দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক ও জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছে অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহ-অর্থায়নে প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যেমন নারীর ক্ষমতায়ন, গৃহকর্মী, গৃহভিত্তিক তৈরি পোশাক শ্রমিক, চা শ্রমিক ও জেলেদের শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠায় বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বিশেষ করে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে গৃহভিত্তিক তৈরি পোশাক শ্রমিকদের। দেশের শ্রম আইনে তাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে ২১ মে কারওয়ান বাজারে বণিক বার্তার প্রধান কার্যালয়ে আয়োজন করা হয় ‘অদৃশ্য শ্রমের ক্ষমতায়ন: গৃহভিত্তিক তৈরি পোশাক শ্রমিকদের অধিকার ও স্বীকৃতি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহ-অর্থায়নে অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ ও বণিক বার্তার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ বৈঠকে অংশ নেন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক, সুশীল সমাজ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা, যেখানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অক্সফ্যামের শাহাজাদী বেগম

23

দেওয়ান হানিফ মাহমুদ

সম্পাদক

বণিক বার্তা

গার্মেন্টস সেক্টরের একদম বটম লাইনে থাকা এসব গৃহভিত্তিক পোশাক শ্রমিকদের কথা কেউ জানে না। তারা ঘরে বসে কাজ করেন, ফ্যাক্টরিতেও কাজ করেন। কিন্তু তারা কোন পরিবেশে কাজ করেন, মজুরি কত, তাদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং থাকার জায়গা—এসব একেবারেই আনঅ্যাড্রেস ইস্যু। মূলধারার গণমাধ্যমেও এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা হয় না বা সমাজের কাছে তুলে নিয়ে আসার কাজটি ততটা গুরুত্ব দিয়ে করা হয় না। এ সেক্টরের আকার কত, কর্মীরা কোথায় থাকেন, কীভাবে কাজ করেন—এসব তথ্য জানার চেষ্টা করব।

17

মাহমুদা সুলতানা

প্রোগ্রাম ডিরেক্টর

অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ

আমাদের হোমবেজড ওয়ার্কারের কোনো পরিসংখ্যানই নেই। যদি সংখ্যাই না জানি তবে আমরা তাদের নিয়ে পরিকল্পনা কীভাবে করব? তাদের নিয়ে পরিকল্পনা করতে হলে প্রথমেই ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বীকৃতি। বায়াররা যখন সোর্সিং বিষয়ে কথা বলেন তখন মূলত ফ্যাক্টরিতে যারা আছেন তাদেরই বিবেচনা করেন, এর বাইরে যারা আছেন তারা আড়ালেই থেকে যান। হোমবেজড ওয়ার্কারদের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে তাদের স্বীকৃতি প্রদানের পাশাপাশি বায়ারদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের সোর্সিং ইথিক্যাল কিনা। আমরা অক্সফ্যামের পক্ষ থেকে ছোট পরিসরে একটা কাজ শুরু করেছি অস্ট্রেলিয়ান বায়ারদের সঙ্গে। তবে এ উদ্যোগ আরো বড় পরিসরে হওয়া দরকার। একই সঙ্গে হোমবেজড ওয়ার্কারদেরও কর্মক্ষেত্রের সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং তাদের ন্যায্য মজুরির ব্যবস্থা করা জরুরি।

4

নজরুল ইসলাম

নির্বাহী পরিচালক

আরইএডিআই

গৃহভিত্তিক পোশাক শ্রমিক যারা আছেন, তাদের তৈরি পণ্যের গুণগত মান নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন আছে। কারণ সেখানে পর্যাপ্ত পরীক্ষার বিষয়টি থাকে না। কিন্তু এ খাত বিশাল। তাদের উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

8

অ্যাড. নাফিজা আনজুম কনা

লিড ট্রেইনার অ্যান্ড লিগ্যাল কনসালট্যান্ট ফেয়ার ওয়্যার ফাউন্ডেশন

গৃহভিত্তিক পোশাক শ্রমিকদের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করা ছাড়া, সমস্যাগুলো সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের বর্তমান আইনে সুযোগ আছে কোথাও পাঁচজন একসঙ্গে কাজ করলেই সেই স্থানকে কারখানা হিসেবে বিবেচনা করার। কিন্তু আমি জানি না এর পরও কেন এ শ্রমিকদের স্বীকৃতি প্রদানে সমস্যা হচ্ছে।

1

মো. বাবুল আজাদ

ডেপুটি চিফ অব পার্টি কেয়ার বাংলাদেশ

গৃহভিত্তিক শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা, সুরক্ষা এবং স্বীকৃতির ব্যবস্থা থাকতে হবে, তা না হলে এ সেক্টর বিকশিত হবে না। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বিশেষ করে সিটি করপোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে তাদেরকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে।

21

এএইচএম সফিকুজ্জামান

সচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়

আমরা কর্মসংস্থান অধিদপ্তর করব, সেখানে প্রশিক্ষণের কর্মসূচি দেব। গৃহভিত্তিক পোশাক শ্রমিকরা যাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ প্রশিক্ষণ নিতে পারেন, আমরা সেই ব্যবস্থা করব। প্রধান উপদেষ্টা শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক মহলকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সামনে আমরা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় যাচ্ছি। শ্রমিকদের যেসব সমস্যা রয়েছে এবং আইনের যেসব দুর্বলতা আছে সেসব কাটিয়ে আমরা শ্রমিকদের সর্বোচ্চ স্বার্থসংশ্লিষ্ট যা যা করা দরকার সরকারের পক্ষ থেকে সেগুলো করব। গৃহভিত্তিক যেসব কর্মী আছেন তাদের ধীরে ধীরে কীভাবে সংগঠিত করা যায় সে বিষয়েও আমরা কাজ করব। এটি করতে পারলে তাদের অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত হবে। এছাড়া মৃত্যুর কারণে সহযোগিতা, চিকিৎসাসেবা এবং শিশুদের শিক্ষার জন্য সরকারের একটি বাজেট আছে। সম্প্রতি একটি মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, কোনো পুরুষ কর্মীর স্ত্রী গর্ভবতী হলে তাদের দুবার আর্থিক সহযোগিতা দেয়া হবে।

10

মোসা. জুলিয়া জেসমিন

যুগ্ম মহাপরিদর্শক কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর

আমাদের দেশে খুবই কম মূল্যে শ্রমিক পাওয়া যায়, যেটি এক ধরনের সমস্যা। কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় কর্মীরা অল্প পারিশ্রমিকেও কাজ করতে আগ্রহী থাকেন। আবার তারা আইন ও অধিকার সম্পর্কে জানেন না। অনেক বাসাবাড়িতেও কারখানার কাজ চলছে। যেগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই, এগুলো কারখানা। তাহলে আমরা কীভাবে সেসব চিহ্নিত করব? তার পরও আমরা যেগুলোর বিষয়ে জানতে পারি সেগুলোতে আইনি পদক্ষেপ নিই। আবার আমাদের কাছে অনেক অভিযোগ আসে, যেগুলো সমাধান করতেও বেগ পেতে হয়। তবে আমরা বসে নেই, এসব বিষয়ে ঠিকই অ্যাকশন নিচ্ছি। আর শুধু আইনি পদক্ষেপ নিলেই কাজ হবে না। সর্বক্ষেত্রেই আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। আমরা যদি নিজেরা পরিবর্তন না হই তাহলে শুধু পরিদর্শন করে আর শাস্তি প্রদান করে সুফল পাওয়া যাবে না।

22

শাহাজাদী বেগম

প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর

অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ

দেশের গৃহভিত্তিক পোশাক শ্রমিকদের জন্য কোনো নীতি বা আইন নেই। পাশাপাশি শ্রম আইনে এ গোষ্ঠীকে সহযোগিতার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। এর পরও শিল্পটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে। গবেষনায় ৮৭ শতাংশ গৃহভিত্তিক শ্রমিক বলেছেন, চাকরিদাতাদের সঙ্গে তাদের আনুষ্ঠানিক কোনো লিখিত চুক্তিপত্র নেই। ৪৭ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ বা ওভারটাইম ছাড়াই ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন। গৃহভিত্তিক কর্মীরা প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন। ৮৬ শতাংশ নারী বলেছেন, বেতনকাঠামো নিয়ে পুরুষের সঙ্গে তাদের বৈষম্য করা হয়। ৬ শতাংশ নারী কর্মী অভিযোগ করেছেন, তারা কর্মক্ষেত্র কিংবা কর্মক্ষেত্রের বাইরে বুলিং, অপ্রত্যাশিত স্পর্শ, জোরজবরদস্তি, যৌন নিপীড়ন কিংবা ধর্ষণের শিকার হন।

5

অবিল বিন আমিন

নির্বাহী পরিচালক ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ

আমাদের উৎপাদিত পণ্যের মানদণ্ড ঠিক রাখতে হবে। আমরা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ক্রেতা গ্রুপের নির্ধারণ করে দেয়া মানদণ্ড অনুসরণ করে থাকি। এ জায়গা থেকে বের হয়ে আমাদের নিজেদের উদ্যোগী হয়ে নিজেদের পণ্যের কোয়ালিটি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অনেক ক্রেতা আছেন, যারা পণ্যের মান নির্ধারণ করে দেন না, কিন্তু তারা পণ্যের নিজস্ব মান পর্যবেক্ষণ করে থাকেন।

15

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ

চেয়ারম্যান ও কমিশনপ্রধান

শ্রম সংস্কার কমিশন এবং নির্বাহী পরিচালক, বিলস

আমাদের প্রথম সুপারিশটিই হলো কাজের ধরন, নিয়োগের ধরন, কাজের স্থান নির্বিশেষে সবাইকে ন্যূনতম কিছু সুরক্ষা দিতে হবে। আমি যে কাজই করি না কেন আমাদের ন্যূনতম কিছু সুরক্ষা যেমন পরিচয়, কাজের পরিবেশ এবং কথা বলার অধিকারের বিষয়টা নিশ্চিত করতে হবে। ইউনিয়ন করার ক্ষেত্রে আনুপাতিক হারের পরিবর্তে সংখ্যায় যেতে হবে। প্রত্যেক শ্রমিকের কোনো না কোনো স্কিমের সদস্য হতে হবে এবং আরেকটি বিষয় আমরা খুব স্পষ্ট করেছি সেটা হলো মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা। মাতৃত্বকালীন সুরক্ষার ক্ষেত্রে শুধু মালিক পক্ষ নয় সরকারকেও যুক্ত হতে হবে। আমাদের নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এই তিন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সব শ্রমিকের মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। এছাড়া শিল্পাঞ্চলে প্রায়ই মাইকিং শোনা যায় যে শিশু হারানো গেছে। এছাড়া কিশোরীদের নিয়েও সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এ কারণে আমরা মডেল কমিউনিটি সেন্টারের চিন্তা করেছিলাম, যেখানে শুধু শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র নয়, ওখানে স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্র থাকবে, কিশোরীদের শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। আমরা সংস্কার কমিশন আইনের আর্টিকেল বাই আর্টিকেল সুপারিশ দিইনি। আমরা চেষ্টা করেছি মোটা দাগে সব সমস্যাই আসুক। আপনারা যদি মনে করেন আপনাদের আকাঙ্ক্ষার সবকিছু প্রতিবেদনে আসেনি তাহলে সে বিষয়গুলো এখানে যুক্ত করতে না পারলেও আমাদের ধারাবাহিক কার্যক্রমে সেটি থাকবে।

1666666

লিথি মুনতাহা মহিউদ্দিন

পরিচালক

লিথি গ্রুপ

বড় ফ্যাক্টরিগুলো যখন সাবকন্ট্রাক্টরদের মাধ্যমে কোনো কাজ করায় তখন তাদের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। তাদের এমন সাবকন্ট্রাক্টরদেরই কাজ দেয়া উচিত যাদের কাছে তার শ্রমিকদের বিস্তারিত তথ্য আছে। আমি মনে করি ফ্যাক্টরি মালিকদের কাউকে কাজ দেয়ার আগে এটি নিশ্চিত হওয়া উচিত তার বিজিএমইএর মেম্বারশিপ আছে কিনা। আমি এনজিওগুলোসহ যারা এ বিষয়ে কাজ করছে তাদের বলব তারা যেন বায়ারদের সঙ্গেও কথা বলে, আলোচনা করে যেন বায়াররা প্রাইস রেঞ্জ একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখে। ছোট যে কারখানাগুলো আছে তাদের জন্য যদি আমরা স্বল্প সুদে লোনের ব্যবস্থা করে দিতে পারি তাহলে তারা কর্মপরিবেশের উন্নয়নসহ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিতে পারবে।

2

তারেক আজিজ

প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর

অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ

আলোচনায় বেশকিছু দাবি উঠে এসেছে। এগুলো কোনো দয়া-দাক্ষিণ্যের ব্যাপার নয়। এগুলো অধিকারের বিষয়। এসব খাতের কর্মীদের কাজের জায়গাটিকে ন্যায্যতা ও হিস্যার জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের করপোরেট ডেলিগেট যাত্রা শুরু করেছে। যারা ক্রেতা বা সরবরাহ চেইনে রয়েছেন, তারা এটি না মানলে কিন্তু বিপদ অবশ্যম্ভাবী। সেজন্য নিজেদের বাঁচানোর জন্য হলেও শ্রমিকদের পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে।

18

বিউটি

শ্রমিক প্রতিনিধি

আমি একটা ছোট কারখানায় কাজ করি। সেখানে কক্ষে আলো-বাতাসসহ পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নেই। বাচ্চা রাখার জায়গা নেই। এক মিনিট লেট হলে হাজিরা বোনাস কেটে নেয়। কোনো বিষয়ে অভিযোগ জানালে মালিক পক্ষ কর্তৃক খারাপ আচরণের শিকার এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়।

6

শিরীন পারভীন হক

চেয়ারম্যান ও কমিশনপ্রধান

নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নারীপক্ষ

সব খাতে ছয় মাস বা ২৪ সপ্তাহ বাধ্যতামূলক প্রসূতি, প্রসবজনিত ও দত্তকজনিত ছুটি নিশ্চিত করার কথা আমরা আমাদের প্রতিবেদনে সুপারিশ করেছি। শ্রম আইনে ‘প্রসূতি কল্যাণ’ শব্দের পরিবর্তে ‘প্রসূতি অধিকার’ শব্দটি ব্যবহারের কথাটি বলেছি, যাতে শ্রমিক বুঝতে পারে এটি তার অধিকার, কারো দয়া নয়। এছাড়া আমরা অন্তত দুই সপ্তাহ পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং ট্রেড ইউনিয়নেও নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে আইনে শতকরা হার নির্ধারণ করে দেয়ার প্রস্তাব করেছি। আমরা পরিষ্কারভাবে এটাও বলেছি যে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যেসব নারী কাজ করেন তাদের যেন স্বীকৃতি দেয়া হয়। বিশেষ করে কৃষক ও জেলে বললে সাধারণত আমরা কল্পনা করি একজন পুরুষ। কিন্তু নারী কৃষক বা নারী জেলে বলে আমরা নারীদের কাজের স্বীকৃতি দিই না। এছাড়া চা-বাগানের শ্রমিকদের প্রতি বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। বসতি ঘরের দুরবস্থা, টয়লেট ব্যবহারের জন্য দীর্ঘ লাইন, স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা প্রভৃতি দেখলে ২০২৫ সালেও মনে হয় চা শ্রমিকরা যেন কোনো বন্দিশালার ভেতরে আবদ্ধ হয়ে রয়েছেন। আমরা ঢাকা এবং মফস্বলে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষদের সঙ্গে ৩৯টি সভা করেছি। এসব সভায় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের বিষয়ে যেসব প্রস্তাব উঠে এসেছে সেগুলো আমরা আমাদের রিপোর্টে সন্নিবেশিত করেছি।

11

সৈয়দ ফজলে নিয়াজ

টিম লিডার বেটারওয়ার্ক

মানুষ যে কাজই করুক না কেন সেখানে তার মর্যাদার একটি বিষয় থাকে। ভালো, পরিচ্ছন্ন কর্মপরিবেশ, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সবই এ মর্যাদার অংশ। হোমবেজড ওয়ার্কারদের যে সমস্যাগুলো রয়েছে তার প্রতিটিরই সুরক্ষা বাংলাদেশ শ্রম আইন ও আন্তর্জাতিক শ্রম আইনে রয়েছে। স্বীকৃতির যে বিষয়টি বারবার আলোচনায় এসেছে, সেটি আমরা সহজভাবে এভাবে দেখতে পারি যে একটি ফ্যাক্টরিতে পণ্য উৎপাদিত হয়ে আসার যতগুলো ধাপ আছে তার সবগুলোই ফ্যাক্টরির এক্সটেনশন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং এ ধাপের মধ্যে যে যেখানেই কাজ করুন তিনিই শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃত হবেন। আর সবশেষে গুরুত্বপূর্ণ হলো শ্রমিকদের কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কথা বললেই তাদের গলা চেপে ধরার যে সংস্কৃতি সেটি বন্ধ করতে হবে।

14

সানজিদা সুলতানা

অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক

কর্মজীবী নারী

যতদিন আমাদের দেশে রফতানিকারক পোশাক শিল্প চলমান রয়েছে, ততদিন ধরে এ হোমবেজড শ্রমিকরাও কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু খুব বেশিদিন হয়নি যে আমরা তাদের অধিকার নিয়ে সরাসরি কথা বলছি। আমরা যে ইন্টারন্যাশনাল সাপ্লাই চেইনের কথা বলি তারই একটি অংশ এ হোমবেজড ওয়ার্কাররা। তাই এ সাপ্লাই চেইনেও মানবাধিকার এবং পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সুতরাং মালিক প্রতিনিধিরা যত দ্রুত বুঝবেন ততই ভালো যে আমরা একটি নজরদারির মধ্যে চলে এসেছি। অর্থাৎ আমরা যদি শ্রমিকদের অধিকার ও সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করি তাহলে আমাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

19

ফিরোজা পারভীন হ্যাপি

শ্রমিক প্রতিনিধি

২০০৬ সালের আইন যেন বাস্তবায়ন করা হয়। পুরুষ ও নারীদের বেতনবৈষম্যের পাশাপাশি আমাদের কোনো পরিচয়পত্র না থাকায় রাস্তায় নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হই। এছাড়া আমরা মাতৃত্বকালীন ছুটি বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাই না।

24

দেবরাজ দে

হেড, পি এম ইউ অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ

অক্সফ্যাম বিশ্বব্যাপী ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আজকের আলোচনার বিষয়টি আমাদের কাছে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজকের এ গোলটেবিল আলোচনায় কমিউনিটিকেন্দ্রিক কাজ করার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। আমাদের ভাবতে হবে এসব নিয়ে কাজ করা যায় কিনা। উদাহরণস্বরূপ, নারীরা কৃষিকাজ করেন কিন্তু তারা স্বীকৃতি পান না। তাদের নারী কৃষক, একইভাবে নারী জেলেদের স্বীকৃতি আদায়ে কাজ করতে হবে। এছাড়া শ্রমিকদের স্বল্পমূল্যে ক্যান্টিন সুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। এগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে।

3

মাহমুদুল হাসান খান

উপপরিচালক (কর্মসূচিপ্রধান) বিএলএফ

ক্লাস্টার অনুযায়ী শ্রমিকদের ম্যাপিংয়ের আওতায় আনতে হবে। এমনটি করা না গেলে কর্মীরা বুঝতে পারবেন না তারা এর আওতাভুক্ত আছেন। এখানে ট্রেড ইউনিয়ন ও ফেডারেশনের দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। ইউনিয়ন নেতারা রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে নজর রাখেন কিন্তু এসব সরবরাহ চেইনে যুক্তদের দিকে আরো বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

7

সুলতানা বেগম

সভাপতি, গ্রীন বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার ফেডারেশন

আমরা যদি হোমবেজড ওয়ার্কারদের থানাভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারি তাহলে তাদের অধিকার লঙ্ঘন হলে আমরা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মাধ্যমে তাদের অধিকার নিশ্চিতে কাজ করতে পারব। তবে একটি চ্যালেঞ্জ হলো কলকারখানা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ছোট কারখানাগুলো পরিদর্শন করেন না। আবার তাদের কাছে কোনো অভিযোগ করলে তিন বা ছয় মাসেও সেটির সমাধান হয় না। বরং ছয় মাস পর তারা মামলা করতে বলে।

13

তারা মিয়া

সাব কনট্রাক্টর

আমাদের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ হলো আমরা টাকা ঠিকভাবে দিই না। কিন্তু আমরা যারা সাবকন্ট্রাক্টর আছি তারা কাজটা আনি কারখানা থেকে এবং কারখানা ঠিক করে দেয় যে আমি তাকে কাজটা কত দরে করে দেব। সেই হিসাবে আমরা কারখানা খরচ, বিদ্যুৎ খরচসহ অন্যান্য খরচ বিবেচনা করে শ্রমিকদের জন্য দর ঠিক করি। কারখানা যখন আমাদের কম দর দেয় আমাদেরও তাদের কম দর দিতে হয়।

20

রানী খাতুন

শ্রমিক প্রতিনিধি

ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত না থাকায় একজন গার্মেন্টস শ্রমিক মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা বেতন পেলেও আমরা পিস রেটে কাজ করে মাসে পাই ৪-৫ হাজার টাকা। এছাড়া আমাদের বোনাস, ছুটি, ওভারটাইমও নেই। এ টাকায় আমাদের সংসার চলে না। এ বিষয়ে আমরা ভেন্ডরের কাছে অভিযোগ করলে তারা আমাদের কাজ না দেয়ার হুমকি দেয়।