রাজতন্ত্রে রানী
কিংবা সম্রাজ্ঞীদের
অন্যতম কাজ
হয় শাসন
বংশের ধারাবাহিকতা
রক্ষায় পুত্রসন্তান
জন্ম দেয়া।
পুত্রসন্তান জন্ম
দেয়ার ওপরই
রানীদের অবস্থান
নির্ভর করত।
অথচ মোগল
সম্রাট জাহাঙ্গীরের
ঘরে নূরজাহানের
কোনো সন্তান
ছিল না।
নূরজাহানের এক
কন্যাসন্তান ছিল
তার প্রথম
স্বামীর ঘরের।
ইতিহাস সাক্ষী,
তার পরও
নূরজাহান ছিলেন
মোগল শাসনামলের
সবচেয়ে প্রভাবশালী
ও ক্ষমতাধর
নারী। নূরজাহানের
এ উত্থান
ছিল তার
ব্যক্তিগত ক্যারিশমা।
তিনি ক্ষমতার
রাজনীতি যেমন
ভালো বুঝতেন,
তেমনি ছিল
তার সৌন্দর্যবোধ।
প্রাসাদের সজ্জা,
নারীদের পোশাক,
নতুন খাবার
তৈরি থেকে
মোগল সাম্রাজ্যে
স্থাপত্য নির্মাণের
মতো পুরুষালি
কাজে নূরজাহান
অনপনেয় ছাপ
রেখে গেছেন।
প্রাসাদের সজ্জা
বিভিন্ন
উৎসব-অনুষ্ঠানে
প্রাসাদের সাজসজ্জা
করা ছিল
মোগল নারীদের
প্রিয় কাজ।
গুলবদন বেগমের
হুমায়ুননামা থেকে
বিভিন্ন অনুষ্ঠানে
পরিবারের নারীদের
প্রাসাদ, বাগান
ও আশপাশের
চত্বরের সাজসজ্জার
কাজ নিয়ে
ব্যস্ত থাকার
কথা জানা
যায়। বাদশাহ
বাবরের মা
মহাম বেগম
বিভিন্ন সময়
এ রকম
সজ্জার উদ্যোগ
নিয়েছেন। একবার
এক ভোজ
উপলক্ষে মহাম
বেগম বাজার,
সৈনিকদের আবাসে
আলোকসজ্জা করার
নির্দেশ দেন।
গুলবদন বেগমের
কথায় এ
ঘটনার পর
ভারতবর্ষে বিভিন্ন
উৎসবে আলোকসজ্জা
করা সাধারণ
এক নিয়মে
পরিণত হয়।
নকশা বা
সাজসজ্জায় সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ অবদান
ছিল যথারীতি
সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের।
মোগল প্রাসাদের
সাজসজ্জা ও
সৌন্দর্য তার
তত্ত্বাবধান ও
নকশায়ই উন্নত
চেহারা পায়।
সম্রাট শাহজাহান
আগ্রা দুর্গের
যে মুসাম্মান
বুর্জে বন্দি
ছিলেন, সেটার
নকশা করেছিলেন
নূরজাহান স্বয়ং।
নূরজাহানের তত্ত্বাবধানে
তৈরি ইতিমাদ-উদ-দৌলার
পিয়েত্রা
দুরা
কারুকাজের নকশাও
তার নিজের
করা।
নূরজাহানের হাতে
প্রাসাদের পোশাক
ও অলংকারও
পায় উত্কর্ষ।
স্থাপত্য নির্মাণ
মোগল
সম্রাটদের প্রায়
সবারই ছিল
দর্শনীয় স্থাপনা
নির্মাণের ঝোঁক।
এ চর্চায়
পিছিয়ে ছিলেন
না মোগল
পরিবারের নারীরাও।
তবে সম্রাট
বাবর বা
হুমায়ুনের আমলে
মোগল নারীদের
উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য
কোনো স্থাপনা
তৈরি হয়নি।
ভারতে মোগল
নারীদের তত্ত্বাবধানে
নির্মিত প্রথম
উল্লেখযোগ্য স্থাপনাটি
হলো দিল্লিতে
অবস্থিত সম্রাট
হুমায়ুনের সমাধি।
এটি নির্মাণ
করিয়েছিলেন হুমায়ুনের
স্ত্রী হাজি
বেগম। ভারতে
মোগল স্থাপত্য
রীতির বিকাশে
সমাধিটিকে অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে
বিবেচনা করা
হয়। নির্মাণশৈলী
ও প্রেরণার
দিক থেকে
সমাধিটি ছিল
পারস্য ও
ভারতীয় নির্মাণ
রীতির মিলন।
এর নির্মাণকাজ
শুরু হয়
১৫৬০ খ্রিস্টাব্দে
এবং শেষ
হয়েছিল ১৫৭৩
খ্রিস্টাব্দে। এ
সমাধিসংলগ্ন বাগানও
মানুষকে মুগ্ধ
করে। স্যার
সৈয়দ আহমেদ
খান এ
স্থাপনার প্রশংসা
করে বলেছেন,
‘কেউ যদি
বেহেশত দেখতে
চায় তাহলে
তাকে হুমায়ুনের
বাগান দেখতে
বলুন।’ এছাড়া
হাজি বেগম
‘আরবান সরাই’
নামে একটি
সরাইখানা নির্মাণ
করিয়েছিলেন, যেখানে
৩০০ লোকের
জন্য ব্যবস্থা
থাকত।
বলা হয়,
তার সমকালে
শিল্প ও
কারুশিল্পের এমন
কোনো শাখা
ছিল না,
যেখানে নূরজাহান
বেগম অবদান
রাখেননি। সাহিত্য,
স্থাপত্য, বাগান,
পোশাকের নকশা,
গৃহসজ্জা, শিকার
প্রভৃতি সবকিছুতেই
আগ্রহ ছিল
তার। তবে
স্থাপত্য শাখায়
তার অবদান
আর সবকিছুকে
ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
নূরজাহানের নকশা
বা পৃষ্ঠপোষকতায়
নির্মিত স্থাপনার
মধ্যে আছে
আগ্রায় তার
পিতার সমাধি
ইতিমাদ-উদ-দৌলা,
জালান্ধারের কাছে
নূর মহল
সরাই, তার
স্বামী সম্রাট
জাহাঙ্গীরের সমাধি,
কাশ্মীরের শ্রীনগরে
পাথর মসজিদ
ও লাহোরে
তার নিজের
সমাধি। ইতিমাদ-উদ-দৌলা
নির্মিত হয়
সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের
প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে
১৬২২-২৮
খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।
এ সমাধিতে
রয়েছে নূরজাহানের
পিতা গিয়াস
বেগ ও
মাতা আসমত
বানু বেগের
সমাধি। গবেষকরা
বলেন, এ
স্থাপনায় নারীসুলভ
সৌন্দর্যবোধ অত্যন্ত
স্পষ্ট। স্থাপনাটি
আকারে খুব
বৃহৎ নয়,
কিন্তু অনবদ্য
কারুকাজের সমাহার
দেখা যায়
এতে। পুরো
স্থাপনাটি সাদা
মার্বেল দিয়ে
তৈরি, যাতে
আছে বিভিন্ন
পাথরের কারুকাজ।
ডে লায়েটের
দেয়া তথ্য
অনুযায়ী, এ
সমাধি নির্মাণে
সে সময়
১ কোটির
বেশি রুপি
খরচ হয়েছিল।
কথিত আছে,
নূরজাহান পুরো
সমাধিটি রুপা
দিয়ে তৈরি
করতে চেয়েছিলেন,
কিন্তু ভারতীয়
আবহাওয়ার কারণে
মার্বেল পাথর
উপযুক্ত হওয়ায়
সেটাই ব্যবহার
করা হয়।
সমাধি নির্মাণের
পুরো খরচ
নূরজাহানের নিজস্ব
সম্পদ থেকে
নির্বাহ করা
হয়েছিল। ইতিমাদ-উদ-দৌলা
বিভিন্ন কারণেই
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থাপনাটিকে বলা
হয় লাল
চুনাপাথরের ভারতীয়
রীতি ও
মার্বেলের পারস্য
স্থাপত্যরীতির মিলন।
এর পুরো
মার্বেল নির্মিত
কাঠামো এবং
তাতে পাথরের
‘পিয়েত্রা-দুরা’
নামে পরিচিত
কারুকাজ, দেয়ালে
পারস্যের মোটিফ
ব্যবহার সবই
গ্রহণ করা
হয় তাজমহল
নির্মাণে।
মোগল আমল
রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের
বিকাশ হওয়ায়
নতুন নতুন
সড়ক তৈরি
হতে থাকে।
রাজনীতি ও
ব্যবসা-বাণিজ্যের
জন্য গুরুত্বপূর্ণ
বিভিন্ন এলাকাকে
সংযুক্ত করতে
তৈরি হয়
এসব সড়ক।
পথচারীদের সুবিধার
জন্য রাস্তার
পাশে গাছ
লাগানো, কুয়া
তৈরি ও
সরাইখানা নির্মাণ
করা হয়।
এসব কাজে
মোগল সম্রাটদের
পাশাপাশি নজর
দিতেন সম্রাজ্ঞীরাও।
নূরজাহান পাঞ্জাবের
কাছে জালান্ধারে
নূর মহল
সরাই নির্মাণ
করিয়েছিলেন ১৬২০
সালে। এ
সরাই নির্মাণের
পুরো ব্যয়
নূরজাহান নিজেই
বহন করেন।
সে সময়
নূরজাহান নির্মিত
সরাইখানাটি বেশ
বিখ্যাত ছিল।
স্থানীয়দের কাছে
এটি ‘সরাই
নূর মহল’
নামে পরিচিত
ছিল। এছাড়া
নূরজাহান আগ্রায়
আরেকটি সরাইখানা
নির্মাণ করিয়েছিলেন।
পাথর মসজিদ,
শ্রীনগর, কাশ্মীর: কাশ্মীরে
মোগলদের তৈরি
স্থাপনার অন্যতম
একটি হলো
পাথর মসজিদ।
মসজিদটি কাশ্মীরের
শ্রীনগরে অবস্থিত।
সম্রাজ্ঞী নূরজাহান
মসজিদটি নির্মাণ
করান। এটি
শাহী মসজিদ
নামেও পরিচিত।
পাথর নির্মিত
মসজিদটি কাশ্মীরের
আর সব
স্থাপনা থেকে
ভিন্ন শৈলীতে
নির্মিত। কিন্তু
ইতিহাসের ট্র্যাজেডি
হলো মসজিদটি
নামাজ আদায়ের
জন্য কখনো
ব্যবহূত হয়নি।
একজন নারী
নির্মাণ করেছেন
বলে মসজিদটি
স্থানীয় অধিবাসীরা
ব্যবহার করেনি।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের সমাধি, লাহোর:
লাহোরে
অবস্থিত সম্রাট
জাহাঙ্গীরের সমাধি
নির্মিত হয়েছিল
নূরজাহান বেগমের
তত্ত্বাবধানে। লাহোর
থেকে ছয়
মাইল উত্তর-পশ্চিমে
অবস্থিত নূরজাহানের
নিজস্ব বাগান
‘দিলকুশা’য়
নির্মিত হয়েছিল
এ সমাধি।
সমাধি ভবনের
ভেতরে অবস্থিত
সম্রাট জাহাঙ্গীরের
শবাধারটি সাদা
মার্বেল পাথরে
নির্মিত। পুরো
সমাধিটি লাল
বেলেপাথরে নির্মিত,
যার মধ্যে
আছে মার্বেলের
কাজ।
নূরজাহান
নিজের অর্থ
ব্যয় করে
অন্যদের জন্য
জাঁকজমকপূর্ণ ও
সুদৃশ্য সমাধি
নির্মাণ করলেও
নিজের সমাধিটি
রেখেছিলেন একেবারে
সাদামাটা। ১৬২৮
খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীরের
মৃত্যুর পর
নূরজাহান অনেকটা
একাকী জীবনযাপন
করতেন। নূরজাহান
মৃত্যুবরণ করেন
১৬৪৮ সালে।
তার সমাধিটি
জাহাঙ্গীরের সমাধির
কাছেই রাভি
নদীর তীরে
অবস্থিত। নকশার
দিক থেকে
এর সঙ্গে
নূরজাহানের পিতার
সমাধি ইতিমাদ-উদ-দৌলা
ও জাহাঙ্গীরের
সমাধির সঙ্গে
মিল আছে।
যদিও প্রথম
দুটির জাঁকজমক
ছিল না
নূরজাহানের সমাধিতে।
অনেকের কাছে
নূরজাহানের সমাধি
একটি রহস্য।
অনেকেরই প্রশ্ন,
এ সমাধি
কি পরিকল্পনা
অনুযায়ী নির্মাণ
শেষ হয়েছিল,
না অংশত
নির্মিত হয়েছিল?
কিন্তু নূরজাহানের
এপিটাফে লেখা
কবিতার পঙিক্তর
দিকে নজর
দিলে স্পষ্ট
হয়ে ওঠে
নূরজাহান নিজেই
নিজের জন্য
এ সাদামাটা
সমাধির পরিকল্পনা
করেছিলেন।
‘মৃত্যুর
পর আমার
কবরে
কোনো মোমবাতি
জ্বলবে না,
ছড়িয়ে থাকবে
না জুঁই
ফুল,
কাঁপা কাঁপা
শিখায় কোনো
মোমবাতি
স্মরণ করাবে
না আমার
খ্যাতি,
মাথার ওপর
কোনো বুলবুল
গান গেয়ে
দুনিয়াকে জানাবে
না যে
আমি মৃত।’
তথ্যসূত্র:
ড. সোমা
মুখার্জি, রয়াল মোগল
লেডিস অ্যান্ড দেয়ার কন্ট্রিবিউশন, জ্ঞান
পাবলিশিং হাউজ,
নয়াদিল্লি-২০১১
শানজিদ অর্ণব: লেখক ও সাংবাদিক





