১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তানিদের শোষণের চালচিত্র প্রতিভাত হয় পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে।১ বাংলাদেশ তথা পূর্ববঙ্গ যে পাকিস্তানের একটি কলোনি তা ক্রমেই স্পষ্ট হতে শুরু করে। বাঙালির হাজার বছরের ভাষা-সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য নষ্টের মধ্য দিয়ে তাদের ঔপনিবেশিক রূপ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলনের (১৯৪৮-৫২) মধ্য দিয়ে বাঙালি যেমন তার ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে, তেমনি তার শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠায় প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলনে শুধু ভাষার প্রশ্নই জড়িত ছিল না, এর সঙ্গে ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের বৈরী আবহাওয়ায় প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপকভাবে অনুভূত হয় বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার্থে। ‘জনসাধারণের চিন্তাধারা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, পছন্দ-অপছন্দ, রুচি ও প্রজ্ঞার পরিবর্তনের জন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনের চেয়ে উত্তম বিকল্প নেই। জনচেতনাকে রাজনীতি বিষয়ে সচেতন ও সমাজ সচেতন করে তোলাই সামগ্রিকভাবে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কাজ।’২ সমাজের সচেতন মানুষ হিসেবে পূর্ব বাংলার শিল্পীসমাজ সক্রিয়ভাবে নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে এবং রঙ-রেখায় সৃষ্টি করে প্রতিবাদী চিত্রকর্ম, যা জনমানসকে সচেতন করে, প্রতিবাদী করে তোলে, সংগ্রামে প্রেরণা জোগায়। সর্বোপরি, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংঘটনে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপনা জাগাতে চারুশিল্পীদের সৃষ্ট শিল্পকর্ম সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

শিল্পীরা এসব বিষয় এঁকেছেন বিক্ষুব্ধ শিল্পমানস থেকে এবং মিটিয়েছেন শিল্পের দায়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক পোস্টার চিত্র অঙ্কন করেন চারুশিল্পীরা। সেসব পোস্টার মুক্তিযুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরার পাশাপাশি জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পোস্টার আঁকা, প্রকাশ ও প্রচারের কাজটি করে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও প্রচার দপ্তর। প্রচার বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন শিল্পী কামরুল হাসান। সহযোগী হিসেবে ছিলেন শিল্পী নিতুন কুন্ডু, দেবদাস চক্রবর্তী, নাসির বিশ্বাস, প্রাণেশ কুমার মণ্ডল, বীরেন সোমসহ আরো অনেক শিল্পী। সবাই মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে পোস্টার আঁকেন।৩

বীরেন সোমের আঁকা৪ একটি পোস্টারের সব অংশজুড়ে আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তর্জনি উঁচিয়ে বাঙালির উদ্দেশে তিনি বলছেন, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম...রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো...ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।’ ১৯৭১-এর ৭ মার্চ এমন গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার এ ভাষণ মুক্তিকামী বাঙালিকে আন্দোলিত করে, সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে, সাহস জোগায়। সে কারণেই ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এ পোস্টার চিত্রের মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। ইতিহাসের সাক্ষী এ পোস্টার চিত্র। (চিত্র: ১)। বীরেন সোমের আঁকা অন্য একটি পোস্টারেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ পোস্টারে লেখা রয়েছে ‘স্বাধীনতা না হয় মৃত্যু’। বাঙালিদের মরণপণ লড়াইয়ের উদ্দেশ্যেই এ পোস্টার চিত্রের অবতারণা। (চিত্র: ২)

পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার পরিচয় পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধকালীন পোস্টার চিত্রে। কামরুল হাসান আঁকলেন এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে শীর্ষক ইয়াহিয়া খানের ব্যঙ্গাত্মক ছবি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ইয়াহিয়ার নির্দেশে পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’৫ নামে যে নিষ্ঠুর গণহত্যা চালায়, এতে তার ঘৃণিত, কুিসত মানসিকতার প্রকাশ ঘটে। লাল ও কালো দুই রঙে আঁকা এ চিত্র দ্বারা শুধু ইয়াহিয়া নয়, সব পাকিস্তানি শাসক চক্রের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণার উদ্রেক সৃষ্টি করে। এ পোস্টারে শিল্পী আঁকলেন নরপশুরূপী ইয়াহিয়া খানের মুখাবয়ব। রক্তচোষা মুখমণ্ডল, হাঁ করা মুখে দুই দিকে দুটি দানবীয় দাঁত, বড় দুটি রক্ত লাল চোখ, খাড়া দুটি বড় কান, দেখলেই মনে হয় রক্তপায়ী এক ভয়ংকর দানব সদ্য কোনো নিরীহ বাঙালির রক্ত পান করেছে এবং রক্তলোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পাকিস্তানের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভয়ংকরতাকে বোঝানো হয়েছে এ চিত্রের মধ্য দিয়ে। বাঙালিদের মনে ইয়াহিয়ার যে কুিসত কদাকার রূপ, পোস্টারটিতে সে রূপেরই যেন প্রতিফলন ঘটেছে। কামরুল হাসানের এ পোস্টার যেন বুলেট, বোমার চেয়েও শতগুণ শক্তিশালী। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের আর্ট ও ডিজাইন সেন্টারের শিল্পী বীরেন সোম এ পোস্টার অঙ্কনের প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণ করেন এভাবে—


শিল্পী কামরুল ভাই আমাদের সবাইকে নিয়ে আলোচনায় বসলেন। তিনি বললেন, ‘সারা দেশ এখন মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। আমরা শিল্পীসমাজ এ যুদ্ধ থেকে বিচ্ছিন্ন নই। আমাদের রঙ-তুলিই এখন আমাদের হাতিয়ার। মুক্তিযোদ্ধাদের মনে দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধের উৎসাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করাই এখন আমাদের কর্তব্য। মনোগ্রাম, পোস্টার, কার্টুন, লিফলেট, ব্যানার, নকশা ইত্যাদির মাধ্যমে দেশে ও বহির্বিশ্বে জনমত সৃষ্টি করাই এখন আমাদের কাজ।’ কামরুল হাসানের নির্দেশ মোতাবেক আমরা কাজ শুরু করলাম। কামরুল ভাইও কিছু খসড়া তৈরি করতে লাগলেন। একদিন সবাইকে ডেকে তিনি কিছু ছোট ছোট ড্রইং দেখালেন। তার ভেতর তিন থেকে চারটি ড্রইং ইয়াহিয়ার মুখমণ্ডলের আদলে তৈরি। দেখে মনে হলো, হিংস্র দানবরূপী ইয়াহিয়া খানের একটি মুখাবয়ব। আমরা সবাই কার্টুনটিকে পোস্টার করার জন্য বললাম।...সেখান থেকে দুটি ড্রইং নিয়ে আরো দু-তিনবার এঁকে তিনি পোস্টারটি তৈরি করেন, রঙ-তুলির মাধ্যমে আরো বোল্ড ব্রাশিং করে লাইনের মাধ্যমে দানবমূর্তির রক্তচোষা অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুললেন। কয়েকবার পরিবর্তন-পরিবর্ধনের পর এটি হয়ে ওঠে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের পোস্টার। গণহত্যাকারী, ধর্ষক ও লুণ্ঠক চরিত্রের পাকিস্তানিদের প্রতিভূরূপে ইয়াহিয়ার এ দানবচিত্র সহজেই একটি প্রতীকী অবয়ব অর্জন করেছিল। পোস্টারটির আঁকা শেষ হওয়ার পর এর শিরোনাম কী হবে, তা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা হলো। আমাদের কথাবার্তা থেকে একটি শব্দ বের হয়ে এল, ‘জানোয়ার’। কামরুল ভাই বললেন ‘পেয়ে গেছি’। পোস্টারটির নাম হবে ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’।...পোস্টারটি হয়ে উঠল পৃথিবীর ইতিহাসে নিষ্ঠুরতম গণহত্যার প্রতিবাদে অঙ্কিত এক অনন্য শিল্পকর্ম।৬

১৯৭১ সালে কামরুল হাসানের পোস্টারটি যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের আলোড়িত করেছে, তেমনি স্বাধীনতার এত বছর পরও পাকিস্তানি ঘাতকদের চেহারা তুলে ধরতে ব্যবহূত হয় এ পোস্টার। (চিত্র: ৩)। কামরুল হাসানের অন্য পোস্টার দ্বারা মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। (চিত্র: ৪)।

নিতুন কুন্ডু আঁকেন সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী শীর্ষক পোস্টার চিত্র। (চিত্র: ৫)। সাদা-কালো, কমলা রঙ ও রেখার মাধ্যমে শিল্পী উপস্থাপন করেছেন এক মুক্তিযোদ্ধাকে। অদম্য সাহস, দৃঢ়প্রত্যয় আর সীমাহীন দেশপ্রেমের সমন্বয় ঘটেছে এ মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে। শত্রুর মোকাবেলায় সদা প্রস্তুত বাংলার একেকজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাঙালির যুদ্ধ করার মতো যথাযথ প্রস্তুতি ছিল না, ফলে যুদ্ধের প্রথম দিকে পাকিস্তানি সৈন্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও মে মাসের পর থেকে মুক্তিবাহিনী কিছুটা পশ্চাদপসরণ করে। এ সময় হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী নিরীহ বাঙালিদের ওপর অমানবিক অত্যাচার চালায়। অবরুদ্ধ বাংলায় এমন আতঙ্কের সৃষ্টি হয় যে মুক্তিবাহিনী বোধহয় হানাদার বাহিনীর কাছে পরাজিত হতে চলেছে। ঠিক এমন সময় পোস্টারটি বাঙালির মনে নতুন আশা জাগায়৭ এবং শান্তি পায় এই মনে করে যে মুক্তিবাহিনী তাদের সঙ্গে আছে ছায়ার মতো। শত্রুকে প্রতিহত করে বাঙালিকে মুক্ত করতে সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী। যারা অকুতোভয় বীর। পোস্টারটিতে সাদা রঙ দ্বারা শান্তি এবং কালো ও কমলা দ্বারা অমানিশা ও ভোরের সূর্য বোঝানো হয়েছে। দুঃখের অমানিশায় শান্তির বাণী নিয়ে ভোরের সূর্যের মতো জাগ্রত মুক্তিবাহিনী।

শিল্পী প্রাণেশ কুমার মণ্ডলের আঁকা এ ধরনের একটি পোস্টার চিত্র বাংলার মায়েরা মেয়েরা সকলেই মুক্তিযোদ্ধা। এ চিত্রে দৃঢ় হাতে ধরে রাখা আগ্নেয়াস্ত্র আর নারীর মুখাবয়বে যেন প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের প্রচণ্ড স্পৃহা ফুটে উঠেছে। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী কর্তৃক নারী নির্যাতনের প্রতিশোধ নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বাংলার নারী মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযুদ্ধে লাখ লাখ পুরুষ যোদ্ধার সঙ্গী হয়ে নারী মুক্তিযোদ্ধারা যে যুদ্ধ করেছে সে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং বাংলার সব নারীকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে পোস্টারটি প্রকাশ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছে খাবার দিয়ে, আশ্রয় দিয়ে, সেবা দিয়ে আবার কখনো জীবন বাজি রেখে রক্ষা করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনীয়তা। পোস্টারটিতে সাদা রঙে লেখা হয়েছে ‘বাংলার মায়েরা মেয়েরা’। শান্তিপ্রিয় বাংলার নারীদের স্নিগ্ধ মায়াময়ীরূপ বোঝাতে সাদা রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। লাল রঙে লেখা হয়েছে ‘সকলেই মুক্তিযোদ্ধা’। লাল রঙ এখানে সংগ্রামের প্রতিভূ হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। যুদ্ধে একজন নারী হারিয়েছে তার পিতা, স্বামী, পুত্র, কন্যা। শোকাহত নারী তাই প্রতিশোধের নেশায় দৃঢ়চেতা মুক্তিযোদ্ধার ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই চিত্রে। (চিত্র: ৬)।


দেবদাস চক্রবর্তী আঁকেন বাংলার হিন্দু, বাংলার খৃষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান আমরা সবাই বাঙালী শীর্ষক পোস্টার। সাদা-কালো ও কমলা রঙে আঁকা এ পোস্টার চিত্রে শিল্পী বাংলার হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপাসনালয় মন্দির, মসজিদ, প্যাগোডা, গির্জা পাশাপাশি উপস্থাপন করে বাঙালি জাতির হাজার বছরের ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক, পরমতসহিষ্ণু, মানবতাবাদী ও সমন্বয়ধর্মী ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি শাসকচক্র এবং তাদের এদেশীয় দোসররা অপপ্রচার চালায় যে মুক্তিযুদ্ধ হলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের যুদ্ধ এবং হিন্দুরা মূলত ভারতীয়। এ অপপ্রচারে বাঙালি জাতি যেন বিভ্রান্ত হয়ে না পড়ে এবং হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, মুসলমান সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ এক জাতি বাঙালি এ চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ পোস্টার চিত্রের অবতারণা।৮ বাংলাদেশ রাষ্ট্র কোনো ধর্মের পৃষ্ঠপোষক না হয়ে সব ধর্মের সমমর্যাদা প্রদান করবে—এ অঙ্গীকারেরও প্রতিফলন ঘটেছে এ পোস্টারের মাধ্যমে। এ পোস্টারে কালো রঙে আঁকা ধর্মীয় উপাসনালয়ের পেছনে কমলা রঙ এবং ওপরের সাদা রঙের উপস্থিতিতে ভোরের আবহ ফুটে উঠেছে, এ ভোর নতুন দিনের, এ ভোর বাঙালির মুক্তির ভোর। পোস্টার চিত্রটি মুক্তিযুদ্ধের সময় এক দেশ, এক জাতি এ একতার ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। (চিত্র: ৭)।

লাল ও সবুজ রঙে বাংলা বর্ণমালায় সাজানো হয়েছে একটি পোস্টার। এ পোস্টারে লেখা হয়েছে এক একটি বাংলা অক্ষর অ আ ক খ এক একটি বাঙালীর জীবন। এ অক্ষরগুলো দিয়ে যেন বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বাঙালির প্রাণস্বরূপ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চেতনায় জাতিকে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে পোস্টারটির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ১৯৬৯-এর একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে নতুন অভিজ্ঞান সংযুক্ত হয় নাগরিকদের পোশাকে। তাতে বড় করে ছাপা একটি বাংলা বর্ণ, আর তার ওপরে নিচে লেখা: ‘একটি বাংলা অক্ষর—একটি বাঙালির জীবন।’৯ বাঙালি যেমন ১৯৫২ সালে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সফল হয়, তেমনি ১৯৭১ সালেও বাঙালির বিজয় অবশ্যম্ভাবী। এ পোস্টারের পরিকল্পনা ও নকশা করেন শিল্পী কামরুল হাসান।১০ কামরুল হাসান ও নাসির বিশ্বাস উভয়ে মিলে পোস্টারটি অঙ্কন করেন বলে জানা যায়।১১ (চিত্র: ৮)।

এ রকম অনেক পোস্টার মুক্তিযুদ্ধের সময় আঁকা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সারা দেশে এসব পোস্টার ছড়িয়ে দেয়া হয়। কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে, কখনো বা বাসের গায়ে লেপটে থাকে এসব পোস্টার। বর্তমান সময়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নিয়মিত ছাপছে মুক্তিযুদ্ধের এসব পোস্টার। এর কারণ ব্যাখ্যা করে জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী বলেন—

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্মারক এসব পোস্টার। এসবে পাকিস্তানিদের খুনি চেহারাটা এত স্পষ্ট যে বলে বা লেখে তা প্রকাশ করা কঠিন। তাই একাত্তরের সেই পোস্টার এখনো আমরা ছাপি। আগামী প্রজন্মের কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর চেহারা তুলে ধরতে এর চেয়ে ভালো পোস্টার হয় না...১২

শিল্পীদের আঁকা এসব পোস্টার মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের আবেগতাড়িত করেছে, প্রতিরোধ চেতনায় উদ্দীপ্ত করেছে। এ পোস্টার চিত্রগুলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্মারক, অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল।

 

নোট

১.   আতিউর রহমান ও লেলিন আজাদ, ভাষা আন্দোলন: অর্থনৈতিক পটভূমি (ঢাকা: ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০০০), পৃ. ১১২-১৩৩।

২.   ড. বিশ্বজিৎ ব্যানার্জী, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম: সাংস্কৃতিক ধারা (ঢাকা : অনুপম প্রকাশনী, ২০১৩), পৃ. ১৩।

৩.  বীরেন সোম, ‘মুক্তিযুদ্ধে শিল্পীসমাজ’, দৈনিক প্রথম আলো, ১৬ ডিসেম্বর, ২০০৯।

৪.   ঐ, ‘‘ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা’, মতলুব আলী (সম্পা.), বীরেন সোম (ঢাকা: চন্দ্রাবতী একাডেমি, ২০০৯), পৃ. ১০২।

৫.  Siddiq Salik, Witness to Surrender (Dhaka: The University Press Limited, 1997), pp. 71-78.

৬.  বীরেন সোম, ‘কামরুল হাসানের পোস্টার’,  দৈনিক প্রথম আলো, ২৬ মার্চ, ২০১২।

৭.   সিদ্দিকুর রহমান স্বপন, বাংলাদেশের গণ-আন্দোলন স্লোগান প্ল্যাকার্ড ও পোস্টার (ঢাকা: সুবর্ণ, ২০০৮), পৃ. ১০৯।

৮.  তদেব, পৃ. ৯৮।

৯.   আনিসুজ্জামান, স্বরূপের সন্ধানে (ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯১), পৃ. ৮২।

১০.          জাহানারা ইমাম, একাত্তরের দিনগুলি (ঢাকা: সন্ধানী প্রকাশনী, ২০০৫), পৃ. ৩২।

১১. বীরেন সোম, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে শিল্পী সমাজ সুবলকুমার বণিক (সম্পা.), (ঢাকা: চন্দ্রাবতী একাডেমি, ২০১৫), পৃ. ৩৯।

১২.          মোরসালিন মিজান, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দলিল, জনমতের স্মারক’, দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১২।

 

ড. বনি আদম: সহযোগী অধ্যাপক, চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়