৩০ আগস্ট ১৬৫৭। মোগল সম্রাট শাহজাহান উত্তরাধিকারীর নাম ঘোষণা করবেন। সম্পত্তির উত্তরাধিকারী নয়; সিংহাসনের—ময়ূর সিংহাসনের, ভারত শাসনের।

পৃথিবীর অনেক দেশেই সিংহাসনের জন্য উত্তরাধিকারী নির্বাচনের ভিত্তি তখন প্রিমোজেনিচার—সম্রাটের ঔরসে জন্মলব্ধ প্রথম পুত্রসন্তানই পিতার পর সিংহাসনে বসবে—এই পদ্ধতিই বিদ্যমান। কিন্তু মোগল উত্তরাধিকারী নির্বাচনের জন্য জোর দেয়া হতো সন্তানদের মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার ওপর; সামরিক সাফল্য বিশেষভাবে বিবেচনা করা হতো।

শাহজাহান তার প্রিয় ও জ্যেষ্ঠ পুত্র দারা শুকোকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করলেন। দারা ছাড়া তার অন্য তিন ভাই—শাহ সুজা, মুরাদ বকশ এবং আওরঙ্গজেব বাবার এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেন না, তারা প্রত্যেকেই নিজেকে সিংহাসনের উপযুক্ত দাবিদার মনে করলেন। ৬ সেপ্টেম্বর ১৬৫৭, শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং দারা শুকোর হেফাজতে ও কন্যা জাহানারার সেবায় তখনকার নবনির্মিত শহর শাহজাহানাবাদে (এখনকার পুরনো দিল্লি) অবস্থান করতে থাকলেন। অল্পদিনের মধ্যেই সম্রাটের শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব রটতে থাকল এবং একসময় এমনও কথা মুখে মুখে ঘুরতে থাকল যে সম্রাট আর বেঁচে নেই।

সম্রাটের অন্য তিন ছেলে দিল্লি থেকে দূরে। শাহ সুজা তখন বাংলা-বিহার-ওড়িশার গভর্নর, মুরাদ সুলতানে, আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যে। গুজব রটে যায় অথবা সিংহাসনপ্রত্যাশী ভাইরা মনে করেন সম্রাটের মৃত্যু হয়েছে, নিজের ক্ষমতা সংহত করার জন্য দারা শুকো সংবাদটি প্রকাশ করছেন না। প্রত্যেকেই যার যার মতো করে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করলেন। ১৬৫৭’র নভেম্বরে শাহ সুজা বাংলায় থেকে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করলেন, মুরাদ নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করলেন গুজরাট থেকে আর আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্য থেকে। তখনকার দাক্ষিণাত্য এখনকার আটটি রাজ্যের ওপর প্রসারিত—তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক, কেরালা ও তামিলনাড়ু।

সম্রাট শাহজাহান কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর আগ্রায় ফিলে এলেন। দারা শুকো বিদ্রোহীদের দমন করতে সম্রাটকে চাপ দিলেন। দারার পুত্র সোলায়মান শুকোর নেতৃত্বাধীন একটি বাহিনী শাহ সুজার বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৬৫৮ বাহাদুরপুর যুদ্ধে শাহ সুজা পরাস্ত হলে দারা শুকো একটি সুবিধাজনক অবস্থানে নিজেকে দেখতে পান। তার পরের অভিযান মুরাদ বকশের বিরুদ্ধে। তার বাহিনী কাছাকাছি পৌঁছার পর জানতে পারে মুরাদ বকশ এবং আওরঙ্গজেবের মধ্যে আঁতাত সৃষ্টি হয়েছে; তারা সম্মিলিতভাবে দারা শুকোর বাহিনীর মোকাবেলা করবে। দুই ভাইয়ের মধ্যে একটি চুক্তিনামাও যে সম্পাদিত হয়, আওরঙ্গজেবের চিঠি সে সাক্ষ্য দেয়। চুক্তি অনুযায়ী পাঞ্জাব, আফগানিস্তান, কাশ্মীর ও সিন্ধুর সমন্বয়ে গঠিত বিস্তৃত এলাকা স্বাধীন সম্রাট হিসেবে শাসন করবেন মুরাদ বকশ। ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের অবশিষ্টাংশ থাকবে আওরঙ্গজেবের জন্য। আর যুদ্ধ বিজয়ের ফলে প্রাপ্ত সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ যাবে মুরাদ বকশের কাছে। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার পরিব্রাজক বার্নিয়ারের একটি বিবরণ নাকচ করে দিয়েছেন যে আওরঙ্গজেব চেয়েছিলেন বড় ভাই বিধর্মী দারা শুকোকে হটিয়ে সাম্রাজ্য মুরাদের হাতে অর্পণ করে মুসাফির হয়ে চিরদিনের জন্য মক্কাশরিফ চলে যাবেন। বার্নিয়ারের বিবরণী যে অতিরঞ্জিত ও অযৌক্তিক, তা আওরঙ্গজেবের পরবর্তী দীর্ঘ শাসনকালই তা প্রমাণ করেছে।

সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতা নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তির জন্য দারা শুকো নিজেই অনেকটা দায়ী। তিনি রাজসভার একজন কি দুজন মন্ত্রী ছাড়া আর কাউকেই সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেননি। অন্যদিকে বাংলা, গুজরাট ও দাক্ষিণাত্য থেকে প্রেরিত কোনো বার্তা বা বার্তাবাহক সম্রাটের কাছে যেন পৌঁছতে না পারে, তিনি সেদিকেও কড়া নজর রেখেছেন। পিতা তথা সম্রাটের কাছ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে সাম্রাজ্যের তিন