একাত্তরের ক্রিপ্টোগ্রাফি
যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ১৩ ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনী ঢাকার বাইরে; যথাসময়ে প্যারাট্রুপার অবতরণ করেছে। ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের জেনারেল জ্যাকব লিখছেন: ১৩ ডিসেম্বর ঢাকার বাইরে আমাদের তিন হাজার সৈন্য। ততক্ষণে মালাক্কা প্রণালি দিয়ে আমেরিকান নৌবহর এগিয়ে আসছে। ইসলামাবাদ থেকে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে যে সামরিক সিগনাল পাঠানো হয়, আমরা তা ইন্টারসেপ্ট করি। পাকিস্তানি বার্তাটি বেশ সহজ-সরল ‘যুদ্ধ চালিয়ে যাও। তোমরা উত্তর দিক থেকে হলুদের সাহায্য পাবে এবং দক্ষিণ দিক থেকে সাদার।’ সিগনালে পাঠানো এ বার্তা নিয়াজি বিশ্বাস করলেন।
এই বার্তা ডিকোড করতে এতটুকু অসুবিধে হয়নি। হলুদ হচ্ছে চীন এবং সাদা হচ্ছে আমেরিকা। সপ্তম নৌবহর পাকিস্তানের পক্ষে লড়ে একদিনেই পরিস্থিতি পাল্টে দেবে, এমন গুজব ছিল। পাকিস্তানের সাদা ও হলুদ সহযোগী উভয়ই প্রতারণা করেছে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ঢাকার রেসকোর্সে সমাহিত হয়েছে পাকিস্তানি বাহিনীর অহংকার ও গৌরব; সাদা ও হলুদের তোয়াক্কা না করে আবির্ভূত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ।
ক্রিপ্টোগ্রাফি—গুপ্ত লিখন বা সাংকেতিক লিখনের ইতিহাস প্রায় তিন হাজার বছরের
প্রাচীন গ্রিক ক্রিপ্টোস মানে গুপ্ত, লুকানো এবং গ্রাফিয়েন মানে লিখন।
এটি একটি ত্রিপক্ষীয় লিখন কৌশল। প্রথম পক্ষ যে দুর্বোধ্য ভাষায় বার্তা দেবে, দ্বিতীয় পক্ষ তা ডিকোড করে প্রকৃত বার্তাটি পেতে সমর্থ হবে আর তৃতীয় পক্ষ হচ্ছে উভয়ের জন্যই শত্রুপক্ষ—তারা বরাবরই চেষ্টা করবে এই বার্তা মাঝপথে আটকে এর রহস্য ভেদ করতে এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে।
জুলিয়াস সিজারের নামে প্রচলিত সিজার টেক্সট বা সিজার শিফটের ডিকোডিং করতে লেগেছে ৮০০ বছর।
মূলত সামরিক উদ্দেশ্যে ক্রিপ্টোগ্রাফির জন্ম ও বিকাশ হলেও একালে এর ব্যবহার সর্বত্র। তৃতীয় পক্ষ যে কেবল রণাঙ্গনের শত্রু, শুধু তাই নয়, শত্রু চারপাশে। বাংলাদেশ ব্যাংকে ব্যবহূত ক্রিপ্টোগ্রাফিক কোড হাতে পেয়েছিল কিংবা ভাঙতে পেরেছিল বলেই প্রায় হাজার কোটি টাকা বের করে নিতে পেরেছে হ্যাকাররা।
কর্মজীবনে বর্তমান নিবন্ধকারকেও একটি সংক্ষিপ্ত সাইফার ডিকোড করার প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। এটি ছিল মূলত বর্ণমালাভিত্তিক; আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে সবসুদ্ধ তিন-চারটে সরকারি বার্তা আমি ডিকোড করেছি, যেগুলো আমার কাছে অদ্ভুত; তখন আদৌ তেমন গোপনীয় ধরনের বলে মনে হয়নি।
গ্রামবাংলায় সদ্য প্রেমে পড়া তরুণীদেরও আমি তাদের স্ব-উদ্ভাবিত ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহার করতে দেখেছি। যেমন একটি মেয়ে লিখেছে:
চিয়াচিমি চিরচিম চিজা চিনচিকে চিভাচিল চিবাচিসি
অথবা
আশিমিশি রশিমশিজাশিনশিকেশি ভাশিলশিবাশিসিশি
প্রথম বাক্যে চি এবং দ্বিতীয় বাক্যে শি উঠিয়ে দিলেই একই কথা বেরিয়ে আসে: আমি রমজানকে ভালোবাসি।
ক্রিপ্টোগ্রাফি শব্দটির প্রথম ব্যবহার ১৮৪৩ সালে প্রকাশিত এগার অ্যালান পো’র গল্প দ্য গোল্ড-বাগ’-এ। দক্ষিণ ক্যারোলাইনার সুলিভান দ্বীপে সোনালি রঙের পোকার কামড় খাওয়া উইলিয়াম লেগ্র্যান্ড নামের একটি চরিত্র এবং একটি ক্রিপ্টোগ্রামকে ঘিরে গল্পটি বিকশিত হয়।
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির লেখা কি ক্রিপ্টোগ্রাফিক?
রেনেসাঁ মানব দ্য ভিঞ্চি উল্টোদিক থেকে লিখতেন। সামনে আয়না ধরলে তিনি কী লিখেছেন পড়া যেত। কিন্তু তাত্ক্ষণিকভাবে এ সমাধানটি তারই জানা ছিল। মনে করা হয় তিনি চাননি তার গোপন গবেষণা ও আবিষ্কার তখনই মানুষ জানুক। অনেক বিষয় তিনি আমৃত্যু গোপনই রেখেছেন। তার নোট বই প্রকাশিত হওয়ার পর তার অনেক উদ্ভাবনের কাহিনী জানা সম্ভব হয়েছে।
লিওনার্দোর লেখা ‘মিরর রাইটিং’ পরবর্তী সময়ে অটোমান রাজত্বে ক্যালিগ্রাফিতেও ব্যবহার করা হয়। কেউ তা নিছক মিরর রাইটিং বলে মানতে রাজি নন, তারা এটাকে দ্য ভিঞ্চি উদ্ভাবিত ক্রিপ্টোগ্রাফিই বলে মনে করেন। এমনকি তারা তার আঁকা মোনালিসাকেও মনে করেন ক্রিপ্টোগ্রাফিক পেইন্টিং। মোনালিসা আদৌ কোনো নারীর ছবি নয়। সিক্রেট কোড ভেঙে ভালোভাবে তাকালে বোঝা যাবে এটি আসলে একজন হিজড়ার ছবি। লিওনার্দোর ক্রিপটিক লেখাই ড্যান ব্রাউনের দ্য ভিঞ্চি কোড-এর প্রেরণা। এ কালের ক্রিপ্টোগ্রাফাররা যে কোড কখনো ভাঙতে পারেননি, তা নিয়ে ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’।
আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফি গণিত, কম্পিউটার বিজ্ঞান, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, কমিউনিকেশন সায়েন্স এবং পদার্থবিজ্ঞানের দক্ষ ও স্মার্ট ব্যবহারে সৃষ্ট। তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, ডাটার অখণ্ডতা, সত্যায়ন এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় উদ্ভাবিত মোটর সাইফার মেশিন থেকে আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফির যাত্রা বিবেচনা করা যায়।
অ্যাডমিরালটি’স রুম নম্বর ৪০
প্রথম মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ নৌ দপ্তরের ৪০ নম্বর রুমটি ছিল জার্মান আক্রমণের রহস্য উদ্ঘাটনের কেন্দ্র। জার্মান নৌবাহিনীর কোডনির্ভর বার্তাগুলো ব্রিটিশ গোয়েন্দারা মাঝপথে উদ্ধার করে ৪০ নম্বর কক্ষে নিয়ে আসত এবং এখানে তা ডিকোড করে দেয়া হতো। জার্মান কোড ভেঙে প্রাপ্ত বার্তা ব্রিটেনকে নর্থ সি, ডোগার ব্যাংক ও জাটল্যান্ড যুদ্ধে বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থায় রেখেছে।





