মধ্য দিল্লির নীরব এক সড়কের ছোট এক ভবনের একেবারে ওপরের তলায় লেখক অরুন্ধতী রায় তার অ্যাপার্টমেন্টে আমাকে স্বাগত জানালেন। তার সঙ্গে ছিল দুটি কুকুর, দুটিই উচ্চৈঃস্বরে ঘেউ ঘেউ করছিল। আমাকে তার প্রশস্ত, রোদেলা রান্নাঘরে নিয়ে যেতে যেতে প্রসন্নচিত্তে কুকুরগুলোর নাম জানাচ্ছিলেন। একজনের নামের অর্থ দাঁড়ায় ‘মিসেস নোংরা ডার্লিং’, আরেকজন ‘ধরণীর প্রিয়’। রান্নাঘরে তিনি ইতালিয়ান মোকা পাত্রে কফি তৈরি শুরু করলেন, হাসিমুখে বললেন, ‘খুব ভালো বানাতে পারি না, দক্ষিণি স্টাইলে— চলবে?’
ঘরের ছাদ বেশ উঁচুতে, দেয়ালে বইয়ের তাকের সারি আর রাজনৈতিক পোস্টার (একটা পোস্টারে দেখা যাচ্ছে লাঠি হাতে ব্রিটিশ পুলিশ: সেডিশন প্রোটেক্টস ডেমোক্রেসি)। তার অ্যাপার্টমেন্টে প্রচুর আলো-বাতাস; একজন শিল্পীর চিলেকোঠা বলে মনে হবে।
পদ্মফুল রাখা একটা উঁচু ফুলদানির পাশে রাখা টেবিলকে ঘিরে আয়েশ করে বসলাম। রায়ের পরনে ছিল ক্রিম রঙের সালোয়ার-কামিজ। তার স্টাইলিশ চলন নিয়ে মন্তব্য করতেই তিনি বললেন, ‘আমি ঐতিহ্য ও আধুনিকতা— দুই থেকেই দূরে থাকি এবং একমাত্র তখনই আপনি নিজের জন্য জায়গা খুঁজে পাবেন।’
অরুন্ধতী রায়ের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাত্ হয়েছিল ১৫ বছর আগে। ২০০২ সালে আমি দিল্লি এসেছিলাম অরুন্ধতী রায়ের নির্ভীক রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিজম নিয়ে এ ম্যাগাজিনের (ভোগ) জন্য লিখতে। তিনি আজ দাঁড়িয়ে আছেন ৫৭ বছর বয়সে, এখনো সেই আগের মতোই আছেন, অপরিবর্তিত। তার কোঁকড়া চুলগুলো আগের চেয়ে ধূসর হয়েছে (তিনি কৌতুক করে বলেন ‘গ্রে প্রাইড’) কিন্তু তার বড় বড় চোখে খুশির ঝিলিক আর সহজ হাসিটা আগের মতোই আছে। তিনি বেশ ভালো মুডে ছিলেন। থাকবেনই বা না কেন! আগের রাতে তার দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস-এর প্রুফ দেখেছেন। প্রুফ দেখতে গিয়ে আমেরিকান ও ব্রিটিশ সংস্করণের জন্য ‘কমা যুদ্ধে’ লিপ্ত হতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তার উপন্যাস প্রকাশ করবে নফ আর যুক্তরাজ্য থেকে পেঙ্গুইন। ১৯৯৭ সালে দ্য গড অব স্মল থিংস প্রকাশের পর এটাই তার প্রথম উপন্যাস।
নতুন ফিকশন লিখতে অরুন্ধতী অনেকটা সময় কাটিয়ে দিলেন বললেও সেটা কম বলা হবে। তার প্রথম উপন্যাস দ্য গড অব স্মল থিংস ছিল নগদ বেস্টসেলার। জুনট ডায়াজ বইটিকে ‘ইংরেজি ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসগুলোর একটি’ বলে অভিহিত করেছেন। বইটি বুকার পুরস্কার পায় এবং দুনিয়ার সাহিত্যজগতে ঝড় তোলে। নতুন উপন্যাসটির জন্য তিনি ১০ বছর কাজ করেছেন। গত বছরের আগস্টে তিনি তার ব্রিটিশ এজেন্ট ডেভিড গডউইনকে একটি শব্দ লিখে পাঠান— ‘সমাপ্ত’। এই বার্তা পাওয়ার পর প্রথম ফ্লাইটে গডউইন দিল্লি রওনা হন। অরুন্ধতী তার হাতে পাণ্ডুলিপি তুলে দেয়ার পর তিনি বেশ নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন। গডউইন বলেন, তার পর আমি পাণ্ডুলিপিটার সূচনাটুকু পড়লাম এবং মনে হলো, ‘হ্যাঁ, আমরা আবার বই নিয়ে ফিরছি।’ এ মাসে যখন তার দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস প্রকাশিত হবে, তখন সেটা দুনিয়ার ৩০টি দেশ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। উপন্যাসের শুরু লাইনটি এমন, ‘সে গোরস্তানে একটি গাছের মতো বাস করত।’ প্রথম লাইন থেকেই পাঠক কাহিনীর ঝোড়ো বাতাসের মধ্যে ঢুকে যাবেন। এখানে ‘সে’ হচ্ছে আনজুম, পুরনো দিল্লিতে তার জন্ম। জন্ম থেকেই সে হিজরা। জন্মের পর সে আফতাব নামে ছেলে হিসেবে বেড়ে উঠেছে, তার পর নারী হিসেবে নতুন জীবন শুরু হয় হিজরাদের আস্তানায়। একসময় সে হিজরাদের মুখপাত্র হয়ে ওঠে। তার পর গুজরাট দাঙ্গা থেকে কোনোমতে বেঁচে গিয়ে দুনিয়ার সবকিছুতে বিশ্বাস হারিয়ে এক গোরস্তানে একাকী জীবনযাপন শুরু করে। গোরস্তানে সে একটি অতিথিশালা তৈরি করে এবং সেখানে বিভিন্ন চরিত্রের মানুষের সমাবেশ ঘটে।
৪০০ পাতার বেশি দীর্ঘ এই গ্রন্থ ডিকেন্স, তলস্তয় ও মার্কেজের উপন্যাসগুলোর মতো সমকালীন উপন্যাস। দ্য গড অব স্মল থিংস যদি রাজনীতিছোঁয়া কল্পনাপ্রবণ পারিবারিক উপন্যাস হয়, তাহলে দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস হবে ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে থাকা অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বয়ান। তবে উপন্যাসের কাহিনী দিল্লিকেন্দ্রিক হলেও এর পরিধি ইরাক ও ক্যালফোর্নিয়া পর্যন্ত পৌঁছেছে। উপন্যাসে আছে বিচিত্র সব চরিত্রের মানুষ— ভবঘুরে, সেনাবাহিনীর মেজর, বিক্ষোভকারী, পুলিশপ্রধান, বিপ্লবী ও প্রেমিক। রায়ের বন্ধু লেখক পঙ্কজ মিশ্র বলেন, ‘প্রান্তিক মানুষের প্রতি তার সহজাত সহমর্মিতা রয়েছে। এটা একটা বিরল গুণ। তিনি সবসময় ক্ষমতাহীন মানুষের পক্ষে থাকেন।’
সূক্ষ্ম ও গতিময় গল্প বলার ঢঙে অরুন্ধতী রায় কৌতুক আর হালকা কথা দিয়ে বেদনা ও দুর্নীতির দৃশ্যের মধ্যে ভারসাম্য এনে ফেলেন। একটি কাব্যিক অনুচ্ছেদে এক শিশুকে উদ্ধারের বিবরণ আছে, ‘কংক্রিটের মেঝেতে, একগাদা ময়লার মধ্যে: সেখানে সিগারেটের সোনালি রঙের ফয়েল, কিছু প্লাস্টিক ব্যাগ, চিপসের খালি প্যাকেট। তার মধ্যেই আলোর বন্যার মধ্যে, উড়ন্ত মশার দঙ্গলের তলায় নগ্ন কন্যা শিশুটি শুয়ে আছে। তার ত্বক নীলাভ-কালো, শিশু শিল মাছের মতো মসৃণ।’ বইটি পড়তে গিয়ে পাঠক হিন্দি, উর্দু, সংস্কৃত এবং বিভিন্ন ধরনের ইংরেজি শুনতে পাবেন। এবং ঠিক এই মুহূর্তের ভারতীয় সমাজের নানা দিকও দেখতে পাবেন। ডায়াজ যেমনটা বলেছেন, ‘আপনি যদি করপোরেট-সৌজন্যে দেখা স্বপ্ন কুহেলিকার বাইরের জগত্টাকে জানতে চান, তাহলে আপনাকে রায়ের মতো লেখকদের পড়তে হবে। তিনি আপনাকে প্রকৃতই কী হচ্ছে, সেটা দেখাবেন।’
বেলা ১টায় রায়ের প্রতিবেশী, পেঙ্গুইন ইন্ডিয়ার সাহিত্য সম্পাদক মেরু গোখলে দরজায় কড়া নাড়লেন। সঙ্গে দুপুরে লাঞ্চের জন্য ঘরে তৈরি রাভিয়োলি ও টমেটো স্যুপ নিয়ে এসেছেন। আর এনেছেন কভার প্রুফ। সেগুলো টেবিলের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে ঝকমকে প্রচ্ছদের চেয়ে মুসলিমদের মার্বেল পাথরের একটি কবর অবলম্বনে অফ হোয়াইট রঙের প্রচ্ছদটি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। রায় বলেন, ‘গল্পে সবাই নিগৃহীত মানুষ, তাই বইটাও যদি নিগ্রহের শিকার হয়, তাহলে সমস্যা নেই।’ রায় মাঝে মাঝেই অভিশাপ দেন, শব্দগুলো তার সুরেলা কণ্ঠের একেবারে বিপরীত। নিজের এই বিদ্রূপ করার ভাষা তিনি তার উপন্যাসেও ব্যবহার করেছেন, ‘তোমার মায়ের .... কসম’, তার কাব্যিক ভাষাকে মাঝে মাঝে এই বাক্যগুলো ঝাঁকি দিয়ে যায়।
অ্যাপার্টমেন্টের উভয় পাশেই বারান্দাগুলো টবে লাগানো গাছে পূর্ণ। মনে হয় যেন মরূদ্যান।
২০ বছর আগে তার প্রথম উপন্যাস যখন ঝড় তোলে, তখন সবাই ভেবেছিলেন যে তিনি দ্রুতই নতুন কাহিনী নিয়ে হাজির হবেন। কিন্তু ভারতের রাজনৈতিক বিবর্তন নিয়ে তিনি অস্বস্তিতে পড়ে যান। ব্যবস্থার বিচারে ভারত দুনিয়ার বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হলেও দেশটি জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় চরমপন্থা, সেন্সরশিপের উত্থান প্রত্যক্ষ করছে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকারকে হুমকিতে ফেলছে। রায় বললেন, ‘চারপাশে যা দেখছেন, সেটা মেনে নেয়া কঠিন মনে হয়েছিল। নিজের সৌভাগ্যকে উপযাপন করাটাও আর ভালো লাগছিল না।’ এর পর ১৯৯৮ সালে পাকিস্তান সীমান্তের কাছে ভারত পরমাণু পরীক্ষা করল। ‘এমন অনেকে এই ঘটনা উদযাপন করলেন, যাদের ক্ষেত্রে আমি এমনটা আশা করিনি। আমি জানতাম কিছু না বললে তখন সবাই ধরে নিত যে আমিও এই উদযাপনে শামিল হয়েছি।’ রায় বলে চললেন, ‘পরমাণু পরীক্ষার উচ্চ মাত্রার ঝুঁকি নিয়ে ভারতের আউটলুক ও ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনে একটা প্রবন্ধ লিখলাম। এই লেখা আমাকে খ্যাতির মসৃণ আসন থেকে পথে ছুড়ে ফেলল। এবং আমি যে দুনিয়ায় গিয়ে পড়লাম সে জগত্ নিয়েই আমি ২০ বছর ধরে লিখছি।’ তিনি নিজের রাজনৈতিক প্রবন্ধগুলোর কথা উল্লেখ করলেন, এগুলো নিয়ে পরবর্তীতে ডজনখানেক নন-ফিকশন বই হয়েছে। ২০০২ সালে যখন অরুন্ধতী রায়ের সঙ্গে আমার পরিচয়, তখন ভারত নতুন করে পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছে। অরুন্ধতী তখন রাজনৈতিক সমালোচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। দুনিয়াজুড়ে তিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদ, কাশ্মীর উপত্যকায় চলমান যুদ্ধ, দলিতদের ওপর নির্যাতন, বাঁধ নির্মাণ ও খনি খননের ফলে পরিবেশ দূষণ এবং অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে উত্তেজক বক্তৃতা দিচ্ছেন ও রচনা লিখছেন। ‘প্রতিবারই কিছু লেখা বা বক্তৃতার পর মনে হয় আমি এটা করতে চাইনি কারণ এর জন্য আবার আমাকে ঝামেলায় জড়াতে হবে। কিন্তু আমি থামতে পারি না।’
শিরার মধ্যে তিনি সুসান সোনটাগ ও নোম চমস্কির মতো একরোখা পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল কিন্তু অনেকেই তাকে রাজনৈতিক সমালোচক হিসেবে খারিজ করে তাকে উপন্যাস লেখায় ফিরতে বলেন। আবার অনেকে তাকে সমাজ পরিবর্তনের আবশ্যিক প্রভাবক বলে বিবেচনা করেন। আমি রায়কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি আবার উপন্যাস লিখবেন কিনা। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘মনে হয় লিখব। এ রকম সময়ে বেঁচে থাকাটা কঠিন কাজ... পরবর্তীকালে আমি যা-ই লিখি না কেন তাতে এসব বিষয় অবশ্যই আসবে।’ তার প্লাটফর্ম ক্রমেই সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০০৫ সালে ইরাকে মার্কিন হামলার প্রেক্ষিতে ইস্তাম্বুলে বসা যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ২০১৫ সালে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল ভারতে রাষ্ট্রীয় সফরের সময় অরুন্ধতী রায়ের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। দার্শনিক, অ্যাক্টিভিস্ট কর্নেল ওয়েস্ট বলেছেন, ‘বোন রায় একজন আন্তর্জাতিকতাবাদী। তিনি দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের ঘটনার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেন।’ তবে এসবের জন্য রায়কে মূল্যও চোকাতে হয়েছে। এক বন্ধুর গ্রেফতারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোয় তাকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সামনে হাজির (দ্বিতীয়বারের মতো) হতে হয়েছে। অনেকে যেমন তার সঙ্গে সেলফি তুলতে আগ্রহী, তেমনি তার কুশপুত্তলিকাও পোড়ানো হয়েছে। পুলিত্জারজয়ী লেখক সিদ্ধার্থ মুখার্জি অরুন্ধতীকে জর্জ অরওয়েলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘গুণ্ডারা তার বক্তৃতার মঞ্চে উঠে চেয়ারও ভেঙেছে। তিনি বক্তৃতা করার সময় গোয়েন্দারা এক কোনায় দাঁড়িয়ে নোট নেয়, তিনি কী বলছেন। কিন্তু ভারত ত্যাগের কোনো ইচ্ছাই অরুন্ধতীর নেই। তিনি বলেন, ‘একজন লেখক হিসেবে আমি এই দেশের থাবার মধ্যে আবার দেশটাও আমার থাবার মধ্যে।’ অরুন্ধতীর নতুন উপন্যাসে তার নন ফিকশনের কোনো ছাপ থাকবে না, এটা কল্পনা করা কঠিন। রায় বলেন, ‘আমি প্রায় নিশ্চিত যে আমি মূলত একজন ফিকশন লেখক। ননফিকশন আমার শখের কাজ। রাজনৈতিকভাবে যে অবস্থান নেয়ার, সেটা আমি নিয়েছি। সেটা ছিল একটা যাত্রা। আর ফিকশন ভিন্ন কিছু। এটা একটা নাচ।’
দিল্লিতে রায়ের সামাজিক জীবন ৩০ বছরের বেশি সময়ের নানা বন্ধুত্বের জালে আবদ্ধ। ৩০ বছর আগে স্থাপত্যবিদ্যা পড়তে তিনি এ শহরে এসেছিলেন। তার লেখা তাকে দেশ-বিদেশের বহু লেখকের কাছে এনে দিয়েছে, যাদের মধ্যে আছেন জন বার্জার। জনের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রায়ের ভালো বন্ধু ছিলেন। এছাড়া রায়ের বন্ধুদের মধ্যে আছেন নাওমি ক্লাইন, ইভ এনসলার ও ওয়ালেস শন। নিজের বিরাট বন্ধুবান্ধব থাকা সত্ত্বেও রায় নিজেকে নিঃসঙ্গ প্রাণী বলেই মনে করেন। ‘আমার মধ্যে সবচেয়ে প্রকট যে অভারতীয় বৈশিষ্ট্যটি রয়েছে, সেটা হলো একাকিত্ব।’ লেখার জন্য তার একটা আলাদা জায়গা রয়েছে, সেটা পুরনো দিল্লিতে অবস্থিত। এই অ্যাপার্টমেন্ট থেকে সেখানে যেতে আধা ঘণ্টা সময় লাগে। একদিন বিকালে তার সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলাম। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘এটাকে রাইটিং স্টুডিও বলবেন না। এ ধারণাটা খুব বেশি নিউইয়র্কের। তার চেয়ে এটাকে আমার আশ্রয়, নির্ভার হওয়ার জায়গা বলতে পারেন।’
পুরনো শহরের সত্যিকার প্রবেশপথ তুর্কম্যান গেটে গাড়ি রেখে আমার নেমে গেলাম। তিনি আমাকে অটোরিকশা, মোটরবাইক আর গাড়ির বাঁধ ঠেলে কৌশলে সামনে নিয়ে চললেন। ‘এ রাস্তা আমার খুব চেনা এবং এই ছাগলগুলোও।’ সন্ধ্যা নাগাদ আমরা তার সেই আশ্রয়ে পৌঁছলাম। বাড়ির মালকিন আমাদের ছাদে আমাদের জন্য বাটার কুকি আর চায়ের আয়োজন করলেন। সেখানে মালকিনের পরিবারের অন্য সদস্যরাও হাজির হলেন। রায় বললেন, ‘এ রকম পরিবেশ আপনি উন্নত বিশ্বে দেখতে পাবেন না।’
অরুন্ধতীর আশ্রয়স্থলটি সাদা রঙের দেয়ালের একটা ছিমছাম কক্ষ। জানালার কাছে একটা ডেস্ক, এর পাশে একটা সিঙ্গেল বেড। দেয়ালজুড়ে শুধু বুক শেলফের সারি, সেখানে দ্য ডেকলাইন অ্যান্ড ফল অব দ্য রোমান এম্পায়ার থেকে অ্যালিস মুনরো— সবই আছে। রায় বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন, নিচে ব্যস্ত গলিকে আমলে না নিয়ে কাঠের রেলিংয়ে হাত রাখলেন। আমাকে বললেন, এখানেই তিনি তার উপন্যাসের গল্প কল্পনা করেছেন। ‘আমি নিয়মের মধ্যে ছিলাম। বাসায় বসেই লিখতাম এবং শুধু সপ্তাহান্তে এখানে আসতাম।’ চিন্তা ও পরিকল্পনা করতে? আমি জিজ্ঞেস করলাম। ‘অনেকে আমাকে কাজ করার জন্য দারুণ সব জায়গা ব্যবহারের সুযোগ দিতে চেয়েছেন, কিন্তু গ্রাম্য-আদিম জায়গায় আমার ভয় লাগে।’
ফেরার সময় কোলাহলপূর্ণ ট্রাফিকের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বললেন, ‘উপন্যাস লেখার জন্য এটা কী দারুণ একটা সংগীত না?’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন? কারণ এটা অভিশঙ্কী সব স্বরকে ডুবিয়ে দেয়? ’
তিনি আমার কথায় বিস্মত হয়ে ঘুরে তাকিয়ে বললেন, ‘না, কারণ হলো এটা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেবে যে সবকিছুকে আপনি যতই শৃঙ্খলায় নিয়ে আসার চেষ্টা করুন না কেন, সবকিছু আসলে চরম বিশৃঙ্খল।’
কয়েকদিন পরে তিনি আমাকে ১৩ শতকের সুফি সন্ত হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার জন্মস্থানে নিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, এটা আমার উপন্যাসের কাল্পনিক কবরস্থান নয়। আরো জানালেন এটা একটা শান্তির জায়গা, উপন্যাস লেখার সময় তিনি বহুবার এখানে এসেছেন।
অরুন্ধতী রায়ের সঙ্গে শেষবার সাক্ষাতের সময় দেখলাম তার কাছে দলিত-অধিকার আন্দোলনের একজন তরুণ নেতা এসেছেন। রায় তখন লন্ডনের বইমেলায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেখানে প্রকাশনার সঙ্গে তিনি প্রুফ নিয়ে আলোচনা করবেন। এছাড়া তার বইয়ের অনুবাদকদের সঙ্গেও কথা বলবেন তার কাব্যিক ভাষায় বিভিন্ন সূক্ষ্ম বিষয় স্পষ্ট করার জন্য। ‘আপনাকে এখন অনেক ভাষা ও আঞ্চলিক ভাষারূপের মধ্যে ভাবতে হচ্ছে। আমরা এখন এ হট্টগোলের মধ্যে বাস করি।’
লেখাটি ভোগ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত






