মহাভারতের কথা অমৃত সমান, শুনে পুণ্যবান— এই অমৃত কথা মুখে মুখে বলছেন মহাকবি বেদব্যাস, আর সেই কাহিনী শুনে নিয়ে ঝড়ের বেগে লিখে চলেছেন সিদ্ধিদাতা গণেশ। আদি কবি বাল্মিকীর রামায়ণ লিখতে কোনো শ্রুতিলেখক বা গণেশের সাহায্য নিতে হয়নি। কিন্তু প্রতিভাবান বেদব্যাসের মহাভারত লিখতে গণেশের মতো সুদক্ষ শ্রুতিলিপিকারের কেন যে প্রয়োজন হয়েছিল, তা বলা মুশকিল।

গণেশ কলম হাতে নেয়ার সময় বেদব্যাসকে একটি শর্ত দিলেন। তিনি অবিরাম দ্রুত লিখে যাবেন; গ্রন্থ শেষ না হওয়া পর্যন্ত লেখনীতে বিরাম দেবেন না। অর্থাত্ ব্যাসকে কাহিনী অবিরাম বলে যেতে হবে। একটু ভেবে গণেশের শর্ত মেনে নিলেন বেদব্যাস। কিন্তু তিনিও গণেশকে পাল্টা একটি শর্ত জুড়ে দিলেন— গণেশ যেন তার কাব্যের একটি বাক্যও পুরোপুরি না বুঝে কখনো না লেখেন। নিজের বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে গণেশের কোনো সংশয় ছিল না, তাই বিনা বাক্য ব্যয়ে শর্ত মেনে নিলেন। ঝড়ের গতিতে লেখা এগিয়ে চলে। ব্যাস যাতে একটু সময় হাতে পেয়ে কাব্যের পরবর্তী অধ্যায় কী হবে বা কোন কোন চরিত্র আগামী পর্বে হাজির করা হবে, তা স্থির করে কাহিনী সাজাতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে কাহিনী বলার ফাঁকে ফাঁকে জটিল এবং আপাত দুর্বোধ্য কিছু উপমা ও প্রসঙ্গ ঢুকিয়ে দিলেন। পুরোপুরি না বুঝে কিছু লিখবেন না— এমন প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ গণেশের লেখা এবার মুখ থুবড়ে পড়ল। অনেকক্ষণ চিন্তা-ভাবনার পর এ কূট প্রসঙ্গগুলোর মর্মার্থ উদ্ধার হলেই আবার তার কলম সচল হয়ে ওঠে। এ অবসরে ব্যাস তার কাহিনীর বিন্যাস এবং পরবর্তী অধ্যায় মনে মনে স্থির করে ফেলার সুযোগ পেলেন। সাহিত্যের পরিভাষায় এই কূট প্রশ্নগুলোর সন্দেহ নিরসন ‘ব্যাসকূট’ নামে আজো বিখ্যাত হয়ে রয়েছে।

উপরের প্রসঙ্গটি এত বিস্তারিত উল্লেখ করার একটি কারণ আছে। ‘ব্যাসকূট’ শুধু প্রথম শ্রুতিলিপিকার গণেশকেই নয়, বহুকাল পরেও তার উত্তরসূরি ‘গণেশ’দের অর্থাত্ পরবর্তী অনুবাদকের শ্রুতিলিপিকারদেরও যথেষ্ট ঝামেলায় ফেলেছিল। উনিশ শতকে ইংরেজের গড়া কলকাতা শহরে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সৃষ্ট এক আলালের ঘরের দুলাল কালীপ্রসন্ন সিংহ তার সহকারী পণ্ডিত/শ্রুতিলিপিকারদের নিয়ে যখন মহাভারতের পূর্ণাঙ্গ বাংলা রূপান্তরে হাত দেন, তখনো তাদের ব্যাসকূটের মতো প্রচণ্ড ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়েছিল বলে স্বয়ং কালীপ্রসন্ন সিংহ তার অষ্টাদশ পর্ব বাংলা মহাভারতের উপসংহারে স্বীকার করে গেছেন।

তবে এ কাহিনীটির উপজীব্য বিষয় মহাভারতের অনুবাদ কাহিনী নয়— এ মহাগ্রন্থের অনুবাদক ও তার সঙ্গীদের বিশেষ করে ‘গণেশ’দের সম্পর্কে আলোকপাত করাই মূল উদ্দেশ্য। অনুবাদক কালীপ্রসন্ন সিংহ কলকাতার হিন্দু কলেজের ইংরেজিপড়ুয়া ছাত্র। মেধাবী কিন্তু প্রথম কাতারের ছাত্র নন। ইংরেজিতে দক্ষ হয়েও তিনি ডিরোজিওর ইয়ং বেঙ্গলের সদস্য হননি। ধনীর দুলাল এই মেধাবী তরুণ সভা-সমিতি, সামাজিক ক্রিয়াকাণ্ড এবং লেখার মাধ্যমে সমাজের ভণ্ডামিকে জনসমক্ষে নিয়ে এসে তরুণ বয়সেই সমাজে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। তবে কিছুটা অস্থিরমতি এ যুবক তার ইচ্ছে ফড়িংকে খেয়াল-খুশিমতো লাফিয়ে চলতে বাধাও দেন না। সুলতানি যুগের হোসেন শাহী আমলে ছুটি খান ও পরাগণ খানের উদ্যোগে চট্টগ্রামে মহাভারতের প্রথম বাংলা অনুবাদ হয়েছিল। তবে সে মহাভারত পূর্ণাঙ্গ ছিল না, ছিল খণ্ডিত। তাই কালীপ্রসন্নের মনে হচ্ছিল মহাভারতের পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদের অনুপস্থিতি বাংলার শিক্ষিত সমাজে একটি বড় অভাব হয়ে বিরাজ করছে। দেবভাষা সংস্কৃত থেকে মহাভারতের বাংলা অনুবাদ, ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ইংরেজ রাজত্বের হিন্দু সমাজে অমার্জনীয় অপরাধ বলে গণ্য হয় না এখন। তাছাড়া ঈশ্বরচন্দ্রের প্রতিভার ছোঁয়ায় বাংলা গদ্যের শক্ত গোড়াপত্তন এরই মধ্যে হয়ে গেছে। বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে যথেষ্ট সাবালক করে তুলেছেন। তাই বাংলা গদ্যে সহজ ভঙ্গিতে মহাভারতের রূপান্তরের এখনই যথোপযোগী কাল। কালীপ্রসন্ন মহাভারত অনুবাদের ইচ্ছা বিদ্যাসাগরের কাছে গিয়ে নিবেদন করলেন। কালীপ্রসন্নের প্রচেষ্টার আন্তরিকতায় বিদ্যাসাগরের আস্থা জন্মালেও তিনি সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইংরেজিপড়ুয়া হিন্দু কলেজের এই প্রাক্তন ছাত্রটির সংস্কৃতজ্ঞান গভীর নয়; তার বাংলা গদ্য সাবলীল, অলঙ্কারময় হলেও সংস্কৃতবিদ্যার ঘাটতি দিয়ে মহাভারতের সব শ্লোকের অর্থ হূদয়ঙ্গম করা দুঃসাধ্য হবে। কালীপ্রসন্নকে কয়েকজন খ্যাতনামা সংস্কৃত পণ্ডিতের সাহায্য নিতে পরামর্শ দিলেন। শুধু এই নয়, নিজেই তাদের নির্বাচন করে কালীপ্রসন্নর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সঙ্গে একটি উপদেশও দিয়েছিলেন— পণ্ডিতদের শ্লোকের সরল অর্থ ও ব্যাখ্যাই যেন কালীপ্রসন্ন তার নিজস্ব গদ্যে নিজের শৈলীতে বাংলায় রূপান্তর করেন, পণ্ডিতদের সংস্কৃতবহুল বাংলা এবং তত্সম কণ্টকিত বাংলা যত দূর সম্ভব পরিহার করাই সঙ্গত হবে। কালীপ্রসন্ন তার স্থাপিত ‘বিদ্যোত্সাহিনী’ সভায় মহাভারতের অনুবাদে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

&dquote;গনেশ

সমসময়ের অনেকেই তার এ উদ্যোগকে নেহাতই ধনীর দুলালের আর ১০টা খেয়ালের মতো আরেকটি স্বল্পায়ু খেয়াল হিসেবে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখলেন। অনেক দুর্মুখ আবার তার ‘বিদ্যোত্সাহিনী’ সভাকে ব্যঙ্গ করে নাম দিয়েছিলেন ‘মদোত্সাহিনী’ সভা।

এবং তারা মনে করত: ব্যয়বহুল এ পরিকল্পনার খরচ মেটাতে কালীপ্রসন্নর জমিদারির ‘গণেশ উল্টাতে’ বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু এসব সমালোচনা গায়ে না মেখে কালীপ্রসন্ন মহাভারত দীর্ঘ আট বছর ধরে অনুবাদ শেষে ছাপিয়ে বের করতে সক্ষম হলেন। প্রথম খণ্ড ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে এবং শেষ খণ্ড অর্থাত্ ১৮তম খণ্ডটি ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।

অষ্টাদশ পর্ব অনুবাদের উপসংহারে অনুবাদক জানাচ্ছেন যে, সাতজন কৃতবিদ্য সদস্যকে নিয়ে তিনি সংস্কৃত মহাভারত বাংলা ভাষায় রূপান্তরে হাত দেন। যে সাতজনের কথা বলেছেন, তাদের নাম পৃথকভাবে উল্লেখ করেননি তিনি। তবে ‘রঘুবংশে’র বাংলা অনুবাদক চন্দ্রকান্ত তর্কভূষণ, কালীপ্রসন্ন তর্করত্ন, বিদ্যাসাগরের পরমাত্মীয় শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় প্রমূখ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছেন যে, তারা সবাই অনুবাদ শেষ করার আগেই ইহলোক ত্যাগ করেন। শেষ পর্যন্ত যাদের সাহায্যে তিনি এ কর্মযজ্ঞ শেষ করেন, তারা হলেন— অভয়চরণ তর্কালঙ্কার, কৃষধন বিদ্যারত্ন, রামসেবক বিদ্যালঙ্কার, হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন— ‘এই সমস্ত কর্ণধারদিগের কৃপাবলেই আমি অনায়াসে মহাভারতস্বরূপ সমুদ্রের পারাপার প্রাপ্ত হইয়া কৃতার্থ হইলাম’— লিখেছেন কালীপ্রসন্ন তার মহাভারতের উপসংহারে।

পণ্ডিতরা কীভাবে কালীপ্রসন্নকে সাহায্য করেছিলেন, এ প্রশ্ন অবশ্যই উঠতে পারে। তার মহাভারতের আকার বিশাল। এই বিশাল গ্রন্থের কোন কোন অংশ নিজ হাতে লিখেছিলেন? তার পক্ষে এত দীর্ঘ এ গ্রন্থ নিজ হাতে লেখাও সম্ভব নয়। পণ্ডিতদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো শ্রুতিলেখনেরও কাজ করেছিলেন। অর্থাত্ গণেশের ভূমিকায় শ্রম দিয়েছিলেন। তারা কারা? এত দীর্ঘদিন পর এ প্রশ্নের সদুত্তর দেয়া সম্ভব নয়। গবেষকদের ধারণা, কয়েকজন পণ্ডিত মূল সংস্কৃত শ্লোকগুলোর আক্ষরিক বাংলা তরজমা করে দেন। পরে কয়েকজন সেগুলো সাজিয়ে দেন বাংলা গদ্যে, কালীপ্রসন্ন সেগুলো ঘষে-মেজে দিলে পণ্ডিতরা শ্রুতিলিপিকার হিসেবে তা লিখে নিয়েছেন। মূলের গাম্ভীর্য রক্ষা করার দিকে কালীপ্রসন্নের বরাবরই সতর্ক নজর ছিল, সঙ্গে সুবোধ্য এবং সাবলীল ভাষা সৃষ্টির কৌশলও যেন ছিল তার হাতের মুঠোয়। দু-চারটি শব্দ পাল্টে দিয়ে বা কোথাও ক্রিয়াপদের স্থান পরিবর্তন করে নতুন রূপ দিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তিনি যে সম্পূর্ণ গ্রন্থটি যত্নের সঙ্গে সম্পাদনা ও পরিমার্জন করেছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নিজেই স্বীকার করেছেন যে, অনুবাদকালে ‘ব্যাসকূটে’র সন্দেহ নিরসন করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে আরো একটি তথ্য গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন, যে কয়জন পণ্ডিতের নাম কালীপ্রসন্নের অষ্টাদশ পর্বের উপসংহারে উল্লিখিত হয়েছে, সেসব নাম দু-তিন সংস্করণের পর আর বইয়ে দেখা যায়নি। বাংলাদেশে সাহিত্য সৃষ্টিতে সর্বপ্রথম কালীপ্রসন্নই গণেশের সাহায্য নিয়েছিলেন— এমনটি অনুমান করা অসঙ্গত না-ও হতে পারে।

 

।। দুই।।

 

কলি যুগে বাংলা

সাহিত্য সৃষ্টিতে গণেশদের ব্যবহারে মাইকেল মধুসূদন দত্ত সবচেয়ে বেশি সার্থক বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না। তার অনুলেখক বা গণেশ নিয়োগের বহুল প্রচার এবং নাটকীয় আড়ম্বর নিজের চমকপ্রদ জীবনচর্চার যেন এক প্রতিফলন। এমনকি তার মৃত্যুর বহুদিন পরও তার কাব্য নির্মাণের প্রচেষ্টায় যেন মহাভারতীয় যুগের বেদব্যাস আর গণেশের রোমাঞ্চকর স্মৃতি বাঙালি মনে রেখেছে। মাদ্রাজ প্রত্যাগত মধুসূদন কলকাতা এসে হতাশায় ভুগছিলেন। তার মতো তুখোড় ইংরেজি শিক্ষিত বিদ্যান মানুষের পুলিশ কোর্টের সামান্য দোভাষীর চাকরিতে কী করে সন্তুষ্টি হবে? কবি যশপ্রার্থী মধুসূদনের কাব্যলক্ষ্মীর বরপুত্র হওয়ার স্বপ্ন যেন অধরাই রয়ে গেল। হতাশার আরো একটি কারণ, প্রশংসাভিক্ষু মধুর সেই অনুরাগী বন্ধুরাও আর তেমন খোঁজ নেন না। তবে এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে বেশি দিন লাগল না তার। মধুসূদনের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে পাইকপাড়ার রাজারা তার গুণগ্রাহী হয়ে উঠলেন। ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক রচনার পর তার ভাগ্য ঝলসে ওঠে। ‘তিলোত্তমাসম্ভব’ কাব্যে অমিত্রাক্ষরের সফল প্রয়োগে এবং এর ছন্দের ঝঙ্কারে বঙ্গসমাজ হলো চমত্কৃত ও উদ্বেলিত। মধু এখন কলকাতার সুধী সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সৃষ্টির উল্লাসে উজ্জীবিত। একের পর এক কাব্য রচনায় ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। এমনকি দুটি সার্থক বাংলা প্রহসন লিখেও হইচই ফেলে দিলেন। পঞ্চাশের গোড়ার দিকে আমাদের মিশনারি প্রাইমারি স্কুলের উদ্যোগে মাইকেলের জীবনী নিয়ে তৈরি একটি ছায়াছবি সিনেমা হলের ম্যাটিনিশোতে দেখানোর ব্যবস্থা হয়েছিল। এখনো মনে আছে সেই ছায়াছবির একটি দৃশ্যের কথা, যেখানে কয়েকজন পণ্ডিত খাতাপত্র নিয়ে নিচু ডেস্কের সামনে বসে রয়েছেন আর সাহেবি পোশাক পরা মধু তার বাজখাই গলায় একেক পণ্ডিতের সামনে তার একেক কাব্যের লাইন আওড়ে যাচ্ছেন, পণ্ডিতরা পালা করে সেই মধুকথা দ্রুত লিখে নিচ্ছেন। পুরো ব্যাপারটাই যেন একটি রোমাঞ্চকর পৌরাণিক দৃশ্যের রিপ্লে।

 

মধুজীবনীকার গবেষক গোলাম মুরশিদ তার ‘আশার ছলনে ভুলি’ গ্রন্থে এই পণ্ডিত অনুলেখক বা গণেশদের কাহিনী উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘তার এই সৃষ্টিযজ্ঞের সময়ে তিনি কখনো কখনো মুখে মুখে বলে যেতেন আর তার পণ্ডিতরা লিখে নিতেন। এর কারণ ছিল ভিন্ন।’— গোলাম মুরশিদ কারণটি আর প্রকাশ করেননি; উহ্যই রেখেছেন তার লেখায়। অনেকের ধারণা, মধু প্রখ্যাত কালীপ্রসন্ন সিংহের দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন হয়তো।

এসব পণ্ডিতের নাম বা পরিচয় এখনো কোথাও খুঁজে পাইনি। গোলাম মুরশিদও এদের নাম উল্লেখ করেননি। ‘মায়াকানন’ লেখার সময় সামান্যতম শারীরিক শক্তিটুকুও অবশিষ্ট ছিল না, সেজন্য ডিকটেশন দিয়ে লেখাতে হয়েছে ‘মায়াকানন’। এ অনুলেখক পণ্ডিত কে ছিলেন, তার খোঁজ পাওয়া যায় না— মন্তব্য করেছেন গোলাম মুরশিদ। তবে সংবাদ প্রভাকরের সম্পাদক ভুবন চন্দ্র মুখোপাধ্যায় বিশেষ পরিশ্রম করে এর আদ্যোপান্ত দেখে দিয়েছিলেন, বানান এবং নাটকের সমাপ্তিও বদলে দিয়েছিলেন। তবে তাকে অনুলেখক বলা সঙ্গত হবে কিনা, এমন সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ‘আশার ছলনে ভুলি’ গ্রন্থের লেখক।

তিন

সবাই জানেন শ্রুতিলেখকদের দক্ষতা প্রধানত স্মৃতিশক্তি এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ করে লেখার ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। কারণ তিনি মাত্র বক্তার বক্তব্য দ্রুতগতিতে লিখে চলেন, নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা ও ভাষা ব্যবহারের ক্ষমতা তার থাকলেও তা ব্যবহার করার সুযোগ নেই। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেজ ছেলে হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্রুত লেখার ক্ষমতা ছিল এবং তিনি স্বেচ্ছায় তার পিতার অনুলেখক হওয়ার কাজে ঐকান্তিকভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর তার লেখার ক্ষমতা সম্পর্কে লিখেছেন—

‘আমার সেঝদাদা (হেমেন্দ্রনাথ) গণেশ ঠাকুরের কাজ করিতেন। তিনি ক্ষিপ্রহস্তে তাঁহার (দেবেন্দ্রনাথের) সমস্ত কথা টুকিয়া লইতেন। তিনি এ বিষয়ে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। সেঝদাদা কাগজ পেনিসল লইয়া সর্ব্বদাই প্রস্তুত থাকিতেন। কি ব্রাহ্মসমাজে, কি পারিবারিক উপাসনামণ্ডপে, যেখানেই পিতৃদেব বক্তৃতা করিতেন বা উপদেশ দিতেন, তিনি যতদূর সম্ভব তাহা অবিকল টুকিয়া লইতেন। পরে পরিষ্কার করিয়া লিখিতেন। এমনকি, পিতৃদেব ঘরে বসিয়া সহজভাবে বাক্যালাপ করিতেছেন, তাহাও তিনি টুকিতে ছাড়িতেন না। আমরা এখন পিতৃদেবের যে সকল বাখ্যান দেখিতে পাই, উহার অধিকাংশ তাঁহারই পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ফল।’

(পিতৃদেব সম্বন্ধে আমার জীবনস্মৃতি— জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রবাসী, মাঘ ১৩১৮।)

সেকালের গণেশের চেয়ে নিষ্ঠার কমতি ছিল না হেমেন্দ্রনাথের, দেবেন্দ্রনাথের প্রতি কর্তব্য-দায়িত্ব পালনের সঙ্গে দেবেন্দ্রনাথের ধর্মীয় আদর্শের প্রতি হেমন্দ্রনাথের অসীম শ্রদ্ধা ছিল তার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। তার এ বৈশিষ্ট্যের পরিচয় পাওয়া যায় দেবেন্দ্রনাথের দেয়া ব্রাহ্ম ধর্মের ওপর উপদেশগুলো সংগ্রহ করার মানসিকতা থেকে। ‘দেবেন্দ্রনাথ ১৮৫৬ সালে কলিকাতা ব্রাহ্মসমাজের বেদিতে বসিয়া যেসব উপদেশ প্রদান করিতেন, তাহা তাহার তৃতীয় পুত্র হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিয়া লইতেন, তাহাই মুদ্রিত হইয়া ব্রাহ্ম ধর্মের ব্যাখ্যা পুস্তক হইয়াছে’ (আত্মকথা ৬ খণ্ড নরেশচন্দ্র জানা)।

&dquote;স্বামী

‘ব্রাহ্মধর্মের ব্যাখ্যান’ গ্রন্থটি দেবেন্দ্রনাথ রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে এ গ্রন্থের অনুলেখক হলেন হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। অন্যভাবে বললে ব্রাহ্মধর্মের ব্যাখ্যান গ্রন্থটি হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্রুতিলিখন বা গণেশবৃত্তির মাধ্যমে গ্রন্থরূপ পেয়েছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিচারণ থেকেও বোঝা যায়, শ্রুতিলেখকরূপে হেমেন্দ্রনাথের ব্রাহ্মধর্মের ব্যাখ্যান প্রস্তুত করা দক্ষ শ্রুতিলেখক হেমেন্দ্রনাথের পক্ষে অসম্ভব ছিল না।

দুঃখের বিষয়, হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর অকালমৃত্যুবরণ করেন।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের আরো একজন প্রখ্যাত গুণী সদস্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও শ্রুতিলিপিকার বা গণেশের সাহায্য নিয়েছিলেন। অবনীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ কন্যা উমা দেবী ‘বাবার কথা’য় লিখেছেন, ‘রবিদাদার মৃত্যুর কিছু আগে থেকে শান্তিনিকেতনে থাকার সময় পর্যন্ত বাবা (অবন ঠাকুর) রানীকে (রানীচন্দ) মুখে মুখে তার জীবন কথা বলতেন... রানী বাবার (অবন ঠাকুর) কাছ থেকে তার জীবন কাহিনী শুনে লিখে ছাপিয়েছেন— মস্ত বড় কাজ করেছেন রানী। তার জীবন কাহিনী তার নিজের মুখের কথা শুনে ছাড়া অমন সুন্দর করে কেউ লিখতে পারে কিনা সন্দেহ।’

কথক অবনীন্দ্রনাথ, লিপিকার রানীচন্দ— এভাবেই গড়ে উঠেছিল তার স্মৃতিচারণ ‘ঘরোয়া’ (১৯৪১) এবং ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’ (১৯৪৪)। রানীর সুন্দর হস্তাক্ষরে অবন ঠাকুরের চিত্রধর্মী গদ্যের সাবলীল চরিত্রটি চমত্কার ফুটে উঠেছে এ দুটি বইয়ে।

রবীন্দ্রনাথকে একবার কথা প্রসঙ্গে রানীচন্দ জানিয়েছিলেন, একটা ইচ্ছে আছে— ‘অবনীন্দ্রনাথের কাছে গল্পচ্ছলে অনেক মূল্যবান (স্মৃতিচারণ) কাহিনী ও কথা শুনেছি, যা আমার মনে হয় পাঁচজনের জানা দরকার, বিশেষ করে শিল্পীদের। সেই লেখাগুলো যদি দেখে দেন, তবে তাই দিয়ে পুরো লেখা শুরু করতে পারি।’

রানীচন্দের গণেশবৃত্তিতে পারদর্শিতা দেখে খুশি হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ক্রমে ক্রমে পুরো লেখাটা পড়া হয়ে গেলে রবীন্দ্রনাথ— ‘কোলের ওপর রাখা লেখাগুলোর ওপর বাঁ হাতখানি চাপা দিয়ে রইলেন।’ রানীকে বললেন, পুত্র রথীন্দ্রনাথকে ডাকতে। রথীন্দ্রনাথ এলে কবি কৌচে বসেই লেখার কাগজগুলো হাতে নিয়ে ঘাড়ের পাশ দিয়ে পেছন দিকে তুলে ধরলেন। বললেন, ‘প্রেসে দাও।’

ঘরোয়ার পাণ্ডুলিপি পড়ে তিনি লিখেছিলেন অবনীন্দ্রনাথকে— ‘কী চমত্কার তোমার বিবরণ, শুনতে শুনতে আমার মনের মধ্যে মরা গাঙ্গে বান ডেকে উঠলো। বোধহয় আজকের দিনে আর দ্বিতীয় কোনো লোক নেই, যার স্মৃতি চিত্রশালায় সেদিনকার যুগ এমন প্রতিভার আলোকে প্রাণে প্রদীপ্ত হয়ে দেখা দিতে পারে— এ তো ঐতিহাসিক পাণ্ডিত্য নয়, এ যে সৃষ্টি-সাহিত্য, এ পরম দুর্লভ। প্রাণের মধ্যে প্রাণ রক্ষিত হয়েছে— এমন সুযোগ দৈবাত্ ঘটে। ২৭ জুন ১৯৪১। রবিকাকা।’

অবন ঠাকুর গদ্য রচনার বড় মাপের শিল্পী ছিলেন। তার মুখে মুখে বলা— যা সাহিত্যে পরম দুর্লভ বলে সম্মানিত করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সেই পরম দুর্লভ সৃষ্টিকে রানীচন্দ তার লেখার মাধ্যমে বিশ্বস্ততার সঙ্গে অবন ঠাকুরকে ফুটিয়ে

তুলেছেন— এ কম কৃতিত্ব নয়। রানীচন্দকে গণেশ বলা অবশ্য কতখানি সঙ্গত, তা পাঠকরাই রায় দেবেন।

শেষ বয়সে অসুস্থ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু রচনার অনুলেখকেরও দায়িত্ব পালন করেছিলেন রানীচন্দ দক্ষতা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে।

চার

বাংলা নাট্যজগতের মহাকবি গিরিশ ঘোষেরও গণেশ বা অনুলেখক হয়েছিলেন সমসময়ের অনেকে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— রসরাজ অমৃতলাল বসু, অমৃতলাল মিত্র, কেদারনাথ চৌধুরী, দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার, দেবেন্দ্রনাথ বসু, অবিনাশ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ।

গিরিশ ঘোষের গণেশের প্রয়োজন হয়েছিল তার হাতের লেখার দুর্বোধ্যতার জন্য। হাতের লেখা ভালো না হওয়ায় গিরিশ ঘোষ নিজের হাতে প্রায় কিছুই লিখতেন না, এমনকি চিঠিপত্র পর্যন্ত। কবি নবীনচন্দ্র সেনকে এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘এ পত্রখানি আমার হাতের লেখা নয়। আমার হাতের লেখা পত্র আমি না পড়ে দিলে মানুষের সাধ্য নেই যে পড়ে। যার হস্তাক্ষর, সে আমার সন্তানের তুল্য। আমার সঙ্গে লেখে।’ (উদ্ধৃতি কলির শহর কলকাতা, হরিপদ ভৌমিকের সৌজন্যে)।

&dquote;কালীপ্রসন্ন

গিরিশ ঘোষের গণেশদের বলা বাহুল্য, হাতের লেখা ছিল সুন্দর এবং অবশ্যই তার সবাই কমবেশি দ্রুত টুকে নিতে অভ্যস্ত ছিলেন। ন্যাশনাল ও স্টার থিয়েটারে অভিনীত নাটকগুলো যখন নাট্যকার গিরিশ ঘোষ রচনা করেছেন, তখন তিনি কখনো বসে, কখনোবা বেড়াতে বেড়াতে, ভাবে বিভোর হয়ে এত দ্রুত বলে যেতেন যে, সে সময় দোয়তের কালি তোলার সময় পাওয়া যেত না। এসব বলার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুত লেখার তাগিদে রসরাজ অমৃতলাল বসু তিন-চারটে পেনসিল কেটে তার সঙ্গে লিখতে বসতেন। রসরাজ অবশ্য তার নিজের হাতের লেখা নিয়ে খুব উঁচু ধারণা পোষণ করতেন, তা নয়। তার নিচের পদ্য থেকেই তা অনুমান করা সম্ভব, যেখানে নিজের হাতের লেখাকে ‘ত্রিভঙ্গ কি অষ্টাবক্র’ বলে উল্লেখ করেছেন—

‘আমার এ হস্তাক্ষর, চক্ষুশূল সুদক্ষর,

লক্ষ্যে সম্মুখে নহে উচিত প্রকাশ।

ত্রিভঙ্গ কি অষ্টাবক্র; কুণ্ডলী কল্পিত চিত্র

ওকড়ার বনে যেন খাগড়ার চাষ।’

গিরিশ ঘোষের প্রায়ই গণেশ পরিবর্তন হতো। বিচিত্র পরিবেশে নতুন গণেশদের প্রথম প্রথম বেশ অসুবিধার মুখে পড়তে হয়েছে। নাট্যকারের শেষ ১৫ বছরের গণেশ হয়েছিলেন অবিনাশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। শুরুর দিকে তিনি কী প্রচণ্ড অসুবিধায় ভুগেছেন, তা তার মুখেই শোনা যাক— “প্রথম প্রথম আমি তাহার সহিত লিখিবার সময় মধ্যে মধ্যে অনুসরণ করিতে না পারিয়া ‘কী?’ বলিয়া পুনরুল্লেখ করিতে অনুরোধ করিতাম। গিরিশচন্দ্র বিরক্ত হইয়া বলিতেন, কী ক্ষতি করিলে জানো! যাহা বলিয়াছি তাহা তো মনেই নাই, আর পরে যাহা বলিতে চাহিয়াছিলাম, তাহাও গোলমাল হইয়া গেল, যে স্থান লিখিতে না পারিবে, দুইটি তারা (স্টার) চিহ্ন অঙ্কিত করিয়া তাহার পর লিখিয়া যাইবে, পরে আমি পরিত্যক্ত অংশ পূরণ করিয়া দিব। যাহা বলিয়াছি, তাহা ঠিকটি আর তেমন বাহির না হইলেও একটা লাভ এই হইবে, যাহা বলিতে যাইতেছিলাম সেটি ঠিক থাকিবে।’

নাটক রচনাকালে গিরিশচন্দ্র  প্রথম দুটি অংক লিখতেই একটু চিন্তা-ভাবনার সময় নিতেন। একবার শুরুটা পছন্দ হয়ে গেলে শেষ করতে বেশি সময় নিতেন না। সে হোক না মধ্যরাত বা নাটকের অভিনয়ের মধ্যেই। ‘পাণ্ডব-গৌরব’ নাটকটি সারা রাত ধরে লেখা হয়েছিল। রাত জাগার অভ্যাস না থাকায় অনুলেখক অবিনাশচন্দ্র মাঝে মাঝে ঝিমিয়ে পড়তেন, ফলে লেখার বিঘ্ন হতো। যে রাতে নাটকটির চতুর্থ অংক লেখা হয়, সে রাতে অবিনাশচন্দ্র তিন-চার বাটি চা খেয়ে লেখা শুরু করেন। রাত আড়াইটা নাগাদ চতুর্থ অংক শেষ হয়। গিরিশ ঘোষ তাকে ঘুমোতে যেতে বলায় অবিনাশচন্দ্র বলেন, ‘আমার চোখে আদৌ ঘুম নেই, লেখা চলুক না কেন?’

গিরিশ ঘোষ সবসময়ই গর্ব করে বলতেন, সরস্বতী তার জিভের আগায় অধিষ্ঠিতা। সুতরাং অবিনাশের কথা শুনে বললেন, ‘বেশ, আমি প্রস্তুত, আমার সব সাজানো রয়েছে। তুমি পারলেই হলো, লিখতে চাও লেখো।’ পঞ্চম অংক লেখা শুরু হলো। নাটক শেষ করে সর্বশেষ গান— ‘হর হর মনমোহিনী কে বলেরে কালো মেয়ে’ গানের প্রথম ছত্র লিখে বললেন, ‘থাক, আজ এই পর্যন্ত। গানগুলো সব কাল বেঁধে দেব। তুমি দরজা-জানালা খুলে দাও, ঘর বড় গরম হয়ে উঠেছে।’ জানালা খুলতেই রোদে ঘর ভরে গেল...। ঘড়িতে দেখা গেল সকাল ৮টা বাজে। ব্যস্ত হয়ে গিরিশ বলেন, ‘যাও বাড়ি যাও, স্নানাহার করে সমস্ত দিন ঘুমিয়ে সন্ধ্যার পর এসো।’

থিয়েটার হলের মধ্যে নাটক অভিনয়ের ফাঁকে ফাঁকে ‘মনি হরণ’ গীতিনাট্য রচনা শুরু করে দেন। নাটক লেখা হবে, সুতরাং অনুলেখক খাতা-পেনসিল নিয়ে প্রস্তুত। গিরিশচন্দ্র স্টেজে অভিনয় করে বাইরে এসে বলে যেতে শুরু করেন। একজন লোক রাখা হলো গিরিশ ঘোষকে অভিনয়ের সময় ডেকে দেয়ার জন্য। এভাবে অভিনয় এবং অভিনয়ের ফাঁকে ফাঁকে গীতিনাট্যটি লেখা হয়ে গেল। অভিনয় শেষে স্টেজে বসে এ গীতিনাট্যের ২৮টি গান বেঁধে ম্যানেজারের হাতে দিলেন। তাকে বললেন, ‘যদি চাও আর একখানি নকশা আজই লিখে দিতে পারি।’ ম্যানেজার আগ্রহ দেখালে অবিশ্বাস্য প্রতিভাধর গিরিশ ঘোষ ওই রাতেই চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি নামে আরেকখানা নকশা লিখে দিয়ে বাড়ি রওনা হলেন।