ভীষ্ম।। সূর্য অস্ত গেছে। অন্ধকার কুরুক্ষেত্রে যতদূর চোখ যায়, স্বজনের মৃতের স্তূপ ছাড়া কিছু নেই। যতদূর শ্রবণ যায়, শকুনের পাখসাট আর শৃগালের কোলাহল ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। অহোরাত্র কান্নার পরে কুলবধূদেরও আর সাড়া পাওয়া যায় না। এইখানে, এই নিবিড় অন্ধকারে প্রায়মূর্ছিত দশায় আমার মনে পড়ে, কোনো শিশুরা যেন ভুল করে আমাকে বাবা বলে ডাকত, ধুলপায়ে উঠে যেত আমার কোলে। আমি ভীষ্ম। এই বীরত্বের ভারে ক্লিষ্ট নামটির আড়ালে আমার আরেকটি নাম ছিল, দেবব্রত। গঙ্গাপুত্র দেবব্রত। মাতা গঙ্গা আমাকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর জলে ভাসিয়ে দিচ্ছিলেন, পিতা বাধা দিয়েছিলেন বলে দেবী গঙ্গা তাঁকে আর আমাকে পরিত্যাগ করে চলে যান। আমার শৈশবে মাতৃস্নেহের দীপালোক জ্বালেনি কেউ, দীর্ঘ দীর্ঘ কাল আমি ক্ষেপণ করেছি পিতা শান্তনুর গভীর মমতায়। মাতৃহীন বালক আর প্রিয়াহীন যুবক একখানি সরল সলতেয় পাক দিয়ে জ্বলেছি কত অন্ধকার নিঃসঙ্গ বেলা। কে? কে যায়?
অবগুণ্ঠিত মানুষ।। (অশ্রুবিকৃত কণ্ঠে) আমি কেউ নই ভীষ্ম। আমি কর্ম, কিংবা ভুলে যাওয়া কর্ম, কিংবা কর্মফল। কিংবা আমি নিষ্ফল কোনো যোগ। কিংবা তোমার শরশয্যার শিয়রে আমি একটি চন্দনতরু।
ভীষ্ম।। হেঁয়ালি? তা হোক। শ্মশানবন্ধু হতে পারো তুমি। হতে পারো অপ্রাপণীয়া প্রিয়া কিংবা গরঠিকানার চিঠি। হতে পারো অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের পদপ্রান্তে দৃষ্টিধারী সঞ্জয়। হতে পারো ছদ্মবেশী ধর্মরাজ। আজ কী আসে যায়। কিন্তু আমার শ্রবণযন্ত্র আর ঠিকমতো কাজ করছে না বলে বুঝতে পারছি না, তুমি কি নারী না পুরুষ? অবশ্য তাতে কী আসে যায়!
অবগুণ্ঠিত মানুষ।। তাই তো। কী আসে যায়। ভীষ্ম, তুমি যা বলছিলে তা বলো।
ভীষ্ম।। (কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে) একদিন দুঃখের দিন কাটল। যুবক তত দিনে প্রৌঢ়, তার দুঃখের দিন কাটল। বালক তখন নওলকিশোর, তার ঘনঘোর দুঃখের দিন শুরু হলো।
পিতা আছেন কিন্তু পিতার পাশে আছেন বিমাতা। তিনি বরবর্ণিনী, তিনি কালো যমুনাবতী।
যমুনাপুলিনে খেয়া পারাপার করতেন। তিনি যোজনগন্ধা, যোজন যোজন দূর থেকে পিতা তাঁর গায়ের সুবাস পেয়েছিলেন, জনম জনমের অন্বিষ্ট নারীকে খুঁজে পেয়েছিলেন। কৈবর্ত্যপল্লীর মেয়ে, তিনি সত্যবতী।
অবগুণ্ঠিত মানুষ।। তাই বুঝি রাজমাতা হবার এত অভিলাষ ছিল তাঁর? সোনার পুরী রুপার পাত, শ্বেতপাথরের নিগম ছাদ?
ভীষ্ম।। হতে পারে। কৈবর্ত্যপল্লীর মেয়ে। একবার ঋষিভোগ্যা হবেন, তার পর রাজভোগ্যা। বারে বারে শুধু ভোগের বস্তু হতে তিনি চাননি। মান চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন রাজবধূ আর রাজমাতা হবার মর্যাদা। সত্যবতীর গর্ভে যে পুত্র জন্মাবে সে সিংহাসনের উত্তরাধিকার পাবে, এই ছিল বিয়ের শর্ত।
অবগুণ্ঠিত মানুষ।। আর তোমার পিতা রাজা শান্তনু, তিনি রাজি হয়ে গেলেন?
ভীষ্ম।। বাসনা বড় দুরূহ বস্তু। ঠিক তখনি তিনি সম্মত হলেন না, রাজধানীতে ফিরে এলেন ক্ষুণ্ন মনে। জেলেপাড়ার মেয়ে এত দুর্লভ হবে কে জানত! আমি তখন সুকুমার যুবক। আমি তখন যুবরাজ। কিন্তু আমি তো তখনো সেই প্রিয়াহীন পিতার স্নেহের সন্তান। পিতার পাণ্ডুর চেহারা আমার প্রাণে সইবে কেন? প্রিয় পোষ্য আমি, আমি তাঁর শতপুত্রের সমান, আমি তো জানতে চাই তাঁর ব্যাধির কারণ।
অবগুণ্ঠিত মানুষ।। প্রেমকাতরতা, এ মরণব্যাধি। এ দৃষ্টিবানকে করে জন্মান্ধ, সুখসুপ্তকে দেয় শয্যাকণ্টকী, সপুত্রককে দেয় বংশহানির আশঙ্কা।
ভীষ্ম।। সত্য। পিতা প্রথম সেই আশঙ্কাই ব্যক্ত করেছিলেন। আমি পুত্র, আমার কাছে আসঙ্গলিপ্সার কথাটি তিনি কি করে বলবেন? কোনোমতে বললেন, আমার মৃত্যু হলে তাঁর বংশের কী গতি হবে। যখন জানলাম, আমি নিজে রাজ্যের মন্ত্রণাদাতা ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে করে গেলাম কৈবর্ত্যপল্লীতে, সকলের সামনে আমি এমন প্রতিজ্ঞা করলাম যা পূর্বে কিংবা পরে আর কেউ কোনোদিন করেনি। প্রতিজ্ঞা করলাম রাজ্যপাট সত্যবতীর গর্ভে জন্মানো পুত্রের অধিকারে যাবে।
রাজ্যের অধিকার ত্যাগ করবার এই প্রতিজ্ঞায় যদি কারো প্রত্যয় না জন্মে, এও প্রতিজ্ঞা করলাম আমি আজীবন ব্রহ্মচর্য পালন করব। নারীসঙ্গই যদি কেউ না করে, বসন্তের শাল্মলীফলের মতো ফেটে গিয়ে বায়ুবাহিত হয়ে তো সে সন্তান জন্ম দেবে না।
অবগুণ্ঠিত মানুষ।। বাহ, তোমার একবার প্রাণ কাঁপল না ভীষ্ম? এমন সুন্দর জীবন, এমন বীর বংশগতি তুমি এক প্রতিজ্ঞায় শেষ করে দিলে?
ভীষ্ম।। বংশরক্ষাই শুধু বীরের ধর্ম নাকি? বীরের ধর্ম নিষ্ঠা, সততা, নির্বিকল্প ঋজুতা। বীরের পরিচয় প্রতিজ্ঞায়।
অবগুণ্ঠিত মানুষ।। তাই? তোমাদের সব বাঘা বাঘা বীররা সবাই প্রতিজ্ঞা রেখেছে? সবাই সত্য বলেছে? ব্রহ্মচর্যে নারীসঙ্গ করেনি?
ভীষ্ম।। অপরের কথা আমি কি করে বলব। অপরাপর কিছুর সাথে এই প্রতিজ্ঞা মেলে না বলে ইহচরাচরে আমার নাম প্রতিজ্ঞার সমার্থক।
অবগুণ্ঠিত মানুষ।। (দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে থাকে।)
ভীষ্ম।। (বিচলিত কণ্ঠে) দ্যাখ, আমি আজন্ম যে স্নেহ জানি, তা পুরুষের।
মাতৃস্তন্যের বদলে আমি পেয়েছি পুরুষের অপত্যপ্রেম। পুরুষ স্নেহের আধার। আমি পুরুষের স্নেহের প্রতিদান দিয়েছি। কুলোকে বলেছে, সমবয়স্কা সত্যবতীকে বরং আমার পাশে মানায়, আমার সাথে বিবাহ হলেও তো সে কুরুবংশের বধূই হবে, আমি গ্রাহ্যমাত্র করিনি। নারীর অলোকসামান্য রূপ আমার চোখে ঠেকেনি। যখন থেকে পিতা শান্তনু তাঁর প্রতি কামপরবশ, তখন থেকে তিনি আমার মা। আমার পৃথিবী অজটিল, একরেখ।
অবগুণ্ঠিত মানুষ।। রূপ চোখে ঠেকে না বুঝলাম, রূপতৃষ্ণা তোমার হূদয়ে আছে, ভীষ্ম?
ভীষ্ম।। (আহতের কাতরোক্তি) অন্তিম শরশয্যায় যে শুয়ে আছে, তাকে এমন প্রশ্ন করতে তোমার দ্বিধা হলো না, করুণা হলো না?
অবগুণ্ঠিত মানুষ।। তুমি আজ অচেনা মানুষের করুণা চাইছ ভীষ্ম? আজ যদি বলি, তোমার আন্তরিক নিরুচ্চার অভিশাপে তোমার সত্ ভাইরা অপুত্রক অবস্থায় মরে গেল?
ভীষ্ম।। না। না। কোনোমতেই তা হতে পারে না। আমি কোনো রাজকার্যে মাতা সত্যবতীকে অতিক্রম করিনি, কোথাও জ্যেষ্ঠের ছায়া ফেলিনি কনিষ্ঠের সুফলা উদ্যানে।
অবগুণ্ঠিত মানুষ।। সুফলা? নিষ্ফলা বলো। তোমার প্রতিজ্ঞা সত্ত্বেও কুরুবংশগতির লয় হতে চলেছিল। সত্ভাইদের একজন মারা গেল যুদ্ধে, আরেকজন কামরোগে। কারো একটি পুত্র জন্মাল
না।
ভীষ্ম।। আমার স্নেহে কোনো ছলনা ছিল না। নইলে একখানামাত্র রথ নিয়ে কাশী যাই সত্ ভাইয়ের জন্যে কন্যা লুণ্ঠন করতে? আমার তখন যৌবন অস্তাচলে। অম্বা, অম্বিকা, অম্বালিকা তিন বোন ছিল তারা, কাশীরাজের তিন পরমাসুন্দরী কন্যা... পূর্ণশশী, বাঁকাশশী আর হেমশশী যেন...
(অবগুণ্ঠিত মানুষটি তার অবগুণ্ঠন মোচন করে। কুরুক্ষেত্রে বহুদূর হতে আসা কোনো তাম্বুর ক্ষীণ আলোয় তাকে দেখা যায়। না নারী, না পুরুষ। মানুষটি শিখণ্ডী। ভীষ্ম আঁতকে ওঠেন। শিখণ্ডী কাছে এসে ভীষ্মের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন। সেই অলৌকিক চোখজোড়া জলে-অগ্নিতে-অঙ্গারে পরিপূর্ণ। সামান্য আলোতেও ভীষ্ম তা দেখতে পান। শারীরিক বেদনায় কাতর ভীষ্মের চোখে জলের কম্পমান পর্দা, তার ভিতর দিয়ে দেখা যায় অপ্সরাসম্ভব এক রূপসীর মুখচ্ছবি।)
ভীষ্ম।। পূর্ণশশী?... অম্বা?
অম্বা।। (বাঁকা হেসে) আমরা তিন বোন তবে পূর্ণশশী, বাঁকাশশী আর হেমশশী?
আমাদের রূপ তবে প্রায়বৃদ্ধ ভীষ্ম চোখ তুলে দেখেছিল? দেখেছিল, হরণ করেছিল, ছুঁয়ে দিয়েছিল কিন্তু গ্রহণ করেনি। অপরের জন্য হরণ করেছিল। সেই ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিতে উদ্যত হয়েছিল।
ভীষ্ম আমার দুই সরলপ্রাণা বোনকে তুমি পুত্রার্থে ধর্ষিতও হতে দিয়েছিলে... আচ্ছা, সেসব হিসেব পরে হবে। আমার কথা বলব আজ। আমার হূদয় ছিল শাল্বরাজার, তুমি কি জানো না ভীষ্ম- প্রণয়িনীর লুণ্ঠিত দেহ মার্জারে মুখ দেয়া দুধের বাটি, সে বাটি আর কারো হতে পারে না। হূদয়েরই বা তুমি কী জানো! (অবজ্ঞায় বিকৃত হয়ে আসে মুখ)
ভীষ্ম।। (মুখ ঢেকে) আমাকে সংহার করেও কি তোমার শান্তি হয়নি অম্বা?
অম্বা।। শান্তি? কার শান্তি? কীসের নির্বাণ? তুমি আমাদের তিন বোনকে লুট করে আনলে ভ্রাতৃবধূ করবে বলে। আমি জানালাম আমি সত্যকার স্বয়ম্বরা, অন্তরে একজনকে পতি মেনেছি, আর কারো স্ত্রী আমি হতে পারি না। অতএব তোমার ভাইয়ের সাথে আমার বিবাহ হলো না।
যাকে আন্তরিক উত্সবে বিরলে পতি হিসেবে বরণ করেছি, সেই শাল্বরাজ আমাকে আর গ্রহণ করল না, কিছুটা তোমার ভয়ে আর কিছুটা পুরুষকারে চোট লেগেছে বলে। আমি কিন্তু তখন আর অপ্সরাসমা রাজকন্যা নই। আমি ভীষ্মর হরণ করে আনা রাজকন্যা। আলোয় মাতাল উদ্দীপনায় সরস স্বয়ম্বরসভায় রাজাদের ভিড়ে বর বাছাই করছিলাম, সেখান থেকে একমুহূর্তে আমি প্রায়ধর্ষিত নারী হয়ে গেলাম কেবল, যাকে কটিবেষ্টন করে তুমি তোমার রথে উড়িয়ে এনেছ। তুমি চয়ন করলে কিন্তু মালায় গাঁথলে না ভীষ্ম। আমার স্পর্শ, আমার সৌন্দর্য, তোমার গুরু পরশুরামের আজ্ঞা কিছুই তোমার হূদয়ের উষর ভূখণ্ডে আমার জন্য স্নেহ-মায়া-প্রেম গজাতে পারল না। আহাঃ নারী এবং মানুষ উভয় হিসেবে আমি প্রত্যাখ্যাত হলাম। কার দোষে? উন্মত্তপ্রায় চরে বেড়ানো ছাড়া সেই প্রত্যাখ্যাত নারীর আহত অহঙ্কারের আর কোনো গন্তব্য মিলল না। তুমি জানো না ভীষ্ম, পৌরুষের পরাজয় যেমন, নারীত্বের পরাজয় তেমন দুর্বিষহ। কোনো মন্ত্রৌষধিবলে আমি পেরিয়ে এলাম লোক হতে লোক, ইহলোক থেকে অন্তর্লোক, ভূলোক-দ্যুলোক কোথাও আমার অচরিতার্থ প্রতিহিংসা, আমার প্রেম, আমার নারীজন্মের অহমের শান্তি হলো না। কোথাও মিলল না পরিপ্লুতি।
একটিমাত্র লক্ষ্য আমার, তোমার প্রাণনাশ।
ভীষ্ম।। ভেবে দেখ অম্বা, তুমি তোমার লক্ষ্য অর্জনের জন্যে এক লোক থেকে আরেক লোকে চলেছ, এক জন্মপরিচয় থেকে আরেক জন্মে, এক লিঙ্গ থেকে আরেক লিঙ্গলাভ করেছ। অম্বা থেকে শিখণ্ডিনী, শিখণ্ডিনী থেকে শিখণ্ডী। তোমার মূলমন্ত্র ‘চরৈবতি’, আমি সে তুলনায় শালগ্রামশিলামাত্র। সেই যে এক প্রতিজ্ঞার স্বনির্মিত কারাগার, তাতে স্থাবর হয়ে বেঁচে আছি তো আছিই। আমৃত্যু আপন কৃতকর্মের হাতে আপনি বন্দি। এমন দুর্ভাগ্য যার, তার প্রতি অভিমান রেখো না।
অম্বা।। নিজেকে দুর্ভাগা বলে মমতার চোখে দেখছ ভীষ্ম। একবার তাকিয়ে দেখ আমার এবং আমার বোনদের ভাগ্যের তুমি কী দশা করেছ। যে রাজকন্যারা সোনার খাটে পা রুপোর খাটে গা করে বড় হয়েছে, সেই কুরুকুলবধূদের তুমি বিকটদর্শন ব্যাসদেবের কাছে পাঠিয়ে দিলে ক্ষেত্রজ পুত্র উত্পাদন করতে... কারণ তোমার বংশরক্ষা করতে হবে... অনিচ্ছুক বোনেরা আমার চোখ বুজে ভয়ে পাণ্ডুবর্ণ হয়ে ধর্ষিত হলো। তাতে তোমার কী যায় আসে, তোমার বংশে পুত্র তো জন্মাল। ক্ষাত্রধর্ম, প্রতিজ্ঞা, ইন্দ্রিয়সংযম, সত্যনিষ্ঠা, বংশগতি এইসব বড় বড় বিষয় ভাবতে ভাবতে তুমি একটি বস্তু বারবার তুচ্ছ করেছ। তার নাম নারীর সম্মান। (একটু চটুল হয়ে ওঠে অম্বার গলা) আচ্ছা ভীষ্ম, আমরা তো তিন শশী, আমরা যদি তিন শশী তবে যে দাসী রানী সেজে আমার ছোটবোনটির বদলে ব্যাসদেবের পাশে শুয়েছিল, সে কী? প্রেমশশী? কালোশশী কে তবে?
সত্যবতী? তোমার হূদয়ে ফসলহীন ক্ষেত্রে এমন কত শশী অস্ত গেছে সবার অজান্তে ভীষ্ম?
ভীষ্ম।। তোমার প্রগলভতার জবাব আমি দেব না নারী। ভুলে যেও না, আমার দুশ্চিন্তায় জীর্ণ কপালের বলিরেখা এবং পলিতকেশ দেখে তোমার বোনেরা স্বয়ম্বরসভা থেকে অপমানজনকভাবে বের হয়ে গিয়ে হাসছিল। এমন প্রত্যাখ্যানের উত্তরে তোমাদের হরণ না করে আমার উপায়ান্তর ছিল না।
অম্বা।। কেন ভীষ্ম, তোমার প্রত্যাখ্যানের অধিকার আছে, সেই প্রত্যাখ্যানের ফলাফল যা-ই হোক না কেন আর আমাদের প্রত্যাখ্যানের আভাসও দিতে নেই? প্রত্যাখ্যাত হবার আশঙ্কা নিয়েই তো যে রাজা যে বীর সে স্বয়ম্বরসভায় ঢোকে।
ভীষ্ম।। কল্যাণী, ভুলো না আমি ক্ষত্রিয়, যুদ্ধ বাধানো এবং যুদ্ধ করা আমার কর্ম, আমার ধর্ম। আমি চেয়েছিলাম যুদ্ধ বাধুক।
অম্বা।। যাতে তুমি আরেকবার প্রমাণ করতে পার যে, তুমি কত বড় বীর।
ভীষ্ম।। ক্ষত্রিয়ের বিক্রম দেখে তুমিও তো সেদিন বিস্মিত হয়েছিল অম্বা, বেতসলতাসদৃশা কন্যা, কই রথ থেকে পালিয়ে যাওনি তো।
অম্বা।। (বিচলিত স্বরে) একটু স্তব্ধ হয়েছিলাম, বাক হারিয়েছিলাম... কী ভীষণ যুদ্ধ। (কিছুক্ষণ নীরব থেকে) ধূম্রলেশহীন আগুনের মতন ছিল তোমার রূপ। জীর্ণ কপাল অথচ কী উদাত্ত। বৃদ্ধ দেহে কী উদ্যম অথচ শান্তি। চোখ কী আশ্চর্যসজল আর তেজে ভাস্বর। মেঘলা সন্ধ্যার শেষ আলোর মতন কী এক আলো এসে লাগল আমার চোখে। রথে চড়ে আমার কটি জড়িয়ে ধরে হস্তিনাপুরের দিকে রথ ছুটিয়ে দিলে, আমি তখন তোমার বুকের কপাটে হূিপণ্ড আছড়ে পড়ার শব্দ শুনছি। এই গর্বোন্মাদ হূদস্পন্দনে কোথায় এসে আমারও বুকের শব্দ বেজেছিল... একটি মুহূর্তের প্রমাদমাত্র। তোমার রাজ্যে এসে দেখলাম আমাদের তুমি যুদ্ধলব্ধ পণ্যের মতন অস্থাবর সম্পত্তির মতন ভাইয়ের-মায়ের পায়ের তলায় বিকিয়ে দিচ্ছ। যেন আমরা হস্তান্তরযোগ্য। যেন নারীর হূদয় স্থানান্তরযোগ্য।
ভীষ্ম।। কী অসংকোচে তুমি আমাদের কাছে তোমার মনের কথা জানিয়েছিলে অম্বা। আমি মাতা সত্যবতীকে বহু বিপর্যয়ে অবিচল থাকতে দেখেছি, কিন্তু সে ছিল স্বার্থবুদ্ধির জেদ। তোমার বেলায় যা দেখেছি, তা নির্ভয় সত্যনিষ্ঠা, অন্তরের আকুতি ব্যক্ত করার সাহস, এমন আমি আগে কখনো দেখিনি। পরেও না।
অম্বা।। (অন্ধকারে ব্যগ্র হয়ে ভীষ্মের মুখভঙ্গি লক্ষ করতে চেষ্টা করে) তুমি মুগ্ধ হয়েছিলে ভীষ্ম?
(ভীষ্ম নিশ্চুপ থাকলেন।)
অম্বা।। (ক্রুদ্ধ, রুষ্ট, তির্যক গলায়) আগে-পরে কখনো দেখনি? হারাশশীতে মানে পাঞ্চালিতে?
কুরুসভায় যখন একবস্ত্রা পাঞ্চালির বসন ধরে টান দিল দুঃশাসন, তখনো দেখনি?
ভীষ্ম।। পাঞ্চালির ভরসা ছিল, পাঁচ স্বামী রয়েছেন। শ্বশুর-ভাসুর প্রভৃতি উপস্থিত সে সভায়।
অম্বা।। সেইসব শ্বশুর-ভাসুররা তো রীতিমতো অক্ষম, স্ত্রীকুলকে সম্মানীয়া জ্ঞানে অক্ষম, স্ত্রীকুলের সম্ভ্রম রক্ষায় অক্ষম। অবশ্য অক্ষমতা যদি উপাদেয় হয়, কে না অক্ষম হয়। নিশ্চুপ-নিশ্চল হয়ে বসেছিলে তুমি সেদিন। কেন ভীষ্ম? তুমি আদৌ পুরুষ কিনা, তোমার উত্থান হয় কিনা তা বিরলে পরখ করে দেখছিলে?
(ভীষ্মের মুখে অত্যন্ত যাতনার চিহ্ন দেখা দিল। তা দেখে অম্বার মুখ হূষ্ট হয়ে উঠল, চোখ অশ্রুপূর্ণ।)
অম্বা।। হস্তিনাপুর থেকে শাল্বপুর... কতটা পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয় জানো তুমি? গেলাম।
বয়সে তরুণ। কৌমার্যে অক্ষুণ্ন। নিবেদনে একনিষ্ঠ। শাল্বরাজ আমাকে গ্রহণ করলেন না, ভীষ্ম তোমার ভুক্তাবশিষ্ট মনে করে, সেই যে রথ থেকে পালিয়ে যাইনি, সেই কাজটুকুকে দ্বিচারণ ধরে নিয়ে আর হয়তো একরকমের অনস্বীকার্য ভয়ে তিনি আমাকে প্রত্যাখ্যান করলেন। আবার সেই দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে আমি তোমার কাছে আসছিলাম। এইবার আমার চোখে আবার লাগছে সেই মেঘকাটা আলো, বুকে আছড়ে পড়ছে তোমার বুকের স্পন্দন। না, বীরের কাছে যাব। ত্যাগী মহর্ষির কাছে যাব। পথিমধ্যে আমার ভ্রম ভাঙল। যে রাজ্যে আমি শতমুখ করে নিজের প্রেমের বয়ান দিয়ে এসেছি, সে রাজ্যে আমি কী করে ফিরি। পিতৃগৃহেই বা কী মুখে ফিরি। আশ্রমে গিয়ে আশ্রয় নিলাম, হোম-যাগ-যজ্ঞেই বা কোন জ্বালা নেভে। শরণাগতকে কে গ্রহণ করবে... প্রত্যাখ্যাত হবার অনির্বাণ শোক তুমি জানো ভীষ্ম? সেই শোকে তোমার অস্ত্রগুরু পরশুরামের কাছে গিয়ে কেঁদে পড়লাম তোমায় যেন তিনি প্রাণে মারেন। যেন তোমার মৃত্যুতে আমার অপমানের শোধ। হায়, গুরু তোমায় আমাকে বিয়ে করার অনুরোধ করলেন, মৃত্যুভয় দেখালেন, তেইশদিন যুদ্ধও করলেন। দুই বীর নক্ষত্র আর ধূমকেতুর মতন যে যার বীরত্বের পথ পরিক্রমা করলেন অথচ তোমার প্রাণনাশের বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেল।
ভীষ্ম।। এমন করে কেন আমার মরণ চেয়েছ অম্বা?
অম্বা।। পৃথিবীতে প্রাণীহত্যার শাস্তি আছে। সম্ভাবনার হত্যা করল যে, তার কোনো শাস্তি নেই। আমি স্ত্রী হতে পারতাম, প্রিয়পুরুষের বক্ষপিঞ্জরে হূিপণ্ড আছড়ানোর শব্দ আমৃত্যু শুনতে পেতাম প্রগাঢ় আলিঙ্গনে। মা হতে পারতাম, জগতের ধাত্রেয়িকা মহামাতৃকুলে আমার দেদীপ্যমান নাম পূজ্য হতো... কই কিছু তো হলো না। তোমার জন্য হলো না।
ভীষ্ম।। অম্বা, যা গত হয়েছে, তা নিয়ে আর শোচনা করো না।
অম্বা।। কেন তুমি গুরুর আজ্ঞা পাওয়ার পরেও আমাকে গ্রহণ করলে না? ভূভারতে মিছে কথা কে না বলেছে, স্বয়ং যুধিষ্ঠিরকেও মিথ্যা বলতে হয়েছে। কত শপথ ভঙ্গ করা গেছে, ভীষ্মের শপথ কেন নয়? শপথভঙ্গ করে আমাকে গ্রহণ করলে কি দ্রৌপদীর পাঁচ সন্তানের মাথা কেটে নেয়ার চেয়ে বড় অমঙ্গল হতো?
ভীষ্ম।। কন্যা, আমার কাছে তার উত্তর নেই। ত্রিলোকে আমার তুল্য বীর আর কেউ নেই, এ মহীমণ্ডলে আমার চেয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আর কেউ নেই...এইসব গরিমার কাছে নারী তুচ্ছ। নারীর স্থান এমনিতেও আমার জীবনে নেই, ছিল না। কামনা বাসনার বিপ্রতীপে যে প্রমত্ত খরস্রোত বয়ে যায়, সেটাই আমার জীবন। তোমাকে তো বলেছি- জননীর কাছে মানুষ শুধু স্নেহক্রোড় পায় না, প্রেমের প্রথম দীক্ষাও পায়। মাতা গঙ্গা আমাকে তা দেননি, দিয়েছেন পিতা।
আমি পুরুষের সন্তান, পুরুষের ভ্রাতা, পুরুষের স্নেহভাক, পুরুষের জ্যেষ্ঠ। ক্ষত্রিয়ের জীবনে, যোদ্ধার জীবনে সহযোদ্ধারা প্রেম, গুরু প্রেম। কুরুবংশের পরাক্রমশীল শিশু-কিশোরদের বীর হয়ে উঠতে দেখে আমার দেহে যে আনন্দস্রোত বয়ে গেছে চিরদিন, তা প্রেম। যুধিষ্ঠিরের ধী, ভীমের শক্তি, অর্জুনের মনঃসংযোগই আমার প্রেম। আমি কোনো নারীকে প্রেম দিতে অক্ষম, এই অন্তর্ঘাতী সত্য কুরুক্ষেত্র আর তার পাশে বহতা মা গঙ্গাকে সাক্ষ্য করে জানিয়ে গেলাম। জেনো।
অম্বা।। ভীষ্ম তোমার হন্তারক খুঁজতে একে একে কত লোক কত জগত্ পায়ে হেঁটে পার হলো অম্বা।
দেব, দানব, যক্ষ, রাক্ষস, গন্ধর্ব, অন্তরীক্ষের ঋষিগণ— কত রকম জাত এই জগতে... কোথায় আছে তোমাকে হনন করবার শক্তি? কোথায় বিনষ্ট সম্ভাবনার শোক থেকে পরিত্রাণ? একটি নারী তোমাকে কখনো ভোলেনি, তার নাম অম্বা। তার নাম মৃত্যু। তার নাম বিরহও। নারীজন্মে তোমায় পেলাম না, সেই অচরিতার্থতায় যক্ষের লিঙ্গ ধারণ করে দেখতে এলাম তোমায় পাই কি না। অম্বার রূপে ভোলোনি তুমি, শিখণ্ডীর বিক্রমে মুগ্ধ হবে তো?
(গভীর স্নেহে ভীষ্ম সজললোচনা অম্বার দিকে ফিরলেন।)
ভীষ্ম।। অম্বা, তোমাকে নিঃসংকোচে দেবার মতন কিছুই আমার ছিল না, শুধু ছিল আমার মৃত্যু, তোমার জন্মজন্মান্তরের ব্রত আমি মৃত্যু দিয়ে সার্থক করে গেলাম। লোকে জানবে ভীষ্ম বড় বীর, স্ত্রীলোক কিংবা স্ত্রী হতে রূপান্তরিত পুরুষের প্রতি বীর অস্ত্রক্ষেপ করে না। তুমি জেনো, কুরুক্ষেত্রে তোমায় আমি দেখবামাত্র চিনেছিলাম, সমরাস্ত্র ছেড়ে আমি দাঁড়িয়েছিলাম তোমায় আমার মৃত্যু উপহার দেব বলে। এ প্রেম। এ মৃত্যু। তুমি প্রসন্ন হও।
(শ্রীকৃষ্ণের গাত্রবর্ণের মতো, অতসীপুষ্পের মতো শ্যামবর্ণ হয়ে আসে ঊষাপুবের আকাশের রঙ, একটু পরে গঙ্গার জলে মঞ্জিষ্ঠা লাল রঙ ধরবে। ভীষ্ম দেহবিসর্জন করতে প্রস্তুত হন।)
১৮/০৫/২০১৭





