাই সে চুপ করে থাকে। চা ঠাণ্ডা হয়।

আনসার আবার বলে, অফিসের মজিদ স্যার টাকা তুলছেন। উনি সাহায্যকারী টিমের সঙ্গে ত্রাণ নিয়ে দুর্গত এলাকায় যাবেন।

         তুমিও যাবা নাকি?

         এখনো ঠিক করিনি। দেখি। আনসার কতক্ষণ চুপ করে থাকে। তার চা ঠাণ্ডা বৃষ্টির পানি হয়ে যায়। বুঝলে মারজানা, পানির অপর নাম জীবন। আবার পানির অপর নাম মরণ। বেশি বেশি কোনোকিছুই ভালো না। বাতাস ছাড়া আমরা বাঁচি না। কিন্তু সেই বাতাস যদি লাগামহীন হয়ে ওঠে, আমাদের বাড়িঘর চুরমার করে দেয়। অদ্ভুত খেলা।

         চা খাও। ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। মারজানা স্বামীর চুলে আঙুল ঢোকায়।

         তুমি এখানো দাঁড়িয়ে আছ। তোমার রান্না?

         আজ খিচুড়ি হবে। চুলায় বসিয়ে দিয়ে এসেছি।

         বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি জমবে ভালো। কিন্তু এই বৃষ্টির কারণেই বন্যা হচ্ছে। কারোর সুখ। কারোর শোক।

         অফিসে যাওয়ার সময় মন্টুর জন্য পাঞ্জাবি নিয়ে যাবে?

         না। আজ বৃহস্পতিবার। তিনটার দিকে চলে আসব। বিকালে দেব। ততক্ষণ তুমি ভাবো পাঞ্জাবিটা কীভাবে ওই দোকানে গেল।

         ন’টা বাজতে বাজতে খাওয়া-গোসল সেরে আনসার বেরিয়ে গেল অফিস পথে। সঙ্গে গেল লাবিবও। ছেলেকে স্কুলে নামিয়ে দেবে আনসার। এদিকে বাসায় একা হয়ে গেল মারজানা। থালাবাসন মেজে, ঘর গুছিয়ে সে প্যাকেট থেকে পাঞ্জাবিটা বের করল। দিনের আলোয় নতুন করে আবার দেখতে লাগল। এটা যে লাবিবের সেই পাঞ্জাবি, কোনো সন্দেহ নেই। ভাবতে ভাবতে ঘুম নামল মারজানার চোখে। একা বাসায় পাঞ্জাবিটা কোলের ওপর রেখেই সে ঘুমিয়ে পড়ল।

         তিনটার আগেই ফিরে এলো আনসার। লাবিবের ফিরতে আরো দেরি হবে। স্কুল শেষে প্রাইভেট পড়ে একবারে ফিরবে।

খাওয়া-দাওয়া করে বিছানায় গা এলিয়ে দিল আনসার। পাশে বসে সংসারের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে লাগল মারজানা। বাইরের গলিতে মাইক বাজছে। মহল্লার তরুণ ছেলেরা বাসায় বাসায় গিয়ে বন্যার্তদের জন্য টাকা, পুরনো কাপড় কালেকশন করে বেড়াচ্ছে। তারই মাইকিং। মারজানার গত বছরের কথা মনে পড়ে যায় হঠাত্। গত বছরের বন্যায়ও ছেলেরা এমন করে টাকা-পয়সা কাপড়চোপড় তুলেছিল বন্যার্তদের জন্য। মারজানা তাদের ব্যবহূত বেশকিছু কাপড় ছেলেদের হাতে দিয়েছিল। ওই সময় কি তাহলে লাবিবের পাঞ্জাবিটাও সঙ্গে চলে গিয়েছিল! মারজানা তার অনুমানের কথাটা আনসারকে জানায়। আনসার শোয়া থেকে উঠে বসে উত্তেজনায়। এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে বলে, এইবার বুঝছি।

কী বুঝছ?

তুমি ওদের হাতে কাপড় তুলে দিয়েছিলে। ওরা সেগুলো নিয়ে গিয়ে বেচে দিয়েছিল পুরনো দোকানে। কী সাংঘাতিক!

যাহ! তাই কি হয়!

         তাছাড়া তো কোনো সমাধান পাচ্ছি না।

         আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। মানুষ এত নিচে নামতে পারে!

         মানুষ সবই পারে। কেন, পেপারে পড়োনি, বন্যার্তদের জন্য বরাদ্দ করা চালের প্রায় অর্ধেক গায়েব হয়ে গেছে গুদাম থেকে। কারা গায়েব করেছে! মানুষই তো।

বলতে বলতে কলিংবেল বেজে ওঠে। লাবিব কি ফিরল! মারজানা দরজা খোলে। লাবিব নয়, দরজায় দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ-সাতটা তরুণ ছেলে। গায়ে একই রকম গেঞ্জি। মাথায় একই রকম ক্যাপ। মারজানা ভড়কে গিয়ে সরে আসে দরজা থেকে। স্বামীকে ডাকে। আনসারকে ওরা জানায়— ওরা সবুজ সংঘের সদস্য। বন্যার্তদের জন্য চাঁদা তুলতে এসেছে।

            আনসার বলে, তোমরা দাঁড়াও, আমি দেখছি। সে ঘুরতেই দেখে মারজানা দরজার দিকে আসছে। তার হাতে ভাঁজ করা লাবিবের নীল পাঞ্জাবি।