প্রতি বছর মার্চের দ্বিতীয় শুক্রবার বিশ্বব্যাপী ‘বিশ্ব ঘুম দিবস’ পালন হয়ে আসছে। সে ধারাবাহিকতায় এ বছরের ১৪ মার্চ দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এ দিবস উপলক্ষে গোলটেবিলের আয়োজন করে চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে চ্যানেল আই কার্যালয়ে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন ডা. জিয়াউল করিম। বৈঠকের ইলেকট্রনিক মিডিয়া পার্টনার ছিল চ্যানেল আই, সায়েন্টিফিক পার্টনার ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস ও প্রিন্ট মিডিয়া পার্টনার বণিক বার্তা

ডা. জহিরুল ইসলাম
সভাপতি
চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
জনগণকে সচেতন করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। মানবশরীরে সুস্থতা ও মনকে সতেজ রাখার জন্য ঘুম অপরিহার্য। ঘুমের ব্যাঘাতের কারণে আমরা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো ঘুম নিশ্চিত করা সম্ভব। ঘুম কম হওয়ার কারণ আধুনিক জীবনযাত্রা, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা। রাতে মোবাইল ব্যবহারের কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে। শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো উদ্বেগজনক। মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহারে তাদের পড়াশোনা ও স্কুলে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। ঘুমের ব্যাঘাত ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পর্যায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কর্মক্ষমতা হ্রাস, স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা ও কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ার ফলে উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যানবাহনের চালকদের ঘুমের সমস্যা থেকে দুর্ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে, ফলে অকালপঙ্গুত্ব বা মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটছে। ফলে পরিবার ও সমাজে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের ব্যাঘাতের কারণে বিভিন্ন দেশে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সঠিক চিকিৎসা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা ও প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে আমাদের সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

অধ্যাপক ডা. খোরশেদ মজুমদার
নাক-কান-গলা রোগ বিশেষজ্ঞ
আমাদের নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞদের লক্ষ্য হলো কোয়ালিটি অব স্লিপ। কোয়ালিটি স্লিপের জন্য প্রয়োজন পরিপূর্ণ অক্সিজেন সরবরাহ ও শরীরে অক্সিজেনের চাহিদা পূর্ণ করা। কোয়ালিটিফুল স্লিপের জন্য দরকার অক্সিজেনের সরবরাহ। নাক-কান-গলার মাধ্যেমে যেহেতু অক্সিজেনটা ফুসফুসে যাবে। এখানে কোনো অবস্ট্রাকশন আছে কিনা সেটি দেখতে হবে। আমি অক্সিজেনের ফ্রি প্রবাহ চাই। এ প্রবাহকে যেন সম্পূর্ণভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারি সেটিই ইএনটি বিশেষজ্ঞদের লক্ষ্য। মানুষের ওজন যখন বেড়ে যায়, তখন তার শরীরে চাহিদা বেড়ে যায়। অক্সিজেনের চাহিদাও বেড়ে যায়। তার তো সে পেসেস নেই। শ্বাসপ্রশ্বাসে শিশুদের অবস্ট্রাকশন থাকলে সার্জারি করলে হয়ে যাচ্ছে। যুবকদের ক্ষেত্রে দেখি তাদের নাকের মধ্যে ডেভিয়েশন আছে, অ্যালার্জির কারণে মাংস বেড়ে অনেক রোগ হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্কদের অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় জন্মগতভাবে ইয়ার পেসেসটা একটু সরু। পরে মোটা হয় গেলে, তখন শরীরের চাহিদাটা বেড়ে গেল। তখন চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়, তখন আমরা সার্জারি করে থাকি। আমরা মেকানিক্যাল অবস্ট্রাকশন ওভারকাম করার জন্য সার্জিক্যাল চিকিৎসাটা করি। ইয়ার পেসেসটাকে আছে সেটি খুলে দিই। এতে রোগী ঘুমাবে এবং সুন্দর জীবনযাপন করবে।

ডা. আশরাফুল আলাম খান
কার্যকরী সদস্য
চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
যারা এতক্ষণ স্লিপ অ্যাপনিয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন, সেখানে একটি শব্দ বারবার চলে এসেছে সেটি হলো স্থূলতা। স্থূলতার একটি মূল কারণ হলো অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া। স্থূলতার কারণে দেখা যায় তার গলা, ঘাড় ও শ্বাসনালি সেখানে চর্বির কারণে শ্বাসনালিটি সরু হয়ে যায়। এ শ্বাসনালি সরু হওয়ার কারণে অনেক সময় শ্বাসকষ্ট হয়, নাক ডাকার মতো সমস্যা হয়। স্থূলতার জন্য আরো কিছু সমস্যা দেখা দেয়। অনেক সময় স্থূলতার জন্য রোগীর ফুসফুসে সমস্যা হয়। রোগীর ফুসফুসের সক্ষমতা কমে যায়। এছাড়া মেকানিক্যাল যে কাজগুলো আছে সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার একজন স্লিপ অ্যাপনিয়া ব্যক্তি যখন ঘুমানোর জন্য যায়, তখন তার শ্বাসনালিটা এ মেকানিক্যালের কারণে আরো সরু হয়ে যায়। ফলে তার শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। স্লিপ অ্যাপনিয়া ও স্থূলতা একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। দেখা যাচ্ছে, এ কারণে ওজন বেড়ে যাচ্ছে এবং স্থূলতা হচ্ছে। চিকিৎসার সময় দুটোরই একই সঙ্গে চিকিৎসা দিতে হয়।

ডা. গোলাম সারওয়ার লিয়াকত হোসেন ভূঁইয়া
মহাসচিব
চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদশ
‘বিশ্ব ঘুম দিবস’-এর এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় সুস্বাস্থ্যের জন্য ঘুমকে অগ্রাধিকার দিন। এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য বিশ্বব্যাপী মানুষ ও চিকিৎসকের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। এর মাধ্যমে আমরা প্রথম যে দিকটিকে প্রাধান্য দেব তা হলো সুস্বাস্থ্যের জন্য ঘুমের প্রয়োজনীয়তা ও পরিমিত ঘুমের অভ্যাস। আমরা জানি, প্রত্যেকটা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। ঘুমের সময় সে সমস্যাগুলো হয় সেগুলো চিহ্নিত করা, সেগুলোর সমাধান করা। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তার প্রতিকার ও ক্ষেত্রবিশেষ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এসব বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য দিবসটি পালন করা হয়। পাশাপাশি আমরা কিছু বিষয় তুলে ধরি। ঘুমের সঙ্গে আরো কিছু জিনিসের সম্পর্ক আছে। পরিমিত ঘুম না হলে মনোযোগের ব্যাঘাত ঘটে, কর্মক্ষমতা কমে যায়। এতে আমরা বিভিন্ন সমস্যায় ভুগি। বিশেষ করে যাদের নিয়মিত এক ধরনের কাজ করতে হয়, তাদের বেশি সমস্যা হয়। রোড অ্যাক্সিডেন্টের একটা বড় কারণ ঘুমজনিত সমস্যা। আমাদের কিছু ডিজিজ আছে, সেগুলোর জন্য ঘুম দায়ী। যারা মোটরবাইক চালায়, তাদের ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো সমস্যা থাকলে অ্যাক্সিডেন্টের ঝুঁকি নয় গুণ বেড়ে যায়। চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এ দিবস পালন করছে। অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপেনিয়া রোগে আক্রান্ত হলে অ্যাজমা, সিওপিডি টাইপের রোগও নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সে জিনিসগুলো বিবেচনা করে আমরা এ দিবস পালনের উদ্যোগ নিই।’

অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম
কার্যকরী সদস্য
চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
কী কী কারণে স্লিপ অ্যাপনিয়া হয় বা ঝুঁকির কারণগুলো কী? এ সম্পর্কে বলতে গেলে সর্বপ্রথমে আসে—পুরষ আর নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নারীরা আক্রান্ত হয়। আরেকটি কারণ স্থূলতা। এটি স্লিপ অ্যাপনিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ৫০ শতাংশ রোগীর দেখা যায় স্লিপ অ্যাপনিয়ার পেছনের মূল কারণ স্থূলতা। আবার কিছু সুনির্দিষ্ট ওষুধ রয়েছে, যেগুলোর ফলে দেখা যায় ঘুমের ঘাটতি হয়। আবার কিছু রোগ রয়েছে, যেগুলোয় আক্রান্ত হলেওে স্লিপ অ্যাপনিয়া হয়। স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের ডায়াগনোসিস করা খুব সহজ। আমাদের কাছে যখন রোগী আসে আমরা তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বলতে পারি স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত। তাদের বেশির ভাগের শর্ট নেক থাকে। এছাড়া রাতে ঘুম না হওয়ার হিস্ট্রি থাকে। স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে আনলেই স্লিপ অ্যাপনিয়া অনেকটা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ডা. মো. জালাল মহসীন উদ্দিন
সাংগঠনিক সম্পাদক
চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
এ রোগের উপসর্গগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হলে আগে মানুষকে জানাতে হবে লক্ষণগুলো কী কী। একসময় প্রচলিত ছিল নাক ডেকে ঘুমানো। আমরা মনে করতাম নাক ডেকে ঘুমানো মানে শান্তির ঘুম। নাক ডাকা ঘুমানো ক্ষতিকর হতে পারে। সুতরাং নাক ডেকে ঘুমানো কিন্তু সবসময় শান্তির ঘুম না। এটি স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত সব রোগীর ক্ষেত্রে উপস্থিত থাকে। তবে নানা কারণে রোগীরা নাক ডাকতে পারে। এটি যারা একটু স্থূলকায় তাদের এটা হওয়ার সমস্যা থাকে। কারণ শরীরের চারদিকে যেমন ফ্যাট জমে, তেমনি গলার চারদিকে ফ্যাট জমে। তখন শ্বাসপ্রশ্বাসে ঝামেলা হয়। বিশেষ করে ঘুমানোর সময় এ সমস্যা বেশি দেখা দেয়। আমরা জানি, এটি একটি মেটাবোলিক সিনড্রোম। যেমন স্থূলতা, ডায়াবেটিস, হাইপার টেনশন। ওবেসিটির একটা অন্যতম আউট প্রডাক্ট হলো স্লিপ অ্যাপনিয়া। সারারাত ঘুমালেও ঘুম পরিপূর্ণ হয় না। ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠলেও ক্লান্তি ভাব, ঝিমানি থাকে। ঝিমানি থাকে সারাদিন। কর্মক্ষেত্রে তার কাজে সমস্যা হয়। তার কাজের প্রতি মনোযোগও কমে যায়। মেজাজ খিটখিটে থাকে। আবার ঘুম কম হলে স্থূলকায় হয়ে যায় মানুষ। ঘুম কমের কারণে ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি কমে যায়। যার কারণে আরো বেশি মোটা হয়ে যায়। আরো বেশি স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হতে থাকে। সাইকেলটি ভাঙার জন্য হলেও এ রোগের চিকিৎসা করা অতীব জরুরি।

অধ্যাপক ডা. দেলোয়ার হোসেন
সহসভাপতি
চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
‘৮০ ধরনের স্লিপ ডিসঅর্ডার থাকে। আমরা আমাদের পুরো জীবনে কোনো না কোনো সময় স্লিপ ডিসঅর্ডারে ভুগে থাকি বা ঘুমের রোগে ভুগছি। আমাদের কমন ডিসঅর্ডার থাকে, সেগুলো হলো ইনসোমনিয়া। যখন একটি লোক ঘুমাতে যায় কিন্তু ঘুম আসে না। অথবা বারবার ঘুম ভেঙে যায়। এটি হলো ইনসোমনিয়া। আমরা আমাদের জীবনে কোনো কোনো সময়ে এ রোগে ভুগছি। আরেকটি হলো স্লিপ অ্যাপনিয়া। দেখা গেল একটি লোক ঘুমাচ্ছে, হুট করে ঘুম ভেঙে গেল। এ ধরনের ডিসঅর্ডারগুলো আমাদের ডায়াগনোসিস করতে হবে এবং সঠিক চিকিৎসা দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় রোগী এসে বলে ঘুমের মধ্যে পায়ে ব্যথা হয়, পা নাড়াতে পারে না। এসবের মূল কারণ তার পর্যাপ্ত ঘুম হয় না। এবং সে ঘুম থেকে উঠে যায়। আরেকটি আছে প্যারাসোমনিয়া। সেক্ষেত্রে ব্যক্তি দেখা যায় ঘুমের মধ্যে হাঁটে বা খাওয়া-দাওয়া করে। সে তার অজান্তেই এ কাজগুলো করে। আরেকটি আছে নারকোলেপসি। সেক্ষেত্রে দেখা যায় যে ঘুমাচ্ছে, তার ঘুম পরিপূর্ণ হচ্ছে না। দেখা যায় সে এক জায়গায় বসছে বা কাজ করছে সেখানেই ঘুমে পড়ে যাচ্ছে। আবার শিফটিং ওয়ার্ক ডিসঅর্ডার আছে। যারা নাইট ডিউটি করে তারা রাতে ঘুমাতে পারে না। তারা দিনে ইনসোমনিয়া বা হাইপার ইনসোমনিয়ায় ভোগে। এ রকম বিভিন্ন ধরনের স্লিপ ডিসঅর্ডার আছে। আমাদের কাজ হলো এগুলো ডায়াগনোসিস করা এবং চিকিৎসা দেয়া।

ডা. আব্দুস শাকুর খান
কার্যকরী সদস্য
চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
আমরা যখন অনেক ক্রিয়াকলাপ করি, তার মাঝখানে আমাদের কোয়ালিটিফুল বিশ্রামের দরকার হয়। কোয়ালিটিফুল বিশ্রামের জন্য হেলদি স্লিপ দরকার। এটি শরীরের একটি ফিজিওলজি। শরীর বিভিন্ন কায়িক পরিশ্রম করবে, মানসিক পরিশ্রম করবে। এর মধ্যে বিশ্রাম নিতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক যারা তাদের ৭-৯ ঘণ্টার বিশ্রামের দরকার হয়। অর্থাৎ ঘুমের প্রয়োজন আছে। আমাদের পুরো শারীরিক কার্যক্রম একটি কেমিস্ট্রি। অল কেমিস্ট্রি একইভাবে চলতে পারে না। এজন্য ঘুম বা রিচার্জের দরকার হয়। রিচার্জের একটি অংশ হলো স্লিপ। ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমালেও অনেক ক্ষেত্রে কোয়ালিটিফুল ঘুম হয় না। আমরা জানি, টোটাল হেলথে প্রোগ্রাম হলো একটি প্যাকেজ। আমাদের বয়সের সঙ্গে সঙ্গে একটা অসুখ দেখা দেয়। আমরা অনেক সময় ক্রনিক রেসপিরেটরি টাইপ অসুখগুলোর দিকে ফোকাস করি। তার ফলাফল কেমন পাচ্ছি, সেটা যেন আমরা রিভিউ করি। রিভিউটা এজন্যই আসে, যাতে আমার দেয়া যে চিকিৎসা বা ব্যবস্থা সেটা কতটা কার্যকর। কারণ অনেক ডিসঅর্ডারের সঙ্গে স্বাস্থ্যসম্মত ঘুম থাকে না। হেলদি লাইফ লিড করতে কোয়ালিটিফুল ঘুম দরকার।

ডা. মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন
দপ্তর সম্পাদক
চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
‘স্লিপ অ্যাপনিয়া একটি ব্যাধি বা এটি একটি ঘুমের ব্যাধি। এখানে দেখা যায় রোগীর একটু পরপর ঘুম ভেঙে যায়। রাতে তার অনেকবার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। এটি এক রাতের মধ্যে অনেকবার হতে পারে। এটিই হলো স্লিপ অ্যাপনিয়া। এটি কেন হচ্ছে। আমাদের কাছে এ ধরনের যেসব রোগী আসে তাদের বেশির ভাগই স্থূলকায়। এছাড়া শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের টনসিল বড় হয়ে যায়। অ্যাডিনয়েট বড় হয়ে যায়। এছাড়া কিছু স্ট্রাকচারাল অ্যাবনরমালিটি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শ্বাসনালিতে বাতাস চলাচলে বাধাগ্রস্ত হয়। তখন তার শ্বাসকষ্ট হয় এবং ঘুম ভেঙে যায়। যারা ধূমপান করে তারাও এ রোগে ভোগে। আবার যারা অ্যালকোহল সেবন করে তাদেরও এ সমস্যা হয়। কিছু ওষুধ আছে। যেগুলো দিলে ঘুমের সমস্যা হয়।

অধ্যাপক ডা. হাসান জাফর রিফাত
পরিচালক
জাতীয় নাক-কান-গলা ইনস্টিটিউট
স্লিপ অ্যাপনিয়া হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন ঘুমে বাধা। আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে শ্বাসপ্রশ্বাসটি খুব মসৃণ রাখা প্রয়োজন। সাধারণত নাক দিয়ে আমরা শ্বাস নিই। এখানে যখন বাধা আসে, তখন আমরা মুখকে ব্যবহার করি। এখন আমাদের অনেক রোগী আসেন যাদের আনুনাসিক সেপ্টামের স্থানচ্যুতি হয়, যার কারণে এমনিতেই তার নাকে কিছু বাধা থাকে। এছাড়া অ্যালার্জির কারণে অনেক সময় নাকের মধ্যে টার্মিনেট হয়। নাকের ভেতরে রাইট লেফট তিনটি টারবিনেট আছে। টারবিনেটগুলো হাইপারট্রফি হয়ে নাকের কিছু জায়গা ব্লক করে দেয়। শীতের মৌসুমে আমাদের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ভোগে অ্যাডিনয়েডে। শীতে প্রচুর নিউমোনিয়ার রোগী আসে যারা অ্যাডিনয়েড রোগে ভোগে। আরেকটি বিষয় এসেছে যে অতি স্থূলতা। আমরা যখন নিশ্বাস নিই তখন সেটি নাসারন্ধ্র দিয়ে অক্সিজেন শ্বাসনালি হয়ে ফুসফুসে যায়। শ্বাসনালিতে যদি সমস্যা থাকে, তাহলে আরো কিছু পেসেস নষ্ট হয়ে গেল। এভাবে কিন্তু স্লিপ অ্যাপনিয়া হয়। এটি শুরু হয় নাক ডাকা দিয়ে। এখানে আমরা প্রথমে দেখি রোগীর শ্বাসনালিতে আনুনাসিক বাধা আছে কিনা। তখন আমরা সেভাবে চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করি। আমরা শ্বাসনালিতে কোনো অবস্ট্রাকশন আছে কিনা দেখি। এ আনুনাসিক বাধা ও স্থূলতাকে আমরা শনাক্ত করি। আরেকটি বিষয় দীর্ঘদিন ধরে স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ভোগেন তারা প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য আমাদের কাছে আসেন। পরে তার হার্টসহ অন্যান্য কী ধরনের সমস্যা হয় সেটি তো বিশেষজ্ঞরা দেখেন।

ডা. মামুনুর রশিদ
যুগ্ম সম্পাদক
চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
স্লিপ অ্যাপনিয়া একটি সাইলেন্ট কিলার ডিজিজ। সাইলেন্ট বলছি কারণ রোগী নিজেই অবগত থাকে না যে তার একটি সমস্যা আছে। স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো তার একটি জটিল সমস্যা আছে। যখন একজন রোগী সমস্যায় পড়ে তখনই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু স্লিপ অ্যাপনিয়া হলে রোগী সমস্যা অনুভবই করে না। দেখা যায় এ ধরনের রোগী দিনের বেলায় ঘুমাচ্ছে, কাজে মনোযোগ দিতে পারছে না। কাজকর্মে ব্যাঘাত হচ্ছে। এসব অনুভব হওয়ার পরও রোগীরা চিকিৎসকের কাছে আসছে না। অনেক সময় চিকিৎসকরাও একটু অসচেতন থাকেন। এ রোগ হলে রোগীদের ঘুমের মধ্যে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়। সাধারণত সবারই ঘুমের মধ্যে কিছু ফিজিওলজিক্যাল পরিবর্তন আসে। স্লিপ অ্যাপনিয়া হলে এ পরবির্তনগুলো ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ঘুমের সময় অক্সিজেনের মাত্রাটা কমে যায়। একই সঙ্গে ওবেসিটি বা অন্য কোনো ফুসফুসের রোগ থাকলে তখন ইজিলি কার্বন ডাই-অক্সাইডও জমা হয়ে যায়। স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর হৃদরোগের ঝুঁকি থাকে। সাধারণ মানুষ থেকে এসব রোগীর স্ট্রোকের ঝুঁকি তিন গুণ বেশি থাকে।

আশরাফ উদ্দিন আহমেদ
এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর (সেলস)
ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড
ঘুমের সঙ্গে অনেক কিছুই জড়িত। সুস্থ সবল দেহের জন্য ও মন-প্রাণের জন্য ঘুম জরুরি। বিশ্বব্যাপী স্থূলতা (ওবেসিটি) একটি মহামারীর মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। পৃথিবীজুড়ে স্থূলতা বেড়ে চলছে। পশ্চিমা বিশ্বে বেশি হলেও বাংলাদেশেও এ সমস্যা ক্রমে বাড়ছে। ঘুমের অভাব ও সমস্যার সঙ্গে স্থূলতার সম্পর্ক রয়েছে। স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে ইনসেপ্টা ফার্মা বাজারে নিয়ে আসছে ‘সিমাগ্লুটাইড’ নামের একটি কার্যকর ওষুধ। এটি ওবেসিটিতে কাজ করে। এছাড়া আমরা আরো একটি নিউ জেনারেশন ওষুধ নিয়ে আসছি, যার নাম ‘টিরজেটাপাইড’, ডায়াবেটিস ও স্থূলতা উভয় ক্ষেত্রেই এটি কার্যকর। ব্যবহারের ফলে ১০-১৫ শতাংশ ওজন কমে যায়। মূল্যও তুলনামূলকভাবে কম, যা অনেকের জন্য সহজলভ্য করবে। এটি দিয়ে ভালো রেজাল্ট আসছে। অনেক মানুষ উপকার পাচ্ছে। স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে সঠিক ওষুধ অনেক উপকারে আসবে। এছাড়া স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যাপক ডা. মো. শাহেদুর রহমান খান
সহসভাপতি
চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
আমার বিষয়বস্তুটা হলো স্লিপ অ্যাপনিয়া কীভাবে ম্যানেজ করব। আমাদের যখন স্লিপ অ্যাপনিয়ার রোগী আসে, তখন আমরা প্রথমে দেখি ঘুম না হওয়ার কারণগুলো। নাসারন্ধ্র, নাক, তার উচ্চ শ্বাস আছে কিনা সেটা দেখি। সব জায়গা আমরা চেক করে নিই কোনো ধরনের সমস্যা আছে কিনা। সাধারণত আমরা দেখি এন্ডোক্রাইন সিস্টেমে কোনো রোগ আছে কিনা। হাইপোথাইরয়েডিজম, স্থূলতা, মেটাবোলিক নমুনা আছে কিনা। স্লিপ অ্যাপনিয়া ভালো করতে গেলে এগুলোকে শনাক্ত করতে হবে। কারণ এগুলোর কারণে স্লিপ অ্যাপনিয়া সৃষ্টি হতে পারে আবার স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণে এ রোগগুলো বাড়তে পারে। এরপর আমরা ফুল নাইট বা ওভার নাইট পলিসমনোগ্রাফি করে আমরা নিশ্চিত হই যে এটি স্লিপ অ্যাপনিয়া। তখন সার্জিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত নিই। এখানে যদি সম্ভব হয় সার্জিক্যাল গ্রাউন্ডটা গুরুত্বপূর্ণ। তার আগে যখন নিশ্চিত হই যে রোগীর স্লিপ অ্যাপনিয়া, তখন তাকে ওজন কমানোর একটি প্ল্যান দিতে পারি। সি প্যাপ, বাই প্যাপ ব্যবহার করতে বলি। নাক-গলা সুরক্ষার জন্য সামগ্রী থাকে, সেগুলো ব্যবহার করতে বলতে পারি। পাশাপাশি রোগীর জীবনযাপনে একটি গাইডলাইন দিতে পারি। এছাড়া তার ঘুম সুস্থভাবে হচ্ছে কিনা, অ্যালকোহল, নিকোটিন নিচ্ছে কিনা এগুলো দেখতে হবে। এভাবে স্লিপ অ্যাপনিয়া নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

ডা. ফেরদৌস ওয়াহিদ
সহযোগী অধ্যাপক
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
স্লিপ অ্যাপনিয়া হলো ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার একটি গুরুতর সমস্যা। এ রোগের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো নাক ডাকা। তবে যিনি নাক ডাকেন, তিনি অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে তিনি নাক ডাকছেন। আবার শুধু নাক ডাকা মানেই স্লিপ অ্যাপনিয়া রয়েছে এমনটাও নয়। সঠিকভাবে নিশ্চিত হতে প্রয়োজন স্লিপ টেস্ট, যার নাম পলিসোমনোগ্রাফি। পলিসোমনোগ্রাফি দুই ধরনের। ল্যাব পলিসোমনোগ্রাফি যেটা হাসপাতাল বা নির্ধারিত ল্যাবে করা হয়। আরেকটা হোম পলিসোমনোগ্রাফি, যা রোগী নিজের বাসায় এ পরীক্ষা করাতে পারেন। তবে এটির মাধ্যমে শুধু অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া ডায়াগনোসিস করা যায়।
এ পরীক্ষায় বোঝার চেষ্টা করা হয় ঘুমের সময় রোগীর শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কিনা আর শ্বাস পুরোপুরি বন্ধ না হলেও শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাচ্ছে কিনা।
প্রতি ঘণ্টায় অ্যাপনিয়া ও হাইপোপনিয়ার ইনডেক্সের ওপর নির্ভর করে রোগীর অবস্থা নির্ধারণ করা হয়। এ ইনডেক্স পাঁচের নিচে হলে স্বাভাবিক, প্রতি ঘণ্টায় যদি ৫-১৫ বার শ্বাস বন্ধ হয়ে যায় তা হলো মাইল্ড অ্যাপনিয়া, ১৫-৩০ বারের ক্ষেত্রে মডারেট অ্যাপনিয়া আর ৩০ বারের বেশি হলে সিভিয়ার অ্যাপনিয়া।
বাংলাদেশে আই কেয়ার, ইএনটি কেয়ার, রেসপিরেটরি কেয়ার থাকলেও স্লিপ কেয়ার সেন্টার নেই, যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ভারতসহ পাশের দেশগুলোয় এরই মধ্যে স্লিপ কেয়ার সেন্টার রয়েছে। আমাদের দেশেও বহুমুখী বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে স্লিপ কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এতে স্লিপ টেস্ট, নির্ভরযোগ্য ডায়াগনোসিস এবং সঠিক চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হবে।





