প্রা ক-সাধারণ অব্দ ৩২৭-২৮ সময়ে মেসিডোনিয়ার রাজপুত্র দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডারের ভারতবর্ষ অভিযানকালে পূর্বদেশীয় শক্তিশালী গঙ্গাহৃদি/গঙ্গারিডি এবং প্রাসী/প্রাসই রাজ্যদ্বয়ের অস্তিত্ব ধ্রুপদী (গ্রিক-লাতিন) লেখকদের মাধ্যমে জানা যায়। উনিশ-বিশ শতকের ইতিহাসচর্চায় কিংবা হালফিলের প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের নানা প্রসঙ্গে উঠে আসে গঙ্গারিডি রাজ্যের বয়ান। জাতীয়তাবাদী কিংবা উত্তর-আধুনিক ইতিহাস লেখার পদ্ধতি অনুসারে ১৯৪৭ কিংবা ১৯৭১-পরবর্তী উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক বাস্তবতায় গ্রিক-লাতিন লেখনীতে পাওয়া এ শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান বিতর্কটি নানাভাবে জাতিরাষ্ট্রের পরিচয় ভাবনা (identity) বা অতীত গৌরবগাঁথার ঠিকুজিতে হয়ে ওঠে সরব।

ক্ল্যাসিক্যাল লেখকদের মধ্যে মেগাস্থিনিস ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি সান্দ্রাকোট্টসের (চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য) দরবারের চাক্ষুষ দর্শক; যদিও তার রচিত ইন্ডিকা গ্রন্থটির কোনো কপি প্রাচ্যবিদদের (orientalist) হাতে পৌঁছায়নি। কিন্তু পরবর্তী লেখক, ইতিহাসবিদ ও ভূগোলবিদদের অনেকেই মেগাস্থিনিসকে উদ্ধৃত করেছেন।

গ্রিক নৃপতি আলেকজান্ডারের ভারত বিজয় কিংবা তার নিকট পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাস রচয়িতারা গঙ্গারিডি এবং প্রাসই রাজ্যের কথা বলেছেন। এ লেখকদের তালিকায় আছেন ডায়াডোরাস সিকুলাস, কুইন্টাস কার্টিয়াস রুফাস, প্লিনি দি এল্ডার, মেস্ত্রিউস লুসিয়াস প্লুতার্ক ও স্ট্রাবো। এ লেখকদের রচিত কিতাবাদিতে ভারতের পূর্বাঞ্চলের শক্তিশালী রাজনৈতিক সত্তা ‘গঙ্গারিডি’ রাজ্যের নানা কথন-অতিকথন নথিভুক্ত হয়েছে।

‘গঙ্গারিডি’-এর সন্ধানে ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকরা নানামুখী প্রতর্কে জড়িয়েছেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা অকাট্য সাক্ষ্য হাজির করার ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই দেখিয়েছেন মুনসিয়ানা। কিন্তু একইভাবে সবাই স্বীকার করেছেন গ্রিক-লাতিন লেখকদের কেউই বাংলায় বা ভারতের পূর্বদেশে আসেননি। রাজ্যাটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে গঙ্গা নদী। অজ্ঞাত নাবিকের লেখা পেরিপ্লাস অব দি ইরিত্রিয়ান সি গ্রন্থে উপমহাদেশের পূর্ব উপকূলীয় বন্দর ও বাণিজ্য পণ্যের ফর্দে ‘গ্যাঙ্গে’ নামক বন্দরের উল্লেখ করা হয়েছে। মান্যবর নীহাররঞ্জন রায় পেরিপ্লাসের ইংরেজি অনুবাদক স্কফের থেকে নিম্নোক্ত অংশটুকু গাঙ্গে বন্দর এবং এ বন্দরের বিখ্যাত পণ্যের বিবরণসংবলিত অংশ উদ্ধৃত করেছেন। পাঠকের সমীপে সেটিরই পুনর্মুদ্রণ করা হলো:

There is a river it called the Ganges… on its bank is a market-town which has the same name as the river Ganges. Through this place are brought malabathrum and Gangetic spikenard and pearls and muslims of the finest shorts which are called Gangetic. It is said that there are gold-mines near these places and there is a gold coin which is called caltis.. (page 147)

নীহাররঞ্জন রায় তার বাঙ্গালীর ইতিহাস গ্রন্থে আদি পর্বের ইতিহাস কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ উপস্থাপনের প্রচেষ্টা করেছিলেন। এ গ্রন্থের রাষ্ট্র বিন্যাস, রাজবৃত্ত, ধনসম্বল কিংবা দৈনন্দিন জীবনের অধ্যায়ে (পৃষ্ঠা ১৪৭, ৩১৮, ৩৫৫, ৫৮ ও ৪৫৫) গঙ্গারাষ্ট্র বা গঙ্গারিডির উল্লেখ করেছেন। তার মতে, ‌এ সমুদ্রতীরবর্তী গঙ্গা বিধৌত দেশ যে বাংলাদেশ তাহা সুস্পষ্ট। এ দেশকেই গ্রিক ঐতিহাসিকেরা বলেছেন গঙ্গারাষ্ট্র বা Gangaridae. এ গঙ্গা-বন্দরের (তাম্রলিপ্তি থেকে পৃথক) রফতানি দ্রব্যগুলোর প্রথমেই পাচ্ছি malabathrum বা তেজপাতা। উত্তরবঙ্গের কোনো কোনো স্থানে, শ্রীহট্টে এবং আমাদের কোনো কোনো জায়গায় সাধারণভাবে পূর্ব বিহারের পার্বত্য জনপদগুলোয় এখনো প্রচুর তেজপাতা উৎপন্ন হয় এবং তাহার ব্যবসাও খুব বিস্তৃত। 

এর পরেই দেখছি গাঙ্গেয় পিপলির উল্লেখ; এরও উৎপত্তিস্থল বোধহয় ছিল বাংলার উত্তরে পার্বত্য সানু দেশ। (পৃষ্ঠা ১৪৭)

ভারতের আদি পর্বের ইতিহাসের আরেক পুরোধা গবেষক হেমচন্দ্র মনে করেন, গঙ্গারাষ্ট্রটি ভাগীরথীর পূর্ব তীরে অবস্থিত ও বিস্তৃত ছিল। গ্রিক-লাতিন ভাষায় বর্তমান লেখকের অজ্ঞতা ও মূর্খতা সত্ত্বেও Gangaridae-এর অনুসন্ধান কিছুটা দুঃসাহসী কাজ কিংবা ‘জেনেশুনে বিষ করেছি পান’ বৈ আর কিছু নয়। রমেশচন্দ্র মজুমদারের The Classical Account of India গ্রন্থের ঋণ স্বীকার করে বাকি আলাপ চলমান রাখাই সমীচীন।

গ্রিক লেখক ডায়োডোরাস সেকুলাস তার বিবলিওথেকা হিস্টোরিকা গ্রন্থে লেখেন,

First came a desert which it would take twelve days to traverse; beyond this was the river called the Ganges which had a width of thirty-two stadia, and a greater depth than any other Indian river; beyond this again were situated the dominions of the nation of the Praisoi and the Gandaridai, whose king, Xandrames, had an army of 20,000 horse, 200,000 infantry, 2,000 chariots, and 4,000 elephants trained and equipped for war.... Alexander, though sensible of the difficulties which would attend an expedition against the Gandaridai, had no thought of swerving from the path of his ambition..

একই রকম একটি বিবরণ কুইন্টাস কার্টিয়াস রুফাস দ্য হিস্ট্রি অব আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট (গ্রন্থটির গ্রিক নামের ইংরেজি অনুবাদ) লিখেছিলেন,

মরুভূমি পার হয়ে ১১ দিনের ভ্রমণ শেষে ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ নদী গঙ্গার দেখা মিলবে। এ নদীর সমান্তরালে দুদিকে গঙ্গারিডাই এবং প্রাসী রাজ্য দুটির অবস্থান। রাজা আগ্রামেস বহিঃশক্তির আগ্রাসী হামলা থেকে নিজের দেশকে নিরাপদ রাখার জন্য ২০ হাজার অশ্বারোহী এবং ২০ লাখ পদাতিক নিয়োজিত করেছেন। এছাড়া রয়েছে ঘোড়া টানা রথ। তবে এ বাহিনীর সবচেয়ে অপ্রতিরোধ্য অংশ হলো তিন হাজার হস্তীর সমন্বয়ে গঠিত হস্তীবাহিনী। (রমেশচন্দ্র মজুমদারের উদ্ধৃত ইংরেজি অনুবাদের বাংলা ভাষ্য)

ওপরের দুজন লেখকের রচনায়ই গঙ্গারিডাই ও প্রাসী রাজ্য পাশাপাশি অবস্থিত বলা হয়েছে। ডিওডোরাস সিকুলাসের ভাসায় গঙ্গার প্রবাহ ছিল নিম্নরূপ:

Now this river [the Ganges]... flows from north to south, and empties its waters into the ocean forming the eastern boundary of the Gangaridai.... when he [Alexander] had arrived with all his troops at the river Ganges, and had subdued all the other Indians, he abandoned as hopeless an invasion of the Gangaridai when he learned that they possessed four thousand elephants well trained and equipped for war

প্লিনি দি এলডারের বক্তব্য অনুযায়ী গঙ্গারিডি দেশটির মাঝ দিয়ে গঙ্গা নদীর শেষ অংশ প্রবাহিত। এছাড়া প্রাসীর রাজধানী পলিবোথ্রা (লোকমুখে পরিচিত পলিবথ্রি) ছিল একটি সুরক্ষিত সমৃদ্ধ নগর। ভূগোলবিদ স্ট্রাবোর জিওগ্রাফি গ্রন্থে গঙ্গা নদীকে গঙ্গারিডাই রাজ্যের পূর্বসীমা নির্দেশক হিসেবে বলা হয়েছে। এ ভূগোলবিদও উল্লেখ করেছেন যে, গঙ্গা ভারতবর্ষেও সর্ববৃহৎ নদী। এটি পাহাড়ি এলাকা থেকে সমতলে নেমে এসে পূর্বদিকে বাঁক নিয়ে পলিবোথ্রা শহর অতিক্রম করেছে। এর পরই এটি সাগর অভিমুখে যাত্রা করে এবং একটি স্রোতধারায় সাগরে গিয়ে মিলিত হয়। পলিবোথ্রা নগরীটি ছিল নিম্নরূপ:

It is said that Palibothra lies at the confluence of the Ganges and the other river, a city eighty stadia in length and fifteen in breadth, in the shape of a parallelogram, and surrounded by a wooden wall that is perforated so that arrows can be shot through the holes; and that in front of the wall lies a trench used both for defense and as a receptacle of the sewage that flows from the city; and that the tribe of people amongst whom this city is situated is called the Prasii and is far superior to all the rest; and that the reigning king must be surnamed after the city, being called Palibothrus in addition to his own family name, as, for example, King Xandrocottus to whom Megasthenes was sent on an embassy

রোমান মানচিত্র বিশারদ টলেমি মনে করেন, গঙ্গারিডাই রাজ্যের রাজধানী ছিল গাঙ্গে শহর (১৪৬ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ ও ১৯ ডিগ্রি ১৫ ফুট অক্ষাংশ) গঙ্গার পাঁচটি প্রবাহের (কোনোটির নামই তিনি বলেননি) অন্তর্ভুক্ত সব এলাকাই এ রাজ্যধীন। ব্রতীন্দ্রনাথ মুখার্জী তার কয়েন্স অ্যান্ড কারেন্সি সিস্টেম অব দি আরলি বেঙ্গল গ্রন্থে দেখান যে টলেমির অনুমান ও বর্তমানে গঙ্গার দুটি শাখা (পদ্মা ও ভাগীরথী) বাহিত অঞ্চল প্রায় কাছাকাছি পরিমাপের। অমিতাভ ভট্টাচার্য হিস্টোরিক্যাল জিওগ্রাফি অব দি আরলি মিডায়ভাল বেঙ্গল গ্রন্থে আরো সুনির্দিষ্ট করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তমলুক থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের কাছে যথাক্রমে গঙ্গার সর্বপশ্চিম এবং সর্বপূর্ব স্রোতধারাকে চিহ্নিত করেছেন। এ দুটি স্থানের মধ্যবর্তী দূরত্ব ঠিক ৩ ডিগ্রি (৮৭ ডিগ্রি ৫৩ ফুট থেকে ৯১ ডিগ্রি ৫৩ ফুট)

সাম্প্রতিক গবেষণায় অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরী গ্রিক-লাতিন বিবরণগুলোকে অক্ষরিক অর্থে গ্রহণ না করে এগুলো থেকে কিছু সাধারণ অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন:

১. প্রাসই/প্রাসী ও গঙ্গারিডাই/গঙ্গারিদয় অঞ্চলটি নিম্ন গাঙ্গেয় সমভূমিতে অবস্থিত এবং এদের রাজাদের এত বেশি সামরিক শক্তি ছিল যে আলেকজান্ডারের সৈন্যরা উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অংশ থেকে পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে অস্বীকার করেছিল।

২. প্রাসঈ/প্রাসী ও গঙ্গারিডাই/গঙ্গারিদয় ছিল পাশাপাশি অঞ্চল এবং গঙ্গার একটি প্রবাহ গঙ্গারিদয় রাষ্ট্রের পূর্বদিকের সীমানা তৈরি করেছিল।

৩. গঙ্গার শেষ অংশটি গঙ্গারিদয় রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহমান ছিল। টলেমি গঙ্গার দুটি শাখার মধ্যবর্তী এলাকাকে গঙ্গারিডাইয়ে রাজ্য হিসেবে চিহ্নিত করেন অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পশ্চিমে তমলুক এবং উত্তর-পূর্বে চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী অঞ্চল।

৪. প্রাসঈ/প্রাসীর রাজধানী পলিবোথ্রা ছিল বিশাল, সম্পদশালী এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি শহর। এটি গঙ্গা ও অন্য একটি নদীর (যার নাম বলা হয়নি) মোহনায় অবস্থিত। সম্ভবত এটি ছিল যমুনা নদী এবং প্রাচীন প্রয়াগ, তথা বর্তমান এলাহাবাদের কাছেই এদের সংযোগস্থল। এখান থেকে গঙ্গার একটু নিচের দিকে পাটলীপুত্র নগরীর অবস্থান, যাকে পলিবোথ্রা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

৫. একটি বর্ণনায় প্রাসঈ/প্রাসীর শাসকের নাম বলা হয়েছে সানড্রোকোট্টাস (চন্দ্রগুপ্ত), যাকে তার রাজধানীর নামানুসারে পলিবোথ্রাস নামেও ডাকা হতো। (বাংলার আদি পর্ব শিরোনামা গ্রন্থ অধ্যায় পৃষ্ঠা ৪৮২)

উপর্যুক্ত অনুসিদ্ধান্তগুলোর প্রথমটি উনিশ-বিশ শতকীয় জাতীয়তাবাদী ঘরানার অনুরণন। বিশ্বজয়ী বীরযোদ্ধা আলেকজান্ডারের সমতুল্য করে নিজকে (self) দেখানোর চেষ্টা সেখানে স্পষ্ট। একুশ শতকীয় ইতিহাস রচনার কায়দায় কিছুটা ত্যাজ্য ও অব্যবহৃত। অবশ্য আত্মপরিচয় অনুসন্ধান এবং আত্মগরিমার মায়াজালে আটকে পড়ার প্রমাণ সেখানে নেই। বাকি সিদ্ধান্তগুলো লিওপোল্ড ফন র‍্যাংকের দেখানো নৈর্ব্যক্তিকতা (objectivity) কোহিনুরের মতো জাজ্ব্ল্যমান।

গ্রিক রোমান লেখকদের পলিবোথ্রা যে পাটলীপুত্র নগরী সে বিষয়ে বিতর্কের অবসান হয়েছে অনেক আগেই। এছাড়া সান্দ্রাকোট্টাস হলো চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের নামটির গ্রিক ভার্সন। গঙ্গারিডি রাজ্যের পরিচয় অনুসন্ধানে দেশজ লিখিত সূত্রগুলো নীরব। পাওয়া যায়নি কোনো লিপিতাত্ত্বিক ও মুদ্রাতাত্ত্বিক প্রমাণ। কিন্তু পাটলীপুত্রের ঐতিহাসিকতা, অবস্থান, প্রত্নতাত্ত্বিক বাস্তবতা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই। পক্ষান্তরে গঙ্গারিডি রাজ্য বা গাঙ্গে বন্দরের অবস্থান নিয়ে নানা মুনির নানা মত। ১৯৪৭-পরবর্তী ইতিহাসের আলোচনা এবং একুশ শতকীয় প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের মাধ্যমে এ বিষয়ে নতুন নতুন প্রস্তাব গবেষকদের লেখায় পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ-ফ্রান্স যৌথ উৎখননের বাংলাদেশের মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত প্রত্নবস্তু প্রমাণ করেছে যে প্রাকার বেষ্টিত এ সুরক্ষিত নগরটি ছিল একটি সমৃদ্ধশালী রাজধানী এবং তা আলেকজান্ডারের সমসাময়িক। অনেকেই এটিকে গঙ্গারিডাই রাজ্যের কেন্দ্র হিসেবে অনুমান করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের চন্দ্রকেতুগড়ে প্রাপ্ত টেরাকোটা ফলক এবং অন্যান্য প্রত্ন নিদর্শনাদির আলোকে অনেকে দাবি করেন গাঙ্গে বন্দরটি মূলত চন্দ্রকেতুগড়েই ছিল। গত দুই দশকে বাংলাদেশের নরসিংদী জেলার উয়ারি-বটেশ্বর গ্রাম দুটি উৎখনন করেছেন মান্যবর সুফি মোস্তাফিজুর রহমান। এখানে পাওয়া গেছে ছাপাঙ্কিত মুদ্রা, নানা রঙ ও মানের গুটিকা (bead), প্রাকার বেষ্টিত দুর্গনগরী, স্থাপত্য নিদর্শনাদি এবং ধাতব দ্রব্যাদির উপস্থিতি ইঙ্গিত করে এ এলাকায় প্রাক-সাধারণ অব্দ ষষ্ঠ থেকে তৃতীয় শতাব্দীতে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামো বিদ্যমান ছিল। উৎখনকদের প্রস্তাব অনুযায়ী উয়ারি-বটেশ্বর প্রাচীন ভারতের ডাবল ডিফেন্স সিস্টেমে তৈরি হওয়া দুর্গনগরী। সুফি মোস্তাফিজুর রহমান ও তার দল মনে করেন গ্রিক-লাতিন লেখনীর গঙ্গারিডির অংশ ছিল এ দুর্গনগরী।

ইতিহাস বহুস্বর এবং বহু ভাষ্যেও সংমিশ্রণ। বহতা নদীর মতো নানা স্রোতকে নিয়ে চলছে এর শাস্ত্রকথন। একরৈখিক উপসংহারের মাধ্যমে অতীত কথনের ভঙ্গিমা বর্তমানে প্রায় অচল। প্রতিটি ইতিহাসই এখন লেখকের নিজস্ব ভাষ্য, যেখানে সে অন্যের ভাষ্যকেও স্থান দেয়। অন্যকে নাকচ না করে নিজের ভাষ্য বা my version of past-বলাটাই এখন রেওয়াজ। বর্তমান লেখক জাতিরাষ্ট্রে জন্ম নেয়া এবং জাতি রাষ্ট্রের কাঠামোয় গড়ে ওঠা। তার উপসংহার জাতীয়তাবাদী ঘরানার দিকে ঝুঁকবে, সেটাই স্বাভাবিক। তাই যুক্তিতর্কের খোলসে উপর্যুক্ত বিষয়টির সরল উপস্থাপনের মাধ্যমে সমাপ্তি টানা শ্রেয়।

শহিদুল হাসান: সহযোগী অধ্যাপক

ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়