যখন তিনি সসৈন্য মেসিডোনিয়া ত্যাগ করলেন, কেউ কল্পনাও করেনি কোথায় গিয়ে থামবে ঘোড়ার দাপট। বলকান, এশিয়া মাইনর, সিরিয়া, ব্যাবিলন, পারস্য ও গান্ধার অতিক্রম করে দাঁড়ালেন ভারতের দুয়ারে। এ মহাবীরকে ইতিহাস আলেকজান্ডার বলে জানলেও ভারতবর্ষে তার প্রভাব বুলন্দ হয়েছে বাদশা সেকান্দার নামের মধ্য দিয়ে। বাদশা সেকান্দার চেয়েছিলেন বিশ্ব জয় করতে। সে ধারাবাহিকতা অক্ষত রাখতেই তক্ষশীলার রাজা অম্ভির সহযোগিতায় সিন্ধু নদী অতিক্রম করেন। ব্যাপক যুদ্ধ হয় রাজা পুরুর সঙ্গে, পশ্চিমা ঐতিহাসিকরা যাকে হাইডেসপাসের যুদ্ধ নামে অভিহিত করেন। দুই পক্ষেই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়। বাদশা সেকান্দারের প্রিয় ঘোড়া বোকেফ্যালাস নিহত হয়। ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে আহত হন তিনি নিজেও। তবে খুব দ্রুত  অশ্ববাহিনী দিয়ে রাজা পুরুর হস্তিবাহিনীকে ঘিরে ফেলেন তিনি। রক্তক্ষয়ী সে যুদ্ধে সৈন্যদের ক্ষতির মাত্রা চিন্তা করে সেকান্দার শাহ দূত পাঠান রাজা পুরুর কাছে। সন্ধির চুক্তি অনুসারে পুরু তার রাজ্যের ওপর অধিকার ফিরে পায়। মেসিডোনিয়ার সেনাবাহিনীতে আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার তীব্র অনীহা। সেদিক বিবেচনা করেই সেকান্দার মুলতান, বেলুচিস্তান ও সিন্ধু হয়ে ফেরার পথ ধরলেন। তিনি এসেছিলেন পারস্য, তক্ষশীলা ও ব্যাক্ট্রিয়া হয়ে উত্তরের পথ দিয়ে। আর দক্ষিণের পথে বের হয়ে ব্যাবিলনে অবস্থানকালে মৃত্যুবরণ করেন। 

পুরু রাজ্যেই প্রাচ্যের শেষ রাজ্য না। স্বাভাবিকভাবেই সেকান্দার শাহ আরো এগিয়ে যেতে চাইছিলেন। হাইডাসপেসের যুদ্ধের পর আরো পুবের দিকে যান যুদ্ধের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য। তিনি চেনাব ও রাভি নদী অতিক্রম করেন। কাথা রাজ্যে অভিযান চালিয়ে রাজধানী সঙ্গল দখলে নেন অনেকটা দ্রুত সময়ের মধ্যেই। তবে সে যুদ্ধটিও হয়েছিল রক্তক্ষয়ী। প্রায় ১৭ হাজার মানুষ নিহত হয়, বন্দি করা হয় ৭০ হাজার মানুষকে। সেকান্দার শাহের নিষ্ঠুরতা পার্শ্ববর্তী রাজাদের তটস্থ করে তুলেছিল। তারা বিনাযুদ্ধে আনুগত্য প্রদর্শন করতে লাগল। পুরু রাজ্যের পূর্বে গঙ্গা নদীর পাশ ঘেঁষে ছিল নন্দ সাম্রাজ্য ও গঙ্গারিডি। ততদিনে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সৈন্যরা। প্লুটার্ক জানাচ্ছেন, পুরুর সঙ্গে যুদ্ধের পর অনেকটাই মনোবল কমে গিয়েছিল মেসিডোনিয়ার বাহিনীর মধ্যে। তারা আরো সামনে এগিয়ে যেতে বিরোধিতা করতে লাগল। যেন গঙ্গা নদী আর অতিক্রম করা না হয়। কারণ দূত মারফত তারা জেনেছেন নদীর ওই পাশে বিপুল বাহিনী অপেক্ষা করছে অশ্ব ও হাতি নিয়ে। গঙ্গারিডি ও প্রাসিয়াই রাজার সৈন্য সংখ্যা সব মিলিয়ে তখন ৮০ হাজার অশ্বারোহী, দুই লাখ পদাতিক, আট হাজার রথ এবং ছয় হাজার হাতি। ফলে অবসন্ন মেসিডোনিয়া বাহিনী তাদের সঙ্গে পেরে উঠবে বলে মনে করেনি। প্রাসিয়াই ও গঙ্গারিডি দুটি আলাদা রাজ্য। প্রাসিয়াই ছিল গঙ্গারিডির ঠিক পশ্চিমে। যা-ই হোক, পুবের দুই শক্তিধর রাজ্যের কথা উঠতেই গ্রিক সেনাবাহিনী নড়েচড়ে উঠল। তারা সেকান্দার শাহের কাছে বাড়ি যাওয়ার আর্জি জানায়। ঝিলাম ও বিপাশা নদীর পাশের অঞ্চলটিকে পুরুর অধীনে দিয়ে তিনি ফিরতে শুরু করেন ৩২৬ সালে। ঝিলাম ও সিন্ধুর তীর ঘেঁষে তারা যখন ফিরছিল, যখন ভারতীয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বারা তারা আক্রান্ত হয়। মালভ ও খুদ্রকদের থেকেও ব্যাপক বাধার সম্মুখীন হন। সেকান্দার শাহ একের পর এক বেকায়দায় পড়েন সেখানে। মালভদের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি আহত হন।

সেকান্দার শাহ কেন ফিরে গেলেন, এনিয়ে সমকালীন গ্রিক ঐতিহাসিকদের বিবরণের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। পুরুর সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে ডিওডোরাস দাবি করেন, ‘সেকান্দার শাহ তার সৈন্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় কয়েকজন ব্যক্তি তার কাছে খবর নিয়ে এল তার কাছে পরাজিত পুরু রাজের ভাতিজা পালিয়ে গঙ্গারিডি রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছে।’ সেকান্দার শাহ দূত ফেগাসের কাছ থেকে একটা ধারণা নিলেন। প্রথমে তাকে নিকটবর্তী মরুভূমির কথা জানানো হলো, যা পার হতে সেনাবাহিনীর ১২ দিন লাগবে। এরপর রয়েছে একটি প্রশস্ত নদী, যার নাম গঙ্গা। গ্রিক পরিমাপ ব্যবস্থায় প্রায় বত্রিশ স্টেডিয়া বিস্তৃতি তার। অন্য যেকোনো ভারতীয় নদীর তুলনায় গভীরতাও বেশি। আর নদীর অন্য পারে রাজ্য প্রাসিয়াই ও গঙ্গারিডি। সেখানকার এক রাজা প্রবল শক্তিধর। তার সেনাবাহিনীতে রয়েছে ২০ হাজার ঘোড়া, দুই লাখ পদাতিক, দুই হাজার রথ এবং চার হাজার প্রশিক্ষিত হাতি। এ গঙ্গা নদী প্রবাহিত হয়েছে উত্তর থেকে দক্ষিণে। উত্তর থেকে দক্ষিণে পানি পড়ে তৈরি করেছে প্রাকৃতিক দেয়াল। গঙ্গারিডি এমন এক রাজ্য, যেখানে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্রশিক্ষিত হাতি ব্যবহৃত হয়।’ এ কথা সত্য যে  গঙ্গারিডির রণহস্তীর খবর সেকান্দার শাহের জয়ের নেশা বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু রণক্লান্ত সৈন্যদের তিনি মানাতে পারলেন না, ভগ্নমনোরথ হয়ে ফিরে গেলেন। ঐতিহাসিক ক্যালিসথিনিস তার পাণ্ডুলিপি সেকান্দার শাহের সামনে রেখে ভেবেছিলেন রাজা খুশি হবেন। প্রশস্তিকারের অতিরঞ্জনে বিরক্ত হয়ে পাণ্ডুলিপিটা সেকান্দার শাহ সিন্ধু নদে ছুড়ে ফেলেছিলেন। মুখ ঘুরিয়ে অন্যদের জানিয়ে দিলেন, পাণ্ডুলিপির সঙ্গে লেখককেও ছুড়ে ফেলে দিলে মন্দ হয় না। সেকান্দার শাহ ব্যতিক্রম। রাজারা সাধারণত প্রশস্তিতে তুষ্ট হন। তার ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে ঐতিহাসিক ডিউডেলাস সেকুলাস বলেন, ‘যদিও সেকান্দার শাহ সারা এশিয়া জয় করেছিলেন, তার পরও তিনি গঙ্গাপাড়ের সেই সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়া থেকে বিরত থাকলেন। কারণ যখন তিনি তার সমস্ত সৈন্য নিয়ে গঙ্গার পাড়ে পৌঁছলেন, তখন জানতে পারলেন তার বিরুদ্ধে চার হাজার হাতির এক বিশাল বাহিনী নিয়ে শত্রুপক্ষ অপেক্ষা করছে।’ 

মেগাস্থিনিস তার ইন্ডিকা গ্রন্থে দাবি করেছেন, গঙ্গারিডি রাজ্যেরই সবচেয়ে বড় হস্তীবাহিনী ছিল। আর এর কারণেই সে দেশ কখনই অন্য কোনো দেশের কাছে পরাজিত হয়নি। কারণ অন্য সব দেশই ওই রাজ্যের হস্তীবাহিনীকে ভয় পেত। সেকান্দার শাহ এশিয়া জয় করার পরও গঙ্গারিডিতে আটকে গেলেন। যখন তিনি গঙ্গারিডির সামরিক শক্তি সম্পর্কে জানতে পেলেন, বাদ দিলেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার আশা। সেকান্দার শাহের সেই ফিরে যাওয়ার আখ্যান অনেক দিক থেকেই হতাশাজনক। সৈন্যরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে বেলুচিস্তানের মরুভূমি অতিক্রম করে। অনেকেই মারা যায় ও অসুস্থ হয়ে পড়ে অনেকে। সবশেষে তারা ব্যাবিলনে হাজির হয়। কিন্তু ভাগ্য আর সহায় ছিল না। খুব দ্রুত তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মেসিডোনিয়া থেকে উঠে এসে সেকান্দার শাহ বিশ্ব জয় করেছিলেন। পদানত করেন একের পর এক বিশাল সাম্রাজ্য। কিন্তু বাংলার দুয়ারে এসে তিনি ইস্তফা দিলেন সমস্ত জয়যাত্রার। ফিরে গেলেন শূন্য হাতে।

আহমেদ দীন রুমি: লেখক