[ইন্তিজার হুসেন: পাকিস্তানের অনন্য উর্দু সাহিত্যিক। অবিভক্ত ভারতের উত্তর প্রদেশের শহর দিবাইতে ১৯২৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন এ কথাশিল্পী। ১৯৪৭-এ দেশ ভাগের সময় চলে যান পাকিস্তানে, থিতু হন লাহোরে। দেশ ভাগের রক্তঝরা ইতিহাস আর দুঃখ-যন্ত্রণা তার রচনায় বারবার ফিরে এসেছে। তার গল্প-কবিতা-উপন্যাসে ঘরহারাদের কষ্ট, মৃত্যু, কঠিন বাস্তবতা পড়তে পড়তে পাঠক যখন বাকরুদ্ধ হন, তখনই ইন্তিজার খুলে বসেন রূপকথার ডালি। সেই ডালি সেজে ওঠে রামায়ণ-মহাভারত-উপনিষদ-জাতককথা আর এক সহস্র এক রজনীর হাত ধরে নতুন রূপে। সৃষ্টিশীল সাহিত্যের জন্য ২০১৪ সালে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সাহিত্য খেতাবে ভূষিত হন। ২০১৩ সালে ম্যানবুকার প্রাইজের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পান। উর্দু সাহিত্যের এই সফল কথাকারের জীবনাবসান ঘটে ২০১৬ সালে। অনূদিত ‘নৌকা’ গল্পটি ‘দ্য বোট’ গল্পের ভাষান্তর। গল্পটি নেয়া হয়েছে তাঁর লিভস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ গল্পগ্রন্থ হতে। গ্রন্থটি উর্দু থেকে ইংরেজিতে ভাষান্তর ভাষান্তর করেছেন অলোক ভাল্লা ও বিশ্বমিত্র আদিল]

 

১

বাইরে তখনো বৃষ্টি হচ্ছিল। ভেতরে উষ্ণ আর স্যাঁতসেঁতে। ভেতরের গরমে হাঁস-ফাঁস হয়ে একজন জানালা খুলেই ফের লাগিয়ে দিল।

‘বৃষ্টি কমেছে?’

‘না। আগের মতোই ঝমঝমে।’

‘এটা বৃষ্টি নাকি কেয়ামতের আলামত?’

‘হে খোদা! বাইরে যে পরিমাণ বৃষ্টি হচ্ছে, সেটা দোজখের চেয়েও ভালো।’

‘বাইরের বৃষ্টি কিংবা ঘরের বিশ্রী গরম, এই দুইয়ের একটাকে পছন্দ করার কোনো কারণ নাই।’

‘তাহলে কোথায় যাব? সব তো পানির নিচে।’

‘এখনো বৃষ্টি পড়ছে কেন?’

‘কারণ আমরা এখনো বেঁচে আছি।’

‘এখানে কতজন আছি? আঙুলের কড়া গুনে হিসাব করতে হবে।’

‘পশু-পাখিরাও কিন্তু আছে।’

‘হয়তো এই জন্যই গরমটা বেশি লাগছে। পশুদের সঙ্গে এক কামরায় আটকে থেকে দম টানা খুবই বিরক্তিকর।’

‘হুম। কে জানে আর কতক্ষণ এখানে আটকে থাকতে হবে। বৃষ্টি থামার তো কোনো নামনিশানা নাই। দিনের পর দিন একটানা ঝরেই যাচ্ছে।’

‘বৃষ্টি শুরু হয়েছিল কবে যেন?’

‘কবে?’

‘হ্যাঁ। চলো বরং গুনে দেখি বৃষ্টি কত দিন ধরে হচ্ছে।’

তখন সবাই আলাদা আলাদাভাবে গুনতে চেষ্টা করল কত দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু কেউই সঠিক হিসাব করতে পারল না। না দিন, না ক্ষণ।

‘তার মানে আমরা জানি না এই নৌকায় কত দিন ধরে ভাসছি!’

সবাই মোটামুটি বিভ্রান্ত। কত দিন, কত বছর, কয় প্রজন্ম? কেউ যখন দীর্ঘ যাত্রায় বেরোয় বা এমন মুষলধারার বৃষ্টি একনাগাড়ে ঝরে পড়ে, তখন সবাই এমন ধন্ধেই পড়ে। আর অঝোর বৃষ্টির রকমটাই এমন যে মনে হয়, তা বছরের পর বছর ধরে হয়েই যাচ্ছে। দীর্ঘ যাত্রার বেলাতেও তা-ই, যেন অনন্তকাল ধরে, জন্মজন্মান্তর ধরে চলছে।

‘যা-ই হোক, যেদিন বৃষ্টি শুরু হয়েছিল, সেদিনই আমরা বাড়ি ছেড়েছিলাম। আচ্ছা, কবে বাড়ি ছেড়েছি, সেটা কি কেউ বলতে পারো?’

‘বাড়ি!’

সেই প্রথম কারো মুখে ‘বাড়ি’ শব্দটি উচ্চারিত হলো।

চমকে উঠল ওরা, ‘একদিন আমাদের বাড়ি ছিল!’ তারপর ওদের নিজেদের বাড়ির কথা মনে পড়ল, যেন সদ্যই ছেড়ে এসেছে ওরা... এমনই তরতাজা স্মৃতি।

‘ইশ্, আর কেউ না হলেও শুধু সে যদি আমার সঙ্গে নৌকায় উঠতে পারত! কে জানে সে এখন কোথায়, সে কি পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে?’

‘কে সে?’

‘ও, ওই সিঁড়ির মুখে ওর সঙ্গে আমার ধাক্কা লেগেছিল সেদিন। আমি উঠছিলাম, সে নামছিল।’

তারপর সেদিনের সেই সংঘর্ষের মুহূর্তটি আদ্যোপান্ত মনে পড়ল তার। সেই হরিণ চোখের দৃষ্টি, পাকা-রসাল ফলের মতো টসটসে স্তনের নারী। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পা হড়কে সে যখন তার বাহুতে বাঁধা পড়ল, মনে হচ্ছিল থিরথির কম্পমান এক পায়রা। মুহূর্ত পরেই বাহু থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সে ত্রস্তে নেমে গিয়েছিল লম্বা পদক্ষেপে, যেন এক বুনো হরিণী। শেষ ধাপে সে হঠাত্ চট করে একবার ফিরে তাকিয়েছিল।

তারপর উঠান, আঁকাবাঁকা পথ, পাহাড়, ফলে ভরভরন্তি গাছ আর রাজ্যের পাখি... কতসবের কথা মনে পড়বে আর! কিন্তু বৃষ্টির জোরালো ছাঁটে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে বন্যার ঢলে ভেসে যাওয়া ঘরদোরের কথা কেন মনে করতে হবে? তবুও, পানি বাড়তে বাড়তে পর্বতের মাথা ছুঁই ছুঁই হয়ে ওদের সহায় ভাসিয়ে নেয়ার এ বাস্তবতা এখনো বোধের অতীত।

‘আমরা কী করে আমাদের আবাসের কথা ভুলে যাব? দিনের পর দিন কেটেছে সেখানে, পাখির কলতানে সুর মিলিয়েছি, গভীর শোকে বিলাপ করেছি।’

জলে কানায় কানায় ভরে উঠল ওদের চোখ। ছেড়ে আসা আবাসের কথা মনে করতে করতে ওরা ফোঁপাতে লাগল। ধীরে ধীরে, বিনা সন্দেহে আর নিরাশায় ওরা মেনে নিল যে, ওদের থাকার সবটুকু জায়গা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।

‘হায় বন্ধুগণ, ধ্বংস হওয়াই ছিল ওই ঘরদোরগুলোর নিয়তি।’

‘কেন?’

 

২

তারপর গিলগামেশ  হাঁটু গেড়ে বললেন, ‘হে আমার সহযাত্রীরা, যদি তোমরা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে থাকো, তাহলে আমার ভাগ্যের প্রতি মনোযোগের সঙ্গে তাকাবে। লক্ষ করলে দেখতে পাবে কত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বুনো সাগর আমি পেরিয়ে এসেছি, কেননা আমি সেখানে পৌঁছতে চেয়েছি, যেখানে উতনাপিশতিম বিশ্রামে আছেন। আমি তার কাছে প্রার্থনাও করেছি: হে উতনাপিশতিম, আমি শুনেছি যারা অন্বেষণ করে, তারা ঠিকই আশীর্বাদপুষ্ট হয়; একটা দীর্ঘ যাত্রার পর পরিত্রাণ পায়। কিন্তু আমি, বহু বহু দিন খোঁজার পরও চরম পরিশ্রান্ত। আমার অনুসন্ধান কোনো আশীর্বাদ এনে দেয়নি, আমার যাত্রা কেবলই দিকশূন্য। কিন্তু আপনি এই স্বর্গের বাগানে বিশ্রাম করছেন।’

আমার কথা শেষ হলে উতনাপিশতিম চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, ‘হে দুর্ভাগা, আমি দেখতে পাচ্ছি দীর্ঘ ক্লান্তিকর ভ্রমণ আসলেই তোমাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে, ফলে তোমার হূদয়ে হতাশা জেঁকে বসেছে। তাই কিছুটা সময় এখানে বিশ্রাম নাও। এখন সাবধানে-মনোযোগের সঙ্গে আমার দুয়েকটা কথা শোনো। আমি তোমাকে বলছি কী করে আমি আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছি, আর কী করেই-বা মোক্ষলাভ করেছি। আমি আমার বাড়িটা ভেঙে ফেলে একটা নৌকা বানিয়েছিলাম।’

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম— মহাত্মন, কী বলছেন এসব! কেউ কি নিজ হাতে তার ঘরবাড়ি ধ্বংস করতে পারে!

বিষাদকণ্ঠে উতনাপিশতিম জবাব দিলেন— আমার প্রভুর যে তেমনই ইচ্ছা ছিল। একদিন তিনি আমার স্বপ্নে এসে বললেন যে, এনলিল ভীষণ রেগে আছেন। কেননা পৃথিবীতে খুব শোরগোল এবং এর ফলে তিনি ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না। সুতরাং, হে উতনাপিশতিম, তোমার নিজ ঘরদোর ধ্বংস করে দেয়ার মধ্যেই তোমার বাঁচামরা নির্ভর করছে। ফলে আমি তা-ই করলাম গিলগামেশ। আমি তা-ই করলাম, যা আমার প্রভু আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

 

৩

তারপর তাদের মনে পড়ল ঠিক কী ঘটেছিল। পৃথিবী তখন ভিড়ভাট্টায় একাকার, প্রত্যেক মানুষই হয়ে পড়েছিল একেকটা বদমাশ। স্রষ্টা প্রথম সৃষ্টি করেছিলেন পুরুষ, তারপর নারী। নারীদের দুর্নিবার সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে তাদের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলেন পুরুষরা। নারীরা একে একে কন্যাসন্তান জন্ম দিতে লাগলেন, পুরুষরা তাদের প্রেমেও মশগুল হলে সেই কন্যাদেরও স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করলেন। বেশ, এভাবেই পৃথিবী ক্রমে মানুষে-মানুষে ভরে উঠতে লাগল এবং সেই সঙ্গে শয়তানের আখড়া হয়ে উঠতে লাগল। পৃথিবীর এমন দশা দেখে স্রষ্টা এনলিলের হূদয় অনুতাপে ভরে গেল। দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে তিনি বললেন, আমি আদম আর তার সন্তান-সন্ততিদের যেমন সৃষ্টি করেছি, তেমনি তাদের ধ্বংসও করব। কারণ তারা পৃথিবীকে দূষিত করে ফেলেছে।

যা-ই হোক, সেখানে ওই বদমাশ মানুষের দলে একজন ধার্মিক মানুষও ছিলেন, যিনি স্রষ্টার সব আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে চেষ্টা করতেন। স্রষ্টা তাকে বললেন, ‘হে লামেছের পুত্র, একমাত্র তোমাকেই বাঁচিয়ে রাখতে চাই আমি। একটা নৌকা বানাও, তারপর যেদিন মুষলধারে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করবে, সেদিন জীবিত সমস্ত প্রাণীর নারী ও পুরুষের একজোড়া করে সেই নৌকায় তুলে নেবে।’ ধার্মিক লোকটি নির্দেশমতোই সব সমাধা করলেন।

নুহ ছিলেন বিবাহিত। তাদের ঘরে বেশ ক’জন পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। বয়স হলে পুত্রসন্তানরা বিয়েও করে। নুহ যখন নৌকা বানাতে শুরু করলেন, সেটা দেখে তার স্ত্রী ঠাট্টা-বিদ্রূপে মেতে উঠলেন। সন্তানদের ডেকে এনে বাবার কায়কারবার দেখিয়ে বললেন, ‘দেখ, তোদের পিতা এসব কী পাগলামি শুরু করেছে! দিন-রাত কী একটা আজগুবি জিনিস বানানোর জন্য কাঠ কাটছে আর ঠুকঠাক করছে।’

কিছুক্ষণ পর স্ত্রীর কটু বাক্যবাণে টিকতে না পেরে নুহ বললেন, ‘তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী, আমার জীবনের সহচর। ভয় পাও সেদিনটির জন্য, যেদিন তোমার এই তীব্র ক্রোধ কমে আসবে এবং তুমিই এসে আমাকে খবর দেবে সেই এগিয়ে আসা প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের কথা।’

 

৪

একদিন সকালে, মনু অবাক হয়ে দেখলেন চৌবাচ্চার মাছটা বাড়তে বাড়তে চৌবাচ্চার আয়তনটাকেই ছাড়িয়ে গেছে! অথচ গতকালই পুকুরে গোসল করতে গিয়ে তিনি এইটুকুন মাছটা ধরেছিলেন, তারপর কাপড়ে জড়িয়ে এনে চৌবাচ্চায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। অবশ্য মাছটা ধরার পর তিনি আবারো পুকুরে ছেড়েই দিতেন কিন্তু ছোট্ট মাছটার আকুতির জন্য সেটা হলো না, ‘প্রভু, শান্তি দিন। আমাকে আশ্রয় দিন। আমি একটা ছোট্ট মাছ আর পুকুরের বড় মাছেরা আমাকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায়, আমাকে খেয়ে ফেলতে চায়।’ ফলে মাছটার জায়গা হলো চৌবাচ্চায়।

মনুজি কিছুটা ধাতস্থ হয়ে মাছটাকে আগের চেয়ে বড় আরেকটা চৌবাচ্চায় থাকতে দিলেন। কিন্তু পরদিন ভোরে যখন প্রার্থনার জন্য ঘুম থেকে জেগে উঠলেন, চৌবাচ্চার দিকে চোখ পড়তেই হতভম্ব হয়ে গেলেন। মাছটা এতই বড় হয়ে গেছে যে, লেজটা চৌবাচ্চা উজিয়ে মাটি ছুঁই ছুঁই। এ-ও সম্ভব! দুদিন আগে যে মাছটা হাতের তালুতে এঁটে যেত, আজ তা কী করে এত বড় হয়ে গেল? মাছটা মনুজির প্রতি অনুনয় জানিয়ে বলল, ‘প্রভু, দয়া করুন। এই চৌবাচ্চাটায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমাকে আরো বড় কোনো জায়গায় রাখুন।’

বাড়ির কাছেই যে পুকুরটা ছিল, সেখানেই তাকে রেখে আসা মনস্থ করলেন মনুজি। ভাবনামতোই, মাছটাকে সেখানে রাখতে গেলেন খুশিমনে। কিন্তু পরদিন তার জন্য আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। কারণ মাছটা আকারে বেড়ে পুকুরের চেয়েও বড় হয়ে গেছে। মাছটি আরেকবার অনুনয় জানাল, ‘প্রভু, আপনি কথা দিয়েছিলেন যে আমাকে নিরাপদ আশ্রয় দেবেন কিন্তু আপনার আশ্রয়ে আমি স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছি না।’ এ কথা শোনার পর মনুজি মাছটিকে শহরের নিকটবর্তী হ্রদে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘এখানে, এইবার তুমি নিশ্চিন্তে সাঁতার কাটতে পারবে।’

মাছটিকে হ্রদে ছেড়ে দিয়ে নির্ভার মনে ঘরে ফিরলেন মনুজি। নির্ভার এজন্য যে, তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের কথা রাখতে পেরেছেন। সেই রাতে তিনি শান্তিতে ঘুমালেন।

যা-ই হোক, পরদিন সকালে চোখ খুলে প্রচণ্ড ধাক্কা খেলেন মনু। দেখলেন মাছটা এতটাই বড় হয়ে গেছে যে, তার লেজটা মনুর উঠানে এসে ঠেকেছে!  ত্রস্তে তিনি হ্রদের দিকে ছুটে গেলেন। হ্রদে পৌঁছে তার চোখ ছানাবড়া, হ্রদের পানিতে কেবল মাছটার মাথাই আঁটছে, আর বাকি শরীর বাইরে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। মাছটি অনুযোগের স্বরে বলল, ‘প্রভু, যেদিন থেকে আপনার আশ্রয় চেয়েছি, সেদিন থেকেই আমার বাঁচা মুশকিল হয়ে পড়েছে। আমি ঠিকমতো শ্বাসই নিতে পারছি না।’

মনুজি মাছটাকে কাঁধে তুলে নিয়ে গঙ্গার পথ ধরলেন। গঙ্গা নদীর পাড়ে পৌঁছে মাছটাকে পানিতে ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘নাও, এবার তোমাকে গঙ্গার কোলে ছেড়ে দিলাম। যদি পারো এখানেই থাকো, নয়তো নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নিও।’ কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগেই মাছটি আয়তনে বড় হতে লাগল। বড় হতে হতে গঙ্গার এপার-ওপার ছাড়িয়ে গেল মাছটি। হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে রইলেন মনুজি। বললেন, ‘তুমি এক অদ্ভুত মাছ! শুধু আকারে বাড়ছ। পৃথিবীর প্রতিটি জীবন্ত প্রাণীরই ধর্ম হলো, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা। কিন্তু তোমার ক্ষেত্রে সেই সূত্র কাজ করছে না। ঠিক আছে, এখন আর একটাই পথ খোলা আছে সামনে। তোমাকে সাগরে ছেড়ে আসব আমি।’

অগত্যা মাছটিকে কাঁধে তুলে নিয়ে সাগরের পথে পা বাড়ালেন তিনি। এগোতে এগোতে হঠাত্ই তার মনে পড়ল বহুকাল আগে শোনা একটা গল্পের কথা, ভগবান বিষ্ণু সেবার বামনের বেশে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন, পৃথিবীতে তখন এক অসুরের রাজত্ব। অসুর রাজাকে বামন বিষ্ণু প্রস্তাব দিলেন, তিন কদমে যে সবচেয়ে বেশি ভূমিতল অতিক্রম করতে পারবে, সে-ই হবে পৃথিবীর শাসক। বোকা অসুর রাজা বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই ভাবল যে, এক বামন আর তিন কদমে কত দূর যেতে পারবে! ফলে সে ভগবান বিষ্ণুর প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। রাজি হওয়ার পর পরই বিষ্ণু তার স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হলেন, হয়েই তিন কদমে তিনি স্বর্গ, মর্ত্য আর পাতাল ঢেকে দিলেন পদতলে।

ঘটনাটা মনে পড়তেই মনুজি সতর্ক হয়ে গেলেন। সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তিনি মাছটির দিকে তাকালেন, মনে মনে ভাবলেন, পৃথিবী পাপে তলিয়ে যাওয়ার সময় পৃথিবীকে বাঁচাতে ভগবান বিষ্ণুর আবির্ভাব হয়েছিল। এ পৃথিবীর তো এখন সে রকমই, তবে কি বিষ্ণুজি আবারো আবির্ভূত হতে পারেন না! নিশ্চয় পারেন, তিনি চাইলেই সব পাপিষ্ঠকে পিঁপড়ার মতো পিষে মারতে পারেন। নিজ ভাবনায় ডুবে থাকতে থাকতেই তিনি সাগরতীরে পৌঁছে গেলেন।

মাছটিকে সাগরে ঠেলে দিয়ে বললেন, ‘ব্যস, এইবার আমাকে মুক্তি দাও। যত ইচ্ছা তত বড় হয়ে যাও এবার। দয়া করে আমাকে আর জ্বালিও না।’ কিন্তু মুখ থেকে কথা সরার আগেই মাছটি বাড়তে লাগল। বাড়তে বাড়তে সাগর ছাপিয়ে যাওয়ার উপক্রম। এমন অভুতপূর্ব দৃশ্য দেখে আতঙ্কে কুঁকড়ে গেলেন মনুজি। তক্ষুনি গভীর শ্রদ্ধায় করজোড়ে আভূমি হলেন। চোখ বুজে প্রার্থনা জানালেন, ‘হে প্রভু, শান্তি দিন।’

তখন একটি দৈবকণ্ঠ শোনা গেল, ‘বত্স মনু, দুষ্ট লোকের কারণে এ পৃথিবীর নাভিশ্বাস উঠেছে। কিন্তু আমি তোমাকে এ বিপদের সময় সাহায্য করব। একটা নৌকা বানাও। যখন সমুদ্র ফুলে-ফেঁপে উঠবে, কূল ছাপিয়ে সমস্ত চরাচর ডুবিয়ে দেবে, তখন প্রত্যেক জীবিত প্রাণীর নারী-পুরুষের একেক জোড়া তোমার নৌকায় তুলে নিও।’

কথাটুকু শোনার পর মনুজি জানতে চাইলেন, ‘হে প্রভু, পৃথিবীতে যখন এমন বন্যা শুরু হবে তখন কি আমার বানানো নৌকা তাতে ভাসবে? ডুবে যাবে না তো!’

স্বর্গীয় কণ্ঠটি উত্তর দিল, ‘আমার লম্বা শুঙে যে চুলগুলো আছে, তাই দিয়ে বেঁধে নিও তোমার নৌকা।’ প্রত্যুত্তরে মনু বললেন, ‘আমি আপনার আজ্ঞাবহ। কিন্তু আমার তো কোনো রশি নেই, কিসের সঙ্গে বাঁধব?’ সঙ্গে সঙ্গেই একটা লম্বা সাপ সাগর থেকে ডাঙ্গায় উঠে এল। কণ্ঠটি বলল, ‘হে মনু, এই নাও তোমার রশি। তোমার নৌকা এ রশির সঙ্গে বেঁধো।’

 

৫

হঠাত্ পড়িমড়ি করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন নুহের স্ত্রী। আটা মাখা হাত, চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললেন, ‘প্রিয়তম শুনছো? ঘরের চুলাটা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, আগুনটা কোথায় যে গেল! তার ওপর চুলার নিচ থেকে পানিও উঠছে বুজবুজ করে।’ সঙ্গে সঙ্গেই নুহ বুঝতে পারলেন কী ঘটতে চলেছে, এ কিসের ইঙ্গিত। প্রভুর কথামতো এ দিনটির অপেক্ষাতেই ছিলেন নুহ। বললেন, ‘শোনো শেষ বিচারের দিন সমাগত প্রায়। তোমার সব সন্তানসন্ততিকে জড়ো করে সবাইকে নিয়ে নৌকায় ওঠো।’

প্রত্যুত্তরে স্ত্রী বললেন, ‘আমি ঘরে গিয়ে চুলার ওপর একটা আঁটো করে ঢাকনা দিয়ে দেব। তাহলেই আর পানি উপচে উঠতে পারবে না।’ এবং কথামতোই চুলা ঢেকে দিয়ে ঢাকনার ওপর বড় একটা পাথর দিয়ে দিলেন। তারপর পেছন ফিরে স্বামীকে বললেন, ‘দেখলে, আমার বুদ্ধি কাজে লেগেছে। এখন আর পানি বাইরে আসতে পারবে না।’ কিন্তু কথা শেষ না হওয়ার আগেই চুলার ভেতর থেকে প্রবল বেগে পানি বেরুতে লাগল। ঘর ভাসিয়ে, দরজা ভেঙে উঠান সয়লাব হয়ে গেল পানিতে, পানির তোড়ে ভেসে গেল ঢাকনার ওপর চাপানো পাথরটা।

আর ঠিক সে সময়েই প্রতিবেশী বাড়ি থেকেও চিত্কার করতে করতে দৌড়ে বেরিয়ে এলেন স্ত্রীটি, তার চোখে স্পষ্ট ভয়। আতঙ্কে অস্থির হয়ে বললেন, ‘আমার চুলা থেকে ঝরনার মতো পানি বেরোচ্ছে। ঘরদোর ভাসিয়ে দিল...’। এর পর পরই একযোগে প্রতিটি ঘর থেকেই শোনা গেল একই আর্তচিত্কার। এখন, এমন পরিস্থিতিতে আমরা সবাই স্বভাবতই পানির উত্স আটকানোর চেষ্টা করি। কিন্তু এমন প্রবল বেগে যে পানির ধারা বইতে শুরু করেছিল, তাকে বাধা দেয়ার কোনে উপায়ই কাজে লাগল না। আর শহরের সব চুলাতেই একযোগে এ অঘটনটি ঘটেছিল। সময়টাও ছিল দুপুরের খাবারের সময়, রান্নাবান্নার পাট তখন তুঙ্গে। রুটির খামির মাখা হচ্ছিল প্রায় ঘরেই। তার মধ্যেই এ দুর্যোগ। ঝমঝম বৃষ্টি শুরু হয়ে দুর্যোগটা আরো বাড়িয়ে দিল। এমনই বৃষ্টি, দেখে মনে হলো— আকাশের পর্দা ফুটো হয়ে গেছে।

নুহ বললেন, ‘শেষ বিচারের দিন এসে গেছে।’

তারপর তিনি নৌকার দিকে এগিয়ে গেলেন। জীবিত প্রাণীর একেক জোড়া তুলে নিলেন নৌকায়। স্ত্রীকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘বুঝতে পারছো, বিপর্যয় ঘনিয়ে এসেছে। ঢাকনার ওই পাথরটাকে তো দেখলে... পানির তোড়ে পাতার মতো ভেসে গেল। তোমার উঠানে পানি থইথই। এখনো সময় আছে, তোমার সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে নৌকায় উঠে এসো।’

স্ত্রী উত্তর দিলেন, ‘প্রিয় স্বামী, আমরা এ বাড়িতে ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাস করছি। সুখে-দুঃখে, তোমার নিশ্চয় মনে আছে। এ বাড়িতেই আমার এতগুলো সন্তান জন্মাল, আমার বুকের দুধ পান করে বড়ও হয়ে গেল। তাদের সন্তান হলো, আমি নানি-দাদি-বড়মা হলাম এ বাড়িতেই। ওদের সঙ্গে হেসেছি-খেলেছি। বলো তো, কেন আমি এ বাড়ি ছেড়ে যাব?’

নুহ উত্তর দিলেন, ‘হে আমার সারথি, এ বাড়ি খুব সহসাই ভেঙে যাবে, তোমার সহায় হয়ে থাকতে পারবে না। আদমের ভিতে তৈরি এ মানবসমাজও আজ নড়বড়ে। এ আমারই দুর্ভাগ্য ছিল যে, এমন পাপিষ্ঠদের মাঝে আমার সংসার পেতেছিলাম। তাই আমার প্রভুর ইচ্ছাতেই এ ঘরবাড়ি আজ ধ্বংস হবে। এ বাড়ির ছাদ-কড়ি-বর্গা খসে পড়ে, বাড়িটি কবর হয়ে পড়ার আগেই এখান থেকে চলে এসো। আজ থেকে আকাশ আর পাতালের মাঝখানে এ নৌকাই তোমার আশ্রয়।’

কিন্তু নুহের স্ত্রী গোঁয়ারের মতো বলেই চললেন, ‘যদি আমার নিজের ঘরই আমাকে রক্ষা করতে না পারে, তাহলে আর কোথায় গিয়ে রক্ষা পাব?’

নুহ এবার তার সন্তানদের দিকে মনোনিবেশ করলেন। ডেকে বললেন, ‘আমার সন্তানেরা, তোমাদের মা এখানে থাকটাই সাব্যস্ত করছে এবং বিপদগ্রস্তদের দলে শামিল রয়েছে। আমার কথা শোনো, মৃত্যুমুখে পতিত অবিশ্বাসীদের কথায় কান না দিয়ে এখনই নৌকায় ওঠো।’

এ কথায় সব সন্তানই রাজি হলো, কেবল বেঁকে বসল সবচেয়ে বড় ছেলেটি। বড় ছেলে কানান মায়ের সঙ্গে থাকাটাই স্থির করল। বলল, ‘হে আমার পিতা, যে জায়গায় আমার নাড়ি পোঁতা আছে, সেই জায়গা আমি কখনই ত্যাগ করব না। এত দিন যে মাটি আমাকে আশ্রয় দিয়ে এসেছে, আমি কীভাবে তাকে পরিত্যাগ করে ওই নৌকায় চাপি, যে নৌকায় মানুষের সঙ্গে একপাল পশু-পাখিও রয়েছে?’ ছেলের এমন প্রশ্ন শুনে নুহ উত্তর দিলেন, ‘পুত্র শোনো, অন্তিম দিন ঘনিয়ে এসেছে। তার জন্যই জীবিত নারী-পুরুষ, সেই সঙ্গে পশু-পাখিদেরও স্থান হয়েছে নৌকায়। এ ঝড়-ঝঞ্ঝায় প্রাণ বাঁচানোর জন্য এর চেয়ে নিরাপদ কোনো স্থান পৃথিবীতে টিকে নেই।’ কিন্তু সন্তানের একই উত্তর, ‘নোংরা-গিজগিজে জায়গায় বাঁচার চেয়ে একা একা মরে যাওয়াই ভালো। প্রয়োজনে এ ঘরেই আমি ডুবে মরব, তবু একপাল পশুর সঙ্গে এক নৌকায় উঠব না।’

প্রচণ্ড দুঃখে পাথর হয়ে গেলেন নুহ। হায়! তার স্ত্রী এবং বড় ছেলে পাপিষ্ঠদের অনুগামী হয়ে পড়েছে।

নৌকা ভাসালেন নুহ। দুঃখ ভারাক্রান্ত হূদয়ে শেষবারের মতোন বিদায় জানালেন ৬০০ বছর ধরে বাস করে আসা প্রিয় আবাসকে।  পিতা-প্রপিতামহের বানানো বড় ফটকঅলা শান্তির নীড়। যে নীড় গতকালও ছিল মুখরতায় বাঙ্ময় আর আজ তা বাড়তে থাকা পানির তোড়ে পড়ো পড়ো। দেখতে পেলেন তার স্ত্রী আর বড় ছেলে ছাদে আশ্রয় নিয়েছে। একটু পর দৃষ্টিসীমা থেকে মুছে যেতে লাগল ডাঙা, পানি ক্রমে বাড়ছে।

এত অঝোরে বৃষ্টি ঝরছিল, যেন আকাশের সব কয়টা দরজা খুলে দেয়া হয়েছে। রাত নেই, দিন নেই, দিনের পর দিন। একটানা বৃষ্টি ঝরার ফলে রাত আর দিন, সকাল আর সন্ধ্যা, দিন থেকে দিনের ভেদ ঘুচে গেল। দৃষ্টিসীমায় কেবল পানি আর পানি, পৃথিবীর আর কিছুই নজরে পড়ল না, যেন পানি ছাড়া আর কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না দুনিয়াজুড়ে।

একদিন যা হওয়ার তা-ই হলো, একটা কাক নৌকায় বসে থাকতে থাকতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে জানালা গলিয়ে বাইরে উড়াল দিল। কিন্তু একপাক উড়েই নৌকায় ফিরে এসে নিশ্চিত করল যে, পা রাখার মতো এক টুকরো জমিও শুকনো নেই পৃথিবীতে। এর কিছুক্ষণ পর নৌকার ইঁদুর জোড়াটি অস্থির হয়ে পড়ল। নৌকা ছেড়ে পালানোর জন্য একটা ফুটো খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে উঠল। না পেয়ে শেষে নৌকার পাটাতনেই ছিদ্র করতে শুরু করল। নৌকার অন্য প্রাণীরা বিষয়টি আঁচ করতে পেরে আতঙ্কিত হলো। ছোট্ট একটা ফুটোই এ নৌকা এবং নৌকায় থাকা পৃথিবীর শেষ জীবিত প্রাণীদের ডুবিয়ে দিতে সক্ষম। 

তক্ষুনি নুহের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইঁদুর জোড়াকে নিবৃত করার আবেদন জানাল সবাই। বিষয়টা নুহের মনে আক্ষেপের জন্ম দিল। তিনি বললেন, ‘এ নৌকায় ওদের তুলে নেয়ার জন্য আমি দুঃখিত। ওরা ওদের প্রকৃতিপ্রদত্ত স্বভাবের বিরুদ্ধে যেতে পারে না, ওদের ধর্মই হলো আঁচড় কাটা আর গর্ত তৈরি করা।’ তারপর নুহ ইঁদুর জোড়াকে নিজেদের প্রবৃত্তি বশে রাখার আদেশ করলেন। কিন্তু নুহের আদেশ সরাসরি অমান্য করল ওরা। ফলে তিনি নৌকায় থাকা বিড়ালটির দিকে তর্জনী তুললেন। সঙ্গে সঙ্গে বাধ্যগতের মতো এক থাবায় অবাধ্য ইঁদুর দুটোকে পাকড়াও করে নিল বিড়ালটি। বিড়ালটির এ কর্মকাণ্ডে সবাই খুশিমনে তাকে ধন্যবাদ জানাল।

এর কিছুক্ষণ পর নৌকায় থাকা পায়রাটাও উড়াল দিল নৌকা ছেড়ে। কিন্তু পায়রাটি সহসাই ফিরে এল পিঠে একটা জলপাইয়ের পাতা নিয়ে। সমবেত সবাই বুঝতে পারল পানি কমতে শুরু করেছে, আর ডাঙাও খুব দূরে নয়। কিন্তু তাদের এ সুখচিন্তা চট করেই দুরাশায় পরিণত হলো, কারণ পায়রাটিকে আচমকাই তার থাবায় টেনে নিল বিড়ালটি। খুবই বিশ্রী একটা ব্যাপার ঘটল।

‘কী করে এ কাজ করল হতচ্ছাড়াটা?’ হতভম্ব হয়ে ওরা বলাবলি করতে লাগল। ‘তাই বলে জলপাইয়ের পাতাটাও খাবে! এখন কী করে বুঝব শুকনো ডাঙা কোথায়, কত দূরে? আবারো আমরা অথই সাগরে পড়লাম।’

নৌকার ভেতরে একটা থমথমে আর গুমোট বাতাবরণের সৃষ্টি হলো। যদিও নৌকার এক কোনায় বসে বিড়ালটি তখন আয়েশে ঝিমোচ্ছে।

 

৬

বাইরে বন্যার ঢল তখনো উন্মত্ত। ঝাপসা অন্ধকারে, আকাশ আর পানির মধ্যকার ব্যবধান যেন ঘুচে গেছে। কবে বাড়ি ছেড়েছে, কত দিন ধরে ভাসছে, এসবের পূর্বাপর উদ্ধত পানির তোড়ে সব ভুলে গেছে ওরা।

‘আমরা কি আর কখনো ফিরতে পারব?’

‘কোথায়?’

‘কেন! বাড়িতে?’

‘আমাদের বাড়ি!’

‘কিসের বাড়ি? বাইরে তাকাও, কোনো শুকনো জমি, ঘরবাড়ি নজরে পড়ছে? গিলগামেশ কি বলেনি যে, উতনাপিশতিমের আদেশেই সে ঘরবাড়ি ছেড়ে এ নৌকা বানিয়েছে?’

‘উতনাপিশতিম কাজটা ঠিক করেননি।’

‘হয়তো কিন্তু গিলগামেশ তার প্রভুর কথাটুকু অন্তত রেখেছে।’

‘হুম, আর তার প্রভুর ঘুম যে ভাঙবে— এমন কোনো টুঁ শব্দও নেই কোথায়। চারদিকে কেবলই মৌনতা।’

 

৭

জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল মার্কণ্ড। চরাচর অন্ধকারে ঢাকা। অন্ধকার আর পানির একটানা গর্জন। পানির ওপর অনন্তনাগের প্রসারিত ফনা। একেকবার ফনা তুলছে আর ফিসফিস করে বলছে, ‘নারায়ণ, নারায়ণ।’

জমাট অন্ধকারে পানির ওপর স্রষ্টার অলৌকিকতা ছড়িয়ে রয়েছে, এই কূল-কিনারাহীন পানির ঢল। বুনো, গর্জানো আর আদি-অন্তহীন পানি, স্থান-কালের কোনো চিহ্ন নেই কোথাও।

৮

অথই পানিতে ভাসমান পাতার মতো, ওরা ভুলেই গেছে কত দিন ধরে ওরা ভাসছে।

নৌকার কাকটা আবারো অধৈর্য হয়ে গেল। পাখা ঝাপটিয়ে ফের নৌকার বাইরে উড়াল দিল, তারপর আর ফিরল না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল কেউ কেউ। বৃষ্টি থেমে গেছে যদিও, পানির গর্জন কমেনি তাতে। একটানা গর্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ কানে বাজছে না। কাকটার কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গেল না।

‘কাক বুদ্ধিমান পাখি। ওটা আর ফিরবে না।’

‘যাক, তবুও বোঝা গেল কাছে ধারে কোথাও শুকনো মাটি আছে। আমাদের নৌকাটাকেও তীরে ভেড়াতে হবে। প্রভু, আমাদের সেই ভূমির দিকে নিয়ে চলো, যেখানে তোমার অনুগ্রহে আমরা নতুন জীবন শুরু করতে পারি।’

‘হে আমার সহযাত্রীগণ, তোমরা কি মনে করছ যে পৃথিবীতে এখনো আশীর্বাদপুষ্ট জমি টিকে আছে? আমরা আছি অকূল সমুদ্রে আর আমাদের পথ দেখানোর মতনও কেউ নেই। যদি নুহ এখানে থাকত তাহলে... ’ 

‘নুহ?’

‘নুহ আর এখানে নেই?’

‘না!’

ওরা একে অন্যের দিকে তাকাল। প্রত্যেকের চোখে ভয়। সবাই সবার কাছে জানতে চাইছে, ‘নুহ কোথায়?’

 

৯

তারপর হাতেমতাই কথা ক’টি আওড়ালেন, ‘হে আমার প্রিয় সহযাত্রীগণ, হে মহাত্মারা, ভেঙে পড়ো না। শান্ত থাকো, ধৈর্য ধরো। এ পৃথিবীর ভাগ্যে প্রভু কী লিখে রেখেছেন, সেটা জানার জন্য অপেক্ষা করো। আমাকেই দেখো না, আমি তো কতশত উন্মত্ত নদী পেরিয়ে এসেছি এক হালবিহীন নৌকায় করে।’

“কোহেনাজা পর্বত খুঁজতে গিয়ে একবার আমার কী দশা হয়েছিল, সেটা মন দিয়ে শোনো। নিজের ভাবনায় ডুবে থাকতে থাকতে অন্যমনস্ক হয়ে আমি হাঁটছিলাম পথে পথে, হঠাত্ই সামনে-দূরে দেখতে পেলাম এক সুন্দর-সুউচ্চ পর্বত। ভাবলাম ওটায় চড়তে হবে। টানা তিনদিন-তিনরাত হেঁটে ওই পর্বতের পাদদেশে পৌঁছলাম। ওই পাদদেশ থেকে যেই না একটা পাথরখণ্ড হাতে নিলাম, সঙ্গে সঙ্গেই পাথরটি যেখানে ছিল, সেখান থেকে রক্তের ঝরনা বইতে শুরু করল। আমি পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে আশপাশে জনমানুষ খুঁজলাম, যে কিনা এমন রহস্যের হাল করতে পারবে, কিন্তু কাউকেই পেলাম না।

চারপাশে ভালো করে তাকাতেই দেখলাম, কাছেই একটা বিশাল নদী প্রবহমান। কিন্তু নদীতে পানি দুকূল ছাপানো, ওপাড় দেখা যাচ্ছে না। মনে মনে ভাবলাম— হে প্রভু, এ নদী আমি কী করে পার হব! পরক্ষণেই আমাকে অবাক করে দিয়ে একটা নৌকাকে এদিকেই আসতে দেখলাম। মনে হলো, কোনো মাঝি দয়াপরবশ হয়েই আমাকে সাহায্য করতে এসেছেন। কিন্তু না! আমার কাছাকাছি আসার পর লক্ষ করলাম নৌকায় কোনো মাঝি নেই। পুরোই হতবুদ্ধি আমি, কী করে সম্ভব? প্রভুর নাম নিয়ে নৌকায় উঠে পড়লাম। উঠেই দেখি নৌকার এক কোনায় একটা পুঁটলিমতন, খাবারেরই মনে হলো। আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম বটেই, পড়িমড়ি করে পুঁটলিটা খুলতেই দেখি, গরম গরম দুটি নান রুটি আর কাবাব। আমার অবাক হওয়ারও আর শক্তি ছিল না। তবু মনে মনে প্রভুকে স্মরণ করলাম, ‘হে মহামহিম, কোথায় এমন তন্দুর-চুলা যেখান থেকে এমন টাটকা গরম নান সেঁকা হয়ে এল?’ তার পরই মনে হলো, এ নিশ্চয় নৌকার মাঝির জন্য রাখা খাবার। এ খাবারে আমার কোনো অধিকার নেই। ভাবনার মাঝপথেই নদী থেকে একটা মাছ মাথা উজিয়ে বলল, ‘ওহে হাতেমতাই, এই নান আর কাবাব তোমার ভাগেরই। মনে কোনো দ্বিধা না রেখে খাবারটা খেয়ে নাও।’ তারপর মাছটা আবারো ডুব দিল নদীতে। আমি বসে বসে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগলাম। নদীতে নৌকাটা এল কী করে, খাবারইবা রাখল কে, মাছটাইবা কে ছিল?”

 

১০

মাছ! সমবেত সবারই মনে পড়ল একটা প্রকাণ্ড মাছের কথা। ইত্যবসরে ওরা ভুলেই গিয়েছিল সেটা। মনুজি প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও পরে মাছের লম্বা শুঙে বেঁধে নিয়েছিলেন নৌকাটি।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল সবাই। বাইরে তখনো অন্ধকার, বন্যার পানি তখনো উদ্ধতস্বরে, দিগ্ভ্রান্ত ওরা। যা-ই হোক, ওরা মাছের কোনো হদিস পেল না।

‘আমরা মাছটাকে দেখতে পাচ্ছি না।’

‘ভালো করে চোখ রাখো। ওটার এটা শুঙে আমাদের নৌকাটা বাঁধতে হবে।’

চোখ কুঁচকে, কখনোবা পিটপিট করে অন্ধকারে ওরা মাছটি খুঁজতে লাগল। কিন্তু মাছের দেখা না পেলেও নৌকার সমান্তরালে একটা দড়ি ভাসতে দেখল।

‘যাক বন্ধুরা, অন্তত একটা দড়ির দেখা তো পাওয়া গেল!’

‘সে ঠিক আছে। কিন্তু মাছটার দেখা না পেলে তো মুশকিলের কথা।’

সন্দেহের দোলাচালে বিদ্ধ হতে লাগল নৌকার সব সওয়ারি। পুরো গল্পটা আবারো একবার ঝালিয়ে নিতে লাগল সবাই, যা যা ঘটেছে, আদ্যোপান্ত; কিন্তু রহস্যের কিনারা করতে পারল না।

নৌকাটা ভেসেই চলল। অন্ধকারে ডুবে আছে গোটা পৃথিবী, কানে বাজছে কেবলই ঢলের একটানা গর্জন।