একসময় হোমওয়ার্ক মানেই ছিল বইয়ের পাতা উল্টে নোট নেয়া, খাতায় কলম চালানো আর পরীক্ষার আগে নিজের মতো করে প্রশ্ন তৈরি করে অনুশীলন। এখন সেই দৃশ্যে যুক্ত হয়েছে নতুন এক ‘অদৃশ্য সহপাঠী’—চ্যাটজিপিটিসহ অন্যান্য জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) টুল। কয়েক সেকেন্ডেই জটিল প্রশ্নের উত্তর, সারসংক্ষেপ কিংবা ব্যাখ্যা দিতে পারা এ প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের শেখার ধরন বদলে দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে এআই কি শেখার প্রক্রিয়ায় সহায়ক, নাকি একাডেমিক সততার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ?
বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে বলছেন, মূল সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, সমস্যা এর ব্যবহারের সীমা নির্ধারণে।
কপি-পেস্ট নয়, নিজস্ব চিন্তাই মূল
চ্যাটবটের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ভাষা। সুগঠিত, যুক্তিসংগত ও পরিপূর্ণ উত্তরের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই তৈরি হচ্ছে কপি-পেস্টের প্রলোভন। অথচ শিক্ষাবিদরা বলছেন, এতে শেখার মূল উদ্দেশ্যটাই হারিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এআই কখনই শিক্ষার্থীর নিজস্ব চিন্তা ও শ্রমের বিকল্প হতে পারে না। পাঠ্যবই বা অন্যের লেখা যেমন নিজের নামে জমা দেয়া যায় না, তেমনি চ্যাটবটের তৈরি উত্তরও নিজের কাজ হিসেবে উপস্থাপন করা একাডেমিক অসততার শামিল।
বিশ্ববিদ্যালয়টির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এআই ধারণা পরিষ্কার করতে বা আইডিয়া পেতে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত কাজ অবশ্যই শিক্ষার্থীর নিজস্ব হতে হবে।
ইয়েল ইউনিভার্সিটির পুওরভু সেন্টার ফর টিচিং অ্যান্ড লার্নিং সতর্ক করে বলেছে, এআই দিয়ে ব্যাখ্যা, সারসংক্ষেপ এমনকি আউটলাইন তৈরি করলেও শিক্ষার্থীর শেখার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এভাবে এআইয়ের ওপর নির্ভরশীল হলে পরবর্তী পরীক্ষা বা মূল্যায়নে তারা দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারেন না।
টিউটর/স্টাডি এইড হিসেবে এআইয়ের কার্যকর ব্যবহার
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই ব্যবহারের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে ‘টিউটর’ বা ‘স্টাডি বাডি’ হিসেবে। কঠিন বিষয় ব্যাখ্যা করা, নতুন আইডিয়া বের করা বা নিজেকে যাচাই করার ক্ষেত্রে এটি যথেষ্ট কার্যকর বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
ক্যালিফোর্নিয়ার এক হাইস্কুলের ইংরেজি শিক্ষক কেসি কুনি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার আগে নিজেকে যাচাই করার জন্য চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস নোট, স্টাডি গাইড ও স্লাইড আপলোড করে নির্দিষ্ট অধ্যায়ের ওপর প্রশ্ন করে কুইজ দিতে পারে।
নিজের ভাষায় বোঝার সুযোগ
এআই-ভিত্তিক শিক্ষা প্লাটফর্ম ফ্লিন্টের প্রধান নির্বাহী সোহান চৌধুরীর মতে, চ্যাটজিপিটির ভয়েস ডিকটেশন ফিচার শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীরা কোনো বিষয় নিয়ে কী বোঝে আর কী বোঝে না তা নিজের ভাষায় এলোমেলোভাবে বললেও এআই তা বিশ্লেষণ করে ব্যাখ্যা দিতে পারে। এতে শেখার প্রক্রিয়া আরো সহজ হয়।
প্রতিষ্ঠানের এআই নীতিমালা জানা জরুরি
এআই ব্যবহারে একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো একক অবস্থানে পৌঁছেনি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় দুই ডজন অঙ্গরাজ্যে স্কুল পর্যায়ে এআই ব্যবহারের নির্দেশনা থাকলেও তা সর্বত্র সমানভাবে প্রয়োগ হয় না।
ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো জানিয়েছে, কোনো কোর্সে শিক্ষক স্পষ্ট অনুমতি না দিলে শিক্ষার্থীরা জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করতে পারবে না। অন্যদিকে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট বাফেলোতে কোনো সর্বজনীন নীতি নেই। শিক্ষকরা নিজ নিজ কোর্সে কোন টুল ব্যবহার করা যাবে তা নির্ধারণ করতে পারেন।
এআই ব্যবহারে স্বচ্ছতা জরুরি
শিক্ষকরা বলছেন, এআই আর ‘ভয়ের বিষয়’ নয়। ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে শিক্ষার্থীদের এ প্রযুক্তি ব্যবহার করতেই হবে। তাই এআই ব্যবহারের বিষয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ।
ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো স্পষ্টভাবে বলছে, আইডিয়া তৈরি, লেখা সারসংক্ষেপ বা খসড়া তৈরিতে এআই ব্যবহার করলে তা যথাযথভাবে উল্লেখ করা উচিত। বই বা ওয়েবসাইটের মতোই প্রয়োজনে এআই ব্যবহারের স্বীকৃতি দিতে হবে।
ব্যবহারে নৈতিকতা
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন নৈতিক ও দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি বলছে, এআই ব্যবহার করতে হবে সততা, সমালোচনামূলক চিন্তা ও একাডেমিক মান বজায় রেখে। —এপি অবলম্বনে










